📄 সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বোত্তম কর্ম
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি কে এবং সর্বোত্তম আমল কোনটি?'
উত্তরে রাসুল বললেন :
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعَهُمْ لِلنَّاسِ، وَأَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ سُرُورٍ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ، أَوْ تَكْشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دِينًا، أَوْ تُطْرَدُ عَنْهُ جُوعًا، وَلِأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِي فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ، يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ، شَهْرًا،
'ওই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম, যে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার করে। আর আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম কর্ম হচ্ছে, মুসলিমদের অন্তরে আনন্দের সঞ্চার করা অথবা তার কষ্ট দূর করা অথবা তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা তার ক্ষুধা নিবারণ করা। কোনো ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের জন্য পথচলা আমার কাছে এই মসজিদে (মসজিদে নববিতে) এক মাস ইতিকাফ থাকার চেয়ে প্রিয়। '
যদি তুমি বিচক্ষণ ও চালাক হয়ে থাকো এবং তোমার সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে আমল করার জন্য সর্বোত্তম আমলের খোঁজে থাকো, তাহলে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল করার শর্ত দিয়ে আমার নিকট থেকে এই হাদিয়াটি লুপে নাও :
'বান্দার কল্যাণের জন্য কাজ করা ইবাদত, বলতে গেলে এটাই সর্বোত্তম ইবাদত।'
মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য চেষ্টা ও সুপারিশ করা কল্যাণমূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল স্বীয় কাজের মাধ্যমে সাহাবিদের এ কাজ শিক্ষা দিয়েছেন। মুআবিয়া থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল বলেছেন:
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَسْأَلُنِي الشَّيْءَ فَأَمْنَعُهُ حَتَّى تَشْفَعُوا فِيهِ، فَتُؤْجَرُوا
'অনেক সময় কোনো মানুষ আমার থেকে কোনো কিছু চাইলে আমি প্রথমে দিতে অস্বীকার করি, যাতে তোমরা সুপারিশ করে সাওয়াবের ভাগিদার হতে পারো।'
সুপারিশ করা খ্যাতি ও প্রভাবের জাকাত। উজির হাসান বিন সাহল বলেছেন, 'আমার সম্পদের জাকাত দেওয়া আমার ওপর ফরজ। একইভাবে আমার প্রভাব-প্রতিপত্তিরও জাকাত আছে, সহযোগিতা ও সুপারিশ করার মাধ্যমে এ জাকাত আদায় করতে হয়।'
অনেক ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা দান করার চেয়ে সুপারিশ করা উত্তম হয়। এ সম্পর্কে মাওয়ারদি বলেন:
'প্রভাব-প্রতিপত্তির ত্রাণ দেওয়া অর্থাৎ সুপারিশ করা অনেক সময় উপকারিতার দিক দিয়ে সম্পদ দান করার চেয়ে কার্যকারী ও গুরুত্ববহ হয়। অনেক অসহায় লোক এর ছায়াতলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। সুতরাং কোনো প্রতিপত্তিওয়ালা ব্যক্তি যদি কোনো কারণ ছাড়াই সুপারিশ করতে অস্বীকার করে, সে টাকা-পয়সার কৃপণের চেয়ে বড় কৃপণ。
এ উপকারিতা ও কল্যাণমূলক কাজ শুধু দুনিয়াবি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দ্বীনি বিষয়ে মানুষের উপকার ও কল্যাণ করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কল্যাণমূলক কাজের মধ্যে অন্যকে ভালো কাজের পথনির্দেশ করা, হাত ধরে তাওবার পথে নিয়ে আসা, শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে পাপাচার ও অশ্লীলতার পথে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। কোনো পাপিষ্ঠ যখন নিজের মুক্তির পথকে চিরতরে বন্ধ মনে করে আশাহত হয়ে পড়ে, তার সামনে আশার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়াও দ্বীনি কল্যাণমূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। মুসাফি উপকার ও কল্যাণ সম্পর্কিত হাদিসের বিশ্লেষণ করার সময় দুনিয়াবি ও দ্বীনি কল্যাণের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা করে বলেছেন:
'দ্বীনি কল্যাণ মর্যাদা ও স্থায়িত্ব বিবেচনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
টিকাঃ
২২৭. আল-মুজামুল আওসাত: ৬০২৬, আল-মুজামুল কাবির: ১৩৬৪৬।
২২৮. মিজানুল আমল, আবু হামিদ গাজালি: পৃ. ৩৮৩।
২২৯. সুনানুন নাসায়ি: ২৫৫৭।
২৩০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন: ১/৩৩৩-৩৩৪।
২৫ নং ফায়দা: সুপারিশ-সম্পর্কিত হাদিস উল্লেখ করার পর ইমাম নববি বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কারও বৈধ প্রয়োজন পূরণ করার জন্য সুপারিশ করা মুসতাহাব। সব ধরনের সুপারিশ এর অন্তর্ভুক্ত। সেটা সুলতানের নিকট হোক বা গভর্নরের নিকট বা যে কারও নিকট। সে সুপারিশ জুলুম বন্ধ করার জন্য হোক, শাস্তি রহিত করার জন্য হোক বা কোনো অভাবগ্রস্তকে অনুদান দেওয়ার জন্য হোক বা অন্য যেকোনো কারণে হোক। (শারহুন নববি: ১৬/১৭৭)
২৩১. ফাইজুল কাদির: ৩/৪৮১।
📄 সদাকা মুক্তির প্রধান ফটক
যারা রোগ-বালাই থেকে আরোগ্য প্রত্যাশী কিংবা কোনো কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি পেতে চায়, তাদের প্রতি নবিজি উপদেশ দিয়ে বলেছেন:
دَاوُوا مَرْضَاكُمْ بِالصَّدَقَةِ
'তোমরা সদাকার মাধ্যমে তোমাদের অসুস্থদের চিকিৎসা করো।'
সূর্যগ্রহণের কারণে যখন মানুষজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল, তখন তিনি তাদের উপদেশ দিয়েছেন:
فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ، فَادْعُوا اللَّهَ، وَكَبِّرُوا وَصَلُّوا وَتَصَدَّقُوا
'যখন তোমরা তা (সূর্যগ্রহণ) হতে দেখবে, তখন আল্লাহর নিকট দুআ করবে, তাকবির বলবে, নামাজ পড়বে এবং সদাকা করবে।'
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে দাকিকুল ইদ বলেন, 'এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রত্যেক ভীতিকর অবস্থায় আশঙ্কাজনক বিপদ থেকে মুক্তিলাভের জন্য সদাকা করা মুসতাহাব। '
মুনাবি সত্যই বলেছেন :
'এটাকে (সদাকার মাধ্যমে চিকিৎসা) পরীক্ষা করার পর প্রমাণিত হয়েছে, রুহানি বা আধ্যাত্মিক চিকিৎসার দ্বারা এমন কাজ হয়, যা সাধারণ ইন্দ্রিয়প্রবণ চিকিৎসা দ্বারা হয় না। চোখের ওপর (বস্তুবাদের) গাঢ় চশমা পরিহিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউই এটা অস্বীকার করে না।'
অনেক সালাফ মনে করেন, সদাকা তার আদায়কারীর সকল বিপদাপদ দূর করে দেয়; যদিও সে জালিম হয়!
ইবরাহিম নাখয়ি বলেন, 'সালাফগণ মনে করতেন, সদাকা জালিম ব্যক্তিকেও বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে। '
উল্লিখিত প্রতিটি বাণীকে আমাদের প্রিয় নবি -এর একটি হাদিস অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। হাদিসটি হচ্ছে :
تَعَرَّفْ إِلَى اللَّهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ
'ভালো সময়ে আল্লাহকে চেনো, কঠিন সময়ে তিনি তোমাকে চিনবেন। '
তোমার আর্থিক অবস্থা দুর্বল বলে বা তোমার সম্পত্তি খুব বেশি নয় বলে তুমি সদাকার ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবে না। কারণ, সদাকার সাওয়াব অর্জনের জন্য মোটা অঙ্ক ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। নিজের স্বাভাবিক ব্যয়ের সময় উত্তম নিয়ত করে নিলেই সদাকার সাওয়াব পেয়ে যাবে তুমি। নিচের হাদিসগুলোই তার প্রমাণ:
• তোমার স্ত্রীকে যে খাবার খাওয়াও, তা তোমার জন্য সদাকা。
• তোমার সন্তানের মুখে যে খাবার তুলে দাও, তা তোমার জন্য সদাকা。
• তোমার খাদিমকে যে খাবার খাওয়াও, তা তোমার জন্য সদাকা。
• তুমি নিজে যে খাবার খাও, তাও তোমার জন্য সদাকা。
টিকাঃ
২৩২. আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি: ৬৫৯৩, আল-মুজামুল কাবির লিত তাবারানি: ১০১৯৬, শুআবুল ইমান: ৩২৭৮।
২৩৩. সহিহুল বুখারি: ১০৪৪।
২৩৪. আহকামুল ইহকাম: ১/৩৫৩।
২৩৫. ফাইজুল কাদির: ৩/৫১৫।
২৩৬. শুআবুল ইমান: ৩৫৫৯।
২৩৭. মুসনাদু আহমাদ: ২৮০৩, আল-মুজামুল কাবির: ১১৫৬০। ২৬ নং ফায়দা: ইবনে রজব বলেন, 'এর অর্থ হচ্ছে, যদি কোনো বান্দা তার সুস্থতা ও সচ্ছলতার সময়ে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর বিধিনিষেধ মেনে চলে, তাহলে এর মাধ্যমে সে আল্লাহর সাথে পরিচিত হয়। আল্লাহ ও তার মাঝে এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়; ফলে তার বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তাকে চিনেন এবং সচ্ছলতার সময়ে তার কৃত আমলের বিনিময়ে তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দান করেন।' (নুরুল ইবতিবাস: পৃ. ৪৩)
২৩৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৭১৭৯, আল-আদাবুল মুফরাদ: ৮২।
📄 আজাব অপসারণ
ভালো কাজের অন্যতম একটি উপকারিতা হচ্ছে, তা পুরো জাতি থেকে আজাবকে অপসারণ করে এবং জাতিকে নিজের হাতে নিজে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেককার লোক তাদের নেক আমলের মাধ্যমে পাপাচার ও অশ্লীলতার আধিক্যকে প্রতিহত না করতেন, তাহলে এতদিনে আমাদের ওপর অনেক আজাব আপতিত হতো।
وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ
'আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেত। '
নবিজি-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আমাদের মাঝে নেককার লোক থাকা সত্ত্বেও আমরা কি ধ্বংস হয়ে যাব?' তিনি বললেন, )نَعَمْ إِذَا كَثُرَ الخَبَثُ ( 'হ্যাঁ, যদি পাপাচার খুব বেশি হয়ে যায়। '
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত করার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা নামাজি ব্যক্তির মাধ্যমে বেনামাজি ব্যক্তি থেকে প্রতিহত করেন, আল্লাহভীরু ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহভীরু নয় এমন ব্যক্তির বিপদ প্রতিহত করেন; যাতে নিজেদের পাপের কারণে সকল মানুষ ধ্বংস হয়ে না যায়。
হুদাইবিয়া চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের কারণে কুরাইশ কাফিরদের ওপর আল্লাহর আজাব আসার কথা ছিল; কিন্তু তাদের মধ্যে গোপনে ইমান আনা কয়েকজন মুমিন ছিলেন বলেই আল্লাহ তাআলা আজাব অপসারণ করে নেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দ্বারা কাফিরদের আজাব প্রতিহত করেছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
لَوْ تَزَيَّلُوا لَعَذَّبْنَا الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
'যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফির, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। '
অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের মাঝে যেসব মুমিন নারী-पुरुष তাদের অজান্তে ইমান এনে বসবাস করছেন, যদি তারা আলাদা হয়ে তাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যেতেন, তাহলে বাকিদের গণহারে হত্যা করতাম অথবা তাদের ওপর দ্রুত ব্যাপকভাবে কোনো আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দিতাম।
এটাই উমর বিন খাত্তাব-এর কথার মর্ম, যা তিনি সকল তাবিয়ির উদ্দেশে- যারা রাসুল-কে দেখেননি এবং তাঁর কথা সরাসরি শোনেননি—বলেছিলেন :
'অচিরেই গ্রামসমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে; অথচ সেগুলো হবে উন্নত ও সমৃদ্ধ।' প্রশ্ন করা হলো, 'উন্নত ও সমৃদ্ধ হওয়ার পর তা ধ্বংস হবে কীভাবে?' উত্তরে বললেন, 'যখন ভালো মানুষের ওপর খারাপ মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। '
উমর ফারুক এই পাঠ গ্রহণ করেছিলেন তাঁরই প্রিয়তম বন্ধু ও আদর্শ মুহাম্মাদ-এর কাছ থেকে, যখন তিনি আল্লাহর একটি অতীত-যুগীয় নীতির বিবরণ দিয়েছিলেন সুদৃঢ়ভাবে :
مَا مِنْ قَوْمٍ يُعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي، ثُمَّ يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا، ثُمَّ لَا يُغَيِّرُوا، إِلَّا يُوشِكُ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ مِنْهُ بِعِقَابٍ
'যে জাতির মধ্যে পাপাচার হতে থাকে, কিন্তু তারা এগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বন্ধ করছে না, অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে চরম শাস্তি দেবেন।'
ভালো কাজের পরিমাণ বেশি হলে আজাব উঠিয়ে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, ভালো কাজের পরিমাণ যত হ্রাস পায়, আজাব তত নিকটবর্তী হয়।
অনেক সময় সৎকর্মশীলরা সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের প্রভাব বেশি হয়। এ জন্যই আওন বিন আব্দুল্লাহ বিন উতবা বিন মাসউদ সৎকর্মশীলদের সাহসী যোদ্ধা মনে করেন, যারা সংখ্যায় অল্প হওয়া সত্ত্বেও পুরো উম্মাহর বিপদ দূর করার কাজে নিয়োজিত থাকেন। মন্তব্যটি তার ভাষাতেই তুলে ধরছি :
'মানুষের গাফিলতির সময়ে আল্লাহর জিকিরকারী ব্যক্তির উদাহরণ হচ্ছে, পরাজয়-নিকটবর্তী সৈন্যদলের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা সেই সাহসী সৈনিক, যে একাই পুরো বাহিনীকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে। উক্ত সৈনিক না থাকলে যেমন পুরো বাহিনী লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করত, তেমনই মানুষের গাফিলতির সময়ে আল্লাহর জিকিরকারী না থাকলে পুরো উম্মাহ ধ্বংস হয়ে যেত।'
এ জন্যই বিচক্ষণ লোকেরা নেককার মানুষের মৃত্যুকে পৃথিবীবাসীর জন্য বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ন্যায়নিষ্ঠ উজির রজা বিন হাইওয়া সেই বিচক্ষণ লোকদের অন্যতম। তিনি বলেন, 'আমাদের নিকট যখন ইবনে উমর-এর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমরা ইবনে মুহাইরিজ -এর মজলিশে উপবিষ্ট ছিলাম। মৃত্যুসংবাদ শোনার পর ইবনে মুহাইরিজ বললেন,
'আল্লাহর কসম, আমি ইবনে উমরের অস্তিত্বকে পৃথিবীবাসীর জন্য নিরাপত্তা মনে করতাম।'
কিছুকাল পর বাইতুল মাকদিসের মেহমান, আবিদকুল শিরোমণি ইবনে মুহাইরিজ মৃত্যুবরণ করেন। রজা বিন হাইওয়া তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে কী বলেছিলেন জানো!? তিনি বলেছিলেন,
'আল্লাহর কসম, আমি ইবনে মুহাইরিজের অস্তিত্বকে পৃথিবীবাসীর জন্য নিরাপত্তা মনে করতাম।'
হে পাপাচারী সম্প্রদায়, সৎকর্মশীল ও নেককার লোকদের শুকরিয়া আদায় করো। এটা তোমাদের ওপর ওয়াজিব। কারণ, তারা না থাকলে তোমাদের অস্তিত্ব নির্ঘাত হুমকির মুখে পড়ত। তাদের কারণেই আজ তোমরা নিরাপদ। যদি তারা মারা যায়, তাহলে তোমাদের ভাগ্য খারাপ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর আজাব তোমাদের পাকড়াও করে নেবে।
টিকাঃ
২৩৯. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৫১।
২৪০. সহিহুল বুখারি: ৩৩৪৬, সহিহু মুসলিম: ২৮৮০।
২৪১. তাফসিরুল ইমাম আরফাহ : ২/৭১১-৭১২।
২৪২. তাফসিরের ভাষ্য অনুযায়ী তারা মোট সাতজন ছিলেন। পুরুষ ছিলেন পাঁচজন ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ বিন মুগিরা, সালামা বিন হিশাম, আইয়াশ বিন আবু রাবিআহ, আবু জানদাল বিন সুহাইল, আবু বাসির কারশি। দুজন মহিলা ছিলেন: আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের স্ত্রী উম্মুল ফজল এবং উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা বিন আবু মুআইত। (তাফসিরুত তাহরিরি ওয়াত তানবির: ২৬/১৯০)
২৪৩. সুরা আল-ফাতহ, ৪৮: ২৫।
২৪৪. আল-জাওয়াবুল কাফি: পৃ. ৫৩।
২৪৫. সুনানু আবি দাউদ : ৪৩৩৮, সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪০০৯। ২৭ নং ফায়দা : ইবনুল আরবি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: কিছু গুনাহ আছে যেগুলোর শাস্তি তাৎক্ষণিক হয়ে যায়। আর কিছু গুনাহের শান্তি আখিরাত পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। মন্দ কাজ দেখে চুপ থাকা সেই গুনাহসমূহের অন্তর্ভক্ত, যেগুলোর শান্তি তাৎক্ষণিক দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এ গুনাহের কারণে দুনিয়াতেই শাস্তিস্বরূপ ধন-সম্পদ ও জানের ক্ষতি হয় এবং মাখলুকের ওপর জালিমের তরফ থেকে লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়।'
২৪৬. তারিখু বাগদাদ: ১/১৮৪।
২৪৭. মুখতাসারু তারিখি দিমাশক: ১৪/৩৫।
📄 রক্ষা পাওয়ার মূল রহস্য
তবে যেকোনো ধরনের নেককার লোকের উপস্থিতি আজাব প্রতিহত করতে পারে না। বরং সমাজ-সংশোধনে সচেষ্ট নেককার লোকের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। শুধু নিজে নেক আমল করে, সমাজের অন্যান্য লোকের সংশোধনের কোনো প্রচেষ্টা চালায় না এমন নেককার লোক আল্লাহর আজাব অপসারণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ইসলাহ তথা সংশোধন করাকেই আল্লাহ তাআলা ধ্বংস ও মুক্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণকারী আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ করেছেন :
وَمَا كَانَ رَبُكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ
'আর তোমার পালনকর্তা এমন নন যে, জনবসতিগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবেন, সেখানকার লোকেরা সংশোধনকারী হওয়া সত্ত্বেও।
আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যদি জনপদের লোকেরা সংশোধনকারী হয়, তাহলে তাদের ওপর আজাব আসবে না। অন্যথায় তাদের ওপর আজাব আসবে। সংশোধন করার অর্থ হচ্ছে, ভালো কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। এ জন্যই উমর বিন আব্দুল আজিজ বলেছেন:
'আল্লাহ তাআলা কয়েকজনের পাপের কারণে সবাইকে আজাব দেন না; কিন্তু পাপাচার যদি প্রকাশ্যে করা হয়, তাহলে সবাই শাস্তির উপযোগী হয়ে যায়।'
তাঁর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো নির্দিষ্ট কয়েকজনের অপরাধের কারণে ব্যাপকভাবে সবার ওপর আজাব প্রেরণ করেন। কাজেই আমরা যদি ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকি, তাহলে আমরাও আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত হব। তবে ভালো কাজের নির্দেশ এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করা সত্ত্বেও যদি অপরাধীরা তাদের অপরাধ থেকে ফিরে না আসে, তাহলে সংশোধনকারী লোকদের সেই জনপদ থেকে হিজরত করে অন্যত্র চলে যাওয়া উচিত। কারণ, পাপাচার ও অশ্লীলতার বাতাসে মুমিনের আত্মাও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই অসুস্থতা থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য হয়তো পাপাচার প্রতিহত করতে হবে, নয়তো নিজেকে সেখান থেকে সরে যেতে হবে।
যে ব্যক্তি এমন করবে, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর দৃষ্টিতে সেই প্রকৃত আলিম। তাঁর মতে, যে ভালো কাজের আদেশ দেয় না এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করে না, সে আলিম নয়। তিনি বলেন:
'তোমাদের ওপর এমন একটি সময় আসবে, যখন পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ইলম কমে যাবে। যখন আলিমগণের বিদায় হবে, তখন সকল মানুষ বরাবর হয়ে যাবে। তারা ভালো কাজের আদেশ দেবে না এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে না। সে সময় তাদের ধ্বংস ত্বরান্বিত হবে。
টিকাঃ
২৪৮. সুরা হুদ, ১১: ১১৭।
২৪৯. মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ২/১৭১।
২৫০. ফাতহুল বারি: ১৩/২১।