📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 সংশয় নিরসন

📄 সংশয় নিরসন


নিচের হাদিসটি পড়ো:
وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الجَنَّةِ، حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا إِلَّا ذِرَاعٌ، فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الكِتَابُ، فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ، فَيَدْخُلُ النَّارَ
'...অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ জান্নাতবাসীদের আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার তাকদিরের লিখন তার ওপর বিজয়ী হয়; ফলে সে জাহান্নামিদের কাজ করতে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে।...'

অবাক করে দেওয়ার মতো কথা, তাই না? এক ব্যক্তি ষাট বছর আল্লাহর ইবাদত করল; অথচ আল্লাহ তাআলা কিনা তার পরিণাম মন্দ করবেন? এক ব্যক্তি সারাজীবন জান্নাতিদের আমল করল; অথচ তার ঠিকানা হবে কিনা জাহান্নামে? এর পেছনের রহস্য ফুটে ওঠে অন্য একটি হাদিসে। হাদিসটি নিম্নরূপ:
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ الجَنَّةِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ النَّارِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ
'...মানুষের বাহ্যিক বিচারে অনেক সময় কোনো মানুষ জান্নাতবাসীদের মতো আমল করতে থাকে, আসলে সে জাহান্নামি হয়। অনুরূপভাবে মানুষের বাহ্যিক বিচারে কোনো মানুষ জাহান্নামবাসীদের মতো আমল করলেও প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতি হয়।'

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি আজীবন জান্নাতিদের আমল করেও জাহান্নামি হওয়ার কারণ হচ্ছে, অন্তরের কপটতা ও পেটের নাড়িভুঁড়িতে লুকিয়ে থাকা রিয়া ও আত্মপ্রদর্শন। সারাজীবন সে যত আমল করেছে, একটাও নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহর জন্য ছিল না; বরং লোকদেখানো ও মানুষের বাহবা কুড়ানোই তার উদ্দেশ্য ছিল। সুতরাং প্রথমোক্ত হাদিস পড়ে আল্লাহর প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করার কোনোই সুযোগ নেই। তাঁর উদারতা ও বদান্যতার কোনো সীমা নেই। তাই বান্দার নিষ্ঠাপূর্ণ সৎকর্মের প্রতিদান তিনি শাস্তির মাধ্যমে দেবেন—এমনটি হতেই পারে না। কীভাবেই বা হবে? তিনি তো সেই মহান সত্তা, যিনি অল্প আমলের বিশাল প্রতিদান দেন, অধিকহারে পাপরাশি ক্ষমা করেন এবং কারও উত্তম আমলের সাওয়াব বিনষ্ট করেন না; বরং অসংখ্য-অগণিত গুণ সাওয়াব দান করেন।

সৎ বান্দা তার প্রতিপালকের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করে। আল্লাহ তাআলা যে প্রতিদানের ওয়াদা দিয়েছেন, তার আশায় আনন্দিত ও প্রফুল্ল থাকে। শুধু তা-ই নয়; বরং এ সুসংবাদ তার আশাপাশের লোকদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়। তাদের মাঝে আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারণা জাগ্রত করে। কবি রাফিয়ি বলেন :
'যখন মাটি হবে আমার বিছানা এবং আমি চলে যাব দয়াবান প্রভুর সান্নিধ্যে। আমাকে তখন অভিনন্দন জানিয়ো বন্ধুরা। আর বোলো, সুসংবাদ তোমার জন্য! কারণ তুমি এক মহান দানশীল সত্তার মেহমান হয়েছ।'

টিকাঃ
৩৬১. সহিহুল বুখারি: ৩৩৩২, সহিহু মুসলিম: ২৬৪৩, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত।
৩৬২. সহিহুল বুখারি : ২৮৯৮, সহিহু মুসলিম: ১১২, সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 দুটি চমৎকার পরিসমাপ্তি

📄 দুটি চমৎকার পরিসমাপ্তি


বেশি দূরের নয়; বরং নিকট অতীতের দুজন ব্যক্তির চমৎকার পরিসমাপ্তির ঘটনা শোনাচ্ছি:

প্রথম ঘটনাটি মিসরের প্রখ্যাত বক্তা ও মিম্বরযোদ্ধা আব্দুল হামিদ কাশাকের। তিনি দুআর মধ্যে প্রায় সময় বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে ইমাম হিসেবে জীবিত রাখুন এবং ইমাম অবস্থায় আমার মৃত্যু করুন। রাব্বুল আলামিন, কিয়ামতের দিন আপনার উদ্দেশে সিজদাবনত অবস্থায় আমার হাশর করুন।'

১৯৯৬ ইসায়ির ৬ ডিসেম্বর। জুমআবার। তিনি বাড়িতে জুমআর সালাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং মসজিদে ফরজ আদায় করতে যাওয়ার পূর্বে বাড়িতে নফল পড়ছিলেন। যখন সালাতের দ্বিতীয় সিজদার জন্য কপাল মাটিতে ঠেকালেন, সেখান থেকে আর মাথা ওঠালেন না। সেই সিজদাতেই চলে গেলেন প্রেমময় প্রভুর সান্নিধ্যে। যেভাবে কামনা করতেন সেভাবেই পরিসমাপ্তি হলো জীবনের। যেন আল্লাহ তাআলা তাঁকে জীবন নামক পাঠশালায় অনন্য কৃতিত্ব লাভের ফলস্বরূপ নতুন একটি জীবন দিয়ে পুরস্কৃত করলেন। যে জীবনে নেই কোনো কষ্ট ও ক্লান্তি; নেই কোনো ধরনের অন্যায়-অবিচার ও চিন্তা-পেরেশানি।

বান্দা আল্লাহর কাছে আবদার করল, আর আল্লাহ তার আবদার পূরণ করলেন! বান্দা কসম দিয়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইল, আর তিনি ঠিক ঠিক দিয়ে দিলেন! কী মধুর এই চাওয়া! কত মধুর এই পাওয়া!

দ্বিতীয় ঘটনাটি ফিলিস্তিনের শাইখ আহমাদ ইয়াসিনের। আমি যখন গাজায় গেলাম, তখন শাইখুল মুজাহিদিন আহমাদ ইয়াসিন -এর ভাইদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তারা আমাকে জানালেন যে, শাইখের শাহাদাতের কিছুদিন পূর্বে ডাক্তার তাদের বলেছিলেন, শাইখের স্বাস্থ্যের অবস্থা সংকটাপন্ন এবং অল্প কদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু আল্লাহর কী অনুগ্রহ! তিনি তাঁকে হৃদযন্ত্র-বিষয়ক জটিলতা এবং দুরারোগ্যব্যাধিতে ধুঁকেধুঁকে মারা যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করালেন! শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তিনি শহিদ হলেন। এভাবে শাইখ ভিন্ন একটি জায়গায় অমরত্ব লাভ করলেন। আমরা এক ধরনের চিন্তা করি; কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা হয় আরেক ধরনের। কী উত্তম হয় সেই ফয়সালা! কবি মুআররি এর যথাযথ চিত্রায়ণ করেছেন :
'আসলে মানুষকে চিরস্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ ভুল বুঝেছে। তারা মনে করেছে, মৃত্যুই মানুষের শেষ ঠিকানা। অথচ মৃত্যু মানে হলো, আমলের জগৎ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্য অথবা সৌভাগ্যের জগতে চলে যাওয়া।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00