📄 রক্ষা পাওয়ার মূল রহস্য
তবে যেকোনো ধরনের নেককার লোকের উপস্থিতি আজাব প্রতিহত করতে পারে না। বরং সমাজ-সংশোধনে সচেষ্ট নেককার লোকের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। শুধু নিজে নেক আমল করে, সমাজের অন্যান্য লোকের সংশোধনের কোনো প্রচেষ্টা চালায় না এমন নেককার লোক আল্লাহর আজাব অপসারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ইসলাহ তথা সংশোধন করাকেই আল্লাহ তাআলা ধ্বংস ও মুক্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণকারী আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ করেছেন :
وَمَا كَانَ رَبُكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ
'আর তোমার পালনকর্তা এমন নন যে, জনবসতিগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবেন, সেখানকার লোকেরা সংশোধনকারী হওয়া সত্ত্বেও।
আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যদি জনপদের লোকেরা সংশোধনকারী হয়, তাহলে তাদের ওপর আজাব আসবে না। অন্যথায় তাদের ওপর আজাব আসবে। সংশোধন করার অর্থ হচ্ছে, ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। এ জন্যই উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেছেন:
'আল্লাহ তাআলা কয়েকজনের পাপের কারণে সবাইকে আজাব দেন না; কিন্তু পাপাচার যদি প্রকাশ্যে করা হয়, তাহলে সবাই শাস্তির উপযোগী হয়ে যায়।'
তাঁর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো নির্দিষ্ট কয়েকজনের অপরাধের কারণে ব্যাপকভাবে সবার ওপর আজাব প্রেরণ করেন। কাজেই আমরা যদি ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকি, তাহলে আমরাও আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত হব। তবে ভালো কাজের নির্দেশ এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করা সত্ত্বেও যদি অপরাধীরা তাদের অপরাধ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে সংশোধনকারী লোকদের সেই জনপদ থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যাওয়া উচিত। কারণ, পাপাচার ও অশ্লীলতার বাতাসে মুমিনের আত্মাও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই অসুস্থতা থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য হয়তো পাপাচার প্রতিহত করতে হবে, নয়তো নিজেকে সেখান থেকে সরে যেতে হবে।
যে ব্যক্তি এমন করবে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর দৃষ্টিতে সেই প্রকৃত আলিম। তাঁর মতে, যে ভালো কাজের আদেশ দেয় না এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করে না, সে আলিম নয়। তিনি বলেন:
'তোমাদের ওপর এমন একটি সময় আসবে, যখন পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ইলম কমে যাবে। যখন আলিমগণের বিদায় হবে, তখন সকল মানুষ বরাবর হয়ে যাবে। তারা ভালো কাজের আদেশ দেবে না এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে না। সে সময় তাদের ধ্বংস ত্বরান্বিত হবে。
টিকাঃ
২৪৮. সুরা হুদ, ১১: ১১৭।
২৪৯. মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ২/১৭১।
২৫০. ফাতহুল বারি: ১৩/২১।
📄 ইসলামের ছায়াতলে আসার অদ্ভুত কাহিনি
আল্লাহর একটি নীতি হচ্ছে, কয়েকজনের পাপের কারণে পুরো জাতি ধ্বংস ও শাস্তিপ্রাপ্ত হয়—এই নীতির কারণেই ইকরিমা বিন আবু জাহেল ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছেন! অদ্ভুত এই কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তাবারি:
ইকরিমা বর্ণনা করেন, তিনি ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে যাওয়ার পথে একটি ঘটনা তাকে ইসলামের দিকে নিয়ে এসেছে। সেটি হচ্ছে, আমি সমুদ্রপথে ইথিওপিয়া চলে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। নৌকায় উঠতে যাব এমন সময় নৌকার মাঝি বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে অস্বীকার করার পূর্বে আমার নৌকায় আরোহণ করো না। কারণ আমার ভয় হচ্ছে, তুমি এমনটি না করলে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব।' আমি বললাম, 'এতে কি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকারকারী ব্যতীত অন্য কেউ আরোহণ করে না?' মাঝি বলল, 'হ্যাঁ, এখানে কেবল একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসীরাই আরোহণ করে।' তখন আমি মনে মনে বললাম, 'তাহলে আমি মুহাম্মাদ থেকে পালিয়ে যাচ্ছি কীসের কারণে? তিনি এই একত্ববাদের দাওয়াত নিয়েই তো আমাদের কাছে এসেছেন। ওয়াল্লাহি, যিনি সমুদ্রে আমাদের মাবুদ, স্থলভাগেও তিনিই আমাদের মাবুদ। তখন ইসলামকে আমি চিনতে পারি এবং তা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নেয়।'
দেখো, নৌকাওয়ালা মাত্র একজন অবিশ্বাসীকে তার নৌকায় তুলতে অস্বীকার করল, সে একজনের কারণে সবাই ডুবে যাওয়ার ভয়ে। কারণ, 'অল্পের পাপের শাস্তি অধিকেও ভোগে'-নীতিটি সম্পর্কে তার ভালোই ধারণা ছিল।
টিকাঃ
২৫১. তারিখুত তাবারি: ৩/৫৯-৬০।
📄 তারা হয়তো পাপ সরিয়ে দেয় অথবা পাপ থেকে নিজেরা সরে পড়ে
সংশোধনকারী পুণ্যবান লোকদের একটি গুণ হচ্ছে, )لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ( তারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না।'
হাফিজ ইবনে কাসির বলেন, আয়াতের পরবর্তী অংশ থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, এখানে যোগদান না করা মানে উপস্থিত না হওয়া। এ জন্যই এর পরপরই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : )وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا( 'এবং তারা যখন অসার কাজকর্মের পাশ দিয়ে যায়, তখন সসম্মানে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।' অর্থাৎ তারা মিথ্যা কাজে উপস্থিত হয় না। ঘটনাক্রমে যদি কখনো এমন কাজকর্মের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে হয়, তখন পাশ কাটিয়ে চলে আসে এবং কোনোভাবেই ওই কর্মের সাথে সংযুক্ত হয় না。
আয়াতে 'মিথ্যা কাজ' বলে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, এ ব্যাপারে কয়েকটি মতামত রয়েছে। প্রতিটি মতামতের সারমর্ম একটাই : প্রতিটি পাপকাজ মিথ্যা কাজের অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।
* জাহহাক ও ইবনে জাইদের অভিমত হচ্ছে, মিথ্যা কাজ বলতে শিরক বোঝানো হয়েছে。
* ইবনে জুরাইজের মতে, মিথ্যা কাজ মানে মিথ্যাবাদিতা。
* কাতাদার অভিমত, মিথ্যা কাজ বলতে সব ধরনের বাতিল মজলিশ বোঝানো হয়েছে。
* ইবনুল হানাফিয়্যা এর বর্ণনামতে, বেহুদা ও অসার কাজকর্ম।
• মুজাহিদের অভিমত হচ্ছে, মিথ্যা কাজ মানে মুশরিকদের উৎসবসমূহ。
মিথ্যা কাজে যোগদান না করা মানে এমন সব স্থান ও বিষয় থেকে দূরে থাকা, যেখানে কোনো মুসলিম গেলে পাপকর্মে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে; যদিও তাতে সে পতিত না হোক। এমন কয়েকটি বিষয়ের প্রতি রাসুল ইশারা করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, সুদ খাওয়া। সুদি লেনদেনের লেখক ও সাক্ষীদের প্রতিও রাসুল অভিসম্পাত করেছেন; অথচ তারা সরাসরি সুদ খাওয়ার সাথে জড়িত নয়। হাদিসের মধ্যে আছে :
لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ
'রাসুল সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন।'
আরেকটি হচ্ছে, মদপানের আসর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে রাসুল ইরশাদ করেছেন :
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ইমান রাখে, সে যেন এমন কোনো খাবার আয়োজনে অংশগ্রহণ না করে, যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়।'
এ জন্য নেককার লোকেরা সব সময় পাপাচার সংঘটিত হওয়ার জায়গাসমূহ থেকে দূরে থাকেন, পাপিষ্ঠদের ওপর আপতিত আজাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে অথবা ইমানের ক্ষতি হওয়ার ভয়ে। উজির আওনুদ্দিন আবু মুজাফফর ইয়াহইয়া বিন হুবাইরা বলেন :
আমার এবং গ্রামের একজন শাইখের মাঝে একটি লেনদেন ছিল। সেটি নিষ্পত্তি করার জন্য একদিন আমি দাওর (উজিরের শহর) থেকে তার গ্রামে গেলাম। কিন্তু তাকে না পেয়ে তার অপেক্ষায় সেখানে অবস্থান করলাম। অপেক্ষা করতে করতে রাত নেমে আসলো। আমি ঘুমানোর জন্য তার ঘরের ছাদে উঠলাম। তখন শুনতে পেলাম, কিছু মানুষ আবোল-তাবোল কথা বলছে। তাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে আমাকে বলা হলো যে, তারা দিনের বেলা আঙুর থেকে মদ নিঙড়ায় আর রাত হলে (মদপান করে) আবোল-তাবোল কথা বলে। তখন আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, এখানে আমি রাত্রি যাপন করব না।' বলা হলো, 'কেন?' আমি বললাম, 'আমার ভয় হচ্ছে, তাদের প্রতি আল্লাহর আজাব বা ক্রোধ নাজিল হবে, তখন আমিও তাদের সাথে আজাবের ভাগী হয়ে যাব। যদি আজাব নাও আসে, তখন প্রকাশ্য ধ্বংস থেকে রক্ষা পেলেও, আত্মিকভাবে আমি ধ্বংসের শিকার হব। অর্থাৎ তাদের কথা শুনতে শুনতে আমার কলবের মধ্যে কঠোরতা এবং আল্লাহর জিকিরের প্রতি উদাসীনতা চলে আসবে।' এ কথা বলার পরপরই আমি দাওরে ফিরে আসলাম。
দেখো, পাপিষ্ঠদের আশপাশে থাকার ব্যাপারে উজিরের কেমন ভয়! নিজের কলবকে পাপিষ্ঠ-সংশ্রবের কালিমা থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁর কেমন চেষ্টা! আল্লাহ তাআলা তাঁর এমন সতর্কতা ও চেষ্টার মূল্য দিয়েছেন। সেদিনের পর খলিফা মুকতাফি সেই গ্রামের পুরো কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন!
টিকাঃ
২৫২. সকল পাপাচার মিথ্যা কাজের অন্তর্ভুক্ত।
২৫৩. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২।
২৫৪. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২।
২৫৫. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৬/১১৮।
২৫৬. তাফসিরুল বাহরিল মুহিত: ৮/১৩২।
২৫৭. সহিহু মুসলিম: ১৫৯৮, সুনানুত তিরমিজি: ১২০৬।
২৫৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৮০১, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি: ৬৭০৮।
২৫৯. জাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাহ: ২/১৩৬-১৩৭।
📄 পাপাচার বর্জনকারী পাপাচার থেকে সরে পড়া ব্যক্তির চেয়ে উত্তম
তবে যে ব্যক্তি পাপাচার বিলুপ্ত করে, সে পাপাচার থেকে নীরবে সরে পড়া ব্যক্তির চেয়ে উঁচু স্তরের। এ জন্যই ইমাম বান্না নম্রতামিশ্রিত ইখলাস এবং ভালোবাসাপূর্ণ বিচক্ষণতার মাধ্যমে পাপাচার বিলুপ্ত করার চেষ্টা করতেন। তাঁর জীবনীর পাতা উল্টালে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধের ব্যাপারে তাঁর চমৎকার অবস্থান তোমার কাছে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। সে ধরনের একটি ঘটনার বিবরণ শোনো:
রমাদানের এক রাতে ইমাম বান্না ইসমাইলিয়ার শরয়ি কাজির বাড়িতে উপস্থিত হলেন। সে মজলিশে কেন্দ্রীয় কর্মকর্তা, সাধারণ কোর্টের বিচারপতি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক ও শিক্ষা-নিরীক্ষকসহ একদল সাহিত্যিক ও জ্ঞানীগুণী লোক উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আইনজীবী এবং গণ্যমান্য নেতৃস্থানীয় লোকজনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইমাম বান্না সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন:
'কাজি মহোদয় আমাদের জন্য চায়ের অর্ডার করলেন। অতঃপর আমাদের সামনে রুপার পাত্রে চা পরিবেশন করা হলো। আমাকে চা দিতে আসলে আমি চায়ের পাত্র না নিয়ে কেবল একটি কাচের পাত্র দিতে বললাম। তখন কাজি মহোদয় আমার দিকে মুচকি হেসে তাকালেন এবং বললেন, “মনে হয় তুমি চায়ের পাত্র রুপার বলেই চা পান করতে চাইছ না।” আমি বললাম, “জি, বিশেষ করে কাজির বাড়িতে বসে আমি রুপার পাত্র দিয়ে চা পান করি কীভাবে?” তখন তিনি বললেন, “এই মাসআলায় তো ইখতিলাফ আছে এবং এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা আছে। তাই এ বিষয়ে এতটা কঠোর হওয়া ঠিক হবে না।” আমি বললাম, “হে শ্রদ্ধেয়, রুপার পাত্র ব্যবহারের ব্যাপারে ইখতিলাফ আছে ঠিক, তবে তা থেকে খানা ও পান করা সম্পর্কে কোনো ইখতিলাফ নেই। কেননা, মুত্তাফাক আলাইহ হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। নবিজি ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تَشْرَبُوا فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَلَا تَأْكُلُوا فِي صِحَافِهِمَا
"তোমরা স্বর্ণ ও রুপার পাত্রে পান করো না এবং স্বর্ণ ও রুপার থালায় আহার করো না।”
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন :
الَّذِي يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ
“যে ব্যক্তি স্বর্ণ ও রুপার পাত্র থেকে পান করে, সে পেটের মধ্যে জাহান্নামের আগুন ভরে।”
আর যে বিষয়ে স্পষ্ট নস থাকে, সেখানে কিয়াস করার কোনো প্রয়োজন নেই। সুতরাং আপনি আমাদের সবাইকে কাচের পাত্রে পান করার নির্দেশ দিলে কতই না উত্তম হতো!'
উপস্থিত লোকদের কয়েকজন আমাদের আলোচনায় মনোযোগ দিলেন এবং বলতে চাইলেন যে, বিষয়টি যেহেতু মতবিরোধপূর্ণ, তাই সেটা অস্বীকার করার তেমন প্রয়োজন নেই। সাধারণ কোর্টের বিচারপতিও নিজের মত ব্যক্ত করতে চাইলেন এবং শরিয়া কোর্টের বিচারপতিকে লক্ষ্য করে বললেন, 'শ্রদ্ধেয় বিচারপতি, যখন আপনার সামনে নস আছে, তখন নসকে সম্মান করা উচিত। নসের হিকমত বা অভ্যন্তরীণ রহস্য স্পষ্ট না হলে তা বের করা এবং নস অনুযায়ী আমল পরিত্যাগ করা আমাদের ওপর আবশ্যক নয়। তাই নসে যা বলা হয়েছে, তা মেনে নেওয়াই আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়। হ্যাঁ, যদি নসের হিকমত সম্পর্কে আমরা পরে কিছু জানতে পারি, সেটা তখন বিবেচনা করা হবে। এখন সর্বাবস্থায় আমল করা আমাদের ওপর ওয়াজিব।'
তার এ মন্তব্যকে আমি সুযোগ হিসেবে নিলাম এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার আঙুলের দিকে ইশারা করে বললাম, 'আপনি এখন যে কথা বলেছেন, তা যদি ঠিক হয়, তাহলে আপনার হাতের স্বর্ণের আংটিটি খুলে ফেলুন। কারণ স্বর্ণের আংটি হারাম হওয়ার ব্যাপারেও নস আছে।' এ কথা শুনে তিনি হাসলেন এবং বললেন, 'উস্তাজ, আমি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করি, আর আমাদের শরয়ি বিচারপতি মহোদয় কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করেন। আমরা দুজনই নিজ নিজ বিধান মানতে বাধ্য। তাই আমাকে ছেড়ে দিন এবং শরিয়া বেঞ্চের বিচারপতি সাহেবকে ধরুন।'
আমি বললাম, 'বিধানটি সকল মুসলিমের জন্য এসেছে। যেহেতু আপনি একজন মুসলিম, তাই এ বিধানটি আপনার জন্যও প্রযোজ্য।'
তখন তিনি আংটিটি খুলে ফেললেন। সব মিলিয়ে মজলিশটি চরম উপভোগ্য ছিল। সেদিনের মজলিশের মাধ্যমে উপস্থিত সবাই একটি বার্তা লাভ করেছিলেন যে, ভালো কাজের আদেশ, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ এবং আল্লাহর বিধান সম্পর্কিত যেকোনো উপদেশ দানের ক্ষেত্রে এমন অবস্থান গ্রহণ করা উচিত।
টিকাঃ
২৬০. আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি : ৬৫৯৭।
২৬১. আল-মুজামুল আওসাত: ৩৩৩৩, আল-মুজামুল কাবির: ৩১৯।