📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ধারাবাহিকতার রহস্য

📄 ধারাবাহিকতার রহস্য


ইবাদত-বন্দেগিই হয় তাদের স্বভাব-প্রকৃতি। কোনো কারণে ইবাদত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে এই প্রশস্ত পৃথিবী তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে আসে, যতক্ষণ না ইবাদতে ফিরে আসে。

নেক আমলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার লক্ষণ। অনুগত বান্দা কোনো ভালো কাজ শুরু করলে তার প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাআলা যেসব পুরস্কার প্রদান করেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কাজ তোমার থেকে সংঘটিত হতে থাকবে এবং পাপ করার ইচ্ছা করা সত্ত্বেও তা থেকে তোমাকে বিরত রাখা হবে। সুসময়ে ও দুঃসময়ে আল্লাহর আশ্রয় নেওয়ার পথ তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে。

ইবাদতে অটলতা ও ধারাবাহিকতার রহস্য হলো, যে ব্যক্তি এর প্রতি মনোযোগী হয়, আল্লাহ তাআলা তাকে নানাভাবে সাহায্য করেন। তাঁর সাহায্যের একটি পন্থা হচ্ছে, ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করা। এটাই সবচেয়ে উত্তম সাহায্য। কারণ, ফেরেশতাগণ হলেন ইমানের যুদ্ধে শক্তিশালী সাহায্যকারী এবং আল্লাহর গোপন বাহিনী। তবে তাদের সহায়তা পাওয়ার জন্য শর্ত হলো, তোমাকে আগে সৎকর্ম শুরু করতে হবে।

বান্দার ইমানের তারতম্যভেদে তার প্রতি আল্লাহর সাহায্যের শক্তিও কমবেশি হয়। ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থন আসে ইমান অনুযায়ী। সুতরাং যার ইমান শক্তিশালী হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সমর্থনে শক্তিশালী ফেরেশতা-বাহিনী প্রেরণ করা হয়। যার ইমান দুর্বল হয়, তার সাহায্যকারী ফেরেশতা-বাহিনীও তার ইমানের মতো দুর্বল হয়।'

আরেক জায়গায় তিনি পুণ্যকর্মের গুরুত্ব খুলে খুলে বর্ণনা করেছেন। শক্তিশালী ও উন্নত পুণ্যকর্ম করার পাশাপাশি অধিকহারে পুণ্যকর্ম করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। বলেছেন, 'মানুষের পুণ্যকর্ম যখন শক্তিশালী হয়, তখন আল্লাহ তাআলা এমন শক্তিশালী ফেরেশতা-বাহিনী দ্বারা তার সমর্থন করেন, যারা শয়তানের ওপর বিজয় লাভ করেন। আর যদি পাপকর্ম শক্তিশালী হয়, তখন শয়তানের বাহিনী বিজয় ছিনিয়ে নেয়।'

এটা একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তোমার বাহিনী ও সাহায্যকারীগণ তোমার বিজয়ের পথ রচনা করবে, যদি তারা শক্তিশালী হয়। তোমার আমল-ইবাদতই এ যুদ্ধের রসদ। ইবনুল কাইয়িম -এর নিম্নোক্ত উদ্ধৃতির সারকথা এটাই। তিনি বলেন, 'বান্দা যখনই তাঁর ইবাদতকে পূর্ণতার স্তরে নিয়ে যাবে, তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সহযোগিতা লাভ করবে।'

এমনকি যদি কখনো তার পদস্খলন হয় এবং গাফিল হয়ে কোনো গুনাহ করে বসে, তখনও আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন। কারণ, আল্লাহর নিকট তার একটি মর্যাদা থাকে, যার কারণে আল্লাহ তাকে পৃথিবীতেই পাপের শাস্তি দিয়ে আখিরাতের জন্য সংশোধিত করে নেন।

ইবনুল কাইয়িম বলেন, '...তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাকে—যে তাঁর কাছে সম্মানিত—সামান্য ভুলের জন্যও শাস্তি প্রদান করেন। ফলে সে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকে। পক্ষান্তরে যে বান্দা আল্লাহর কাছে ঘৃণিত, তার ও তার পাপের মাঝে আল্লাহ তাআলা অন্তরায় হন না। বরং সে যখনই নতুন কোনো গুনাহ করে, তখন আল্লাহ তাকে নতুন একটি নিয়ামত দানে ভূষিত করেন। তা দেখে সেই প্রবঞ্চিত বান্দাটি মনে করে যে, আল্লাহ তাকে ভালোবেসে এ নিয়ামত দান করেছেন। সে ঘুণাক্ষরেও ভাবে না যে, এটা মূলত তার প্রতি আল্লাহর অসম্মান ও অবজ্ঞার প্রদর্শন এবং এর মাধ্যমে তিনি তাকে কঠিন ও স্থায়ী আজাব দেওয়ার ইচ্ছা করেছেন।'

টিকাঃ
৩৪৬. আল-জাওয়াবুল কাফি: পৃ. ৫৬, দারুল মারিফাহ।
৩৪৭. কুতুল কুলুব: ১/১১৫।
৩৪৮. আন-নাবওয়াত, ইবনে তাইমিয়া: ২/১০৬২।
৩৪৯. আন-নাবওয়াত: ২/১০৬৩।
৩৫০. মাদারিজুস সালিকিন: ১/৯৭।
৩৫১. জাদুল মাআদ: ৩/৫০২।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 হিদায়াতের মূল্য চেষ্টা ও সাধনা

📄 হিদায়াতের মূল্য চেষ্টা ও সাধনা


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'যারা আমার পথে জিহাদ করে (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়), তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব।'

সুদ্দি-সহ আরও অনেক মুফাসসিরে কিরাম বলেন, 'এ আয়াত কিতাল ফরজ হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে।' সুতরাং এখানে 'জিহাদ' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দ্বীনকে সাহায্য করা, বাতিলপন্থীদের প্রতিহত করা, জালিমদের মোকাবিলা করা, গাফিলদের পথ দেখানো এবং এসবের আগে, পরে ও পাশাপাশি অন্তরের সংযম ও সাধনা। আল্লাহ তাআলা এই জিহাদের পুরস্কারস্বরূপ হিদায়াত এবং হিদায়াতের ওপর অটলতা দান করেন। একাধিক মুফাসসিরের জবানিতে উল্লেখিত আয়াতের বিভিন্ন তাফসির (অর্থাৎ চেষ্টা ও সাধনার বিনিময়ে হিদায়াত লাভের বিভিন্ন ধরন ও পদ্ধতি) উল্লেখিত হয়েছে। নিচে কয়েকটি তুলে ধরা হলো:
• দারানি-এর তাফসির: মৌলিক আমলসমূহ চেষ্টা ও সংযমের মাধ্যমে উত্তমরূপে আদায় করলে আমি আরও অধিক আমল করার তাওফিক দান করব।
• ফুজাইল-এর তাফসির: যারা ইলম অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করবে, আমি তাদের জন্য ইলম অনুযায়ী আমল করার ব্যবস্থা করে দেবো।
• সাহল-এর তাফসির: যারা নববি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করবে, আমি তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করব।
• ইবনে আতা-এর তাফসির: যারা আমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করবে, আমি তাদেরকে আমার সন্তুষ্টিলাভের স্থান তথা জান্নাতের পথ দেখিয়ে দেবো।

• ইবনে আব্বাস-এর তাফসির : যারা আমার ইবাদতে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি তাদেরকে আমার বিনিময় লাভ করার পথসমূহ দেখিয়ে দেবো।

জুনাইদ-এর তাফসির : যারা তাওবার মাধ্যমে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি তাদেরকে ইখলাস ও নিষ্ঠা অর্জনের পথে পরিচালিত করব। অথবা যারা আমার সেবায় চেষ্টা-সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার সাথে নিভৃতে আলাপের সৌভাগ্য অর্জনের পথে পরিচালিত করব。

আয়াত থেকে সূক্ষ্মভাবে একটি বিষয় বোঝা যায় যে, হিদায়াতের পন্থা কেবল একটি নয়; বরং কয়েকটি আছে। যেন আল্লাহর দিকে পৌঁছিয়ে দেওয়া পথসমূহ তোমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে এবং তার ওপর চলতে উদ্বুদ্ধ করছে। সুতরাং সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করো না। কারণ আল্লাহ তাআলা এতই দয়ালু যে, পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর বিনিময়ে এক পাপিষ্ঠ বান্দাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আরেক ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে গাছের ডাল সরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ক্ষমা করেছিলেন। এভাবে দেখতে তুচ্ছ মনে হয়, এমন অনেক পুণ্যকর্মের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অনেক বান্দাকে ক্ষমা করে দিয়ে থাকেন।

টিকাঃ
৩৫২. সুরা আল-আনকাবুত, ২৯: ৬৯।
৩৫৩. তাফসিরুন নাসাফি (মাদারিকুত তানজিল ওয়া হাকায়িকুত তাওয়িল), দারুল কালিমিত তাইয়িব: ২/২৮৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00