📄 ইবাদতের উদ্দেশ্য সৃষ্টির দাসত্ব থেকে নিষ্কৃতিলাভ
আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য যেসব ইবাদত প্রবর্তন করেছেন, সবগুলোর পেছনে বিভিন্ন মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তন্মধ্যে একটি উদ্দেশ্য হলো, গাইরুল্লাহর দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। রোজা সম্পর্কে মুনাবি বলেন:
'রোজা প্রবর্তিত হয়েছে প্রবৃত্তির চাহিদাকে দমানোর জন্য, পরাধীনতার উপকরণসমূহ এবং বস্তুর দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের জন্য। কেননা, মানুষ মনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বস্তুর দাসে পরিণত হয় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কহীন হয়ে যায়। রোজা গাইরুল্লাহর সেই দাসত্বকে নিঃশেষ করে দেয় এবং আকাঙ্ক্ষিত বস্তুসমূহের দাসত্ব থেকে স্বাধীনতা দান করে। স্বাধীনতা মানে সম্পদের দাস বনে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া। আল্লাহ বলেন:
قَالَ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِيكُمْ إِلَهَا وَهُوَ فَضَّلَكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ
“তিনি বললেন, তাহলে কি আল্লাহ ছাড়া তোমাদের জন্য অন্য কোনো উপাস্য অনুসন্ধান করব; অথচ তিনিই তোমাদের সারা বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।”
প্রবৃত্তি একধরনের উপাস্য। রোজা সেই উপাস্যের দাসত্ব থেকে মানুষকে নিষ্কৃতি দেয়。
টিকাঃ
১৮১. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৪০।
১৮২. ফাইজুল কাদির: ৪/২১১।
📄 তৃতীয় অর্থ: আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা
এটাই আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রকৃত ঐশ্বর্যের তৃতীয় অর্থ। যেমন কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى
'তিনি আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব, অতঃপর ধনী করেছেন।'
ফাতহুল বারি গ্রন্থে ইবনে হাজার এ আয়াতের তাফসিরে বলেন :
'আয়াতে ধনী করে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে মনের ধনী করে দেওয়া। কারণ আয়াতটি মক্কায় অবতীর্ণ। এদিকে (মদিনায় গিয়েও) খাইবার ইত্যাদি বিজয়ের পূর্বে রাসুল-এর আর্থিক অসচ্ছলতার কথা তো সবার জানা।'
সুতরাং রাসুল-এর ঐশ্বর্য প্রতিদিনের প্রয়োজন অনুপাতে খাবারের চেয়ে অতিরিক্ত সম্পদ থাকা নয়, তার ঐশ্বর্য মনের ঐশ্বর্য এবং আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ ভরসা ও নির্ভরতা। এই ঐশ্বর্য তিনি লাভ করেছেন সেই পূর্ণাঙ্গ নিয়ামতের অংশ হিসেবে, যার কথা কুরআনে এসেছে :
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।'
টিকাঃ
১৮৩. সুরা আদ-দুহা, ৯৩: ৮।
১৮৪. ফাতহুল বারি: ১১/২৭৩।
১৮৫. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ৩।
📄 পূর্ণাঙ্গ নিয়ামত মানে কী?
পূর্ণাঙ্গ নিয়ামত মানে হচ্ছে, নিয়ামত দানের পর নিয়ামতদাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না হওয়া; বরং তার সাথে সম্পর্ক অটুট থাকা।
এই ঐশ্বর্য ও ধনাঢ্যতা একমাত্র আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার ফসল। ইবনুল কাইয়িম তাঁর তরিকুল হিজরাতাইন গ্রন্থে তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন:
'যে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী, সে প্রকৃত ধনী। সে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী, সে প্রকৃত ধনী নয়। যে আল্লাহর সামনে লাঞ্ছিত, সে মানুষের সামনে সম্মানিত। যে আল্লাহর সামনে দুর্বল, সে মানুষের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী। যে আল্লাহর সামনে মূর্খ, সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী। যে নিজের প্রবৃত্তিকে অসন্তুষ্ট করে, সে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে। এসব দ্বারা প্রমাণিত হয়, আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা এবং ধনাঢ্যতা—এ দুটি এক ও অভিন্ন।'
📄 ঐশ্বর্যের উপকরণ
নেককারদের একটি দল এক জায়গায় একত্রিত হলেন। দারিদ্র্য ও ঐশ্বর্য নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা হলো।
একজন বললেন, 'ঐশ্বর্য হলো: যার একটি থাকার মতো ঘর আছে, শরীর ঢাকার মতো কাপড় আছে এবং প্রয়োজন অনুপাতে জীবিকা আছে।'
আরেকজন বললেন, 'ধনী হলো ওই ব্যক্তি, যাকে নিজের প্রয়োজনে মানুষের কাছে যেতে হয় না।'
সুলাইমান আল-খাওয়াস নীরব ছিলেন। সবাই তাকে বললেন, 'এ ব্যাপারে আপনি কিছু বলুন, হে আবু আইয়ুব!' তখন তিনি ক্রন্দন করলেন এবং বললেন,
'আমার মতে, আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বা নিরঙ্কুশ নির্ভরতাই হচ্ছে ঐশ্বর্য। প্রকৃত ধনী হলো সেই ব্যক্তি, যার অন্তর আল্লাহর প্রতি নির্ভর এবং তাঁর দানের ওপর সন্তুষ্ট থাকে; যদিও তার সকাল-সন্ধ্যা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটুক।' তাঁর কথা শুনে উপস্থিত সবাই কেঁদে দিলেন。
টিকাঃ
১৮৬. তরিকুল হিজরাতাইন ওয়া বাবুস সাআদাতাইন: ১/৩৩।