📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 দ্বিতীয় অর্থ: মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা

📄 দ্বিতীয় অর্থ: মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা


এক ব্যক্তি বসরা শহরে প্রবেশ করে বলল, 'এই শহরের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি কে?' লোকেরা হাঁসান বসরির নাম বলল। লোকটি বলল, 'কীসের বিনিময়ে তিনি পুরো শহরবাসীর মর্যাদার আসনে বসেছেন?' তারা বলল, 'সকল মানুষ তাঁর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী; কিন্তু তিনি তাদের মধ্য থেকে কারও পার্থিব সম্পদের মুখাপেক্ষী নন। '

এই অমুখাপেক্ষিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইমানি আমল এবং একটি বড় আত্মিক ইবাদত। আবু সাইদ খুদরি - এর হাদিসের মধ্যে এসেছে, রাসুল ইরশাদ করেছেন:
وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ
'আর যে অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন।'

হাদিসের অর্থ হলো : কেউ যদি কোনো কিছু অর্জন করার জন্য নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলা তাকে তা পাইয়ে দেন। সুতরাং কেউ যদি পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাআলা তাকে অভাবশূন্য করে দেন。

নবিজি আমাদের জন্য ওয়াদা দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বনকারীকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। তাঁর ওয়াদা দুভাবে পূরণ হতে পারে : হয়তো আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে ঐশ্বর্য দান করবেন; ফলে সে অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী হবে না। অথবা আল্লাহ তাআলা তাকে এ পরিমাণ রিজিক দান করবেন যে, কোনো মাখলুকের কাছে চাওয়ার প্রয়োজন হবে না তার।

সুতরাং যতটুকু করার সামর্থ্য তোমার আছে, তা করো এবং মাখলুকের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বনে আল্লাহর নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এত নিয়ামত দান করবেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে তুমি প্রয়োজনমুক্ত থাকবে।
গাইরুল্লাহর প্রতি অমুখাপেক্ষিতা প্রকৃতপক্ষে তোমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ দান। এটি আল্লাহর প্রতি তোমার দাসত্বের পূর্ণতা। এই অমুখাপেক্ষিতা ব্যতীত তুমি আল্লাহর প্রকৃত দাস হতে পারবে না।

আল্লাহর সাথে তোমার সম্পর্ক যত শক্ত হবে, মাখলুকের সাথে তোমার সম্পর্ক তত দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতাই প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্যতীত অন্য সবার প্রতি অমুখাপেক্ষিতা।

বাস্তবতা হলো, যে মানুষের প্রতি তুমি মুখাপেক্ষী হবে, সে আরও বড় ফকির। তোমাকে দান করার বা তোমার সহযোগিতা করার শক্তি তার নেই। ধনাঢ্যতার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে সেই রাজত্ব, যা কখনো নিঃশেষ হবার নয়। সে হিসেবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য ধনী শব্দটিও তার বাস্তবিক অর্থ হিসেবে মানানসই নয়। আল্লাহই একমাত্র ধনী, অন্য সবাই তাঁর প্রতি মুহতাজ, ফকির। আর মাখলুকের মধ্যে যে যত বেশি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী, সে তত বেশি ধনী। তাঁর সামনে যে যত বেশি লাঞ্ছিত, সে বান্দাদের মাঝে তত বেশি সম্মানিত। তাঁর সামনে যে যত বেশি দুর্বল, মানুষের মাঝে সেই সবচেয়ে বেশি সবল ও শক্তিশালী।

এ জন্যই জনৈক কবি বান্দার কাছে চাওয়া এবং বান্দার রবের কাছে চাওয়ার পার্থক্য তুলে ধরে বলেন :
'তুমি যে সময়ে আমার নিকট তোমার সমস্যার কথা পেশ করছ, সে সময়ে আমি স্বয়ং নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমি আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে দাঁড়িয়েছি আর বলছি, প্রভু আমার, আমি আপনার কাছে সমস্যা সমাধানের আকুতি নিয়ে এসেছি। এমন কারও দরজায় আমি দাঁড়াইনি, যেখানে বলা হয়, আজ যাও, সাহেব আজকে বিশ্রাম নিচ্ছেন।'

পর-অমুখাপেক্ষিতাই মান-মর্যাদা ও আত্মসম্মানের চাবিকাঠি। দুনিয়াবিমুখ সাধকপুরুষ হাসান বসরি তা-ই বলেছেন:
'তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মাঝে সম্মানিত থাকবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তোমাকে সমীহ করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মাল-সম্পদ তোমাকে দিতে না হয়। তুমি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু চাও, তখন তাদের দৃষ্টিতে তোমার মান কমে যাবে এবং তোমার কথা তাদের পছন্দ হবে না এবং একসময় তোমাকে তারা ঘৃণা করতে শুরু করবে。

টিকাঃ
১৬১. কবিতাটি মূলত বুরকায়ির (-অনুবাদক)।
১৬২. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২/২০৬।
১৬৩. সহিহুল বুখারি: ১৪২৭, সহিহু মুসলিম: ১০৫৩।
১৬৪. কাশফুল মুশকাল মিন হাদিসিস সহিহাইন: ৩/১২৭।
১৬৫. ১৭ নং ফায়দা: আব্দুর রহমান সাদি একটি মূলনীতি তুলে ধরেছেন যে, আল্লাহর একটি নীতি হচ্ছে, যে ব্যক্তি উপকারী বিষয় দ্বারা উপকৃত হতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা দ্বারা উপকৃত হয় না, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে একটি অপকারী বিষয়ে লিপ্ত করে দেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে মূর্তিপূজায় লাগিয়ে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা, ভয় ও আশা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার মনে গাইরুল্লাহর ভয়, ভালোবাসা ও আশা সৃষ্টি করে দেন। যে আল্লাহর আনুগত্যের পথে সম্পদ খরচ করে না, তার সম্পদ শয়তানের আনুগত্যে ব্যয়িত হয়। যে আল্লাহর সামনে অবনমিত ও বিনম্র হয় না, বান্দার সামনে তাকে নিচু ও লাঞ্ছিত হতে হয়। যে হক পরিত্যাগ করে, সে বাতিলে জড়িয়ে পড়ে। (তাফসিরুস সাদি: ১/১৮)
১৬৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২০।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তোমার প্রতি আমার কোনো প্রয়োজন নেই

📄 তোমার প্রতি আমার কোনো প্রয়োজন নেই


একদিন আহবাজের শাসক সুলাইমান বিন আলি মুহাল্লাবি নিজ সন্তানকে পড়ানোর জন্য খলিল বিন আহমাদ ফারাহিদির কাছে খবর পাঠালেন। খলিল ফারাহিদি একটি শুকনো রুটি এনে সুলাইমানের দূতকে বললেন, 'যতদিন পর্যন্ত আমার কাছে এতটুকু রুটি আছে, সুলাইমানের প্রতি আমার কোনো প্রয়োজন নেই।' দূত বললেন, 'আপনার থেকে কী বার্তা নিয়ে যাব সুলাইমানের নিকট?' তিনি বললেন :
'সুলাইমানকে বলে দাও যে, আমি তার চেয়ে বেশি সচ্ছল ও ধনী, যদিও আমার কাছে তেমন পয়সাকড়ি নেই। দরিদ্রতা থাকে মনের মধ্যে। সম্পদের মধ্যে নয়, যেমনটি আমরা মনে করি। ধনাঢ্যতা ও ঐশ্বর্যেরও একই অবস্থা। সুলাইমান তো সামান্যতম অনুদান দিতেও কার্পণ্য অনুভব করে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অনেক উদার ও বদান্য। আমি সকল প্রয়োজনের কথা তাঁকেই বলি।'

আত্মসম্মানের দিক দিয়ে বসরাবাসীর গর্ব মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-ও ঠিক খলিল ফারাহিদির মতো। তিনি শুকনো রুটি পানিতে ভিজিয়ে খেতেন এবং বলতেন, 'যে এতটুকুতে পরিতুষ্ট হয়, তার অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন নেই。

টিকাঃ
১৬৭. ১৮ নং ফায়দা : খলিল বিন আহমাদ হচ্ছেন সেই বিস্ময়কর প্রতিভাধর ব্যক্তি, যিনি কবিতার মাত্র একটি চরণে আরবি ভাষার সকল অক্ষর নিয়ে এসেছেন:
صف خلق خود كمثل الشمس إذ بزغت * يحظى الضجع بها نجلاء معطار
১৬৮. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৩/২৩৯।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 নবিজির শিক্ষা

📄 নবিজির শিক্ষা


ইমাম শাফিয়ি আলিমগণের সম্মান এবং সুলতানের চেয়ে তাদের সম্মান বেশি হওয়া নিয়ে গর্ব করে বলেন:
'পরিতুষ্টিই ঐশ্বর্যের মূল। তাই তো আমি পরিতুষ্টির আস্তিন শক্ত করে ধরে রেখেছি। সুতরাং পৃথিবীর দুয়ারে আমাকে যেতে হয় না, কারও দরবারে নিজেকে নিবেদিত করতে হয় না। ফলে টাকা-পয়সা ছাড়াই আমি ধনীদের একজন হয়ে উঠলাম এবং রাজা-বাদশাহদের মতো মানুষের ওপর হুকুম চালাই অবলীলায়।'

আপন সাহাবিদের প্রতি রাসুল -এর বিশেষ একটি শিক্ষা ছিল, কেউ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট সাহায্য চাইবে না এবং আল্লাহর সামনে নত হয়ে সিজদা করা ব্যতীত অন্য কারও জন্য কপাল মাটিতে ঠেকাবে না। আবু জার -কে তিনি কী উপদেশ দিয়েছিলেন, তা শোনো :
‘মানুষের নিকট কোনো কিছুই চাইবে না। এমনটি (বাহনের পিঠের ওপর থাকা অবস্থায়) তোমার চাবুক পড়ে গেলেও, সেটি উঠিয়ে দিতে কাউকে বলবে না। তুমি নিজে নেমে তা উঠিয়ে নেবে।'

সুবহানাল্লাহ! নবিজি আমাদের মাঝে কেমন আত্মমর্যাদাবোধ জাগাতে চেয়েছেন! সামান্য একটি বিষয়েও মানুষের কাছে সাহায্য না চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, সেখানে বড় বিষয়ে সাহায্য চাওয়ার ব্যাপারে তো প্রশ্নই আসে না!

রাসুল -এর এই শিক্ষা ধনী-গরিব, মনিব-ভৃত্য নির্বিশেষে সকল সাহাবি মনেপ্রাণে ধারণ করেছিলেন। তাই তো রাসুল -এর ভৃত্য সাওবান দ্বিধাহীনচিত্তে কারও নিকট সাহায্য না চেয়ে আত্মসম্মান ধরে রাখাকে গ্রহণ করেছিলেন, যখন রাসুল সকল সাহাবিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
مَنْ يَكْفُلُ لِي أَنْ لَا يَسْأَلَ النَّاسَ شَيْئًا، وَأَتَكَفَّلُ لَهُ بِالْجَنَّةِ؟
'কে আমাকে এ নিশ্চয়তা দেবে যে, সে মানুষের কাছে কোনো কিছু চাইবে না, বিনিময়ে আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেবো?'

উত্তরে সাওবান বলেছিলেন, 'আমি'।

এরপর থেকে সাওবান সত্যিই কখনো কারও নিকট কোনো কিছু চাননি。

মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছু না চাওয়ার ব্যাপারে রাসুল -এর হাতে যেসব সাহাবি অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আওফ বিন মালিক অন্যতম। তিনি তাঁর এক বর্ণনায় উক্ত অঙ্গীকারের ওপর সাহাবিদের অটলতার বিবরণ দিয়েছেন। বলেছেন, 'এরপর থেকে রাসুলের কোনো সাহাবির চাবুক পড়ে গেলে, সেটি তুলে দেওয়ার জন্য কাউকে বলতেন না।'

জনৈক কবি বলেন:
'তোমার ভালো কাজ দেখে যদি তোমাকে অনুদান না দেয়, তাহলে ছেড়ে দাও। এর থেকে বিরত থাকার মাঝেই নিহিত তোমার সম্পদ। কোনো আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি এমন কোনো মানুষের নিকট অনুগ্রহ চাইতে পারে না, যার সামনে নিজের আত্মমর্যাদা বিলীন করতে হয়। নিজেকে লাঞ্ছিত করে যদি কোনো অনুদান চাইতে হয়, সে অনুদান না নেওয়াই উত্তম।'

এ সম্পর্কে ইবনুল জাওজি আমাদেরকে দারুণ একটি উপদেশ উপহার দিয়েছেন তাঁর 'আল-মুদহিশ' নামক বইয়ে:
'তোমার মালিক ব্যতীত অন্য কারও নিকট কোনো কিছু চেয়ো না। কারণ, ভৃত্য মালিক ব্যতীত অন্য কারও কাছে চাওয়া মানে মালিকের বদনাম করা。

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট সাহায্য চাওয়া মানে আল্লাহকে অপমান করা। কারণ, তা কেমন যেন আল্লাহর প্রতি পরোক্ষভাবে কার্পণ্যের অভিযোগ করার মতো। তা ছাড়া এটা তোমার অজান্তেই আল্লাহর ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ হয়ে যায়। এটা তোমার ইমানের ক্ষতি তো করেই, পাশাপাশি তোমার বিবেক ও বুদ্ধিমত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। জান্নাত এমন বোকা লোকদের থেকে নিজের সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে প্রতিনিয়ত। আবু ইয়াজিদ আল-বিসতামি কেমন যেন সেই ঘোষণা শুনতে পেয়েছেন।

টিকাঃ
১৬৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/১৭৩।
১৭০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন: ১/১১৪।
১৭১. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১/৩৯-৪০।
১৭২. সহিহ মুসলিম: ২৯৬৫, মুসনাদু আহমাদ: ১৪৪৪।
১৭৩. মুসনাদু আহমাদ: ২১৫০৯।
১৭৪. সুনানু আবি দাউদ: ১৬৪৩।
১৭৫. আল-মুদহিশ: পৃ. ২৬৭।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 যদি সে সবর করে, সেটাই হবে তার জন্য অধিক কল্যাণকর!

📄 যদি সে সবর করে, সেটাই হবে তার জন্য অধিক কল্যাণকর!


তাই তো তিনি একটি দারুণ উপমার মাধ্যমে বলেন:
'মাখলুকের কাছে মাখলুকের সাহায্য প্রার্থনা করা মানে এক ডুবন্তের কাছে আরেক ডুবন্তের সাহায্য চাওয়া।'

সালিহ ও সৎকর্মশীল বান্দাদের চিন্তাচেতনা প্রায় এক রকম। এ জন্যই হয়তো আবু আব্দুল্লাহ কারশি -ও একই কথা বলেছেন :
'মাখলুকের কাছে মাখলুকের সাহায্য প্রার্থনা করা মানে এক বন্দীর নিকট আরেক বন্দীর সাহায্য চাওয়া।'

এ জন্যই ইমাম আহমাদ প্রতি নামাজের শেষে বিশেষ একটি দুআ করতেন। দুআটি তাঁর অন্তরে ঐশ্বর্যের চারা রোপণ করেছিল। দুআটি আমরা নিয়মিত পড়লে আমাদের অন্তরেও ঐশ্বর্যের চারা রোপিত হওয়ার আশা করা যায়।
'হে আল্লাহ, আপনি আমার কপালকে যেভাবে আপনি ব্যতীত অন্য কারও জন্য মাটিতে ঠেকানো থেকে বিরত রেখেছেন, সেভাবে আপনি ব্যতীত অন্য কারও কাছে চাওয়া থেকেও বিরত রাখুন।'

যদি তুমি ধৈর্য না ধরো, তাহলে লাঞ্ছিত হবে। মানুষের কাছে চাওয়ার লাঞ্ছনা ও নীচতা কেমন, তা যদি তুমি জানতে চাও, তাহলে উরওয়া বিন আজিনার ঘটনাটি শোনো। উরওয়া মদিনার বিখ্যাত একজন কবি ছিলেন। ফকিহ ও মুহাদ্দিস হিসেবেও তাকে গণনা করা হতো। একদিন তার আর্থিক অবস্থা খুবই অসচ্ছল হয়ে পড়ল। তখন আশপাশের লোকেরা তাকে পরামর্শ দিল, 'হিশাম বিন আব্দুল মালিকের সাথে আপনার বন্ধুত্ব আছে। তাই আপনি তার কাছে যান এবং খিলাফতের পক্ষ থেকে কিছু অনুদান গ্রহণ করুন।' তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ইবনে আজিনা রওনা হলেন বন্ধুর উদ্দেশে। উটের ওপর সওয়ার হয়ে তিনি পৌঁছে গেলেন সুদূর শামে। তারপর হিশামের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। হিশাম তার বন্ধুকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। উরওয়া জানালেন, তিনি অভাব-অনটনের মধ্যে আছেন। তখন তাকে উদ্দেশ্য করে হিশাম বললেন, 'একটি কবিতায় তুমিই তো বলেছিলে :
"আমি একজন জ্ঞানী মানুষ, অপচয়-অপব্যয় আমার স্বভাবের মধ্যে নেই। রিজিকের জন্য আমি অমানুষিক কষ্ট করি না। কারণ, যে রিজিক আমার জন্য বরাদ্দ, তা আমার নিকট পৌঁছাবেই। এখন তার জন্য যদি আমি চেষ্টা করি, তাহলে কষ্টের বিনিময়ে তা আমার কাছে আসবে। কিন্তু আমি যদি বসে থাকি, তাহলে কষ্ট ছাড়াই তা আমার কাছে এসে পৌঁছাবে।"

আমি তো তোমার কথা ও কাজে মিল দেখতে পাচ্ছি না। কেননা, তুমি রিজিকের তালাশে কষ্ট করে সুদূর মদিনা থেকে শামে চলে এসেছ!'

উরওয়া বললেন, 'তুমি আমাকে দারুণ এক উপদেশ দিয়েছ বন্ধু। তুমি আমাকে সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছ, যা থেকে আমি অনেক দিন যাবৎ বিস্মৃত ছিলাম।' এই বলে তিনি তাৎক্ষণিক বাহনের ওপর সওয়ার হয়ে হিজাজে চলে আসলেন। সেদিন রাতে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার পর হিশামের উরওয়ার কথা মনে পড়ল। তখন মনে মনে বললেন, 'কুরাইশের একজন ব্যক্তি হিকমতের সাথে তোমার কাছে কিছু চাইতে আসলো, আর তুমি তার অভাব সত্ত্বেও তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছ! তা ছাড়া সে একজন কবি, কখন কী বলে বসে, তার নিশ্চয়তা নেই!'

পরদিন সকালে হিশাম উরওয়ার ব্যাপারে খোঁজ নিলে তাকে বলা হলো, তিনি চলে গেছেন। হিশাম বললেন, 'অসুবিধা নেই, এখন সে জানবে যে, তার রিজিক তার কাছে অচিরেই আসবে।' অতঃপর তিনি গোলামকে ডাকলেন এবং তাকে দুই হাজার দিনার দিয়ে বললেন, 'এখনই ইবনে আজিনার সাথে দেখা করে এগুলো তাকে দিয়ে আসো।'

গোলাম বলেন, আমি তার নিকট পৌঁছানোর পূর্বেই তিনি বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমি তার দরজার কড়া নাড়লাম। তিনি বের হলে হিশামের দেওয়া দিনার তার হাতে তুলে দিলাম। সেগুলো হাতে নেওয়ার পর তিনি বললেন, 'আমিরুল মুমিনিনকে আমার কথাটি পৌঁছে দিয়ো:
"আমি রিজিকের জন্য কষ্ট করেছি, তাই আমাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু যখন আমি বাড়িতে ফিরে আসলাম, তখন আমার রিজিক আমার কাছে এসে গেছে!"

সুবহানাল্লাহ! তিনি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের কাছে রিজিক চাইতে গিয়ে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হলেন। যদি তিনি ধৈর্য ধরতেন এবং যা আছে তার ওপর পরিতুষ্ট থাকতেন, তাহলে একসময় রিজিক তার বাড়িতে চলে আসত। যেমনটি তিনি নিজ কবিতার মধ্যেই বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তার নিজের কথার ওপর অটল থাকতে পারেননি। যদি তিনি উবাইদ বিন আবরাস যা শিখেছেন তা শিখতেন, তাহলে সেটাই তার জন্য কল্যাণকর হতো। উবাইদ বিন আবরাসের সেই শিক্ষাটি হলো :
'যে মানুষের কাছে চায়, মানুষ তাকে বঞ্চিত করে। কিন্তু যে আল্লাহর কাছে চায়, তাকে খালি হাতে ফিরতে হয় না।'

ইবনে রজব ঠিক এ কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন নিচের বাক্যে :
'যে মানুষের কাছ থেকে তাদের টাকা-পয়সা চায়, মানুষ তাকে অপছন্দ করে এবং তার প্রতি একপ্রকার ঘৃণা চলে আসে তাদের মনে। কারণ, টাকা-পয়সা বনি আদমের খুবই প্রিয় বস্তু। তাই কেউ তাদের প্রিয় বস্তু নিয়ে নিতে চাইলে খারাপ তো লাগবেই!'

টিকাঃ
১৭৬. ফাতাওয়া ইবনি তাইমিয়া: ১/৩৩০।
১৭৭. ফাতাওয়া ইবনি তাইমিয়া: ১/৪৮৪।
১৭৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৪৮৪।
১৭৯. সামারাতুল আওরাক : ১/৮ (ঈষৎ পরিবর্তিত)।
১৮০. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ২/২০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00