📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 চিরস্থায়ী ওয়াদা

📄 চিরস্থায়ী ওয়াদা


যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তারা নিঃসন্দেহে আল্লাহর মাগফিরাত ও অনুগ্রহকেই বেছে নেয়। বস্তুত আল্লাহর ওয়াদা ও শয়তানের ওয়াদার মধ্যে তো কোনো তুলনাই চলে না। এখন আমরা জেনে নেব, আয়াতে মাগফিরাত ও অনুগ্রহ বলে কী বোঝানো হয়েছে:
ইবনে আতিয়া বলেন : 'মাগফিরাত' মানে হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। আর 'অনুগ্রহ' মানে হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে রিজিকের প্রশস্ততা দান করবেন এবং আখিরাতে অফুরন্ত নিয়ামত দান করবেন।

যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে একটি স্থায়ী ওয়াদা দিয়েছেন। একইসাথে এ ওয়াদা কৃপণদের জন্য তিরস্কার ও উপদেশও বটে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
'তোমরা (আল্লাহর রাস্তায়) যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দান করবেন। তিনিই উত্তম রিজিকদাতা। '

এ আয়াতের তাফসিরে ইবনে আশুর বলেন: 'ওয়াদামূলক আয়াতটিতে তিন তিনটি দৃঢ়তাবোধক বাক্য-বিন্যাস-রীতি ব্যবহার করে ওয়াদাটিকে সুদৃঢ় করা হয়েছে। প্রথমত, পুরো বাক্যটি শর্তবাচক; দ্বিতীয়ত, শর্তের জবাবমূলক বাক্যটি নামবাচক; তৃতীয়ত, বাক্যটিতে উদ্দেশ্যের পূর্বে বিধেয় আনা হয়েছে। বাক্যের এমন বিন্যাস ওয়াদার দৃঢ়তা এবং তা বাস্তবায়িত হওয়ার আবশ্যিকতাকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে।'

কুরআনের বক্তব্যকে সমর্থন করে হাদিসে কুদসিতেও সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াদাটি এসেছে:
يَا ابْنَ آدَمَ أَنْفِقْ أُنْفِقْ عَلَيْكَ
'হে আদম-সন্তান, তুমি ব্যয় করো, তাহলে আমিও তোমার জন্য ব্যয় করব।'

এখানে আল্লাহর জন্য ব্যয় শব্দটি বান্দার ব্যয়ের সাথে শব্দগত সাদৃশ্যের জন্য আনা হয়েছে। নাহলে এ শব্দটি আল্লাহর সাথে মানানসই নয়। কারণ, ব্যয়ের আসল অর্থ ফুরিয়ে যাওয়া। আর আল্লাহ তাআলা যতই দান করুন, তাঁর ভান্ডার থেকে সামান্যতমও কমে না।

শুধু এতটুকুই নয়, নবিজি তোমার জন্য আরও সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন। ইরশাদ করেছেন:
مَا فَتَحَ رَجُلُ بَابَ عَطِيَّةٍ لِصَدَقَةٍ أَوْ صِلَةٍ إِلَّا زَادَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهَا كَثْرَةً
'কোনো ব্যক্তি যদি সদাকা অথবা আত্মীয়তা-সম্পর্ক সংরক্ষণের মাধ্যমে দানের দরজা উন্মুক্ত করে, আল্লাহ তাআলা তার সম্পদে প্রবৃদ্ধি দান করেন।'

দান করলে আল্লাহ তাআলা সম্পদ বাড়িয়ে দেন। কারণ যারা আল্লাহর রাস্তায় দান করে, তাদের জন্য ফেরেশতারা দুআ করেন। আর ফেরেশতাদের মধ্যে দুআ কবুল হওয়ার সকল শর্ত বিদ্যমান আছে বিধায় আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ ফিরিয়ে দেন না। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ العِبَادُ فِيهِ، إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
'প্রতিদিন বান্দারা এমন অবস্থায় সকালে উপনীত হয় যে, ওই সময় দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, "হে আল্লাহ, দানশীলকে তার দানের বিনিময় দিন।" আর অপরজন বলেন, “হে আল্লাহ, কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।”

তেমনিভাবে জান্নাতের দুই দরজায় দুজন ফেরেশতা বসে একজনের পরে একজন আল্লাহর পথে ব্যয়কারীদের জন্য দুআ করতে থাকেন। যেন এভাবে তারা বান্দাদের আল্লাহর রাস্তায় দান করা এবং কল্যাণমূলক কাজে সম্পদ ব্যয় করার প্রতি উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। এ সংবাদ আমরা পেয়েছি নবিজির জবান থেকে, যা খুব সুন্দর ভাষায় আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন বিশিষ্ট সাহাবি আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু। হাদিসের ভাষ্য নিম্নরূপ :
إِنَّ مَلَكًا بِبَابٍ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ» يَقُولُ: «مَنْ يُقْرِضِ الْيَوْمَ يُجْزَ غَدًا، وَمَلَكُ بِبَابٍ آخَرَ يَقُولُ: اللهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَأَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
'একজন ফেরেশতা জান্নাতের একটি দরজায় বসে বলেন, “যে ব্যক্তি আজকে (কোনো ব্যক্তিকে) কর্জ দেবে, আগামীকাল সে তার বিনিময় পাবে। “আরেকজন ফেরেশতা অন্য দরজায় বসে বলেন, “হে আল্লাহ, দানশীলকে তার দানের বিনিময় দিন এবং কৃপণকে ধ্বংস করে দিন。

এখানে স্বাভাবিকভাবে একটি প্রশ্ন আসে, সেটা হচ্ছে: প্রত্যেক দাতাই কি এ দুআর উপযুক্ত? এ ক্ষেত্রে ফরজ দান (জাকাত) এবং নফল দানের (সদাকা ও করজে হাসানা) মধ্যে কি কোনো পার্থক্য নেই?

ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন :
'দান করা বলতে যদিও ফরজ ও নফল উভয় প্রকার দানকে বোঝায়; কিন্তু যারা নফল দান থেকে বিরত থাকে, তারা এ দুআর উপযুক্ত নয়।'

ইমাম নববি -ও অভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন:
‘প্রশংসিত দান সেটাই, যেটা পরিবারের ভরণপোষণ, মেহমানদারি এবং অন্যান্য নফল খাতে ব্যয়িত হয়।’

এতক্ষণ যা বলা হলো, তা কক্ষনো এ কথা বোঝায় না যে, যেকোনো উদ্দেশ্যে সম্পদ জমা করে রাখা নিন্দনীয়। কারণ, ভালো উদ্দেশ্যে সম্পদ জমা করে রাখার মধ্যে কোনো অসুবিধা নেই। এটাকে সম্পদের প্রতি মোহ বা লোভ বলা যাবে না। সালাফদের অনেকেই ভালো উদ্দেশ্যে সম্পদ জমা করেছেন। তাদের অন্যতম হলেন আবু আহমাদ নিশাপুরি । তিনি মুনাজাতে আল্লাহকে বলেন:
‘হে আল্লাহ, আপনি অবশ্যই জানেন, আমি যা সঞ্চয় করছি, তা কেন করছি। এই সম্পদ আমি মাখলুক থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার জন্য এবং দারিদ্র্যকে লুকিয়ে বেড়ানো আলিমদের সাহায্য করার জন্য সঞ্চয় করছি।’

টিকাঃ
২০০. আল-জাওয়াহিরুল হিসান ফি তাফসিরিল কুরআন: ১/৫২৫।
২০১. সুরা সাবা, ৩৪ : ৩৯।
২০২. আত-তাহরির ওয়াত তানবির: ১২/২৬০।
২০৩. সহিহুল বুখারি : ৪৬৮৪, সহিহু মুসলিম: ৯৯৩।
২০৪. শুআবুল ইমান : ৩১৪০, সহিহুল জামি: ৫৬৪৬।
২০৫. সহিহুল বুখারি: ১৪৪২, সহিহু মুসলিম: ১০১০।
২০৬. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৩৩৩৩।
২০৭. দালিলুল ফালিহিন: ৩/১২১।
২০৮. দালিলুল ফালিহিন: ৩/১২১।
২০৯. তারিখু বাগদাদ: ৮/৭৪।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে করজ বলা হয়েছে কেন?

📄 আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে করজ বলা হয়েছে কেন?


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً
‘এমন কে আছে, যে আল্লাহকে করজ দেবে, উত্তম করজ; অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন।’

ইবনুল জাওজি এ আয়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। অতঃপর তাঁর তাফসিরগ্রন্থ জাদুল মাসিরে আমাদের জন্য চমৎকার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। লিখেছেন:
যদি প্রশ্ন করা হয়, সদাকাকে করজ বলা হয়েছে কেন?' এর তিনটি উত্তর দেওয়া যায়:
১. যেভাবে করজ পরিশোধ করে দেওয়া হয়, তেমনিভাবে সদাকার বিনিময় দিয়ে দেওয়া হবে।
২. সদাকার বিনিময় কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত হয়, যে রকম করজের বিনিময় নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বিলম্বিত হয়।
৩. সদাকার সাওয়াবের আবশ্যিকতা বোঝানোর জন্য। অর্থাৎ যে রকম বিনিময় ছাড়া করজ হয় না, তেমনই সদাকারও অবশ্যই বিনিময় রয়েছে এ কথা বোঝানোর জন্য।

ইবনুল কাইয়িম আরও গভীরে গিয়ে এর রহস্য উদঘাটন করেছেন। বলেছেন:
ব্যয়কারী ব্যক্তি যদি জানতে পারে, সে যা ব্যয় করছে, তা একদিন অবশ্যই তার নিকট ফিরে আসবে, তখন ব্যয় করা তার জন্য সহজ হয়। যে ঋণ দেয় সে যদি জানে, ঋণগ্রহীতা অনেক বড় মনের মানুষ; যদি জানতে পারে, ঋণগ্রহীতা তার থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করবে এবং সে ব্যবসার লভ্যাংশ তাকে দিয়ে দেবে; যদি জানতে পারে, ঋণগ্রহীতা তার ঋণ ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আরও অনেক কিছু তাকে দেবে, সে কোনোভাবেই ঋণ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে না। অবশ্য কেউ চূড়ান্ত পর্যায়ের কৃপণ হলে কিংবা ঋণগ্রহীতার (আল্লাহর) প্রতি বিশ্বাস না থাকলে তার কথা ভিন্ন।

এ জন্যই জনৈক উদারমনস্ক দানবীরকে যখন কেউ বলল, 'তুমি তো সম্পদ নষ্ট করছ,' উত্তরে তিনি বললেন, 'বদান্যতা থেকে বিরত থাকা মাবুদের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করার নামান্তর।'

আয়িশা-এর হতবাক করে দেওয়া গল্পটি শোনো :
এক মিসকিন তাঁর কাছে ভিক্ষা চাইল। সেদিন তিনি রোজা রেখেছিলেন এবং বাড়িতে মাত্র একটি রুটি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবুও তিনি তাঁর দাসীকে বললেন, 'রুটিটি তাকে দিয়ে দাও।' দাসী বললেন, 'তাহলে তো আপনি ইফতার করার জন্য কিছুই পাবেন না!' আয়িশা বললেন, 'তাকে দিয়ে দাও।' দাসী বলেন, 'অতঃপর আমি রুটিটি ভিক্ষুককে দিয়ে দিলাম। সন্ধ্যায় কোনো এক বাড়ির লোক অথবা একজন ব্যক্তি-যে সাধারণত আমাদের কাছে হাদিয়া পাঠাত না-আমাদের জন্য রুটির কাফনমোড়ানো১২ একটি ভুনা ছাগল হাদিয়া পাঠাল। আয়িশা আমাকে ডেকে বললেন, "এখান থেকে খাও। এটা তোমার সেই রুটি থেকে উত্তম।”

তবে দানের এমন তাৎক্ষণিক পুরস্কার পাওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, দান করতে হবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে। যাচাই করার জন্য কিংবা সংশয় নিয়ে দান করলে সে দানের পুরস্কার পাওয়া যাবে না। হাইওয়া বিন শুরাইহ পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে দান করতেন। প্রতিবছর তিনি ষাট দিনার দান করতেন। সেগুলোর সম্পূর্ণটুকু সদাকা করার পরই তিনি বাড়িতে আসতেন। বাড়িতে ফিরে এসে উক্ত ষাট দিনার বিছানার নিচে পেয়ে যেতেন! তার এক চাচাতো ভাই এ খবর পেয়ে নিজের সমুদয় সম্পত্তি সদাকা করে দিলেন। অতঃপর বাড়িতে ফিরে এসে দেখলেন, বিছানার নিচে কিছুই নেই! বেচারা দুকূল হারিয়ে অভিযোগ নিয়ে গেলেন হাইওয়ার নিকট। হাইওয়া বললেন, 'আমি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে আমার রবের জন্য দান করি। তুমি তো দান করেছ পরীক্ষা করার জন্য। '

টিকাঃ
২১০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৪৫।
২১১. তরিকুল হিজরাতাইন : পৃ. ৫৩৮-৫৩৯।
২১২. ২১ নং ফায়দা: আয়িশা -এর দানের বরকত ও প্রভাব সম্পর্কে মুনকাদির বিন আব্দুল্লাহ একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন: একদিন তিনি আয়িশা -এর কাছে গিয়ে বললেন, 'উম্মুল মুমিনিন, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে।' তিনি বললেন, 'আমার কাছে তো তোমাকে দেওয়ার মতো কিছু নেই। যদি আমার কাছে দশ হাজার দিরহামও থাকত, আমি সবগুলো তোমাকে দিয়ে দিতাম।' অতঃপর তিনি যখন আয়িশা -এর নিকট থেকে বের হলেন, তখনই তাঁর নিকট খালিদ বিন উসাইদের পক্ষ থেকে দশ হাজার দিরহাম হাদিয়া আসলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তা মুনকাদিরের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর মুনকাদির সেখান থেকে এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি দাসী ক্রয় করলেন। সে দাসী থেকে তার তিনটি সন্তান হলো। পরবর্তী সময়ে মুনকাদিরের সেই তিন সন্তান হয়ে উঠলেন মদিনার শ্রেষ্ঠ ইবাদতগুজার। (সিরাজুল মুলুক: পৃ. ৩৭৭)
২১৩. মুয়াত্তা মালিক: ১৮১৯।
২১৪. আস-সিয়ার: ৬/৪০৪।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন

📄 তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন


উত্তম ও সুন্দর ইবাদত পেশ করো। তা তোমাদের আখিরাতের সঞ্চয় হবে এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে তোমাদের আড়াল করে রাখবে। কোনোমতে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ইবাদত করলে সে ইবাদত তেমন কাজে আসবে না।

মাখরাজ মানে বের হওয়ার পথ। বিপদ ও সংকট থেকে বের হওয়ার পথ। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন। যেমন তিনি গুহায় আটকে পড়া তিন ব্যক্তিকে বের হওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। গল্পটি সবার জানা:
তিন ব্যক্তি একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে একটি বিশাল আকৃতির পাথর এসে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। তারা নিজ নিজ পুণ্যকর্মের অসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। একজন মাতাপিতার সাথে সদাচরণের অসিলা দিয়ে দুআ করলেন। আরেকজন অসিলা হিসেবে ব্যবহার করলেন নিজের আমানতদারিকে। অপরজন অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দুআ করলেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের বিপদ দূর করে দিলেন। তাদের নেক আমলসমূহের বিনিময়ে গুহার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে তাদের বের হওয়ার পথ করে দিলেন। উক্ত ঘটনার মাধ্যমে এই তিনজন লোক আমাদের একটি বার্তা দিয়ে গেছেন :
'উত্তম ও সুন্দর ইবাদত পেশ করো। তা তোমাদের আখিরাতের সঞ্চয় হবে এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে তোমাদের আড়াল করে রাখবে।'

অনুরূপভাবে তিনি উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন আওফ বিন মালিক আশজায়ি-কে। যখন মুশরিকরা তাঁর ছেলেকে বন্দী করে নিয়ে গেল, তখন তিনি রাসুল-এর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলেন। রাসুল তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে অধিকহারে )لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ( পাঠ করতে বললেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, 'রাসুল তোমাকে অত্যন্ত সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন।' দুজনেই রাসুল-এর উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। ফলে মুশরিকরা তাদের ছেলের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ল। এ সুযোগে তাদের ছেলে পালিয়ে চলে আসলো এবং সাথে মুশরিকদের চারশ বকরিও নিয়ে আসলো। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলো :
وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا - وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
'যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।'

অনুরূপভাবে তিনি উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ সাধকপুরুষ বিশিষ্ট তাবিয়ি আবু মুসলিম খাওলানি-এর জন্য। ঘটনাটি হলো: একদিন তাঁর স্ত্রী এসে তাঁকে বললেন, 'ঘরে আটা নেই।' তিনি বললেন, 'তোমার নিকট (আটা ক্রয় করে আনার মতো) কিছু আছে?' স্ত্রী বললেন, 'একটি দিরহাম আছে, যা আমি সুতা বিক্রি করে পেয়েছি।' তিনি বললেন, 'তা আমাকে দাও এবং থলেটি নিয়ে আসো।' অতঃপর তিনি বাজারে গেলেন। সেখানে এক ভিক্ষুক নাচোড়বান্দার মতো তাঁর কাছে ভিক্ষা চাইলে তিনি তাকে দিরহামটি দিয়ে দিলেন। এখন পড়ে গেলেন বিপাকে। আটা নিয়ে যেতে না পারলে তো স্ত্রীর ঝাড়ি খেতে হবে! তাই তিনি থলের ভেতর বালি ও কাঠের গুঁড়া ভরে বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং স্ত্রীর হাতে থলেটি তুলে দিয়ে আস্তে করে সরে পড়লেন। স্ত্রী থলের মুখ খুলে দেখলেন, ভেতরে আটা! তিনি যথারীতি আটা মেখে রুটি বানালেন। আবু মুসলিম খাওলানি রাতে বাড়িতে এসে রুটি দেখতে পেয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, 'রুটি কোথায় পেয়েছ?' স্ত্রী বললেন, 'কেন, আপনিই তো আটা এনে দিলেন!' স্ত্রীর কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন。

একইভাবে তিনি সংকট থেকে মুক্তির পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন শাইখ বুনান আল-হাম্মাল-এর জন্য। এক ব্যক্তি শাইখুল ইসলাম আবুল হাসান বুনান আল-হাম্মাল-এর নিকট আসলো। লোকটির একজন থেকে একশ দিনার পাওনা ছিল। ঋণগ্রহীতার কাছে ঋণ চাইতে গেলে সে ঋণের চুক্তিপত্র চেয়ে বসল। লোকটি চুক্তিপত্র খুঁজতে গিয়ে দেখল, সেটি হারিয়ে গেছে! উপায়ান্তর না দেখে সে বুনান আল-হাম্মাল-এর নিকট দুআ চাওয়ার জন্য আসলো। বুনান তাকে বললেন, 'আমি বুড়ো মানুষ, হালুয়া খেতে একটু বেশিই ভালোবাসি। তাই অমুকের দোকান থেকে আমার জন্য এক বোতল হালুয়া নিয়ে আসো। তবেই আমি তোমার জন্য দুআ করব।' লোকটি তা-ই করল। হালুয়া নিয়ে আসার পর বুনান লোকটিকে বললেন, 'হালুয়ার ওপর পেঁচিয়ে দেওয়া কাগজটি খুলে ফেলো।' লোকটি কাগজ খুলে দেখল, সেটি তারই ঋণের চুক্তিপত্র!' এরপর বুনান বললেন, 'এটা নাও এবং (এর মাধ্যমে পাওনা বুঝে নিয়ে) তোমার সন্তানদের হালুয়া খাওয়াও।'

টিকাঃ
২১৫. ২২ নং ফায়দা : আয়াতে মাখরাজ বা উত্তরণের পথ থেকে কী উদ্দেশ্য, সে ব্যাপারে আটটি মত আছে। এক. দুনিয়ার সন্দেহ-সংশয়, মৃত্যুকালীন কষ্ট এবং কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণের পথ। এটি কাতাদা -এর অভিমত। দুই. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সব ধরনের দুঃখ-দুর্দশা থেকে রক্ষা করবেন। এ মতটি ইবনে আব্বাস-এর। তিন. মানুষকে কষ্ট দেয় এমন প্রতিটি বিষয় থেকে উত্তরণের পথ। ইবনে খাইসাম এ মতের প্রবক্তা। চার, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকার উপায়। এটি হাসান -এর মত। পাঁচ শান্তি থেকে বাঁচার উপায়। হুসাইন বিন ফাজল এ মন্তব্য করেছেন। ছয়. তাকে অল্পতুষ্টি দান করবেন। এটি আলি বিন সালিহ-এর অভিমত। সাত. জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভের উপায়। এটা কালবি বলেছেন। আট, বাতিল থেকে হকের পথে আসা এবং সংকীর্ণতা থেকে প্রশস্ততার দিকে ফিরে আসার উপায়। এটি ইবনে জুরাইজের অভিমত। (আদ-দুররুল মানসুর: ৬/৩১)
২১৬. ২৩ নং ফায়দা: আল্লাহ তাআলা সব সময় আমাদের সাথে অনুগ্রহমূলক আচরণ করেন, যা ন্যায়মূলক আচরণের চেয়ে ঊর্ধ্বে। তিনি আমাদের সাথে তাঁর শান উপযোগী আচরণ করেন, আমাদের শান উপযোগী নয়। এ জন্যই জনৈক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির নিকট যখন এ আয়াত তিলাওয়াত করা হলো:
وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا - وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
'যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।' (সুরা আত-তালাক, ৬৫: ৩-২) তখন তিনি বললেন,'ওয়াল্লাহি, তিনি আমাদের জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছেন; অথচ আমরা যথাযথরূপে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারিনি। আমরা তিনি যেভাবে চান, সেভাবে তাঁকে ভয় করতে পারি না; তবুও তিনি আমাদের রিজিক দান করেন। তাই আমরা যথাযথরূপে তাকওয়া অবলম্বন করতে না পারলেও, অন্তত আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাকওয়া অবলম্বন করে তৃতীয় আরেকটি অনুগ্রহ তাঁর থেকে আশা করতে পারি। সেটা হচ্ছে:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
'আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তাকে মহা প্রতিদান দান করেন।' (সুরা আত-তালাক, ৬৫ : ৫)-হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২৪৮/৪।
২১৭. জাদুল মাসির: ৪/২৭৮।
২১৮. সুরা আত-তালাক, ৬৫: ২-৩।
২১৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/৩৭১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির আনুগত্য নেই

📄 স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির আনুগত্য নেই


তবে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সকল কিছুর ওপর প্রাধান্য দেয় এবং স্রষ্টার আনুগত্যকে সৃষ্টির আনুগত্যের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। তবেই আল্লাহ তাআলা মানুষের শাস্তি থেকে তাদের রক্ষা করেন—চাই সে মানুষ যতই শক্তিশালী হোক। অবশ্য এর আগে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবি হাকাম বিন আমর গিফারি-এর উপদেশটি শুনতে পারো:
তিনি খোরাসানের গভর্নর ছিলেন। একদিন জিয়াদ তাঁর নিকট পত্র মারফত সংবাদ পাঠালেন : আমিরুল মুমিনিন স্বর্ণ ও রৌপ্যকে বাছাই করে তার জন্য পাঠিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্বর্ণ ও রৌপ্য জনগণের মধ্যে বণ্টন করা যাবে না।

এর উত্তরে তিনি জিয়াদের উদ্দেশে লিখলেন: আপনার বার্তা আমি পেয়েছি। তবে আমিরুল মুমিনিনের বার্তার আগেই আল্লাহর বার্তা (প্রজাদের সাথে ইনসাফ করার বার্তা) এসেছে আমার নিকট। (তাই আমি আল্লাহর নির্দেশই পালন করব। এর জন্য আমার ওপর যতই বিপদ আসুক, আমি পরোয়া করি না। কেননা) আল্লাহর কসম, যদি আসমান ও জমিন একত্রিত হয়ে কোনো বান্দার পথ বন্ধ করে দেয়, সে বান্দা যদি তাকওয়াবান হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার বের হওয়ার পথ করে দেবেন। ওয়াস-সালামু আলাইক।

এরপর তিনি জনগণের উদ্দেশে বললেন, 'সকালে সবাই মাল সংগ্রহ করতে এসো।' অতঃপর তিনি জনগণের মাঝে মাল বণ্টন করে দিলেন。

এ জন্যই আয়িশা মুআবিয়া-কে চিঠির মাধ্যমে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, সর্বদা আল্লাহকে ভয় করতে হবে, এর কারণে মানুষ অসন্তুষ্ট হলেও। চিঠির ভাষা নিম্নরূপ :
'আমি আপনাকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। কেননা, যদি আপনি আল্লাহকে ভয় করেন, তাহলে মানুষের (রাগ ও অনিষ্ট) থেকে আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন। কিন্তু যদি আপনি মানুষকে ভয় করেন, তাহলে তাদের কেউই আল্লাহর (ক্রোধ ও শান্তি) থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।'

টিকাঃ
২২০. আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল উমামি ওয়াল মুলুক: ১৩/২৭৪।
২২১. আদ-দুররুল মানসুর: ৮/১৯৯-২০০।
২২২. আদ-দুররুল মানসুর: ৮/২০০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00