📄 ক্রুসেড
মানুষ প্রায়ই ইতিহাসের অমোঘ বিধির কথা চিন্তা করেছে। এই চিন্তার মধ্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দ্বন্দ্বের কথা সব সময় ছিলো। হেরোডোটাস তার ইতিহাসের সূচনায় প্রশ্ন রাখেন, কেন তারা পরস্পর যুদ্ধ করে। আমাদের কবিরা এখনো পাশ্চাত্যের বজ্রনিনাদী কাহিনীর প্রতি প্রাচ্যের নীরব ও গভীর ঘৃণার কথা বলে থাকে কিংবা যে আপোসহীন বৈরিতা এ দুটিকে চিরন্তনভাবে পৃথক করে রেখেছে তা সাড়ম্বরে বর্ণনা করে। প্রাচীনকালের উজান ও পারস্য-যুদ্ধ, সিরিয়ায় ক্রেসাস ও হেরাক্লিয়াসের যুদ্ধ, ক্রুসেড এবং উসমানীয় বিজয় সবগুলি মিলে এক ছন্দের সৃষ্টি করেছে এবং নিয়মিত পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত বহন করছে। কিন্তু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব জটিলতাপূর্ণ ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ঘটনার ভৌগোলিক পরিণতি, ইতিহাসে বাইরের সংঘাতের অতিরিক্ত বিষয়ও স্থান লাভ করে। যে সংঘাত প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম, জাতি ও সভ্যতার মধ্যে যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন রূপ লাভ করেছে।
আমরা যদি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দৃশ্যমান সেই সংঘাতকে হ্রাস করে সত্যিকারের সংঘাতে রূপায়িত করতে পারি, তাহলেই আমাদের বিবরণ বাস্তব রূপ ও আকৃতি লাভ করবে। বস্তুত এ কথা সত্য যে, বিচিত্র ভৌগোলিক কারণে কনস্টান্টিনোপল থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরীয় পূর্ব উপকূল দীর্ঘকাল ইতিহাসের অত্যন্ত বিতর্কপূর্ণ একটি অঞ্চল ছিলো। এখানে কৃষ্ণ সাগরের পথে লোহিত সাগরের পথে কিংবা মরুভূমির অপর পারে বৈরুত থেকে ইউরোপ, এশিয়া এবং এশিয়ার পণ্যও রহস্যের সংস্পর্শে আসে। এখানে মিসর, ক্রীট, জেরুজালেম বা এথেন্স ছিলো সভ্যতা, ধর্ম ও দর্শনের দোলনা-লালনভূমি।
এ ধরনের এলাকায় বহু সংঘাতের উদ্ভব হওয়া অবধারিত ছিলো। এগুলোর কোনটি ছিলো অর্থনৈতিক, কোনটি ধর্মীয়, কোনটি রাজনৈতিক এবং কোনটি ছিলো বর্ণগত। আবার বহু সংঘাত ছিলো এগুলির সংমিশ্রণ জনিত। প্রত্যেকটি সংঘাতকে তার নিজস্ব পর্যায়ে ও নিজস্ব পরিসরে প্রকৃষ্টভাবে বোঝা যায়। বৃহত্তম সংঘাতগুলির অন্যতম হচ্ছে, একদিকে পাশ্চাত্য খৃষ্ট ধর্ম, সভ্যতা ও সম্প্রদায় এবং অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বাস, সভ্যতা ও সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সংঘাত। আমরা বলতে পারি যে, এর সূচনা হয় ৬৩৬ খৃস্টাব্দে ইয়ারমুকে হযরত উমর রাদিআল্লাহু তা'আলা আন্হর সেনাবাহিনীর নিকট 'প্রথম ক্রুসেডার' হেরাক্লিয়াসের পরাজয় থেকে। এর সমাপ্তি তারিখ কেউ বলতে পারে না। এটি এক সময় ছিলো প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় এবং অন্য এক সময় প্রধানত রাজনৈতিক। এই সংঘাত ছিলো বিভিন্ন জাতির মধ্যে একদিকে প্রধানত রোম্যান্স ও স্লাভোনিক এবং অন্যদিকে আরব ও তুর্কী, কিন্তু এটি সবসময় একটি মিশ্র সংঘাত হিসাবে অব্যাহত থাকে, যাতে দুটি সভ্যতা মৌলিকভাবে ব্যাপৃত হয়। এর অন্যতম অধ্যায় হচ্ছে ক্রুসেডের যুদ্ধ। এই অধ্যায়ের সূচনা ১০৯৬ খৃস্টাব্দে। মূল সিরীয় ভূখণ্ডে সর্বশেষ খৃস্টান ঘাঁটির পতনকে যদি আমরা সমাপ্তি মনে করি তাহলে এর সমাপ্তি ঘটে ১২৯১ খৃস্টাব্দে-আমরা যদি ক্রুসেডের প্রেরণার রেশটুকু বিবেচনা করি তাহলে পর্তুগীজ সমুদ্র অভিযান ও কলোম্বাসের আবিষ্কার পর্যন্ত এটি অব্যাহত ছিলো।
ক্রুসেডগুলোর দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মূল আবেগের দিক দিয়ে (এ কথা সত্য যে, অন্যান্য প্রবণতাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়) এগুলি হচ্ছে একটি আত্মিক আন্দোলন যা নিজস্ব পন্থায় একটি আত্মিক প্রতিষ্ঠানের বাস্তবরূপ গ্রহণ করে। খৃস্টান যাজকরা এ যুদ্ধকে পুতযুদ্ধ এবং ন্যায় বলেই শুধু ব্যাখ্যা করেনি; তারা এও যোষণা করে যে, এর দ্বারা বিশপের উচ্চ পদমর্যাদায় উন্নীত হওয়া যায়। এ যুদ্ধ রেস খৃষ্টিয়ানা, যা খৃষ্টান জগতকে তাদের ধর্ম বিশ্বাসের প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করে। পবিত্র ভূমি পুনরুদ্ধারে প্রলুব্ধ করে। এটি মুসলিম প্রাচ্যে খৃস্টান পাশ্চাত্যের একটি প্রতিফলন। এটি 'জেরুজালেমের ল্যাটিন রাজ্য' নামে একটি খৃস্টান রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে, যার দৃষ্টি লেভ্যান্টের উপকূল থেকে পূর্ব দিকে মসুল ও বাগদাদের প্রতি এবং দক্ষিণ দিকে কায়রো ও মিসরের প্রতি প্রসারিত হয়। প্রথমোক্ত ধারণাটি হচ্ছে ব্যাপকতর এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ ও অদ্ভুত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। জেরুজালেমের ল্যাটিন রাজ্যে ক্রুসেড তার সুনির্দিষ্টরূপ গ্রহণ করে এবং এখানে তার সুনির্দিষ্ট ফলাফলও প্রদর্শন করে, সামরিক শৃংখলার উদ্ভব হয়, ভেনিস ও জেনোয়ার বণিকগণ কর্তৃক সিরীয় বন্দরগুলিতে বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দূরবর্তী এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও মিশনারী সম্পর্কের বিকাশ লাভ করে। এখানে (যেমনটি স্পেনেও, কিন্তু এখানকার ব্যাপারে যেভাবে ইউরোপের সাধারণ দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় স্পেনের ব্যাপারে তা কখনো হয়নি) খৃষ্ট ধর্ম ও ইসলামের মধ্যে ক্রমাগত সংঘাত ও স্থায়ী সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ল্যাটিন রাজ্যটির প্রতি যখন দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় তখনি সাধারণ পটভূমি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় (দৃশ্যমান দিগন্তের পাহাড়ের চূড়ার ন্যায়) ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকার ভৌগোলিক পটভূমি এবং এই অববাহিকায় পূর্ববর্তী শতকগুলিতে খৃস্টান ও মুসলিম শক্তির দোদুল্যমান অবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি।
ভৌগোলিকভাবে দুটি ভূমধ্যসাগরের কথা আমরা বলতে পারি। একটি হচ্ছে পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর, যা সিসিলির দক্ষিণ পশ্চিমে সরেল্লো অন্তরীপ এবং উত্তর-পূর্ব তিউনিসের বন অন্তরীপের মধ্যবর্তী প্রায় ১০০ মাইল প্রশস্ত সমুদ্র পথ দ্বারা পূর্বদিকে ইটালী ও সিসিলির সঙ্গে যুক্ত। অপরটি হচ্ছে পূর্বের ভূমধ্যসাগর, যা সিসিলির পূর্ব উপকূল (ইতিহাসে এ স্থানটি বার বার দুই ভূমধ্যসাগরের রণাঙ্গন বা সংযোগ স্থল ছিল) থেকে এশিয়া মাইনর ও সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। একটি সমুদ্রের দুটি অংশ পূর্ব ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগর প্রাচীনকালে দুটি সভ্যতার লীলাভূমিতে পরিণত হয়। পশ্চিমে ছিল ল্যাটিন সভ্যতা। এই সভ্যতার ভিত্তিতে খৃষ্টধর্ম বিজয়মণ্ডিত হওয়ার পর রোমান ধর্মমত ও পশ্চিমের হোলি রোমান সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয়। পূর্বে ছিলো গ্রীক সভ্যতা। এখানে বিকাশ লাভ করে গ্রীক ধর্মমত ও বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্য। এই অংশেই সপ্তম শতকে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। মক্কায় অবস্থিত এর শক্তি কেন্দ্র থেকে বৈদ্যুতিক শক্তির দ্রুততায় সম্প্রসারিত হয়ে এটি সিরিয়াকে আলোকিত করে, উত্তর আফ্রিকার সমগ্র বিস্তার অতিক্রম করে এবং সেখান থেকে একলাফে জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে পিরেনিজের দ্বারদেশে গিয়ে উপনীত হয়। আদি মধ্যযুগেই এটি উভয় ভূমধ্যসাগরে তার স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠিত করে-পশ্চিমের দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে এবং পূর্বের দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকার উভয় অংশেই খৃস্টান শক্তি এর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং এসব সংঘর্ষ, এমনকি ক্রুসেডের আগেই, ক্রুসেডের কিছুটা বৈশিষ্ট্য লাভ করে। কিন্তু ক্রুসেডের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একাদশ শতকের শেষের দিকে অভিযান শুরু হলে পাশ্চাত্যের ল্যাটিন খৃস্টান শক্তি এতদিন পর্যন্ত তার থেকে বিচ্ছিন্ন-প্রাচ্যে অগ্রসর হয়, এবং এখানে একদিকে এটি তার নামমাত্র মিত্র গ্রীক খৃস্টান শক্তি ও প্রাচ্য সাম্রাজ্যের সংস্পর্শে আসে এবং অন্যদিকে প্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
পাশ্চাত্যের প্রাচ্যে প্রবেশের এই সহজ সত্যটিই সম্ভবত ক্রুসেডের প্রাথমিক ও সবচাইতে বিশ্বস্ত দিক। কিন্তু এই সহজ সত্যেরও কতিপয় জটিলতা রয়েছে। কারণ পাশ্চাত্য যে প্রাচ্যে প্রবেশ করে, তাও জটিলতাপূর্ণ ছিলো। কেবলমাত্র ল্যাটিন খৃস্টান শক্তিকেই বাইযেন্টিয়ামের গ্রীক খৃস্টান শক্তির সংগে চুক্তি করে তার সম্পর্ক স্থির করতে হয়নি, এসময় মুসলমানরাও নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন ছিলো। উত্তরে কৃষ্ণ সাগর থেকে দক্ষিণে লোহিত সাগর পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ার সুন্নী তুর্কীরা বিতর্কমূলক সিরীয় ভূ-খণ্ডে ফাতেমী বংশীয় মিসরীয় শিয়াদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ক্রুসেডে অংশগ্রহণকারী পাশ্চাত্য এমন এক বিরোধিতা আবিষ্কার ও সর্বশক্তি দিয়ে মুকাবিলা করে, যার সম্পর্কে সে আদৌ অবহিত ছিলো না।¹
ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ল্যাটিন খৃস্টান শক্তির বিদেশে গমন পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যেকার সুদীর্ঘকালীন যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আর এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক পটভূমির এক বিরাট উপাদান যাকে আমরা অবশ্যই ক্রুসেডের জন্য বসাতে পারি। সপ্তম শতাব্দীর শেষেরদিকে আরবরা উত্তর আফ্রিকার বারবারদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৭১১ থেকে ৭১৮ খৃস্টাব্দের মধ্যে আরব ও বারবাররা পিরেনিজ পর্যন্ত স্পেন জয় করে। নবম শতকে ৮২৭ থেকে ৮৭৮ খৃস্টাব্দের মধ্যে (যখন সিরাকুজের পতন হয়) উত্তর আফ্রিকার কাইরোওয়ানের আঘলাবীরা সিসিলি জয় করেন। তারা আকস্মিক আক্রমণ ও ছোট ছোট ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে ইটালীর দক্ষিণে ক্যাম্পাগনা ও আবরুয্যী পর্যন্ত এলাকায় অভিযান চালায়। স্পেনের মুসলমানরা প্রভেন্স, উত্তর ইটালী এবং এমনকি সুইজারল্যাণ্ডেও অভিযান চালায়। শত্রু জাহাজ ধ্বংস করার জন্য নিযুক্ত নৌবহরের হাতে কর্সিকা ও সার্ডিনিয়া বারবার পর্যুদস্ত হয়। কেবলমাত্র স্পেন এবং সিসিলিতেই মুসলিম সভ্যতার বিকাশ লাভ করে এবং দুটি এলাকা থেকেই এর প্রভাব ফ্রান্স ও ইটালীতে বিস্তার লাভ করে। কর্ডোভার দর্শন এবং এর মহান শিক্ষক ইবনে রুশদ (আবেররোস) প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। আরব বাগানবাড়ি (ভিল্যা), আরব ভূগোলবিদ ও আরব কবিরা নর্ম্যান রাজণ্যবর্গ ও তাদের উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের আমলে পালের্মোর শোভা বর্ধন করে। বলা হয়, ইসলামের সাময়িক অবদানের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য যে আশীর্বাদ লাভ করেছে তা অন্ততপক্ষে ক্রুসেডের সামনে প্রাচ্যের প্রভাবের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ।¹ কিন্তু যতটা লাভবানই হোক না কেন, অন্য একটি ধর্মবিশ্বাসের অনুসারীদের দ্বারা খৃস্টান ভূমি অধিকারকে পাশ্চাত্য সহ্য করতে পারেনি। একাদশ শতকে খৃস্টান অভিযানের আগেই পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মুসলিম সামরিক শক্তির ক্রমাবনতি লক্ষ্য করা যায়। ১০০২ খৃস্টাব্দে খলীফা আল্-মনসুরের ইন্তিকালের পর স্পেনে উত্তরাঞ্চলের লিওন, ক্যাস্টিল, অ্যারাগন ও নাভারের ছোট ছোট খৃস্টান রাজ্যগুলি তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যাপৃত হয়। ১০৮৫ খৃস্টাব্দে ক্যাস্টিলের ষষ্ঠ আলফন্সোর হাতে টলেডোর পতন ঘটে² এবং ১১১৮ খৃস্টাব্দে অ্যারাগণ কর্তৃক সারাগোসা অধিকৃত হয়। একাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাইযেন্টাইন গভর্নর ও আরব আক্রমণকারীদের বিরোধে জর্জরিত দক্ষিণ ইটালী নর্ম্যানদের অধিকারে যায়। তারা ১০৬০ ও ১০৯০ খৃস্টাব্দে মধ্য সিসিলিও জয় করেন। ১০১৬ খৃস্টাব্দের দিকে অষ্টম বেনেডিক্ট সার্ডিনিয়া অধিকারের জন্যে পিসানদের প্ররোচিত করেন। জেনোয়া ও ভেনিসের নাবিকদের আবির্ভাবের ফলে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌবহরের তৎপরতা হ্রাস পায়। একাদশ শতকের শেষ দিকে কেবলমাত্র দক্ষিণ স্পেন এবং উত্তর আফ্রিকাই মুসলমানদের অধিকারে থাকে। দ্বাদশ শতকে সিসিলির নর্ম্যানরা তাদের উপর, এমন কি তাদের আফ্রিকার সুরক্ষিত এলাকাতেও আক্রমণ চালায়। অধিকতর সংঘবদ্ধ ও উন্নত পাশ্চাত্য তাদের নিজস্ব এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকে।
এটাই ছিলো পাশ্চাত্যের ক্রান্তিকাল। কারণ এক হলেও এই আহবান এসেছে দুদিক থেকে। সেলজুক তুর্কীরা বেতনভোগী সৈনিক হিসাবে শুরু করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে বাগদাদের খলীফাদের উপর সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। তাদের চাপে একদিকে সিরিয়ায় কায়রোর নরমপন্থী ফাতেমী খলীফাদের কাছ থেকে জেরুজালেম অধিকৃত হয় (১০৭০) এবং অন্য দিকে এশিয়া মাইনরে মানযিকার্টে বাইযেন্টাইন বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে (১০৭১)। জেরুজালেমের প্রয়োজন ও বাইযেন্টিয়ামের প্রয়োজনীয়তা উভয়টিই পাশ্চাত্যের প্রতি জোর আহবান জানায়। প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-৯৯) এই দ্বৈত আহবানেরই একটি সাড়া।
পশ্চিম ইউরোপের ধর্মীয় অভ্যাস এবং সামাজিক ব্যবস্থা একযোগে এই সাড়া তৈরির জন্য কাজ করতে থাকে। পাপ স্থালনের জন্য প্রায়শ্চিত্তমূলক তীর্থ যাত্রা প্রাচীনকাল থেকে পাশ্চাত্যের একটি রীতি ছিলো। জেরুজালেম সবচাইতে পবিত্র এবং সবচাইতে দূরবর্তী পবিত্র স্থান। তাই এতে দ্বিগুণ পুণ্য সঞ্চয় হয়। জেরুজালেমে এ ধরনের তীর্থযাত্রা বহু দিনের লক্ষ্য ছিলো। এই লক্ষ্য বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন, কাজেই এই হুমকি অবশ্যই অপসারিত করতে হবে। অতএব যাত্রাপথ নিরাপদ করে ভবিষ্যৎ তীর্থযাত্রার লক্ষ্যস্থলকে মুক্ত করার জন্য ক্রুসেড এক বিরাট সশস্ত্র তীর্থযাত্রায় রূপায়িত হয়। পরবর্তীকালে যে তীর্থ যাত্রী নাইটরা (যোদ্ধা) জেরুজালেম রক্ষা করার জন্য বছরে বছরে এখানে আগমন করতেন, তারাই এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রুসেডের অপর একটি সমতুল্য কারণ ছিলো যাজক সম্প্রদায়ের প্রভাবে সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থা। একাদশ শতকের সূচনা থেকে ব্যক্তিগত যুদ্ধের (গুয়েররা) জন্য একটি সামরিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধপ্রিয়তা ধর্মসভা (সিনড) ও পোপদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথমে তারা প্যাক্স ও টিউগা ডী প্রবর্তন করে এই প্রবণতা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে তারা এই মনোভাবকে 'ন্যায়' ও 'পবিত্র' যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করার প্রয়াস পান। এই উদ্দেশ্যে তারা আংশিকভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য দীক্ষা অনুষ্ঠানে নাইটের অস্ত্র উৎসর্গ করেন (এতদ্বারা একটি নতুন শিভল্লি সৃষ্টিতে সহায়তা করা হয়), এবং আংশিকভাবে ১০৯৫ খৃস্টাব্দে ক্লারমন্টে ক্রুসেড প্রচার করতে গিয়ে দ্বিতীয় আরবান যেভাবে দাবি করেন, সেভাবে ভ্রাতৃঘাতী ব্যক্তিগত যুদ্ধকে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে 'পবিত্র যুদ্ধের' দিকে পরিচালিত করার দাবি জানান। এমনিভাবে আভ্যন্তরীণ শান্তির একটি উদ্দেশ্যকে একটি 'পবিত্র যুদ্ধের' উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং একইভাবে ধর্মসভাগুলি উপর্যুপরি আল্লাহর উদ্দেশ্যে খৃষ্টান ক্রুসেডের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে ফরমান জারি করে।
এ পর্যন্ত ক্রুসেডের দুটি দিক প্রতিভাত হয় 'তীর্থযাত্রীর অগ্রগতি' (পিলগ্রিমস প্রোগ্রেস) এবং 'পবিত্র যুদ্ধ' কিন্তু এটি এর বাইরেও অন্য কিছু। প্রথমত এটি ছিলো সামন্ততান্ত্রিক অতি জনশক্তির একটি সমাধান। একটি সামন্ত অভিজাত পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানদের স্বদেশে কোন ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ছিলো না। দৃষ্টান্ত স্বরূপ সিসিলির একটি নর্ম্যান সাম্রাজ্য এবং জেরুজালেমের একটি ল্যাটিন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত না হলে 'ট্যানক্রিড ডি' হাউটিভিলের বংশধরদের অনেকের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়তো। এই রাজ্যগুলি ছিলো সামন্ত উপনিবেশ, যা সামন্ত দেশত্যাগীদের জন্য সুযোগের সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত ক্রুসেড ইটালীর বর্ধনশীল বন্দরগুলির বাণিজ্যিক উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। এশীয় বাণিজ্য পথের আমদানী-রপ্তানী কেন্দ্র হিসাবে অবস্থিত সিরীয় উপকূল ভেনিসিয়ান, পিসান ও জেনোয়ান প্রতিষ্ঠানগুলির অবদান ল্যাটিন বসতি স্থাপনের ইতিহাসে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইটালীয় জাহাজগুলো প্রথম ক্রুসেডের সহগামী হয়, এমনকি এর অগ্রগতিতে সাহায্য করে। যে অবরোধ যুদ্ধের পরিণতিতে জেরুজালেম রাজ্যের সৃষ্টি হয়, সেখানে ইটালীয় শহরগুলির সাহায্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিলো। যেসব তীর্থযাত্রী বছরে বছরে আগমন করে, ইটালীয় জাহাজগুলি তাদের বহন করে। এমনিভাবে ক্রুসেডের আধ্যাত্মিক প্রেরণার সঙ্গে ভালোমন্দ উভয় রকমের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য যুক্ত হয়।
এসব বিবিধ কারণে এবং সে সঙ্গে সিরিয়ায়, মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের সুবর্ণ সুযোগে প্রথম বান্ডউইন ও দ্বিতীয় বান্ডউইনের পক্ষে ১১০০ থেকে ১১৩১ খৃস্টাব্দের মধ্যে জেরুজালেম রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও সংগঠিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। খৃস্টানদের চাপের মুখে মুসলমানদের মধ্যে একটি প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রস্থল ছিলো মসুল। এখানে প্রথম ক্রুসেড আরম্ভ হওয়ার আগেই যে সেলজুক সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে যায় তার ধ্বংসাবশেষ থেকে ১১২৭ খৃস্টাব্দের দিকে আতাবেগ জঙ্গী নামে এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, এবং ১১৪৪ খৃস্টাব্দে ল্যাটিনদের কাছ থেকে এডেসা অধিকার করে নেন। এটি ল্যাটিনদের জন্য প্রথম গুরুতর বিপর্যয়। তার উত্তরাধিকারী নূরুদ্দীন (১১৪৬-৭৪) ইতিমধ্যেই ক্রুসেডের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তাঁর রাজত্বকালে তার সহচর কুর্দ সিরকুহ ও সিরকুহর ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহউদ্দীন মিসরকে তার অধিকারভুক্ত করেন। মসুল ও কায়রো উভয়দিক থেকে বিপন্ন হয়ে এবং নিজেদের ক্রুসেডের অবসন্ন আবেগের মুকাবিলায় নতুন জিহাদী প্রেরণার মুখে রাজ্যের ল্যাটিনরা নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। ১১৮৭ খৃস্টাব্দের জুলাই মাসে হিটাইনের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়। একই বছরের অক্টোবরে জেরুজালেম শর্তাধীনে আত্মসমর্পণ করে। সালাহউদ্দীনের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং যে আল-আকসা মসজিদে আল্লাহ্ একরাতে তার বান্দা মুহাম্মদ (সা)-কে ভ্রমণ করান তিনি তা মুক্ত করেন।
তৃতীয় ক্রুসেড সালাহউদ্দীনের অপ্রতিরোধ্য গতি রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ল্যাটিনরা এখনো কিছু কালের জন্য উত্তর সিরিয়ার এন্টিয়ক ও ত্রিপোলির ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি তাদের অধিকারে রাখে। সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডারিক অস্ত্রবলে না হলেও তাঁর কূটনীতির সাহায্যে স্বল্পকালের জন্য (১২২৭-৪৪) জেরুজালেম নগরী পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। কিন্তু জেরুজালেম রাজ্য ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। ত্রয়োদশ শতকে আগাগোড়াই ক্রুসেড যুদ্ধ হয়, কিন্তু এসব যুদ্ধ যেমন অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলা হয়েছে, 'ফিলিস্তিন ছাড়া সর্বত্র' সংঘটিত হয়। নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে তারা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তারা অনিশ্চিতভাবে কনস্টান্টিনোপল (১২০২-৪) থেকে মিসর (১২১৮-২১ ও ১২৪৯-৫০) এবং সেখান থেকে এমনকি তিউনিসে (১২৭০) ঘুরে বেড়ায়। একটি ক্রুসেড সফল হয়েছিলো এবং তাও কেবলমাত্র খৃস্টান শহর কনস্টান্টিনোপল দখলে এবং কিছুকালের জন্য (১২০৪-৬১) বাইয়েন্টাইন সাম্রাজ্যকে ফরাসী ও ভেনিসীয়দের মধ্যে বিভক্ত করার ব্যাপারে সফলতা অর্জন করে। কনস্টান্টিনোপল ক্রুসেডকে প্ররোচিত করলেও তাদের দ্বারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; এবং এটি ১২৬১ থেকে ১৪৫৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দুই শতাব্দীর জন্য পুনরায় ক্ষীণভাবে পুনরুজ্জীবিত হলেও এরপর ফরাসীদের মোরিয়ায় এবং ভেনিসীয়দের ক্রীট ও দ্বীপাঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপে পরিত্যাগ করে। প্রথম ক্রুসেড ছিলো ফরাসী সামন্ততন্ত্র ও ইটালীয় শহরগুলির নৌশক্তির একটি যৌথ জোট। ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে ফরাসী সামন্ততন্ত্র গ্রীসে গতি পরিবর্তন করে এবং ভেনেসীয় এবং জেনোয়ীরা ক্রিমিয়া এবং আযোভ সাগরে তাদের প্রাচ্য বাণিজ্যের নতুন আমদানী-রপ্তানী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। মনে হয়, অপ্রয়োজনীয় বলে ফিলিস্তিন পরিত্যক্ত হয় এবং ক্ষমতার ভার-কেন্দ্র প্রাচ্য সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষে স্থানান্তরিত হয়।
কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগের আগে একটি নতুন আশার আলো দেখা দেয় এবং এশীয় ঘটনাবলীর একটি নতুন অবস্থান্তর পাশ্চাত্যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা হিসাবে অভিনন্দিত হয়। চেঙ্গিস খান কর্তৃক খৃস্টানও নয় মুসলমানও নয় এরূপ এক বিশাল মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পূর্বে পিকিং থেকে পশ্চিমে নিপার ও ইউফ্রেটিশ নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। যে চারটি খানশাসিত এলাকায় এটি বিভক্ত হয় তার প্রত্যেকটি এক একটি সাম্রাজ্যের মর্যাদাসম্পন্ন ছিলো। এর মধ্যে বিশেষভাবে তাব্রিযে রাজধানী সমন্বিত পারসিক খানশাসিত এলাকা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের এতোটা নিকটবর্তী ছিলো যে, এই অঞ্চলের ঘটনাবলীর সঙ্গে তাকে সংশ্লিষ্ট করা যেতো। মঙ্গোলরা ছিলো সহনশীল। তাদের শাসনাধীনে নেস্টোরিয়ান খৃস্টানরা সমৃদ্ধি লাভ করে। তাহলে কেন তাদের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা যাবে না, এবং কেন আগের চেয়ে বৃহত্তর পরিসরে ক্রুসেডের মূল উদ্দেশ্য আরোপিত করা যাবে না? দূতদের গমনাগমন চলতে থাকে। চতুর্থ ইনোসেন্ট ১২৪৫ খৃস্টাব্দে জন ডি পিয়ান ক্যাপাইনকে এবং সেন্ট লুই ১২৫০ খৃস্টাব্দে উইলিয়াম অব রুব্রুকুইসকে দুটি বিরাট মিশনে প্রেরণ করেন। এসব মিশন অত্যন্ত কর্মতৎপর ছিলো এবং সুদূর চীনে পর্যন্ত গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর সবই ছিলো স্বপ্ন। ফিলিস্তিনের জন্য কোন সাহায্য আসেনি। কিছুকালের জন্য এন্টিয়ক, ত্রিপোলি এবং ল্যাটিনদের অধিকারভুক্ত পুরাতন জেরুজালেম রাজ্যের উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকা বিপদমুক্ত ছিলো। সালাহউদ্দীনের উত্তরাধিকারীরা পারস্পরিক বিরোধে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং এই বিরোধের ফলে ল্যাটিনরা বেঁচে যায়। কিন্তু মিসরে মামলুক সুলতানদের আবির্ভাবের ফলে একটি নতুন ও সামরিক মুসলিম শক্তির উদ্ভব হয়। ১২৫০ খৃস্টাব্দে তারা কায়রোর মদ অধিকার করে। পারস্যের মঙ্গোল খান শাসিত এলাকার অধিপতি একবার সিরিয়ায় পদার্পণের চেষ্টা করলে এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুলতান বাইবার্স সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তিনি দামেস্কে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন (১২৬০) এবং এন্টিয়ক রাজ্যটিকে পর্যুদস্ত করে তাঁর অধিকারভুক্ত করেন (১২৬৮)। তার উত্তরাধিকারী কালাউন ত্রিপোলি অধিকার করেন (১২৮৯) এবং তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী খলীল সিরীয় উপকূলে ল্যাটিনদের সর্বশেষ ঘাঁটি একার দখল করেন (১২৯১)। ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ল্যাটিন খৃস্টান শক্তি সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত হয়।
এই শক্তি বিভিন্ন দ্বীপে টিকে থাকে। তৃতীয় ক্রুসেডের সময় প্রথম রিচার্ড কর্তৃক গ্রীকদের কাছ থেকে অধিকৃত সাইপ্রাস-এর লুসিগনান রাজাদের অধীনে ফিলিস্তিনের ল্যাটিন সামন্তরাজাদের আশ্রয়স্থল হয়। এখানেই জেরুজালেমের অ্যাসিযদের সামন্ত আইন-বিজ্ঞান অব্যাহত থাকে এবং বিধিবদ্ধ হয়। সাইপ্রাস রাজ্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ১৪৮৮ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত টিকে থাকে। ঐ সময় এটি ভেনিসের অধিকারে যায়। ¹ একইভাবে একারের চূড়ান্ত পতনের পর নাইটস হসপিট্যালারগণ² ১৩০৯ খৃস্টাব্দে রোস্ দ্বীপ অধিকার করেন। তারা ১৫২৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন এবং তারপর পশ্চিম দিকে মাল্টায় যান। এই দুটি দ্বীপেই মধ্যযুগে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ল্যাটিনদের কতিপয় অপরূপ কীর্তিচিহ্ন এখনো টিকে আছে।
সাইপ্রাস ও রোল্স দ্বীপে যখন এভাবে সামন্ত শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন ভেনিসীয়রা চতুর্থ ক্রুসেডের সুযোগে অর্জিত সম্পদ হিসাবে ক্রিট এবং উত্তরে আরো কতিপয় দ্বীপ দখল করে। জেনোয়ীরা ১২৬১ খৃস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলের সিংহাসন পুনরুদ্ধারে প্যালিওলগিকে সাহায্য করে এবং তার প্রতিদান হিসাবে তাঁরা কেবল পেরার উপকণ্ঠই লাভ করেনি লেম্বস এবং চিওস্ দ্বীপও তাদের অধিকারভুক্ত করে। এমনিভাবে মধ্যযুগের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত ল্যাটিন খৃস্টান শক্তি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তাদের একটি অধিকার অব্যাহত রাখে। এই অধিকার সংশ্লিষ্ট দ্বীপগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবং মুসলিম শক্তির কাছ থেকে জয় না করে বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা তখনো নিজেদের বিচ্ছিন্ন ঘাঁটি থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। উসমানীয় তুর্কীদের বিজয়ের ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর একটি মেয়ার ক্লসেম³ হওয়ার পরেই তারা তাদের এই সংগ্রাম ত্যাগ করে। বস্তুত ১৬৬৮ খৃস্টাব্দের পরেই ক্যাণ্ডিয়ার পতন হয় এবং ভেনিস লেভান্টে তার সর্বশেষ বৃহৎ দুর্গ হারায়।
২
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পাশ্চাত্য খৃস্টান শক্তির সুদীর্ঘ কালের দুঃসাহসিক অভিযান এবং প্রাচ্যের মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সুদীর্ঘ যোগাযোগের ফলাফল কি? প্রশ্নটি বাস্তবিকই দ্বিবিধ। প্রশ্নটি প্রথমত ক্রুসেডকে সহজভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে যোগাযোগের একটি ধরন হিসাবে বিবেচনা করা হলে তার ফলাফল সম্পর্কে পাশ্চাত্যের উপর প্রাচ্য থেকে লব্ধ বাস্তব বিষয় ও আবেগের প্রভাব সংক্রান্ত প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত ক্রুসেডকে পাশ্চাত্য সমাজের আওতায় তৎপরতামূলক একটি সাধারণ আন্দোলন হিসাবে বিবেচনা করা হলে তার ফলাফল সম্পর্কে যে আন্দোলন একটি সমাজ থেকে উদ্ভূত হয় এবং তার উপর গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সেই সমাজের উপর তার প্রভাব সংক্রান্ত প্রশ্ন। ইতিহাসবিদরা এই দুটি প্রশ্নকে প্রায়ই জড়িয়ে ফেলেছেন, এবং এই জড়ানোর ফলে যে অতিরঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে, তা পার্থক্য সৃষ্টির মাধ্যমে এড়ানো যেতো।
এ ধরনের অতিরঞ্জনের একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে আমরা ক্রুসেড সংক্রান্ত হেনি-অ্যাম রাইনের আলগেমিন কুলটুর গ্যাচিটে থেকে অংশ বিশেষ তুলে ধরতে পারি।¹ এখানে আমরা ক্রুসেডের প্রেক্ষিতে মধ্যযুগের সামগ্রিক ঘটনা দেখতে পাই। ধর্মীয় ক্ষেত্রে ক্রুসেড পোপতন্ত্রের মর্যাদা হ্রাস করেছে, সন্ন্যাসজীবনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে এবং ধর্মদ্রোহিতার বিকাশকে উৎসাহিত করেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে অধিকতর সমতা সৃষ্টি হয়েছে, একটি স্বাধীন কৃষক সমাজ ও কারুশিল্পী সংগঠনের বিকাশ ঘটেছে এবং শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এবং লিখিত আইন ও বিচার বিভাগীয় প্রশাসন প্রবর্তনের ফলে এস্টেটস² (সামাজিক শ্রেণী) ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। বিশাল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ক্রুসেডের আরবদের সংস্পর্শ লাভের পর দর্শন শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটে। এমনকি আধ্যাত্মিকতা একটি বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য লাভ করে। প্রাচীন ভাষাসমূহের গবেষণা ও পর্যালোচনার বিস্তৃতি ও বিকাশ ঘটে। ইতিহাস ও ভূগোল বিজ্ঞান নতুন প্রাণশক্তি পায়। মাতৃভাষায় কাব্যচর্চার উদ্ভব হয়। গথিক স্থাপত্য রোমানেস্কের উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে এবং ভাস্কর্য ও চিত্রাঙ্কনে সূক্ষ্ম রুচিবোধের সৃষ্টি হয়।
এমনকি হ্যান্স ট্সের কুলটুর গ্যাচিটে ডার ক্রিউযগত³ গ্রন্থেও একই বিভ্রান্তি, একই অতিরঞ্জন এবং পোস্ট হক, আর্গো প্রোপটার হক-এর⁴ ভ্রমাত্মক ধারণা দেখা যায়। এটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ রচনা হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে। প্রথমত, স্কে এজন্যেই লিখতে হয়েছে, যেন ১১০০ থেকে ১৩০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দুই শতকে ইউরোপে যা ঘটেছে ক্রুসেডই ছিলো তার একটি কারণ, যেন ঐ দুই শত বছরের সবগুলি কজাই-কজেন্টেস-রেনেসাঁ যুগের, আবিষ্কার যুগের ও সংস্কার যুগের নতুন ইউরোপ সৃষ্টির কারণসমূহ-ঐ একটি মাত্র কারণের মধ্যে সম্পৃক্ত ও নিহিত। প্রকৃতপক্ষে ক্রুসেড ছিলো বহু কারণের মধ্যে একটি এবং আমরা যখন এসব কারণের একটি একক ও সার্বজনীন বিশ্লেষণ প্রদান করি তখনি পোস্ট হক, আর্গো প্রোপটার হক-এর ভ্রমাত্মক যুক্তির সঙ্গে 'একক কারণের' ভ্রমাত্মক ধারণা যুক্ত হয়। দ্বিতীয়ত, প্রুস্ স্বীকার করেন যে, স্পেন এবং সিসিলি আরব্য প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ বাহন ছিলো, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি তার এই স্বীকৃতি বেমালুম ভুলে গিয়ে বলেন যে, এই প্রভাবের ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনই সবচাইতে বড়ো এবং প্রায় একমাত্র কারণ। তিনি লিখেছেন, সাংস্কৃতিক বিকাশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা ফ্রান্দের (ফিলিস্তিনের) মধ্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের অবদানের প্রথম স্থায়ী সম্পর্ক দেখতে পাই, এবং এই মিশ্রিত জাতিই ...... যাকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমঝোতা সৃষ্টির অগ্রনায়ক হিসাবে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। ¹ এখানেও আমরা 'একক কারণের' ভ্রমাত্মক ধারণা লক্ষ্য না করে পারি না। এবং এই ভ্রমাত্মক ধারণা আরো বড়ো হয়ে দেখা দেয় যখন আমরা দেখতে পাই যে, অপর কারণ (স্পেন ও সিসিলিতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের উপাদানগুলির সংমিশ্রণ) এর চাইতে অনেক প্রবল ও গভীর। শেষত, ট্রসের লেখা পড়তে গিয়ে এরূপ ধারণা পরিহার করা অসম্ভব যে, তিনি প্রায় ১১০০ খৃস্টাব্দের দিকে এক পক্ষে ল্যাটিন পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখিয়েছেন এবং অন্য পক্ষে আরব্য প্রাচ্যের সংস্কৃতিকে অতিরঞ্জিত করেছেন। এরূপ করার উদ্দেশ্য ছিলো ক্রুসেডের প্রভাব প্রদর্শনের জন্য একটি বৃহত্তর পরিসর সৃষ্টি করা এবং আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যতোটা গ্রহণ করতে পারি তার চাইতে বেশি জিনিসের জন্য একটি খালি মার্কেট দেখানো। যে পাশ্চাত্য ইউরোপ তখন গ্রেগরিয়ান যুগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিলো-যে যুগ আবেলার্ডের² পর্যায়ে চিন্তাধারার বিকাশ, ফরাসী কম্যুনের উদ্ভব, ন্যান আন্দোলন ও নর্ম্যান স্থাপত্যের প্রাণশক্তি এবং একাদশ শতকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত শিল্প ও বাণিজ্য বিপ্লব অবলোকন করে - সে অবস্থায় তা টেবুলারাসাও³ ছিলো না। তেমনি ১১০০ খৃস্টাব্দের দিকে আরব সংস্কৃতিও সমৃদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিলো না। বরং আমরা দেখতে পাবো যে, ক্রুসেডের যখন সূচনা হয় তখন এর সূর্য ছিলো অস্তগামী। আমাদের সব সময় স্মরণ রাখতে হবে যে, কুলটুরগ্যাচিট্টেতে যাই থাকুক না কেন এটি ছিলো একটি নতুন ও বর্ধিষ্ণু পাশ্চাত্য যা ম্রিয়মাণ প্রাচ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ক্রুসেড একটি যাদুকরি শব্দ এবং যাদুকরি শব্দের এমন চুম্বক শক্তি থাকতে পারে যা বহু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে তার প্রভাবের আওতায় আকৃষ্ট করে। তেমনি ক্রুসেডের সময় পশ্চিম ইউরোপে যা ঘটেছে তার প্রত্যেকটি ক্রুসেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো না এবং তার অনেক কিছু ক্রুসেডের দরুন ঘটেনি। এমনকি কোন ক্রুসেড না হলেও একাদশ শতকের শেষার্ধে যে পাশ্চাত্য খৃস্টান জগতে শহর জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত বিকাশ হচ্ছিলো সেই খৃস্টান শক্তি সম্ভবত তার ব্যবসা-বাণিজ্যকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করতো। এটি হয়তো কৃষ্ণ সাগরের উত্তর উপকূলে প্রাচ্যের স্থল বাণিজ্য পথের শেষ সীমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতো। এখানে এটি কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরে ও আরব সাগরের পশ্চিমে বোখারা এবং সমরকন্দগামী বাণিজ্য পথের সংস্পর্শে আসতে পারতো। কিংবা পুনরায় সিরীয় বন্দরগুলিতে আসতে পারতো, সেখান থেকে পারস্য ও পারস্য উপসাগরে পৌঁছে যে সমুদ্রপথ ভারত হয়ে চীন অভিমুখে গিয়েছে তার সংস্পর্শে আসতে পারতো। ক্রুসেড যা করেছে তা ছিলো একটি সামন্ততান্ত্রিক সিরীয় রাষ্ট্র-যা আংশিকভাবে সামন্ত রাজারা এবং আংশিকভাবে সামন্ত চরিত্রের টেম্পলার¹ ও হসপিটালারদের কোম্পানীগুলি অধিকার করে—সেখানে কিছু কালের জন্য বাণিজ্যিক প্রেরণা সংশ্লিষ্ট হয় এবং এতদুদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের 'কোয়ার্টারের' সৃষ্টি হয়। উপকূলবর্তী এসব কোয়ার্টার ভেনেসীয়, জেনোয়ী ও পিসানদের অধিকারে ছিলো। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, এই বাণিজ্যিক প্রেরণা একান্তভাবে সিরীয় কোয়ার্টারগুলির সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো না, কনস্টান্টিনোপল এবং কৃষ্ণ সাগরের সঙ্গেও এর যোগাযোগ ছিলো। চতুর্থ ক্রুসেডের পর এবং ত্রয়োদশ শতকে এসব যোগাযোগ আরো গভীর এবং বহুমুখী হয়। কিন্তু যে কোনভাবেই হোক না কেন প্রথম ও তৃতীয় ক্রুসেডের মধ্যবর্তী দ্বাদশ শতকে সিরিয়া ছিলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে খৃষ্ট ধর্ম ও ইসলামের মধ্যেকার সম্পর্কের বিশেষ কেন্দ্রবিন্দু। এখানে ইসলাম আংশিকভাবে সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের উপর তার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির এবং পাশ্চাত্যের উপর সেই প্রতিক্রিয়া প্রতিফলনের মাধ্যমে, এবং আংশিকভাবে বাণিজ্য পথে প্রবেশের একটি পদ্ধতির মাধ্যমে পাশ্চাত্য খৃস্টান শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই ক্রিয়াটিই আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে।
কিন্তু আমাদের একথাও স্মরণ রাখতে এবং পুনরাবৃত্তি করতে হবে যে, ইসলাম স্পেন এবং সিসিলিতেও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে থেকেও পাশ্চাত্যকে প্রভাবিত করতে পারে। দুটি ধারা একযোগে ক্রিয়াশীল হয়। আমরা প্রত্যেকটি ধারাকে সঠিক ও পৃথকভাবে পরিমাপ করতে না পারলেও এরূপ ধারণা করতে পারি যে, ইসলাম তার মসুল, বাগদাদ ও কায়রোর ভিত্তি ভূমির চাইতে স্পেন ও সিসিলির ভিত্তিভূমি থেকে পাশ্চাত্য খৃস্টান জগতের উপর অনেক গভীরতর প্রভাব সৃষ্টি করে। এই ধারণার পিছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, আমরা সিসিলিতে ২য় রজার ও ২য় ফ্রেডারিকের আমলে একটি সংমিশ্রিত সংস্কৃতির যে গভীর প্রভাব দেখতে পাই সিরিয়ায় তা কখনো ঘটেনি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খৃস্টানরা যেভাবে তাদের গভীর সংশ্লিষ্টতা থেকে কর্ডোভা ও মুসলিম স্পেনের সাংস্কৃতিক সম্পদ আহরণে সক্ষম হয় সিরিয়ার ল্যাটিনরা সেভাবে তা আহরণ করতে পারেনি।
একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে, জেরুজালেমের ল্যাটিন সাম্রাজ্যে সংস্কৃতির কোন সংমিশ্রণ ঘটেনি কিংবা কোন প্রকারের সংস্কৃতিরই তেমন বিকাশ হয়নি। সিসিলিতে বিভিন্ন জাতির-গ্রীক, নর্ম্যান, লম্বার্ড এবং আরব বারবার-সংমিশ্রণে একটি উল্লেখযোগ্য মিশ্র সভ্যতার উদ্ভব হয়। নর্ম্যান রাজাদের দরবারে আমরা কেবল আরব ভূগোলবিদ এবং কবিদেরই উৎসাহিত হতে দেখি না, একজন রাজসচিবকে (চ্যান্সেলর) ১ম উইলিয়ামের জন্য প্লেটোর ফাইডো এবং মেনো, এরিস্টটলের মিটিওরলজিকার অংশবিশেষ এবং ডায়োজেনিস লায়েরটিয়াসের রচনা অনুবাদ করতেও দেখি। দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের দরবার আরো বিখ্যাত ছিলো। দাঁতের ডি ভালগারী এলোকিওর বর্ণনা অনুযায়ী এখানে ইটালীয় কাব্য চর্চার সূচনা হয়। এখানে রাজা নিজের ব্যবহারের জন্য এরিস্টটলীয় দর্শনের বিশ্লেষণমূলক জটিল প্রশ্নাবলী (কোয়েশনস সিসিলিয়ানে) সাজিয়ে নিতে পারতেন বা সাজিয়ে নিয়েছেন। আরবী পাণ্ডুলিপি আকারে এর প্রমাণ এখনো বলিয়ান লাইব্রেরিতে রয়েছে। জেরুজালেমের ল্যাটিন সাম্রাজ্য ছিলো একটি রুক্ষ সাময়িক বসতি। এখানে সভ্যতার কোন অবদান সৃষ্টির না ছিলো প্রেরণা, না ছিলো সময়, এখানে একটি বিদেশী বাহিনী দুর্গ ও ছাউনিতে অবস্থান করতো। এরা সিরীয় গ্রামাঞ্চলের ভূমি কর্ষণকারী কৃষকদের কিংবা যেসব কারুশিল্পী বর্তমানের ন্যায় তখনো শহরাঞ্চলে গালিচা তৈরী, মৃৎপাত্র তৈরী এবং স্বর্ণকারের কাজ করতো তাদের কারো সংস্পর্শে আসেনি। ল্যাটিন ভাষীরা একটি সঙ্কীর্ণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে হালকাভাবে ছড়িয়ে ছিলো। বিরাট মুসলিম শক্তির পটভূমিতে এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় তাদের ব্যস্ত থাকতে হতো। এবং যদিও তারা অনুভব করতো যে, তারা তাদের ধর্মবিশ্বাসের পুণ্যভূমিতে এবং গোলাকার পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে (আমবিলিকাসটিরে) বাস করছে, তথাপি একথা সত্য যে, তারা মধ্যযুগীয় সভ্যতার কেন্দ্রস্থল রোম ও প্যারিস থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো।
তাদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা থাকলেও (যদিও তা করার জন্য তাদের সময় ছিলো অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং অবস্থান ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক) তারা আকর্ষণ করতে পারে এমন কোন মুসলিম সভ্যতা আশেপাশে ছিলো না। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আরব্য স্পেনের সংস্কৃতি তাদের চোখের সামনে ছিলো। এখানে আইনশাস্ত্রবিদ, চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিক ইবনে রুদ দ্বাদশ শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত তার জ্ঞান বিতরণ অব্যাহত রাখেন। এখানে ইহুদীরা আরবী দর্শনের সংস্পর্শে আসে, এবং এর প্রভাবে মাইমোনেডিয¹ ওল্ড টেস্ট্যামেন্টের সঙ্গে এরিস্টটলের সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেন। এবং এখানে ১২০০ খৃস্টাব্দের দিকে পাশ্চাত্যের ল্যাটিন খৃস্টান সম্প্রদায় এরিস্টটল সম্পর্কে এর আগে বোইথিয়াসের অর্গ্যানন অনুবাদের একমাত্র সূত্র থেকে যতটুকু জানতেন তার চাইতে অনেক গভীর জ্ঞান লাভ করেন। টলেডো বিজয়ের পর স্পেনীয়রা এর যে মসজিদ গ্রন্থাগার লাভ করেন তা পণ্ডিতদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এবং স্পেনের আরব্য এরিস্টটল ত্রয়োদশ শতকের জ্ঞান চর্চার অন্যতম সূত্র ছিলো। ² এখানেই শেষ নয়। পিরেনিজের দক্ষিণে সীমান্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ কাব্যের অন্যতম বিষয়বস্তু হয়। ইংরেজ ও স্কটদের সীমান্ত যুদ্ধ যেভাবে আমাদের নিজস্ব সীমান্ত গাথা সাহিত্যের জন্ম দেয়, কিংবা গ্রীক ও তুর্কীদের মধ্যে টৌরাসের যুদ্ধ যেভাবে বাইযেন্টাইন চ্যান্সন্স ডি গেস্টের সৃষ্টি করে, তেমনি স্পেনে খৃস্টান ও পেনিস³ এর মধ্যকার যুদ্ধ-বিগ্রহ সং অব রোল্যান্ড ও সিড ক্যাম্পিডোর-এর রূপকথার বিষয়বস্তু হয়। প্রাচ্যের দৃশ্য ছিলো অন্য রকম। এখানে প্রথম ক্রুসেডের সময় আরব দর্শনের ক্ষয়িষ্ণুতা শুরু হয়; এবং দ্বাদশ শতকের সর্বপ্রকার সীমান্ত যুদ্ধে কোন দেশীয় কাব্য গাথার উদ্ভব হয়নি। ১০৩৭ খৃস্টাব্দে হামাদানে মহান ইবনে সিনা ইন্তিকাল করেন। সূফী দার্শনিক আল গাজ্জালী ১১১১ খৃস্টাব্দে খোরাসানে ইন্তিকাল করেন। ১১৫০ খৃস্টাব্দে বাগদাদের জনৈক খলীফা দর্শনশাস্ত্রের একটি গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেন, যার মধ্যে ইবনে সিনার নিজস্ব রচনাবলীও ছিলো। এ ধরনের অবস্থার যুগে প্রাচ্যের ল্যাটিন ভাষীদের পক্ষে মুসলমানদের সংস্পর্শে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধক হওয়া স্বাভাবিক ছিলো না। তারা মৌলিক কিছু সৃষ্টির জন্য তাদের পারিপার্শ্বিক নতুনত্ব থেকেও প্রেরণা লাভ করেনি। 'পবিত্র ভূমিতে' কোন নতুন কাব্য বা শিল্পকলারও উদ্ভব হয়নি। যে চারণ কবিরা ক্রুসেডের প্রশস্তি গান গায়, তারাও ছিলো পাশ্চাত্যের চারণ কবি। চারট্রেসের ফালচার কিংবা টায়ারের উইলিয়ামের মাধ্যমে যদি ইতিহাস বিজ্ঞানের উন্নতি হয়ে থাকে; অথবা আইবেলিনের জনৈক জন কিংবা নোভারার জনৈক ফিলিপ যদি আইনগ্রন্থ সংকলন করে থাকেন তাহলে একমাত্র সেগুলিই আমাদের অভিনন্দন লাভ করতে পারে।
অতএব সংস্কৃতি জগতে সাম্রাজ্যের ল্যাটিনভাষীরা প্রাচ্যের মুসলমানদের কাছ থেকে খুব সামান্যই শিখতে পেরেছে এবং পাশ্চাত্যকে প্রভাবিত করার মত তাদের নিজস্ব অবদানও ছিলো অতি সামান্য। বস্তুত প্রায় বিতর্কমূলকভাবে এটুকু বলা যেতে পারে যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশে ক্রুসেডের প্রধান অবদান ল্যাটিন খৃস্টান শক্তির মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে যতখানি এসেছে, তার অনেক বেশি এসেছে বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্য ও গ্রীক খৃস্টান শক্তির সংগে এর সম্পর্ক থেকে। প্রথম ক্রুসেডের আগে পাশ্চাত্যের খৃস্টধর্ম ও সাম্রাজ্য বিস্মৃতির এক বিরাট ব্যবধানে প্রাচ্যের খৃস্টধর্ম ও সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। প্রথম অটোর পক্ষে বিখ্যাত দৌত্য কার্যে ক্রোমোনার লুইটপ্রাণ্ড ৯৬৮ খৃস্টাব্দে এবং নবম লিওর দূতরা ১০৫৪ খৃস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে গেলেও প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত অত্যন্ত ক্ষীণ ও কদাচিৎ ছিলো। ১০৯৬ খৃস্টাব্দের পর কমনেনি¹ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের সঙ্গে অব্যাহত সম্পর্ক বজায় রাখে। ১২০৪ খৃস্টাব্দের পর ল্যাটিনরা প্রাচ্য সাম্রাজ্যে বসবাস শুরু করে। ত্রয়োদশ শতকে করিন্থের ফ্লেমিশ আর্কবিশপ উইলিয়াম অব মোয়েরবেক এবং তার সহচর হেনরি অব ব্র্যাবান্ট সেন্ট টমাসের সহযোগিতায় এরিস্টটলের এথিক্স ও পলিটিক্স অনুবাদ করেন এবং স্পেন ছাড়াও পাশ্চাত্যের জন্য গ্রীক দর্শনের আরেকটি দ্বার উন্মুক্ত করেন। চতুর্দশ শতকের সমাপ্তিতে এবং পঞ্চদশ শতকে বাইযেন্টাইন পণ্ডিতরা গ্রীক উত্তরাধিকারিত্বের পুরো সম্পদ ইটালীতে নিয়ে আসেন; এবং ইটালীয় রেনেসাঁর প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান দেন। কনস্টান্টিনোপল ক্রুসেডের প্রধান প্রবাহ পথে অবস্থিত ছিলো না, তবুও ক্রুসেড কনস্টান্টিনোপল থেকেই সম্পদশালী বৃহৎ বাণিজ্যপোত পাশ্চাত্যে নিয়ে আসে।
এতদসত্ত্বেও এমন কতগুলি পন্থা ছিলো যার মাধ্যমে ক্রুসেড সিরিয়ার মধ্য দিয়ে, এবং এর দ্বারা সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত ল্যাটিন রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের বিকাশকে প্রভাবিত করে। প্রথমে ভাষার প্রমাণের কথা ধরা যাক যে সব পাশ্চাত্য শব্দ আরবীতে এবং যেসব আরবী শব্দ পাশ্চাত্য ভাষাসমূহে প্রবেশ করেছে সেই প্রসঙ্গে আরবীতে পাশ্চাত্য শব্দের সংখ্যা খুব বেশি নয়। প্রুট্স দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ইনবিরুর (ইস্পারেটর), কাস্তাল, (ক্যাস্টেলাম), বুরুজ (বুজুস) এবং গির্শ্ (গ্রসাস)। এর তুলনায় পাশ্চাত্য ভাষাগুলিতে আরবী শব্দের সংখ্যা অনেক বেশি। কেবল মাত্র আমাদের নিজস্ব ভাষাতেই ক্যারাভান, ডাগোমান, জার, সিরাপ শব্দগুলির কথা সহজে উল্লেখ করা যায়। ইউরোপের অন্যত্র রোমান্স ভাষার দিকে লক্ষ্য করলে- যেখানে আরবী শব্দগুলি সরাসরি প্রবেশ করেছে, আর আমাদের ভাষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐসব ভাষার মাধ্যমে এসেছে- আমরা দেখতে পাবো যে, আরবী থেকে ধার করা পাশ্চাত্য শব্দগুলির তালিকা অতি সহজেই বৃদ্ধি করা যায় (ডাউয়েন, গ্যাবেল্লি, ফেলুক্কা, চেবেক প্রভৃতি)। কিন্তু এসব ধার করার তাৎপর্য নিরূপণে স্পষ্টত ভাষাতাত্ত্বিক অসুবিধা রয়েছে। ফিলিস্তিনই একমাত্র স্থান নয়, কিংবা ক্রুসেডই একমাত্র যুগ নয় যার মধ্য দিয়ে এগুলির উদ্ভব হয়েছে। ধার করার অন্যান্য সম্ভাব্য স্থান স্পেন ও সিসিলি এবং পাশ্চাত্য ও আরবী ভাষাভাষী বিশ্বের সঙ্গে বহু শতাব্দীব্যাপী যে যোগাযোগ ছিলো-সুয়েজের পূর্বে ও পশ্চিমে উভয়দিকে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও জলদস্যুতা উভয় পন্থায়—সেটিই ছিলো অনন্য সময় ও পন্থা। এ কথা সত্য যে, পাশ্চাত্য এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাজারু ডিনার, ট্যারিফ এবং যেচিন, সমুদ্র বিহারের ক্ষেত্রে অ্যাডমিরাল ও আর্সেন্যাল ও গার্হস্থ্য জীবনের ক্ষেত্রে আলকোড, কারেফ, ম্যাটরেস ও সোফা কিংবা অ্যামিউলেট, এলিক্সির, জুলেপ ও ট্যালিসম্যান এবং সঙ্গীতের ক্ষেত্রে লিউট ও ন্যাকার¹ প্রভৃতি আরবী শব্দ ব্যবহার করে। কিন্তু এসব শব্দ প্রচলনের দায়িত্ব ক্রুসেডের ওপর আরোপ করার আগে আমাদের আরবী ও রোমান্স ভাষাতত্ত্ব আলোচনা করতে হবে এবং এগুলি প্রচলনের মূল স্থান ও সঠিক সময় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
ক্রুসেড ছিলো কতগুলি ধারাবাহিক যুদ্ধ, যেসব যুদ্ধ নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে, নতুন অস্ত্রের সাহায্যে এবং কোন কোন দিক দিয়ে নতুন কলাকৌশল অনুসরণ করে সংঘটিত হয়। কাজেই আমরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করতে পারি যে, এসব যুদ্ধ পাশ্চাত্যে যুদ্ধকৌশল বিকাশে কিছুটা প্রভাব সৃষ্টি করেছে। কোন কোন লেখকের মতে প্রথম এডওয়ার্ডের রাজত্বকালে ইংল্যাণ্ডে যে 'কনসেন্ট্রিক' (সাধারণ কেন্দ্র সমন্বিত) রীতির দুর্গ সাধারণ হয়ে পড়ে, তা জেরুজালেমের ল্যাটিন সাম্রাজ্যের সামরিক স্থাপত্যের ছাঁচে নির্মিত আবার ল্যাটিন সাম্রাজ্যের রীতিও আরবরা সিরিয়ায় প্রাপ্ত বাইযেন্টাইন দুর্গগুলির যে সংস্কার সাধন করে সেই সংস্কৃত ছাঁচে নির্মিত। এ ধরনের যুক্তি অনুসরণ করেই প্রুটস অভিমত প্রকাশ করেন যে, ফিলিস্তিনে সামরিক প্রতিরক্ষার সাধারণ পরিকল্পনায় নর্ম্যান ক্যাস্টেলেশন (ছোট ছোট গম্বুজ ও ফোকরওয়ালা প্রাচীর বিশিষ্ট) পদ্ধতি অনুসৃত হলেও (দৃষ্টান্তস্বরূপ যেমনটি আমরা ওয়েলস্ সীমান্তে এবং সাউথ ওয়েলসে দেখতে পাই) বৃহত্তর সুরক্ষিত এলাকার বিভিন্ন অংশের বিন্যাসে, পাশ্চাত্যের প্রাচীনতর সামরিক স্থাপত্যে অপরিজ্ঞাত অতিরিক্ত অংশসমূহ সংযোজনে এবং প্রাচ্যে উদ্ভাবিত অবরোধ কৌশলের প্রয়োজনে কতিপয় নতুন প্রতিরক্ষা পদ্ধতিতে আরব প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। '২ তাই তিনি দুই সারি প্রাচীর ব্যবহার ('কনসেনটিক' দুর্গের জন্য যা অপরিহার্য) এবং দুই সারির মধ্যস্থলে একটি অতিরিক্ত টাওয়ার নির্মাণকে আরব্য প্রভাব হিসাবে উল্লেখ করেন। ³ তিনি আরো অভিমত প্রকাশ করেন যে, প্রথম রিচার্ড কর্তৃক ভেক্সিনে নির্মিত বিখ্যাত শাটো গেইনার্ড দুর্গে সুস্পষ্টভাবে প্রাচ্যের প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। অপরপক্ষে এরূপ যুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে যে, 'কনসেনটিক' দুর্গ পাশ্চাত্যে উদ্ভাবিত হয়েছে এবং সেখান থেকে ক্রুসেডারগণ তা প্রাচ্যে নিয়ে গেছেন। এবং যে কোনভাবেই হোক একথা নিশ্চিত যে, দুঃসাহসিক অভিযানকারী নর্ম্যানদের প্রকৌশলগত দক্ষতা, যা তারা ফিলিস্তিনের আগে পশ্চিম ইউরোপে প্রদর্শন করে, তা নিজেদের স্বাধীন সম্পদ থেকে বিকাশে তারা সম্পূর্ণ সক্ষম ছিলো। আমরা আরো আস্থার সঙ্গে বলতে পারি যে, ক্রুসেড অবরোধ কলাকৌশল উন্নয়নে সহায়তা করে--সুড়ঙ্গ খনন ও মাইন স্থাপনের কৌশল প্রয়োগ, মেঙ্গনেল¹ ও ক্যাটারিং- র্যামের² গোলন্দাজ বাহিনী নিয়োগ এবং সম্ভবত বিভিন্নভাবে অগ্নি ও দাহ্য পদার্থ প্রয়োগ। যদিও এ ক্ষেত্রেও সম্ভবত আরবরা বরং নয় বরং বাইযেন্টাইনরাই ছিলো মূল প্রেরণা। ১১৫৯ খৃস্টাব্দে ক্রেমা অধিকারের সময় প্রথম ফ্রেডারিক পবিত্র ভূমি থেকে যে দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগ করেন তিনিও আরবদের শিষ্য না হয়ে গ্রীকদের শিষ্য ছিলেন। ক্রস- ধনুক বা আড়-ধনুক প্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। নাইটও তার ঘোড়ার জন্য বর্ম ব্যবহার ক্রুসেডের প্রভাব থেকে আসে। বর্মের ভেতরে তুলার কাঁথা বা কোমল গদি ব্যবহারও একই সূত্র থেকে আসে। আর ফিলিস্তিনে যুদ্ধের সময় ফ্রাঙ্কিশ নাইট প্রাচ্য সূর্যের তাপ থেকে নিজের মাথা ও ঘাড় রক্ষার জন্য আরব কুফিয়া ব্যবহার শিখেন। সাময়িক সংবাদ প্রেরণের জন্য সংবাদ বহনকারী কবুতর নিয়োগের কৌশলটি আরবদের কাছ থেকে নেওয়া। যদিও এ প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নর্ম্যান সিসিলির রেকর্ডপত্রে সাধারণভাবে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয়েছে যে, আলোকসজ্জার মাধ্যমে দেওয়ালে ও জানালায় রংবেরংয়ের জিনিস এবং গালিচা ঝুলিয়ে বিজয় উৎসব পালনের রীতিও মানুষের আবেগের ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বদেশজাত বলে মনে হবে সম্ভবত একই সূত্র থেকে ধার করা। জারিদ-এর মহড়ার সঙ্গে সাদৃশ্যমূলক টুর্নামেন্ট (কৃত্রিম যুদ্ধ মহড়া) অনুষ্ঠানের রীতি সম্ভবত ক্রুসেডের মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে কুলজীচিহ্ন ব্যবহারও সিরিয়ার স্যারাসেনদের³ সঙ্গে যোগাযোগের ফল। তারা নিশ্চিতভাবেই দ্বিমস্তক ঈগল, ফ্লিউর-ডি-লি এবং দুটি তালাচাবি প্রভৃতি কুলজী চিহ্ন ব্যবহার করতেন এবং বহু কুলজী চিহ্ন এবং কুলজী পরিচায়ক শব্দ (যেমন অ্যাযিউর এবং সম্ভবত গিউলস) একই সূত্র থেকে উদ্ভূত। এও প্রতীয়মাণ হচ্ছে যে, ক্রুসেডের ফলেই সমগ্র ইউরোপে কুলজীচিহ্নের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ম-বিধির উদ্ভব হয়েছে এবং 'সবগুলি ইউরোপীয় দেশে কুলজীচিহ্নের সম্পর্ক, পরিচয়জ্ঞাপক শব্দ ও নিয়মের ক্ষেত্রে একটি সামঞ্জস্য রয়েছে।'
ক্রুসেডের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য যুদ্ধের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং ইটালীয় বণিকরা ফ্রাঙ্কিস নাইটদের পিছনে পিছনে দ্রুত ধাবিত হয়। কেবলমাত্র সিরিয়ার পণ্যই এর উদ্দেশ্য ছিলো না, ভারত, চীন এবং মসল্লা দ্বীপপুঞ্জের পণ্যও এর লক্ষ্য ছিলো। একথা সত্য এবং আমরা ইতিপূর্বেও উল্লেখ করেছি যে, ক্রুসেড না হলেও এরূপ প্রাচ্য বাণিজ্যের উদ্ভব হতো এবং তা সফলতা লাভ করতো। একথাও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, ভেনিস প্রথম ক্রুসেড শুরু হওয়ার বহু বছর আগে বাইযেন্টিয়ামের মধ্যদিয়ে প্রাচ্যের বাজারে প্রবেশ করে। তাই মধ্যযুগে প্রাচ্যের যেসব পণ্য পশ্চিম ইউরোপে আসে তার সবগুলি ক্রুসেডের দরুন-অন্তত এককভাবে ক্রুসেডের দরুন আসেনি, কিংবা এসব পণ্য আমদানিকে কেন্দ্র করে যেসব প্রাচীন বাণিজ্যপথ ও বাজারের উদ্ভব হয়েছে তাও এককভাবে ক্রুসেডের অবদান নয়। অবশ্য একইভাবে আমরা সিরিয়ার ল্যাটিন বসতি থেকে যে বিরাট বাণিজ্যিক প্রেরণার সৃষ্টি হয় এবং সেখানে স্থানীয়ভাবে যেসব পণ্য উৎপাদিত হয় তা অস্বীকার করতে পারি না। এই বসতি, একদিকে দামেস্কের বাজারসমূহে এবং অন্যদিকে রাক্কা ও ইউফ্রেটিসের পথে বাগদাদের বাজারগুলিতে যাতায়াতের যে নতুন সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে তাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একইভাবে আমরা বলতে পারি যে, নতুন নতুন গাছপালা, লতাগুল্ম ও ফসল লেভ্যান্ট থেকে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এসেছে- -তিল ও ক্যারব, ভুট্টা ও ধান, লেবু ও তরমুজ এবং খোবানী ও পেঁয়াজ-রসুন, এমনিভাবে পাশ্চাত্যে বহু নতুন নতুন ব্যবহার্য ও ফ্যাশনদ্রব্য ছড়িয়ে পড়ে-সুতীবস্ত্র; মসুলের মসলিন¹; বাগদাদের ব্যালডাচিন, দামেস্কের বুটিদার রেশমীবস্ত্র ও ড্যামাস্সিন, 'সারসেনেট' বা স্যারাসেন পোশাক; বাইযেন্টিয়ামের রেশমী বস্ত্র, দো-সুতী কাপড় ও বুটিদার লিনেন কাপড়; প্রাচ্যে তৈরি এক ধরনের রেশমী সাটিন' 'অ্যাটলাস' (আরবী আতলাসা); দূরপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার কম্বল, গালিচা ও দেওয়াল-পর্দা (ট্যাপিস্টি) বার্নিশ; নতুন নতুন রং যেমন ক্যার্মাইন (উজ্জ্বল লাল রং ও লাইল্যাক (উভয় শব্দই আরবী); রং, ওষুধ, মসল্লা ও সুগন্ধিদ্রব্য যেমন ফিটকিরি, ঘৃতকুমারী, লবঙ্গ, ধুপ, নীল ও চন্দনকাঠ; পোশাক ও ফ্যাশনের জিনিস, যেমন ক্যামলেট (রেশম ও পশম মিশ্রিত কাপড়) জুপ (আরবী জুব্বাহ থেকে) কিংবা পাউডার ও কাচের আয়না; মৃৎপাত্র, কাচ, স্বর্ণ, রৌপ্য ও কলাই মিনার উপর শিল্পকর্ম। এমনকি তসবিহও (জপমালা) প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে আসে। এটি ভারতের বৌদ্ধদের কাছ থেকে সিরিয়া হয়ে পশ্চিম ইউরোপে আসে।
প্রাচ্য বাণিজ্যে ক্রুসেডের অবদান সরাসরি না হলেও ক্রুসেড-এর পিছনে প্রেরণা সৃষ্টি করে। দ্বাদশ শতকে এই বাণিজ্য প্রধানত সিরীয়ায় কেন্দ্রীভূত ছিলো। বাণিজ্যপথ উন্নয়নে এবং ক্রেডিট ও ফাইন্যান্সের নতুন নতুন পন্থা উদ্ভাবনে এর অবদান ছিলো অসামান্য। মধ্যযুগীয় ইউরোপে যে বিশাল বাণিজ্যপথ ভেনিস থেকে ব্রেনার গিরিপথ হয়ে কলোন এবং সেখান থেকে দুভাগ হয়ে একদিকে বাল্টিক সাগরের তীরে লুবেকে এবং অন্যদিকে উত্তর সাগরের তীরে ব্রুযে গিয়ে পৌঁছে তা এই প্রাচ্য বাণিজ্যেরই পণ্য-সামগ্রী বহন করে। এই পথেই লম্বার্ডিতে, রাইন নদীর তীরে, ফ্লাণ্ডার্সে এবং উত্তর ফ্রান্সে মধ্যযুগীয় শহর ও বাণিজ্য সংঘসমূহ ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠে, একই সময় ভূমধ্য সাগরে একটি নিয়মিত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে যাতে পণ্য ও তীর্থযাত্রী উভয়ই বহন করা হতো। ভেনিস ও মার্সেলজ-এর সদর দফতর হয়ে উঠে এবং এই জাহাজ চলাচলে বেসামরিক জাহাজ মালিক ও জাহাজ কোম্পানীগুলির সঙ্গে সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলি যোগদান করে। সুদূর প্রাচ্য বাণিজ্যের জন্য এবং তীর্থযাত্রী ও নাইটদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য যে আর্থিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় তার ফলে এক ধরনের ক্রেডিট-নোট পদ্ধতির উদ্ভব হয়। এর ফলে লেভ্যান্টে শাখা ও ব্যবসা কেন্দ্র সমন্বিত ব্যাঙ্কার্স প্রতিষ্ঠানের (জেনোয়ী, পিসান বা সিয়েনী) সৃষ্টি হয়। সামরিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে টেম্পলাররা ডিপোজিট ও লেন্ডিংয়ের ব্যাঙ্কের ভূমিকা গ্রহণ করে। ক্রুসেড ও ক্রুসেডের প্রেরণায় উদ্ভূত প্রাচ্য বাণিজ্যের মুদ্রা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত দিক হচ্ছে ভেনেসীয়গণ কর্তৃক পবিত্র ভূমিতে বাইযেন্টিনি স্যারাসেনাটি মুদ্রা তৈরি। মুসলিম হিন্টারল্যান্ডের (বাণিজ্যের পশ্চাদভূমি) সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এটি ছিলো একটি স্বর্ণমুদ্রা (সম্ভবত ল্যাটিনদের দ্বারা ছাপ মেরে তৈরি প্রাচীনতম স্বর্ণমুদ্রা)। ১২৪৯ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত (যখন ৪র্থ ইনোসেন্ট প্রতিবাদ জানায়) এসব স্বর্ণ মুদ্রায় আরবী উৎকীর্ণলিপি ছিলো, যাতে কুরআন শরীফের একটি সংক্ষিপ্ত উক্তি, মহানবীর উল্লেখ এবং হিজরী সাল অনুযায়ী তারিখ ছিলো। দক্ষিণ ফ্রান্সে ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগেও এধরনের মুদ্রার সন্ধান পাওয়া যায়।
ক্রুসেডের সময়কার দুই শতকে পাশ্চাত্যের উপর প্রাচ্যের প্রভাবের কতিপয় নিদর্শন আমরা বিভিন্ন ধরনের অট্টালিকা নির্মাণে, শিল্প ও কারুশিল্পে এবং দৈনন্দিন ও গার্হস্থ্য জীবনের সাধারণ পরিসরে দেখতে পাই। এরূপ মনে করার কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না যে, ক্রুসেড পাশ্চাত্যের সাধারণ স্থাপত্য বিকাশে প্রভাব সৃষ্টি করেছে। কনসেন্টিক দুর্গের বিশেষ উন্নয়নের ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা যায়। স্যারাসেনিক স্থাপত্যের কোন সাধারণ রীতি পরিদৃষ্ট হয় না। বিজয়ী আরবরা যে ধরনের দেশীয় ভবন নির্মাণ করেছেন তদনুযায়ী বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন স্থাপত্য রীতি দেখা যায়। একমাত্র সামঞ্জস্য দেখা যায় সাজসজ্জা ও অলংকরণে। আরবরা এক ধরনের ছুঁচালো খিলান ব্যবহার করেন, কিন্তু এটি এ জাতীয় গথিক স্থাপত্য থেকে পৃথক ধরনের ছিলো। তারা জ্যামিতিক ডিজাইন ব্যবহার করতেন, কারণ জীবজন্তুর ছবি ব্যবহার তাদের ধর্মে নিষিদ্ধ, কিন্তু এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, তাদের ডিজাইন জ্যামিতিক পর্যায়ে পাশ্চাত্য গথিক ডিজাইনের ট্রীফয়ল (ত্রিপত্র আকৃতির নক্শা) বা সিঙ্ক ফয়ল্কে (পঞ্জা আকৃতির নক্শা) প্রভাবিত করেছে।¹ পবিত্র ভূমির গির্জা-স্থাপত্যের স্মৃতিসৌধগুলি প্রায় সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য রীতিতে এবং পাশ্চাত্য ভবন তৈরির নিয়ম-বিধি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত। আমরা বড়জোর একথা বলতে পারি যে, স্থানীয় সমস্যা কিছু কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি করেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ফিলিস্তিনে কাঠ পাওয়া যায়নি বলে গির্জার ছাদ সমতল করে তৈরি করতে হয়, কিংবা স্থানীয় রাজমিস্ত্রী এবং স্টোন-কাটাররা স্বাভাবিকভাবে পাশ্চাত্য পন্থায় অভ্যস্ত বলে সাধারণভাবে পাশ্চাত্য রীতিতে তৈরি ভবনেও কিছু কিছু পাশ্চাত্য রীতির বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়েছে। ² প্রাচীর চিত্রের এরাবেস্ক³ রীতি প্রাচ্য থেকে উদ্ভূত নয়, বরং মূরীয় এবং ক্রুসেড যদি পাশ্চাত্যের ভাস্কর্যে কোন নতুন উপাদান দিয়ে থাকে তাহলে সেগুলি আরব্য নয়, বাইযেন্টাইন। চিত্রাঙ্কন কোন আরব্য শিল্প নয়, এবং পবিত্র ভূমির গির্জাগুলির মোজাইক বাইযেন্টাইন সূত্র থেকে উদ্ভূত। গার্হস্থ্য শিল্প ও কারুকার্যের সঙ্কীর্ণতর গণ্ডীর মধ্যেই আমরা আরব্য প্রভাব সম্ভবত সবচাইতে বেশি পরিমাণে দেখতে পাই। স্বয়ং জেরুজালেম রাজ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভবনগুলির অঙ্গন, মার্বেল, ফোয়ারা এবং প্রস্রবনের কলকল ধ্বনি সম্ভবত আরব্য রীতি অনুসরণ করে। আভ্যন্তরীণ কারুকার্য এবং আসবাবপত্রের ক্ষেত্রেও-একই আদর্শের নকল করা হয়। প্রাচ্যের স্বর্ণের কারুকার্য ও অলংকার সম্ভবত ইটালীতে এবং বিশেষভাবে ভেনিসে কারুশিল্পকে প্রভাবিত করেছে। প্রাচ্যের আইভরি, এনামেল, কার্পেট, ট্যাপেস্টি একইভাবে ব্যাপক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যে প্রভাব সৃষ্টি করেছে। অষ্টাদশ শতকের চিনয়সেরিকে (ওয়াল-পেপার বার্নিশ, বার্নিশ ও ফার্নিচারে) আমরা যে দৃষ্টিতে দেখি মধ্যযুগের 'রেবেস্ক' বা অ্যারাবেস্ক ফ্যাশনকে আমরা সে দৃষ্টিতে দেখতে পারি। তীর্থযাত্রীরা হয়তো খৃস্টান পরিত্র জিনিস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আরবদের পবিত্র বস্তু সংরক্ষণের পাত্র (রেলি কোয়ারি) কিনে নিয়ে আসেন। তারা হয় তো প্যারিসে অনুকরণ করার জন্যে প্রাচ্যের 'গার্ডল-পার্স' (কটিদেশ বেষ্টনী থলে) পরে দেশে নিয়ে আসেন। কিংবা যেসব সিঙ্গায় এক সময় সিরীয়দের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতো সেগুলি তারা পাশ্চাত্যে বয়ে আনেন।
বিজ্ঞান ও দর্শন শাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রাচ্যের আরবরা নয়, বরং স্পেনের আরবরাই ল্যাটিন পাশ্চাত্যে উপহারের সওগাত বয়ে নিয়ে আসে। অবশ্য কতিপয় গাণিতিক জ্ঞান প্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। বাথ-এর অ্যাডেলার্ড আরবদের জ্যোতিঃশাস্ত্র ও জ্যামিতি অধ্যয়ন করেন। তিনি দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে মিসর, এশিয়া মাইনর এবং স্পেন সফর করেন। প্রথম খৃস্টান বীজগাণিতিক লিওনার্ডো ফিবনাক্কিও মিসর এবং সিরিয়া ভ্রমণ করেন। তিনি দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের সমসাময়িক ছিলেন এবং তার বর্গসংখ্যা সংক্রান্ত পুস্তিকা ফ্রেডারিকের নামে উৎসর্গ করেন। আরবী সংখ্যা-চিহ্ন ও পাটীগণিতের প্রসারণ ইটালীয় বন্দরগুলির সঙ্গে সিরিয়ার বাণিজ্য প্রাণবন্ত করে তোলে। অংক শাস্ত্রের ন্যায় ভেষজশাস্ত্রও আরব্য বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিলো, কিন্তু এই উপাদানের মূল কেন্দ্র ও প্রসারণের উৎস ছিলো সিরিয়া নয়, স্পেন। সিরীয় প্রভাব সম্পর্কে যে বিষয়ে সবচাইতে বেশি ধারণা করা হয় তা হচ্ছে মোন্টপেলিয়ারে একটি মেডিক্যাল স্কুলের উদ্ভব। দক্ষিণ ফ্রান্স ও লেভ্যান্টের মধ্যে যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এটি তারই ফল। আমরা ত্রয়োদশ শতকে যে জ্ঞানদীপ্ত দর্শনের সাক্ষাত পাই তা প্রাচ্যের আরব দার্শনিকদের প্রত্যক্ষ অবদান নয়। খৃস্টান ঐতিহ্য ও ফাদারদের শিক্ষা ছাড়াও স্পেনের আরবদের এরিস্টটল চর্চা থেকে কিংবা এরিস্টটলের যে জ্ঞান সরাসরি বাইযেন্টিয়াম থেকে পাওয়া যায় সেখান থেকে এর উপাদান সংগ্রহ করা হয়। ¹
শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ক্রুসেডের প্রভাব সম্ভবত সবচাইতে গভীর ও ব্যাপ্তিশীল ছিলো। এর অন্যতম প্রত্যক্ষ ফল ছিলো প্রাচ্য ভাষাগুলির চর্চা। কিন্তু এক্ষেত্রে ক্রুসেডের চাইতেও যে এসিয়াটিক মিশন ক্রুসেডের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং মঙ্গোলদের ধর্মান্তরিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে তারই অবদান বেশি। ক্যাটালোনিয়ার অধিবাসী জনৈক রেমণ্ডাস লালাস সর্বপ্রথম প্রাচ্যচর্চার উন্নয়ন সাধনে সচেষ্ট হন। তিনি এটিকে এমন একটি শান্তিবাদী ক্রুসেডের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চান সেখানে সামগ্রিকভাবে আধ্যাত্মিকতাই হবে অস্ত্র। আরবী ভাষা চর্চার জন্য তিনি ১২৭৬ খৃস্টাব্দে মিরামারে ফ্রাইয়ারদের একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩১১ খৃস্টাব্দে সম্ভবত তাঁরই উদ্যোগে প্যারিস, লুভেইন ও স্যালামা হরফে প্রাচ্য ভাষার (আরবী ও তাতার ভাষার) কতিপয় অধ্যাপকের পদ সৃষ্টির জন্য কাউন্সিল অব ভিয়েন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই অস্থির ও নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি ১৩১৪ খৃস্টাব্দে তিউনিসে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তার সাধনা প্রায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু যে প্রাচ্য মিশনের জন্য তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন তা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আমরা দেখতে পাবো যে, এর পরিণতি প্রাচ্য চর্চা বিকাশে পর্যবসিত না হয়ে ভৌগোলিক জ্ঞান বিকাশে পর্যবসিত হয়। ²
সাহিত্যের ক্ষেত্রে ক্রুসেড অনেকখানি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এবং এগুলি বহু পাশ্চাত্য কবির কাব্যের বিষয়বস্তু ছিলো। ক্রুসেডের পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদদের মধ্যে রয়েছেন গেস্টাফ্র্যাঙ্কোরাম-এর অজ্ঞাতপরিচয় নর্ম্যান লেখক, যিনি প্রথম ক্রুসেডের বিবরণ প্রদান করেন; ফালচার অব চার্টরেস যার হিস্টোরিয়া হিরোসেলিমিটানা গ্রন্থে কেবল প্রথম ক্রুসেডেরই বর্ণনা দেওয়া হয়নি, ১১২৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্যের ইতিহাসও দেওয়া হয়েছে, এবং সর্বোপরি টায়ারের আর্কবিশপ উইলিয়াম, যার তেইশ খণ্ডে রচিত হিস্টরি অব থিংস ডান ইন দি পার্টস ওভারাসীজ ১১৮৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই গ্রন্থটির একটি ফরাসী অনুবাদ বর্তমানে মধ্যযুগের প্রধান উপাদান এবং ক্রুসেড কাহিনীর প্রধান ভিত্তি। টায়ারের উইলিয়াম কেবল ল্যাটিনদের কার্যকলাপের বিবরণই দেননি, তিনি এ হিস্টরি অব দি মুহাম্মাডান প্রিন্সেস ফ্রম দি এপিয়ারেন্স অব দি প্রফেট- ও (হযরত মুহম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের পরবর্তী মুসলিম সুলতানগণের ইতিহাস সংকলিত করেন। শেষোক্ত রচনাটি বর্তমানে পাওয়া না গেলেও ত্রিপোলির উইলিয়ামের ট্যাক্টেটাস ডি স্ট্যাটু স্যারাসেনোরাম (১২৭৩) গ্রন্থে এর যেটুকু সন্ধান পাওয়া যায় তাতে আরব বিশ্ব সম্পর্কে গ্রন্থকারের জ্ঞানের বিস্তৃতি এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্য ও প্রতিভা সম্পর্কে তার গভীর দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়।
মূল প্রাচ্য সূত্রের মধ্যে রয়েছে দ্বাদশ শতকের বিবরণী সম্বলিত উত্তর সিরিয়ার জনৈক শেখ, উসামা ইবনে মুনকিজের আত্মজীবনী; ইবনে আল- আসিরের আতাবেগের ইতিহাস; এবং বাহাউদ্দীন রচিত সালাহউদ্দীনের জীবনী। কিন্তু পাশ্চাত্যে যেকোনভাবেই হোক ক্রুসেডের কাহিনী দ্রুত রূপকথায় রূপান্তরিত হয়। সং অব রোল্যান্ড-এর পথপ্রদর্শন করে। এটি উত্তর স্পেনে খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত সীমান্ত যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কে কবি-কল্পনার ফসল। ক্রুসেড যুদ্ধের প্রথম দিকে সম্ভবত প্রথম ক্রুসেডের সময় একই কল্পনার ক্রিয়া থেকে একটি রূপকথা সৃষ্টির সূচনা হয়, এবং ইতিহাস থেকে অনেক দূরে সরে গেলেও এটি ইতিহাসের পাশাপাশি অব্যাহত থাকে। ¹ চ্যান্সন ডেস চেটিফস (১১৩০) এবং চ্যান্সন ডি. এন্টিয়ক (১১৮০)-এ ইতিমধ্যেই রূপকথার আবির্ভাব ঘটে। সং অব রোল্যান্ডে যেমন রোল্যান্ড ও অলিভারকে গৌরবমণ্ডিত করা হয়, তেমনি এখানেও পিটার দি হার্মিট বা গডফ্রে অব বুইলনকে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এগুলিতে ক্রুসেডকে যদৃচ্ছক্রমে কখনো এখানে এবং কখনো ওখানে বড়ো করে প্রদর্শন করে এমন এক বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনী তৈরি করা হয় যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাস্তবতার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। টাসো এই কাহিনীই গ্রহণ করেন এবং তাঁর মহাকাব্য জেরুজালেমে লিবারেটায় ষোড়শ শতকের রীতিগত মহাকাব্যীয় পরিচ্ছদে বিন্যাস করে। ইউরোপের হৃদয় থেকে ক্রুসেড কত দূর গিয়েছে এর চাইতে ভাল করে আর কোথাও তা প্রদর্শিত হয়নি। ডি স্যান্টিক্স বলেন, টাসো এমন একটি কাব্য রচনা করতে চেয়েছিলেন যা ধর্মীয় প্রেরণায় 'উজ্জীবিত হয়ে সত্যিকারভাবে বীরত্বব্যঞ্জক হবে, পসিবিলমেন্টে স্টোরিকো ই প্রসিমো আল ভেরো ও ভেরিসিমিলি। তিনি কতটা সফলতা অর্জন করেছেন? আনমন্ডো কেভালেরেস্কো, ফ্যান্টাস্টিকো, রোমাননেস্কো ই ভল্যুটুওসো, চে সেন্টে লা মেসা ইসি ফা লা ক্রোসে।¹
ক্রুসেড বাস্তবে শার্লেমনের 'বিষয়' বা বৃটেন এণ্ড দি রাউণ্ড টেবলের 'বিষয়ের' ন্যায় মধ্যযুগীয় কাব্যের অন্যতম বড়ো 'বিষয়' কখনো হয়নি।² বস্তুত ক্রুসেড এই দুটি বিরাট বিষয়কে প্রভাবিত করেছে। শার্লেমনকে একজন ক্রুসেডার হিসাবে তৈরি করে কনস্টান্টিনোপলে, এবং এমনকি জেরুজালেমে পাঠানো হয়। আর্থারীয় কবিগণ তাদের কাহিনীতে ক্রুসেডের ন্যায় একটি রূপ আরোপ করেন। মধ্যযুগে ক্রুসেড না হলে মর্টে ডি' আর্থার বাস্তবে যা ছিলো তা হতো না। কিন্তু এ ধরনের প্রভাবের ক্ষেত্রে ইসলাম থেকে কোনো কিছু আহরণ করা হয়নি। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ হিসাবে অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিশ্বাসের যুদ্ধের ধারণামাত্র এবং এই ধারণা ইরান ও তুরানের মধ্যে যুদ্ধের ন্যায়ই প্রাচীন-। অবিশ্বাসের রূপায়ণ ছাড়া মধ্যযুগের কাব্য ভাণ্ডারে ইসলাম নিজেও অতি সামান্যই যুক্ত করেছে। অকাসিন এণ্ড নিকলেট-এর ক্যান্টিফ্যাবল-এর লেখক হয়তো আরবী সূত্র থেকে কোন কিছু ধার করেছেন। কিন্তু ধার করে থাকলেও ক্রুসেডের আওতার বাইরেই তিনি তা করেছেন।³ যে 'স্যারাসেনিক' মতবাদে কেবল সনেট নয়, মিলযুক্ত গীতিকাব্যের আকারও প্রাচ্য থেকে উদ্ভূত বলে ধারণা করা হয়, তার মধ্যে যদি কোন সত্যতা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রেও তা ক্রুসেডের আওতার বাইরেই হয়েছে এবং তা সিসিলীয় ইতিহাসের একটি ব্যাপার। এটি এমনি মনে হবে, যেন ট্রয়ের কাহিনী এবং আলেকজাণ্ডারের দুঃসাহসিক অভিযান মধ্যযুগীয় কবিদের কাছে ক্রুসেডের চাইতেও বেশি পরিমাণে প্রাচ্যের দৃশ্য তুলে ধরেছে। কেউ কেউ হয়তো এমন কথা বলতেও দ্বিধা করবেন না যে, কাউন্ট রবার্ট অব প্যারিস এবং দি ট্যালিসমান-এর সময়ের আগে পর্যন্ত ক্রুসেড পাশ্চাত্যের দুঃসাহসিক কাহিনীর সত্যিকার উপাদান হয়নি, কিন্তু ক্রুসেড স্বয়ং না হলেও ক্রুসেড থেকে যেসব প্রসঙ্গ ও উদ্দেশ্য পাওয়া যায়, তা মধ্যযুগের রোমান্টিক ঐতিহ্যের অর্ন্তভুক্ত হয়। যেমন জনৈক নাইট সম্পর্কে এরূপ প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয় যে, তাঁকে স্যারাসেন-দেশে বন্দী করা হয় এবং যে স্যারাসেন রাজকুমারী তাঁকে ভালোবাসতেন তিনি তাঁকে উদ্ধার করেন। যেমন কোন এক স্ত্রীর এরূপ মটিফ (উদ্দেশ্য) দেখানো হয় যে, তিনি দীর্ঘকাল বিরহ যন্ত্রণা ভোগ করার পর তার ক্রুসেডার স্বামীকে ফিরে পাবার আশা ত্যাগ করে যখন আবার বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন তখন স্বামীর পুনরাবির্ভাব ঘটে—একা অথবা জনৈক স্যারাসিন মহিলাসহ, কিন্তু এসব হচ্ছে কল্পনার জালবোনা—এগুলির সঙ্গে ক্রুসেডের সত্যিকার বিষয় ও উপাদানের সম্পর্ক নেই।¹
৩
ক্রুসেডের মাধ্যমে কিংবা জেরুজালেম রাজ্যের নলের মধ্য দিয়ে মুসলিম প্রাচ্য পশ্চিম ইউরোপের উপর যে প্রভাব সৃষ্টি করেছে সে প্রশ্ন ছাড়াও, পশ্চিম ইউরোপের একটি আন্দোলন হিসাবে নিজস্ব মূলভূমিতে ক্রুসেডের সামগ্রিক সাধারণ প্রভাবের অতিরিক্ত ও বৃহত্তর প্রশ্নটিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এই অতিরিক্ত ও বৃহত্তর প্রশ্নটি আমাদের প্রসঙ্গের বাইরে অবস্থিত, তাই একটি পরিশিষ্ট ও একটি উপসংহার হিসাবে আরো কিছুটা মতামত, বিশেষত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্রুসেডের সাধারণ প্রতিক্রিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে।
ক্রুসেড চারদিক দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের খৃস্টান জগতে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রথমত যাজক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে পোপতন্ত্রে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, এটি কতিপয় রাষ্ট্রের প্রত্যেকটির আভ্যন্তরীণ জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। আমরা আংশিকভাবে সরকারী (মূল 'স্টেট') কর্মপন্থায় এবং আংশিকভাবে দুটি ধর্ম বহির্ভূত এস্টেটের অবস্থায় এই প্রভাব দেখতে পাই—এস্টেট দুটি হচ্ছে অভিজাত শ্রেণী ও সাধারণ শ্রেণী, বিশেষ করে শহরবাসী সাধারণ শ্রেণী। তৃতীয়; এটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাহ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। এসব রাষ্ট্রের আপেক্ষিক মর্যাদা ও গুরুত্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এবং একটি ইউরোপীয় ব্যবস্থার সাধারণ বিকাশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। শেষত, এটি এশিয়া মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। এবং ত্রয়োদশ শতক থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত অনুসন্ধানের যে সম্প্রসারমান আলোড়নের সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে আমরা এমন একটি আন্দোলনের ধারাবাহিক পর্যায় দেখতে পাই যা ক্রুসেডই প্রথম সূচনা করে।
যাজক সম্প্রদায় ও পোপতন্ত্র
যাজক মণ্ডলী ছিলো একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যাজক মণ্ডলীর নেতা পোপ ছিলেন এক বিরাট ইউরোপীয় ব্যক্তিত্ব। তাই ক্রুসেডের ন্যায় একটি আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় উদ্যোগে স্বাভাবিকভাবেই যাজক মণ্ডলী ও পোপের নিয়ন্ত্রণ পূর্বেই নির্দিষ্ট হয়েছিলো বলে প্রতিভাত হয় এবং তার ফলে পৌরহিত্যবাদের প্রবণতা প্রাধান্য পেতে দেখা যায়। গ্রেগরিয়ান আন্দোলনে ইতিপূর্বেই এই প্রবণতা সঞ্চারিত হয়। দ্বিতীয় আরবানের ধারণা অনুযায়ী পোপকে পবিত্র যুদ্ধের জেনারেমিসিমো হতে হবে। ক্রুসেড হবে পোপতন্ত্রের পররাষ্ট্রনীতি, যা পরিচালিত হবে তারই ইঙ্গিতে। পোপের জনৈক প্রতিনিধি আল্লাহ্র বাহিনীর সঙ্গে থাকবে এবং সে বাহিনীর শাসনও তার হাতে থাকবে। কার্যক্ষেত্রে এ উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো প্রতিফলিত হয়নি। যাজকীয় আওতা বহির্ভূত রাজাদের বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইতিমধ্যেই প্রাধান্য লাভ করে, এবং বস্তুত প্রথম ক্রুসেডে তাই ছিলো প্রধান। কিছু কিছু লোক যে যাজকীয় ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার স্থলে ১১০০ খৃস্টাব্দে একটি পার্থিব জেরুজালেম রাজ্যের প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যে সব সম্রাট ও রাজা প্রথম ক্রুসেডে অনুপস্থিত ছিলেন দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্রুসেডে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন, আমরা মাঝে মাঝে লক্ষ্য করব যে, কিভাবে একটি বৈষয়িক রাষ্ট্র জেরুজালেমের আর্থিক প্রয়োজন মিটানোর জন্য নিজস্ব কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। এতদসত্ত্বেও এবং পার্থিব নীতি এবং ব্যবস্থা সত্ত্বেও (যা চতুর্থ ক্রুসেডের সময় যতোটা সুস্পষ্ট ছিলো অন্য কোথাও ততটা ছিলো না) ক্রুসেড মূলত পোপতন্ত্রের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিলো। পোপরাই এসব ক্রুসেডে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং এগুলিকে সংগঠিত করতেন। পোপরাই তাদের নিদের্শ দিতেন, এবং এই নির্দেশ কেবল প্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধেই নয়, পাশ্চাত্যের ধর্মদ্রোহী আলবিজেনসিয়েনের¹ বিরুদ্ধেও প্রদত্ত হয়। এবং দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের রাজত্বকালে এমন এক সময়ও আসে যখন জনৈক পোপ একজন পাপী সম্রাটের বিরুদ্ধে ক্রুসেড পরিচালিত করতে পারতেন। ক্রুসেড কেবল পোপতন্ত্রের নীতির একটি হাতিয়ারই ছিলো না, পোপের অর্থ বিভাগেরও একটি অংশ ছিলো। বৈষয়িক রাষ্ট্র যদি সালাহউদ্দীন ‘টাইদ’ (উশর) আরোপ করতো, পোপও তার নিজস্ব টাইদ অরোপ করতে পারতেন। ত্রয়োদশ শতকের সূচনার পর যাজকদের পক্ষ থেকে ক্রুসেডের অজুহাতে নিয়মিতভাবে এক দশমাংশ যাজকীয় রাজস্ব ধার্য করা হয়। এই রাজত্ব প্রথমে কাউন্সিলের ফরমান বলে এবং পরে পোপের কর্তৃত্বে ধার্য করা হয় এবং ইংল্যান্ডে রিফরমেশন (পোপ বিরোধী ধর্ম বিপ্লব) পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। ক্রুসেড যেমন যাজক শ্রেণীর জন্য নতুন রাজস্বের সূত্রপাত করে, তেমনি তারা নতুন সম্প্রদায়েরও সৃষ্টি করে। টেম্পলারস নামক সংঘ ও হসপিটালারস্ নামক সংঘ নিয়মিত যাজক বিধির উপর ভিত্তি করে ইউরোপে যোদ্ধা-যাজকের এক নতুন শ্রেণী হিসাবে আবির্ভূত হয়। পেশাদার সৈনিক জীবনের সঙ্গে সন্ন্যাস জীবনের বিধি সংযুক্ত হয়। সামরিক শৃংখলার মিশ্রিত বৈশিষ্ট্য ক্রুসেডের মিশ্রিত বৈশিষ্ট্যকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে। এর ফলে ক্রুসেড একই সময়ে পোপপন্থী ও পোপবিরোধী, যাজকীয় ও যাজক-বিরোধী এবং যাজকতন্ত্রের সমর্থনপুষ্ট ও যাজকতন্ত্রের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে ওঠে।
ক্রুসেড পবিত্র ও অপবিত্র, বৈষয়কি ও যাজকীয় এবং পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ধারণার মধ্যে যে প্রাচীন সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিলো তা দূর না করলেও দুর্বল করে। ক্রুসেড ছিলো যুদ্ধরত সাধারণ মানুষের উৎসর্গ এবং এটি নিজস্ব পন্থায় সাধারণ মানুষকে পাপস্থালনের পথে পরিচালিত করতো। ক্রুসেডকে কেন্দ্র করে সাধারণ লোক এক ধরনের ধর্ম যাজক হতে পারতো এবং এর সঙ্গে সহযোগিতা করে সাধারণ রাষ্ট্র কিছু পরিমাণে পবিত্রতা অর্জন করতে পারতো। এক পারলৌকিক মনোভাব থেকে একটি আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়।
এমন এক যুগে এই আন্দোলনের জন্ম হয় যে যুগটি দৃশ্যত ধর্মতন্ত্রের দিকে যাচ্ছিল। তাই সাধারণ প্রেরণা ও সাধারণ শক্তি বিকাশে এই আন্দোলনের অবদানমূলক ক্ষমতা কোন অংশে কম ছিলো না। প্রাচ্যে ইসলামের সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ— যে যোগাযোগ ঘনিষ্ঠতা, এবং সেসঙ্গে ঘনিষ্ঠতালব্ধ সহনশীলতা সৃষ্টি করে—বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের প্রাচীন বিরোধিতাকে দুর্বল করে, ঠিক যেমনিভাবে ক্রুসেড বিশ্বাসের আওতায় পার্থিব ও যাজকীয় পার্থক্যকে দুর্বল করেছিলো। ক্রয়োদশ শতকের সব লোকই দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের মনোভাবসম্পন্ন ছিলো না। তিনি পোপের বিরুদ্ধে একটি স্যারাসেন বাহিনী ব্যবহার করেন। আরব পণ্ডিতদের সঙ্গে পত্র বিনিময় করেন এবং যে সময় জেরুজালেমের অস্তিত্বের প্রশ্ন দেখা দেয় তখনো মুসলিম শাসকদের সঙ্গে আপোস আলোচনা করেন। যাই হোক পণ্ডিত ব্যক্তিরা আরব দার্শনিকদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণে আগ্রহ প্রদর্শন করেন, কেউ কেউ আরবী ভাষা শিখতে শুরু করেন এবং জ্ঞানার্জনের একটি নতুন প্রেরণার সৃষ্টি হয়। যে সেন্ট লুই বক্ষস্থলে তলোয়ার প্রবেশ করিয়ে অবিশ্বাসীর সঙ্গে কথা বলতেন তার মনোভাবের সঙ্গে, যে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এরিস্টটলের ফিজিকা এট মেটাফিজিকার জন্য আরব স্পেনেও যেতে রাজি ছিলো তার মনোভাবের পার্থক্য ছিলো। ক্রুসেড থেকে আলাদাভাবে জ্ঞান চর্চার উদ্ভব ও বিকাশ সাধিত হয়। কিন্তু যে নতুন সমঝোতার যুগ সৃষ্টিতে ক্রুসেডও কিছুটা অবদান রাখে, কেবলমাত্র সে যুগেই জ্ঞানচর্চা এরিস্টটলের ধর্ম নিরপেক্ষ জ্ঞানের সঙ্গে বাইবেল ও গির্জার ঐতিহ্যের সমন্বয় সাধনের মহান দায়িত্ব সম্পাদনে সচেষ্ট হতে পারে।
রাষ্ট্র ও যাজকীয় আওতা বহির্ভূত এস্টেট
পাশ্চাত্যের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় জীবনে ক্রুসেডের সবচাইতে সহজ ও সুস্পষ্ট ফলাফল হচ্ছে একটি নতুন ধরনের কর ব্যবস্থার বিকাশ। এতোদিন ভূমির উপর কর ধার্য করা হতো। ক্রুসেডের আবির্ভাবের পরেই আমরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর করের সূচনা দেখতে পাই। সপ্তম লুই ১১৪৬ খৃস্টাব্দে সর্বপ্রথম প্রপটার সাসটেনটেশনেম টেরেই হিরোসলি মিটানেই নামে একটি কর ধার্য করেন, এবং ১১৬৫ খৃস্টাব্দে তিনি এর পুনরাবৃত্তি করেন। ১১৬৬ খৃস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের দ্বিতীয় হেন্নি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন। তিনি ঐ বছর প্রতি পাউন্ডে দুই পেন্স হারে এবং এর পরবর্তী চার বছর প্রতি পাউন্ডে এক পেনি হারে কর ধার্য করেন। তিনি সকল শ্রেণীর কাছ থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং আয়ের (ক্যাটাল্লা এট রেডিটাস) ভিত্তিতে এই কর আদায় করেন। ১১৮৪ খৃস্টাব্দে ফিলিফ অগাস্টাস ও দ্বিতীয় হেনরি তাদের নিজ নিজ রাজ্যে পরবর্তী তিন বছরের জন্য এ ধরনের একটি কর আরোপে একমত হন। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। জেরুজালেমের পতনের পর ১১৮৮ খৃস্টাব্দে উভয় রাজা সালাহউদ্দীন 'টাইদ' ধার্য করেন। অন্তত ইংল্যাণ্ডে এই দৃষ্টান্ত বিস্মৃত হয়নি, এবং ত্রয়োদশ শতকে ক্যাটাল্লা এট রেডিটাস-এর উপর কর জাতীয় অর্থ ব্যবস্থার একটি প্রচলিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত করা হয়। ¹
পাশ্চাত্য রাজ্যগুলির যাজকীয় আওতা বহির্ভূত এস্টেটগুলির উপর ক্রুসেডের প্রতিক্রিয়া অনেক অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট। এরূপ বলা হয় যে, ক্রুসেড সামান্ততন্ত্র অবসানে ও ব্যারানিয়াল এস্টেটের অবনতিতে অবদান সৃষ্টি করে। ক্রুসেড অশান্ত আবেগকে অবশ্যই প্রাচ্যের দিকে সিরিয়ায় নতুন জায়গীর (ফীফ) অনুসন্ধানের জন্য কিংবা সামরিক সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার জন্য আকৃষ্ট করে। এর ফলে সম্ভবত কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পত্তি বিক্রয় করা হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মালিকানা বৈধতায় গোলযোগ দেখা দেয়। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের সমাপ্তি পর্যন্ত সামন্ততান্ত্রিক ব্যরনব্যবস্থা প্রাণবন্ত শক্তি হিসাবে অব্যাহত থাকে।
ক্রুসের নতুন পদ্ধতির যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং আমাদের ইতিপূর্বে উল্লিখিত টুর্নামেন্ট ও কুলজীচিহ্ন ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্ট করার ক্ষেত্রে যতটা অবদান সৃষ্টি করেছেন তাদের মর্যাদা ব্যাহত করার ক্ষেত্রে ততটা অবদান সৃষ্টি করতে পারেনি। একইভাবে পৌর স্বাধীনতার উদ্ভব ক্রুসেডের অবদান বলে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। বলা হয় যে, ক্রুসেডে অংশগ্রহণকারী নেতাদের নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় পৌরসনদ প্রদান করা হয়। এখানেও আবার অনুমান প্রমাণকে ছাড়িয়ে গেছে। আমরা নির্বিবাদে একথা বলতে পারি যে, যেহেতু ক্রুসেডে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ সাধন করেছে, সে জন্য ক্রুসেড আবশ্যিকভাবে বিভিন্ন শহর গড়ে ওঠাকেও উৎসাহিত করেছে। বড় বড় ইটালীয় বন্দরগুলি তাদের প্রাথমিক সমৃদ্ধির জন্য অবশ্যি ক্রুসেডের কাছে ঋণী। এবং যে স্থলবাণিজ্য পথে ভেনেসীয় পণ্য রাইন নদীর ওপারে বাল্টিক ও উত্তর সাগরে বহন করা হয়, আমরা দেখেছি যে, সেই বাণিজ্য পথও স্বাধীন শহর ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার জন্য দায়ী।
রাষ্ট্রসমূহ ও ইউরোপীয় ব্যবস্থার বাহ্যিক সম্পর্ক
কেবলমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টির মাধ্যমে নয়, ইউরোপীয় ঐক্যের নতুন বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমেও ক্রুসেড ইউরোপীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধন করে। আমরা বলতে পারি যে, ১০৯৬ খৃস্টাব্দের পর সংযুক্ত পশ্চিম ইউরোপের ধারণা কেবলমাত্র একটি হোলি রোমান এম্পায়ারের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনার মধ্যেই নয়, একটি সাধারণ ক্রুসেডের বাস্তব অবস্থার মধ্যেও প্রতিভাত হয়। একথা সত্য যে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির শাসকরা যখন কোন ক্রুসেডে মিলিত হতেন তখন পারস্পরিকভাবে একমত না হওয়ার জন্যেই মিলিত হতেন। জাতীয় মতভেদ জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বারা জোরদার হতো, যা তৃতীয় ক্রুসেডে বিশেষভাবে দেখা যায়। এতদসত্ত্বেও পারস্পরিক স্বার্থের একটি ঐক্য ও একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের মনোভাব কখনো সামগ্রিকভাবে তিরোহিত হয়নি। প্রাচ্যের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বাগদাদ থেকে কোন নির্দেশ ছিলো না এবং খলীফারও কোন আহবান ছিলো না। বড় জোর মসুলে একটি বাস্তব ক্ষমতা ছিলো এবং একজন নূরুদ্দীনের একনিষ্ঠ বিশ্বাস ছিলো কিংবা একজন সালাহউদ্দীনের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিলো। পাশ্চাত্য খৃষ্টান শক্তির জন্য ছিলো এর পোপ এবং ক্রুসেড যুদ্ধের জন্য পোপের নির্দেশ। শত্রুর বিরুদ্ধে একটি সাধারণ আক্রমণ ব্যবস্থায় এটিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা হয়। একটি ইউরোপীয় কমনওয়েলথের ধারণা—একটি রেসপাবলিকা ক্রিশ্চিয়ানা, যা তুর্কীদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় বা আক্রমণে রেস ক্রিশ্চিয়ানায় ব্যাপৃত হয়—কয়েক শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। ওলন্দাজ পণ্ডিত টের মিউলেন তাঁর ডেরগেডাঙ্কে ডের ইন্টারনেশনালেন অর্গানাইজেশন নামক গ্রন্থে ডুবয়সের সময় (১৩০০) থেকে আব্বে ডি সেন্ট-পিয়ের ও কান্টের সময় (১৮০০) পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের যেসব পরিকল্পনা ইউরোপীয় ঐক্য বা রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত হয় সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করেন। প্রামাণ্য হিসাবে উদ্ধৃত প্রায় সবগুলি পরিকল্পনায়ই তুর্কীদের বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মপন্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। আমরা যা কিছু রেকর্ডপত্র পাই তার প্রায় সবগুলিতেই ক্রুসেডের অব্যাহত ধারণা নিহিত রয়েছে।
ইত্যবসরে ক্রুসেডের সময় এবং ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যর তুলনায় ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের ওজন বিলীন হয়। ১২০৪ খৃস্টাব্দে এর পতন হয় এবং ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে কনস্টান্টিনোপল ও টেবিজণ্ডে পুনরায় গ্রীক সাম্রাজ্যগুলির আবির্ভাব হলেও তারা একটি বিরাট নামের ছায়ামাত্র ছিলো। ইউরোপের ভারসাম্য পাশ্চাত্যে এসেই বজায় থাকে। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ফ্রান্স সর্বাধিক প্রাধান্য লাভ করে এবং এর সাফল্যে ক্রুসেড তার ভূমিকা পালন করে। ফরাসী ভূমিতেই ক্রুসেডের প্রচার করা হয় এবং ফরাসী নাইটরাই ক্রুসেড যুদ্ধ করে। সেন্টলুইর মাধ্যমে ফ্রান্সই পূর্ণাঙ্গ আদর্শ ক্রুসেডার তৈরি করে। ফরাসী ঔপনিবেশিকরা জেরুজালেম রাজ্যে বসতি স্থাপন করে, এবং যখন এর পতন হয় তখন তারা সাইপ্রাস রাজ্যে বসবাস করে। তারা মোরিয়া এবং ডিউক শাসিত এথেন্সে বসতি স্থাপন করে। চতুর্দশ শতকের জনৈক ফরাসী লেখক বলেন, 'মোরিয়ার শিভ্যলরি পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত শিভ্যলরি। সেখানে প্যারিসের মতই উত্তম ফরাসী ভাষা প্রচলিত।' লেভ্যান্টের মিশ্র সাধারণ ভাষা 'উত্তম ফরাসী ভাষা' নয়। এর একটি ল্যাটিন ভিত্তি রয়েছে যা ভেনেসীয় ও জেনোয়ী ব্যবসায়ীদের ইটালিয়ান ভাষা থেকে উদ্ভূত। কিন্তু পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফরাসী ভাষা টিকে না থাকলেও ফরাসী ঐতিহ্য কখনো তিরোহিত হবে না। পবিত্র স্থানসমূহের যে আশ্রিত রাজ্য শার্লেমন শাসন করতেন তার দায়িত্ব ষোড়শ শতকে প্রথম ফ্রান্সিস গ্রহণ করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ল্যাটিনরা জেরুজালেমের ন্যাটিভিটি গুহাগৃহ (গ্রটো) এবং হোলি সেপালচারের অধিকার লাভ করেন। এ সব শর্ত উনবিংশ শতকেও কার্যকর রয়েছে এবং এগুলি ক্রিমিয়া যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিলো। এমন কি সেদিন পর্যন্তও ক্রুসেডের অন্যতম উত্তরাধিকার সিরিয়া ফরাসী অছি শাসনের অধীনে ছিলো।
ইউরোপ ও এশিয়ার সম্পর্ক
উপসংহারে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের নতুন সম্পর্কের ব্যবস্থার কথা বলতে হয়। যার সূচনা হয়েছিল ক্রুসেডের মাধ্যমে। ক্রুসেডের মাধ্যমে ইউরোপ কেবল আভ্যন্তরীণ ঐক্যের একটি নতুন রূপ এবং নিজস্ব আভ্যন্তরীণ জীবনের উপর একটি নতুন প্রভাবই লাভ করেনি, বিশ্ব সম্পর্কে একটি নতুন ও ব্যাপকভাবে প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গিও লাভ করেছে। দৃষ্টির এই প্রশস্ততা এবং সেসঙ্গে আবিষ্কার ও ভৌগোলিক জ্ঞানের বিকাশই হচ্ছে ক্রুসেডের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। দ্বাদশ শতকে তীর্থযাত্রীদের পথ প্রদর্শকদের জন্য ভূগোল ছিলো একটি বহুমূল্য সম্পদ।¹ এতে বিভিন্ন পথ ও পবিত্র স্থানের যেসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা (বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও মিসরের মধ্যবর্তী এলাকা) সামরিক অনুসন্ধান কার্য পরিচালনার পর অধিকার করা হয় সেগুলির বিবরণ থাকতো। এগুলি কেবলমাত্র 'নিকটবর্তী এশিয়ার' উপকূলীয় প্রান্তকেই স্পর্শ করে। কিন্তু আমরা ইতিপূর্বেই লক্ষ্য করেছি যে, ত্রয়োদশ শতকে আবিষ্কার ও বর্ণনা সমগ্র 'দূরবর্তী এশিয়ায়' প্রসারিত হয়। এশিয়া আবিষ্কারের মহান যুগ ষোড়শ শতকে আমেরিকা আবিষ্কারের যুগের সমান না হলেও সমতুল্য। প্রায় ১২৪০ খৃস্টাব্দের দিকে এই আবিষ্কার শুরু হয় এবং এক শতাব্দী পরে শেষ হয়।² ঐ শতকে এশিয়া একটি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধীনে অসংলগ্নভাবে একত্রিত ছিলো। এর বিস্তৃতি ছিলো ক্রিমিয়া ও তাব্রিজ থেকে শুরু করে বোখারা ও সমরকন্দ হয়ে ক্যাম্বালুক (পিকিং) ও কিস্সাই (হ্যাংচৌ) পর্যন্ত। মঙ্গোলরা তাদের প্রাচীন শামান ধর্মের অনুসারী ছিলো এবং অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল ছিলো। নিজেরা খৃস্টান না হলেও তারা তাদের সাম্রাজ্যে খৃস্টানদের আশ্রয় প্রদান করে। খৃস্টান প্রেরণা তাদের ধর্মান্তরিত করার আশা পোষণ করে এবং খৃস্টান বাণিজ্যিক উদ্দীপনা তাদের সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রাচ্য বাণিজ্যের উৎসস্থল পর্যন্ত বাণিজ্য পথ সৃষ্টি করতে চায়। মঙ্গোলদের নিকট অংশত এরূপ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে মিশন পেরিত হয় যে, তারা ধর্মান্তরিত হলে শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং পবিত্র ভূমি স্থায়িভাবে পুনরুদ্ধার করা যাবে। কিন্তু এটি ক্রুসেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও এতে ক্রুসেডের আওতা অতিক্রম করা হয়।
রেমাণ্ডাস লালাসের মতো অনেকেই মনে করতেন যে, এই মিশন ক্রুসেডের স্থলাভিষিক্ত হওয়া এবং সামরিক অভিযানের স্থলে শান্তিপূর্ণ ধর্ম প্রচার প্রবর্তিত হওয়া উচিত। তারা এও চাইতেন যে, এশিয়ার এসব ধর্মান্তরই এর একান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে করে পানি যেভাবে সমুদ্রকে আবৃত করে তেমনিভাবে পৃথিবী আল্লাহর জ্ঞানে পরিপূর্ণ হয়।
মঙ্গোলদের সহনশীলতা এবং এশিয়ায় নেস্টোরিয়ান খৃস্টানদের অবস্থানের সুযোগে এসব খুস্টান মিশনারী বহুদূর পর্যন্ত ভ্রমণ করে। চতুর্দশ শতকের শুরুতে চীনে ল্যাটিন চার্চের প্রতিষ্ঠাতা জন অব মন্টিকর্তিনো ক্যাম্বালুকের আর্কবিশপ হন। তিনজন ফ্রান্সিসকান তার অধীনে বিশপ ছিলেন। ইটালীয় বন্দরসমূহের নাবিকরা যেভাবে প্রথম ক্রুসেডের সহগামী হয়েছিলো তেমনিভাবে এই মিশনের সঙ্গে ইটালীয় বণিকরা সহগামী হয়। এর অনুসরণে কেবল পোলোরাই (মার্কোপোলো প্রমুখ) তাদের বিরাট ভ্রমণে বের হননি। (আরো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ হিসাবে) একটি জেনোয়ী কোম্পানী কাস্পিয়ান সাগরে নৌ-বাণিজ্য অভিযান পরিচালনা করে এবং জনৈক ভেনেসীয় কনসাল তাব্রিজে বসতি স্থাপন করেন। এ ব্যাপারে সবগুলি বড় বড় আশা ব্যর্থ হয়। একটি খৃস্টান এশিয়াকে একটি খৃস্টান ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত করার এবং ইসলামকে স্পেনের একটি অংশে ও লেভ্যান্টের এক কোণে একটি ক্ষুদ্র শক্তিতে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে মঙ্গোলদের ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করার সম্ভাবনা তিরোহিত হয়। পারস্যের খান শাসিত সাম্রাজ্য ১৩১৬ খৃস্টাব্দে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি মধ্য এশিয়াও একই পথ অনুসরণ করে। ১৩৬৮-৭০ খৃস্টাব্দে চীনের ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজ বংশ মিংরা বিদেশীদের চীনে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত পরিণাম ফল দাঁড়ায় খৃষ্ট ধর্মের অবনতিতে এবং ইসলাম ধর্মের বিস্তৃতিতে। ওসমানী তুর্কীদের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ইসলাম আরো বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অপরাজিত পাশ্চাত্যের জন্য একটি নতুন আশার আলো উদ্ভাসিত হয় এবং এই নতুন আশারই ফলশ্রুতি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লব। স্থলপথ যদি রুদ্ধই হলো, তাহলে খুস্টানরা কেন সমুদ্র পথে এগিয়ে যাবে না? কেন তারা নৌপথে প্রাচ্যে গিয়ে পেছন থেকে মুসলমানদের ধরবে না এবং জেরুজালেমকে এ টেগো হিসাবে জয় করবে না? বড় বড় নাবিকদের মনোভাব তাই ছিলো। তারা তাদের বক্ষদেশে ক্রুশ পরিধান করে সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে বিশ্বাস করতেন যে, তারা পবিত্র ভূমি উদ্ধারের জন্যই সাধনা করছেন। কলোম্বাস ক্যাথের পরিবর্তে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ পেলেও আমরা অন্তত একথা বলতে পরি যে, তার সঙ্গী স্পেনীয়রা খৃষ্ট ধর্মের জন্য একটি মহাদেশ পেয়েছে এবং, পাশ্চাত্য যা স্বপ্নেও ভাবেনি এমন এক পন্থায় অবশেষে ভারসাম্যকে তার অনুকূলে পেয়েছে।
আমরা যদি বৃহত্তর পরিসরের কথা এবং মূল প্রেরণার পর সুদীর্ঘ তৎপরতার কথা বিবেচনা করি তাহলে আমরা মনে করবো না যে, ক্রুসেড ব্যর্থ হয়েছে। এমন কি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসলামের হুমকির বিরুদ্ধে একটি সাধারণ খৃস্টান শক্তিকে রক্ষা করার ব্যাপারে মূল উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রেও ক্রুসেড ব্যর্থ হয়নি। আমরা বলতে পারি যে, ক্রুসেড সেলজুক তুর্কীদের এশীয় সীমানায় নাইসিয়ায় সীমাবদ্ধ রেখে তার অভিযান শুরু করে এবং ওসমানীয় তুর্কীদের খোদ ইউরোপে দানিউরের তীরে সীমাবদ্ধ রেখে তার অভিযান সমাপ্ত করে। আমরা আবার অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে পারি যে, প্রায় পাঁচ শ বছর পর মুসলিম শাসিত এলাকায় পবিত্র স্থানসমূহের একটি ফ্রাঙ্কিশ আশ্রিত রাজ্যসহ সবকিছু যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো সেখানেই শেষ হয়েছে। কিন্তু এলাকাই সবকিছু নয়। মানচিত্রের মানদণ্ডে ক্রুসেড যদি কোন কিছু লাভ করে না থাকে, অথবা রক্ষা করতেও না পেরে থাকে তবুও ক্রুসেড অন্য এমন কিছু লাভ করেছে বা রক্ষা করেছে যা অধিকতর সূক্ষ্ম হলেও কোন অংশে কম বাস্তব নয়। ক্রুসেড মধ্যযুগে পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশ্চাত্য খৃস্টান শক্তিকে রক্ষা করেছে। তাকে আত্মকেন্দ্রিক স্থানীয়তাবাদের কবল থেকে মুক্ত করেছে; তাকে প্রসারতা ও একটি গভীর দৃষ্টি প্রদান করেছে। যে জাতির কোন গভীর দৃষ্টি নাই তা ধ্বংস হয়'; এবং মধ্যযুগের জাতিসমূহের জন্য ক্রুসেডের গভীর দৃষ্টি যা কদাচিত দৃঢ়ভাবে দেখা যায়, এবং সম্ভবত কখনো সামগ্রিকভাবে দেখা যায় না-একটি মুক্তির আদর্শ হিসাবে কোন অংশে কম নয়।
টিকাঃ
১. লেভ্যান্ট, আক্ষরিক অর্থ উদয়, সাধারণভাবে উদয়ের দেশ প্রাচ্য বোঝায় বিশেষভাবে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ পূর্বভূমধ্য সাগর এবং ইজিয়ান সাগর এলাকা বোঝায়। অনুবাদক,
১. ১০১৬ খৃস্টাব্দের অবস্থার সঙ্গে খৃষ্টপূর্ব ২০৩-এর অবস্থার কতিপয় সামঞ্জস্য রয়েছে। রোমানরা যখন প্রাচ্যে তৎপর হতে শুরু করে তখন তাদেরও তিনটি শক্তির মোকাবেলা করতে হয়--গ্রীস ও বসফরাস পর্যন্ত উত্তর ঈজিয়ানে ক্ষমতাসীন মেসিডোনিয়ান সাম্রাজ্য, এশিয়া মাইনরের সেলিউসিড সাম্রাজ্যের এবং মিসরের টলেমী সাম্রাজ্য। অপরদিকে মৌলিক পার্থক্যও ছিলো। রোমানরা এসেছিল একটি নতুন ও পৃথক জগতে। আর একাদশ শতকের ফাঙ্করা বাইযেন্টিয়ামে যাদের সাক্ষাৎ পেয়েছে তাদের উন্নতির ধারা পৃথক হলেও ঐতিহ্যগতভাবে-উভয়ের মিল ছিলো। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাবো যে, তারা সিরিয়া ও মিসরের মুসলমানদের কাছ থেকে যতটা শিক্ষা লাভ করেছে সম্ভবত তার চাইতে বেশি শিক্ষালাভ করেছে বাইযেন্টাইনদের কাছ থেকে।
১. প্রফেসর বেকার, কেম্ব্রিজ মিডিয়েভ্যাল হিস্টরি, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯০। ২. ১০৮৬ খৃস্টাব্দে আলমোরাভিডদের নতুন অভিযানের ফলে তাঁর অগ্রগতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়, কিন্তু এই বাধা সাময়িক বলে প্রমাণিত হয়।
১. প্রথম ক্রুসেডে অংশগ্রহণকারী ন্যান নেতা। -অনুবাদক।
১. স্টারস এর লেকচার্স অন মেডিয়ীভ্যাল এণ্ড মডার্ন হিস্টরির সাইপ্রাস সংক্রান্ত দুটি ভাষণ দ্রষ্টব্য। ২. মধ্যযুগে জেরুজালেমে রুগ্ন ও অভাবগ্রস্ত লোকের সেবার উদ্দেশ্যে গঠিত একটি সামরিক ধর্মীয় সম্প্রদায়। অনুবাদক। ৩. এককভাবে কোন জাতির আওতাধীন একটি সমুদ্র যা অন্য কারো জন্যে উন্মুক্ত নয়। অনুবাদক
১. ৩য় খণ্ড, কুলটুরগ্যাচিট্টে ভেসমিটেলটার্স, বুক ৭, বিশেষত পৃ. ৪৯৮-৫০০। ২. সামন্ত যুগে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি শ্রেণী, যথা-যাজক, অভিজাত ও বুর্জোয়া শ্রেণী। পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিকরা চতুর্থ শ্রেণী হিসাবে গণ্য হয়। অনুবাদক ৩. বার্লিন, ১৮৮৩, পাঁচ খণ্ডে যার মধ্যে চতুর্থ খণ্ড (অর্থনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে) ও পঞ্চম খণ্ড (সংস্কৃতির ইতিহাসে ক্রুসেডের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে) বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। ৪. এই ল্যাটিন কথাটির অর্থ হচ্ছে, এর পরে, কাজেই এর ফলে তর্কশাস্ত্রে একটি ঘটনার পরে আর একটি ঘটনা ঘটলে সেটি অবশ্যই প্রথমোক্তটির ফল-এরূপ ভ্রমাত্মক যুক্তি। -অনুবাদক
১. পৃ. ৪৫২, ন্যায়বিচারের খাতিরে একথা অবশ্যই বলা দরকার যে, প্রুট্স স্বীকার করেন যে, 'সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক জীবনের ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ পৃথক পদ্ধতির উদ্ভব হয়।' ২. পিয়ের আবেলার্ড (১০৭৯-১১৪২), ফরাসী পণ্ডিত, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ। - অনুবাদক ৩. ল্যাটিন কথাটির আক্ষরিক অর্থ, খালি টেবলেট; পরিষ্কার মন, অভিজ্ঞতার দ্বারা ধারণা সৃষ্টির আগের মন।- অনুবাদক
১. তীর্থযাত্রী ও যীশু খৃস্টের সমাধিগৃহ রক্ষার জন্য ১১১৮ খৃস্টাব্দে জেরুজালেমে ক্রুসেডারগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মীয় সামাজিক সম্প্রদায়। -অনুবাদক
১. আনিসিয়াস মানলিয়াস সেভেরিনাস বোইথিয়াস (খৃ. ৪৮০?-৫২৪২?); রোমান দার্শনিক ও রাষ্ট্রনীতিক।- অনুবাদক ২. তুলনা টি জে ডি বোয়ার, গেশ্চিষ্টে ডের ফিলোসফি ইন্ ইসলাম এবং ই রেনান, আভেররোস এট এল আভের রুইজমে। ৩. অ-খৃস্টান, বিশেষত মুসলমান, এক সময় বাংলায় মুসলমানদের সম্পর্কে ব্যবহৃত হিন্দুদের 'যবন' শব্দের সঙ্গে তুলনীয়। -অনুবাদক
১. কমনেনাস শব্দের বহুবচন; বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের একটি ক্ষমতাসীন রাজ পরিবারের (১০৫৭-৫৯, ১০৮১-৮৫) সদস্যরা এই নামে পরিচিত ছিল।-অনুবাদক
১. মূল আরবী নয়, ফার্সী। ২. কুলটুরগেসচিচটে পৃ. ১৯৪। ৩. এ ধরনের একটি প্রাথমিক টাওয়ার বিশেষ করে সেটি যখন দ্বারদেশে কিংবা প্রবেশ পথে নির্মিত হয় তখন তা বারবিকান নামে পরিচিত, এবং বলা হয়ে থাকে যে এই শব্দটি আরবী (বা ফার্সী) শব্দ থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ 'প্রাচীরের উপর ঘর' কিংবা 'তোরণ-গৃহ'। (দ্রষ্টব্য এন, ই, ডি সাবভোস)
১. একটি অপ্রচলিত সামরিক সরঞ্জাম, যা ভারী পাথর ও অন্যান্য নিক্ষিপ্ত বস্তু নিক্ষেপে ব্যবহৃত হতো।-অনুবাদক ২. তোরণ ও প্রাচীরে আঘাত হানার জন্য ভারী কাষ্ঠদণ্ড ও লোহার ছুঁচালো অগ্রভাগ সমন্বিত একটি প্রাচীন সামরিক যন্ত্র।-অনুবাদক, ৩. মূলত সিরিয়া ও তার আশেপাশের ভবঘুরে উপজাতীয় লোক, পরবর্তীকালে আরবদের এবং বিশেষত ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী যে কোন মুসলমানকে এই নামে অভিহিত করা হতো। অনুবাদক
১. মসলিনের সঙ্গে মসলিন তৈরি কেন্দ্র ঢাকা ইতিহাস প্রসিদ্ধ। এক্ষেত্রে ঢাকাই মসলিন সম্ভবত মসুল হয়ে পাশ্চাত্যে যেতো, এবং লেখক হয়তো তাই বলতে চেয়েছেন। অনুবাদক।
১. প্রুট্স অপ সিট, পৃ ৪১১, ধারণা করেন যে, (কিন্তু তিনি স্বীকার করেন যে, এটি ধারণা। আরব্য প্রভাবের ফলেই পাশ্চাত্যে বহু ছোট ছোট খিলানের সমবায়ে গঠিত অশ্ব-নাল খিলান ও অর্ধ-বৃত্তাকার খিলান প্রবর্তিত হয়েছে এবং এটি সিঙ্কফয়ল্ ও পাথরের উপর বিভিন্ন ধরনের কারুকার্য সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে। ২. গোলাকার 'টেম্পল' গির্জাগুলি (যার মধ্যে চারটি ইংল্যান্ডে এবং যার সন্ধান ফ্রান্স, স্পেন এবং জার্মানীতেও পাওয়া যেতে পারে।) সেপালচার গির্জা এবং জেরুজালেমের 'টেম্পলের' একটি ইচ্ছাকৃত অনুকরণ-এগুলি কোন কোন পাশ্চাত্য গির্জার ল্যাবিরিন্থস' বা 'চেমিনস ডি জেরুজালেম'-এর কিংবা প্রুশিয়ার টিউটনিক অর্ডারের কোন কোন শহরের 'জেরুসালেমস'-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ৩. রিলিফে খোদাই করা কিংবা আঁকা ফুল, পত্রগুচ্ছ, জ্যামিতিক চিত্র প্রভৃতির একত্র সন্নিবেশিত একটি জটিল ও সূক্ষ্ম ডিজাইন, যা' বিশেষভাবে মূরীয় স্থাপত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। -অনুবাদক।
১. পশ্চিম ইউরোপে আরব বিজ্ঞান সম্পর্কিত এক নিবন্ধ (আইসিসে মুদ্রিত, ৭ম খণ্ড, পৃ.৩) প্রফেসর সি এস হাস্কিন্স মন্তব্য করেন, খৃস্টান ইউরোপে আরব বিজ্ঞান প্রচারে ক্রুসেড বিস্ময়করভাবে অত্যন্ত নগণ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। ২. প্রফেসর হাসকিন্স (অপ, সিট) জে কে রাইটের জিওগ্রাফিক্যাল লোর অব দি টাইম অব দি ক্রুসেস্ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'ক্রুসেড যদি খৃস্টান ইউরোপের ভৌগোলিক জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করে থাকে তবে তা আরব ভূগোলবিদদের রচনার সংস্পর্শের চাইতে প্রকৃত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই করেছে,' যে অভিজ্ঞতা মধ্যযুগে পাশ্চাত্যের কাছে অপরিজ্ঞাত ছিলো।
১. ভন সাইবেলের গেস্টিটে সে আর্সটেন ক্রুয়েযযুগস দ্রষ্টব্য।
১. ডি স্যাঙ্কটিস, স্টোরিয়া চেল্লা লিটারেচুরা ইটালিয়ামা ২য়, ১৬১, ১৬৮। ২. ট্স্ মন্তব্য করেন (অপ সিট. পৃ ৪৯৪) যে, প্রাথমিক ক্রুসেডারদের যে গেস্টা একসময় অতৃপ্ত আগ্রহের সৃষ্টি করে ক্রুসেডের শেষের দিকে তাতে ভাটা পড়ে। একটি এক্সজামপ্লা বা উপদেশমূলক গল্প সংকলনের রচয়িতা জেমস্ অব ভিটি (১২৪০) লক্ষ্য করেছেন যে, লেখকদের কাছে ক্রুসেডের বিষয় ছাড়া অন্য যেকোন বিষয় অধিকতর আকর্ষণীয় ছিলো। ৩. প্রুট্স মনে করেন (পৃ ৪৫০) যে, একটি ভারতীয় ধারাবাহিক গল্প (কালিলা এণ্ড ডিমনা সম্ভবত ক্রুসেডের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপে আসে। তিনি আরো বলেন যে, উভেয়ারগণ তাদের গাথা কাব্য প্রাচ্যের উপাদান সংযোজিত করেন এবং প্রাচ্যের গল্প-কাহিনী ও উপকথা বোকাক্কিও এবং ইটালীয় ঔপন্যাসিকগণ তাদের মাধ্যমেই লাভ করেন।
১. সম্ভবত আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাশ্চাত্যের সঙ্গীত ক্রুসেডের যুগে কিছু পরিমাণে প্রাচ্যের সঙ্গীতের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
১. আলবিজেনসীয় নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক; আনু. ১০২০-১২৫০ খৃস্টাব্দে তারা ফ্রান্সের দক্ষিণে বসবাস করতো এবং ধর্মদ্রোহিতার জন্য শেষ পর্যন্ত তাদের নির্মূল করা হয়। -অনুবাদক।
১. কার্টেলিয়েরি, ফিলিপ দি সেকেন্ড অগাস্ট, ২য় খণ্ড, পৃ৮৫। পৃ. ৫ থেকে পরের দিকে এ বিষয়ের একটি পূর্ণ বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
১. পেরেগ্রিনেটক্স সম্পর্কে প্রুস্ (অপ সিট পৃ. ৪৭০) এবং ইটিনেরা হিরোসলিমিটানা যেমন কর্প, স্ক্রিপ্ট, এক্স ল্যাটিন)-এর সংস্করণসমূহ এবং প্যালেস্টাইন পিলগ্রিম্স টেক্সট সোসাইটির প্রকাশনাসমূহ দ্রষ্টব্য। ২. প্রফেসর এ পি নিউটন কর্তৃক সম্পাদিত ট্রান্স এন্ড ট্রাক্লার্স অব দি মিডল এজেস মিস ইলিন পাওয়ারের 'ক্যাথে পর্যন্ত স্থল পথ উন্মুক্তকরণ সংক্রান্ত অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১. এককালে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় প্রচলিত একটি ধর্ম, যা এই মতবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যে, কেবলমাত্র শামানদের (তান্ত্রিক পুরোহিত) দ্বারাই ভালো ও মন্দের ক্রিয়া প্রভাবিত করা যায়। - অনুবাদক।
📄 ভূগোল ও বাণিজ্য
দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ের ইউরোপ, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার একটি রাজনৈতিক মানচিত্র অংকন করি তাহলে দেখতে পাবো যে, 'বসতিপূর্ণ বিশ্বের' অতি বৃহত্তর যে অংশটিকে গ্রীকরা 'ওইকাউমেন' বলে অভিহিত করতো তা ইসলামী সরকার ও ইসলামী সভ্যতার অধিকারী দেশগুলির দখলে ছিলো। এসব দেশের মধ্যে মজবুত রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে না উঠলেও সাধারণভাবে এমন একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিলো যাতে তাদের অধিবাসীরা এবং মুসলমান অধিবাসীরাই নয়, বরং সকল শ্রেণীর নাগরিকই নিজেদের এক বিশাল সাম্রাজ্যের নাগরিক বলে মনে করতো। এ সাম্রাজ্যের ধর্মীয় কেন্দ্র ছিলো মক্কা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিলো বাগদাদ। মূলত মদীনা থেকে পর্যায়ক্রমিক বিজয় অভিযানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী তিন শতকে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। পশ্চিম দিকে মিসর এবং সুদূর অ্যান্টি-এ্যাটলাস পর্যন্ত আটলান্টিক উপকূলসহ আফ্রিকার সমগ্র উত্তর উপকূল এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আরো দূরে অ্যাস্টরিয়া ছাড়া মসগ্র স্পেন এবং সিসিলি ও ক্রিট দ্বীপগুলি এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সার্ডিনিয়া এবং সাইপ্রাসও মুসলমানদের অব্যাহত অভিযানের আওতায় ছিলো। তেমনি অবস্থায় ছিলো দক্ষিণ ইটালীয় উপকূল, যেখানে বারি প্রভৃতি কতিপয় শহর প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসনাধীনে ছিলো এবং আমাল্ফি ইত্যাদি কতিপয় শহর তাদের প্রভাবাধীনে ছিলো। আরবের উত্তরে আর্মোনিয়া ও দক্ষিণপূর্ব ককেসাসসহ সিরিয়া মুসলমানদের স্থায়ী অধিকারভুক্ত ছিলো। আরো পূর্বে ইরাকসহ মেসোপটেমিয়া এবং তারপর আধুনিক পারস্য ও আফগানিস্তানের সামগ্রিক অঞ্চল তারা অধিকারভুক্ত করে। আবার এসব দেশের উত্তরদিকে ট্রান্নোক্সানিয়াও ইসলামের কর্তৃত্বাধীনে আসে। পশ্চিমে খাওয়ারিজম্ বদ্বীপ অঞ্চল এবং পূর্বে ফারগনার পার্বত্য ও উপত্যকা অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ইতিমধ্যে অষ্টম শতকে সিন্ধু নদ অতিক্রম করা হয়। সিন্ধুদেশসহ এর ভাটি অঞ্চল ইসলামী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে কেবলমাত্র মিসরে আসওয়ানের অক্ষাংশ মুসলমানরা কদাচিৎ অতিক্রম করে।
'আমাদের যুগে ইসলামী সাম্রাজ্য ফারগানার সীমা থেকে খুরাসান, আল-জিবান (মেডিয়া) ইরাক ও আরব হয়ে ইয়ামনের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই পথ প্রায় চার মাসের সফর ছিলো। এর প্রস্থ ছিলো রুম দেশ (বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্য) থেকে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, ইরাক, ফারস্ এবং কিরমান হয়ে ফার্স্ সাগরের (ভারত মহাসাগর) উপকূলবর্তী আল-মনসূরা অঞ্চল পর্যন্ত। এইপথ ভ্রমণ করতে প্রায় চারমাস অতিবাহিত হতো। ইসলামী রাজত্বের দৈর্ঘ বর্ণনা করতে গিয়ে ইতিপূর্বে আমি মাগরিব (উত্তর আফ্রিকা) ও আন্দালুসের (স্পেন) কথা উল্লেখ করিনি, কারণ এটি জামার আস্তিনের মতো। মাগরিবের পূর্বে ও পশ্চিমে কোন ইসলামী রাজ্য নেই। অবশ্য কেউ যদি মিসরের পরে মাগরিবের দেশে যায় তাহলে সুদানের (কৃষ্ণকায়) দেশ মাগরিবের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর উত্তরে রুম সাগর (ভূমধ্য সাগর) এবং তারপর রুম অঞ্চল অবস্থিত।' ভূগোলবিদ ইবন হাউকালের অনুমানিক ৯৭৫ খৃস্টাব্দের লেখা থেকে উপরিউক্ত উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
উপরে বর্ণিত অঞ্চলগুলির সাথে বর্তমানে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির আদৌ কোন মিল না থাকলেও এবং তা বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট হলেও একথা সত্য যে, এই অঞ্চলগুলি ধর্মীয় দিক ছাড়া রাজনৈতিক দিক দিয়েও একটি শক্তিশালী ব্লক ছিলো। অস্ত্রের শক্তিতে এগুলি একতাবদ্ধ হয় এবং তৎকালে জ্ঞাত বিশ্বে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়।
অপর দিকে আমরা যদি ঐ সময়কার খৃস্টান ইউরোপীয় বিশ্বের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা করি তাহলে এই বিশ্ব বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের উপর কতখানি নির্ভরশীল ছিলো তা সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারবো। ঐ সময় ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণে মুসলিম উপকূলসমূহের শাসকদের অধীনে একটি অপ্রতিরোধ্য প্রতিবন্ধকতা গড়ে ওঠে। উত্তর ককেসাস ও পূর্ব ইউরোপে যেসব অর্ধ সভ্য জাতি বাস করতো তারা যতটা খৃস্টান প্রভাবাধীন ছিলো, অন্তত ততোটা মুসলিম প্রভাবাধীনেও ছিলো। কেবলমাত্র ইউরোপের উত্তরে পৌত্তলিক নর্ম্যানরা (উত্তর ইউরোপের অধিবাসী) এ সময় তাদের শক্তি সম্প্রসারণের সূচনা করে, যা দ্বাদশ শতকে ইসলামের একচ্ছত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের অবসানে বিরাট অবদান সৃষ্টি করে।
দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের তীর্থস্থানগুলির তুলনামূলক ভৌগোলিক অবস্থান সম্পূর্ণ পৃথক। খৃস্টান ইউরোপের আদর্শ ধর্মীয় কেন্দ্র জেরুজালেম ৬৩৮ খৃস্টাব্দ থেকে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিলো। কিন্তু মুসলিম বিজয়ের ফলে হোলি সেপালচারে ইউরোপীয় খৃস্টানদের তীর্থযাত্রা বন্ধ হয়নি। আমরা যে সব প্রথম তীর্থযাত্রীর ভ্রমণ কাহিনী পাই তারা হচ্ছেন ফ্রাঙ্ক আরকাল্ল্ফ (আনু. ৬৮০), স্যাক্সন উইলিবান্ড (আনু. ৭২৫) এবং জনৈক বার্নার্ড, যিনি আনু. ৮৭০ খৃস্টাব্দে রোম থেকে তীর্থযাত্রা করেন। নিঃসন্দেহে আমরা কেবল এদের কাছ থেকেই মুসলমানদের দ্বারা বিজিত দেশসমূহের তথ্য পাইনি। এক্ষেত্রে বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের খৃস্টানদের সঙ্গে মিসর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়ায় বসবাসকারী তাদের স্বধর্মীদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
মুসলিম বিশ্বের ব্যাপারসমূহ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। তীর্থযাত্রার কেন্দ্রস্থল মক্কা স্বয়ং মুসলমানদের কাছে একটি কেন্দ্রীয় ভৌগোলিক মর্যাদা লাভ করে। আল্লাহর ঘরে তীর্থযাত্রা বা হজ্জ ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। ইসলামী সাম্রাজ্যের সকল এলাকা থেকে মুসলমানরা এখানে মিলিত হতেন। কাজেই হজ্জ কেবল ধর্মীয় ঐক্যসাধনের একটি শক্তিশালী নিয়ামক ছিলো না, মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে এবং বিশ্বের সকল অংশ সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণে হজ্জ বৈষয়িকভাবেও সাহায্য করে। হজ্জকে কেন্দ্র করে কতিপয় ভ্রমণ নির্দেশক পুস্তিকা সংকলিত হয়। এগুলিতে বিভিন্ন দেশ থেকে মক্কাগমনের পথসমূহের বিভিন্ন কেন্দ্র ও পর্যায় উল্লিখিত হয়। অবশ্য এগুলিতে তৎকালীন জ্ঞাত বিশ্বের অমুসলিম এলাকাগুলি সম্পর্কে জ্ঞানের ও আগ্রহের অভাব ছিলো।
ইসলাম প্রায় সকল দিক দিয়ে খৃস্টান ইউরোপের সাংস্কৃতিক দিগন্তকে সীমাবদ্ধ করার পর প্রায় এক সহস্র বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ইত্যবসরে ইউরোপ নৌপ্রদক্ষিণ করেছে এবং যেসব বাধা তাকে অজ্ঞাত বিশ্বের কথা বাদ দিলেও জ্ঞাত বিশ্বের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেগুলিকে অতিক্রম করেছে। ইউরোপ এর অনেকখানি নিজস্ব শক্তি ও উদ্যোগেই করেছে। কিন্তু যারা এক সময় বিশ্বের হর্তাকর্তা ছিলেন তাদের দ্বারাও ইউরোপ অনেকখানি উপকৃত হয়েছে। তাই ভৌগোলিক জ্ঞান আবিষ্কার ও বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদেরকে তার সাংস্কৃতিক পূর্ব পুরুষ হিসাবে দেখা ইউরোপের উচিত ছিলো। এসব কর্মক্ষেত্রে আমাদের আধুনিক সভ্যতায় ইসলাম যে অবদান রেখেছে তা আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও নৌচলাচলের শব্দভাণ্ডারে বহু মূল আরবী শব্দ থেকে বোঝা যায়। আমাদের প্রকৃত ভৌগোলিক জ্ঞান যে এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত কেবলমাত্র তার ঐতিহাসিক বিকাশ পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই প্রভাবের গভীরতা প্রমাণ করা যায়। কারণ আধুনিক ভূগোল এমন একটি প্রত্যক্ষ ও ঐতিহ্য বর্জিত বিজ্ঞান যেখানে পূর্ববর্তী যুগসমূহের অল্প বিস্তর নির্ভুল প্রায় সব মতামতই বিবেচনার বহির্ভূত রাখে। আমি 'প্রায়' শব্দটি কেন ব্যবহার করেছি তার দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করতে চাই যে, ১৮৪০ খৃস্টাব্দে জউবার্ট যখন তার ইদ্রিসীর ফরাসী অনুবাদের সম্পাদনা করেন তখন এই সংস্করণের দ্বারা বিশ্বের ভৌগোলিক জ্ঞান এবং বিশেষ করে আফ্রিকার জ্ঞান বৃদ্ধি পেতে পারে এমন কথা চিন্তা করা হয়নি।
আমাদের বিশ্ব-জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের ইসলামী সংস্কৃতির পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক প্রভাব পর্যালোচনা কিছুটা দুঃসাধ্য। কারণ, মুসলমানদের ভৌগোলিক জ্ঞান কতোটা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভরশীল ছিলো, তারা ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলেন এবং তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিস্তার কতটা ছিলো, এগুলি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সবসময় সহজ নয়। নবম শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত এক উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক রচনা আরবীতে প্রকাশিত হয়। তাই উপরোক্ত বক্তব্য বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এই রচনার প্রধান অংশ জ্ঞানী ও সাহিত্যিকদের সরকারী বিজ্ঞান মাত্র। এসব লেখক যেসব অঞ্চলে ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রমণ করেছেন, সেগুলি সম্পর্কে যতবেশি পর্যবেক্ষণশীল হোন না কেন, এবং যেসব পর্যটক ও নাবিকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তাদের কথা যত মনোযোগ সহকারেই শ্রবণ করুন না কেন, তারা তখনো কমবেশি আদর্শগত ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত মতামতের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। এই অবস্থায় 'অন্ধকার যুগের' খৃস্টান পণ্ডিতদের চাইতে তাদের মতামত অনেক বেশি সংস্কারমুক্ত থাকলেও কতিপয় বাস্তবকে তারা সত্যিকার আলোকে দেখতে পাননি। এই সরকারী ও সাহিত্যমূলক বিজ্ঞান ছাড়াও এসময় সমুদ্র ভ্রমণকারী ও বণিকদের বিরাট নৌ ও ভৌগোলিক অভিজ্ঞতা ছিলো। সাহিত্যিকরা অবশ্যই এদের জ্ঞানের দ্বারা লাভবান হন। কিন্তু কোন কোন সময় তাদের নিজস্ব লেখা থেকে দেখা যায় যে, যেসব ব্যবসায়ী ও নাবিক ততোটা দাম্ভিকতার আশ্রয় গ্রহণ করেননি তারা লেখকদের চাইতেও বেশি সংস্কারমুক্ত ছিলেন। বর্তমানে আমরা এই অপেক্ষাকৃত বিনয়ী লোকদেরই ইসলাম ও মধ্যযুগীয় ইউরোপের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান আপোসকারী ও শিক্ষক হিসাবে বিবেচনা করবো। বড় বড় আরবী ভৌগোলিক রচনা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত ভৌগোলিক ক্ষেত্র ছাড়া মধ্যযুগীয় ভৌগোলিক মতামতের ক্ষেত্রে কার্যত তাৎক্ষণিক কোন প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয় না।
আমরা অবশ্য আরবী সাহিত্যে মুসলমানদের বিরাট ভৌগোলিক জ্ঞান কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার পর্যালোচনা পরিহার করবো না। ইসলামের প্রথম ১৫০ বছরে বিজ্ঞান হিসাবে ভূগোল, আমরা খৃস্টান জগতে যা লক্ষ্য করেছি তার চাইতে নিশ্চয়ই উন্নত ছিলো না। মহানবীর সমসাময়িক লেখকদের উক্তিতে বিশ্বের দৈর্ঘ, অংশসমূহ নীলনদের উৎস এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে অদ্ভুত মতামত পাওয়া যায়। এসব মতামতের মধ্যে একটিতে পৃথিবীকে একটি পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যার মাথা হচ্ছে চীন এবং লেজ হচ্ছে আফ্রিকা। কুরআনে দুবার ভৌগোলিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্ একটি অনতিক্রম্য বাধার সাহায্যে দুটি সমুদ্রকে পৃথক করেছেন (২৫.৫৫; পাতা ১৯,২০)। পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই উক্তিকে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরসহ ভারত মহাসাগরের প্রতি ইঙ্গিত বলে অভিমত প্রদান করেছেন এবং তাদের এই বিশ্লেষণ সম্ভবত সত্য। দুই সমুদ্রের এই মতবাদ যে মূলত পারসিক, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুরআনে উল্লিখিত হওয়ায় এই মতবাদটি ধর্মীয় বিশ্বাসে উন্নীত হয়েছে এবং মুসলমানদের সর্বপ্রকার ভৌগোলিক রচনায় ও মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যায় এটি বহুল পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করেছে।
গ্রীকদের প্রভাবেই ইসলামে ভূগোলের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা শুরু হয়। নবম শতকের শুরুতে বিশেষ করে খলীফা আল মামুনের রাজত্বকালে (৮১৩-৩৩) গ্রীক রচনাবলীর যে ব্যাপক অনুবাদকার্য শুরু হয় তাতে মুসলমানরা গ্রীক সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী হয়ে পড়েন। এর একটি ফলশ্রুতি হচ্ছে টলেমীর ভৌগোলিক রচনার সঙ্গে তাদের পরিচিতি। টলেমীর আফ্রিকার পূর্ব উপকূলকে প্রাচ্যের দিকে সম্প্রসারিত করার মতবাদ দুই সমুদ্রের মতবাদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। টলেমীর রচনার প্রাথমিক আরবী অনুবাদ আমরা পাই নি, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল খারেজমী ৮৩০ খৃষ্টাব্দের দিকে এর যে পরিবর্তিত সংকলন প্রণয়ন করেন তা পাওয়া যায়। কিন্তু এর সঙ্গে আবশ্যিকভাবে যে মানচিত্র ছিলো তা নেই। আল খারেজমীর অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাগুলি অনেকাংশেই টলেমীর অনুরূপ, কিন্তু তাঁর গ্রন্থে মুসলিম বিজয়ের পর যেসব স্থানের সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলির ভৌগোলিক অবস্থানও দেয়া হয়েছে। এই শেষোক্ত তথ্যগুলো জোতির্বিজ্ঞানের নতুন পর্যবেক্ষণের ফল কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমরা শুধু এটুকু জানতে পারি যে, খলীফা আল মামুন সিরীয় মরুভূমিতে একটি ভৌগোলিক ডিগ্রী পরিমাপ করার নির্দেশ দেন এবং একই খলীফার নির্দেশ আল-খারেজমীসহ সত্তরজন পণ্ডিত ব্যক্তি 'পৃথিবীর একটি প্রতিমূর্তি' তৈরি করেন, যার বর্ণনা পরবর্তীকালের একটি রচনায় এখনো পাওয়া যায়। কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি যে, আল-খারেজমীর গ্রন্থে ইতিমধ্যে মুসলিম পণ্ডিতদের গবেষণার ফল অন্তর্ভুক্ত হয়। তদুপরি এতে অন্যান্য প্রভাবেরও প্রমাণ পাওয়া যায়, যেমন বসতিপূর্ণ বিশ্বকে সাতটি অঞ্চলে বা আবহাওয়ায় বিভক্তিকরণ, যা টলেমীর লেখায় দেখা যায় না। সাতটি আবহাওয়ার মতবাদের প্রমাণ নিঃসন্দেহে গ্রীক পণ্ডিতদের মধ্যেও, সম্ভবত সুপ্রাচীন ইরাটস্থনিসের আমলে পাওয়া যায়। অবশ্য এটিও সম্ভব যে, বসতিপূর্ণ বিশ্বের বিভাগ সম্পর্কিত এই মতবাদ মূলত পারসিক-ব্যবিলনীয়, এবং হয়ত একারণেই মুসলমানদের ভৌগোলিক রচনায় এদের স্থান প্রাধান্য লাভ করেছে। মুসলমানরা গ্রীকের চাইতে প্রাচ্য ঐতিহ্যকেই বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।
কিন্তু মুসলিম বিশ্বে টলেমীর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের যে ধারণাও প্রবেশ করেছিলো তার সঙ্গে নতুন ইসলামী রাজত্বের নাগরিকরা বিশ্ব সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করে তার তেমন কোন সামঞ্জস্য ছিলো না। পৃথিবীর গোলাকৃতিতে তাদের কোন অপত্তি ছিলো না- যা ঐ সময় বহু খৃস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ স্বীকার করতেন না-কিংবা এই মতবাদকে সমর্থন করার প্রয়োজনীয়তাও তারা বোধ করেননি। এতদ্বারা এ সত্যই প্রকাশ পাচ্ছে যে, ইসলামী ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অচিরেই নিজস্ব পথ অনুসরণ করে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-ফারগানী (আনু. ৮৬০), আল বাত্তানী (আনু. ৯০০), ইবনে ইউনুস (আনু. ১০০০) ও মহান আল বিরুনী (আনু ১০৩০) সাতটি আবহাওয়া বিভাগের নীতি অনুসরণ করে দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের ভৌগোলিক তালিকা দিতে থাকেন। কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে খুব সামান্য তথ্যই দিতে পেরেছেন, কিংবা আদৌ কোন তথ্যই দিতে পারেন নি। এ ধরনের তথ্য বিভিন্ন দেশের একটি বর্ণনা ও ভ্রমণবৃত্তান্তসমূহ থেকে পাওয়া যায়, যা সাম্রাজ্যের প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিলো। এগুলির মধ্যে মক্কা ভ্রমণের বৃত্তান্তের কথা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নবম শতকের মধ্যেই 'দেশ সম্পর্কে বই' কিংবা 'রাস্তা ও রাজ্য সম্পর্কে বই' প্রভৃতি শিরোনামে বিভিন্ন দেশের কতিপয় বর্ণনা পাওয়া যায়। ঐ যুগের প্রধান প্রধান লেখক হচ্ছেন ইবনে খুররাদাজবেহ (আনু. ৮৭০), আল ইয়াকুবী (আনু. ৮৯০), ইবনুল ফকিহ (আনু. ৯০৩) এবং ইবনে রুস্তা (আনু. ৯১০)। তারা কমবেশি সুবিন্যস্তভাবে ইসলামের আওতাভুক্ত বিভিন্ন দেশের একটি প্রশাসনিক ও স্থানের বৃত্তান্তমূলক বিবরণ প্রদান করেন। এতে ভ্রমণ পথ সংক্রান্ত বিবরণ বিশেষ প্রাধান্য পায়। এসব রচনায়- দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ এবং বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের ন্যায় অমুসলিম দেশগুলির প্রতি এখনো বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করা হয়। অপরদিকে এগুলিতে সর্বপ্রকার রূপকথার কাহিনীও বিরাটভাবে স্থান পায়। সমুদ্র-কাপ্তান সিরাফের সুলাইমানের ভারতে ও চীনে সমুদ্র ভ্রমণের বিবরণীও এই যুগের অন্তর্ভুক্ত।
দশম শতকে আমরা ভৌগোলিক রচনা বিকাশের একটি পর্যায় দেখতে পাই, যা মুসলমানদের ভৌগোলিক মতামতের উপর একটি স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে। এসব গ্রন্থের বক্তব্য অনেকখানি পূর্ববর্তী রচনাসমূহের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলি ইতিমধ্যে মুসলিম দেশগুলি থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার দ্বারা সমৃদ্ধ। এযুগের অধিকাংশ গ্রন্থকার স্বয়ং ভ্রমণকারী ছিলেন। এই নতুন ভূগোলচর্চা পূর্ববর্তী যুগের ভূগোল চর্চা থেকে পৃথক ধরনের ছিলো; কারণ এতে যেসব দেশ ইসলামের আওতায় ছিলো না সেগুলি সম্পর্কে খুব সামান্যই উল্লেখ করা হয় এবং ভৌগোলিক বিষয়ের ধারাবাহিক আলোচনার সঙ্গে কতিপয় মানচিত্রও দেওয়া হয়। বক্তব্য বিষয় মানচিত্রেরই বর্ণনামূলক।
এসব মানচিত্রের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে বিশ্বের একটি মানচিত্র। এর আকার গোল, এবং কেন্দ্রস্থল মক্কা। পৃথিবী 'বেষ্টনকারী মহাসমুদ্র' দ্বারা বেষ্টিত, যেখান থেকে দুটি উপসাগর এমনভাবে মহাদেশে প্রবেশ করেছে যাতে এক জায়গায় অর্থাৎ সুয়েজ যোজকে তারা পরস্পরের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছে। কুরআনের ইঙ্গিত অনুযায়ী এই দুটি উপসাগর হচ্ছে ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর (রুম সাগর ও ফারস সাগর)। বিশ্ব মানচিত্রের পর আরব দেশকে বিশ্বের কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর উত্তর আফ্রিকা, মুসলিম স্পেন, মিসর ও সিরিয়ার বর্ণনা রয়েছে। এই অংশ রুম সাগরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত করা হয়েছে। ভৌগোলিক বর্ণনার দ্বিতীয় অংশে মুসলিম প্রাচ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এবং তা মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে ট্রান্সঅক্সানিয়ায় শেষ করা হয়েছে।
যে প্রথম গ্রন্থকার এ ধরনের একটি ভৌগোলিক পুস্তিকা প্রণয়ন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় তিনি হচ্ছেন আবু যায়েদ আল-বলখী (মৃ. ৯৩৪)। তিনি খুরাসান ও ট্যান্সঅক্সানিয়ায় ক্ষমতাসীন সাসানীয় রাজবংশের (৮২২-৯৯৯) দরবারে একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন। আল-বলখী উজীর আল-জায়হানির অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন, যিনি নিজেও একইভাবে একটি বিরাট ভূগোল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর বিষয়বস্তু ইউরোপের কাছে অপরিচিত। বন্ধীর গ্রন্থটিও সংরক্ষিত হয়নি, কিন্তু কয়েকটি প্রধান ভৌগোলিক গ্রন্থ তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থারই বিশ্লেষণ। এগুলি হচ্ছে আল ইস্তাখ্রী (আনু. ৯৫০) ও ইবনে হাউকালের (আনু. ৯৭৫) গ্রন্থ, এবং কিছুটা অধিকতর স্বাধীনভাবে রচিত আল-মান্দিসীর (আনু. ১৮৫) রচনা। খুব সম্ভব এই ভৌগোলিক চর্চা আংশিকভাবে সাসানীয় আমল থেকে প্রচলিত প্রাচীনতর পারস্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ভারত মহাসাগরকে 'ফার্স সাগর' নামকরণ তারই ইঙ্গিত বহন করে। মানচিত্রগুলি অবশ্যই স্পেনীয় মঙ্ক বীটাস (আনু. ৭৩০-৯৮)-এর বিশ্ব মানচিত্রের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যে সব মানচিত্র ঐ সময় ইউরোপে প্রচারিত হয় সেগুলির তুলনায় ভৌগোলিক বাস্তবতার অধিকতর সঠিক ধারণা প্রদান করে। জীবন্ত জিনিসের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হওয়ায় আমরা এসব মানচিত্রে কখনো মানুষ ও জীব-জন্তুর ছবি দেখতে পাই না। ছবি যুক্ত হওয়ায় হারফোর্ডের মানচিত্রসহ অধিকাংশ ইউরোপীয় মানচিত্র আরো অধিক অদ্ভুত দেখায়। কিন্তু অপর দিকে দশম শতকের ইসলামী মানচিত্রগুলোতে আমরা ইতিমধ্যেই গতানুগতিকভাবে উপকূল রেখা ও নদ-নদী প্রদর্শনের একটি প্রবণতা দেখতে পাই। তাই ইসতাখ্রীর বহু মানচিত্রে বৃত্তাকারে কিংবা উপবৃত্তাকারে ভূমধ্যসাগরকে দেখানো হয়েছে।
এ সময়কার ভৌগোলিক ধরনের অন্যান্য রচনায় কেবলমাত্র বিশেষ অঞ্চলের বিষয় আলোচিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত হচ্ছে আল-হামদানির আরব উপদ্বীপের বর্ণনা এবং আল-বিরুনীর ভারত সংক্রান্ত বিখ্যাত বর্ণনা। এজাতীয় কিছু কিছু রচনা আমরা অবিকলভাবে পাইনি; কিন্তু পরবর্তী সঙ্কলনগুলি থেকে তা জানা যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ভল্লা বুলগেরিয়ানদের দরবারে ৯২১ খৃস্টাব্দে খলীফা আল-মুক্তাদির কর্তৃক প্রেরিত দূত ইবনে ফালান কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্ট উল্লেখযোগ্য। আল-মাসূদীর রচনা এক্ষেত্রে বিশেষ স্থান দখল করেছে। তিনি মুসলিম বিশ্বের একজন বিশ্ব পর্যটক ছিলেন। এসব সফরে তিনি বহু ভৌগোলিক ও জাতিতত্ত্বমূলক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁর বহু রচনার মধ্যে দুটি ১৫৬ খৃস্টাব্দে সমাপ্ত হয়, এবং সংরক্ষিত আছে। ভৌগোলিক বিষয়গুলিতে পদ্ধতির অভাব সুস্পষ্ট হলেও এগুলি এ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলিতে 'রাজকীয়' ইসলামী ভূগোল ও ভ্রমণকারী ও নাবিকদের স্বাধীন ভৌগোলিক ধারণার বিরাট পার্থক্য চোখে পড়ে। যেমন এক জায়গায় ভারত মহাসাগরের বিস্তৃতি সম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতদের প্রচলিত মতামতের বিবরণ দেওয়ার পর লেখক এরূপ মন্তব্য না করে পারেন নি যে, পারস্য উপসাগরের বন্দরসমূহের যেসব নাবিক এসব সমুদ্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তারা পণ্ডিতদের পরিমাপ সম্পর্কে আদৌ একমত হননি। এমনকি তাঁরা এরূপ দাবি করেন যে, কোন দিকে এসব সমুদ্রের আদৌ কোন সীমা নেই। এই অভিমত প্রচলিত বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত, সেখানে বলা হয় যে, ফারস্ সাগর 'পরিবেষ্টনকারী মহাসাগরের' একটি উপসাগর এবং ভূমধ্যসাগরের ন্যায় এর একটি সঙ্কীর্ণ প্রবেশ পথ রয়েছে। উপরোক্ত গ্রন্থকার আল-মাকদিসী ভারত মহাসাগরের আকারের বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে একইভাবে বলেন যে, কোন কোন লোক এটিকে একটি 'তৈলাসানের' (এক ধরনের অর্ধবৃত্তাকার পারস্য কোট) সঙ্গে তুলনা করেছেন, এবং কেউ কেউ পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন, কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এসম্পর্কে অভিজ্ঞ জনৈক শেখ তার জন্য বালির উপর এই সমুদ্রের একটি আকার অঙ্কন করেন। 'তৈলাসান' বা পাখি কারো সঙ্গেই এর মিল ছিল না, বরং উপসাগর বা উপদ্বীপের দরুন এটি বিশৃংখলপূর্ণ আকারে পরিপূর্ণ ছিলো। মনে হয় আল-মাসুদী চীন সফর করেছেন এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূল সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। অপর পক্ষে জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোল সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব কম ছিলো বলে মনে হয়, কারণ তার অন্যতম গ্রন্থে আমরা এরূপ অদ্ভুত অভিমত দেখতে পাই যে, একটি আবহাওয়ায় সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ শহর আকস্মিকভাবে একই অক্ষাংশে অবস্থিত থাকবে।'
একাদশ শতকের পূর্ববর্তী শতকের ধারায় অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বলতা নিয়ে অব্যাহত থাকে। এযুগের সর্বাধিক পরিচিত গ্রন্থকার হচ্ছেন, স্পেনীয় মুসলমান আল-বাক্বী (রচনাকাল আনু. ১০৬৭)। তাঁর বিরাটাকার রচনার মধ্যে কেবল মাত্র আফ্রিকা সংক্রান্ত অংশটিই সম্পাদিত হয়েছে। এখানে আমরা আরো বিশদভাবে ভ্রমণপথ নির্দেশক তথ্য, এবং বিশেষভাবে অসংখ্য বন্দর ও উপসাগর সমন্বিত উপকূল রেখার তথ্যাবলী পাই। প্রায় একই সময়ে আমরা পারস্যবাসী নাসির-ই খসরুর একটি ভ্রমণকাহিনী পাই। তিনি খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন এবং মিসর ও মক্কা সফর করেন। এই ব্যক্তি নিজেকে গভীর পর্যবেক্ষণশীল হিসাবে প্রদর্শন করলেও সাধারণভাবে বিশ্বের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত ভুল ধারণা পোষণ করতেন।
একাদশ শতকে এমন কতিপয় ঘটনা ঘটে যা মুসলিম বিশ্বের আদর্শ ঐক্যে গভীর আঘাত হানে। ১০৫০ খৃস্টাব্দের দিকে সেলজুক তুর্কীরা প্রাচ্য অংশ আক্রমণ করে। পশ্চিমে সিসিলি দ্বীপ, স্পেনের এক বিরাট এলাকা, এমন কি আফ্রিকা উপকূলের কোন কোন স্থান খৃস্টান শাসকরা জয় করেন। একই সময়ে ইউরোপ ক্রুসেডের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো। এই সময়েই খৃস্টানবিশ্ব থেকে ইসলামীবিশ্বের সংরক্ষিত বিশেষ সত্তা ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে। ইসলামী বিশ্ব বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তার রাজনৈতিক শক্তি হারায়। অবশ্য একই সেলজুক তুর্কীদের নেতৃত্বে এবং ক্রুসেডের বিরুদ্ধে আইয়ুবীদের তীব্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মাত্র স্বল্পকালের জন্য এই শক্তি ফিরে আসে। এসব ঘটনা মুসলিম লেখকদের রচনায় প্রচলিত ভৌগোলিক মতামতের ক্ষেত্রে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। কেবলমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, আমরা ইবনে হাউকালের প্রায় ১১৬৪ খৃস্টাব্দে একটি ভূগোল গ্রন্থের একটি পরবর্তী উদ্ধৃতাংশে দেখতে পাই যে, বিশ্বের মানচিত্র আর গোলাকার নয়। বরং বসতিপূর্ণ বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিবৃত্তাকার (ডিম্বাকৃতি)।
এসময়কার সবচাইতে দীপ্তিমান লেখক হচ্ছেন ইতিপূর্বে এডিসী নামে অভিহিত আল-ইদ্রিসী। অন্য যে কোন মুসলিম ভূগোলবিদের চাইতে আল-ইদ্রিসীর প্রতি আমাদের দৃষ্টি বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এর প্রথম কারণ হচ্ছে, তিনি দুটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র সিসিলির খৃস্টান শাসক নর্ম্যান রাজা দ্বিতীয় রজারের (১১০১-৫৪) দরবারে কাজ করতেন এবং দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তিনি সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত মুসলিম ভৌগোলিক জ্ঞানের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন। পূর্ববর্তী আরবী ভূগোল গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে আমরা জানতে পারি যে, আল ইদ্রিসী তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু রাজা রজার জ্ঞাত বিশ্বের বর্ণনামূলক একটি গ্রন্থ রচনার দায়িত্ব একজন মুসলমান জ্ঞানীর উপর ন্যস্ত করেছেন, এই বাস্তব সত্য থেকে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ঐ সময় যে কতটা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে তাঁর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এটা সর্বজন বিদিত যে, সিসিলির নর্ম্যান রাজ দরবার অর্ধেক পরিমান প্রাচ্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলো। রজার তাঁর জন্য একটি ভূগোল তৈরির যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তাও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে প্রাচ্য। প্রাচীনকাল থেকে মহামতি আলেকজান্ডার ও কোন কোন পারস্য রাজার ন্যায় বড় বড় রাজার এরূপ বিশেষ অভিলাষ ছিলো যে, বিশ্ব তাদের পদানত তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তাদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হোক। ভূগোলের প্রতি খলীফা আল-মামুনের আগ্রহের পিছনেও এই অভিলাষ সক্রিয় ছিলো, এমন কি দশম শতকে সামানীয় রাজদরবারে যে ভূগোল চর্চার সূত্রপাত হয় তার পিছনেও এই একই কারণ ছিলো। আল-ইদ্রিসী তাঁর ভূমিকায় বলেছেন যে, এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের জন্য রাজা রজার সকল দিকে লোক পাঠান। ঠিক আল-মামুনের ন্যায় তিনিও একটি বিরাট বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করার নির্দেশ দেন। আল-ইদ্রিসীর রচনায়ও বহু মানচিত্র রয়েছে, এবং এই মানচিত্রগুলি একদিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বক্তব্য বিষয় মানচিত্রগুলিরই ভাষ্য। সবচাইতে পরিচিত এর দুটি সংস্করণে সত্তরটি মানচিত্র রয়েছে। (প্রকৃত পক্ষে সবগুলি পাণ্ডুলিপিতে একটি মানচিত্র পাওয়া যায় না)। তিনি মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুকরণে বিশ্বকে যে সাতটি আবহাওয়া অঞ্চলে ভাগ করেন তার প্রত্যেকটি ভাগের এক-দশমাংশের জন্য একটি করে মানচিত্র দেওয়া হয়। সবগুলি মানচিত্র একত্রে সন্নিবেশিত করা হলে এই সত্তরটি মানচিত্র টলেমীয় নমুনায় একটি আয়তাকার চতুর্ভুজের সৃষ্টি করে। কিন্তু এতে দুটি বৃহৎ সাগরের সুনির্দিষ্ট ইসলামী ধারণা সংরক্ষণ করা হয়, যদিও বিস্তারিত বর্ণনায় বিশেষ করে ভূমধ্য সাগরের উপকূল রেখার বর্ণনার পূর্ববর্তী যে কোন ইসলামী মানচিত্রের চাইতে অনেক সুন্দরভাবে বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। আল-ইদ্রিসীর লেখা থেকে পূববর্তী ভূগোলবিদের কাছে তিনি কতটা ঋণী তা বোঝা যায়, এবং রচনাটি সামগ্রিকভাবে বর্ণনামূলক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলের একটি সমন্বয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আল বিরুনীর ন্যায় বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পরিমাপের ফলাফল ব্যবহার করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। কারণ তথাকথিত 'ক্ষুদে ইদ্রিসী' নামে পরিচিত আল-ইদ্রিসীর দ্বিতীয় ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণে আমরা বিষুব রেখার দক্ষিণে সাতটি আবহাওয়ার অতিরিক্ত একটি অষ্টম, আবহাওয়া অঞ্চল দেখতে পাই। তাছাড়া 'বড় ইদ্রিসীতে' অন্যান্য মানচিত্রের আগে যে বিশ্ব মানচিত্র দেখা যায় তা গতানুগতিকভাবে গোলাকার।
এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর যে, যুগ ও ভৌগোলিক বিকাশের দিক দিয়ে ইসলামী ও খৃস্টান সভ্যতার সম্মিলন স্থলে রচিত আল-ইদ্রিসীর গ্রন্থ সিসিলি, ইটালী বা অন্যান্য খৃস্টান দেশের খৃস্টান পণ্ডিতদের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলো। অবশ্য বর্তমানে এর প্রভাবের কোন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। আল-ইদ্রিসীর বলে পরিচিত গ্রন্থের প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৬১৯ খৃস্টাব্দে রোমে। অসমাপ্তভাবে সংক্ষিপ্ত করার পর এটি অনূদিত হয়, এমনকি অনুবাদক লেখকের নামও জানতেন না।
পর্যটকদের বর্ণনামূলক কাহিনী ছাড়া আল-ইদ্রিসীর পরবর্তী ভৌগোলিক রচনা তেমন বড় রকমের মৌলিকত্ব দাবি করতে পারে না। এই সময় বর্ণনামূলক কাহিনীই অধিকতর ব্যাপকতা লাভ করে। এসব পর্যটকের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হচ্ছেন স্পেনীয় ইবনে যুবায়র। তিনি ১১৯২ খৃস্টাব্দে মক্কা ও মেসোপটেমিয়া ভ্রমণ করেন। এক শতাব্দীরও পরে মরক্কোর ইবনে বতুতা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সফর করেন। তিনি আরো পূর্ব দিকে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে যান এবং কনস্টান্টিনোপলও সফর করেন। সর্বশেষ সফরে ১৩৫৩ খৃস্টাব্দে তিনি আফ্রিকার গভীর অভ্যন্তরে যান। অপর একজন ভ্রমণকারী যিনি ১২৫০ খৃস্টাব্দের দিকে বিশ্বের এই অংশের অত্যন্ত মূল্যবান বিবরণী রেখে যান, তিনি হচ্ছেন ইবনে ফাতিমা। তাঁর গ্রন্থ আমরা পাইনি, কিন্তু গ্রন্থকার ইবনে সাঈদ ১২৭৪ খৃস্টাব্দের দিকে এটিকে ব্যবহার করেন। এই সর্বশেষ লেখকের রচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে বিষয়বস্তু আল-ইদ্রিসীর ন্যায় একইভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তার বর্ণনা অতোটা বিস্তারিত না হলেও এতে মুসলমানদের আফ্রিকা সংক্রান্ত জ্ঞান কত গভীর ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তা ছাড়া এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক ভূগোলের এতোটা কাছাকাছি পৌঁছে যে, এতে প্রধান প্রধান শহর ও স্থানগুলির অত্যন্ত সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান দেওয়া হয়েছে। ইবনে সাঈদ সিরিয়ার হামার যুবরাজ আবুল ফিদা সম্পর্কেও অন্যতম প্রধান বিবরণ দাতা। আবুল ফিদার 'দেশসমূহের তালিকা' (১৩২৭) প্রায় ১০০ বছর আগে আল-ইদ্রিসীর পরেই আরবীতে সর্বাধিক পরিচিত ভৌগোলিক রচনা ছিলো। তবে এটি পূর্ববর্তী সূত্রগুলির তুলনায় কিছুটা দুর্বল সংকলন।
আমাদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান সঙ্কলন হচ্ছে ইয়াকুতের বিরাটাকারের ভৌগোলিক অভিধান (১২২৮)। এতে সর্ব প্রকার ভৌগোলিক নাম বর্ণানুক্রমে দেওয়া হয়েছে। ভৌগোলিক দিকের ন্যায় জীবন চরিতের দিক দিয়েও রচনাটি মূল্যবান। গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য ছিলো বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্মস্থান বা বাসস্থানের নাম দেওয়ার পর বংশ পরিচয় ও বর্ণনামূলক অতিরিক্ত নাম প্রদান। আর এক ধরনের রচনা হচ্ছে, আল কাযউইনীর (আনুঃ ১২৭৫) রচনা। তাঁকে আরবী সাহিত্যের প্লিনি বলা হতো। তিনি একটি ভূ-বিবরণ (বিশ্বতত্ত্ব) ও একটি ভূগোল রচনা করেন। শেষোক্ত গ্রন্থে তিনি তার উল্লেখিত স্থানসমূহের বহু অদ্ভুত অতিরঞ্জিত বিবরণ প্রদান করেন। তিনি জার্মান দেশগুলি সম্পর্কেও কিছু কিছু তথ্য প্রদান করেন। অধিকতর উন্নত ও মৌলিক ভূগোলবিদ ছিলেন আল-দিমাল্কী (আনু. ১৩২৫), যদিও তাঁর সাধারণ প্রবণতা আল-কাযউইনীর মতোই ছিলো।
আল-ইদ্রিসীর পরে বহু ইসলামী ভূগোলবিদের আবির্ভাব একথাই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ঐ যুগেও ভূগোল সংক্রান্ত জ্ঞান অত্যন্ত ব্যাপক ছিলো। কিন্তু আমরা আর কোন ভূগোল চর্চা কেন্দ্রের সন্ধান পাই মা। মঙ্গোল আক্রমণের পর চিরদিনের জন্য মুসলিম বিশ্বের সুসম্পূর্ণ ও সাংস্কৃতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। এ কথা সত্য যে, ইতিমধ্যে ইসলামী বিশ্বাস নতুন ধরনের অগ্রগতি লাভ করে এশিয়া মাইনর ও মধ্য এশিয়ায় তুর্কী অভিযান এবং আফ্রিকার অভ্যন্তর ভাগে অধিকতর শান্তিপূর্ণ পন্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে। আরবী ও পারস্য সাহিত্য ঐ সব দেশ সম্পর্কে আমাদের অনেক তথ্য জ্ঞাপন অব্যাহত রাখে। কিন্তু স্বয়ং খৃস্টানরা, এবং প্রথমত ইটালিয়ানরা ইতিমধ্যে ভ্রমণকার্যে ও আবিষ্কারে তৎপর হয়ে ওঠে। চতুর্দশ শতকের জনৈক মিসরীয় লেখক আল উমারী এশিয়া মাইনরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার বক্তব্যের সমর্থনে জনৈক জেনোয়া বাসীর উদ্ধৃতি দেন। এ সময় আমরা কোন একটি দেশ ও তার প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকতর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভৌগোলিক বর্ণনা পাই। কয়েকজন গ্রন্থকার ধারাবাহিকভাবে প্রাথমিক মামলুক যুগের মিসরের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রদান করেন। এগুলির মধ্যে আল-মাকরিযী প্রণীত মিসরের বর্ণনামূলক একটি বিরাটাকার গ্রন্থ (আনু. ১৪২০) সব চাইতে বিখ্যাত।
ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামী ভূগোল সাহিত্য মধ্যযুগে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় সরাসরি তেমন গভীর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয় না। খৃস্টান লেখকগণ কর্তৃক মুসলিম ভৌগোলিক মতামত গ্রহণের দু-একটি প্রমাণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অপাস টেরাই স্যাঙ্কটাই-তে দ্রষ্টব্য বিশ্ব মানচিত্র। ১৩২১ খৃস্টাব্দে ম্যারিনো স্যানুটো এটি প্রণয়ন ও পোপের নামে উৎসর্গ করেন। এই মানচিত্রটি গোলাকার, এর কেন্দ্রস্থল জেরুজালেম এবং এতে সুস্পষ্টভাবে মহাসাগর থেকে দুটি বড় সমুদ্রের উদ্ভব ও পূর্বদিকে আফ্রিকান উপকূলের বিস্তৃতি দেখানো হয়েছে। তাই ক্রুসেডী প্রেরণা পুনরুজ্জীবনে আপোসহীন এই ব্যক্তি যাদের তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন তাদেরই জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম অনুসারী হন।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভৌগোলিক রচনা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই আমরা কিছুটা আলোকপাত করেছি। ভূগোলের চাইতে ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব অনেক বেশি গভীর ছিলো। এদের কোন কোন রচনা প্রাথমিক দিকেই অনূদিত হয়। এক্ষেত্রে প্লাটো অব টিভলী (আনু. ১১৫০) কর্তৃক অনূদিত আল-বাত্তানীর যিজ (রচনাকাল আনু. ১০০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সপ্তম আলফন্সো কর্তৃক বিজিত হওয়ার পর টলোডা ছিলো খৃস্টান জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের প্রধান কেন্দ্র, যেখানে তারা আরবী বিজ্ঞান সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য সকল দেশ থেকে এসে সমবেত হতেন। ভূগোলের ক্ষেত্রে এসব অনুসন্ধানমূলক পর্যালোচনা প্রথমত পৃথিবীর গোলাকৃতির মতবাদকে সজীব রাখার ক্ষেত্রে অবদান সৃষ্টি করে। খৃস্টান জগতের অন্ধকার যুগে এই মতবাদ প্রায় বিস্মৃতির অতলে চলে যায়, এবং এই ধারণা পুনরুজ্জীবিত না হলে আমেরিকা আবিষ্কার অসম্ভব হতো।
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সকলেই মানচিত্র অঙ্কনের আদৌ কোন চেষ্টা না করে কতিপয় নির্দিষ্ট সংখ্যক স্থানের ভৌগোলিক দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ নিরূপণের উদ্দেশ্যেই ভূগোল চর্চা করতেন। সাতটি আবহাওয়া অনুসরণেই তাদের দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের তালিকা তৈরি করা হতো। এই বিজ্ঞানের অধিকতর সাধারণ বৈশিষ্ট্যের দরুন খৃস্টান বিজ্ঞানীরা নিছক ভৌগোলিক রচনার চাইতে এদিকটির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। ফলে দ্বাদশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত তালিকা তৈরি শুরু হয় এবং এতে কোন কোন সময় ভৌগোলিক তালিকাও থাকতো। কোন কোন খৃস্টান বিজ্ঞানী সাতটি আবহাওয়ার বিভাগকেও মেনে নেন। বিশ্বের জ্ঞাত গোলার্ধের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত একটি কেন্দ্র বা 'বিশ্বচূড়া' রয়েছে, এই ধারণা ইসলামের আরো গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। আল-বাত্তানী 'পৃথিবীর এই গম্বুজকে' একটি দ্বীপ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু অপর একজন গ্রন্থকার (ইবনে রুস্তা) ইতিপূর্বেই এটিকে 'আরিনের গম্বুজ' হিসাবে জানতেন। আরিন শব্দটি ভারতীয় শহর উজ্জয়িনীর (টলেমীর ভূগোলে ওযিনি। আরবী অনুবাদের একটি ভুল পাঠ। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি মানমন্দির ছিলো এবং এই শহরেরই মধ্যরেখার উপর মূলত একটি ভারতীয় ধারণা 'বিশ্বচূড়া' অবস্থিত ছিল বলে মনে করা হতো। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ন্যায় তাদের খৃস্টান শিষ্যরাও এই মতবাদকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। শেষোক্তদের মধ্যে একজন ছিলেন বাথ-এর অ্যাডেলার্ড, যিনি ১১২৬ খৃস্টাব্দে আল খারেযমীর ত্রিকোণমিতিক তালিকাসমূহ অনুবাদ করেন। আরো ছিলেন জেরার্ড অব ক্রিমোনা এবং ত্রয়োদশ শতকে রজার বেকন ও আল বার্টাস ম্যাগনাস। ১৪১০ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত আইলীর কার্ডিন্যাল পিটারের ইম্যাগো মুণ্ডি গ্রন্থে পরবর্তীকালেও আরিন (বা আরিম) মতবাদের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থ থেকেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস এই মতবাদ সম্পর্কে অবহিত হন। ইত্যবসরে এই মতবাদের এতোটা বিকাশ হয় যে, তার ভিত্তিতে কলম্বাস বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী একটি নাশপাতির ন্যায় গোলাকার এবং আরিনের চূড়ার বিপরীত দিকে পশ্চিম গোলার্ধেও পূর্বদিকের চূড়ার চাইতে অনেক বেশি উন্নত আরেকটি কেন্দ্র রয়েছে। যাকে ভিত্তি করে নাশপাতির নিচের দিক তৈরি হয়েছে। তাই মুসলিম ভৌগোলিক মতবাদ নতুন বিশ্ব আবিষ্কারে একটি হিস্সা দাবি করতে পারে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আর একটি ক্ষেত্রেও আমরা একই মতবাদের প্রভাব দেখতে পাই। দান্তে মুসলিম ঐতিহ্যের কাছে ঋণী এ কথা বহু দিক দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এটা খুবই সম্ভব যে, দান্তে এই মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে তার পারগেটোরিও পশ্চিম গোলার্ধের পাহাড়ের মত একটি স্থানে কল্পনা করেছেন এবং এই সঙ্গে অত্যন্ত নিপুণভাবে খৃস্টানদের এরূপ প্রাচীন বিশ্বাসকে যুক্ত করেছেন যে, পার্থিব স্বর্গ বিশ্বের পূর্বতম প্রান্তে সমুদ্রের পিছনে (বিটাসের বিভিন্ন বিশ্ব মানচিত্রে যেমনটি দেখানো হয়েছে) অবস্থিত।
মুসলিম নৌচলাচল বিজ্ঞান নবম শতকে চূড়ান্ত বিকাশলাভ করে। কিন্তু এই নৌচলাচল ভারত মহাসাগরে এশিয়া ও আফ্রিকার অমুসলিম অধ্যুষিত উপকূলসমূহের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থেকে প্রধানত গুরুত্ব লাভ করলেও ভূমধ্যসাগরে তা মুসলিম শাসনাধীন এলাকাসমূহেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ খৃস্টান বন্দরগুলির সঙ্গে তখন সম্পর্ক ছিল সামরিক ও আক্রমণাত্মক।
তাই শেষ পর্যন্ত ভারত মহাসাগরই বড় বড় বাণিজ্যিক তৎপরতার ক্ষেত্র হয়ে পড়ে। এর মূল কেন্দ্র ছিল পারস্য উপসাগর। এখানে আল উবুল্লা উপকণ্ঠসহ সিরাক ও বসরার ন্যায় বন্দর এবং ওমান উপকূলের অন্যান্য বন্দর ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই বাণিজ্য ও নৌচলাচলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। অবশ্য ইসলামের আবির্ভাব, বিশেষ করে ইরাকে এর রাজনৈতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এই ব্যবসায়ী উদ্যোগকে আরো উৎসাহিত করে। দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুসলমানদের জাহাজ চীনের খানফু শহরে পৌঁছে, খানফুর বর্তমান ক্যান্টনে ফৌঁছে। ঐ সময় শহরটি একটি উল্লেখযোগ্য মুসলিম উপনিবেশ হিসাবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে পড়ে। এখান থেকে কিছু সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী ও নাবিক আরো দক্ষিণে অগ্রসর হন। সম্ভবত তাঁরা কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কতিপয় গোলযোগের ফলে এই প্রাথমিক বাণিজ্যিক তৎপরতা ৮৭৮ খৃস্টাব্দে বন্ধ হয়ে যায় এবং এতে খানফু বন্দর ধ্বংস হয়। ঐ সময়ের পর থেকে আরবী লেখকদের কাছে কালা নামে পরিচিত এক শহরের পরে নিয়মিত নৌচলাচল সম্প্রসারিত হয়নি। এটি বিশেষভাবে টিন খনির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এর অবস্থান অবশ্যই মালাক্কার পশ্চিম উপকূলে ছিল। কালা রাজনৈতিকভাবে যাবাজের শাসকের অধীনে ছিল। প্রাথমিক আরবীতে জাবা থেকে এই নামটির উদ্ভব হয়। কিন্তু ঐ সময় যাবাজ বলতে প্রথমে সুমাত্রাকে এবং বিশেষভাবে ঐ সময়কার সমৃদ্ধ শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রকে বোঝাতো। এসব অঞ্চলের সঙ্গেই বাণিজ্যিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ইবনে রস্তা (আনু. ৯০০) সুলায়মান (আনু. ৮৫০) এবং তার অনুসারী আবু যায়েদের (আনু. ১৫০) বিবরণী থেকে মনে হয় যে, মুসলিম নাবিকগণ এসব সমুদ্রে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতেন। কিন্তু তারা কোন্ কোন্ সমুদ্রপথ অনুসরণ করতেন বিবরণীতে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। মুসলমানদের জাহাজ একইভাবে শ্রীলঙ্কার (সারানদিব) বন্দরসমূহ এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলেও চলাচল করতো। বোম্বের কাছাকাছি সাইমূর শহরে একটি সমৃদ্ধ আরব উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। সিন্ধুর মুসলিম অধিকৃত এলাকার দাইবুল (দেবল) এসব অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে বাণিজ্যিক তৎপরতা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এখানে তাঁরা দশম শতকের সূচনায় সোনার জন্য বিখ্যাত সুফলা দেশে পৌঁছেন। আফ্রিকান উপকূলের এই অঞ্চলটি মাদাগাস্কারের বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল। মাদাগাস্কার দ্বীপটি মুসলমানদের কাছে ওয়াক্ ওয়াক্ দ্বীপ নামে পরিচিত ছিল।
লেখকরা আরো একটি ওয়াক্ ওয়াক্-এর কথাও উল্লেখ করেছেন যা চীনের বিপরীত দিকে অবস্থিত ছিল এবং বর্ণনা থেকে মনে হয় যে, এটিই ছিল জাপান। এতে ভৌগোলিক লেখার বিবরণীতে গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। নিঃসন্দেহে এই বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে, এরূপ ভৌগোলিক বিশ্বাস যে, আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পূর্ব দিকে চীনের কাছাকাছি কোন এক জায়গায় 'ফারস সাগরের' মুখ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। দেখা যাচ্ছে যে, এই চিরাচরিত মতবাদের দ্বারা সামুদ্রিক কাপ্তানদের জ্ঞান বাধা প্রাপ্ত হয়নি। তাদের সমুদ্র- বিহারের কাহিনী আরবী সাহিত্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে আরব্য রজনীর সিন্দাবাদ নাবিকের বিখ্যাত্ কাহিনীগুলিতে তা এখনো টিকে আছে।
পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘকালব্যাপী নৌচলাচলের যে ধারা গড়ে ওঠে তা পরবর্তীকালে পর্তুগীজ, তুর্কী, বৃটিশ, ওলন্দাজ প্রভৃতি যে সব শক্তি এসব এলাকায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের পথ সুগম করে। ১৪৯৮ খৃস্টাব্দে আফ্রিকা প্রদক্ষিণের পর ভাস্কো ডা গামা আফ্রিকার পূর্ব উপকূল মালিওি পৌঁছলে জনৈক আরব নাবিকই (Pilot) তাকে ভারত গমনের পথপ্রদর্শন করেন। পর্তুগীজ সূত্রে জানা যায় যে, এ নাবিকের কাছে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট সামুদ্রিক মানচিত্র ও অন্যান্য নৌচলাচল সরঞ্জাম ছিল। ঐ সময়কার আরব মহলেরও এই কাহিনী জানা ছিল। তাদের মতে আহমদ ইবনে মজিদ নামে পরিচিত এই নাবিককে নেশাগ্রস্ত করার পরই তাকে দিয়ে পর্তুগীজরা পথ বাতলিয়ে নেয়। সম্ভবত কাল্পনিক এই বিবরণ দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমানরা পর্তুগীজদের আগমনের সুদূর প্রসারী পরিণতি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এই আহমদ ইবনে মজিদ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, দক্ষিণ চীন সমুদ্র এবং পূর্ব 'ভারতীয় দ্বীপাঞ্চলের নৌচলাচল ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন বলেও জানা যায়। স্যার আর এফ বার্টনের একটি বিবরণ অনুযায়ী এও দেখা যায় যে, ইবনে মজিদকে এর পূর্ববর্তী শতকে আফ্রিকান উপকূলে কম্পাসের আবিষ্কারক হিসাবে শ্রদ্ধা জানানো হতো।
প্রথম দিকের আব্বাসীয় খলীফাগণ সুয়েজ যোজক ভেদ করার কথা চিন্তা করেন। কিন্তু ক্রুসেডের পর থেকে যেভাবে চিন্তা করা হয়েছিলো তেমনিভাবে কখনো চিন্তা করা হয়নি যে, এ ধরনের উদ্যোগ ইসলামের জন্য এক বিরাট বিপদ হয়ে দেখা দেবে। তাই ভূমধ্যসাগরে মুসলিম নৌচলাচল প্রাচ্য সমুদ্রের নৌচলাচল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্য মুসলিম বন্দরগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
খলীফা হযরত উমর (রা)-এর আমল থেকেই খৃস্টান দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক মুসলমান ও খৃস্টান উভয় পক্ষ থেকেই তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এর ফলে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর এবং অন্যান্য বহু প্রাচীন সামুদ্রিক বন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তিউনিস উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনীয় বন্দরগুলির মধ্যে নৌচলাচলের নতুন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। খৃস্টানদের কাছে মুসলিম নাবিকরা প্রায়ই জলদস্যু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এবং এ কথা খৃস্টান নাবিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
ক্রুসেডের শুরু থেকে ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের নৌচলাচলের প্রায় একক প্রধান্যের অবসান ঘটে। স্পেনের একটি বিরাট অংশ, সিসিলি দ্বীপ এবং ইটালীয় উপকূলের অধিকৃত এলাকা মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। একই সময়ে ইটালীয় সমুদ্র বন্দর জেনোয়া ও পিসার বিকাশ শুরু হয়। ১১৯২ খৃস্টাব্দে পর্যটক ইবনে জুবায়র একটি খৃস্টান জাহাজযোগে সিউটা থেকে আলেকজান্দ্রিয়া গমন করে। নৌচলাচলে একক প্রাধান্যের এই পরিবর্তন বাস্তবে অপেক্ষাকৃত কম হিংসাত্মক ছিল। অবস্থা কেবল এটুকুই দাঁড়ায় যে, যে খৃস্টানরা এর আগে মুসলিম নিয়ন্ত্রণাধীনে নিছক নাবিক বা ক্রীতদাস হিসাবে নৌচলাচলের সংশ্লিষ্ট ছিল তারা এখন পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভ করে এবং নিজস্ব কর্তৃত্বেই নৌচলাচল ও বাণিজ্য করে। আধুনিক আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের শব্দকোষে এডমিরাল, ক্যাল, অ্যাভারেজ, শ্যালপ (স্লপ), বার্ক এবং ভারত মহাসাগরের নৌচলাচলের বিশেষ ভাষা মনসুন¹ প্রভৃতি বহু শব্দ এককালে সমুদ্রে মুসলমানদের একক প্রাধান্যের ইঙ্গিত বহন করে।
নাবিক ইবনে মজিদের প্রসঙ্গে কম্পাসের কথা ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে। এই ব্যক্তি তাঁর রচনায় নিজেই অনুমান করেন যে, কম্পাসের আবিষ্কারক ছিলেন কিং ডেভিড (হযরত দাউদ আ) কিন্তু এটি কিছুতেই প্রমাণ করা যায় না যে, মুসলমানরা খৃস্টানদেরও আগে এই যন্ত্রটির সঙ্গে পরিচিত ছিল। এ কথা সত্য হতে পারে যে, চীনারা দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই যন্ত্র ও এর ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং তাদের কাছ থেকেই পাশ্চাত্য এটি লাভ করে। কিন্তু মুসলমান সমুদ্র-কাপ্তানরা কম্পাসের ব্যবহার জানতেন এর প্রথম নিঃসন্দেহ প্রমাণ পাওয়া যায় ১২৮২ খৃস্টাব্দের জনৈক লেখকের রচনায়। প্রায় একই সময়ে ফ্রান্স এবং ইটালীতেও এর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। কম্পাস সম্পর্কে এমন কয়েকটি পরিভাষা রয়েছে যা মূলত প্রাচ্য ভাষা হলেও আরবী নয়। তাতে মনে হয় যে, চুম্বকের কাঁটার গুণাগুণ সম্পর্কিত জ্ঞান ইউরোপ প্রাচ্য থেকে লাভ করে, কিন্তু এতে এ কথা মনে হয় না যে, মুসলমানরা এ ক্ষেত্রে খৃস্টানদের অগ্রগামী। বহু ক্ষেত্রে তাদের এলোমেলো মানচিত্র অঙ্কন বিজ্ঞান বরং এরূপ ধারণার সৃষ্টি করে যে, তাদের জাহাজগুলি কেবল উপকূলের দৃষ্টিপথেই চলাচল করতে পারতো। কাজেই নির্বিবাদে এরূপ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মুসলমানরা ইউরোপীয় খৃস্টানদের আগেই কম্পাসের ব্যবহার জানলেও তাদের এই জ্ঞান ১২০০ খৃস্টাব্দের আগের নয়, এবং তারা বিষয়টি জানার অব্যবহিত পরেই খৃস্টান নাবিকরাও তা লাভ করে।
ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে ভূমধ্যসাগরের প্রথম সামুদ্রিক চার্টের আবির্ভাবের ক্ষেত্রে অদ্ভুত সমস্যার ও কম্পাসের সমস্যার সঙ্গে মিল রয়েছে। সব চাইতে প্রাচীনজ্ঞাত চার্ট সম্ভবত জেনোয়াবাসীরা তৈরি করে। এসব চার্ট পূর্ববর্তী সর্বপ্রকার মানচিত্রের চাইতে অনেক বেশি সঠিকভাবে একই সময়ে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের অবস্থান নির্দেশ করে কেবল কম্পাসের সাহায্যেই এগুলি তৈরি সম্ভব হয়। এসব চার্টে উপকূল রেখার বিস্তারিত নকশাও দেওয়া হয় এবং এসব বিশদ বিবরণ কিছুতেই এক যুগের অবদান হতে পারে না। এবারে আমরা আল-ইদ্রিসী এবং তাঁর পূর্ববর্তী ইবনে হাউকাল ও আল-বাস্ত্রীর রচনায় আফ্রিকান উপকূলের সঠিক বর্ণনার কথা স্মরণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, উপরোক্ত ভৌগোলিক গ্রন্থগুলিতে প্রতিফলিত মুসলিম নাবিকদের অভিজ্ঞতা আধুনিক মানচিত্র বিজ্ঞানের আদর্শ প্রাচীনতম চার্টগুলি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
মেসোপটেমিয়ার বিরাট সমুদ্র পথের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর মুসলিম সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বাগদাদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের নৌচলাচল বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের সহায়ক হয়। এই পথেই বাগদাদের বড় বড় বণিকরা চীনের রেশম, ভারতের মসল্লা ও সুগন্ধি দ্রব্য এবং কালার বিভিন্ন ধরনের কাঠ, নারিকেল ও টিন আমদানি করতেন। এসব পণ্য মুসলিম দেশগুলি থেকে ইউরোপে যেত। কারণ ঐ সব দেশের সঙ্গে ইউরোপের কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। এই সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি অংশ পারস্য উপসাগরে প্রবেশ না করে পণ্যসামগ্রী এডেন এবং লোহিত সাগরের বন্দর জেদ্দা ও আল-কুলযুমে (সুয়েজের নিকট প্রাচীন ক্লিস্মা) পৌঁছিয়ে দিতো। ক্রুসেডের সময় জেদ্দার প্রায় বিপরীত দিকে তীর্থযাত্রীদের গমনাগমনের একটি প্রাচীন বন্দর 'আইজাবে পৌঁছিয়ে দিতো। এখান থেকেই মুসলিম বিশ্বের পশ্চিম অংশে সরবরাহ যেতো। আবার একই পথে আফ্রিকার আইভরি প্রভৃতি পণ্যসামগ্রীর আমদানি হতো। এগুলি এডেনের বিপরীত দিকে ইথিওপীয় সামুদ্রিক বন্দর যাইলা থেকে পাঠানো হতো।
মুসলমানদের নৌবাণিজ্যের চাইতে 'মরুভূমির জাহাজের' মাধ্যমে স্থল-বাণিজ্য আরো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের অনেক আগেই স্থল-বাণিজ্য বহর এশিয়া ও আফ্রিকার তৃণভূমি অঞ্চল অতিক্রম করলেও আমরা এই বাণিজ্যে মুসলমানদের অবদানের কথাই বিশেষভাবে জানি। এমন কি কিছুকাল আগেও মরুভূমিতে গমনাগমনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলমানদের পিছনে পড়েছিল। সাম্প্রতিককালে সিরীয় মরুভূমি, আরব উপদ্বীপ, পারস্য ও সাহারায় যে মোটর যানবাহন চালু হয়েছে, মধ্য এশিয়ায় যে সব রেলপথ নির্মিত হয়েছে এবং যে কয়েকটি বিমান সার্ভিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এগুলি সবই স্মরণাতীত কাল থেকে অব্যাহত উটের পথই অনুসরণ করছে। মুসলিম সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির যুগে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে তীর্থযাত্রীদের মক্কা গমনাগমনের ক্ষেত্রে এই দলবদ্ধ চলাচল সবচাইতে সাধারণ মাধ্যম ছিল। একই সময়ে সাম্রাজ্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ প্রথমত ভারত ও চীনের, দ্বিতীয়ত দক্ষিণ ও মধ্য রাশিয়ার এবং তৃতীয়ত আফ্রিকার স্থলপথের সঙ্গে যুক্ত হয়। সমুদ্র পথেও ভারত এবং চীনে যাওয়া যেতো, তাই অন্যান্য দিকের তুলনায় এদিকে স্থলপথে দলবদ্ধ বাণিজ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাছাড়া ভারতের সঙ্গে স্থলপথ আফগানিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পথের দরুন ব্যাহত হয়। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে তুর্কী অধিকৃত অঞ্চলসমূহের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তদুপরি চীনের প্রধান উৎপাদিত পণ্য রেশম আগে পারস্যেও উৎপাতিক হতো। একাদশ শতকের সামানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর চীনের সঙ্গে স্থলপথ বাণিজ্য আরো প্রতিকূল হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এশীয় বাণিজ্য পথের বিরাট প্রসার মঙ্গোলদেরই অবদান ছিল।
উত্তর দিকে মুসলমানদের বাণিজ্যিক প্রভাব প্রসারের তথ্য লাভের জন্য আমরা কেবল লিখিত সূত্রের উপর নির্ভর না করে রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল সংখ্যায় যে সব মুসলিম মুদ্রা পাওয়া যায় তাও বিবেচনা করতে পারি। এসব মুদ্রা বিচ্ছিন্ন ভাবে বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং আইসল্যান্ডেও পাওয়া যায়। কাযান প্রদেশে ভলগা নদীর মাঝামাঝি অঞ্চলে এ ধরনের বিপুল সংখ্যক মুদ্রা পাওয়া যায়। কিন্তু বাল্টিক প্রদেশগুলিতে প্রাপ্ত মুদ্রা সংখ্যার দিক দিয়ে এগুলিকে অনেক বেশি পরিমাণে ছাড়িয়ে যায়। স্কান্ডিনেভিয়ার যে সব এলাকায় এসব মুদ্রা প্রধানত পাওয়া যায় সেগুলি হচ্ছে সুইডেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং নরওয়ের দক্ষিণ এলাকা। মুদ্রাগুলির সময়কাল হচ্ছে সপ্তম শতকের সমাপ্তি থেকে একাদশ শতকের সূচনা। এরূপ সম্ভাবনা খুব কম যে, মুসলিম বণিকগণ উত্তর দিকে এসব স্থান পর্যন্ত গিয়েছিলেন; কারণ লিখিত আরবী সূত্র থেকে দেখা যায় যে, ভলগা নদীর মাঝামাঝি অঞ্চলে ভল্লা বুলগারদের দেশই ছিলো তাদের বাণিজ্যিক অভিযান ও দূতাবাসের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ইসলাম ধর্মও প্রাথমিক দিকে ঐসব অঞ্চল পর্যন্তই প্রসারিত হয়। তাদের বাণিজ্য সাধারণত যে পথে অগ্রসর হয় তা ট্রান্সঅক্সানিয়া থেকে ওকসাস নদীর মোহনায় অবস্থিত খারিযমের (খিবা) বদ্বীপ অঞ্চল পর্যন্ত ছিল। ভল্লার মোহনা থেকে উজান দিকের পথ ততোটা স্বাভাবিক ছিল না। অবশ্য এতোটা বিস্তৃত এলাকায় মুদ্রা পাওয়ার কারণ হচ্ছে সাংস্কৃতিক প্রভাবের একটি লক্ষণ, এবং এতদ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মুসলমানরা বুলগেরীয় বাজারগুলিতে যেসব লোক উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতো তাদের কাছ থেকে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতো। এদের মধ্যে স্কান্ডিনেভীয় রাশিয়ানরা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে মুসলমান বণিকরা কি ধরনের পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতেন তা আমরা বিভিন্ন ভৌগোলিক রচনা বিশেষ করে আল-মাকদিসীর রচনা থেকে জানতে পারি। পণ্যগুলি হচ্ছে নকুলের পশম, শুভ্র পশম, আরমিনের লোম, খেকশিয়াল, বিবর, ফুটফুটে খরগোস ও ছাগলের পশম, মোম, তীর-ধনুক, বার্চগাছের বাকল, খাড়া পশমের টুপী, মাছের সিরিশ, মাছের দাঁত, বিবরের নির্যাস, অম্বর, ঘোড়ার পাকা চামড়া, মধু, হেজেল নাট, বাজ পাখি, তলোয়ার, বর্ম, ম্যাপল কাঠ, ক্রীতদাস এবং ছোট বড় গবাদি পশু। অধিকাংশ ক্রীতদাসই ছিল স্লাভজাতীয়। তাদের নাম এখনো সভ্য জগতে, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলিতে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করে। ক্রীতদাস আমদানির আর একটি সূত্র ছিল স্পেন। এখান থেকে মাগরেব ও মিসরে ক্রীতদাস আমদানি করা হতো। এই শেষোক্ত শ্রেণীর ক্রীতদাসরা প্রধানত খোজা ছিল এবং তাদেরকে মুসলিম হেরেমে নিয়োগ করা হতো। এটা সর্বজন বিদিত যে, বিভিন্ন জাতি থেকে এভাবে আমদানিকৃত ক্রীতদাসদের ইউরোপে মুসলিম সংস্কৃতি প্রসারে কোন অংশে কম অবদান ছিল না। এই সুদূর প্রসারী মুসলিম-বুলগেরীয় বাণিজ্য ছাড়াও যার প্রমাণ জার্মানীতেও পাওয়া যায়-- কাস্পিয়ান সাগরের তীরে ভল্লা নদীর মোহনায় খাযার সাম্রাজ্যের সঙ্গেও তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। খাযারদের রাজধানী ইটিল বা আটিল এখানেই অবস্থিত ছিল। পণ্য বিনিময়ের দিক দিয়ে এই বাণিজ্য অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু খাযার সাম্রাজ্য মুসলিম ও বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে এক ধরনের নিরপেক্ষ এলাকার সৃষ্টি করে। ফলে এর মধ্য দিয়ে বহু মুসলিম ও প্রাচ্য পণ্য খৃস্টান দেশগুলোতে যাওয়ার পথ সুগম হয়।
আফ্রিকার স্থল-বাণিজ্য একটি প্রাচ্য ও একটি পাশ্চাত্য এলাকায় বিভক্ত ছিল। উভয় দিকেই প্রধান আমদানি পণ্য ছিল স্বর্ণ। মুসলিম অঞ্চলের পরে আসোয়ানের পূর্ব দিকে বুজা দেশে স্বর্ণখনি এলাকার বিরাট বাণিজ্য কেন্দ্র আল-'আল্লাকী প্রাচীন মিসরীয় আমল থেকেই বিখ্যাত ছিল। পশ্চিম আফ্রিকায় স্বর্ণের দেশ ঘানার সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। এর রাজধানী অবশ্যই নাইজার নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার মুসলিম বণিকরা দক্ষিণ দিকে কয়েক মাস পর্যন্ত ভ্রমণ করতেন। তারা সাধারণত আউদাগোশত নামে একটি মরূদ্যান পার হতেন। এটি ছিল ঘানার উত্তরে চৌদ্দ দিনের পথ। এসব এলাকায় বাণিজ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে ভৌগোলিক ইবনে হাউকাল (আনুমানিক ৯৭৫) বলেন যে, তিনি আউদাগোশত-৪২০০০ দিনারের একটি আই ও ইউ¹ দেখেছেন যা দক্ষিণ মরক্কোর সিজিলমাসা শহরের জনৈক বণিকের নামে লেখা হয়। এমনও বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী শতকে এই বাণিজ্যের পরিমাণ আরো বেশি ছিল। কারণ তখন পশ্চিমের অঞ্চলগুলি ও মিসরের মধ্যে একটি সরাসরি রাস্তা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা না থাকায় এই রাস্তাটি পরিত্যক্ত হয়।
পরবর্তী শতকগুলিতেও আফ্রিকা এমন একটি এলাকা ছিল যেখানে কোন প্রতিযোগিতা ছাড়াই মুসলমানরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের প্রেরণা অব্যাহত রাখতে পারে। ত্রয়োদশ শতকে লেখক ইবনে সাঈদ ইবনে ফাতিমার ভ্রমণ কাহিনীর মাধ্যমে সুদূর সেনেগাল পর্যন্ত আটলান্টিক উপকূলের সঙ্গে সম্যকভাবে অবহিত হন। এই এলাকাটি নাইজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং নীল নদের ন্যায় একই নদী ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা হতো। তিনি চাদ হ্রদের আশেপাশে বসবাসকারী নিগ্রোদের সম্পর্কেও অবহিত হন। অপরদিকে মুসলমানরা কখনো নীলনদের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, কারণ এ ব্যাপারে তারা কেবল টলেমীর প্রচলিত ধারণারই পুনরাবৃত্তি করেন। এতদসত্ত্বেও রেনেসাঁ যুগের ইউরোপ মুসলমানদের সূত্র ছাড়া অন্ধকার মহাদেশের অভ্যন্তর ভাগ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কারণ ১৫২৬ খৃস্টাব্দে খৃষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত মুসলমান লিও আফ্রিকানুস আফ্রিকা সম্পর্কে যে বিবরণী প্রদান করেন তা তখনকার জন্য এবং পরবর্তীকালে আরো দীর্ঘকালের জন্য তাদের একমাত্র তথ্যসূত্র ছিল। উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ইদ্রিসীর বিবরণের যে মূল্যায়ন করা হয় তা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিপূর্বে বর্ণিত ব্যাপক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব ও খৃস্টান ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য প্রথমে তীব্র বিপরীতধর্মী ছিল। তাদের মধ্যে সরাসরি কোন বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে, যেটুকু ছিল তা ইহুদী বণিকদের হাতে ছিল। ঐ সময় ইহুদীরা একান্তভাবে একটি বাণিজ্যিক জাতি ছিল। সভ্যতার দুটি এলাকায় কেবল তারাই অবাধে বাণিজ্য করতে পারতো। ইবনে খুরাদাজবেহর বর্ণনায় দেখা যায় যে, ইহুদী বণিকরা ফ্রান্সের দক্ষিণ থেকে সমুদ্র পার হয়ে মিসর আগমন করতো, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সুয়েজ যোজক অতিক্রম করতো এবং সেখান থেকে জাহাজযোগে ভারতে যেতো। অন্যরা স্থলপথে সিউটা থেকে মিসর যেতো এবং সিরিয়া থেকে সিন্ধুনদ এলাকায় গমন করতো। তারা প্রায়ই কনস্টান্টিনোপলেও যেতো। এমনিভাবে মুসলিম দেশগুলি ইউরোপ থেকে ইতিপূর্বে বর্ণিত ক্রীতদাস, বাইযেন্টাইন সাম্রাজ্যের রেশম, পশম এবং অস্ত্রশস্ত্র লাভ করতো। এসব পণ্য রাশিয়া হয়েও তাদের কাছে যেতো। একই ব্যবসায়ীরা ইউরোপের জন্য নিয়ে আসতো মৃগনাভি, ঘৃতকুমারী, কর্পূর, দারুচিনি এবং এ জাতীয় অন্যান্য পণ্য। এসব নামের সঙ্গে তাদের মূল প্রাচ্য নামের মিল নেই। অন্যান্য যে সব পথে প্রাচ্যের পণ্যসামগ্রী ইউরোপে প্রবেশ করতো সেগুলি হচ্ছে কাস্পিয়ান অঞ্চল ও বাইযেন্টিয়ামের মধ্যবর্তী খাযার সাম্রাজ্য এবং মধ্য ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনকারী, রাশিয়ার অর্ধ-বর্বর জাতি অধ্যুষিত এলাকা। দশম শতকে বাইযেন্টাইন সীমান্তবর্তী টেবিযণ্ড শহর মুসলিম গ্রীক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সেখানে কিছু সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী বসবাস করতো। বাইযেন্টাইন সরকার শুল্ক আরোপ করে প্রচুর লাভবান হতো। স্পেন সীমান্তেও কিছুটা সরাসরি বাণিজ্য অব্যাহত ছিল।
অতএব, আমরা একদিক দিয়ে বলতে পারি যে, খৃস্টান ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে পারস্পরিকভাবে এক ধরনের বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতা বিরাজ করছিল। এ কথা সত্য যে, অষ্টম শতক থেকেই মুসলমান ভ্রমণকারী ও বণিকদের ইটালীয় শহরগুলিতে এবং কনস্টান্টিনোপলে দেখা যায়, কিন্তু এসব সম্পর্ক একাদশ শতকে যে প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হয় এবং যা ক্রুসেডের প্রথম যুগে স্বল্পকালের জন্য ব্যাহত হয় তারই সূচনা করে। বিগত যুগগুলির বাধা দূর হওয়ার পর যে বাণিজ্যিব সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা ইউরোপীয় জাতিগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রচারে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে। এসব জাতি তাদের শাসকদের (যেমন সিসিলির রজার) সহায়তায় এই মূল্যবোধের দ্বারা লাভবান হতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
যৌথ অংশিদারিত্ব, বাণিজ্যিক চুক্তি
যে সব বহুমুখী পন্থায় বাণিজ্যিক সম্পর্ক মুসলমান ও খৃস্টানদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সৃষ্টি করে তা এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা যায় না। মুসলিম বিশ্ব প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বৈষয়িক সংস্কৃতির যে সব সম্পদ আহরণ করে তা ইউরোপকে ঢেলে দেওয়া হয়। এ সব সম্পদ কেবল মুসলমানদের দুঃসাহসিক উদ্যমের মাধ্যমে দূরবর্তী দেশগুলি থেকে সংগৃহীত চীনা, ভারতীয় ও আফ্রিকান উৎপাদিত পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এগুলির মধ্যে প্রথমত মুসলিম দেশগুলিতে স্বাভাবিকভাবে ও শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে যেসব সম্পদ পাওয়া যেতো, তাও ছিল। মুসলিম দেশগুলিতে একটি বিশেষ পন্থায় শিল্প উৎপাদনের বিকাশ হয়। মূলধন না থাকায়, এবং শ্রমশিল্পীরা বিভিন্ন সংস্থায় সংগঠিত হওয়ায় এটি প্রধানত শাসকদের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল। মুসলমানরা পরবর্তীকালে যখন ইউরোপীয় শিল্পের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তখন শিল্পোন্নয়নের এই অদ্ভুত ব্যবস্থা তাদের জন্য বিরাট অসুবিধাজনক বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ইসলামী সমৃদ্ধির যুগে এই ব্যবস্থা শিল্প দক্ষতার এমন এক বিকাশ ঘটায় যাতে উৎপাদিত জিনিসের শৈল্পিক মূল্য অপ্রতিদ্বন্দ্বিতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে। প্রথমে বস্ত্র শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্যের কথা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে সাধারণভাবে প্রচলিত কতগুলি নাম থেকে কোন্ কোন্ বস্ত্র ইসলামী দেশগুলি থেকে আমদানি করা হতো তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়: মসলিন (মসুল থেকে), ড্যামাঙ্ক (দামেস্ক থেকে), বালডাচিন (মূলত বাগদাদে উৎপাদিত হতো) এবং গজ, কটন, সার্টিন প্রভৃতি যে সব বোনা বস্ত্রে আরবী বা পারসিক নাম রয়েছে। একইভাবে প্রাচ্যের কম্বল আমদানিও মধ্যযুগের ন্যায় প্রাচীন। এখানে একটি অদ্ভুত বিষয়ও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মধ্যযুগীয় জার্মান সম্রাটদের রাজকীয় পোশাকে আরবী উৎকীর্ণ লিপি ছিল। এগুলি সম্ভবত সিসিলি থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হতো যেখানে খৃস্টান পুনর্বিজয়ের পরও দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইসলামী শিল্পকলা ও শিল্প অব্যাহত থাকে। যে সব স্বাভাবিক উৎপাদিত দ্রব্য মূলত মুসলিম দেশসমূহ থেকে আমদানি করা হয়েছে এ কথা তাদের নাম থেকে বোঝা যায় না, সেগুলি হচ্ছে কমলা, লেবু, খোবানি প্রভৃতি ফল, স্পিনিজ, আর্টিকোক প্রভৃতি শাক-সব্জি, স্যফরণ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যানিলাইন। একইভাবে মূল্যবান পাথর (ল্যাপিস-ল্যাজিউলাই) এবং বাদ্যযন্ত্রেরও (বীণা, গিটার ইত্যাদি) নাম করা যেতে পারে, যদিও এগুলি সরাসরি বাণিজ্যিক লেনদেনের ফল কিনা তা প্রমাণ করা যায় না। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে, যার তৈরি কৌশল ইউরোপ দ্বাদশ শতকে মুসলমানদের কাছ থেকে আয়ত্ত করে।
সর্বশেষে আমাদের বাণিজ্যিক শব্দ সম্ভারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে এক সময় মুসলিম বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক রীতিনীতি কিভাবে খৃস্টান দেশগুলির বাণিজ্য বিকাশে গভীর প্রভার সৃষ্টি করে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ 'স্টার্লিং' শব্দটির মধ্যে প্রাচীন গ্রীক শব্দ 'স্ট্যাটার' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কিন্তু এই শব্দটি আরবীর মাধ্যমেই ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করেছে। 'ট্রাফিক' শব্দটি সম্ভবত আরবী তাফরিক থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বন্টন। তেমনি সর্বজন পরিচিত 'ট্যারিফ' শব্দটি বেশ সুন্দর আরবী শব্দ তা'রিফ থেকে এসেছে, যার অর্থ বৈশিষ্ট্য ঘোষণা। একই সূত্র থেকে এসেছে 'রিস্ক' 'টেয়ার' 'ক্যালিবার' এবং প্রাত্যহিক ব্যবহৃত 'ম্যাগাযিন' শব্দ। ম্যাগাযিনের মূল আরবী 'মাখাযিন', যার অর্থ ভাণ্ডার বা দোকান (ফারসী 'ম্যাগাসিন' শব্দ এখনো সাধারণভাবে দোকান অর্থে ব্যবহৃত হয়)। 'চেক' শব্দের কথা আফ্রিকান বাণিজ্য প্রসঙ্গে ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর জার্মান এবং ওলন্দাজ প্রতিশব্দও (ওয়েচসেল, উইসেল) একইভাবে আরবী। 'অ্যাভাল' শব্দটির ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এরপর বিল অব এক্সচেঞ্জ (মূল্যপত্র) প্রসঙ্গে বলা যায় যে, মুসলমান ও ইটালিয়ান খৃস্টানদের পার্টনারশীপ (অংশীদারিত্ব) থেকেই জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর ধারণার উদ্ভব হয়। মুসলমানদের বাণিজ্যিক আইন কুরআন ও হাদীস থেকে উদ্ভূত শরিয়তী বিধানের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে একটি উন্নত বাণিজ্য রীতি ব্যবস্থার দ্বারা এটি পরিলক্ষিত হয়। উপরের দৃষ্টান্ত তারই প্রমাণ। এসব বাণিজ্য পদ্ধতির একটি হচ্ছে 'মোহাটা' নামে অভিহিত কাল্পনিক দরাদরি। এই শব্দটিও আরবী থেকে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষাভুক্ত হয়।
'ডাউয়েন' (dauane)-এর ন্যায় একটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শব্দ ঐ সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন বন্দরে নিয়মিত বাণিজ্যিক লেনদেনের উদ্ভব হয়। এ কথা সর্বজন বিদিত যে, এই লেনদেন পাশ্চাত্য দেশগুলির বাণিজ্যিক সংগঠনেও বিরাট অবদান সৃষ্টি করে। মুসলিম শাসকদের সঙ্গে তারা যেসব চুক্তি সম্পাদন করে এবং পাশ্চাত্যের বন্দরগুলিতে যেসব বাণিজ্য প্রতিনিধি নিয়োগ করে তা বর্তমানে যে সব বিধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল।
পূর্ববর্তী পর্যালোচনা থেকে দেখা যাবে যে, ভূগোল ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপ মুসলিম বিশ্ব থেকে যে সাংস্কৃতিক সুফল লাভ করেছে তা কেবল এক মুহূর্তের ব্যাপার ছিলো না বরং একাদশ শতকের শুরু থেকে যে পারস্পরিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকে এবং ত্রয়োদশ শতকের মঙ্গোল আমলে যা বিশেষভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তাই ছিল এর ভিত্তিভূমি। এ কথাও সত্য যে, তুরস্ক ও পারস্যের ন্যায় দেশগুলিতে এবং ভারত ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে পরিবৃদ্ধি সহকারে যে ইসলামী সভ্যতা বিরাজমান ছিল তার মাধ্যমেও বহু মুসলিম মতামত ও রীতিনীতি ইউরোপীয় দেশগুলি অবহিত হয় এবং সেগুলি অনুসরণও করে। কিন্তু খৃস্টান জগতের উপর মুসলমানদের এককালের বিপুল প্রাধান্য দশম শতকের ন্যায় এতো সুস্পষ্টভাবে আর কোন যুগে দেখা যায়নি। এ সময় ইসলাম সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে ছিল এবং খৃস্টান ইউরোপে নেমে আসে নৈরাশ্যজনক স্থবিরতা।
টিকাঃ
১. আর মেনেণ্ডেয পিডাল, অরিজেনস ডেল এসপানল, পৃ. ৪৪২। (মাদ্রিদ, ১৯২৬)
১. ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে নাল্লিনো কর্তৃক আরবী ও ল্যাটিন ভাষায় সম্পাদিত। আল খওয়ারিযমীর জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থটি বাথের অ্যাডেলার্ডের সংস্করণ থেকে এইচ সুটার কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় সম্পাদিত হয় (কোপেন হেগেন, ১৯১৪)। ঐ সময় আরব জ্যোতির্বিদগণ 'আরিনের' মিরিডিয়ান থেকে দ্রাঘিমা নিরূপণ করতেন। এই নাম একটি অপভ্রংশ। প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে মধ্য ভারতের উজ্জয়িনী শহর, যেখানে ঐসময় একটি মানমন্দির ছিল। বহুকাল পরে অষ্টাদশ শতকে জয়সিংহ সেখানে মান মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।..
১. 'মূল আরবী মাওসিম, একটি বিশেষ সময়, একটি ঋতু; বাং মওসুম। ভারত মহাসাগরে ও দক্ষিণ এশিয়ায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে এবং বছরের অবশিষ্ট সময়ে উত্তর-পূর্ব থেকে প্রবাহিত মওসুমী বায়ু। প্রবল বৃষ্টিপাত সমন্বিত দক্ষিণ-পশ্চিমের বায়ু প্রবাহের কালকে মনসুন বা মওসুমী ঋতু বলা হয়।-অনুবাদক।
১. আই ও ইউ আমি তোমার কাছে ধারি। আরবী শব্দ বাক এবং এর থেকেই আধুনিক 'চেক' শব্দের উদ্ভব হয়েছে। -অনুবাদক
📄 ইসলামী লঘু শিল্পকলা এবং ইউরোপীয় শিল্পকর্মে এর প্রভাব
ইসলামের সেই চমকপ্রদ যুগের সূচনায় ইসলামী সভ্যতা পশ্চিমে আটলান্টিকের তীরবর্তী শহরগুলিতে নতুন ধরনের শিল্পের অবদান সৃষ্টি করার জন্য যেসব অঞ্চল থেকে শুরু করে সে সব অঞ্চলে শিল্পকলার অবস্থা ছিল সেকেলে ও অনুন্নত। ঐ সময় আরবের শিল্পকলায় ছিল হয় দূর অতীতের একটি নির্জীব অভিব্যক্তি কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে বাইরের প্রভাবমূলক একটি অনুকরণ। যে সব স্থায়ী বসতিপূর্ণ উর্বর অঞ্চল মরুভূমির বিচ্ছিন্ন ভবঘুরে বেদুইনদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিবেশে সমৃদ্ধি লাভ করে, সেখানেও স্থানীয়ভাবে শিল্পকলার তেমন বিকাশ ঘটেনি। ইসলামী শিল্পকলার আত্মিক রূপ আরব থেকে উদ্ভূত হলেও এর বাহ্যিক রূপ বাইরের যে সব দেশে শিল্পকলা একটি বলিষ্ঠ শক্তি ছিল তার আঙ্গিকেই গড়ে উঠেছে।
খৃস্টানরা সিরিয়া ও মিসরের পৌত্তলিক আমলের শিল্পকলায় গভীর পরিবর্তন সাধন করে। এ সব দেশের নিজস্ব যে সব বৈশিষ্ট্য ছিল কিংবা বাইরের প্রভাবাধীনে যে সব বৈশিষ্ট্যের আমদানি ও বিকাশ ঘটে, সেগুলিকে নতুন এক প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত করা হয় এবং উভয়ের সংমিশ্রণে একটি সুসংবদ্ধ ও অপরূপ শিল্পকলার উদ্ভব হয়। ইউফ্রেতিস ও তাইগ্রীসের অপর পারে আর এক ধরনের শিল্পকলা গড়ে ওঠে। পারস্যবাসী তাদের পার্থীয় অধিস্বামীদের বিতাড়িত করে নিজস্ব সাসানীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠার কয়েক শতকের মধ্যেই এক অপূর্ব জাতীয় পুনর্জাগরণের যুগে প্রবেশ করে। ইরানীয় শিল্প-প্রতিভা তাদের প্রাচীন শিল্প-সম্পদের সঙ্গে আলেকজান্ডারের অভিযানের সময় থেকে প্রচলিত গ্রীক বৈশিষ্ট্য এবং পরবর্তীকালে আভ্যন্তরীণ এশিয়া থেকে আমদানিকৃত বৈশিষ্ট্য সমূহের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ এক অপরূপ শিল্প সৌকর্য গড়ে তোলে। উপরোক্ত দুটি সংস্কৃতি ছিল পরস্পর বিরোধী। অপর দিকে মুসলমানদের কাছে উভয়টিই ছিল অপ্রীতিকর। ইসলামী শিল্পকলা এই পরিস্থিতিতেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
মধ্যযুগে শিল্পকলা ছিল প্রথমত ও প্রধানত একটি ধর্মীয় অভিব্যক্তি। আমরা মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মের ধারায়, যে ধর্ম বিশ্বাসের প্রেরণায় সেগুলি গড়ে ওঠে তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করি। এগুলির গঠন রীতিতে কোন কোন বৈশিষ্ট্য যত সুস্পষ্টই হোক না কেন এবং কোন বিশেষ পদ্ধতি তাদের মূল পরিচয় যতই তুলে ধরুক না কেন, তারা সুস্পষ্টভাবে ধর্মীয় প্রভাবের ছাঁচেই গড়ে ওঠে। খৃস্টান শিল্পকলা মূলত ধর্মীয় উপদেশের একটি বাহন। এর উদ্দেশ্য সব সময় সর্বপ্রকার সূক্ষ্ম ছবি ও প্রতীকের মাধ্যমে এত সরল-সহজভাবে প্রতিফলিত যে, শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই তা উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু এর সুন্দর পট-শিল্প আরবদের কাছে ছিল নিছক মূর্তিপূজা। কোন শৈল্পিক ঐতিহ্য না থাকায় তারা শিল্পকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং আদিম যুগের লোকদের ন্যায় এর সঙ্গে জাদুর যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করে। তার ওপর ধর্মীয় নিষ্ঠার প্রথম দৃষ্টিতে বিলাসিতা তাদের কাছে বিশেষভাবে নিন্দনীয় ছিল। তারা মনে করতেন যে, এটি নাস্তিকতা থেকে উদ্ভূত একটি শয়তানের ফাঁদ, যার সঙ্গে সত্যিকারের বিশ্বাসীর কোন সংশ্রব থাকতে পারে না। পারস্য শিল্পের যে শিল্পসৌকর্য পারস্যের কারুশিল্পীরা বর্তমানে ইসলামী শিল্পকলায় গভীরভাবে প্রতিফলিত করেছে তাও প্রথমে পৌত্তলিকতার নিন্দনীয় বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হতো।
ইসলামী শিল্পের সূচনা মসজিদে। এখানে প্রকাশ্য দিবালোকে এর উদ্ভব হয় এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এটি লালিত পালিত হয়। প্রথম দিকের মসজিদগুলি কোন প্রকার স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যবিহীন সাদাসিধা কাঠামো ছিল। কেবল নামায আদায় এবং ধর্মীয় উপদেশ প্রচারের জন্যই সেগুলি ব্যবহৃত হতো। প্রথমে কোন প্রকার গৃহসজ্জা ছিল না। যখন এর প্রবর্তন হয়, তখনো সেগুলি ছিল যতোটা সম্ভব অতি সাধারণ। যে কোন অভিনবত্বের কঠোর সমালোচনা করা হতো। কথিত আছে যে, মিসরে যখন প্রথম মিম্বার তৈরি করা হয়, তখন এই অপকর্মের সংবাদ খলীফার কর্ণগোচর হলে তাঁর নির্দেশে সেটি ভেঙে ফেলা হয়; কারণ এতে ইমামের মর্যাদা তার অন্যান্য মুসলমান ভাইয়ের চাইতে অবাঞ্ছিতভাবে বৃদ্ধি পায়। তেমনি মক্কার দিকনির্দেশের জন্য প্রথম যে মিহরাব তৈরি করা হয় তারও তীব্র সমালোচনা হয়; কারণ এটি বিশেষভাবে খৃস্টান গির্জার আপস-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বস্তুত সেখান থেকেই মিহরাবের উদ্ভব হয়। কিন্তু শীঘ্রই এমন এক যুগের আবির্ভাব হয়, যে যুগের লোকদের রুচিশীল দৃষ্টিতে গির্জার উন্নত অবস্থার তুলনায় মসজিদের দৈন্য বিশেষভাবে ধরা পড়ে। ফলে যথাসময়ে মিম্বার ও মিহরাব মসজিদের প্রধান আলংকারিক সৌন্দর্যে পরিণত হয়। সূক্ষ্ম ডিজাইন ও অলংকরণের বৈচিত্রে এগুলি স্থাপত্য শিল্পে এক অপরূপ সাফল্য সূচিত করে।
ইসলাম যখন আরো প্রসারিত হতে থাকে, তখন বাইরের জাতিগুলির সংস্পর্শে তার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত হয়। ইসলামী ধর্মীয় বিধানে যেসব স্থায়ী বিধি-নিষেধ রয়েছে তার সীমার মধ্যে একটি শৈল্পিক আদর্শের নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হয়। তার ওপর প্রাসাদিত দৃষ্টিভঙ্গি লাভের সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক প্রাধান্যের স্থলে সম্পূর্ণরূপে লৌকিক একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতার উদ্ভব হয়।
যে সব শাসক ধর্মীয় বিশ্বাসের ধারক হিসাবে খ্যাতিমান ছিলেন না তাদের মধ্যে যখন বিদেশী রীতিনীতি সংক্রমিত হতে শুরু করে তখন রাজপ্রাসাদের পবিত্রতার সুনামও ক্ষীণ হতে থাকে। সংস্কৃতিমনা শাসকগণ মহানবীর উত্তরাধিকারী হিসাবে নয়, বরং রাজা হিসাবে যখন সুন্দর সুন্দর বই, সুদৃশ্য ছবিওয়ালা পোশাক ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হন তখনই বিধিনিষেধ বহির্ভূত শিল্পকর্মের আবির্ভাব শুরু হয়। শাসকের দেখাদেখি অভিজাত শ্রেণী এবং অন্ধ অনুসারীরাও এ ধরনের শিল্পের সমঝদার হয়ে ওঠেন এবং এর ফলে এমন এক 'দরবারী শিল্পের' উদ্ভব হয় যাতে কারুশিল্পীরা লাভবান হলেও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন।
প্রাথমিক খলীফাদের আমলে আভিজাত্য চর্চা অসম্ভব ছিল। তারা অলংঘনীয় মূলনীতি হিসাবে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের মতবাদ ছিল যে, প্রত্যেকে তার অভাব-অভিযোগে শাসকের প্রত্যক্ষ সহায়তা পাবে যার জীবন যাপন প্রণালী, বাসস্থান এবং বাসস্থানের আসবাবপত্র সমালোচনার ঊর্ধে থাকবে। কিন্তু একটি আয়েশী জীবনের শাসক শ্রেণী যখন নিজেদের জনগণের সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে তখনই রাজপ্রাসাদও একটি বিচ্ছিন্ন মর্যাদা লাভ করে এবং সেখানে একটি নতুন ধরনের রীতিনীতি প্রচলিত হয়। কতিপয় উল্লেখযোগ্য প্রাচীর চিত্র থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, উমাইয়া খলীফাদের আমলেই একটি লৌকিক দরবারী শিল্পের উদ্ভব হয়। এসব প্রাচীর চিত্রে গ্রীক ও প্রাচ্য ধারার সংমিশ্রণে অত্যন্ত সুন্দরভাবে অঙ্কিত চিত্র সম্বলিত বিষয়বস্তু রয়েছে। মরু সাগরের পূর্বে মরুভূমি অঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত শিকার-ভবনে এখনো দেখা যায়। ভবনটি খলীফা প্রথম ওয়ালিদ কর্তৃক ৭১২ থেকে ৭১৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়। আব্বাসীয় খলীফাগণ কর্তৃক দামেস্ক থেকে নতুন নগরী বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরের পর দরবারী শিল্প একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়। এই রাজধানী স্থানান্তর প্রকৃতপক্ষে ৭৬ খৃস্টাব্দে সম্পন্ন হয়। এই রাজধানী স্থানান্তর মুসলিম শিল্পকলার ইতিহাসে একটি বিশেষ যুগের সূচনা করে, কারণ এ সময় থেকে এর বিকাশে পারস্য প্রভাব প্রাধান্য বিস্তার করে।
মুসলিম শিল্পকলার উদ্ভব, ধাপে ধাপে বর্ণনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়: বরং এই শিল্পকলা কিভাবে খৃস্টান ইউরোপের সমসাময়িক ও পরবর্তী অগ্রগতিকে প্রভাবিত করেছে তা অনুসন্ধানের জন্য এর কতিপয় পরিণত বিকাশের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। তাছাড়া আমরা একান্তভাবে ছোটখাটো শিল্পকলার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি। এগুলি ছিল কারুশিল্পীদের কাজ। যখন কোন ভবন নির্মিত হতো তখন এর উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয়তা ও সুযোগ সুবিধা বিধানের জন্য খুঁটিনাটি সব কিছু সজ্জিত করার উদ্দেশ্যে এদের ডাক পড়তো।
শীঘ্রই মুসলমানরা বিরাট নির্মাণশিল্পী হয়ে ওঠে। তাদের শিল্প প্রতিভা গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে স্থাপত্যের সুনির্দিষ্ট ধ্যান-ধারণা লাভ করে। মানুষের ছবি আঁকার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকায় মূর্তি শিল্পের বিকাশ না ঘটলেও পাথর, কাঠ ও অন্যান্য জিনিসের খোদাই কার্যে তারা অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করে। প্রাচীর চিত্র দূর অতীত থেকে অব্যাহত থাকলেও বর্তমানে যে চিত্রকলা আমাদের কাছে পরিচিত তা তথাকথিত 'মিনিয়্যাচার' শিল্পে সীমাবদ্ধ। ছোট ছোট চিত্র, পাণ্ডুলিপির ছবি প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলিতে কারিগরি সৌকর্যের দক্ষতা এবং রং সম্পর্কে গভীর বিচক্ষণতা প্রকাশ পেলেও মধ্যযুগীয় ইউরোপে একই অবস্থায় যেসব উৎকৃষ্টতম শিল্পকর্মের সৃষ্টি হয়েছে তার কতিপয় বৈশিষ্ট্য এগুলিতে দেখা যায় না। সুদক্ষ নির্মাণ শিল্পীর সংখ্যা বহু হলেও ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে তাদের সমকক্ষ কাউকে দেখা যায় না।
অবশ্য মুসলমানরা যদিও স্থাপত্য ছাড়া চারুকলার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সাফল্যের সমকক্ষ হতে পারেনি, তথাপি যে সব শিল্পে তারা অবাধে তাদের প্রতিভার প্রতিফলন ঘটায়, সেখানে তারা মধ্যযুগে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ইসলাম পাশ্চাত্যের নিকট অপরিজ্ঞাত বহু প্রাচীন কারুশিল্প ধারার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী ছিল। মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা যেভাবে ভবিষ্যৎ বংশধরদের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরাট সম্পদ বিতরণ করে গেছেন, তেমনি মুসলিম কারুশিল্পীরাও প্রাচ্যে প্রচলিত শিল্পকলার 'কর্মকেন্দ্র ভিত্তিক চর্চার' ঐতিহ্য সংরক্ষণ, বিকাশ ও প্রসার করে গেছেন। এই ঐতিহ্য হয় ইউরোপে কখনো প্রবেশ করেনি, কিংবা অতীতে ইউরোপ এ সম্পর্কে অবহিত হলেও মধ্যযুগের ঝড়ঝঞ্ঝায় সেখানে তার বিলুপ্তি ঘটে।
নতুন করে অতীতের এই নিপুণতার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে ইসলামী শিল্পকলা এমন এক সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য লাভ করে যে, এটিকে অতি সহজেই একটি স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করা হয় এবং তাই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সাধারণের জন্য হোক কিংবা উৎসব অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য হোক প্রতিটি জিনিসকে অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে অলংকৃত করা হতো। তার পরিকল্পনা ও প্রকাশ এতো সুষ্ঠু ছিল যেন সেটি কোন কৃত্রিম সৌন্দর্য নয় বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপের অভিব্যক্তি। এই অঙ্কন শিল্পের রীতি সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশাগত হলেও ইউরোপীয় ঐতিহ্য থেকে সামঞ্জস্যহীন হিসাবে এখনো তা পরিত্যক্ত হয়নি। এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আকর্ষণীয় ও রোমান্টিক। এর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলি এতো সুনিপুণভাবে উদ্ঘাটিত হয় যাতে আমাদের মনে এরূপ বিশ্বাস জন্মে যে, এর বাহ্যিক অবয়বের বাইরে কোন অবোধ্য প্রাণশক্তি রয়েছে। এ ধরনের শিল্পসৌকর্য নগ্ন জিনিস রূপায়ণের নিছক কৌশল মাত্র নয়, বরং সূক্ষ্ম কারুকার্যের এমন একটি অপরিহার্য দিক যা ছাড়া কোন শিল্পকর্ম অসম্পূর্ণ থাকে। পাশ্চাত্যের শ্রবণে সুরমাধুর্য যেমন আনন্দের শিহরণ জাগায়, তেমনি কোন একটি কারুশিল্পের নৃত্যছন্দ প্রাচ্যের কাল্পনিক দৃষ্টিকে বিমোহিত করে। প্রাচ্যের কারুশিল্পীদের কাছে কারুশিল্পের চর্চা এতোটা মোহনীয় ছিল যে, এর বিভিন্ন সমস্যা পর্যালোচনায় এবং যে ধারা এখনো আধুনিক শিল্পীরা অনুসরণ করছে সেই ধারার সুষ্ঠুতা বিধানে তারা অবিরাম ও অক্লান্ত সাধনা করে যান। ইসলামী শিল্পকলার সামান্যতম পর্যালোচনা থেকে একথা প্রতীয়মান হবে যে, মুসলিম শিল্প প্রতিভা কারুশিল্পের ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছে তা ছোটোখাটো শিল্প হিসাবে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী।
ধর্মীয় বিধি-নিষেধে মানুষের কিংবা কোন জীব-জন্তুর ছবি আঁকা মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হলেও মুসলিম অলংকরণে অত্যন্ত সাধারণভাবে এগুলির প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু সময় সময় এরূপ বলা হয় যে, কোন বিশেষ সম্প্রদায় এগুলি সমর্থন করে না, কিংবা এগুলি কোন অবস্থায়ই মসজিদে করতে দেওয়া হয় না। এ ধরনের ছবি থাকলে সংশ্লিষ্ট জিনিসগুলি লৌকিক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেওয়া হয়। কোন বিশেষ শৃংখলা ভঙ্গকারী অন্যায় কার্যে সার্বজনীন মৌনসম্মতিও সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। উদারমনা লোকেরা তা মেনে নিলেও কঠোর মনোভাবসম্পন্ন লোকের কাছে তা সবসময় বিরক্তিকর এবং তারা যে কোন মুহূর্তে এর বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে। আমাদের জাদুঘর এবং শিল্প সংগ্রহে এমন বহু জিনিস রয়েছে যেগুলি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে সুস্পষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতির স্বাক্ষর বহন করে। এতে নিশ্চিতভাবে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, এসব ক্ষেত্রে কোন না কোন সময়ে ন্যায়পরায়ণতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিরস্কারের হাত সক্রিয় ছিল।
মুসলিম অলংকরণ শিল্পে আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আরবী উৎকীর্ণ লিপির ব্যবহার। পবিত্র কুরআনের একটি উদ্ধৃতি, কোন কবির একটি উৎকৃষ্ট চরণ কিংবা অভিনন্দন বা আশীর্বাদমূলক কোন উক্তি প্রান্তভাগের বা ফ্রিজের চারদিকে লেখা হয়, অথবা গোল করে পাকানো কাগজের আকারে (কার্টুশ) লিপিবদ্ধ করা হয়। অভিজাত মালিকের নাম ও জাঁকজমকপূর্ণ উপাধি মাঝে মাঝে কোন মূল্যবান জিনিসের সৌকর্য বিধান করে। এতে তারিখ এবং ব্যুৎপত্তিও দেওয়া হয়। কোন কোন ওস্তাদ কারিগর সময় সময় তার শিল্পকর্মের উপর নিজের নাম, যে শহরে তৈরি করা হয়েছে তার নাম এবং যে বছর কাজ শেষ হয়েছে সে বছরের নামও প্রদান করেন।
ইসলামী শিল্পে আরবদের একক অবদান আরবী হস্তলিপি, ইসলাম যেখানেই প্রসার লাভ করেছে সেখানে মুসলিম প্রভাবের সার্বজনীন স্বাক্ষর রেখেছে। পবিত্র কুরআন এই বর্ণমালায় লিখিত। মুসলিম জগতের সর্বত্র এটি অত্যন্ত পবিত্র। এর লিপিকাররা এর লেখনরীতির সৌকর্য সাধনে পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। অভিজ্ঞ লিপিকাররা পুরুষানুক্রমে এই হস্তলিপি চর্চা করে এতোটা সাফল্য ও স্বীকৃতি লাভ করেছে যে, একটি সুন্দর গ্রন্থ কেবল অমূল্য সম্পদই নয়, একজন ওস্তাদ হস্তলিপিবিদের লেখার একটি টুকরাও সংগ্রাহকের কাছে মহামূল্যবান।
পড়তে না পারলেও ইউরোপীয় কারুশিল্পীরা আরবী হস্তলিপির বাইরের সাদৃশ্যের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হন। এই পরিচয় ও অজ্ঞতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় মার্সিয়ার রাজা ওফফার (৭৫৭-৯৬) তৈরি একটি স্বর্ণ মুদ্রায়, যা বর্তমানে বৃটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। একটি মুসলিম দিনারের সঙ্গে এর গভীর মিল রয়েছে, কিন্তু 'ওফফা রেক্স' কথাটি একটি আরবী রূপকথার মধ্যে উল্টোভাবে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। রূপকথাটি এতোটা নির্ভুলভাবে অনুকরণ করা হয়েছে যে, এতে মূল মুদ্রার তারিখ (৭৭৪) এবং মুসলিম ধর্মীয় বক্তব্যের বর্ণনাও কপিতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। এই মুদ্রার অনুরূপ পরবর্তী কোন মুদ্রা পাওয়া যায় না, কিন্তু এতদ্বারা মুসলিম টাকশাল থেকে নিখুঁত মুদ্রার প্রচলন কতো ব্যাপক ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই মিউজিয়ামে আনুমানিক নবম শতকের ব্রঞ্জের গিল্টি করা ক্রসের উপর মুসলিম শিল্পকর্মের সঙ্গে পাশ্চাত্যের যোগাযোগের আর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর কেন্দ্রস্থলে একটি কাচের মধ্যে কুফী অক্ষরে আরবীতে বিসমিল্লাহ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই শিল্পীরা যে অপরিচিত লেখা নকল করেছেন তার অর্থ বুঝতে পারেননি, কারণ যে উৎকীর্ণলিপি এতোটা মুসলিম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা কিছুতেই একজন খৃস্টান রাজার মুদ্রার উপর কিংবা খৃস্টানদের একটি পবিত্র নিদর্শনের উপর জেনেশুনে দেওয়ার কথা নয়।
এ সময়ের পর থেকে মুসলিম সূত্র হতে প্রায়ই হিজিবিজিভাবে নকল করা আরবী হস্তলিপির টুকরো টুকরো অংশ এবং অন্যান্য কারুকার্য খৃস্টান ইউরোপের কারুশিল্পে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যাপকতা লাভ করে। পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি শ্রদ্ধামূলক আকর্ষণ, মুসলমানরা এককভাবে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিকারী ছিল তা অর্জন করার আগ্রহ, বাণিজ্যিক উদ্যম এবং এ ধরনের অন্যান্য স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু পর্যটক মুসলিম দেশগুলি ভ্রমণ করেন। তারা আরবদের জাঁকজমকের যেসব কাহিনী বর্ণনা করেন তার সমর্থনে মুসলিম দক্ষতার বিভিন্ন প্রামাণ্য জিনিসও নিয়ে আসেন।
নিজেদের দেশে অজ্ঞাত জ্ঞান সঞ্চয়ের জন্য পণ্ডিত ব্যক্তিরা মুসলমানদের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র সফরের পর যেসব জিনিস নিয়ে আসেন তার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অ্যাস্টলেব (নক্ষত্র নির্ণায়ক যন্ত্র)। প্রাচীন গ্রীকদের আবিষ্কৃত জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই যন্ত্রটির উন্নয়ন সাধন করেন আলেকজান্দ্রিয়ার ভূগোলবিদ টলেমী। মুসলমানরা এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদান করেন। অ্যাস্টলেব দশম শতকে ইউরোপে আসে। নামাযের সময় নির্ধারণ এবং মক্কার দিক নির্ণয়ের জন্য প্রাচ্যে এটি প্রধানত ব্যবহৃত হতো। অন্যান্য কাজেও এটি ব্যবহৃত হতো, যেমন আমরা দর্জি কর্তৃক কথিত কাহিনীতে দেখতে পাই যে, বাকচতুর নরসুন্দর অ্যাস্টলেব দেখে ক্ষৌরকার্যের শুভ মুহূর্ত নির্ণয় না করা পর্যন্ত তার উত্ত্যক্ত মক্কেলকে দীর্ঘসময় অপেক্ষায় রাখেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ায় সমগ্র মধ্যযুগে অ্যাস্টলেব ও এর ব্যবহারকারীরা বহু দুর্নাম কুড়ায়। তখন সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হতো যে, জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সমার্থক। দশম শতকের মহান পণ্ডিত গারবার্ট অব গুভার্ন, যিনি ৯৯৯ খৃস্টাব্দে দ্বিতীয় সিলভেস্টার নামে পোপ নিযুক্ত হন, তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করায় বলা হয় যে, কর্ডোভা সফরের সময় তাঁর সঙ্গে শয়তানের মোলাকাত হয়। 'গারবার্ট অ্যাস্টলেবের ব্যবহারের ক্ষেত্রে টলেমীকেও ছাড়িয়ে যান, এবং গলে যে গণিত বিজ্ঞানের চর্চা দীর্ঘকাল বন্ধ ছিল তিনি তা পুনরুজ্জীবিত করেন। এই গারবার্টের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে মালমেসবারীর উইলিয়াম জাদু বিদ্যায় তার নিপুণতা ছিল বলে কুৎসিৎ উক্তি করেন। ফ্লোরেন্সে দশম শতকের শেষার্ধের বিজ্ঞানের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে একটি অ্যাস্টলেব সংরক্ষিত আছে। রোমের অক্ষাংশ পরিমাপের জন্য এটি নির্মিত হয়। কোন কোন মহলের মতে পোপ সিলভেস্টার এটি ব্যবহার করতেন।
প্রাচীনতম তারিখের অ্যাস্টলেব অক্সফোর্ডে রয়েছে। ৯৮৪ খৃস্টাব্দে নির্মিত এই অ্যাস্টলেবটি ইস্পাহানের অ্যাস্টলেব বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিমের দুই পুত্র আহমদ ও মাহমুদ নির্মাণ করেন। বৃটিশ মিউজিয়ামের অ্যাস্টলেবগুলির মধ্যে ১২৬০ খৃস্টাব্দে ইংরেজদের নির্মিত একটি অ্যাস্টলেবও রয়েছে। মার্টন কলেজ লাইব্রেরী ঐতিহ্যগতভাবে এটির অধিকারী। এর সঙ্গে সসারের নামও জড়িত রয়েছে। তিনি তাঁর ছোট ছেলের জন্য অ্যাস্টলেব সম্পর্কে একটি পুস্তিকা লেখেন।
নাবিকদের জন্য অ্যাস্টলেব ছিল অমূল্য জিনিস। সপ্তদশ শতকে নতুন যন্ত্র আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত পাশ্চাত্যে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণের জন্য এর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অ্যাস্টলেবের সৌন্দর্য তার শিল্প-সৌকর্যের মধ্যে নিহিত। কোন প্রকার অবয়ব পরিবর্তন ছাড়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিস্ময়কর যত্ন ও নিপুণতা সহকারে একই আকারে এটি নির্মিত ও খোদাই করা হয়। ১০৬৬-৭ খৃস্টাব্দে টলেডোতে ইব্রাহিম ইবনে সাঈদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত একটি অ্যাস্টলেব ১৫ নং চিত্রে দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে অপর একটির (চিত্র ১৬) তুলনা করা যেতে পারে যা আকারে একই রকমের হলেও কারুকার্যের দিক দিয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম। পারস্যের বিখ্যাত ওস্তাদ শিল্পী আবদুল হামিদ ১৭১৫ খৃস্টাব্দে এটি তৈরি করেন।
আমরা মুসলমানদের প্রাথমিক ধাতব শিল্পে সৌকর্যের যে অসংখ্য নমুনা পেয়েছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে জেরোনা ক্যাথিড্রালে রক্ষিত একটি কাস্কেট (চিত্র ১৭)। এটি কাঠের উপর পিটিয়ে পাতলা করা রৌপ্যমণ্ডিত পাতে গুটানো আকারে রেপুজো কারুকার্য খচিত। কাস্কেটের উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, বদ্র ও তা'রিফ নামক দুজন কারুশিল্পী দ্বিতীয় আল-হাকামের (৯৬১-৭৬) জনৈক ওমরাহর জন্য এটি তৈরি করেছেন। ওমরাহ এটি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিশামকে উপহার হিসাবে প্রদান করবেন। হিশাম কর্ডোভায় তার পিতার উত্তরাধিকারী হিসাবে খলীফা হন। রৌপ্যের উপর কারুকার্যমণ্ডিত যে সামান্য কয়টি শিল্পকর্ম আমাদের যুগ পর্যন্ত টিকে আছে এটি তার অন্যতম। ইহকালে মূল্যবান ধাতব জিনিস ব্যবহারে ধর্মীয় আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এটি স্বর্গের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। খলীফাদের প্রাসাদের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্যের ব্যবহার কোন অবস্থাতেই নিষিদ্ধ ছিল না।
কায়রোতে ফাতিমীয় খলীফাগণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের যেসব সম্পদ সঞ্চয় করেন মিসরীয় রেকর্ডপত্রে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে কিন্তু ১০৬৭ খৃস্টাব্দের বিদ্রোহের সময় তুর্কী ভাড়াটিয়া বাহিনী সেগুলি তছনছ করে। এই বংশের শুরু থেকে রাজপ্রসাদসমূহে যেসব বংশগত সম্পদ সঞ্চিত হয় তার একটি তালিকা ঐতিহাসিক আল-মাকরিযী প্রথম দিকের আর্কাইভজ থেকে নকল করেন। এই আর্কাইভজ তার আমলেও যথাযথ ছিল। এই তালিকা থেকে ঐ সময়কার দরবারের মনিকারগণ যেসব অদ্ভুত বিলাসদ্রব্য উদ্ভাবন করেন তার কিছু কিছু ছবি তুলে ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। এটি এক সুদীর্ঘ দলিল যাতে ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিটি জিনিসের নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এসব জিনিসের মধ্যে রয়েছে সোনা ও রূপার দোয়াতদানি, দাবার ঘুঁটি, ছাতার (প্যারাসল) বাট, বিভিন্ন ফুলদানি, সোনার পাখি, মূল্যবান পাথর খচিত গাছ, প্রভৃতি। উৎসাহী পর্যবেক্ষকরা হাজারো রকমের জিনিস গণনা করলেও আমরা যদি তার থেকে কয়েকশ বাদও দেই, তাতেই যে কেউ বিস্ময় বোধ করবেন। তাছাড়া সমসাময়িক পারস্য পর্যটক নাসির-ই-খসরুর বর্ণনা থেকে ফাতিমীয় খলীফাদের বিখ্যাত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি ১০৪৭ খৃস্টাব্দে জনৈক ওমরাহর সৌজন্যে রাজকীয় প্রাসাদের প্রকোষ্ঠগুলি পরিভ্রমণ করেন। তিনি পরপর এগারটি প্রকোষ্ঠ অতিক্রম করেন যার প্রত্যেকটি পূর্ববর্তীটি থেকে সুন্দর ছিল। দ্বাদশ প্রকোষ্ঠে ছিল সিংহাসন। স্বর্ণের তৈরি সিংহাসনটি শিল্পসৌকর্যে ছিল বিস্ময়কর। এতে সুদর্শন উৎকীর্ণলিপি সমন্বিত বিভিন্ন মৃগয়ার দৃশ্য অংকিত ছিল। তিনটি রৌপ্য নির্মিত সোপানের উপর স্থাপিত সিংহাসনের সম্মুখভাগে উন্মুক্ত কারুকার্য মণ্ডিত একটি বিস্ময়কর সোনালি জাফরি স্থাপন করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এর সৌন্দর্য এতো অপূর্ব ছিল যে, 'এটি বর্ণনাকে হার মানায়' ।
প্রথমদিকের মুসলিম স্বর্ণ ও রৌপ্য শিল্পকর্ম কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে যেসব মুসলিম ধাতব শিল্প পর্যালোচনা করা যায় সেগুলি হচ্ছে ধনী ও অভিজাত মুসলমানগণ কর্তৃক ব্যবহৃত প্রধানত ব্রঞ্জ, পিতল ও তামার আসবাব ও তৈজসপত্রের মধ্যে যেগুলি টিকে আছে সেগুলি। পিসার ক্যাম্পোসান্টোতে অবস্থিত ব্রঞ্জের বিশাল গ্রিফিন (চিত্র ১৮) এমন এক ধরনের শিল্পকর্মের দৃষ্টান্ত যে রীতি সাধারণত ছোট ছোট পাখি ও জীবজন্তু, ফোয়ারার বিভিন্ন অংশ কিংবা বহনযোগ্য জলপাত্রে দেখা যায়। এগুলি থেকেই পরবর্তীকালের তথাকথিত ইউরোপীয় একোয়ামানিলেস তাদের অদ্ভুত আকার লাভ করে।
অতি আদরের জীবের আত্মতুষ্টির প্রতিমূর্তি বিস্ময়কর দানব গ্রিফিনের দেহ সম্পূর্ণরূপে খোদাই করা নকশায় আবৃত। ঘাড় ও পাখা দুটির উপর পাল্লার ন্যায় পালক অংকিত করা হয়েছে। পিছনের দিক দেখলে মনে হয় গোল ডোরাওয়ালা কাপড় সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তার প্রান্তভাগে কুফী হস্তলিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছে এবং তা বক্ষের চারদিকে বৃত্তাকারে অব্যাহত রয়েছে। কটিদেশে তীক্ষ্ণ খোব সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শৃঙ্খল প্রান্তভাগের অভ্যন্তরে এসব খোবে সিংহ ও বাজপাখি খোদাই করা হয়েছে। উৎকীর্ণলিপিতে কবিতায় মালিকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু এই অপূর্ব ব্রঞ্জ মূর্তিটি তৈরির তারিখ বা মূল পরিচয়ের কোন সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এটি সম্ভবত একাদশ শতকের কোন ফাতেমীয় রাজপ্রাসাদ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
রিলিফে উত্তোলিত নকশা বা খোদাইকরা নকশা ছাড়া ধাতব কারুকার্যের অন্যান্য রীতিও মুসলিম কারুশিল্পীরা চর্চা করেন। তারা ব্রঞ্জ বা তামার উপর স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত কারুকার্যে অত্যন্ত নিপুণতা অর্জন করেন। বিভিন্ন পন্থায় অনুসৃত এই পদ্ধতি সাধারণত ডামাস্কেনিং নামে পরিচিত। ইউরোপীয়দের এই শিল্প চর্চার সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ক থেকেই এই নামের উদ্ভব হয়। সেখানে এটির উদ্ভব না হলেও এর চর্চা অবশ্যই হতো। এই জাতীয় সবচাইতে সূক্ষ্ম ও প্রাচীনতম শিল্পকর্মে ধাতব পদার্থের উপর নকশাগুলি খোদাই করা হতো এবং তারপর শূন্যস্থানগুলি স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা ভরাট করে দেওয়া হতো। এক ধরনের কালো আঠালো পদার্থ দিয়ে অন্যান্য কর্তিত অংশ ভরাট করে প্রায়ই এই নকশার সৌকর্য সাধন করা হতো। কোন কোন ক্ষেত্রে এটিই ছিল এই কারুকার্যকে সমৃদ্ধ করার একমাত্র পন্থা।
মুসলিম খোদাই করা ধাতব শিল্পকর্ম দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ণতা লাভ করে এবং দুইশত বছর পর্যন্ত এর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব অব্যাহত থাকে। এর সর্বাধিক সুন্দর এবং আদর্শ নমুনা হচ্ছে বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পিতলের সোরাহী (চিত্র ১৯), যার পুরোটাই রৌপ্য খচিত কারুকার্যমণ্ডিত। দশটি পৃষ্ঠদেশ সমন্বিত অবয়ব ও গণ্ডদেশ আড়াআড়িভাবে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত এবং সেগুলি বিভিন্ন আকারের খোবে বৈচিত্রময়। বহির্ভাগের প্রতিটি অংশ বিভিন্ন ধরনের ছবি, জ্যামিতিক বা পত্রপুষ্পের নকশা এবং উৎকীর্ণলিপির কারুকার্যে গভীরভাবে সুশোভিত। পাদদেশে গ্রন্থীযুক্ত কারুকার্যের একটি ঝালর থোবার ন্যায় ঝুলন্ত রয়েছে এবং এর মধ্যদিয়েই নকশার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খচিত ছোট ছোট রূপার পাতে যেসব ছবি তৈরি করা হয়েছে সেগুলির আকার অপূর্ব এবং সেগুলিতে অত্যন্ত যত্নসহকারে মুখমণ্ডল, হাত, গুটানো কাপড় প্রভৃতি বিশদভাবে খোদিত হয়েছে। গণ্ডদেশের চারদিকে একটি উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, সোরাহীটি মসুলে ১২৩২ খৃস্টাব্দে শুজা ইবনে হানফার কর্তৃক নির্মিত হয়েছে।
সোরাহীটি মসুলভিত্তিক একটি শিল্পচর্চা কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্বশীল। প্রাচীন ও সমৃদ্ধ তাম্র খনির সঙ্গে এই নগরীর গভীর যোগাযোগ ছিল। এখানে বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পের জন্য বিখ্যাত শিল্পীদের সমাবেশ ঘটে। এম রিনাউদ কর্তৃক উদ্ধৃত ত্রয়োদশ শতকের জনৈক লেখকের ঘোষণা অনুযায়ী এখানে বিশেষ করে রান্নাবান্না ও খাবারের কাজে ব্যবহৃত তামার পাত্র তৈরির জন্য এসব কারুশিল্পী সমবেত হয়। কিন্তু এরও আগে মসুলের উত্তর ও পূর্বদিকের বিভিন্ন অঞ্চলে একই রীতি ও কারুকার্যের শিল্পকর্ম দেখা যায়। এতে এই শিল্পচর্চার সঙ্গে আরমেনীয় ও পারস্য সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। অবশ্য এখন পর্যন্ত তার পক্ষে কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী কালের শিল্পকর্মে কারুকার্যের রীতি ও কোন কোন বৈশিষ্ট্যে দ্বিতীয় শতকের গ্রীক ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকায় এইরূপ সম্ভাবনা বাতিল করা যায় না যে, দূর অতীত থেকে এসব অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্থানীয় শিল্প রীতিকে ভিত্তি করে হয়তো বা মুসলমানরা এই শিল্পের বিকাশ সাধন করে।
এই শিল্পচর্চার প্রভাব সিরিয়ার মধ্য দিয়ে মিসরে দ্রুত প্রসারিত হয়। মঙ্গোল আক্রমণের ফলে মেসোপটেমিয়ার নগরগুলি ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ায় এবং কারুশিল্পীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় এই স্থানান্তর দ্রুত সম্পাদিত হয়। চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাগু কর্তৃক বাগদাদ অধিকার এবং খলীফা মুসতাসিমের মৃত্যু ১২৫৮ খৃস্টাব্দে আব্বাসীয় খেলাফতের অবসান ঘটায়।
বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত রৌপ্য ও স্বর্ণ খচিত একটি পিতলের রাইটিং কেস-এ (চিত্র ২০) এর শিল্পী বাগদাদের অধিবাসী মাহমুদ ইবনে সানকার-এর নাম রয়েছে। কিন্তু এটি তার পিতৃপুরুষদের নগরীতে (চিত্র ২২) তৈরি হতে পারে না। কারণ এর তারিখ দেওয়া হয়েছে ১২৮১ খৃস্টাব্দে, যখন এর অধিবাসীরা ছিল নগরীর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বসতি স্থাপনকারী গ্রামের লোক। এই সুদর্শন রাইটিং কেসটি কারুকার্য ও শিল্পসৌকর্যে সোরাহীটি থেকে কোন অংশে নিম্নমানের নয়। তিনটি বড় বড় পদকে চারগ্রুপে অংকিত দ্বাদশ রাশিচক্র এর ঢাকনির প্রধান অলংকার। ঢাকনির ভেতরের দিকে একসারি বৃত্তের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন নক্সা দেওয়া হয়েছে। মধ্যবর্তী বৃত্তের মধ্যে একটি মনুষ্য মুখাকৃতির আলোক বিকিরণকারী সূর্য রয়েছে এবং এর উভয় পার্শ্বের বৃত্তগুলিতে উপবিষ্ট অবস্থায় রয়েছে চন্দ্র, কলম ও কাগজ হাতে বুধ, বীণা হাতে শুক্র, তলোয়ার ও কর্তিত মস্তক হাতে মঙ্গল, বিচারকের আসনে বৃহস্পতি এবং যষ্টি ও থলে হাতে শনি গ্রহ।
সুন্দর সুন্দর কারুকার্যমণ্ডিত ভিত্তিভূমির উপর এসব নকশা অংকন করা হয়েছে এবং চারদিকের প্রান্তভাগেও রয়েছে জটিল নকশা। এই কেসটি এ ধরনের বহু কেসের মধ্যে একটি অপরূপ দৃষ্টান্ত। মূল অবস্থায় ২২ নং চিত্রের ন্যায় এর মধ্যে ছিল কালি রাখার কোটর, বালি ও আঠা রাখার কোটর এবং খাগের কলম রাখার জন্য আয়তাকার খোব।
খোদাই করে খচিত করার এই শিল্প দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কারুকার্যও পরিবর্তিত হয় এবং তা চতুর্দশ শতকে কায়রোভিত্তিক দ্বিতীয় শিল্পধারার বৈশিষ্ট্য নিয়ে নতুনভাবে বিকশিত হয়। কারুকার্যপূর্ণ পৃষ্ঠদেশে মাঝে মাঝে যেসব পদক স্থাপন করা হয় সেগুলির চারদিকে পত্র-পুষ্প শোভিত সূক্ষ্ম প্রান্তভাগের উদ্ভব হয়। উৎকীর্ণলিপি আনুষঙ্গিক না হয়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। ২৩ নং চিত্রটি প্রান্তভাগ সমন্বিত একটি আদর্শ পদক। ১২৯৩ থেকে ১৩৪১ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত মিসরের সুলতান আল-নাসির মোহাম্মদ ইবনে কালাউনের জন্য নির্মিত একটি বৃহৎ থালা থেকে এই বিশদ নকশাটি তুলে ধরা হয়েছে।
আমাদের কাছে প্রায়ই অত্যন্ত সুন্দরভাবে রক্ষিত যে অসংখ্য শিল্প নিদর্শন রয়েছে এ দুটি দৃষ্টান্ত থেকে সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। এগুলির মধ্যে রয়েছে সোরাহী, থালা এবং অন্যান্য সুদর্শন গঠনের পাত্র, যেগুলির নাম-পরিচয় তাদের কারুকার্যে নিহিত এবং যেগুলি সুলতান ও বড় বড় অভিজাত ব্যক্তিদের উৎসব অনুষ্ঠানের শোভাবর্ধন করতো। জুয়েল কেস, রাইটিং বক্স, মোমবাতিদানি, ধূপদানি, ফুলদানি এবং অনুরূপ অন্যান্য যে সব জিনিস গার্হস্থ্য জীবনে আড়ম্বরপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হতো সেগুলি বৈচিত্র ও সংখ্যার দিক দিয়ে এতো বেশি যে তা বিশেষ বিশেষভাবে বর্ণনা করা যায় না। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে এই শিল্প-কর্মের অত্যন্ত কদর ছিল। সম্পদশালী অভিজাত ব্যক্তিরা বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্প কর্মের জন্য অধীর আগ্রহ প্রকাশ করতেন এবং প্রায়ই নিজেদের জন্য এসব জিনিস বিশেষভাবে তৈরি করিয়ে নিতেন। বৃটিশ ও ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত বহু শিল্প নিদর্শনের সঙ্গে চমকপ্রদ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এর কোন কোনটি শিল্প সৌকর্যের দিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে এই শিল্পের অবক্ষয় শুরু হয়। সিরিয়ায় মঙ্গোলদের হস্তক্ষেপ এবং ১৪০১ খৃস্টাব্দে তৈমুর কর্তৃক দামেস্কের ধ্বংস সাধন বড় বড় শিল্প কেন্দ্রগুলিকে বিপর্যস্ত করে। ১৫১৭ খৃস্টাব্দে উসমানীয়দের মিসর বিজয় কায়রোর অবশিষ্ট শিল্পীদেরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু এটি নিজস্ব কেন্দ্রগুলিতে বিলুপ্ত হতে থাকলেও ইউরোপে এর আকর্ষণ ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পায়। এখানেই তার গৌরবদীপ্ত পুনর্জন্ম ঘটে। ক্রুসেডের আমলে ইটালীয় শহরগুলিতে যে প্রাচ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, পঞ্চদশ শতকে তা বিপুল সমৃদ্ধি লাভ করে। ছোট ছোট ইটালীয় রাজন্যবর্গের আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে প্রাচ্যের জিনিস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের কারুশিল্পীরা আদর্শ হিসাবে এসব শিল্পকর্ম প্রবর্তন করে এবং এগুলির সৌকর্য সাধনে অনুকরণমূলক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
ভেনিসে মুসলিম ধাতব শিল্প স্থানীয় কারুশিল্পীদের এতটা অনুপ্রাণিত করে যে, সেখানে সুস্পষ্টভাবে একটি ভেনেসীয় প্রাচ্য শিল্পচর্চা কেন্দ্র গড়ে ওঠে এবং ইটালীয় রেনেসাঁর রুচির সঙ্গে মুসলিম শিল্পরীতি ও কারুকার্যের সংমিশ্রণ সাধিত হয়। ২১ নং চিত্রটি এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এটি পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত একটি পিতলের থালা। এটি মুসলমানদের পারস্পরিক বুনটের গ্রন্থী নকশায় রৌপ্যখচিত একটি শিল্পকর্ম, যা প্রথমদিকের বলিষ্ঠ কায়রো কারুকার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর কেন্দ্রস্থলে ভেরোনার একটি অভিজাত পরিবার ওচি ডি কেন-এর স্মারক হিসাবে মিনাকরা একটি রূপার শিল্ড রয়েছে। অন্যান্য শিল্পকর্ম সমসাময়িক পারস্য শিল্পকর্মের আদর্শে তৈরি। এগুলি প্রকৃতপক্ষে ভেনিসেই উক্ত নগরীতে বসবাসকারী পারস্যের কারুশিল্পীরা তৈরি করতেন।
ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে ধাতব শিল্পকর্ম পারস্যে মসুলের শিল্পচর্চা কেন্দ্রের ন্যায় একই পন্থা অনুসরণ করে। কিন্তু এখানে কারুকার্যমণ্ডিত পাত্রগুলির গাঠনিক সৌকর্য বিধানের এবং অলংকরণের কতিপয় সংশোধনীর মাধ্যমে এর অগ্রগতি সূচিত হয়। ষোড়শ শতকের প্রাথমিক বছরগুলিতে সাফাভী বংশের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে পারস্য শিল্পকলার পুনরুজ্জীবনের সূচনায় একটি নতুন রীতিতে এসব পরিবর্তনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। এই রীতিতে সাধারণত খোদাইকরণ রৈখিক নকশায় বা উৎকীর্ণ লিপিতে রূপান্তরিত হয় এবং তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনুসৃত পাকানো নকশার ভিত্তিভূমিতে করা হয়। ২৪ নং চিত্রে এই রীতির একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। একটি বাটির ঢাকনির উপর এই নকশাটিতে বিখ্যাত পারস্য কারুশিল্পী মাহমুদ আল-কুর্দীর স্বাক্ষর রয়েছে। ষোড়শ শতকের প্রাথমিক বছরগুলিতে তিনি ভেনিসে শিল্প চর্চা করেন।
মধ্যযুগীয় মুসলিম কারুশিল্পীদের স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত শিল্পকর্ম কোন কোন দিক দিয়ে সমসাময়িক ইউরোপীয় কারুশিল্পীদের তৈরি মিনাকরা ধাতব শিল্পের একটি প্রাচ্য প্রতিরূপ। ইউরোপীয়দের চ্যাম্পলিত পদ্ধতিতে বহু জিনিসের ওপর আঠালো রঙিন কাচে নকশা করা হয়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের রীতি ছিল অনুরূপ একটি পদ্ধতিতে মূল্যবান ধাতব পদার্থের সাহায্যে নকশা করা। ধাতব পদার্থের উপর মিনা করা অবশ্যই একটি প্রাচ্য রীতি, কিন্তু এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামী দৃষ্টান্ত কদাচিৎ দেখা যায়। আল-মাকরিযীর ফাতিমীয় সম্পদের তালিকায় রঙের সাহায্যে মিনাকরা সোনালি ফলকের উল্লেখ রয়েছে। ফুসতাতের আবর্জনার স্তূপ থেকে পত্রালংকার এবং ক্রয়যেনে রীতিতে মিনাকরা উৎকীর্ণ লিপি সমন্বিত একটি ধাতব থালা উদ্ধার করা হয়। এটি বর্তমানে কায়রোর আরব আর্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। স্পষ্টত এটিও ফাতিমীয় যুগের। কিন্তু মুসলিম মিনাকরা ধাতব শিল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নমুনা হচ্ছে ইন্সব্রুকের মিউজিয়াম কার্ডিনেণ্ডামে রক্ষিত একটি তামার বাটি। চ্যাম্পলিভ রীতিতে সুশোভিত নকশার মধ্যস্থলে একটি বিরাট পদকে 'অ্যাসেন্ট অব আলেকজাণ্ডার' (আলেকজান্ডারের উত্থান) প্রতিফলিত করা হয়েছে। চারদিকে পৌরাণিক জীবজন্তুসহ অন্যরা রয়েছে এবং পটভূমিতে রয়েছে তাল জাতীয় গাছ ও নানা প্রকার দণ্ডায়মান ছবি। রীতির দিক দিয়ে বাইজেন্টাইন হওয়া সত্ত্বেও এই বাটির উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হয়েছে যে, এটি মেসোপটেমিয়ার জনৈক অটুকী রাজার জন্য তৈরি করা হয়, যিনি দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে রাজত্ব করেন।
আমরা যে কয়টি নমুনা পেয়েছি তাতে মনে হয় যে, মিনার কাজ মুসলিম ধাতবশিল্পীদের প্রিয় ছিল না। পঞ্চদশ শতকের দিকে মুসলমানদের মধ্যে পুনরায় মিনাশিল্পের চর্চা দেখা যায়। এসময় স্পেনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে মিনাকরা তলোয়ারের আসবাবপত্র তৈরি হয়। এসব দৃষ্টান্ত ও পরবর্তীকালে ভারতে মুঘল সম্রাটদের জন্য তৈরি করা মিনাশিল্প ঐতিহ্যগত না হয়ে সম্ভবত বিদেশী রীতির প্রতিফলন।
Mৃৎপাত্রের উপর রঙিন উজ্জ্বলতা (গ্লেজ) প্রয়োগের মাধ্যমে আর এক ধরনের মিনার কাজে মুসলমানরা অনেক পূর্ব থেকেই অত্যন্ত সুদক্ষ শিল্পী ছিলেন। মুসলিম শাসনাধীনে মিসর ও নিকট-প্রাচ্যের স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা তাদের এলাকায় প্রাচীনকাল থেকে কমবেশি ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় যে মৃৎশিল্প ছিল তা পুনরুজ্জীবিত করেন এবং তার প্রয়োগ পদ্ধতি ও কারুকার্যের কৌশলের উন্নতি সাধন করেন। মিসরে বহু যুগ আগে থেকেই উপরিভাগে সুন্দর সবুজ-নীল উজ্জ্বলতাসম্পন্ন প্রাচীর টালি প্রচলিত ছিল। আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৫০০ খৃস্টাব্দে সুসায় দারিয়ুসের প্রাসাদে বিভিন্ন বর্ণের অনুরূপ শিল্প-সৌকর্যের প্রচলন ছিল। আরব অভিযানের পূর্ব-পর্যন্ত এসব অঞ্চলে সবার অজ্ঞাতে উপরোক্ত শিল্প চর্চা অব্যাহত ছিল। মুসলিম প্রভাবে মৃৎশিল্পীরা নতুন রীতি ও নকশা কৌশলের মাধ্যমে পুনরায় এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
মুসলিম মৃৎশিল্পের প্রাথমিক ইতিহাস এখনো অলিখিত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বহু চমকপ্রদ নিদর্শন আবিষ্কৃত হলেও এগুলির ব্যুৎপত্তি এবং সময়-তারিখ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমানের বিষয়। এ কথা পরিষ্কার যে, পারস্য, মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া ও মিসরে অবস্থিত কেন্দ্রগুলি থেকে বিভিন্ন ধরনের মৃৎশিল্প মুসলিম বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ মৃৎপাত্রের উদ্ভব মূলত কোথায় হয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ধারণ অসম্ভব। জনপ্রিয় শ্রেণীর মৃৎপাত্রগুলি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে ছিল এবং একই ধরনের ও নকশার মৃৎপাত্র বিভিন্ন প্রাচীন এলাকায় পাওয়া যায়, যেসব এলাকা পরস্পর থেকে বহু দূরে বিচ্ছিন্ন। প্রাথমিক মুসলিম মৃৎশিল্প কি ধরনের ছিল দু-একটি নমুনা থেকে তা বোঝা যায়।
সুসায় একটি গ্লেজ করা মাটির থালা পাওয়া গেছে (চিত্র ৩০)। এতে সাদা ভিত্তিভূমির উপর উজ্জ্বল নিকেল ব্লু রঙে পপিবৃক্ষের একটি মাথা অংকিত করা হয়েছে। এর তৈরিকাল নবম শতক বলে ধরা হয়, কারণ সামাররার রাজপ্রাসাদ এলাকায় খননকার্যের পর অনুরূপ মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। খলীফা হারুনুর রশীদের জনৈক পুত্র ৮৩৬ খৃস্টাব্দে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন এবং পঞ্চাশ বছর পর তা পরিত্যক্ত হয়। এই থালাটি বর্তমানে পাশ্চাত্য মৃৎশিল্পে অত্যন্ত জনপ্রিয় নীল ও সাদা কারুকার্যের একটি প্রাথমিক দৃষ্টান্ত। এই ফ্যাশনটি আধুনিক ইউরোপে পরবর্তীকালে চীন থেকে আসে। আব্বাসীয় শাসকগণ নবম শতকেই চীনা মৃৎশিল্প আমদানি করেন। সামাররায় তা রাজবংশের আমলে নির্মিত মৃৎশিল্প ও চীনামাটির পাত্র আবিষ্কৃত হয়। সে সঙ্গে ঐসব পাত্রের স্থানীয়ভাবে অনুকরণ করা মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। উপরোক্ত থালাটির বাস্তবতাপূর্ণ ডিজাইন এই বিদেশী ঐতিহ্যের অনুসারী। কিন্তু যে অপরূপ নীল বর্ণে নকশাটি প্রতিফলিত করা হয়েছে তা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। এই রংটি পরবর্তীকালে চীনে রফতানি করা হয় এবং এটি সেখানে 'মুসলিম ব্লু' নামে পরিচিত হয়। নীল ও সাদা পাত্র তৈরিতে এই রঙটি চীনাদের কাছে এতো অপরিহার্য ছিল যে; কোন অজ্ঞাত কারণে এর সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় এ ধরনের মৃৎপাত্র উৎপাদনও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। তাই পাশ্চাত্যবাসী অভ্যাসবশত 'ব্লু এণ্ড হোয়াইট চায়না' দূরপ্রাচ্যের বলে মনে করলেও বিশেষ ধরনের ব্লু মুসলমানদেরই অবদান। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে এশিয়া মাইনরের কুতাহিয়ায় মুসলিম মৃৎশিল্পীরা এই রঙ কতিপয় মৃৎপাত্রে অপরূপভাবে ব্যবহার করেন।
প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণা প্রতিফলিত করতে গিয়ে মুসলিম মৃৎশিল্পীরা বিদেশলব্ধ অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংযোজিত করে নিজেদের মহান মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রাখেন। কিভাবে এই মৌলিকত্ব বজায় রাখেন তা বহু চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। ৩১ নং চিত্র তথাকথিত গাবরি মৃন্ময় পাত্রের একটি ঢাকনি। এ ধরনের মৃন্ময়পাত্র অগ্নিপূজকরা তৈরি করতেন বলে ধারণা করা হয়। আরব বিজয়ের অনেক পরেও এরা পারস্যের কোন কোন অঞ্চলে তাদের প্রাচীন ধর্ম আঁকড়ে থাকে। এই কারুকার্য ইটের ন্যায় লাল দেহাবয়বের উপর সাদা কাদামাটির যে পাতলা আবরণ থাকে তা কেটে অংকন করা হয়। তারপর সমস্ত অবয়বটি ঈষৎ হলদে, সবুজ, বেগুনী বা বাদামী রঙের স্বচ্ছ উজ্জ্বলতায় আবৃত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রঙ এমন এলোমেলোভাবে দেওয়া হয় যা সমসাময়িক একটি চীনা রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অশ্বারোহী শিকারী, পৌরাণিক দানব এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পত্রালংকার প্রভৃতি সাসানীয় উপাদানের সাধারণ প্রচলন থেকে ইতিপূর্বে মনে করা হতো যে, গাবরি মুসলিম যুগের সূচনা থেকে প্রবর্তিত হয়েছে। কিন্তু একাদশ বা দ্বাদশ শতকের রীতির কুফী বর্ণমালার উৎকীর্ণলিপির দৃষ্টান্ত থেকে এর অধিকাংশ শিল্পকর্ম এযুগ থেকে শুরু হয়েছে বলে ধরা হয়। গ্রাফিটো নামে পরিচিত- খোদাই করা নকশারীতি চীনে সাধারণভাবে প্রচলিত থাকলেও সেখানেই এর উদ্ভব হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। ইসলামের পূর্ববর্তী মিসরেও এর প্রচলন ছিল। পঞ্চদশ শতকে ইটালীয় মৃৎশিল্পীরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এই রীতি অনুসরণ করেন। তারা সম্ভবত মুসলিম সূত্র থেকে এটি লাভ করেন। সেখান থেকেই অনেকখানি পরিণত কারিগরি জ্ঞান লাভ করার ফলে ইটালীয় রেনেসাঁর যুগে মৃৎশিল্প পুনরুজ্জীবনে এটি তাদের বিশেষ সহায়ক হয়।
যাকে দীপ্তিমান-মৃৎশিল্প (লাস্টার্ড পটারি) বলা হয়, সেখানে মুসলমানরা সীমাহীন সাফল্য অর্জন করে। এতে একটি রঞ্জিত ভিত্তিভূমিতে ধাতব লবণের সাহায্যে নকশাটি অংকন করা হয় এবং সেখানে এমনভাবে ধূম্র প্রয়োগ করা হয় যাতে একটি ধাতব উজ্জ্বল তাম্র-লাল থেকে শুরু করে সবুজ-হলদে উজ্জ্বলতার সৃষ্টি হয়। এই উজ্জ্বলতা বিভিন্ন আভাযুক্ত ধনুরাকার সমুজ্জ্বল নমুনার হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে এতে রংধনুর আলো ঝলোমলো রংয়ের প্রতিফলন ঘটে। নিকট-প্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে দশম শতকের শিল্পকর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। এত দ্বারা ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র এই শিল্পের অত্যধিক কদর প্রমাণিত হলেও এর উদ্ভব কোথা থেকে তা সন্দেহাবৃত। এটি প্রথমে মিসরে না পারস্যে তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কে এখনো বিতর্ক চলছে এবং এ সম্পর্কে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। ২৬ নং চিত্রের বিরাট পাত্রটি ফুসতাতের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এটি একাদশ শতকের ফাতেমীয় শিল্পকর্ম বলে অনুমান করা হয়। ৩২ নং চিত্রটি একটি থালা। নিষ্প্রভ দীপ্তির মধ্যে একটি উজ্জ্বল গ্রিফিন, পত্রালংকার এবং বিশেষ ধরনের কুফী হস্তলিপি রয়েছে। ১২২০ খৃস্টাব্দে মঙ্গোলদের দ্বারা ধ্বংস প্রাপ্ত একটি প্রাচীন পারস্য নগরী রাই বা রাজিসের ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি আবিষ্কৃত হয়।
রাই মৃৎশিল্পের একটি বিরাট কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতির উদ্ভব হয়। এর ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন সুদর্শন শিল্পকর্মের একটি খনি। সুনির্দিষ্টভাবে এই নগরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কতিপয় পাত্র ও থালা রয়েছে যা অস্বচ্ছ (ওপেক) বর্ণে রঞ্জিত। বর্ণগুলি হচ্ছে নীল, সবুজ, লাল-বাদামী ও বেগুনী। মাঝে মাঝে সাদা বা রঙের আভাযুক্ত পাদভূমিতে সোনালি পত্রের স্পর্শ। বিষয়বস্তুতে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত বিভিন্ন ছবি ও আনুষ্ঠানিক অলংকার। সমসাময়িক পাণ্ডুলিপিগুলির চিত্রসমূহের সঙ্গে এগুলির এতটা মিল রয়েছে যে, যেন শিল্পীরা পাণ্ডুলিপির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই এগুলি অংকন করেছেন। ২৫ নং চিত্রের পেয়ালাটিতে পরস্পর বিরোধী 'এস' আকৃতির বক্ররেখা দ্বারা গঠিত খোবের মধ্যে স্পিঙ্কস সঙ্গীত শিল্পীদের ছবি অংকন করা হয়েছে। এটি প্রায়ই 'মিনিয়েচার' পাত্র হিসাবে অভিহিত এ ধরনের শিল্পের একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। রাই নগরী যখন মঙ্গোলদের দ্বারা ধ্বংস হয় তখন এই শিল্প উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছে।
২৭ নং চিত্রের পাত্রটি গাঢ়নীল ও কালোবর্ণের নীলকান্তমণির রঙে রঞ্জিত। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে পারস্যের সুলতানাবাদে তৈরি এক ধরনের মৃৎশিল্পের রীতিতে এটি তৈরি করা হয়েছে। এই আকৃতির পাত্র ইটালীয়দের কাছে আলবারেল্লো নামে পরিচিত ছিল। নামটি সম্ভবত আরবী আল-বারনিয়া থেকে নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ একটি ওষুধের পাত্র। এ ধরনের পাত্র প্রাচ্যে কি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো উপরোক্ত নাম থেকে তা বোঝা যায় এবং ইটালীতেও একই উদ্দেশ্যে এগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে। পঞ্চদশ শতকের ইটালীয় ওষুধের দোকানে এ ধরনের পাত্র প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত ওষুধ ভর্তি করে সাজিয়ে রাখা হতো। আমাদের দেশে এখনো যেভাবে চীনা জিঞ্জার-জার (আদ্রক ভর্তিপাত্র) আমদানি করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ইটালীয় ওষুধের পাত্রও ওষুধ ব্যবসায়ের মাধ্যমে পশ্চিমদিকে প্রবর্তিত হয়। ২৮ নং চিত্রে প্রাচ্যের অনুকরণে একটি ইটালীয় পাত্র দেখা যায়। এটি ঈষৎ পীতবর্ণের পোড়ামাটির পাত্রে গাঢ়নীল রঙে রঞ্জিত একটি আলবারেল্লো। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফায়েনযায় এটি তৈরি করা হয়।
ইটালীয়রা দীপ্তিমান বর্ণে রঞ্জিত ওষুধের পাত্র, প্রাচ্যে এধরনের পাত্রের মুসলিম কেন্দ্র ভ্যালেনসিয়া থেকে পেয়েছে। এ জাতীয় যেসব উৎকৃষ্টতম নিদর্শন রয়েছে সেগুলিও এখানে তৈরি করা হয়। কোন কোন সময়ে বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী এগুলি তৈরি করা হতো, যাতে তাদের কুলচিহ্ন অংকিত করা হতো। ২৯ নং চিত্রের থালাটি হলদে দীপ্তি ও নীল বর্ণে রঞ্জিত করা হয়েছে। এটি পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ফ্লোরেন্সের ডেগলি আগলি পরিবারের জনৈক সদস্যের জন্য ভ্যালেন্সিয়ায় তৈরি করা হয়। উক্ত পরিবারের গৌরব প্রতীকও এটিতে অংকিত রয়েছে। স্পেনীয় দীপ্তিমান মৃৎশিল্প ইটালীয় অনুকরণমূলক প্রতিযোগিতাকে এতোটা অনুপ্রাণিত করে যে, তার ফলেই ষোড়শ শতকে স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা কিভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রেনেসাঁর নকশা দীপ্তিমান করতে হবে তা আয়ত্ত করে। তারা এমন সব পন্থায় অম্লান দীপ্তি আরোপ করেন যা ঐতিহ্যের ধারা পাল্টিয়ে দেয়। বিখ্যাত শিল্পকেন্দ্র গুব্বিওতে মহান শিল্পী জিওরজিও আদ্রিওলির সোনালি ও চুনীবর্ণের দীপ্তি ইটালী কিংবা প্রাচ্য সর্বত্রই অপ্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে।
ষোড়শ শতকের সূচনায় মৃৎশিল্পের প্রাচীন ধারা সর্বত্রই পরিবর্তিত হতে থাকে। নতুন রূপায়ণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাসম্পন্ন দুটি রূপ এশিয়া-মাইনর ও সিরিয়ায় ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয় এবং এক অপরূপ সমৃদ্ধি লাভ করে। সাদা পল্লবের আবরণযুক্ত পোড়ামাটির পাত্রে স্বচ্ছ উজ্জ্বলতা দ্বারা সেগুলি রঞ্জিত করা হয় এবং নকশাগুলি কালো পটভূমিতে সবুজ, নীল ও নিষ্প্রভ বাদামী রঙে অংকিত হয়। এশিয়া-মাইনরের কেন্দ্রগুলিতে প্রায়ই এগুলিতে টমাটোর ন্যায় উজ্জ্বল লালবর্ণও আরোপ করা হয়। এসব মৃৎশিল্পের চমকপ্রদ দিক হচ্ছে যে, বর্গাকৃতি প্রদানের মাধ্যমে এগুলি প্রাচীরের টালি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিটে পুনরাবৃত্তিমূলক আনুষ্ঠানিক নকশা অংকন করা হতো অথবা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা সম্বলিত বড় বড় অংশ পৃথকভাবে তৈরি করা হতো। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের কনস্টান্টিনোপল, ব্রুসা ও অন্যান্য বড় নগরীতেও বহু ভবনে এ ধরনের নকশাসম্বলিত প্রাচীর রয়েছে।
পরবর্তী তিনটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা অংকিত টালির নমুনা। প্রথমটিতে (চিত্র ৩৩) কারুশিল্পী প্রতিটি টালির মধ্যস্থলে দুই দিক সরু ডিম্বাকৃতির একটি নকশা অংকন এবং প্রত্যেক কোণে একই নকশার এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করেন। এতে অনেক টালি একত্র করার পর উপর থেকে নিচের দিকে আঁকাবাঁকাভাবে পরস্পর বিরোধী সাদা সাদা ডোরা সৃষ্টি হয়। এই ডিজাইনের বিপরীত দ্বিতীয়টি (চিত্র ৩৪) হচ্ছে সম্পূর্ণ নৈসর্গিক। এতে সমান্তরালভাবে ঢেউ খেলানো লতায় পর্যায়ক্রমিকভাবে দ্রাক্ষাপত্র ও আঙ্গুর এবং বাদাম-কুঁড়ি অংকিত করা হয়। তৃতীয় নকশাটি (চিত্র ৩৫) উপরোক্ত আনুষ্ঠানিক ও নৈসর্গিক উভয় উপাদানের সংমিশ্রণে অংকিত হয়েছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাঝে মাঝে গোলাপাকৃতির পুষ্পশোভিত ক্ষীণ একান্থাসের পত্ররাজি। সহজ-সরল বিষয়গুলিকে জটিলতাপূর্ণ নকশায় রূপান্তরিত করতে গিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অসঙ্গতির মধ্যেও সঙ্গতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি এই রীতির বৈশিষ্ট্য। মুসলিম কারুশিল্পীরা কিভাবে কারুশিল্পের বিভিন্ন ধারণার সুষ্ঠু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এখানে ঘটনাক্রমে তা লক্ষণীয়। ৩৬ নং চিত্রে প্রদর্শিত সুন্দর প্যানেলটিতে টালি-নকশার দ্বিতীয় প্রকার, অর্থাৎ একটি বড় আকারের মধ্যে সামগ্রিক নকশা দেখানো হয়েছে। এটি হালকা নীল, সবুজ ও বাদামী রঙে রঞ্জিত দামেস্ক শিল্পকর্মের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা তুর্কী মৃন্ময় পাত্রের সঙ্গে সিরীয় মৃন্ময় পাত্রের পার্থক্য সৃষ্টি করেছে।
তুর্কী ও সিরীয় মৃৎশিল্পীরা তাদের টালিতে একটি রীতি প্রয়োগ করেছেন এবং থালা, বাটি, ফুলদানি ও অন্যান্য বিচিত্র ধরনের পাত্রে একই ধরনের নকশা ব্যবহার করেছেন। ৩৭ নং চিত্রের বোতলটিতে স্পিঙ্কস, পাখি ও জীব-জন্তুর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের নকশা অংকন করা হয়েছে। আপেল-গ্রীন পাদভূমিতে ছবিগুলি সাদা রাখা হয়েছে। এগুলি কিছুটা সেকেলে উপাদান সমন্বিত একটি বিশেষ শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। লালবর্ণের যে পরশ রঙের পরিকল্পনাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে তা মূলত তুর্কী। এশিয়া-মাইনরের শিল্পকর্মে সবসময় লাল রঙ দেখা যায় না, আর সিরীয় শিল্পকর্মে তা আদৌ নেই।
এ ধরনের মৃৎশিল্পে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে সব আলঙ্কারিক উপাদান ব্যবহৃত হয় সেগুলি নিঃসন্দেহে পত্র-পুষ্প অলংকার। দামেস্ক প্যানেলে (চিত্র ৩৬) তা ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। অপরূপ নকশা সম্বলিত এ ধরনের দুটি সুদর্শন পাত্রে টিউলিপ, গোলাপ, কচুরিপানা, আইরিশ ও বাদাম-কুঁড়ির অপূর্ব সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। ফুলগুলি সবসময় এতোটা পরিপূর্ণ নিপুণতা ও যথাযথ সৌকর্যবোধের মাধ্যমে অংকন করা হয় যে, ছবির মধ্যেও তাদের স্বাভাবিকতা কখনো ক্ষুণ্ণ হয় না। কারুশিল্পীরা পারস্য থেকেই তাদের পুষ্পালংকারের উপাদান সংগ্রহ করেন এবং এত অপরূপভাবে সেগুলি অংকনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ৩৮ নং চিত্রে আমরা পারস্য রীতির দ্বারা প্রভাবিত দামেস্ক শিল্পকর্মের একটি অপরূপ জগ দেখতে পাই। এতে নীল খোলসসম্পন্ন পাদভূমিতে টিউলিপ ও গোলাপ ফুল অংকন করা হয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকার্য ও উজ্জ্বল বর্ণের এটি এ জাতীয় একটি অপূর্ব সৃষ্টি।
পাশ্চাত্য শিল্পে কতিপয় ফুলের প্রবর্তন হয় প্রধানত তুরস্ক ও সিরিয়ার মাধ্যমে পারস্য থেকে। এসব ফুল বর্তমানে আমাদের উদ্যানসমূহে উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এক সময় মুসলিম প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত মৃন্ময়পাত্র এবং চীনামাটির বাসন-কোসনের নকশা থেকেই ইউরোপ এগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কনস্টান্টিনোপলে নিযুক্ত রাজকীয় দূত বাসবেকের মাধ্যমেই টিউলিপ সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যে আসে।
সিরিয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই কাচ উৎপাদনের অত্যন্ত সুন্দর স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করা হতো। মুসলমানরা এখানে কাচের উপর কারুকার্যের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতি উদ্ভাবন করেন। বিভিন্ন রকমের বোতল, পানপাত্র, সজ্জিত পাত্র এবং রঙিন মিনাকরা এবং প্রায়ই সোনালি পরশ দেওয়া চিত্র ও কারুকার্য সমন্বিত পাত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন পাত্র এমন পন্থায় কারু-সমৃদ্ধ করা হয়েছে যা পারস্য ও মেসোপটেমিয়ার কয়েকটি মৃন্ময় পাত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এগুলি প্রাচীনতম বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রথম মঙ্গোল অভিযানের সময় মেসোপটেমিয়ার যেসব কারুশিল্পী সিরিয়ায় হিজরত করেন এগুলি সম্ভবত তাদেরই অবদান। এসব কারুশিল্পী সিরিয়ায় নিজেদের উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন যা চতুর্দশ শতকে ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। কিন্তু ১৪০১ খৃস্টাব্দে তৈমুর সিরিয়ার ধ্বংস সাধন করলে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
৩৯ নং চিত্রের পানপাত্রটিতে আড়াআড়িভাবে দুটি উৎকীর্ণ নকশা বন্ধনীর ন্যায় চিত্রিত করা হয়েছে। বন্ধনীর মাঝখানে দুদিকে দণ্ডায়মান দুজন পরিচারক পরিবৃত্ত হয়ে একজন রাজা সিংহাসনে উপবিষ্ট। লাল ও সাদা বর্ণে মিনাকরা এবং সমুজ্জ্বল এই চিত্রটি ত্রয়োদশ শতকের রীতির একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। পানপাত্রটিকে যেভাবে ফ্রান্সের চতুর্দশ শতকের রেপোসে শিল্প রীতিতে ব্যাপক কারুকার্যময় একটি প্রশস্ত পাদানি ও রূপার গিল্টি করা দণ্ডের উপর অত্যন্ত মূল্যবান বস্তুর ন্যায় চ্যালিস (পবিত্র পানপাত্র) হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে, তাতে মনে হয় নির্মিত হওয়ার অব্যবহিত পরই এটি ইউরোপে আসে।
সমসাময়িক রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, খৃস্টান ইউরোপে এ সময় সিরীয় কাচের পাত্রের অত্যন্ত কদর ছিল। ১৩৯৭ খৃস্টাব্দে ফ্রান্সের পঞ্চম চার্লসের সম্পদের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার দুটিতে এ জাতীয় কাচের পাত্রের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, যেমন: 'টক্স পয ডি ভয়ের ঔভার পার ডেহর্স এ ইমেজেস এ লা ফ্যাকন ডি ডামাস'; এবং 'আং বেসিন প্ল্যাট ডি ভয়ের পেইন্ট এ লা ফ্যাকন ডি ডামাস' । বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আরেকটি সিরীয় কাচের পাত্রও বিশেষ করে কোন খৃস্টান মালিকের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কারণ এতে ভার্জিন ও চাইল্ড, সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের ছবি এবং একটি ল্যাটিন উৎকীর্ণলিপি রয়েছে।
ত্রয়োদশ শতক থেকে সমগ্র ইউরোপে কাচের কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত ভেনেসীয় কারুশিল্পীরা পঞ্চদশ শতকে প্রাচ্য রীতির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মিনার কাজে এতোটা দক্ষতা অর্জন করেন যে, শীঘ্রই এতে মুসলমানদের একচেটিয়া প্রাধান্যের অবসান ঘটে। এটি ভেনিস থেকে ইউরোপের অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রে প্রসার লাভ করে এবং সেখানে নতুন নতুন রীতির উদ্ভব হয়। যেসব সুশোভিত মিনাকরা স্পিরিটের বোতল সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে অত্যন্ত সাধারণ হয়ে পড়ে সেগুলি মধ্যযুগীয় মুসলিম নিপুণতার নিকৃষ্ট উত্তরাধিকারী।
অনুকরণ যতই চমকপ্রদ হোক না কেন-আকারের সৌন্দর্যের দিক দিয়ে কিংবা অলংকরণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যক্ষতার দিক দিয়ে এগুলি কখনো তাদের প্রাচ্যের আদর্শের সমকক্ষ হতে পারেনি। ৪১ নং চিত্রের লম্বা গলাওয়ালা বোতল এবং ৪২ নং চিত্রের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় বাটি ও ঢাকনি মুসলমানদের খাবার টেবিলের আদর্শ কাচের পাত্র। বোতলটিতে আড়াআড়ি বন্ধনীর মধ্যে পদক, উৎকীর্ণলিপি ও পত্রালংকার মিনাকরা হয়েছে এবং এতে ১৩৪৫ খৃস্টাব্দে মিসরের মামলুক সুলতান আল কামিল, সাইফুদ্দিন শা'বানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনৈক আমীরের নাম খোদাই করা হয়েছে। বাটিতেও একই ধরনের নকশা রয়েছে এবং সেগুলি সবুজ, নীল, লাল ও সাদা বর্ণে মিনাকরা হয়েছে এবং কোথাও গিল্টি করা হয়েছে। এই অপরূপ আকৃতির সুদর্শন পাত্রটিতে কোন নাম নেই, কিন্তু নিম্নোক্ত কথাটি উৎকীর্ণ করা হয়েছে: 'আমাদের প্রভু সুলতানের উপর গৌরব বর্ষিত হোক!'
সিরীয় কাচশিল্পীদের সবচাইতে সুন্দর শিল্পকর্ম হচ্ছে প্রদীপ কিংবা দ্বীপাধার। দ্বীপাধারগুলির সঙ্গে ভেতরের দিকে ছোট ছোট তৈলপাত্র প্রান্তভাগের তার দ্বারা যুক্ত করা হয়। প্রদীপগুলিকে তাদের গায়ের ভাঁজের সঙ্গে রূপা বা পিতলের শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব প্রদীপ বহু বড় বড় মসজিদকে রত্নের ন্যায় আলোকশিখায় উদ্ভাসিত করে। এগুলি সাধারণত পদক ও উৎকীর্ণ নকশার ডোরা কেটে অলংকৃত করা হয়। প্রচলিত পল্লবগুচ্ছের নকশা তাদের প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু ৪৪ নং চিত্রের ন্যায় কোন কোনটির সমগ্র উপরিভাগ বুটিদার রেশমী বস্ত্রের মতো পুষ্পের নকশায় আবৃত করা হয়। আরেকটির (চিত্র ৪০) অলংকরণও একইভাবে করা হয়েছে। সেটিতে যে দাতা প্রদীপটি কোন অজ্ঞাত মসজিদকে দান করেছেন তাঁর বর্মের গৌরবচিহ্ন অংকিত করা হয়েছে।
মুসলিম অভিজাত শ্রেণী প্রাচ্যের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করে তাদের নিজস্ব জিনিসের উপর প্রায়ই কুলজীচিহ্ন অংকন করেন। তাদের এই রীতি পাশ্চাত্যকেও কুলজীচিহ্ন ব্যবহারে প্রভাবিত করে। এর ফলে ক্রুসেডের সময় নিজস্ব একটি অদ্ভুত পরিভাষাসহ ধারাবাহিক বিজ্ঞান হিসাবে কুলজীচিহ্ন রীতি প্রবর্তিত হয়। এতে পারস্য শব্দ থেকে নীলবর্ণের পরিভাষা আউরু গ্রহণ করা হয়, যার অর্থ 'ল্যাপিস ল্যাজিউলাই' নামে অভিহিত মূল্যবান নীল পাথর। ইউরোপীয় ও প্রাচ্য কুলজীচিহ্ন ব্যবস্থায় আরো কয়েকটি চমৎকার সম্পর্কও রয়েছে। এর মধ্যে সেই অদ্ভুত দ্বিমস্তক ঈগলের ছবির কথা উল্লেখ করা যায়। এই ছবিটি দূর অতীতের হিট্রাইট স্মৃতিসৌধে প্রথম দেখা যায়। দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে এটি সেলজুক সুলতানদের প্রতীকচিহ্নে পরিণত হয়। চতুর্দশ শতকে এটি হোলি রোমান সম্রাটদের বর্মে গৌরবচিহ্ন হিসাবে প্রবর্তিত হয়।
মুসলমানদের কুলজীচিহ্ন হয় ৪০ নং চিত্রের প্রদীপের ন্যায় গোল আকারে বর্মের উপর স্থাপন করা হতো অথবা ৪১ নং চিত্রে বোতলে যেভাবে মিনা করা হয়েছে সেভাবে পাদদেশে ছুঁচালো করে লাগানো হতো। ঈগলের ন্যায় বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং মামলুক সুলতান বাইবার্স কর্তৃক ব্যবহৃত সিংহের ন্যায় বিভিন্ন পশুর প্রতীক চিহ্ন ছাড়াও রাজদরবারের কোন কোন কর্মচারী তাদের মর্যাদাসূচক সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করতেন। এসব কর্মচারী ছিলেন সাকী, পোলো-মাস্টার, বিভিন্ন সমরসচিব প্রভৃতি। চ্যালিসের ন্যায় পেয়ালা এবং পোলো-স্টিকের তাৎপর্য বোঝা যায়, কিন্তু ৪৫ নং চিত্রে প্রদর্শিত সর্বশেষ ছবিটির অর্থ দীর্ঘকাল পর্যন্ত দুর্বোধ্য ছিল। একসময় মনে করা হতো যে, এর মাধ্যমে মুসলিম শিল্পকর্মে প্রাচীন মিসরীয় চিত্রাক্ষরের একমাত্র নমুনা ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটিকে ২২ নং চিত্রে একটি রাইটিং কেসের আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার যে নকশা দেওয়া হয়েছে, তেমনি একটি নকশা বলে ধরা হয়।
কোন কোন সময়ে সরকারী ব্যাজে কিভাবে একটি ব্যক্তিগত প্রতীক চিহ্ন ব্যবহৃত হতো লম্বা বোতলের উপর ছুঁচালো শিল্ডটি (একটি ঈগলের) তার দৃষ্টান্ত। সম্ভবপর ক্ষেত্রে মুসলমানদের গৌরব প্রতীকগুলি সবসময় উজ্জ্বল বর্ণের হতো, কারণ কোন অভিজাত ব্যক্তির ব্যবহৃত রং তার অস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
এবারে বস্ত্রের শিল্পকর্মের কথা আলোচনা করা যাক। আরবরা যখন পারস্য, সিরিয়া ও মিসর জয় করেন তখনই সেসব দেশ বস্ত্রের সুদর্শন কারুকার্যে বেশ উন্নতি সাধন করে। আশেপাশের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ বয়নকেন্দ্রসমূহে অত্যন্ত উন্নতমানের রেশমী বস্ত্র উৎপাদিত হতো। তারা নিজেদের নকশায় বহু সাসানীয় উপাদান গ্রহণ করেন। মহানবী কর্তৃক রেশমী কাপড়ের ব্যবহার বিশেষভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানরা কেবল চালু রেশম কারখানাগুলিকে উৎসাহিতই করেননি; তারা যেখানে গেছেন সেখানেই নতুন নতুন রেশম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিষিদ্ধ বিলাসিতায় তাদের আগ্রহ এতটা নিঃসঙ্কোচ ও অবাধ ছিল যে, শীঘ্রই তারা মধ্যযুগীয় বিশ্বে রেশমী বস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে প্রাধান্য লাভ করে। মধ্যযুগে বহু রেশমী বস্ত্র যে সব নামে পরিচিত হয়, এবং ব্যবসায়ের যেসব পরিভাষা আমাদের যুগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তার মধ্য দিয়ে এর পরিচয় পাওয়া যায়। নাম ও পরিভাষায় কোন কোন জিনিস যেখানে উৎপাদিত হতো কিংবা যেসব কেন্দ্র থেকে পাওয়া যেতো সেসব স্থানের পরিচয় রয়েছে। তাই মিসরের প্রথম মুসলিম রাজধানী ফুসতাত থেকে সসারের সময় প্রচলিত বস্ত্র 'ফুসচেন'-এর উদ্ভব হয়েছে। যেসব কাপড়কে এখনো আমরা 'ডামাস্কাস' বলি তার নাম দামেস্ক থেকে এসেছে। এই বিরাট বাণিজ্য কেন্দ্রের বহু জিনিস যা একান্তভাবে সেখানে উৎপাদিত হতো না সেগুলিকেও পাশ্চাত্যবাসী দামেস্কের জিনিস বলে মনে করতো। ইটালীয় বণিকগণ মসুল থেকে যে মুসোলিনা আমদানি করতো সেগুলিই আমাদের 'মসলিন'। বাগদাদকে ইটালিয়ানরা 'বালডাক্কো' বলতেন, এবং সেখান থেকে যেসব উৎকৃষ্ট রেশমী বস্ত্র আমদানি করা হতো সেগুলি এই নামে অভিহিত হয়। বহু গির্জায় বেদীর উপর যে রেশমী চাঁদোয়া টাঙানো হয় সেটিকেও 'বালডাচিনো' বলা হয়। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় দোকানসমূহে গ্রানাডা থেকে আমদানিকৃত পোশাকের কাপড় 'গ্রেনাডাইন্স' নামে পরিচিত হয়। সেখানে পারস্য থেকে আমদানিকৃত 'তাফতাহ' 'টাফেটা' নামে পরিচিত হয়।
বাগদাদের 'আততাবীয়াহ' এলাকায় মহানবী (সা)-এর সাহাবী 'আততাব (রা)'-এর প্রপৌত্রগণ বসবাস করতেন। দ্বাদশ শতকে এই এলাকাটি একটি বিশেষ ধরনের বস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং তা সেখানে আত্তাবী রেশমী বস্ত্র হিসাবে পরিচিত হয়। স্পেনীয়রা এটির অনুকরণ করতেন। ফ্রান্স ও ইটালী এটিকে 'ট্যাবিস' নামে গ্রহণ করে এবং এই ব্যবসায়িক নামটিই ইউরোপের সর্বত্র জনপ্রিয় হয়। ১৬৬১ খৃস্টাব্দের ১৩ই অক্টোবর (লর্ডস ডে) মিঃ পেপিস বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত থেকেই তাঁর 'সোনালি লেস যুক্ত ভুয়া ট্যাবি ওয়েস্টকোট' পরিধান করেন। ১৭৮৬ খৃস্টাব্দে মিস বার্নি 'লাইল্যাক ট্যাবির' একটি গাউন পরে উইন্ডসর প্রাসাদে একটি রাজকীয় জন্মোৎসবে যোগদান করেন। লাইল্যাক পারস্যে এই নামে পরিচিত একটি রং। একই নামে পাশ্চাত্যে আমদানিকরা একটি ফুলের গাছ আছে। উপরোক্ত সুদর্শন ঝলসানো রেশমী কাপড় বর্তমানে অপ্রচলিত। কিন্তু আমাদের অতি পরিচিত বন্ধু ট্যাবি বিড়াল এখনো বাদামী ও হলদে রঙের একটি 'আত্তাবী' নকশা ধারণ করে।
বার্লিনে আব্বাসীয় খলীফা হারুনুর রশীদের জাদুকরী নামযুক্ত টুকরো কাপড় পাওয়া গেলেও বাগদাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রেশমী কাপড় বর্তমানে কদাচিৎ দেখা যায়। লিওনের কলেজিয়েটা ডি সান ইসিডরোতে রক্ষিত একখণ্ড রেশমী বস্ত্রের (চিত্র ৪৩) উৎকীর্ণলিপিতে বলা হয়েছে যে, সম্ভবত আবু নাসের নামে জনৈক শিল্পী এটি বাগদাদে তৈরি করেন, যেখানে শিল্পীর স্বাক্ষর থাকার কথা সেখানে নামের অক্ষরগুলো কিছুটা বিকৃত প্রতীয়মান হয়। লাল, হলুদ, কালো ও সাদাবর্ণে বোনা কাপড়টিতে নকশা দশম শতকের শেষভাগের প্রাথমিক মুসলিম শিল্প-রীতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একটি প্রাচীনতর ঐতিহ্য অনুসরণে এর পাখি, পশু ও ফুলের নকশা বিরাট বৃত্তাকার প্যানেলের ভেতরে ও বাইরে অংকিত করা হয়েছে। একটি বিশেষ উপাদান হাতীর নকশা সম্ভবত ভারত থেকে এসেছে। কয়েক বছর আগে ক্যালের নিকটবর্তী একটি গ্রাম্য গির্জায় আবিষ্কৃত কিছুটা প্রাচীনতর একটি পারস্য রেশমী বস্ত্রখণ্ডটি বর্তমানে লুভারের অন্যতম সম্পদ। পারস্য বস্ত্রের কোন কোন বাইজেন্টাইন অনুকরণে, বিশেষ করে আচেনে শার্লেমানের সমাধিতে রক্ষিত সুদর্শন বস্ত্রখণ্ডেও এই ছবি দেখা যায়।
ইউরোপে প্রাচ্য বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে উৎকৃষ্টমানের রেশমী বস্ত্রের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম দেশগুলি থেকে সূক্ষ্ম কারুকার্যসম্পন্ন বস্ত্র এতো অধিক পরিমাণে আসতে থাকে যে, পাশ্চাত্যের শিল্প উদ্যোক্তারা এই লাভজনক শিল্পে বিপুল অর্থাগমের সম্ভাবনা দেখতে পায়। তারা বিভিন্ন কেন্দ্রে তাঁত প্রতিষ্ঠা করে প্রাচ্য ও স্পেনীয় কারখানাগুলির সঙ্গে জোরেশোরে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। প্রধানত সিসিলি থেকেই পাওয়া ইটালীয় শিল্পীরা তাদের কারিগরিজ্ঞান এবং নকশার নমুনা লাভ করেন। এখানে পালেরমোর রাজকীয় প্রাসাদে মুসলিম অভিযানকারীরা একটি বিখ্যাত তাঁত কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বীপটি নর্ম্যানদের অধীনে পুনরায় খৃস্টান অধিকারে যাওয়ার পর এই কারখানা আরো সমৃদ্ধি লাভ করে। নর্ম্যান শাসনামলে সিসিলির শিল্পকেন্দ্রটি বাইজেন্টাইন ঐতিহ্যের সংস্পর্শে আরো বিকাশ লাভ করে। ১১৪৭ খৃস্টাব্দে ঈজিয়ান সাগরে হামলা চালিয়ে কতিপয় গ্রীক তাঁতীকে গ্রেফতার করার পর রাজপ্রাসাদের কারখানায় নিযুক্ত করা হয় এবং এরই মাধ্যমে গ্রীক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটে। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতেই কতিপয় সমৃদ্ধ ইটালিয়ান নগরীতে রেশমীবস্ত্র বয়ন প্রধান শিল্প উদ্যোগে পরিণত হয়। এখানকার উৎপাদিত বস্ত্রের সঙ্গে তারা যেসব সিসিলীয় বস্ত্রের অনুকরণ করেন সেগুলির পার্থক্য করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে তারা ব্যাপকহারে বস্ত্র উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতো।
চতুর্দশ শতকে ইটালীয় রেশমী বস্ত্রে মুসলিম বস্ত্র শিল্পের ন্যায় নতুন প্রভাব প্রতিফলিত হয়। ৪৬ নং চিত্রের ন্যায় সোনালি বুটিদার নীল ও সাদা রেশমী কাপড়ে কেবল সিংহ, তালজাতীয় ক্ষুদে গাছ, ফুলের নকশা, আরবী উৎকীর্ণলিপি এবং ইটালীয় শিল্পকর্মে ইতিমধ্যে প্রবর্তিত অন্যান্য প্রাচ্য উপাদান ছাড়াও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চীনা পাখিও দেখা যায়। কতিপয় ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে দূরপ্রাচ্যে যে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয় প্রধানত সেকারণেই ইউরোপে এগুলির আবির্ভাব ঘটে। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে যে হালাগু খান আব্বাসীয়দের উচ্ছেদ সাধন করে তাঁর ভ্রাতা কুবলাই খানের নেতৃত্বে যাযাবর মঙ্গোলরা ১২৮০ খৃস্টাব্দে চীন আক্রমণ করে এবং সেখানে ইউয়ান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। এই রাজবংশ ১৩৬৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এসব বিজয়ের ফলে পারস্য থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত এশিয়ার এক বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় এক শতাব্দিকাল একই মঙ্গোল রাজবংশ শাসন করেন। এতে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যার ফলে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার শিল্প ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য বিনিময় ঘটে। চীনে তাং রাজ বংশের আমলে প্রতিষ্ঠিত উপনিবেশগুলি থেকে একটি মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠে এবং অন্য যেসব এলাকায় ইসলাম প্রসারিত হয়েছে সেসব এলাকার ন্যায় আরবীভাষা প্রচলিত হয়। মুসলিম জনবসতিতে বহু কারুশিল্পীও ছিলেন। এদের মধ্যে যারা রেশম তাঁতী ছিলেন তারা তাদের প্রাচীন আবাসভূমির রেশম শিল্পের ঐতিহ্যগত দক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে এমনসব রেশমীবস্ত্র উৎপাদন করেন যা মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। তাদের সুদর্শন রেশমীবস্ত্র তাদের পাশ্চাত্যের ভাইদের এতোটা প্রভাবিত করে যে, এর ফলে মুসলিম বস্ত্র উৎপাদনে নতুন নতুন ডিজাইনের উদ্ভব হয় এবং তার মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপের বস্ত্রের ডিজাইনেও তা প্রতিফলিত হয়। মধ্যযুগীয় চীনা শিল্পসৌকর্যের কতিপয় অপরূপ নমুনা এখনো সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে সম্ভবত সবচাইতে উল্লেখযোগ্য নমুনাটি ড্যানসিগে (পোল্যাণ্ডের একটি বন্দর) রক্ষিত আছে। এটি মামলুক সুলতান আন নাসির মোহাম্মদ ইবনে কালাউনের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত হয়। ডিজাইনের মধ্যে তাঁর নামটি বোনা হয়েছে। ৪৭ নং চিত্রে রেশমী ও সোনালি বুটিদার একটি চীনাবস্ত্র দেখানো হয়েছে। নকশাটিতে রয়েছে ফিনিক্স পাখি ও আরবীতে উৎকীর্ণ পামেটিস। এগুলিকে আনুষ্ঠানিক কারুকার্যমণ্ডিত দুটি রেখার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। নকশাটি উল্লেখিত পাখিসমন্বিত রীতির একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
কেবল মধ্যযুগে নয়, তার পরবর্তীকালেও প্রাচ্যের রেশমী কাপড় দিয়ে প্রায়ই গির্জার পোশাক তৈরি করা হতো। ৪৮ নং চিত্রের ফতুয়া জাতীয় পোশাকটি (চেচিউবল) ষোড়শ শতকের শেষভাগে কিংবা সপ্তদশ শতকের প্রথমভাগে তৈরি পারস্যের একটি রেশমী কাপড় থেকে কেটে তৈরি করা হয়েছে। এর নকশাটি যে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে কোন অবস্থাতেই তার উপযোগী নয়, বিশেষ করে কোন মসজিদে এটিকে কখনো সহ্য করা হবে না। এর প্রধান উপাদান হচ্ছে হাতে পেয়ালা ও মদের বোতল নিয়ে দরবারী পোশাক পরিহিত দণ্ডায়মান তরুণদের সারি। পত্র-পুষ্প শোভিত সরু লতার ফাঁকে ফাঁকে এসব ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলির সঙ্গে তুর্কী মৃৎশিল্পীদের কারুকার্যের মিল রয়েছে। ভেতরের শূন্যস্থানগুলিতে এমন ধরনের সুদর্শন পাখির ছবি দেওয়া হয়েছে যা চীনাপাখির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ডিজাইনটি সাফাভী আমলের শৌখীন বুটিদার রেশমী পোশাকের উজ্জ্বল নকশার একই শ্রেণীভুক্ত। এই শ্রেণীর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্যগতভাবে আরো বেশি ছবির সমাবেশ দেখা যায়। এর মধ্যে খসরু ও শিরিনের মিলনাত্মক রোমান্টিক কাহিনী কিংবা লাইলী ও মজনুর বিয়োগাত্মক কাহিনীর সচিত্র বর্ণনা উল্লেখযোগ্য। কোন কোন সময় পুষ্পশোভিত বৃক্ষ ও গুল্মরাজির মধ্যে নিরীহ বা হিংস্র প্রাণীর বিচরণের দৃশ্যও দেখা যায়। অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বলভাবে এগুলি অংকিত ও রঞ্জিত হয়।
ধর্মীয় পোশাক (ওরফ্রি) হিসাবে ব্যবহৃত লম্বা রেশমী ফালিটির উপর যে নকশা অংকিত হয়েছে তা তুর্কী ও ইটালীয় তাঁতিদের একটি বিশেষ শ্রেণীর ডিজাইন প্রতিফলিত করেছে। এ জাতীয় নকশা যখন প্রবর্তিত হয় তখন উভয় এলাকার শিল্পীরা এতোটা সক্রিয়ভাবে ও সফলতার সঙ্গে পরস্পরকে অনুকরণ করে, যাতে কোন্ কাপড়টি ইউরোপীয় বা প্রাচ্য তা নির্ণয় করা বিশেষজ্ঞদের পক্ষে অনেক সময় দুষ্কর হয়ে পড়ে। তারিখের দিক দিয়ে পরবর্তী এবং দেখতে ইউরোপীয় মনে হলেও এই বস্ত্রখণ্ডে এমন এক ধরনের একটি তুর্কী নকশা রয়েছে যার উদ্ভব হয় পঞ্চদশ শতকের কোন এক সময়ে এশিয়া মাইনরে। অত্যন্ত সাদাসিধে আকারের এই নকশাগুলি উপরে নিচে আঁকাবাঁকাভাবে অংকিত সাধারণ বা কারুকার্যমণ্ডিত রেখার দ্বারা গঠিত। রেখাগুলি মাঝে মাঝে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং জমিনটি জালের ন্যায় কারুকার্যে ভরে দেওয়া হয়। কোন কোন নকশায় ওরফ্রির নকশাটির ন্যায় জালের ফাঁকগুলির মধ্যে কমবেশি আনুষ্ঠানিক কারুকার্য করা হয়। অন্যগুলিতে রেখাগুলির সংযোগ স্থল থেকে অনুরূপ উপাদানের উদ্ভব হয়। শেষোক্ত পরিকল্পনাটি ৫০ নং চিত্রের অত্যন্ত সুন্দর বুটিদার বস্ত্রের অনুসরণ করা হয়েছে। গাঢ় লাল বর্ণের পাদভূমি ও নিকেল নীলের পটভূমিতে নকশাটি সোনালি বর্ণে বোনা হয়েছে। প্রধান ব্যবস্থার ফলে ভেতরে ভেতরে যেসব স্থান শূন্য ছিল সেখানে একটি দ্বিতীয় নকশাজাল সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, টিউলিপ কুড়ি, পিঙ্ক ও নার্গিস ফুল।
এই ডিজাইনের প্রধান উপাদান পুষ্পগুচ্ছ থেকে ইটালীয়রা ৪৯ নং চিত্রের পুষ্প-নকশাটি উদ্ভাবন করেছে। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগের মখমলে প্রায় একই ধরনের একটি নকশা ৫১ নং চিত্রে দেখা যায়। ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় ও তুর্কী তাঁতশিল্পীরা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পালাক্রমে একে অপরকে হার মানায় এবং এর মাধ্যমে জাল ও গুচ্ছ রীতির বহু জটিলতাপূর্ণ বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। তারা এই সময়ে সুদর্শন মখমলকে বিশেষ বিশেষ ধরনের নকশায় এমন অপরূপ করে তোলেন যে, এগুলি ঐতিহ্যগতভাবে তাদের অবদান হয়ে পড়ে। এসব মূল্যবান রেশমী বস্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার একক প্রচেষ্টায় উইলিয়াম মরিস নীল, কমলা, সাদা ও সোনালি রঙে বোনা বুটিদার মখমলের উপর এই জাতীয় একটি নকশা (চিত্র ৫২) অংকন করেন।
বর্তমানকালে সার্বজনীনভাবে প্রয়োজনীয় কার্পেট প্রাচ্য থেকে ইউরোপে এমন একটি বিলাসদ্রব্য হিসাবে আসে যাকে ধনাঢ্য শিল্প রসিকগণ প্রথমে ব্যবহারের জিনিসের চাইতে সংরক্ষণযোগ্য সম্পদ হিসাবে মনে করতেন। ট্যাপিস্ট্রির ন্যায় মসৃণ এবং অসংলগ্ন সুতার গ্রন্থি সৃষ্টির মাধ্যমে মখমলের ন্যায় জড়ো করা, এই উভয় প্রকারের কার্পেটই প্রাচ্যের অতি প্রাচীন সম্পদ। এগুলিকে ঘুমানোর জন্য মাদুর, দেওয়ালের পর্দা এবং মেঝের আবরণ হিসাবে ব্যবহার করা হতো। ইটালীয় ছবিতে প্রাচ্যের কম্বলের অনুকরণ থেকে জানা যায় যে, ইউরোপে চতুর্দশ শতকে এগুলির আবির্ভাব ঘটে। ষোড়শ শতকে এগুলি ব্যবসায়-বাণিজ্যের নিয়মিত পণ্যে পরিণত হয়। প্রমাণ রয়েছে যে, কার্ডিন্যাল উলসী ১৫২১ খৃস্টাব্দে ভেনেসীয় রাষ্ট্রদূতের সৌজন্যে তাঁর হ্যাম্পটন কোর্টের প্রাসাদের জন্য প্রাচ্যের ষাটটি কম্বল সংগ্রহ করেন। চিত্রকর হলবিনের ছবিতে সম্ভবত এগুলির প্রতিফলন দেখা যায়। ঐ সময় এশিয়া-মাইনরে যেসব কার্পেট তৈরি হতো সেগুলির সঙ্গেও এর সাদৃশ্য দেখা যায়। নর্দাম্পটনশায়ারের বাউটন হাউসে স্যার এডওয়ার্ড মন্টেগুর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত তিনটি জড়োকার তৈরি কার্পেট সংরক্ষিত আছে। এগুলিতে প্রান্তভাগে বোনা তাঁর প্রতীক চিহ্ন ও ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের তারিখ দেওয়া রয়েছে। বর্তমানের ন্যায় তখনো এগুলি 'তুর্কী' গালিচা হিসাবে পরিচিত ছিল। এগুলি বিভিন্ন আকৃতিমূলক কারুকার্যে মণ্ডিত ছিল এবং লাল জমিনের উপর নীল ও হলুদ বর্ণে রঞ্জিত ছিল।
ষোড়শ শতকে পারস্যের কারুশিল্পীগণ কার্পেট বোনাকে সৌকর্যের এমন এক শিখরে নিয়ে যান যেখানে তাঁর পূর্বে কিংবা তারপর থেকে এ পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারেনি। তাঁদের অলৌকিক দক্ষতাপূর্ণ ডিজাইন সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয়। এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান আর্দাবিল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে এবং বর্তমানে ভিক্টোরিয়া ও আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। আর্দাবিলে এটি সাফাভী শাহদের শ্রদ্ধেয় পূর্ব পুরুষ শেখ শাফীর মসজিদে কয়েক শতক পর্যন্ত ছিল। ৫৩ নং চিত্রে এই বিশাল কার্পেটের একটি অংশ দেখানো হয়েছে। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত এই গালিচাটিতে তিন কোটিরও বেশি অতি ক্ষুদ্র গ্রন্থী রয়েছে। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে গ্রন্থীর সংখ্যা ৩৮০। মধ্যভাগে কাটাকাটা প্রান্তভাগ সমন্বিত একটি বিরাট পদক রয়েছে। এর চারদিকে রয়েছে ডিম্বাকৃতির ছুঁচালো খোব, সেগুলি উজ্জ্বল বর্ণে পত্র-পুষ্পের অপরূপ কারুকার্যে সুশোভিত। আয়তাকার ক্ষেত্রটির প্রত্যেক কোণে কেন্দ্রীয় উপাদানের এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। গাঢ় নীল বর্ণের জমিনে আঁকাবাঁকা লতায় উজ্জ্বল ফুলের সমাহার এবং তারি মধ্যে দুটি প্রদীপ দ্বিতীয় পর্যায়ের কেন্দ্রগুলি থেকে যেনো শূন্যে ঝুলে আছে। দৃঢ়বদ্ধ প্রান্তভাগ কর্ণলতিকার ন্যায় বৃত্ত ও সম্প্রসারমান খোবে সুশোভিত ও কারুকার্যমণ্ডিত। এক প্রান্তের একটি কার্টুশে (পাকানো কাগজ) কবি হাফিজের একটি কবিতা উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং তার নিচে রয়েছে: 'দ্বার দেশের বান্দা কাশানের মকসূদের শিল্পকর্ম, ৯৪৬ হিজরী' (১৫৪০ খৃ.)। বহু প্রাচীনতর কার্পেট সংরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই কার্পেটটিকেই সবচাইতে প্রাচীনতম বলে মনে করা হতো। এই প্রসঙ্গে মিলানের মিউজিও পল্টিপ্লেযযোলিতে রক্ষিত অপর একটি অপরূপ পারস্য গালিচার কথা উল্লেখযোগ্য। এটি ১৫২১ খৃস্টাব্দে গিয়াসুদ্দীন জামী কর্তৃক বোনা হয়েছিল।
ইউরোপীয় কারুশিল্পীরা মুসলমানদের কাছ থেকে জড়ানো কার্পেট বোনার কাজ শিখেন। প্রথমে তারা প্রাচ্যের ঐতিহ্যগত হাতের কৌশল প্রয়োগ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে যান্ত্রিক পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করেন। যান্ত্রিক পন্থায় তৈরি গালিচা ও কম্বল বর্তমানে প্রায় সার্বজনীনভাবে ব্যবহৃত হয়। মুসলমানদের কাছ থেকে নেওয়া নকশা সাধারণ হলেও, সেগুলি ঐতিহ্যগত না হয়ে কিছুটা খেয়ালী ধরনের। নকশার মধ্যে নয়, বরং মখমলের ন্যায় বুনটের মধ্যেই আধুনিক গালিচার প্রাচীন ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে।
আমরা সমতলের নকশা থেকে রিলিফের (সমতলের উঁচুতে) নকশাতে গেলে দেখতে পাবো যে, মুসলিম খোদাই-শিল্পীরা এখানেও তাদের অন্যান্য নকশা অংকন রীতি অনেকখানি একইভাবে অনুসরণ করেছে। ইউরোপীয় রিলিফের নকশা অংকনে আমরা যে রীতি বৈচিত্র্য দেখতে পাই, যেখানে মুসলিম দেশগুলিতে অপরিজ্ঞাত ভাস্কর্য ও ছবি অংকনের প্রভাব ঐতিহ্যগত হয়ে পড়েছে, মুসলিম খোদাই শিল্প ও মডেলিংয়ে তা অনুপস্থিত। সেখানে সাধারণত বয়নকার্যে, খচিত করণে কিংবা রংয়ের কারুকার্যে ব্যবহৃত নকশাগুলিরই পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ইউরোপীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত পন্থায় এ ধরনের নকশাগুলি কারুকার্যের উপযোগী করে নেওয়া হয়, যে নকশা উজ্জ্বল বর্ণের একটি পাণ্ডুলিপির শিরোনামের পৃষ্ঠা কিংবা একটি রেশমী বস্ত্র অলংকরণে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই একই নকশা কোন গম্বুজের বহির্ভাগে কিংবা মসজিদের প্রাচীরে পাথর খোদাইতেও সমভাবে উপযোগী বলে মনে করা হয়। ৫৫ নং চিত্রে সাদা মার্বেলের তৈরি ফাউন্টেন-বেসিনটির নির্মাণকাল ১২৭৭-৭৮ এবং তাতে ঐতিহাসিক আবুল ফিদার পিতৃব্য হামার সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদের নাম অংকিত রয়েছে।
এতে খোদাইশিল্পী তাঁর বিশেষ প্রয়োজনে কিভাবে বিভিন্ন কারুশিল্পের একটি সাধারণ ডিজাইনকে কাজে লাগিয়েছেন তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পরিকল্পনাটি মূলত একটি পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা যার উপাদানগুলি একপাশে অনির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত প্রান্তভাগ হিসাবে প্রসারিত করা যায় কিংবা একপাশে ও উপরে নিচে 'সার্বিক' নকশা হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ১২১৬ খৃস্টাব্দে মৃত্যুবরণকারী জনৈক শেখের সমাধি থেকে সংগৃহীত ৫৬ নং চিত্রের কাঠের আবরণটিতে নিচের দিকের কারুকার্যমণ্ডিত লম্বা অংশে (ফ্রিজ) এবং পৃথক পৃথক খোবগুলিতে একই পুনরাবৃত্তিমূলক নকশা খোদাই করা হয়েছে। এই অপরূপ শিল্প কর্মটির একটি দিক সাউথ কেংসিংটনে এবং অবশিষ্ট অংশ কায়রোতে রক্ষিত আছে। ফাতিমীয় আমলের খোদাই শিল্পে ৫৪ নং চিত্রের ন্যায় সমতলভাগকে প্রায়ই এতোটা গভীর করে খোদাই করা হয় যে, এতে ছিদ্র করণের একটি ধারণার সৃষ্টি হয়। এই খোবটি কায়রোর আরব আর্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সিসিলিতে নির্মিত হলেও ৫৭ নং চিত্রের খোদাই করা কাঠের সিলিংটির (ভেতরের দিকের ছাদ) শিল্পকর্ম রীতির দিক দিয়ে ফাতিমীয়। গভীরভাবে খোদাই করা খোবের বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন ছাড়াও এই পত্রালংকারে বহু রকমের পশু-পাখির ছবিও রয়েছে। রাজ-দরবার কিংবা লৌকিক ব্যবহারের জন্য নির্মিত ফাতিমীয় শিল্পকর্মে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রায়ই দেখা যায়। এগুলিতে মানুষের ছবিও অবাধে ব্যবহৃত হতো।
মুসলিম ছুতাররা যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নির্মাণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন উপরোক্ত সিলিংয়ে তাই অনুসরণ করা হয়েছে। ব্যবহারিক এবং আলংকারিক প্রয়োজনীয়তা থেকে এই রীতির উদ্ভব হয়েছে। আবহাওয়াগত কারণে কাঠ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে কিংবা দুমড়ে যেতে পারে। অনেক সময় যথোপযুক্ত কাঠের অভাবও ছিল। তাই খোবগুলি আয়তনে যতটা সম্ভব ছোট করা হতো এবং তাঁর রক্ষণকারী ফ্রেমগুলি অপেক্ষাকৃত বড় করা হতো। নকশার স্থায়িত্ব ও বিভিন্ন রকমের উদ্দেশ্য সংরক্ষণের জন্য ধীরে ধীরে অদ্ভুত ও বিচিত্র রকমের ছোট ছোট খোবের উদ্ভব হয়। এই পরিকল্পনাটি প্রকৃতপক্ষে কাঠামোগত পন্থায় প্রকাশ পেতো এবং মুসলিম ছুতার শিল্পীরা এ ধরনের ডিজাইন অংকনে বিশেষ আনন্দ পেতো। দীপ্তিমান তারকার ন্যায় বিচিত্র আকারের বহু-ভুজ সম্বলিত এই নকশা এমন এক ধরনের কারুকার্য সৃষ্টি করে যা অলংকার শিল্পে মুসলমানদের সম্ভবত সবচাইতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান। এই রীতি রূপায়ণে কাঠের যে কারুকার্য বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে সেখানে এর সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশিত হয়। কিন্তু বহু কারুশিল্পী বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমেও এসব নকশা ব্যবহার করেছেন। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এসব নকশা অংকনে অত্যন্ত উদ্ভাবনমূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। পরবর্তীকালে এগুলি বিরক্তিকর জটিলতা এবং অতি-সচেতন জ্যামিতিক রূপ লাভ করলেও এর সহজ আকারগুলি সবসময় মুসলিম প্রতিভার অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য রঙের অপরূপ পরিকল্পনা রূপায়ণে এককভাবে কার্যকর বাহন ছিল।
৬০ নং চিত্রে এ ধরনের একটি নকশায় ষড়ভুজের মধ্যে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বারোটি ছুঁচালো তারকা স্থাপন করা হয়েছে। এই নকশাটি ৬১ নং চিত্রের খসড়া কাঠামোর উপর ভিত্তি করে অংকন করা হয়েছে। খসড়া কাঠামোটি উনবিংশ শতকের সূচনায় পারস্যের শাহর স্থপতি মির্যা আকবরের একটি নোট থেকে নেওয়া হয়েছে। তাঁর এ ধরনের বহু নকশা ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। সূক্ষ্ম রেখা দ্বারা গঠিত মূল জ্যামিতিক চিত্রটি একটি ছুঁচালো জিনিস দিয়ে কাগজের উপর অংকন করা হয়েছে এবং তারি ভিত্তিতে কালি দিয়ে নকশাটি অংকন করা হয়েছে। পদ্ধতিটি উপদেশমূলক এবং সম্ভবত একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা বহন করছে। এতে প্রাচ্যের অংকন শিল্পীরা কিভাবে পরিকল্পনা তৈরি করে তাঁর ভিত্তিতে বহু রকমের নকশা অংকন করতেন তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব নকশা সম্বলিত পুস্তিকা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
৫৮ ও ৫৯ নং চিত্রে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের দরজার দুটি পাল্লায় মিসরীয় শিল্পকর্মের নিদর্শন দেখানো হয়েছে। খোবগুলি এতো ছোট যে সেখানে কাঠের পরিবর্তে আইভরি ব্যবহার করে এক বিস্ময়কর শিল্প-সৌকর্য প্রদর্শন সম্ভব হয়েছে। একটি পাল্লায় খোবগুলিতে তীক্ষ্ণ রিলিফ পুষ্পালংকার খোদাই করা হয়েছে এবং অন্যটিতে জ্যামিতিক নকশায় সেগুলিকে খচিত করা হয়েছে। উভয়টিই সম্ভবত একই ডিজাইনের মিম্বরের ধ্বংসাবশেষ। অনুরূপ ডিজাইনের একটি নমুনা ভিক্টোরিয়া এণ্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। এটি কায়রোর একটি মসজিদে মামলুক সুলতান কায়েত বে (১৪৬৮-১৫ খৃ.) নির্মাণ করেন। উনবিংশ শতকে একটি নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য এটি ধ্বংস করা হয়।
আংশিকভাবে বা সামগ্রিকভাবে আইভরি দিয়ে মুসলমানরা বহু সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করেন। তারা খোদাই করে, খচিত করে কিংবা রঞ্জিত করে এটিকে অলংকৃত করতেন। দশম শতকে কর্ডোভায় আইভরি খোদাই শিল্পীদের একটি কেন্দ্র ছিল। তারা এমন এক রীতি অনুসরণ করতেন যাতে তখনি একটি পরিণত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। তাদের শিল্প-সৌকর্যের বহুবিধ দৃষ্টান্তের মধ্যে ৬২ নং চিত্রের নলাকার কৌটাটি বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। এটি যামোরার গির্জা থেকে আহরিত হয়েছে এবং বর্তমানে মাদ্রিদের মিউজিও আর্কিলজিকোতে রক্ষিত আছে। গম্বুজ আকৃতির ঢাকনির চারপাশে এক উৎকীর্ণলিপিতে বলা হয়েছে যে, এটি ৯৬৪ খৃস্টাব্দে খলীফা দ্বিতীয় আল হাকামের জন্যে তাঁর পত্নী যুবরাজ আবদুর রহমানের মাতাকে উপহার হিসাবে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় একই সময়ে কর্ডোভায় তৈরি অনুরূপ কতিপয় জিনিসের এই সুন্দরতম নিদর্শনটি সম্পূর্ণরূপে পত্রালংকার, ময়ূর ও অন্যান্য পশু-পাখির চিত্রে আবৃত। অন্যান্য নিদর্শন বর্তমানে লণ্ডন, প্যারিস ও অন্যত্র দেখা যায়। গঠনে এবং শিল্প-সৌকর্যে একই রকম হলেও এগুলির কারুকার্য বিভিন্ন রকমের। ৬৩ নং চিত্রে আয়তাকার কৌটার ন্যায় কোন কোনটিতে ছবিওয়ালা বিষয়বস্তুকে বেষ্টন করে পারস্পরিক বোনা ঝুলন্ত বৃত্ত খোদাই করা হয়েছে। কয়েকজন কারুশিল্পী একযোগে এটি তৈরি করেছেন, যাদের মধ্যে খায়ের ও উবায়দা নাম দুটি পড়া যায়। নাম দুটি তাদের খোদাই করা খোবে অংকিত রয়েছে। রাজদরবারের জনৈক ওমরাহর জন্য ১০০৫ খৃস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়। ঢাকনির মধ্যে তাঁর নাম ও উপাধি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
৬৪ নং চিত্রে আর এক ধরনের আইভরি শিল্পকর্ম দ্রষ্টব্য। একটি বৃত্তাকার বাক্সের গায়ে ও সমতল ঢাকনিতে ছিদ্র করে জ্যামিতিক নকশা অংকন করা হয়েছে। এটি চতুর্দশ শতকে কায়রোতে নির্মিত এই শ্রেণীর শিল্পকর্মের প্রতিনিধি স্থানীয়। ত্রয়োদশ শতক থেকে প্রবর্তিত এবং কিছুটা অস্পষ্টভাবে 'সিকুলো-অ্যারাবিক' হিসাবে বর্ণিত কতিপয় নলাকার ও আয়তাকার আইভরি বাক্সের কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এগুলি সোনালি ও অন্যান্য বর্ণে রঞ্জিত এবং বৃত্তের মধ্যে গ্রন্থি নকশা কিংবা পশু, পাখি, ফুল ও গাছের ছবি অংকিত এমন একটি রীতি যা উজ্জ্বল বর্ণের পাণ্ডুলিপির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ৬৬ নং চিত্রে এর একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে যেখানে পিছনে উপবিষ্ট একটি চিতাসহ জনৈক অশ্বারূঢ় শিকারীর ছবি অংকিত করা হয়েছে।
রঞ্জিত, খোদাই করা কিংবা ছিদ্র করা আইভরি কৌটা মণিমুক্তা, অলংকার, সুগন্ধি, মিষ্টি এবং এ ধরনের অন্যান্য জিনিস রাখার জন্যে ব্যবহার করা হতো। উৎকীর্ণলিপিতে দেখা যায় যে, এগুলি প্রায়ই উপহার হিসাবে বিশেষভাবে তৈরি করা হতো। প্রাচীনতম কৌটাগুলি সূচনায় ইসলামী শিল্পকর্মের অত্যন্ত মূল্যবান নিদর্শন। এর অনেকগুলি আমরা বিস্ময়করভাবে সুসম্পন্ন আকারে পেয়েছি। এগুলির কোন কোনটিতে এখনো রঙের যে সৌন্দর্য দেখা যায় তা বিবেচনা করলে মনে হয় যে, খোদাই করা কৌটাগুলি মূল অবস্থায় রং ও স্বর্ণের আমেজে সমুজ্জ্বল ছিল। কোন কোনটিতে এখনো তাদের ধাতব হুক ও কব্জা দেখা যায়। এগুলি একটি বিশেষ ধরনের ধাতব শিল্পের চমৎকার দৃষ্টান্ত।
খোদাই শিল্পে নিপুণতার একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ৬৫ নং চিত্রে প্রদর্শিত স্বচ্ছ পাথরের একটি অপরূপ জলপাত্র। এটি ভেনিসের সেন্ট মার্কস-এর ট্রেজারীতে রক্ষিত আছে। শিল্পকর্মটি ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে মিসরের দ্বিতীয় ফাতেমীয় খলীফা আল-আজিজের নাম অংকিত রয়েছে। আল-মাকরিযী ১০৬৭ খৃস্টাব্দে বিলুপ্ত যেসব সম্পদের তালিকা তৈরি করেছেন এটি তাঁর অন্যতম স্বচ্ছ পাথরের জলপাত্রও হতে পারে, কারণ সেগুলিতে এই খলীফার নামও খোদাই করা হয়েছে। শিল্পসৌকর্য ও অলংকরণের দিক দিয়ে এটি ইসলামী শিল্পকলার এক গৌরবোজ্জ্বল যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
যেসব প্রাত্যহিক ব্যবহার্য জিনিসে মৌল-উপাদান, কলাকৌশল বা ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা কোন না কোনভাবে ইসলামের কাছে ঋণী তাঁর মধ্যে আমাদের মুদ্রিত বই-পুস্তক সবচাইতে ব্যাপক। প্রথম দৃষ্টিতে প্রাচ্যের সঙ্গে এগুলির সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ মনে হলেও বই উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি মধ্যযুগীয় মুসলিম উদ্যোগ ও নৈপুণ্য থেকে অনেক কিছু লাভ করেছে। কেবলমাত্র সাম্প্রতিককালেই ইসলামী সাহিত্য টাইপের মাধ্যমে বা লিথোগ্রাফি পদ্ধতিতে পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে। শেষোক্ত পদ্ধতিটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়, কারণ এতে লিপিকরের প্রকৃত সৌকর্য-দক্ষতা বিশ্বস্ততার সঙ্গে রক্ষিত হয়। লিপিকরের এই সৌকর্য-দক্ষতা সর্বপ্রকার কারুশিল্পীর কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার জিনিস। মুদ্রণশিল্প মুসলিম দেশগুলিতে সম্প্রসারিত হওয়ার বহু আগে ইউরোপে পূর্ণতা লাভ করলেও এর বিকাশের একটি বড় রকমের উপাদানের জন্য আমরা প্রাচ্যের কাছে ঋণী। মুসলমানরা যখন ৭০৪ খৃস্টাব্দে সমরকন্দ জয় করেন তখনই চীনের একটি প্রাচীন আবিষ্কার কাগজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং চীনা শিল্পীদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেন। ইসলামী বিশ্বের মধ্যদিয়ে এটি পাশ্চাত্যে আসে। কাগজে লেখা বহু সংখ্যক আরবী পাণ্ডুলিপির তারিখ নবম শতক, কিন্তু দ্বাদশ শতকের আগে খৃস্টান ইউরোপে এর আমদানি হয়নি এবং ত্রয়োদশ শতকে এটি সাধারণভাবে প্রচলিত হয়নি। প্রথম ইউরোপীয় কাগজ কল প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলমানদের দ্বারা স্পেন ও সিসিলিতে এবং এখান থেকেই কাগজ প্রেরিত হয় ইটালীতে।
যান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে পঞ্চদশ শতকে যখন ব্যবসায় ভিত্তিতে বই উৎপাদন শুরু হয় তখনই কাগজ এর একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদানে পরিণত হয়। কাগজ ছাড়া মুদ্রণ শিল্পের এতোটা অগ্রগতি আদৌ হতো না। কিন্তু আধুনিক প্রকাশকরা একমাত্র কাগজের জন্যই মুসলমানদের কাছে ঋণী নয়। পঞ্চদশ শতকে ভেনিস যখন অতোটা সক্রিয়ভাবে মুসলিম শিল্পরীতি আয়ত্ত ও প্রচার করছিল তখন ইটালীতে বাঁধাই করা বই-পুস্তক বিশেষভাবে প্রাচ্যের বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এসময় কিছু কিছু বই এমন একটি বৈশিষ্ট্য লাভ করে যা মুসলিম বই বাঁধাইর ক্ষেত্রে সাধারণ এবং এটি হচ্ছে সামনের প্রান্ত ভাগগুলি সুরক্ষিত করার জন্যে মোড়কের ন্যায় মলাট (ফ্ল্যাপ)। এই বৈশিষ্ট্য আমাদের ব্যাঙ্কারদের 'পাস-বুকের' ন্যায় হিসাব রক্ষণের জন্য তৈরি কতিপয় বাঁধাইর ক্ষেত্রে এখনো অব্যাহত রয়েছে। এটি এখনো প্রাচ্য ঐতিহ্যের একটি স্মারক।
মুসলমানদের দ্বারা অনুপ্রাণিত আর একটি অভিনব দিক হচ্ছে, চামড়ার মলাটে কারুকার্য করার একটি নতুন পদ্ধতি। মধ্যযুগে ইউরোপীয় বাইণ্ডাররা প্রায়ই ধাতব ছাঁচ দ্বারা ছাপ মেরে নকশা সৃষ্টির মাধ্যমে চামড়ার মলাটের সৌকর্য সাধন করতেন। এসব সীলমোহর নতুন নতুন ও বিস্তারিত নকশা খোদাইর মাধ্যমে বৃহত্তর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপরোক্ত পদ্ধতির বিকাশলাভ ঘটে। কিন্তু 'কানা হাতিয়ার' নামে পরিচিত এই সীলমোহরের নকশা কেবলমাত্র রিলিফেই প্রতিফলিত করা যেতো। অবশেষে প্রাচ্য শিল্পীদের সীলমোহরের খোদাই করা স্থানসমূহে সোনার রং ভরাট করে ছাপ মারা উন্নত নকশার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ভেনিসে বসবাসকারী মুসলিম বাইণ্ডাররা ইউরোপে এই রীতি প্রবর্তন করেন। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে একটি নতুন রীতিতে এই পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়। এতে উত্তপ্ত হাতিয়ারটিকে বারবার সোনার পাতে চাপ দিয়ে ছাপ মেরে স্থায়ীভাবে সোনার রং যুক্ত করা হয়। সম্ভবত কর্ডোভায় এই নতুন রীতিটির উদ্ভব হয়। ষোড়শ শতকে খৃস্টান ও মুসলমান উভয় বাইণ্ডাররাই সার্বজনীনভাবে এই রীতি অনুসরণ করেন। অবশ্য সোনা ব্যবহারের প্রাচীনতর প্রাচ্যরীতি কখনো সামগ্রিকভাবে পরিত্যক্ত হয়নি।
৬৭ নং চিত্রে চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে কিংবা পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগের একই বাঁধাইর ভেতরের দিকে অপরূপ কারুকার্য প্রাচ্যের সোনা ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত। পরিষ্কার ও সূক্ষ্ম একটি অলৌকিক নকশা। কয়েকটি সাধারণ হাতিয়ারের সাহায্যে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে অসংখ্য ছাপ মেরে এটি অংকিত করা হয়েছে। ৬৮ নং চিত্রে প্রাচ্যের বাইণ্ডারগণ কর্তৃক অনুসৃত অন্যান্য অলংকরণ রীতি প্রদর্শিত হয়েছে। এসব রীতি সপ্তদশ শতকের অনেক আগে প্রবর্তিত হয়। গাঢ় লাল বর্ণের চামড়ার মলাটে একটি কেন্দ্রীয় নকশা ছাপ মেরে সোনা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে। এর উপরে ও নিচে এবং প্রত্যেক কোণে সমতল থেকে নিচু করা বিভিন্ন আকারের খোব রয়েছে। সাদা পাতলা চামড়া কেটে কালো পাদভূমির উপর আঠা দিয়ে জড়িয়ে সেগুলির মধ্যে ফিতার ন্যায় কারুকার্য মণ্ডিত নকশা অংকন করা হয়েছে। সমতল ক্ষেত্রে গাছপালা এবং দূরপ্রাচ্যের একটি ড্রাগনসহ বিভিন্ন রকমের পশুপাখি সমন্বিত একটি আনুষ্ঠানিক প্রাকৃতিক দৃশ্য স্বর্ণ দিয়ে রঞ্জিত করা হয়েছে। ৬৯ নং চিত্রে ষোড়শ শতকের ভেনিসীয় মলাটে একই ধরনের নিচু করা খোব ও রঞ্জিত কারুকার্য রয়েছে। এটি স্পষ্টত একটি পারস্য মডেলের অনুকরণ।
মিসরীয় বাঁধাইয়ে (চিত্র ৬৭) কেন্দ্রস্থলে একটি ছুঁচালো ডিম্বাকৃতির খোব থেকে এবং প্রত্যেক কোণে তাঁর এক-চতুর্থাংশের পুনরাবৃত্তি করা হয়। পারস্য মলাটে একই পরিকল্পনার কিছুটা পরিবর্তন সাধন করে কারুকার্য করা হয় যা আমরা ইতিমধ্যেই বহু কারুশিল্পে লক্ষ্য করেছি। ৭০ নং চিত্রে প্রদর্শিত ১৫৪৬ খৃস্টাব্দের একটি ভেনিসীয় মলাটে মূলত মুসলমানদের কেন্দ্রীয় ও কৌণিক কৌশল এবং প্রাচ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত রৈখিক কারুকার্য সমন্বিত অনুরূপ একটি নকশা সোনালি দীপ্তিতে রঞ্জিত করা হয়েছে। ৭১ নং চিত্রে পরবর্তীকালের একটি জার্মান নকশায় একই ব্যবস্থা দেখা যায়, যদিও সমসাময়িক ইউরোপীয় রীতিতে বিস্তারিত কারুকার্য কিছুটা সংশোধন করা হয়েছে।
এই চারটি বাঁধাই শিল্পে মোটামুটিভাবে এমন কয়েকটি শৈল্পিক পদ্ধতির বিকাশকে অনুসরণ করা হয়েছে যার উদ্ভব মূলত মুসলিম দেশগুলিতে। এসব দেশের নকশা পরিকল্পনা ও কারুকার্যের উপাদান নিয়ে এগুলি ইউরোপীয় শিল্পকেন্দ্রে আবির্ভূত হয় এবং কিছুটা রদবদলসহ দৃঢ়ভাবে আধুনিক চর্চার অন্তর্ভুক্ত হয়। যেসব পন্থায় সূক্ষ্ম চামড়ার বাঁধাইয়ে বর্তমানে সার্বজনীনভাবে হাতিয়ারের সাহায্যে সোনালি লেখা অংকিত করা হয় মুসলিম শিল্পীরাই তাঁর পূর্ণতা সাধন করেন। প্রাচীন হাতের তৈরি বইয়ের মলাটের সঙ্গে যখন উনবিংশ শতকের যান্ত্রিকভাবে উৎপাদিত বইর মলাট যুক্ত হয় তখনো যান্ত্রিকভাবে বাঁধাইকরা বইগুলি মূল মুসলিম রীতিরই অনুসরণ করে।
প্রান্তভাগের মলাটে (এন্ডপেপার), কাগজের মলাটে এবং অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় কারখানায় বইর প্রান্তভাগ বাঁধাইতে 'মার্বেল রঙের' যেসব উজ্জ্বল নকশা অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে সেগুলিও সরাসরি প্রাচ্য সূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে। ষোড়শ শতকে মুসলমানদের অংকিত চিত্রের ও সুদর্শন হস্তলিপির প্রান্তভাগের চারদিকে আটকানো কাগজের টুকরার উপর এসব সূক্ষ্ম নকশার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। শিল্পরসিকদের বিশেষ রুচিসম্মত সম্পদ সুশোভিত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এর উদ্ভব হয়। ইংল্যাণ্ডে বেকনের সময় মার্বেল পেপারের কথা জানা ছিল। এ সম্পর্কে তাঁর উক্তি হচ্ছে, 'তুর্কীদের কাগজকে চ্যামলেটিং (মার্বেল রং করার) একটি সুন্দর শিল্প রয়েছে, যা আমাদের এখানে প্রচলিত নেই। তারা ডুবুরিদের তৈল রং বিভিন্নভাবে পানির সঙ্গে মিশায়, সেটাকে হালকাভাবে ঝাঁকিয়ে নেয় এবং তার দ্বারা তাদের কাগজ ভিজিয়ে নেয়। ফলে কাগজ চ্যামলেট বা মার্বেলের ন্যায় রেখায়িত হয়ে ওঠে।'
ষোড়শ শতকের শেষদিকে পাশ্চাত্যে যেসব বই বাঁধাই হতো সেগুলিতে প্রাচ্যকে আমদানি করা মার্বেল পেপার দেখা যায়। কিন্তু এরও প্রায় একশ বছর পরে ইউরোপীয় বাইণ্ডাররা এই কাগজ উৎপাদন শুরু করেন। হাতের তৈরি মার্বেল কাগজ বর্তমানে কদাচিৎ ব্যবহৃত হয়। অনুকরণমূলকভাবে উৎপাদিত কাগজই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
ইউরোপ এক হাজার বছরেরও বেশি কাল পর্যন্ত মুসলিম শিল্পকর্মকে একটি বিস্ময়ের বস্তু হিসাবে দেখে। প্রথমে এ কারণে তারা বিস্ময় বোধ করে যে, এটি এমন সব দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল যেগুলিকে উত্তরাধিকার সূত্রে খৃস্টান বলে মনে করা হতো। পরবর্তীকালে এর নিজস্ব সৌন্দর্যের জন্যই তারা বিস্ময় বোধ করে। মধ্যযুগীয় ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণেই বহু সুন্দর সুন্দর শিল্পকর্ম সংরক্ষিত হয়। কারণ যেসব শিল্প নিদর্শন যুগের পর যুগ ধরে গির্জাগুলিতে সুরক্ষিত থাকে তাদের সংখ্যা কম নয়। এখানে খলীফার জুয়েল-কেস হিসাবে ব্যবহৃত কৌটা পবিত্র স্মৃতিচিহ্নের ভাণ্ডারে পরিণত হয়। এর মধ্যে পবিত্র ভূমি থেকে হয়ত মুসলমানদের কোন রাজকীয় পোশাক থেকে কেটে নেওয়া এক টুকরো অপরূপ রেশমী বস্ত্র ছিল। এসব জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধার যথেষ্ট কারণও ছিল। এগুলির উপর যেসব অদ্ভুত ছবি ও রহস্যজনক লেখা থাকতো সেগুলিকে কোন কোন সময় ট্যালিসম্যান (জাদুকরি কবচ) এবং হযরত সোলায়মানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জিনিস মনে করা হতো। মধ্যযুগে স্থাপত্য আর কিছু না হোক রোমান্টিক ছিল। শার্লেমনকে প্রদত্ত হারুনুর রশীদের উপহার কিংবা সেন্টলুই কর্তৃক প্রাচ্য থেকে সংগৃহীত শিল্প নিদর্শনের ন্যায় যেসব উল্লেখযোগ্য শিল্প সম্পদকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত পবিত্র মনে করা হতো, গবেষণার মাধ্যমে, কেবলমাত্র বিগত শতকেই এই শ্রদ্ধামূলক মনোভাবে সন্দেহ আরোপ করা হয়। কিন্তু এই সন্দেহ সত্য হোক কিংবা মিথ্যা হোক এগুলির অপরূপ সৌন্দর্য নিঃসন্দেহে বাস্তব। যেসব শ্রেষ্ঠ অবদানকে প্রত্যেক কারুশিল্পী শ্রদ্ধা করে সেগুলি সবসময় উপেক্ষিত পাশ্চাত্যে শিল্পচর্চায় নিষ্ঠাবান শিল্পকর্মীদের জন্য একটি প্রেরণা ছিল।
খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় ক্রুসেডের বহু পূর্ব থেকেই শুরু হয়। স্পেনে পশ্চিম ইউরোপের একেবারে দ্বারপ্রান্তে ইসলাম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রথম থেকেই খৃস্টান সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। সিসিলিতে দুটি ধর্ম সাধারণ ভূমিতে অবস্থান করে। উত্তর আফ্রিকা সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের অধিকারভুক্ত হয় এবং এখান থেকে মুসলিম জাহাজগুলি ভূমধ্যসাগরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বিচরণ করে।
ক্রুসেডের সঙ্গে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। বিস্মিত খৃস্টান জগতের কাছে স্যারাসেন নামে পরিচিত অর্ধ-রূপকথার শিল্পসৌকর্য বাস্তবতা লাভ করে। ইউরোপের প্রত্যেকটি অঞ্চল থেকে আকস্মিকভাবে দলে দলে লোক এমন এক সামাজিক ব্যবস্থার গভীর সংস্পর্শে আসে যা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সংকীর্ণ অভিজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিদেশী প্রগতির সংস্পর্শে শীঘ্রই তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সূচিত হয়। শিল্পক্ষেত্রে এই প্রভাব কোন অংশে কম সুদূর প্রসারী ছিল না। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ইটালীয় বণিকরা সিরীয় বন্দরগুলির সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে, প্রাচ্য বাণিজ্য নিয়মিতভাবে সংগঠিত করা হয় এবং মুসলিম শিল্প কেন্দ্রগুলি থেকে সর্বপ্রকার দুষ্প্রাপ্য জিনিস ইউরোপীয় বাজারসমূহে গিয়ে পৌঁছে। এসব আমদানি নতুন নতুন প্রয়োজন মেটায়। এগুলি যেখানে যায় সেখানেই প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে এবং সঙ্গে সঙ্গে কিংবা অদূর ভবিষ্যতের জন্য সূক্ষ্ম পন্থায় উন্নতির নতুন নতুন দিক উন্মোচিত করে।
যে গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে পাশ্চাত্য মধ্যযুগীয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছিল তখন কতগুলি শক্তির উদ্ভব হয় এবং তা ধর্মীয় প্রেরণার দ্বারা পরিপুষ্ট হয়। এসব শক্তি সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যিক তৎপরতার মধ্যে গড়ে ওঠা অপর একটি ক্ষমতার পর্যায়ে প্রবেশ করে। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপীয় কারুশিল্পীগণ রেনেসাঁর জন্য অপরিহার্য আড়ম্বরপূর্ণ ও লাভজনক শিল্পচর্চায় মুসলমানদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন উদ্যমে প্রাচ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মুসলিম পদ্ধতিগুলি গভীরতরভাবে পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ করে তারা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিগুলির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেন। এমনিভাবে তারা যেসব অলংকারমূলক অবদান লাভ করেন সেগুলি কেবল আয়ত্ত করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা মুসলিম নকশার রীতিনীতিগুলি গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে শুরু করেন এবং সেগুলিকে এমন এক নতুন শিল্প সাধনার প্রেরণায় অঙ্গীভূত করেন যা ধারণার দিক দিয়ে পুরোপুরি ইউরোপীয়। কেবল ছোটখাট কারুশিল্পীরাই নন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ন্যায় অসাধারণ ব্যক্তিরাও প্রাচ্যের অলংকার শিল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি ৭২ নং চিত্রের নকশাটি তাঁর একটি নোট বুকের খসড়া রেখাচিত্র থেকে রূপায়িত করেন। এত দ্বারা এ ধরনের পর্যালোচনায় তাঁর আগ্রহ সূচিত হয়েছে।
সব সময় প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে এসব অভিনবত্বের সূচনা হয়নি। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে এ ধরনের প্রেরণা সৃষ্টিকারী একটি নতুন পদ্ধতির উদ্ভব হয়, এবং তা হচ্ছে 'নকশার বই'। এটি মুদ্রণযন্ত্রের একটি সমূহ অবদান। মূল সূত্রসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না তারা এ ধরনের সংগ্রহের মাধ্যমে নতুন রীতিতে প্রখ্যাত শিল্পীদের গবেষণামূলক কাজের সঙ্গে পরিচিত হন। ফ্রান্সিস্কো ডি পেলেগরিনোর একটি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ নকশার বইগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দৃষ্টান্তগুলি সামগ্রিকভাবে মুসলিম নমুনা থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি এবং পিটার ফ্লন্টার, ভার্জিল সলিস ও মার্টিনাস পেটাস প্রমুখের সমসাময়িক নকশার বই থেকে হোলবিন কর্তৃক অংকিত নকশাগুলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যেতে পারে। রৌপ্যকার ও অন্যান্য কারুশিল্পীর জন্য তিনি যেসব নকশা অংকন করেছেন সেগুলিতে মুসলিম শিল্প প্রেরণাকে অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে একটি মৌল রীতিতে রূপায়িত করা হয়েছে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ওলন্দাজ ও ইংরেজ প্রতিষ্ঠানগুলি ভাস্কোদাগামার ভারত অভিযানের সুফল ভোগ করতে থাকে। প্রাচ্য থেকে সরাসরি একটি নতুন বাণিজ্যের ধারা ক্রমবর্ধমানভাবে অব্যাহত থাকে এবং তা প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট হস্তশিল্প দ্রব্যকে প্রভাবিত করে। এসব দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা মিটানোর জন্য এমনসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যা আধুনিক শিল্পোন্নয়নকেও ম্লান করে দেয়। মুসলিম এশিয়া থেকে বাহ্যত তুচ্ছ বহু জিনিস আসতে থাকে যা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে এবং তা কেবল ইউরোপেই নয়, সমগ্র সভ্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে। জাহাজ ভর্তি তুলা ও উজ্জ্বল বর্ণের নকশা সম্বলিত 'চিন্টজ' (সুতি কাপড়) বস্ত্রের ক্ষেত্রে নতুন প্রচলনের সূচনা করে। এর ফলে প্যারিসের উপকণ্ঠে বস্ত্রশিল্পের বিকাশ হয়, রানী অ্যানের আমলে মহিলারা সুদর্শন পোশাক লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে ম্যানচেস্টার সম্পদশালী হয়ে ওঠে। পারস্য থেকে 'নতুন শাল' আসতে থাকে। প্রাচুর্যের অধিকারী 'নবাবরা' ভারত থেকে সম্ভবত মোগলদের জলপাত্রের অনুকরণে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের চা ও কফির পাত্র নিয়ে আসেন। এগুলি ভিক্টোরিয়া যুগের ব্রেকফাস্টের টেবিলে সাধারণ ব্যবহার্য জিনিসে পরিণত হয় এবং কিছুটা সংশোধিত আকারে বর্তমান যুগেও অব্যাহত রয়েছে।
পাশ্চাত্যের শ্রদ্ধাভক্তি, শিক্ষা গ্রহণ, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কৌতূহল ইসলামের সূচনা থেকে মুসলিম নিপুণতার স্বাক্ষর বহনকারী জিনিসসমূহে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের রুচির খোরাক লাভ করেছে। কিন্তু তাদের কারিগরি দক্ষতা ও সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য শিল্পীরা এমন একটি তহবিল থেকে পাশ্চাত্যের শিল্পকে ক্রমাগত উজ্জীবিত করে আসছে যা আমাদের কাছে কেবল একটি উত্তরাধিকারই নয়, বরং আমাদের পোষণকারী একটি বার্ষিক বৃত্তিও বটে। ১২৮৬ খৃস্টাব্দে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবের প্রেসবিটারির মার্বেল পাথরের মেঝেতে খচিত করে ইসলামী নকশা অংকনকারী রোমের ওডারিকাস এবং ১৮৮৪ খৃস্টাব্দে নিজস্ব মখমলের উপর অপর একটি নকশা অংকনকারী উইলিয়াম মরিসের ন্যায় প্রখ্যাত কারুশিল্পী এবং তাদের পূর্ববর্তী, মধ্যবর্তী ও পরবর্তীকালের অসংখ্য শিল্পীর কারুকার্য এই সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
টিকাঃ
১. এ সব নকশার রঙীন চিত্র এলয়স্-মুসিলের কুশেজর আমরায় পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছে।
১. এডুয়ার্ডো সাভেড্রা দ্রষ্টব্য, 'নোট সার আন অ্যাস্টলেব অ্যারাবে' অ্যাট্রিডেলিভ কংগেম্মে ইন্টারনেযিওনেল ডেগলি ওরিয়েন্টালিস্ট, ১৮৭৮। ফিরেনয ১৮৮০।
১. ১৮২৮ খৃস্টাব্দে উৎকীর্ণলিপিটি প্রথম পাঠ করে এম রিনাউদ উপরোক্ত নামটি দিয়েছেন। কিন্তু এম ম্যাক্সভ্যান বার্চেম এটি সংশোধন করে ('নোটস ডি 'আর্কিওলজি অ্যারাবে' জার্নাল এসিয়াটিক, ১১শ সিরি, প্যারিস, ১৯০৪) পৈতৃক হানফার-এর স্থলে মানআহ্ নাম দিয়েছেন।
১. দ্রষ্টব্য: সিলি স্টেঞ্জ, বাগদাদ আন্ডার দি আব্বাসিও ক্যালিফেট। অক্সফোর্ড ১৯০০।
১. এম জে বোরগয়েন লি টেইট ডেস এনটিল্যাকস (প্যারিস, ১৮৭৯) গ্রন্থে এ ধরনের প্রায় দুইশত অদ্ভুত ডিজাইন বিশ্লেষণ করেছেন। ডঃ ইএইচ হ্যার্কিন (দি ড্রইং অব জিওমেটিক প্যাটার্নস ইন স্যারাসেনিক আর্ট, কলকাতা, ১৯২৫) কতিপয় উল্লেখযোগ্য জটিল নমুনা অস্বাভাবিক দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন।
১. ফ্লোরেন্সের জৈনিক চিত্রকর ও ভাস্কর। তিনি ফন্টেন ব্লুতে প্রথম ফ্রান্সিসের দরবারে শিল্পচর্চা করতেন এবং ফ্রান্সে ফ্রান্সিস্কো ডি পেলেগ্রিন নামে পরিচিত ছিলেন। লা ফ্লিউর ডি লা সায়েন্স ডি পোর্টেকচার : প্যাটন্স ব্রডারি, ফ্যাকন অ্যারাবিক এট ইটালিক শিরোনামে ১৫৩০ খৃস্টাব্দে তার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্যাস্টন মিজিওমের পরিচিতিসহ এর একটি প্রতিরূপ সংস্করণ প্যারিস থেকে ১৯০৮ খৃস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
📄 ইসলামী শিল্পকলা এবং ইউরোপের চিত্রকলার ওপর এর প্রভাব
সপ্তদশ শতকের আগে মুসলিম চিত্রশিল্প ইউরোপে আনা হয়েছিল কিনা তাঁর কোন প্রমাণ নেই। রেমব্রান্টকেই প্রাচ্যের শিল্পকলার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহশীল পাশ্চাত্যের প্রথম চিত্রকর মনে করা হতো। দূরপ্রাচ্য থেকে কতিপয় চিত্র হল্যান্ডে পৌঁছার পর তিনি সেগুলি নকল করেন। এগুলি ছিল দিল্লীর রাজকীয় পরিবারের সদস্যদের ছবি।
অতএব, ইউরোপে ব্যক্তিগতভাবে কোন শিল্পীর উপর মুসলিম বিশ্বের চিত্র শিল্পের কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না। তেমনি মুসলিম প্রাচ্যের প্রভাব কোন বড় রকমের চিত্রকলার আন্দোলনকে অনুপ্রাণিতও করেনি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ক্লাসিক্যাল শিল্পের প্রতি নতুন আবেগের ফলে ইটালীয় চিত্রকলায় যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় সেরূপ শিল্প চর্চায় মুসলমানদের কোন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। খুঁজে পাওয়া গেলেও তা বাহ্যিক। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে আরব প্রাধান্যের প্রাথমিক যুগেই এগুলি দেখা যায়। প্রাচ্যের নকশীবস্ত্র থেকে কিছু কিছু জীবজন্তুর ছবি নকল করা হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ একাদশ শতকে বিবলিওথেক ন্যাশনেলে (জাতীয় গ্রন্থাগার) বীটাসের অ্যাপক্যালিপসের টীকার পাণ্ডুলিপিতে এবং মধ্যযুগের প্রথম দিকের অন্যান্য কতিপয় পাণ্ডুলিপিতে এসব চিত্র দেখা যায়। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে খৃস্টান বিশ্বের সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রাচ্যের শিল্প সৌকর্যমূলক জিনিস আমদানির ফলে ভাস্কর্য, স্থাপত্য কিংবা ধাতব শিল্পকর্মে যতটা অবদান সৃষ্টি হয়েছে চিত্রকলার ক্ষেত্রে তা আদৌ হয়নি। প্রাচ্যের উপাদানসমূহের কারুকার্যমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রধানত এর ভূমিকা দেখা যায় এবং সেখানেও ছোটখাট ব্যাপারেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। এসব কারুকার্যমূলক উপাদান মুসলমানদের উৎপাদিত রেশমী বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্প উপকরণ আমদানির মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে এলেও এগুলি একান্তভাবে মুসলমানদের উদ্ভাবিত বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুসলমানরা তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে যেসব জিনিস লাভ করেছে সেগুলিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতীতের এ ধরনের শৈল্পিক সম্পদের মধ্যে কালডিয়ার পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় অত্যন্ত প্রাচীন কতিপয় প্রচলিত নকশাও রয়েছে। এই নকশাটি সাসানীয় শিল্পকলার মধ্য দিয়ে মুসলিম যুগে এসেছে। আদিম রীতি অনুসারে এই জীবন বৃক্ষটির দুপাশে দুটি জন্তু পরস্পরের মুখোমুখি থাকে। কিন্তু খৃস্টান শিল্পীরা প্রায়ই পবিত্র বৃক্ষের কেন্দ্রীয় উপাদানটি পরিহার করেছে। মুসলিম পূর্ববর্তী আদিম যুগের অন্যান্য চিত্রের মধ্যে একটি অপরটির শিকার দুটি জন্তু এবং একই দেহ ও দুই মস্তক বিশিষ্ট জন্তুর ছবি উল্লেখযোগ্য। এগুলি চিত্রকলার চাইতে ভাস্কর্যের মধ্যেই বেশি দেখা যায় এবং শেষোক্ত ক্ষেত্রে প্রায়ই অনুরূপ খোদাই শিল্প থেকে নকল করে গির্জার ক্যাপিটাল (স্তম্ভের শীর্ষদেশ) ও বাস-রিলিফে (পটভূমি থেকে উঁচু) খোদাই করা হয়। দ্বিতীয় রজারের (১১০১-৫৪ খৃ.) পালেরমোর প্যালেটাইন চ্যাপেলের নকশাশিল্পীদের ন্যায় যেসব মুসলিম শিল্পী মধ্যযুগের প্রথম দিকে খৃস্টান পৃষ্ঠপোষকদের জন্য কাজ করেন তাদের শিল্পকর্মে এধরনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ক্রুসেডের আমলে মুসলিম প্রাচ্যের সঙ্গে অধিক পরিমাণ যোগাযোগের ফলে মুসলমানদের আলঙ্কারিক উপাদান সম্বলিত জিনিসপত্রের বিশেষভাবে আমদানি ঘটে। এ সময় জেনোয়া, পিসা ও ভেনিসের ন্যায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ কেন্দ্রের দেশগুলিতে চিত্রশিল্পে এসব উপাদান প্রচলিত হয়। এর ফলে প্রধানত অপরিচিত জিনিসের প্রতি কৌতূহল ও আকর্ষণ থেকে প্রাচ্য বিশ্বের প্রতি একটি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিফলন ঘটে সিয়েনীয় চিত্রকলার প্রাথমিক দ্রব্যগুলিতে এবং তা আরো প্রাধান্য পায় টুসকান শিল্পে। চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই এসব ইটালীয় চিত্রে পাগড়িওয়ালা ছবি ও প্রাচ্যের মুখাবয়ব পরিদৃষ্ট হয়। কোন পবিত্র দৃশ্যে এসব বিদেশী ছবি সাধারণত প্রাধান্য পায় না। কেবলমাত্র আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেই প্রাচ্যের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। যেমন, পারস্য ও অন্যান্য কার্পেটের প্রতিলিপিতে, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাচ্যের পোশাকে এবং চিতা বাঘ, বানর ও তোতা পাখির ন্যায় ভিনদেশী জীবজন্তুর প্রচলনে। বিস্তারিত প্রাকৃতিক দৃশ্যেও প্রাচ্যের নকশার ইচ্ছাকৃত অনুকরণমূলক গাছপালা ও পত্রপুষ্প দেখা যায়।
কারুকার্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রায়ই আরবী হস্তলিপি ব্যবহারের মধ্যে একটি বিশেষ প্রাচ্য বৈশিষ্ট্য ধার করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি খৃস্টান শিল্পীদের উপর মুসলিম শিল্পের সরাসরি প্রভাবের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত যা ইউরোপীয় পণ্ডিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৪৬ খৃস্টাব্দে আডিয়েন ডি লং পারিয়ার কর্তৃক রিভিউ আর্কিওলজিক-এ তাঁর নিবন্ধ 'ডি এল এমপ্লয় ডেস কারেক্টার্স অ্যারাবেস ড্যান্স এল অর্নামেন্টেশন, চেযলেস পিউপলস্ ক্রেটিয়েন্স ডি এল অকসিডেন্ট' প্রকাশিত হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় এর দৃষ্টান্ত সংগৃহীত হয়। বার্লিংটন ম্যাগাযিন-এ মিঃ এইচ ক্রিস্টির অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রবন্ধগুলিতে (১১শ ও ১২শ সংখ্যা 'দি ডেভেলপমেন্ট অব অর্নামেন্ট ফ্রম অ্যারাবিক স্ক্রিপ্টস')। ইটালীয় চিত্রকলায় চিত্রকর জটোর আমলেই এ ধরনের আরবী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কারুকার্যের ব্যবহার দেখা যায় (যেমন পাড়ুয়ার অ্যারেনা চ্যাপেলে রিসারেকশন অব ল্যাযারাসে যিশুখৃস্টের ছবির ডান কাঁধের উপর)। এ ধরনের কারুকার্যের জন্য ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো এবং ফ্রালিপ্পো লিপপি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এখানে স্পষ্টত এ ধরনের নকশার মূল পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা থেকে ভার্জিনের আস্তিন এবং তাঁর পোশাকের প্রান্তভাগেও এই নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত বহু ধরনের রেশমী ও সুতিবস্ত্র কিংবা প্রদীপ ও অন্যান্য পিতলের পাত্রই তাদের এ ধরনের নকশা জ্ঞানের সূত্র।
গ্রন্থপঞ্জি
স্যার টমাস ডব্লিউ আর্নল্ড, পেইন্টিং ইন ইসলাম, এ স্টাডি অব দি প্লেস অব পিক্টোরিয়াল আর্ট ইন মুসলিম কালচার, অক্সফোর্ড ১৯২৮।
টিকাঃ
১. ল্যাট্ (জে এবারসোন্ট, ওরিয়েন্ট এট্ অকসিডেন্ট পৃ. ১৯, প্যারিস, ১৯২৮)।
১. এগুলির একটি দীর্ঘ তালিকা সংকলিত হয়েছে, দ্রষ্টব্য-আঁদ্রে মাইকেল, হিস্টরি ডি লার্ট টি. আই ২ মি পার্টি, পৃ. ৮৮৩ এস কিউ কিউ (প্যারিস, ১৯০৫), এ ম্যারিগনান, আন হিস্টারিয়েন ডি লার্ট ফ্ল্যঙ্কয়েস লুই কোরাজড (৪র্থ অধ্যায়, এল' ইনফ্লুয়েন্স ওরিয়েন্টেল সুর লেস প্রভিন্সেস ডু নর্ড এটু ডু মিডি ডি এল ইটালী) (প্যারিস, ১৮৯৯)।
২. এ প্যাভলভস্কী 'ডেকোরেশন্স ডেস প্ল্যাফন্ডস ডি লা চ্যাপেল প্যালাটাইন' (বাইযেন্টিনিস্চ্ ফিটসচারিফ্ট, ২য়, ১৮৯৩)।