📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আজাব অপসারণ

📄 আজাব অপসারণ


ভালো কাজের অন্যতম একটি উপকারিতা হচ্ছে, তা পুরো জাতি থেকে আজাবকে অপসারণ করে এবং জাতিকে নিজের হাতে নিজে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেককার লোক তাদের নেক আমলের মাধ্যমে পাপাচার ও অশ্লীলতার আধিক্যকে প্রতিহত না করতেন, তাহলে এতদিনে আমাদের ওপর অনেক আজাব আপতিত হতো।
وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ
'আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেত। '

নবিজি-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আমাদের মাঝে নেককার লোক থাকা সত্ত্বেও আমরা কি ধ্বংস হয়ে যাব?' তিনি বললেন, )نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الخَبَثُ ( 'হ্যাঁ, যদি পাপাচার খুব বেশি হয়ে যায়। '

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত করার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা নামাজি ব্যক্তির মাধ্যমে বেনামাজি ব্যক্তি থেকে প্রতিহত করেন, আল্লাহভীরু ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহভীরু নয় এমন ব্যক্তির বিপদ প্রতিহত করেন; যাতে নিজেদের পাপের কারণে সকল মানুষ ধ্বংস হয়ে না যায়。

হুদাইবিয়া চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের কারণে কুরাইশ কাফিরদের ওপর আল্লাহর আজাব আসার কথা ছিল; কিন্তু তাদের মধ্যে গোপনে ইমান আনা কয়েকজন মুমিন ছিলেন বলেই আল্লাহ তাআলা আজাব অপসারণ করে নেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দ্বারা কাফিরদের আজাব প্রতিহত করেছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
لَوْ تَزَيَّلُوا لَعَذَّبْنَا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
'যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। '

অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের মাঝে যেসব মুমিন নারী-पुरुष তাদের অজান্তে ইমান এনে বসবাস করছেন, যদি তারা আলাদা হয়ে তাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যেতেন, তাহলে বাকিদের গণহারে হত্যা করতাম অথবা তাদের ওপর দ্রুত ব্যাপকভাবে কোনো আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দিতাম।

এটাই উমর বিন খাত্তাব-এর কথার মর্ম, যা তিনি সকল তাবিয়ির উদ্দেশে- যারা রাসুল-কে দেখেননি এবং তাঁর কথা সরাসরি শোনেননি—বলেছিলেন :
'অচিরেই গ্রামসমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে; অথচ সেগুলো হবে উন্নত ও সমৃদ্ধ।' প্রশ্ন করা হলো, 'উন্নত ও সমৃদ্ধ হওয়ার পর তা ধ্বংস হবে কীভাবে?' উত্তরে বললেন, 'যখন ভালো মানুষের ওপর খারাপ মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। '

উমর ফারুক এই পাঠ গ্রহণ করেছিলেন তাঁরই প্রিয়তম বন্ধু ও আদর্শ মুহাম্মাদ-এর কাছ থেকে, যখন তিনি আল্লাহর একটি অতীত-যুগীয় নীতির বিবরণ দিয়েছিলেন সুদৃঢ়ভাবে :
مَا مِنْ قَوْمٍ يُعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي، ثُمَّ يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا، ثُمَّ لَا يُغَيِّرُوا، إِلَّا يُوشِكُ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ مِنْهُ بِعِقَابٍ
'যে জাতির মধ্যে পাপাচার হতে থাকে, কিন্তু তারা এগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বন্ধ করছে না, অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে চরম শাস্তি দেবেন।'

ভালো কাজের পরিমাণ বেশি হলে আজাব উঠিয়ে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, ভালো কাজের পরিমাণ যত হ্রাস পায়, আজাব তত নিকটবর্তী হয়।

অনেক সময় সৎকর্মশীলরা সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের প্রভাব বেশি হয়। এ জন্যই আওন বিন আব্দুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসউদ সৎকর্মশীলদের সাহসী যোদ্ধা মনে করেন, যারা সংখ্যায় অল্প হওয়া সত্ত্বেও পুরো উম্মাহর বিপদ দূর করার কাজে নিয়োজিত থাকেন। মন্তব্যটি তার ভাষাতেই তুলে ধরছি :
'মানুষের গাফিলতির সময়ে আল্লাহর জিকিরকারী ব্যক্তির উদাহরণ হচ্ছে, পরাজয়-নিকটবর্তী সৈন্যদলের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা সেই সাহসী সৈনিক, যে একাই পুরো বাহিনীকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে। উক্ত সৈনিক না থাকলে যেমন পুরো বাহিনী লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করত, তেমনই মানুষের গাফিলতির সময়ে আল্লাহর জিকিরকারী না থাকলে পুরো উম্মাহ ধ্বংস হয়ে যেত।'

এ জন্যই বিচক্ষণ লোকেরা নেককার মানুষের মৃত্যুকে পৃথিবীবাসীর জন্য বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ন্যায়নিষ্ঠ উজির রজা বিন হাইওয়া সেই বিচক্ষণ লোকদের অন্যতম। তিনি বলেন, 'আমাদের নিকট যখন ইবনে উমর-এর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমরা ইবনে মুহাইরিজ -এর মজলিশে উপবিষ্ট ছিলাম। মৃত্যুসংবাদ শোনার পর ইবনে মুহাইরিজ বললেন,
'আল্লাহর কসম, আমি ইবনে উমরের অস্তিত্বকে পৃথিবীবাসীর জন্য নিরাপত্তা মনে করতাম।'

কিছুকাল পর বাইতুল মাকদিসের মেহমান, আবিদকুল শিরোমণি ইবনে মুহাইরিজ মৃত্যুবরণ করেন। রজা বিন হাইওয়া তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে কী বলেছিলেন জানো!? তিনি বলেছিলেন,
'আল্লাহর কসম, আমি ইবনে মুহাইরিজের অস্তিত্বকে পৃথিবীবাসীর জন্য নিরাপত্তা মনে করতাম।'

হে পাপাচারী সম্প্রদায়, সৎকর্মশীল ও নেককার লোকদের শুকরিয়া আদায় করো। এটা তোমাদের ওপর ওয়াজিব। কারণ, তারা না থাকলে তোমাদের অস্তিত্ব নির্ঘাত হুমকির মুখে পড়ত। তাদের কারণেই আজ তোমরা নিরাপদ। যদি তারা মারা যায়, তাহলে তোমাদের ভাগ্য খারাপ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর আজাব তোমাদের পাকড়াও করে নেবে।

টিকাঃ
২৩৯. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৫১।
২৪০. সহিহুল বুখারি: ৩৩৪৬, সহিহু মুসলিম: ২৮৮০।
২৪১. তাফসিরুল ইমাম আরফাহ : ২/৭১১-৭১২।
২৪২. তাফসিরের ভাষ্য অনুযায়ী তারা মোট সাতজন ছিলেন। পুরুষ ছিলেন পাঁচজন ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ বিন মুগিরা, সালামা বিন হিশাম, আইয়াশ বিন আবু রাবিআহ, আবু জানদাল বিন সুহাইল, আবু বাসির কারশি। দুজন মহিলা ছিলেন: আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের স্ত্রী উম্মুল ফজল এবং উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত। (তাফসিরুত তাহরিরি ওয়াত তানবির: ২৬/১৯০)
২৪৩. সুরা আল-ফাতহ, ৪৮: ২৫।
২৪৪. আল-জাওয়াবুল কাফি: পৃ. ৫৩।
২৪৫. সুনানু আবি দাউদ : ৪৩৩৮, সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪০০৯। ২৭ নং ফায়দা : ইবনুল আরবি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: কিছু গুনাহ আছে যেগুলোর শাস্তি তাৎক্ষণিক হয়ে যায়। আর কিছু গুনাহের শান্তি আখিরাত পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। মন্দ কাজ দেখে চুপ থাকা সেই গুনাহসমূহের অন্তর্ভক্ত, যেগুলোর শান্তি তাৎক্ষণিক দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এ গুনাহের কারণে দুনিয়াতেই শাস্তিস্বরূপ ধন-সম্পদ ও জানের ক্ষতি হয় এবং মাখলুকের ওপর জালিমের তরফ থেকে লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়।'
২৪৬. তারিখু বাগদাদ: ১/১৮৪।
২৪৭. মুখতাসারু তারিখি দিমাশক: ১৪/৩৫।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 রক্ষা পাওয়ার মূল রহস্য

📄 রক্ষা পাওয়ার মূল রহস্য


তবে যেকোনো ধরনের নেককার লোকের উপস্থিতি আজাব প্রতিহত করতে পারে না। বরং সমাজ-সংশোধনে সচেষ্ট নেককার লোকের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। শুধু নিজে নেক আমল করে, সমাজের অন্যান্য লোকের সংশোধনের কোনো প্রচেষ্টা চালায় না এমন নেককার লোক আল্লাহর আজাব অপসারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ইসলাহ তথা সংশোধন করাকেই আল্লাহ তাআলা ধ্বংস ও মুক্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণকারী আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ করেছেন :
وَمَا كَانَ رَبُكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ
'আর তোমার পালনকর্তা এমন নন যে, জনবসতিগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবেন, সেখানকার লোকেরা সংশোধনকারী হওয়া সত্ত্বেও।

আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যদি জনপদের লোকেরা সংশোধনকারী হয়, তাহলে তাদের ওপর আজাব আসবে না। অন্যথায় তাদের ওপর আজাব আসবে। সংশোধন করার অর্থ হচ্ছে, ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। এ জন্যই উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেছেন:
'আল্লাহ তাআলা কয়েকজনের পাপের কারণে সবাইকে আজাব দেন না; কিন্তু পাপাচার যদি প্রকাশ্যে করা হয়, তাহলে সবাই শাস্তির উপযোগী হয়ে যায়।'

তাঁর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো নির্দিষ্ট কয়েকজনের অপরাধের কারণে ব্যাপকভাবে সবার ওপর আজাব প্রেরণ করেন। কাজেই আমরা যদি ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকি, তাহলে আমরাও আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত হব। তবে ভালো কাজের নির্দেশ এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করা সত্ত্বেও যদি অপরাধীরা তাদের অপরাধ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে সংশোধনকারী লোকদের সেই জনপদ থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যাওয়া উচিত। কারণ, পাপাচার ও অশ্লীলতার বাতাসে মুমিনের আত্মাও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই অসুস্থতা থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য হয়তো পাপাচার প্রতিহত করতে হবে, নয়তো নিজেকে সেখান থেকে সরে যেতে হবে।

যে ব্যক্তি এমন করবে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর দৃষ্টিতে সেই প্রকৃত আলিম। তাঁর মতে, যে ভালো কাজের আদেশ দেয় না এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করে না, সে আলিম নয়। তিনি বলেন:
'তোমাদের ওপর এমন একটি সময় আসবে, যখন পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ইলম কমে যাবে। যখন আলিমগণের বিদায় হবে, তখন সকল মানুষ বরাবর হয়ে যাবে। তারা ভালো কাজের আদেশ দেবে না এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে না। সে সময় তাদের ধ্বংস ত্বরান্বিত হবে。

টিকাঃ
২৪৮. সুরা হুদ, ১১: ১১৭।
২৪৯. মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ২/১৭১।
২৫০. ফাতহুল বারি: ১৩/২১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ইসলামের ছায়াতলে আসার অদ্ভুত কাহিনি

📄 ইসলামের ছায়াতলে আসার অদ্ভুত কাহিনি


আল্লাহর একটি নীতি হচ্ছে, কয়েকজনের পাপের কারণে পুরো জাতি ধ্বংস ও শাস্তিপ্রাপ্ত হয়—এই নীতির কারণেই ইকরিমা বিন আবু জাহেল ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছেন! অদ্ভুত এই কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন ইমাম তাবারি:
ইকরিমা বর্ণনা করেন, তিনি ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে যাওয়ার পথে একটি ঘটনা তাকে ইসলামের দিকে নিয়ে এসেছে। সেটি হচ্ছে, আমি সমুদ্রপথে ইথিওপিয়া চলে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। নৌকায় উঠতে যাব এমন সময় নৌকার মাঝি বলল, 'হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে অস্বীকার করার পূর্বে আমার নৌকায় আরোহণ করো না। কারণ আমার ভয় হচ্ছে, তুমি এমনটি না করলে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব।' আমি বললাম, 'এতে কি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল উপাস্যকে অস্বীকারকারী ব্যতীত অন্য কেউ আরোহণ করে না?' মাঝি বলল, 'হ্যাঁ, এখানে কেবল একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসীরাই আরোহণ করে।' তখন আমি মনে মনে বললাম, 'তাহলে আমি মুহাম্মাদ থেকে পালিয়ে যাচ্ছি কীসের কারণে? তিনি এই একত্ববাদের দাওয়াত নিয়েই তো আমাদের কাছে এসেছেন। ওয়াল্লাহি, যিনি সমুদ্রে আমাদের মাবুদ, স্থলভাগেও তিনিই আমাদের মাবুদ। তখন ইসলামকে আমি চিনতে পারি এবং তা আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নেয়।'

দেখো, নৌকাওয়ালা মাত্র একজন অবিশ্বাসীকে তার নৌকায় তুলতে অস্বীকার করল, সে একজনের কারণে সবাই ডুবে যাওয়ার ভয়ে। কারণ, 'অল্পের পাপের শাস্তি অধিকেও ভোগে'-নীতিটি সম্পর্কে তার ভালোই ধারণা ছিল।

টিকাঃ
২৫১. তারিখুত তাবারি: ৩/৫৯-৬০।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তারা হয়তো পাপ সরিয়ে দেয় অথবা পাপ থেকে নিজেরা সরে পড়ে

📄 তারা হয়তো পাপ সরিয়ে দেয় অথবা পাপ থেকে নিজেরা সরে পড়ে


সংশোধনকারী পুণ্যবান লোকদের একটি গুণ হচ্ছে, )لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ( তারা মিথ্যা কাজে যোগদান করে না।'

হাফিজ ইবনে কাসির বলেন, আয়াতের পরবর্তী অংশ থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, এখানে যোগদান না করা মানে উপস্থিত না হওয়া। এ জন্যই এর পরপরই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : )وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا( 'এবং তারা যখন অসার কাজকর্মের পাশ দিয়ে যায়, তখন সসম্মানে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।' অর্থাৎ তারা মিথ্যা কাজে উপস্থিত হয় না। ঘটনাক্রমে যদি কখনো এমন কাজকর্মের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতে হয়, তখন পাশ কাটিয়ে চলে আসে এবং কোনোভাবেই ওই কর্মের সাথে সংযুক্ত হয় না。

আয়াতে 'মিথ্যা কাজ' বলে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, এ ব্যাপারে কয়েকটি মতামত রয়েছে। প্রতিটি মতামতের সারমর্ম একটাই : প্রতিটি পাপকাজ মিথ্যা কাজের অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।
* জাহহাক ও ইবনে জাইদের অভিমত হচ্ছে, মিথ্যা কাজ বলতে শিরক বোঝানো হয়েছে。
* ইবনে জুরাইজের মতে, মিথ্যা কাজ মানে মিথ্যাবাদিতা。
* কাতাদার অভিমত, মিথ্যা কাজ বলতে সব ধরনের বাতিল মজলিশ বোঝানো হয়েছে。
* ইবনুল হানাফিয়্যা এর বর্ণনামতে, বেহুদা ও অসার কাজকর্ম।
• মুজাহিদের অভিমত হচ্ছে, মিথ্যা কাজ মানে মুশরিকদের উৎসবসমূহ。

মিথ্যা কাজে যোগদান না করা মানে এমন সব স্থান ও বিষয় থেকে দূরে থাকা, যেখানে কোনো মুসলিম গেলে পাপকর্মে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে; যদিও তাতে সে পতিত না হোক। এমন কয়েকটি বিষয়ের প্রতি রাসুল ইশারা করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, সুদ খাওয়া। সুদি লেনদেনের লেখক ও সাক্ষীদের প্রতিও রাসুল অভিসম্পাত করেছেন; অথচ তারা সরাসরি সুদ খাওয়ার সাথে জড়িত নয়। হাদিসের মধ্যে আছে :
لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُؤْكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ
'রাসুল সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন।'

আরেকটি হচ্ছে, মদপানের আসর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে রাসুল ইরশাদ করেছেন :
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ইমান রাখে, সে যেন এমন কোনো খাবার আয়োজনে অংশগ্রহণ না করে, যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়।'

এ জন্য নেককার লোকেরা সব সময় পাপাচার সংঘটিত হওয়ার জায়গাসমূহ থেকে দূরে থাকেন, পাপিষ্ঠদের ওপর আপতিত আজাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়ে অথবা ইমানের ক্ষতি হওয়ার ভয়ে। উজির আওনুদ্দিন আবু মুজাফফর ইয়াহইয়া বিন হুবাইরা বলেন :
আমার এবং গ্রামের একজন শাইখের মাঝে একটি লেনদেন ছিল। সেটি নিষ্পত্তি করার জন্য একদিন আমি দাওর (উজিরের শহর) থেকে তার গ্রামে গেলাম। কিন্তু তাকে না পেয়ে তার অপেক্ষায় সেখানে অবস্থান করলাম। অপেক্ষা করতে করতে রাত নেমে আসলো। আমি ঘুমানোর জন্য তার ঘরের ছাদে উঠলাম। তখন শুনতে পেলাম, কিছু মানুষ আবোল-তাবোল কথা বলছে। তাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে আমাকে বলা হলো যে, তারা দিনের বেলা আঙুর থেকে মদ নিঙড়ায় আর রাত হলে (মদপান করে) আবোল-তাবোল কথা বলে। তখন আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, এখানে আমি রাত্রি যাপন করব না।' বলা হলো, 'কেন?' আমি বললাম, 'আমার ভয় হচ্ছে, তাদের প্রতি আল্লাহর আজাব বা ক্রোধ নাজিল হবে, তখন আমিও তাদের সাথে আজাবের ভাগী হয়ে যাব। যদি আজাব নাও আসে, তখন প্রকাশ্য ধ্বংস থেকে রক্ষা পেলেও, আত্মিকভাবে আমি ধ্বংসের শিকার হব। অর্থাৎ তাদের কথা শুনতে শুনতে আমার কলবের মধ্যে কঠোরতা এবং আল্লাহর জিকিরের প্রতি উদাসীনতা চলে আসবে।' এ কথা বলার পরপরই আমি দাওরে ফিরে আসলাম。

দেখো, পাপিষ্ঠদের আশপাশে থাকার ব্যাপারে উজিরের কেমন ভয়! নিজের কলবকে পাপিষ্ঠ-সংশ্রবের কালিমা থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁর কেমন চেষ্টা! আল্লাহ তাআলা তাঁর এমন সতর্কতা ও চেষ্টার মূল্য দিয়েছেন। সেদিনের পর খলিফা মুকতাফি সেই গ্রামের পুরো কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন!

টিকাঃ
২৫২. সকল পাপাচার মিথ্যা কাজের অন্তর্ভুক্ত।
২৫৩. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২।
২৫৪. সুরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭২।
২৫৫. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৬/১১৮।
২৫৬. তাফসিরুল বাহরিল মুহিত: ৮/১৩২।
২৫৭. সহিহু মুসলিম: ১৫৯৮, সুনানুত তিরমিজি: ১২০৬।
২৫৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৮০১, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি: ৬৭০৮।
২৫৯. জাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাহ: ২/১৩৬-১৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00