📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন

📄 তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন


উত্তম ও সুন্দর ইবাদত পেশ করো। তা তোমাদের আখিরাতের সঞ্চয় হবে এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে তোমাদের আড়াল করে রাখবে। কোনোমতে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ইবাদত করলে সে ইবাদত তেমন কাজে আসবে না।

মাখরাজ মানে বের হওয়ার পথ। বিপদ ও সংকট থেকে বের হওয়ার পথ। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন। যেমন তিনি গুহায় আটকে পড়া তিন ব্যক্তিকে বের হওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। গল্পটি সবার জানা:
তিন ব্যক্তি একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে একটি বিশাল আকৃতির পাথর এসে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। তারা নিজ নিজ পুণ্যকর্মের অসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। একজন মাতাপিতার সাথে সদাচরণের অসিলা দিয়ে দুআ করলেন। আরেকজন অসিলা হিসেবে ব্যবহার করলেন নিজের আমানতদারিকে। অপরজন অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দুআ করলেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের বিপদ দূর করে দিলেন। তাদের নেক আমলসমূহের বিনিময়ে গুহার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে তাদের বের হওয়ার পথ করে দিলেন। উক্ত ঘটনার মাধ্যমে এই তিনজন লোক আমাদের একটি বার্তা দিয়ে গেছেন :
'উত্তম ও সুন্দর ইবাদত পেশ করো। তা তোমাদের আখিরাতের সঞ্চয় হবে এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে তোমাদের আড়াল করে রাখবে।'

অনুরূপভাবে তিনি উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন আওফ বিন মালিক আশজায়ি-কে। যখন মুশরিকরা তাঁর ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে গেল, তখন তিনি রাসুল-এর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলেন। রাসুল তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে অধিকহারে )لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ( পাঠ করতে বললেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, 'রাসুল তোমাকে অত্যন্ত সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন।' দুজনেই রাসুল-এর উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। ফলে মুশরিকরা তাদের ছেলের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ল। এ সুযোগে তাদের ছেলে পালিয়ে চলে আসলো এবং সাথে মুশরিকদের চারশ বকরিও নিয়ে আসলো। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলো :
وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا - وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
'যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।'

অনুরূপভাবে তিনি উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ সাধকপুরুষ বিশিষ্ট তাবিয়ি আবু মুসলিম খাওলানি-এর জন্য। ঘটনাটি হলো: একদিন তাঁর স্ত্রী এসে তাঁকে বললেন, 'ঘরে আটা নেই।' তিনি বললেন, 'তোমার নিকট (আটা ক্রয় করে আনার মতো) কিছু আছে?' স্ত্রী বললেন, 'একটি দিরহাম আছে, যা আমি সুতা বিক্রি করে পেয়েছি।' তিনি বললেন, 'তা আমাকে দাও এবং থলেটি নিয়ে আসো।' অতঃপর তিনি বাজারে গেলেন। সেখানে এক ভিক্ষুক নাচোড়বান্দার মতো তাঁর কাছে ভিক্ষা চাইলে তিনি তাকে দিরহামটি দিয়ে দিলেন। এখন পড়ে গেলেন বিপাকে। আটা নিয়ে যেতে না পারলে তো স্ত্রীর ঝাড়ি খেতে হবে! তাই তিনি থলের ভেতর বালি ও কাঠের গুঁড়া ভরে বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং স্ত্রীর হাতে থলেটি তুলে দিয়ে আস্তে করে সরে পড়লেন। স্ত্রী থলের মুখ খুলে দেখলেন, ভেতরে আটা! তিনি যথারীতি আটা মেখে রুটি বানালেন। আবু মুসলিম খাওলানি রাতে বাড়িতে এসে রুটি দেখতে পেয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, 'রুটি কোথায় পেয়েছ?' স্ত্রী বললেন, 'কেন, আপনিই তো আটা এনে দিলেন!' স্ত্রীর কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন。

একইভাবে তিনি সংকট থেকে মুক্তির পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন শাইখ বুনান আল-হাম্মাল-এর জন্য। এক ব্যক্তি শাইখুল ইসলাম আবুল হাসান বুনান আল-হাম্মাল-এর নিকট আসলো। লোকটির একজন থেকে একশ দিনার পাওনা ছিল। ঋণগ্রহীতার কাছে ঋণ চাইতে গেলে সে ঋণের চুক্তিপত্র চেয়ে বসল। লোকটি চুক্তিপত্র খুঁজতে গিয়ে দেখল, সেটি হারিয়ে গেছে! উপায়ান্তর না দেখে সে বুনান আল-হাম্মাল-এর নিকট দুআ চাওয়ার জন্য আসলো। বুনান তাকে বললেন, 'আমি বুড়ো মানুষ, হালুয়া খেতে একটু বেশিই ভালোবাসি। তাই অমুকের দোকান থেকে আমার জন্য এক বোতল হালুয়া নিয়ে আসো। তবেই আমি তোমার জন্য দুআ করব।' লোকটি তা-ই করল। হালুয়া নিয়ে আসার পর বুনান লোকটিকে বললেন, 'হালুয়ার ওপর পেঁচিয়ে দেওয়া কাগজটি খুলে ফেলো।' লোকটি কাগজ খুলে দেখল, সেটি তারই ঋণের চুক্তিপত্র!' এরপর বুনান বললেন, 'এটা নাও এবং (এর মাধ্যমে পাওনা বুঝে নিয়ে) তোমার সন্তানদের হালুয়া খাওয়াও।'

টিকাঃ
২১৫. ২২ নং ফায়দা : আয়াতে মাখরাজ বা উত্তরণের পথ থেকে কী উদ্দেশ্য, সে ব্যাপারে আটটি মত আছে। এক. দুনিয়ার সন্দেহ-সংশয়, মৃত্যুকালীন কষ্ট এবং কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণের পথ। এটি কাতাদা -এর অভিমত। দুই. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা থেকে রক্ষা করবেন। এ মতটি ইবনে আব্বাস-এর। তিন. মানুষকে কষ্ট দেয় এমন প্রতিটি বিষয় থেকে উত্তরণের পথ। ইবনে খাইসাম এ মতের প্রবক্তা। চার, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকার উপায়। এটি হাসান -এর মত। পাঁচ শান্তি থেকে বাঁচার উপায়। হুসাইন বিন ফাজল এ মন্তব্য করেছেন। ছয়. তাকে অল্পতুষ্টি দান করবেন। এটি আলি বিন সালিহ-এর অভিমত। সাত. জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভের উপায়। এটা কালবি বলেছেন। আট, বাতিল থেকে হকের পথে আসা এবং সংকীর্ণতা থেকে প্রশস্ততার দিকে ফিরে আসার উপায়। এটি ইবনে জুরাইজের অভিমত। (আদ-দুররুল মানসুর: ৬/৩১)
২১৬. ২৩ নং ফায়দা: আল্লাহ তাআলা সব সময় আমাদের সাথে অনুগ্রহমূলক আচরণ করেন, যা ন্যায়মূলক আচরণের চেয়ে ঊর্ধ্বে। তিনি আমাদের সাথে তাঁর শান উপযোগী আচরণ করেন, আমাদের শান উপযোগী নয়। এ জন্যই জনৈক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির নিকট যখন এ আয়াত তিলাওয়াত করা হলো:
وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا - وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
'যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।' (সুরা আত-তালাক, ৬৫: ৩-২) তখন তিনি বললেন,'ওয়াল্লাহি, তিনি আমাদের জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছেন; অথচ আমরা যথাযথরূপে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারিনি। আমরা তিনি যেভাবে চান, সেভাবে তাঁকে ভয় করতে পারি না; তবুও তিনি আমাদের রিজিক দান করেন। তাই আমরা যথাযথরূপে তাকওয়া অবলম্বন করতে না পারলেও, অন্তত আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাকওয়া অবলম্বন করে তৃতীয় আরেকটি অনুগ্রহ তাঁর থেকে আশা করতে পারি। সেটা হচ্ছে:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তাকে মহা প্রতিদান দান করেন।' (সুরা আত-তালাক, ৬৫ : ৫)-হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২৪৮/৪।
২১৭. জাদুল মাসির: ৪/২৭৮।
২১৮. সুরা আত-তালাক, ৬৫: ২-৩।
২১৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/৩৭১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির আনুগত্য নেই

📄 স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির আনুগত্য নেই


তবে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সকল কিছুর ওপর প্রাধান্য দেয় এবং স্রষ্টার আনুগত্যকে সৃষ্টির আনুগত্যের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। তবেই আল্লাহ তাআলা মানুষের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করেন—চাই সে মানুষ যতই শক্তিশালী হোক। অবশ্য এর আগে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবি হাকাম বিন আমর গিফারি-এর উপদেশটি শুনতে পারো:
তিনি খোরাসানের গভর্নর ছিলেন। একদিন জিয়াদ তাঁর নিকট পত্র মারফত সংবাদ পাঠালেন : আমিরুল মুমিনিন স্বর্ণ ও রৌপ্যকে বাছাই করে তার জন্য পাঠিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্বর্ণ ও রৌপ্য জনগণের মধ্যে বণ্টন করা যাবে না।

এর উত্তরে তিনি জিয়াদের উদ্দেশে লিখলেন: আপনার বার্তা আমি পেয়েছি। তবে আমিরুল মুমিনিনের বার্তার আগেই আল্লাহর বার্তা (প্রজাদের সাথে ইনসাফ করার বার্তা) এসেছে আমার নিকট। (তাই আমি আল্লাহর নির্দেশই পালন করব। এর জন্য আমার ওপর যতই বিপদ আসুক, আমি পরোয়া করি না। কেননা) আল্লাহর কসম, যদি আসমান ও জমিন একত্রিত হয়ে কোনো বান্দার পথ বন্ধ করে দেয়, সে বান্দা যদি তাকওয়াবান হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার বের হওয়ার পথ করে দেবেন। ওয়াস-সালামু আলাইক।

এরপর তিনি জনগণের উদ্দেশে বললেন, 'সকালে সবাই মাল সংগ্রহ করতে এসো।' অতঃপর তিনি জনগণের মাঝে মাল বণ্টন করে দিলেন。

এ জন্যই আয়িশা মুআবিয়া-কে চিঠির মাধ্যমে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, সর্বদা আল্লাহকে ভয় করতে হবে, এর কারণে মানুষ অসন্তুষ্ট হলেও। চিঠির ভাষা নিম্নরূপ :
'আমি আপনাকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। কেননা, যদি আপনি আল্লাহকে ভয় করেন, তাহলে মানুষের (রাগ ও অনিষ্ট) থেকে আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন। কিন্তু যদি আপনি মানুষকে ভয় করেন, তাহলে তাদের কেউই আল্লাহর (ক্রোধ ও শান্তি) থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।'

টিকাঃ
২২০. আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল উমামি ওয়াল মুলুক: ১৩/২৭৪।
২২১. আদ-দুররুল মানসুর: ৮/১৯৯-২০০।
২২২. আদ-দুররুল মানসুর: ৮/২০০।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 রুটির হাতিয়ার

📄 রুটির হাতিয়ার


কোনো ব্যক্তি যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ করতে থাকে, সে ভালো কাজ তাকে বিপদাপদ থেকে মুক্ত রাখার জন্য অস্ত্রের মতো কাজ করে। আমাদের কাছে অপরিচিত অথচ আল্লাহর কাছে পরিচিত এক লেখকের সাথে বাস্তবেই এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি হলো: একদিন উজির আলি বিন মুহাম্মাদ বিন ফুরাত জনৈক লেখককে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'আচ্ছা, আপনি একটা কথা বলুন তো! আপনার ব্যাপারে আমার খারাপ ধারণা আছে। তাই সব সময় আমি আপনাকে গ্রেফতার করার চিন্তা করতাম। কিন্তু একদিন স্বপ্নে দেখলাম, আপনি আমাকে একটি রুটি দিয়ে প্রতিহত করছেন। স্বপ্নটি কয়েক রাত দেখেছি আমি। স্বপ্নে বারবার আমি আপনাকে গ্রেফতার করতে চেয়েছি; কিন্তু বারবার আপনি আমাকে প্রতিহত করেছেন। অতঃপর আমি সৈন্যদলকে আপনার সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিলাম। তাদের নিক্ষিপ্ত প্রতিটি তির আপনি মাত্র একটি রুটি দিয়ে প্রতিহত করেছেন! একটি তিরও আপনাকে বিদ্ধ করতে পারেনি। এখন আমাকে বলুন, রুটির রহস্য কী?

লেখক বললেন, 'উজির মহোদয়, আমার ছোটবেলা থেকে আমার মাতা প্রতি রাতে আমার বালিশের নিচে একটি রুটি রাখতেন। পরদিন সকালে আমার পক্ষ থেকে রুটিটি সদাকা করে দিতেন। মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি রাতে তিনি এ কাজটি করতেন। তার মৃত্যুর পরে কাজটি আমি অব্যাহত রাখি। আমিও তার মতো প্রতি রাতে বালিশের নিচে একটি রুটি রাখি এবং সকালে উঠে তা সদাকা করে দিই।'

ঘটনা শুনে উজির খুব আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং বললেন, 'আল্লাহর কসম, আজকের পর থেকে কোনোদিন আমার তরফ থেকে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।'

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) কেমন যেন আমাদের উল্লিখিত সকল ঘটনা মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন! অতঃপর চূড়ান্ত পর্যায়ের দৃঢ়তা সহকারে বললেন :
'যে ভালো কাজ করে, যে বিপদে পড়ে না, পড়লেও তা থেকে উত্তরণের উপায় পেয়ে যায়। '

একই কারণে আলি বিন আবু তালিব (রাঃ) ভালো কাজের প্রতি ভালোভাবে উৎসাহ দেওয়ার জন্য কসম করে বলেছেন :
'সেই সত্তার শপথ-যাঁর শ্রবণশক্তি সকল শব্দ শুনতে পায়, কোনো ব্যক্তি যদি কারও অন্তরে খুশির সঞ্চার করে, আল্লাহ তাআলা সে খুশির বিনিময়ে একটি দয়া সৃষ্টি করেন। অতঃপর কোনো সময় যদি তার ওপর বিপদ আসে, তখন সে দয়া তার দিকে স্রোতের পানির মতো এগিয়ে আসে এবং তার বিপদকে উটের খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। '

আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ হলো সৃষ্টির উপকার করা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা। এ জন্য তিনি ওই লোকদের বেশি ভালোবাসেন, যারা তাঁর বান্দাদের উপকার করতে সচেষ্ট থাকে। সুতরাং তুমি যদি বান্দাদের উপকার করাকে নিজের কাজ বানিয়ে নাও এবং তাদের জন্য তোমার দান-দক্ষিণা ও উদারতার দুয়ার খুলে দাও, তাহলে আল্লাহর রহমতের শাহি ফটক তোমার জন্য খুলে যাবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আল্লাহর অনুগ্রহের দুয়ার খুলতে হলে প্রথমে তোমাকে নিজের অনুগ্রহের দুয়ার খুলতে হবে। এ সম্পর্কে সালিহ মিররি বলেন:
যদি তুমি তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করো, তাহলে তাঁর মাখলুকের প্রতি অনুগ্রহ করো। তখন তোমার সকল বিষয়ে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ তোমার সাথে থাকবে। '

এর সমর্থনে রাসুল -এর একাধিক হাদিসও আছে :
• যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে পোশাক পরিধান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করাবেন。
• যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে আহার করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের ফলমূল খাইয়ে পরিতৃপ্ত করবেন。
• যে ব্যক্তি কোনো পিপাসার্তকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের পানি করাবেন。
• যে ব্যক্তি কোনো গোলাম আজাদ করবে, আল্লাহ তাআলা উক্ত গোলামের একেকটি অঙ্গের বিনিময়ে তার একেকটি অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন。
• যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের অভাব (সাহায্যের মাধ্যমে) সহজ করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে (তার বিষয়গুলো) তার জন্য সহজ করবেন。
• যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুমিনের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে কিয়ামতের কঠিন কষ্ট দূর করে দেবেন।

উল্লিখিত প্রতিটি হাদিস জান্নাত-প্রত্যাশীদের মনে দান, খয়রাত ও কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার জন্য চরমভাবে উৎসাহিত করে।

টিকাঃ
২২৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১১/১৫১-১৫২।
২২৪. উয়ুনুল আখবার: ৩/১৯৬।
২২৫. আল-মুসতাতরিফ ফি কুল্লি ফাননিন মুসতাজরিফ: ১/১২৬।
২২৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৬/১৭১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বোত্তম কর্ম

📄 সর্বোত্তম ব্যক্তি ও সর্বোত্তম কর্ম


আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবিজি-এর কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি কে এবং সর্বোত্তম আমল কোনটি?'
উত্তরে রাসুল বললেন :
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعَهُمْ لِلنَّاسِ، وَأَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ سُرُورٍ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ، أَوْ تَكْشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دِينًا، أَوْ تُطْرَدُ عَنْهُ جُوعًا، وَلِأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِي فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ، يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ، شَهْرًا،
'ওই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম, যে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার করে। আর আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম কর্ম হচ্ছে, মুসলিমদের অন্তরে আনন্দের সঞ্চার করা অথবা তার কষ্ট দূর করা অথবা তার ঋণ আদায় করে দেওয়া অথবা তার ক্ষুধা নিবারণ করা। কোনো ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের জন্য পথচলা আমার কাছে এই মসজিদে (মসজিদে নববিতে) এক মাস ইতিকাফ থাকার চেয়ে প্রিয়। '

যদি তুমি বিচক্ষণ ও চালাক হয়ে থাকো এবং তোমার সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে আমল করার জন্য সর্বোত্তম আমলের খোঁজে থাকো, তাহলে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল করার শর্ত দিয়ে আমার নিকট থেকে এই হাদিয়াটি লুপে নাও :
'বান্দার কল্যাণের জন্য কাজ করা ইবাদত, বলতে গেলে এটাই সর্বোত্তম ইবাদত।'

মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য চেষ্টা ও সুপারিশ করা কল্যাণমূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল স্বীয় কাজের মাধ্যমে সাহাবিদের এ কাজ শিক্ষা দিয়েছেন। মুআবিয়া থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল বলেছেন:
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَسْأَلُنِي الشَّيْءَ فَأَمْنَعُهُ حَتَّى تَشْفَعُوا فِيهِ، فَتُؤْجَرُوا
'অনেক সময় কোনো মানুষ আমার থেকে কোনো কিছু চাইলে আমি প্রথমে দিতে অস্বীকার করি, যাতে তোমরা সুপারিশ করে সাওয়াবের ভাগিদার হতে পারো।'

সুপারিশ করা খ্যাতি ও প্রভাবের জাকাত। উজির হাসান বিন সাহল বলেছেন, 'আমার সম্পদের জাকাত দেওয়া আমার ওপর ফরজ। একইভাবে আমার প্রভাব-প্রতিপত্তিরও জাকাত আছে, সহযোগিতা ও সুপারিশ করার মাধ্যমে এ জাকাত আদায় করতে হয়।'

অনেক ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা দান করার চেয়ে সুপারিশ করা উত্তম হয়। এ সম্পর্কে মাওয়ারদি বলেন:
'প্রভাব-প্রতিপত্তির ত্রাণ দেওয়া অর্থাৎ সুপারিশ করা অনেক সময় উপকারিতার দিক দিয়ে সম্পদ দান করার চেয়ে কার্যকারী ও গুরুত্ববহ হয়। অনেক অসহায় লোক এর ছায়াতলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। সুতরাং কোনো প্রতিপত্তিওয়ালা ব্যক্তি যদি কোনো কারণ ছাড়াই সুপারিশ করতে অস্বীকার করে, সে টাকা-পয়সার কৃপণের চেয়ে বড় কৃপণ。

এ উপকারিতা ও কল্যাণমূলক কাজ শুধু দুনিয়াবি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দ্বীনি বিষয়ে মানুষের উপকার ও কল্যাণ করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কল্যাণমূলক কাজের মধ্যে অন্যকে ভালো কাজের পথনির্দেশ করা, হাত ধরে তাওবার পথে নিয়ে আসা, শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে পাপাচার ও অশ্লীলতার পথে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। কোনো পাপিষ্ঠ যখন নিজের মুক্তির পথকে চিরতরে বন্ধ মনে করে আশাহত হয়ে পড়ে, তার সামনে আশার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়াও দ্বীনি কল্যাণমূলক কাজের অন্তর্ভুক্ত। মুসাফি উপকার ও কল্যাণ সম্পর্কিত হাদিসের বিশ্লেষণ করার সময় দুনিয়াবি ও দ্বীনি কল্যাণের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা করে বলেছেন:
'দ্বীনি কল্যাণ মর্যাদা ও স্থায়িত্ব বিবেচনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'

টিকাঃ
২২৭. আল-মুজামুল আওসাত: ৬০২৬, আল-মুজামুল কাবির: ১৩৬৪৬।
২২৮. মিজানুল আমল, আবু হামিদ গাজালি: পৃ. ৩৮৩।
২২৯. সুনানুন নাসায়ি: ২৫৫৭।
২৩০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন: ১/৩৩৩-৩৩৪।
২৫ নং ফায়দা: সুপারিশ-সম্পর্কিত হাদিস উল্লেখ করার পর ইমাম নববি বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কারও বৈধ প্রয়োজন পূরণ করার জন্য সুপারিশ করা মুসতাহাব। সব ধরনের সুপারিশ এর অন্তর্ভুক্ত। সেটা সুলতানের নিকট হোক বা গভর্নরের নিকট বা যে কারও নিকট। সে সুপারিশ জুলুম বন্ধ করার জন্য হোক, শাস্তি রহিত করার জন্য হোক বা কোনো অভাবগ্রস্তকে অনুদান দেওয়ার জন্য হোক বা অন্য যেকোনো কারণে হোক। (শারহুন নববি: ১৬/১৭৭)
২৩১. ফাইজুল কাদির: ৩/৪৮১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00