📄 প্রকৃত ঐশ্বর্যের আরও কিছু রূপ
প্রকৃত ঐশ্বর্যের আরেকটি রূপ হচ্ছে, নিজের আমলসমূহ এবং ইবাদতে স্তর- উন্নতির মাঝে ঐশ্বর্য অনুভব করা এবং ইবাদতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ও তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার সুখ অনুভব করা। সুতরাং যখন তুমি রাসুল -এর এ বাণীটি শুনবে :
وَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِهُدَاكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ
'আল্লাহর কসম, তোমার পথ দেখানোর মাধ্যমে কোনো একজন ব্যক্তি হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া তোমার জন্য (মহামূল্যবান) লাল উটের চেয়ে উত্তম。
তখন তোমার সামনে ধনী হওয়ার আরেকটি দরজা খুলে যাবে। তা হচ্ছে, আল্লাহর পথের দিকে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া এবং অন্ধকার ও পাপাচারের পথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা।
এরপর যখন পড়বে:
رَكْعَتَا الْفَجْرِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا
'ফজরের দুই রাকআত (সুন্নাত) দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে উত্তম।'
তখন তুমি জানবে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু বান্দা আছে, যাদের নিকট দিনের খাবার পর্যন্ত নেই, তবুও তারা ঐশ্বর্যের শীর্ষচূড়ায় বাস করে। সকালে উঠে ইবাদত করার মাধ্যমে।
যখন পড়বে :
غَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةُ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا
'আল্লাহর পথে (জিহাদের ময়দানে) এক সকাল বা এক সন্ধ্যা অতিক্রান্ত করা পৃথিবী ও তন্মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তু অপেক্ষা উত্তম।'
অথবা পড়বে :
غَدْوَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ ، أَوْ رَوْحَةٌ، خَيْرٌ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ وَغَرَبَتْ
'আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের ময়দানে) একটি সকাল অথবা সন্ধ্যা অতিক্রান্ত করা সেই (বিশ্বজাহান) অপেক্ষা উত্তম, যার ওপর সূর্য উদিত হয় এবং অস্তমিত হয়。
তখন তোমার মনে জিহাদের তামান্না জাগ্রত হবে এবং তুমি বুঝতে পারবে যে, পরিবার ও ধন-সম্পদ ব্যয় করে এই উন্নত ও সুউচ্চ সাওয়াব অর্জন না করলে নয়। কারণ, জিহাদের সাওয়াব এতটাই উন্নত ও সুউচ্চ যে, যদি তা দুনিয়াতে স্বরূপে প্রকাশ পায়, তাহলে তার বড়ত্ব ও মহানতায় ভীত ও অভিভূত হয়ে পুরো দুনিয়া বিলীন হয়ে যেত!
অথচ এই মহান সাওয়াবের জন্য সামান্যতম মূল্য পরিশোধ করতে হয় : জিহাদের ময়দানে দিনের শুরু থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অথবা সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর থেকে দিনের শেষভাগ পর্যন্ত।
এই যে অন্তরের ঐশ্বর্য, তা যে কেউ অনুভব করতে পারে না। কেবল ওই সব ব্যক্তিই তা অনুভব করতে পারেন, যাদের অন্তরসমূহে আল্লাহ তাআলা জীবন দান করেছেন। এই লোকগুলো যখন অন্যদের দেখতে পান যে, আল্লাহ তাআলা তাদের যে অনুগ্রহ দান করেছেন, তা থেকে এরা বঞ্চিত এবং ইমানি ও আত্মিক ক্ষুধার তাড়নায় জর্জরিত, তখন তারা নিজেদের ভান্ডার থেকে তাদের দান করেন। অর্থাৎ তাদেরকে প্রবৃত্তির অনুসরণ বাদ দিয়ে কল্যাণের পথে ফিরে আসার দাওয়াত দেন।
টিকাঃ
১৮৭. আল-মুসতাজরিফ فی কুল্লি ফান্নিন মুসতাতরিফ: ১/১৫১।
১৮৮. সহিহুল বুখারি: ২৯৪২, সহিহু মুসলিম: ২৪০৪, সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৬১।
১৮৯. সহিহু মুসলিম: ৭২৫।
১৯০. সহিহুল বুখারি: ৬৫৬৮, সহিহু মুসলিম: ১৮৮০।
১৯১. সহিহু মুসলিম: ১৮৮৩।
📄 দুনিয়া ও আখিরাতের পার্থক্য
আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই তোমার সামনে তাঁর অসীম রহমতের নমুনা দৃশ্যমান করেছেন। তিনি তোমাকে দান করেছেন ফলমূল, গাছগাছালি, নদীনালা ও স্বাদ-উপভোগ। এ সবগুলোই যেন জান্নাতে বয়ে চলা সুরভিত বাতাসের একটি ঝলক। যার ঘ্রাণ তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অফুরন্ত নিয়ামত ও সুমহান আনন্দের কথা। ফলে তুমি এ নিয়ামত লাভের জন্য আরও অধীর ও মরিয়া হয়ে ওঠো। অতঃপর নবিজি ﷺ কোনো মুগ্ধকর বস্তু দেখলে যা বলতেন, তুমিই তা-ই বলো :
لَبَّيْكَ إِنَّ الْعَيْشَ عَيْشُ الْآخِرَةِ
'আমি আপনার সমীপে হাজির হে রব, নিশ্চয় আসল জীবন হচ্ছে আখিরাতের জীবন。
তারপর তুমি সেই আখিরাতের জীবনকে সুন্দর ও শান্তিময় করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা, অধ্যবসায়, দৃঢ়তা ও ক্ষিপ্রতা নিয়ে এগিয়ে যাও।
দুনিয়ার নিয়ামত ও সুখ তোমাকে আখিরাতের নিয়ামত ও সুখের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুনিয়ার অসম্পূর্ণ সুখ তোমাকে আখিরাতের পূর্ণাঙ্গ সুখের প্রতি উৎসাহিত করে।
তাই দুনিয়ার কোনো প্রিয় বস্তুর নাগাল না পেলেও দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে তুমি বলতে পারো, 'এই নিয়ামত আমার জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করছে!' আর যখন তা তোমার নাগালে আসে, তখন তুমি বলো, 'দুনিয়ার নিয়ামতের চেয়ে আখিরাতের নিয়ামত আরও সুস্বাদু এবং উপভোগ্য!'
এই দুনিয়া একটি পারাপারের স্থান মাত্র। এখানে মুসাফির তার মূল গন্তব্যের জন্য কিছু পাথেয় সংগ্রহ করে নেয়, এই যা! তাই মুমিন দুনিয়ার নিয়ামতকেই চূড়ান্ত মনে করে না। পেলে ভালো, না পেলে আরও ভালো টাইপ অবস্থা! দুনিয়ার প্রতিটি নিয়ামত তাকে আখিরাতের নিয়ামতের জন্য অধীর ও মরিয়া করে তোলে। দুনিয়ার অসম্পূর্ণ নিয়ামত তাকে আখিরাতে প্রভুর সান্নিধ্যে গিয়ে পরিপূর্ণ নিয়ামত লাভের প্রতি লোভাতুর করে।
এতক্ষণ আমরা যে মনের ধনীদের কথা বললাম, তাদের বিশেষ একজন হলেন অখ্যাত সাহাবি...
টিকাঃ
১৯২. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ১৫৮০৬।