📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 খুশির ওপর খুশি

📄 খুশির ওপর খুশি


আলি মাহির পাশা ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ‘আল-মুরশিদুল আম’ তথা প্রধান মুরব্বিকে আলেকজান্দ্রিয়ায় তার ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলেন। নির্ধারিত দিনে শাইখ আলেকজান্দ্রিয়ায় উপস্থিত হলেন। তবে সরাসরি বিয়ের অনুষ্ঠানে না গিয়ে প্রথমে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সদস্যদের নিকট অবস্থান করলেন। অতঃপর একজন ভাইকে বিয়ের অনুষ্ঠানে পাঠালেন এবং বললেন, 'যদি দেখো, সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো কিছু হচ্ছে না, তাহলে আমাকে ফোন করবে, আমি সেখানে যাব। আর যদি কোনো সমস্যা দেখতে পাও, তাহলে আমার হয়ে তুমি দায়িত্ব পালন করবে।'

এরপর শাইখ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন; কিন্তু ভাইটির পক্ষ থেকে কোনো ফোন এলো না। তখন শাইখ উপস্থিত ভাইদের বললেন, 'আজকে আমাদের ইখওয়ানের কোনো ভাইয়ের বাড়িতে কোনো আয়োজন আছে?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ, অমুকের বিয়ে আছে আজ।'

অতঃপর সবাই তার বিয়েতে উপস্থিত হলো। এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মুরশিদে আমের আগমনে বিয়েবাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল。

টিকাঃ
২৭০. মিশরের ২৩ তম প্রধানমন্ত্রী।
২৭১. ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সর্বোচ্চ পদ।
২৭২. মিআতু মাওকিফিন মিন মাওয়াকিফিল মুরশিদিন লি জামাআতিল ইখওয়ানিল মুসলিমিন।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 সন্তানসন্ততি সৎ ও ভালো হওয়া

📄 সন্তানসন্ততি সৎ ও ভালো হওয়া


তুমি সৎ ও ভালো হলে তার উপকারিতা তোমার সন্তানসন্ততিও লাভ করবে— বর্তমানেও, ভবিষ্যতেও। বর্তমান উপকারিতা হচ্ছে, দুনিয়াতে তারা বিপদমুক্ত থাকবে এবং তাদের দ্বীনি অবস্থা ভালো হবে, যার ফলে তারা জান্নাত পাওয়ার উপযুক্ত হবে। ভবিষ্যৎ উপকারিতা হচ্ছে, তুমি তাদের নিয়ে জান্নাতের একই আসনে একত্রিত হয়ে একটি জান্নাতি পরিবার গঠন করবে।

উমর বিন আব্দুল আজিজ খুব দৃঢ়তার সহিত বলতেন, 'একজন মুমিনের মৃত্যুর পর তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আল্লাহ তাআলা হিফাজত করেন।'

সৎ ও নেককার ব্যক্তির অনেক দূরের উত্তরাধিকারীদেরও আল্লাহ তাআলা বিশেষ নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখেন। সুরা কাহফের ৮২ নং আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ তা-ই বলেছেন:
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
'আর তাদের দুজনের পিতা ছিলেন নেককার।'

জাফর বিন মুহাম্মাদ বলেন, 'আয়াতে যে পিতার কথা বলা হয়েছে, সে পিতা এবং দুই সন্তানের মাঝে আরও সাতজন পিতা ছিল।'

সেই অষ্টম পিতৃপুরুষের সততা ও নেক আমলের কারণে আল্লাহ তাআলা এ দুই এতিম বালকের সম্পদ তাদের বড় হওয়া পর্যন্ত হিফাজত করার দায়িত্ব নিয়েছেন।

ইবনে আব্বাস বলেন, 'এ দুই বালকের সম্পদ হিফাজত করা হয়েছে তাদের পিতার সততা ও নেক আমলের কারণে। তাদের সততার কারণে নয়। '

আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, পিতামাতা সৎ ও নেককার হওয়ার কারণে সন্তানদের উপকার হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এক ব্যক্তিকে তাদের জন্য দেয়াল নির্মাণ করার জন্য নিযুক্ত করে দিলেন। এভাবে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। সর্বশেষ যখন দেয়ালটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো, তখন দেয়ালকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে বালকদ্বয়ের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার মতলবে থাকা দুষ্ট লোকদের থেকে তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখলেন।

এ জন্যই জগদ্বিখ্যাত আলিম সাইদ বিন জুবাইর সন্তানের উপকার হওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতেন। হিশাম বিন হাসসান থেকে বর্ণিত আছে, সাইদ বিন জুবাইর বলেন, 'আমি অধিকহারে নামাজ পড়ি আমার এই ছেলেটির জন্য।' হিশাম এ কথার ব্যাখ্যা করে বলেন, 'অর্থাৎ তার নামাজের বরকতে আল্লাহ তাআলা তার সন্তানকে হিফাজত করবেন, এ আশায় তিনি অধিক নামাজ পড়তেন। '

প্রিয় ভাই আমার, সন্তানের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যাংকে তাদের জন্য সম্পদ জমা করে রাখার মধ্যে নয়; বরং দীর্ঘ নামাজ, সিজদায় ঝরানো চোখের পানি, গোপন সদাকা, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার পূরণ এবং কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি ইবাদতের মাধ্যমে তাদের জন্য পুণ্য জমা করে রাখার মধ্যেই তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিহিত আছে।

এর বিপরীতে আল্লাহর ইবাদতে যদি তুমি কমতি করো এবং তাঁর বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করো, তাহলে তোমার পাশাপাশি তোমার সন্তানসন্ততিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবার তুমি নিজের জীবনের হিসাব কষতে বসো। দেখো, তোমার কী কী পাপের কারণে তোমার সন্তানদের ক্ষতি হয়েছে। যাতে সত্য দিলে আল্লাহর নিকট তাওবা করতে পারো। হাসান বসরি কী বলেছেন, তা একটু পড়ে দেখো। তিনি বলেছেন, 'যদি তুমি তোমার সন্তানের মধ্যে অপছন্দনীয় কোনো বিষয় দেখতে পাও, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তাওবা করো। কেননা, হতে পারে, তোমার কারণেই তোমার সন্তানের মধ্যে সেটি এসেছে।'

এ কথা বলে তিনি আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার একটি ইশারার ব্যাপারে অবহিত করেছেন। অনেক সময় আল্লাহ তাআলা সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের ইশারা করেন। তাদের মধ্যে প্রকাশ করে দেন তোমারই কোনো গোপন কর্মের প্রভাব। যাতে তুমি আল্লাহর ইবাদতের দিকে ফিরে আসো এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে আগ্রহী হও। ফলে তোমার সে নেক আমলের প্রভাব তোমার সন্তানদের ওপর পড়বে। ফলে তাদের দুনিয়াবি ও দ্বীনি জীবন সুন্দর ও পরিশুদ্ধ হবে। মৃত্যুর পরেও তাদের নেক আমলের সাওয়াব তুমি পেতে থাকবে অনন্তকাল ধরে।

একইসাথে এটি প্রত্যেক ইসতিগফার ও তাওবার সময় একটি নতুন নিয়তের প্রতি পথনির্দেশ করে। তা হচ্ছে সন্তানসন্ততি সৎ ও নেককার হওয়ার নিয়ত করা। ফলে তোমার বয়স দ্বিগুণ হয়ে যাবে এবং তুমি দুটি জীবন লাভ করবে। একটি নিজের জীবন, আরেকটি সন্তানের সততার মাঝে বেঁচে থাকার জীবন। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এই নিয়তটি অধিকাংশ ইসতিগফারকারী করে না। চরম ভাগ্যবান লোক ছাড়া এ নিয়ত করার সৌভাগ্য তেমন কারও হয় না।

ইবাদত যত বেশি হয়, তার উপকারিতা তত ব্যাপক হয়। এভাবে একসময় উপকারিতার এই পরিধি সন্তানদের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশীদেরও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

এর চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়েছেন মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির। তাই তিনি বলেছেন:
'আল্লাহ তাআলা মুমিনের সন্তান, সন্তানদের সন্তানদের হিফাজত করেন। তার বাড়ি এবং আশপাশের বাড়িঘর সুরক্ষিত রাখেন। ফলে তারা যতক্ষণ প্রকৃত মুমিনদের মাঝে বসবাস করে, ততক্ষণ তারা সুস্থতা ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করে। '

যেহেতু তারা আল্লাহর বিশেষ হিফাজত ও তত্ত্বাবধানে থাকে, তাই তাদের অন্তর অন্যদের মতো চিন্তা-পেরেশানি ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকে। এসব নিশ্চিন্ত-মনের অধিকারীদের মধ্যে মুহাম্মাদ বিন কাব কুরাজি ছিলেন অন্যতম। মদিনায় তার অঢেল সম্পদ ছিল। একদিন তিনি নতুন করে আরও কিছু সম্পদের মালিক হলেন। তখন তাকে বলা হলো, 'সন্তানদের জন্য কিছু গচ্ছিত রাখুন।' উত্তরে তিনি বললেন, 'না, এগুলো (কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে) আমি আমার জন্য রবের কাছে গচ্ছিত রাখব। আর আমার সন্তানদের জন্য আমার রবকেই গচ্ছিত রেখে যাব। '

বাস্তবেই তাদের সন্তানদের আল্লাহ হিফাজত করেন। তাদের জীবদ্দশাতেও, মৃত্যুর পরেও। পিতার নেক আমলের কারণে সন্তান উপকৃত হওয়ার এমনই একটি ঘটনা আবু হামিদ গাজালি উল্লেখ করেছেন:
বর্ণিত আছে যে, ইমাম শাফিয়ি মিসরে জীবনের শেষ রোগে যখন আক্রান্ত হলেন, তখন সন্তানদের বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর অমুককে আমায় গোসল করাতে বোলো।' মৃত্যুর পর খবর পেয়ে লোকটি আসলেন। এসেই বললেন, 'আমার কাছে ইমামের ডায়েরিটা আনো।' ডায়েরিতে দেখলেন, ইমাম শাফিয়ির ওপর সত্তর হাজার দিরহাম কর্জ আছে। লোকটি সে কর্জ পরিশোধের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন এবং তা আদায় করে দিলেন। অতঃপর বললেন, ‘এটাই তাঁকে আমার গোসাল করানো (অর্থাৎ তিনি গোসল করানো বলতে কর্জ পরিশোধ করার কথাই বলেছিলেন)।’

আবু সাইদ আল-ওয়াইজ বলেন, ‘যখন আমি মিসর গেলাম, তখন সেই লোকটির (যিনি ইমাম শাফিয়ির কর্জ পরিশোধ করে দিয়েছিলেন) বাড়ির খোঁজ করলাম। লোকজন আমাকে লোকটির বাড়ি দেখিয়ে দিল। সেখানে গিয়ে আমি তার উত্তরপুরুষদের একটি দল দেখতে পেলাম। তাদের সবার মধ্যে নেককার ও ভালো মানুষ হওয়ার আলামত স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তখন আমি মনে মনে বললাম, ‘ওই লোকটির বরকতে এদের মাঝে সততা ও উত্তমতার গুণ এসেছে।’ আমার এমন ধারণার পেছনে শক্ত যুক্তি আছে। হ্যাঁ, সুরা কাহফের এই আয়াতটিই তার প্রমাণ:
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
‘আর তাদের দুজনের পিতা ছিলেন নেককার।’

টিকাঃ
২৭৩. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ১/৪৬৭।
২৭৪. সুরা আল-কাহফ, ১৮: ৮২।
২৭৫. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ৩/২৫১।
২৭৬. জাদুল মাসির ইলা ইলমিত তাফসির : ৩/১০৪।
২৭৭. জাদুল মাসির ইলা ইলমিত তাফসির : ৩/১০৪।
২৭৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৪/২৭৯।
২৭৯. আল-হাসান আল-বসরি, ইবনুল জাওজি: পৃ. ৫৯।
২৮০. সিফাতুস সাফওয়াহ : ১/৩৭৯।
২৮১. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/৬৮।
২৮২. এখানে ইমাম শাফিয়ির নেক আমলের বিনিময়ে সন্তানদের এ উপকার হয়েছে যে, তিনি পৃথিবীতে এমন ভক্ত রেখে গিয়েছেন, যিনি অকুণ্ঠচিত্তে তার কর্জ পরিশোধ করে দিয়েছেন। অন্যথায় এ কর্জ তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকেই পরিশোধ করতে হতো, বিধায় সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পদের পরিমাণ কম হতো। (-অনুবাদক)
২৮৩. সুরা আল-কাহফ, ১৮: ৮২।
২৮৪. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/২৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00