📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 বরকতের প্রকারদ্বয়

📄 বরকতের প্রকারদ্বয়


বরকত মানে প্রবৃদ্ধি। বরকত মানে কোনো বিষয় তোমার ধারণা এবং অনুমানের চেয়ে বেশি পাওয়া। তা দুই প্রকার:

প্রথম প্রকার: প্রদান করার মাধ্যমে বরকত
ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে একটি হাদিসের আলোচনায় বলেছেন, “আমি বনু উমাইয়ার একটি ধনভান্ডারে খেজুর-বিচির সমান একটি গমের বিচি দেখেছি। যে থলির মধ্যে সেটা সংরক্ষিত ছিল, তার ওপর লেখা ছিল: ন্যায়বিচারের যুগে এ ধরনের গম উৎপন্ন হতো।”

পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ন্যায়পরায়ণতার যুগ ছিল মুজাদ্দিদে ইসলাম উমর বিন আব্দুল আজিজ -এর খিলাফতকাল। সে যুগ সম্পর্কে মুসা বিন আইয়ুন বলেন, 'উমর বিন আব্দুল আজিজ-এর খিলাফতের সময় আমরা যে মাঠে ছাগল চরাতাম, সে একই মাঠে বন্য হিংস্র জন্তুরা বিচরণ করত। একদিন আমাদের ছাগলপালে বাঘ হানা দিল। তখন আমরা মন্তব্য করলাম, “ভালো মানুষটি বোধহয় আর নেই।” বর্ণনাকারী বলেন, মুসা বিন আইয়ুনসহ আরও অনেকে আমাকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাদের প্রত্যেকে বলেছেন, এ ঘটনা থেকে মানুষে যেমনটি ধারণা করেছিল, ঠিক তা-ই হয়েছিল। সেদিন উমর বিন আব্দুল আজিজের মৃত্যু হয়েছিল。

দ্বিতীয় প্রকার: রহিত করার মাধ্যমে বরকত
এই বরকতের ধরন হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তোমার ব্যয়ের খাত কমিয়ে দেন। এটি একটি সূক্ষ্ম বরকত। তোমার আয় হয়তো কম, তবে ব্যয়ের খাত কম হওয়ার কারণে সে কম আয় তোমার জন্য অধিক। এই বরকত তোমার পকেটে টাকা বৃদ্ধি করে না ঠিকই; কিন্তু তোমার জন্য ব্যয়ের পথ রুদ্ধ করে রাখে। যেমন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে সুস্থ রাখেন; ফলে ডাক্তার ও চিকিৎসার খরচ তোমার বেঁচে যায়। এমন মারাত্মক ঘটনা তোমার সাথে সংঘটিত হয় না, যার জন্য তোমার প্রচুর টাকা খরচ হয়।

টিকাঃ
৩০৬. আদ-দাউ ওয়াদ দাওয়া: পৃ. ৬৫।
৩০৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/২৫৫।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 যে পাঠ ভুলে থাকা যায় না

📄 যে পাঠ ভুলে থাকা যায় না


রাসুল-এর দুআর বরকতে হাকিম বিন হিজাম-কে আল্লাহ তাআলা উভয় প্রকারের বরকত দান করেছিলেন। এই বরকত লাভের সবক তিনি গ্রহণ করেছিলেন নববি মাদরাসা থেকে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন:
আমি রাসুল-এর নিকট চাইলাম। তিনি দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলাম। তিনি দান করলেন। অতঃপর আবার চাইলাম। এবার তিনি দান করার পর বললেন:
يَا حَكِيمُ ، إِنَّ هَذَا المَالَ خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ، فَمَنْ أَخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفْسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أَخَذَهُ بِإِشْرَافِ نَفْسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلَا يَشْبَعُ، اليدُ العُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى
'হে হাকিম, এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ব্যতীত) তা গ্রহণ করে, তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভ নিয়ে তা গ্রহণ করে, তার জন্য তা বরকতময় হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মতো, যে খায়; কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত হতে উত্তম।'

এখানে রাসুল সম্পদ সম্পর্কে হাকিম বিন হিজাম-কে-যিনি সেসব লোকের মধ্যে ছিলেন, যাদেরকে রাসুল ধন-সম্পদ দিয়ে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছিলেন-মাল সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এই হাদিসে তিনি ধন-সম্পদকে সবুজ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যা তার বাইরের সৌন্দর্য দিয়ে দৃষ্টি ও অন্তরসমূহকে আকৃষ্ট করে। একইসাথে তা সুস্বাদুও। ফলে তা ভোগ করতেও মজা লাগে। মোটকথা, সম্পদ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক দিয়ে সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। এ কারণে তা মানুষকে সহজেই ফিতনায় আক্রান্ত করে ফেলে।

এই হাদিসে রাসুল -এর ভাষার অলংকার দেখো। আরবিতে মাল (المال) শব্দটি পুংলিঙ্গবাচক হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য স্ত্রীলিঙ্গবাচক দুটি গুণ (خَضِرَةٌ حُلْوَ) ব্যবহার করেছেন। এমন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি এখানে মাল বলে দুনিয়াকেই বোঝাতে চেয়েছেন। আবার দুনিয়াকে মাল বলার কারণ হচ্ছে, বান্দা দুনিয়াতে সবচেয়ে যে বস্তুটির অন্বেষণ করে, তা হচ্ছে মাল। আর রাসুল -এর উপদেশের সারমর্ম হচ্ছে, মাল যদিও ফিতনা ও প্রভাব বিস্তারকারী, তা সত্ত্বেও কেউ যদি যাচনা ও লোভ ব্যতীত মাল গ্রহণ করে, আল্লাহ তাআলা তার মধ্যে বরকত দান করেন। এই বরকতের দুটি ধরন রয়েছে:

প্রথম ধরন: যাচনা ও লোভ ব্যতীত অর্জিত সম্পদ তার মালিকের জন্য ফিতনার কারণ হয় না। তাই এ সম্পদের কারণে তার দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং তার প্রয়োজন পূরণে ও দ্বীনকে বিশুদ্ধ রাখতে তাকে সহায়তা করে।

দ্বিতীয় ধরন: এ সম্পদ থেকে অল্প পরিমাণ সম্পদই তোমার জন্য যথেষ্ট হয়। ফলে এর চেয়ে বেশি অর্জনের প্রতি লোভ ও যাচনা করার বাসনা জাগে না।

রাসুল -এর উপদেশ শোনার পরপরই হাকিম শপথ করলেন। ততক্ষণে নবুওয়াতের নুর তার লোভ-লালসার অন্ধকারকে দূর করে দিয়েছিল। তাই স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন—তাঁর কসম খেয়ে বলছি, আজকের পর থেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত কারও কাছ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করব না।'

হাকিম তাঁর ওয়াদাকে সত্য প্রমাণ করেছেন। তাঁর বয়স ষাট অতিক্রম করার পরেও তিনি কারও কাছ থেকে কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। আবু বকর সিদ্দিক তাঁকে অনুদান দেওয়ার জন্য ডাকতেন; কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। আবু বকর এ-এর পরে উমর-ও তাঁর প্রাপ্য অনুদান তাঁকে দেওয়ার জন্য ডাকতেন; কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। ফলে একদিন উমর জনতার সামনে বললেন, 'হে মুসলিম জনতা, আমি তোমাদের এই মর্মে সাক্ষী রাখছি যে, আমি হাকিম বিন হিজামের প্রাপ্য হক তাঁর সামনে পেশ করেছি; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন।'

এভাবে জনগণকে সাক্ষী করার মাধ্যমে উমর হয়তো নিজ জিম্মা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন অথবা হাকিমকে তাঁর প্রাপ্য গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাসুল-এর পর থেকে হাকিম বিন হিজাম কারও কাছ থেকে কোনো সম্পদ গ্রহণ করেননি। মুআবিয়া-এর রাজত্বের দশ বছরের মাথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজের ওয়াদার ওপর অটল ও অবিচল ছিলেন।

রাসুল-এর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কারণে আল্লাহ তাআলা তার সম্পদে অনেক বরকত দান করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তার পরিত্যক্ত সম্পদ সম্পর্কে ইমাম জুহরি বলেন, 'অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। মৃত্যুর সময় তিনি কুরাইশের সর্বোচ্চ ধনীদের একজন ছিলেন।'

অপরদিকে, যে ব্যক্তি মনের চাহিদা ও লোভের বশবর্তী হয়ে সম্পদ গ্রহণ করে, তার মাল থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে রাসুল-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সে হয়ে যায় চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, যারা যতই খাবার গ্রহণ করুক, কখনো তৃপ্ত হয় না। কেননা, তারা জীবন বাঁচানোর জন্য খায় না; লোভ পূরণ করার জন্য খায়। যে ব্যক্তি লোভের কারণে সম্পদ গ্রহণ করে, তার অবস্থাও ঠিক এদের মতোই।

টিকাঃ
৩০৮. সহিহুল বুখারি : ১৪৭২, সহিহু মুসলিম: ১০৩৫।
৩০৯. ৩২ নং ফায়দা : বার্ধক্যের সময়ে আত্মমর্যাদাবোধ ধরে রাখা বেশ কঠিন। এ সময়ে কেউ যদি আত্মমর্যাদাবোধ ধরে রাখে, সেটা তার সততা ও উচ্চ মনোবলের নিদর্শন। এ জন্যই বলা হয়, বড় শিশুর দুধ ছাড়ানো খুব কঠিন! কবি বলেন: 'গাছের শাখাকে যদি তুমি সোজা করতে চাও, তা সোজা হয়ে যায়। কিন্তু শুকনো কাঠকে সোজা করা সম্ভব নয়। আদব ও শিষ্টাচার বাল্যকালে ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে; কিন্তু বার্ধক্যের সময় আদব কোনো উপকার করতে পারে না।'
আরেক কবি বলেন: 'শিশুদের শিষ্টাচার শিখানো থেকে বিরত থেকো না। এতে যতই কষ্ট হোক। বুড়ো লোকদের শিষ্টাচার শিখাতে গিয়ে সময় নষ্ট করো না। আদব-শিষ্টাচার গ্রহণ করা থেকেও তারা বুড়ো হয়ে গিয়েছে।'
৩১০. উমদাতুল কারি: ৯/৫৩।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা


আমার এক বন্ধু তার অর্জিত সকল সম্পদের একটি অংশ বের করে কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। বিয়ের পর থেকে তার স্ত্রীও এ কাজে তার সাথে শরিক হলেন। তাদের অবস্থা যতই করুণ ও কঠিন হোক না কেন, তাদের সম্পদ থেকে এ অংশটি তারা বের করে কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে কখনো ভুল করতেন না। এভাবে অনেক বছর কেটে গেল। একদিন স্বামী কাজের উদ্দেশ্যে বাইরের দেশে সফর করার মনস্থ করলেন। সফরের প্রস্তুতির জন্য অনেক খরচের প্রয়োজন দেখা দিল। এ সুযোগে প্রবৃত্তি ও শয়তান তাকে এবারের মতো কল্যাণমূলক কাজের অংশ বের না করে পুরো সম্পদ রেখে দেওয়ার প্ররোচনা দিল। ফলে তিনি এবার সেই নির্ধারিত অংশটি বের করলেন না।

আমার বন্ধুটি যথারীতি সফরে বেরিয়ে পড়লেন। এক জায়গায় তাকে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ করা হলো। জায়গাটি ছিল একটি ইউরোপীয় দেশের বনাঞ্চলে। তিনি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য বের হয়ে দেখলেন, তার গাড়ির কাচ ভেঙে গেছে এবং তার বিশেষ ল্যাপটপটি চুরি হয়ে গেছে! তিনি খুবই আশ্চর্য হলেন, এই শান্ত পরিবেশে এবং সুনসান নীরব জঙ্গলে কে চুরি করতে পারে!

ল্যাপটপটি কেনার কয়েকদিনের মধ্যেই চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। তার ওপর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আসার কারণ কী—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি পেলেন, যদি তিনি পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী সম্পদ থেকে কল্যাণমূলক কাজের অংশটি বের করতেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতেন। বের করা অংশটির পরিমাণ চুরি হয়ে যাওয়া ল্যাপটপের মূল্যের এক-দশমাংশের চেয়েও কম ছিল! এ অল্প পরিমাণ দান থেকে বিরত থাকার কারণে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল। এই ঘটনার পর ব্যথাতুর হৃদয়ে তিনি আল্লাহর একটি মূলনীতি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারলেন:
'তুমি আল্লাহর জন্য দান করা থেকে বিরত থেকো না; নাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দান করা থেকে বিরত থাকবেন।'

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার

📄 আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার


প্রসিদ্ধ তাবিয়ি কাতাদা বিন দিআমাহ সাদুসি বলেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি কোনো হারাম কাজ সম্পাদন করার সামর্থ্য রাখা সত্ত্বেও একমাত্র আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা আখিরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই তাকে এর চেয়ে উত্তম বদলা দান করেন।'

চলো, কয়েকটি হাদিসাংশ থেকে তাঁর কথার যথার্থতা জেনে নিই:
مَا نَقَصَ مَالٌ مِنْ صَدَقَةٍ
'সদাকা করলে সম্পদ কমে না।'

وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ، إِلَّا عِزَّا
'(প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও) কোনো বান্দা যদি ক্ষমা করে দেয়, তার বিনিময়ে আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করেন।'

مَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ هَمَّهُ ... وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ
'যে ব্যক্তি আখিরাতকে তার ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে নেয়,... দুনিয়া না চাওয়া সত্ত্বেও তার হাতে এসে ধরা দেবে।'

مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ قَادِرُ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ، دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ مَا شَاءَ
'যে ব্যক্তি রাগ প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে তাকে সকল মাখলুকের সামনে ডেকে এনে ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট হুরদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বেছে নেওয়ার ইচ্ছাধিকার দান করবেন। '

مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ
'আল্লাহর জন্য যে বিনয় অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।'

مَنْ تَرَكَ اللَّبَاسَ تَوَاضُعًا لِلَّهِ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ دَعَاهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ مِنْ أَيِّ حُلَلِ الْإِيمَانِ شَاءَ يَلْبَسُهَا
'যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত হয়ে বিলাসী পোশাক ত্যাগ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সকল মাখলুকের সামনে তাকে ডাকবেন এবং জান্নাতি পোশাকসমূহের মধ্য থেকে যেটা ইচ্ছা বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন। '

উপরিউক্ত সকল কথা নবিজি -এর সহিহ অথবা হাসান হাদিসের অংশ। প্রতিটি হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহর বিধানকে প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তাকে উত্তম বদলা দান করেন এবং মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতেও তার সাওয়াব দান করেন। এটি একটি ইমানি মূলনীতি, যার মূলভাব হচ্ছে :
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দান করবেন।'

এটা এমন এক পাঠ, যা একজন গ্রাম্য সাহাবিকে রাসুল হাত ধরে শিক্ষা দিয়েছেন। বলেছেন:

إِنَّكَ لَنْ تَدَعَ شَيْئًا اتَّقَاءَ اللَّهِ إِلَّا أَعْطَاكَ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهُ
'তুমি আল্লাহর ভয়ে যা-ই পরিত্যাগ করবে, বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার চেয়ে উত্তম বস্তু তোমাকে দান করবেন।'

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করার বিনিময়ে তিনি যে প্রতিদান দান করেন, ইবনুল কাইয়িম সে প্রতিদানের প্রকারসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন। অতঃপর সর্বোত্তম প্রকারটি চিহ্নিত করেছেন। বলেছেন, 'প্রতিদান বিভিন্ন ধরনের আছে। সেগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা, হৃদয়ের প্রশান্তি, শক্তি, প্রফুল্লতা, আনন্দ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।'

প্রতিদানটা কলবে পাওয়াই সবচেয়ে ভালো। কারণ, কলবের প্রশান্তি ও আনন্দ শরীরের সুখ ও স্বাদের উৎস। সুফইয়ান বিন উয়াইনা আব্দুল্লাহ বিন মারজুক-কে একটি বালুকাময় প্রান্তরে পেলেন, যে অবস্থায় তাঁর পাশে ছিল বিক্ষিপ্ত বালির টিলা। তাঁকে এ অবস্থায় দেখে সুফইয়ান বললেন, 'হে আবু মুহাম্মাদ, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু পরিত্যাগ করে, তাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই বদলা দিয়ে দেন। তো আপনি যা ত্যাগ করেছেন, তার বিনিময়ে কী পেয়েছেন?' তিনি বললেন, 'আমি বর্তমানে যে অবস্থায় আছি, তার প্রতি সন্তুষ্টি।'

আল্লাহর এই নীতিসম্পর্কিত কোনো না কোনো ঘটনা আমাদের প্রত্যেকের সাথে ঘটেছে। স্মৃতির ডাইরির পাতা উল্টালে অবশ্যই তা চোখে পড়বে। ভবিষ্যতের দিগন্তে আলোর আগমন ঘটাতে হলে এসব অতীত ঘেঁটে দেখা জরুরি। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া যথার্থই বলেছেন, 'আল্লাহর জন্য যে কোনো কিছু বিসর্জন দিল, তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর। '

কেউ আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করল; কিন্তু আল্লাহ তার বিনিময় দান করেননি এবং যা ত্যাগ করেছে তার চেয়ে উত্তম বিনিময় দেননি—এমনটা হওয়া অসম্ভব। যদি তুমি মনে করো যে, তুমি প্রতিদান পাওনি, তাহলে নিজেকেই অভিযুক্ত করো এবং গভীর মনোনিবেশ নিয়ে চিন্তা করে দেখো, আসল সমস্যা কোথায়। কেননা, আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন অধিক দানশীল এবং তাঁর উদারতা অনেক ব্যাপক ও সর্বজনবিদিত।

এ জন্য খাওয়াস বলেন, 'কেউ প্রবৃত্তির চাহিদা ছেড়ে দিল; কিন্তু অন্তরে তার প্রতিদান অনুভব করেনি, প্রবৃত্তির চাহিদা ত্যাগ করার দাবিতে সে মিথ্যুক।'

কথাটিকে আরও স্পষ্ট করে ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ও অভ্যাস পরিত্যাগ করলে মনের ভেতর কষ্ট অনুভব হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর জন্য তা পরিত্যাগ করে, সে প্রথম ধাক্কায় একটু কষ্ট অনুভব করলেও পরে আর অনুভব করে না। বস্তুত এর মাধ্যমে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করার ক্ষেত্রে কে কতটা আন্তরিক তার পরীক্ষা করা হয়। এই সাময়িক কষ্টের ওপর যদি কেউ সবর করে, কিছুদিন যেতে না যেতেই এই কষ্টকেই তার কাছে সুখ মনে হয়。

টিকাঃ
৩১১. জাম্মুল হাওয়া: পৃ. ২৪৫।
৩১২. আল-মুজামল আওসাত: ২২৭০।
৩১৩. সহিহু মুসলিম: ২৫৮৮।
৩১৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৬৫।
৩১৫. সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৭৭।
৩১৬. আল-মুজামুল আওসাত: ৮৩০৭।
৩১৭. সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮১।
৩১৮. মুসনাদু আহমাদ: ২০৭৩৯, হাদিসটি সহিহ। ৩৩ নং ফায়দা: যেকোনো ভালো কাজের প্রভাব তোমার পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পড়বে। কেননা, আল্লাহর জন্য কোনোকিছু ত্যাগ করার বরকত পরবর্তী প্রজন্ম ভোগ করে। বর্ণিত আছে যে, খলিফা মুতাওয়াক্কিল একবার মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক বিন আবু শাওয়ারিব, আহমাদ বিন মিদাল, ইবরাহিম তাইমি এ-কে বসরা থেকে ডেকে এনে সেখানকার কাজি হওয়ার প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক বয়স বেশি হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। আহমাদ বিন মিদালও দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার কথা বলে অপারগতা প্রকাশ করলেন। ইবরাহিম তাইমিও প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন; কিন্তু মুতাওয়াক্কিল তাকে বললেন, 'আপনি ছাড়া এখন আর কেউ বাকি নেই।' তাই একপ্রকার জোর করেই তাকে কাজি নিযুক্ত করলেন। ফলে আলিমদের কাছে ইবরাহিম তাইমির মর্যাদা হ্রাস পেল এবং বাকি দুজনের মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। আবুল আলা বলেন, 'এরপর মানুষ দেখতে পেয়েছে, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার বরকত তার সন্তানদের মধ্যে কীভাবে উপচে পড়েছে। তার সন্তানদের মধ্য থেকে একে একে ২৪ জন কাজি হয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে আট জন প্রধান কাজি হয়েছেন।' (তারিখু বাগদাদ: ৬/১৯৭)
৩১৯. আল-ফাওয়ায়িদ: পৃ. ১০৭।
৩২০. আজ-জুহদুল কাবির: ১/৩৩৭।
৩২১. কায়িদাহ ফিস সবর: পৃ. ৯৯।
৩২২. আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা: পৃ. ২৮৭। ৩৫ নং ফায়দা : ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'বান্দা হারামে জড়িয়ে পড়ার পেছনে মোটাদাগে দুটি কারণ আছে। প্রথম কারণ: আল্লাহর ব্যাপারে সে বিরূপ ধারণা পোষণ করে যে, সে যদি আল্লাহর আনুগত্য করে এবং হারাম ত্যাগ করাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে হালাল ও উত্তম বিনিময় দান করবেন না। দ্বিতীয় কারণ: সে বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে উত্তম বিনিময়ে দেবেন; কিন্তু তার চাহিদা সবরের ওপর এবং প্রবৃত্তি বিবেকের ওপর বিজয়ী হয়ে যায়। প্রথম কারণটি জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এবং দ্বিতীয় কারণটি বিবেক-বুদ্ধি ও অন্তর্দৃষ্টি দুর্বল হওয়ার কারণে হয়ে থাকে।
৩২৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ১/১০৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00