📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 গাইরুল্লাহর দাসত্বের লাঞ্ছনা

📄 গাইরুল্লাহর দাসত্বের লাঞ্ছনা


সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ইরশাদ করেছেন :
تَعِسَ عَبْدُ الدِّيْنَارِ، وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ، وَعَبْدُ الْخَمِيْصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيْكَ فَلَا انْتَقَشَ
'ধ্বংস হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম ও উত্তম পোশাক- আশাক ও উত্তম চাদরের গোলাম (দুনিয়াদার)! যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। সে ধ্বংস হোক, তার অবস্থা আরও খারাপ হোক! তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ বের না করুক!

দাসত্ব মানে কোনো বস্তুর সামনে নিচু ও লাঞ্ছিত হওয়া। সুতরাং দুনিয়ার দাস হওয়া মানে নিজের মনকে দুনিয়ার সামনে অবনমিত ও অনুগত করে দেওয়া। ফলে রিজিক অনুসন্ধানের জন্য সে যেকোনো হীনতা ও লাঞ্ছনার পথে চলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এমনকি হারাম উপায়ে রিজিক অনুসন্ধান করতেও দ্বিধাবোধ করে না সে।

আবু আলি আদ-দাক দাসত্বের যে অর্থ করেছেন, তা দাসত্বের অর্থকে আরও ব্যাপক ও স্পষ্টভাবে বোঝায়। তিনি বলেন:
'তুমি তারই গোলাম, যার হাতে তুমি বন্দী। সুতরাং তুমি যদি নিজের প্রবৃত্তির কাছে বন্দী হয়ে থাকো, তাহলে তুমি নিজের প্রবৃত্তির গোলাম। আর যদি দুনিয়ার হাতে বন্দী হয়ে থাকো, তাহলে তুমি দুনিয়ার গোলাম।'

উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যা:
হাদিসে দিনার, দিরহাম, উত্তম পোশাক-আশাক ও উত্তম চাদর- প্রত্যেকটিকে কেবল একটি অর্থে আনা হয়নি; বরং প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা অর্থ আছে। দিনার বলা হয় স্বর্ণের মুদ্রাকে এবং দিরহাম বলা হয় রুপার মুদ্রাকে। আগের যুগে মানুষ স্বর্ণ ও রুপার তৈরি মুদ্রা দিয়ে পরস্পর লেনদেন করত। দিনার ও দিরহাম দ্বারা হাদিসে মানুষের মাঝে সাধারণভাবে পরিচিত সম্পদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। দুনিয়ালোভী সম্পদশালীদের মধ্যে আবার তারতম্য আছে। কেউ কেউ অঢেল সম্পত্তির অধিকারী হয়, অধিক জমিজমা ও মালামালের মালিক হয়। হাদিসের এ ধরনের ধনীকে 'দিনারের গোলাম' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেউ কেউ কম সম্পদের মালিক হয়, তবে দ্রুতগতিতে যেকোনো সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে টাকা-পয়সা কামিয়ে ধনী হওয়ার সুতীব্র বাসনা নিয়ে দিনাতিপাত করে। হাদিসে তাদের 'দিরহামের গোলাম' বলা হয়েছে।

আর 'পোশাক-আশাকের গোলাম' বলে রেশম ও উলেন ইত্যাদি দ্বারা তৈরি আড়ম্বরপূর্ণ ও গৌরবময় পোশাক যারা পরে, তাদের বোঝানো হয়েছে। কারণ, যারা এ ধরনের পোশাক পরিধানে অভ্যন্ত, তারা এ অভ্যাস সহজে ছাড়তে পারে না। যেন তারা পোশাক-আশাক ও চাকচিক্যময় বেশভূষার গোলামে পরিণত হয়। তাদের মনজুড়ে কেবল ঘুরতে থাকে উন্নত ও জাঁকালো পোশাক-আশাকের ফিকির ও কল্পনা। এ জন্যই জনৈক সালাফ পোশাকের ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে বলেন:
'ওই কাপড় পরিধান করো, যে কাপড় তোমার সেবা করে। এমন কাপড় পরিধান করো না, যার সেবা তোমাকে করতে হয়। '

আর 'চাদরের গোলাম' বলে হাদিসে ওই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে নিজের এবং বাড়ির আসবাবপত্রকে অপ্রয়োজনীয় সুন্দর ও জাঁকজমকপূর্ণ করার জন্য চেষ্টা করতে থাকে এবং উত্তরোত্তর সুন্দর ও আড়ম্বরপূর্ণ করার ফিকিরে থাকে।

অতঃপর রাসুল এমন বান্দার অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন:
إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ،
যদি তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে সন্তুষ্ট হয়। আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। '

অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা তাকে সম্পদ দান করেন, তখন সে আনন্দিত ও সন্তুষ্ট হয়। আর যখন তাকে সম্পদ দান না করেন এবং দরিদ্রতা দিয়ে পরীক্ষা করেন, তখন সে রাগান্বিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার পবিত্র এই বাণীটি তার সাথে হুবহু মিলে যায় :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ
'মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তবে ইবাদতের ওপর কায়িম থাকে এবং যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়。

এ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়িম বলেন:
'এসব লোক, যাদের দান করা হলে সন্তুষ্ট হয়, দান করা না হলে অসন্তুষ্ট হয়, তাদেরকে উল্লিখিত বস্তুসমূহের গোলাম বলে আখ্যায়িত করেছেন রাসুল । কারণ, তারা সেগুলোর প্রতি ভীষণভাবে ভালোবাসা, লোভ ও আগ্রহ লালন করে। আর মানুষ যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো বস্তুর প্রতি এতটা আসক্ত হয়ে পড়ে যে, তা পেলে সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে অসন্তুষ্ট হয়, সেটা ওই বস্তুর প্রতি তার দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। যে পরিমাণ আসক্তি, সে পরিমাণ দাসত্ব。

এরপর রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'সে ধ্বংস হোক, তার অবস্থা আরও খারাপ হোক!' অর্থাৎ সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, ধ্বংস হোক! কেননা, সে নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। মণিমাণিক্যের বিনিময়ে সে কিনে নিয়েছে মৃৎপাত্র। তা সত্ত্বেও সে দুনিয়া থেকে কেবল তা-ই অর্জন করতে পারবে, যা তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বরাদ্দ আছে। এই মানুষ মহামূল্যবান বস্তুর বিনিময়ে অতি তুচ্ছ ও নগণ্য বস্তু ক্রয় করে নিয়েছে। মানুষের মাঝে বুদ্ধিশুদ্ধি বলে কিছু না থাকলেই কেবল এমনটি করা সম্ভব!

বস্তুত এটাই আল্লাহর নিয়ম, কেউ অবৈধ পথে সুখ তালাশ করলে তাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সুখ থেকে বঞ্চিত রাখেন। বরং সুখের বদলে তার জীবনে ভরে দেন দুঃখ-দুর্দশা। কারণ, সে রবের দেখিয়ে দেওয়া পথ বাদ দিয়ে অন্য পথে সুখের অনুসন্ধান করেছে। ফলে যে পথে সুখ আছে মনে করে সে পা বাড়িয়েছে, সেখানে আল্লাহ তাআলা সুখের বদলে দুঃখ রেখে দিয়েছেন।

'তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ বের না করুক!'
রাসুল এ ব্যক্তির জন্য বদ-দুআ করতে করতে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বললেন যে, তার পায়ে যদি কোনো কাঁটা বিদ্ধ হয়, তা যেন কোনো ছেনি ইত্যাদি দিয়ে তুলে নেওয়া সম্ভব না হয়! অর্থাৎ সে যদি কোনো বিপদে পড়ে, তাকে উদ্ধার করার জন্য কেউ এগিয়ে না আসুক এবং তার প্রতি কোনো মানুষের মনে দয়ার উদ্রেক না হোক! কারণ দুঃখগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি কেউ দয়ার্দ্র হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিলে দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়। কিন্তু রাসুল চাইছেন, এ ব্যক্তির কপালে এতটুকু সহানুভূতিও না জুটুক! বরং তার দুঃখ দেখে তার শত্রুরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে তার কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিক। হাদিসে বিশেষভাবে কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার কথা বলার কারণ হলো, সাধারণত এমন ছোট বিপদে মানুষ সহজেই পাশে এসে দাঁড়ায়। যখন এমন সহজ বিপদেও কারও পাশে আসাকে না করা হচ্ছে, তাহলে বড় বিপদে পাশে আসার তো প্রশ্নই আসে না!

এখন তোমার ইখতিয়ার। তুমি চাইলে এককভাবে আল্লাহর বান্দা হতে পারো, অথবা চাইলে তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করতে পারো! চাইলে তুমি স্বাধীন থাকতে পারো, অথবা চাইলে প্রবৃত্তি ও মনোবাসনার গোলাম হয়ে থাকতে পারো!

টিকাঃ
১৪৯. সহিহুল বুখারি: ২৮৮৭।
১৫০. আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা: ২/৩৪৮।
১৫১. ফাতাওয়া ইবনি তাইমিয়া: ১০/৫৯৭।
১৫২. সহিহুল বুখারি: ২৮৮৭।
১৫৩. সুরা আল-হাজ, ২২: ১১।
১৫৪. সহিহ বুখারিতে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, (মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে।): কোনো ব্যক্তি মদিনায় আগমন করত, অতঃপর তার স্ত্রী যদি পুত্র-সন্তান প্রসব করত এবং তার ঘোড়া বাচ্চা দিত, তখন বলত, "এ দ্বীন ভালো।" আর যদি তার স্ত্রী থেকে পুত্র-সন্তান না জন্মাত এবং তার ঘোড়াও বাচ্চা না দিত, তখন বলত, “এটা মন্দ দ্বীন."
১৫৫. ইগাসাতুল লাহফান মিন মাকাইদিশ শাইতান: ২/১৪৯।
১৫৬. মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ: ৮/২৯-৩২।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ঐশ্বর্যের তিন মেরুদণ্ড

📄 ঐশ্বর্যের তিন মেরুদণ্ড


এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস-এর নিকট এসে প্রশ্ন করলেন, 'আমরা কি গরিব মুহাজির নই?'
-তোমার কি স্ত্রী আছে, যার সাথে তুমি সঙ্গম করতে পারো?
-হ্যাঁ, আছে।
-তোমার কি একটি বাসস্থান আছে, যেখানে তুমি বসবাস করতে পারো?
-জি, আছে।
-তাহলে তুমি ধনীদের একজন।
-আমার একটা খাদিমও আছে!
-তাহলে তুমি একজন বাদশাহ!

আব্দুল্লাহ রাসুল-এর নিম্নোক্ত হাদিসের ওপর আমল করেই এমন মন্তব্য করেছেন:
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا

'তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে একদিনের খাবার আছে, তাকে যেন দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে。

এ বিষয়টি কেবল তারাই বুঝতে পারে, যাদের মাঝে তাকওয়া ও বিবেকের সমন্বয় ঘটেছে। যাদের হৃদয় জীবিত এবং যাদের ভেতরে ইমানওয়ালা অন্তর্দৃষ্টি আছে, কেবল তারাই তা অনুধাবন করতে পারে। ফলে দুনিয়ার কোনো আসবাব বা স্বাদ থেকে বঞ্চিত হলে তাদের মন অস্থির হয়ে যায় না। তারা জানে যে, সুখী ব্যক্তি সাধারণ মানুষ যা খায়, তার চেয়ে বেশি খায় না এবং অন্যান্য মানুষের চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হয়েছে বলে সে সুখী হয় না। বরং তার সুখের রহস্য হলো, অন্যান্য মানুষ যেখানে অধিক পেলেও তুষ্ট হতে পারে না, সেখানে সে অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। জনৈক দার্শনিককে প্রশ্ন করা হলো, 'ঐশ্বর্য কী?' তিনি উত্তর দিলেন, 'ঐশ্বর্য হলো তোমার আশা-আকাঙ্ক্ষা কম হওয়া এবং যতটুকুতেই তোমার চলে, ততটুকুর ওপর পরিতুষ্ট হওয়া。

অলংকারপূর্ণ ভাষায় রাফিয়ি বলেন:
'নিশ্চিন্ত ও অস্থিরতামুক্ত হৃদয়ে অধিক সম্পদের ফিকির থাকে না। আর যে অন্তরে অধিক সম্পদের ফিকির থাকে না, সে অন্তর অল্প পরিমাণ সম্পদ নিয়েও বেশি সুখী হয়।'

সেই সুখী কাফেলারই একজন সুখের আতিশয্যে আবৃত্তি করেন :
'আমার কুঁড়েঘর আমার কাছে খলিফা ও উজিরের রাজপ্রাসাদের চেয়ে প্রিয়। যখন আমি এক টুকরো রুটি খেয়ে পুকুর থেকে পানি পান করি, তখন মনে হয় আমার চেয়ে সুখী এ তল্লাটে আর কেউ নেই, যেন আমিই খলিফা! খলিফার সুখ অনুভব করার জন্য আমাকে সুউচ্চ সিংহাসনে আরোহণ করার কোনোই প্রয়োজন নেই। পরিমাণে অল্প আহার্য যদি স্বচ্ছ ও যথেষ্ট হয়, তাহলে বেশির কোনো প্রয়োজন থাকে না।'

টিকাঃ
১৫৭. আত-তারগিব ওয়াত তারহিব ৪/৭৮।
১৫৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৬, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৪১, আল-আদাবুল মুফরাদ: ৩০০।
১৫৯. ফাইজুল কাদির: ৪/২৮২।
১৬০. ওয়াহইয়ুল কলাম: ১/২৮।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী

📄 গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী


তবে যে পরিতুষ্টির কথা এখানে বলা হয়েছে, সেটা সেই নিন্দিত পরিতৃষ্টি এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া নয়, যার ব্যাপারে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি পরিতুষ্টিকে পেশা বানিয়ে নিয়েছে, সে দুর্বলতার লেপে মুড়িয়ে যায় এবং উত্তম ও উন্নত বিষয় থেকে সব সময় বঞ্চিত থাকে।' মানুষকে ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে ঠেলে দেওয়া এ পরিতুষ্টি সম্পর্কে জনৈক সালাফ বলেন, 'পরিতুষ্টি হলো দুর্বল ও অশীতিপর বৃদ্ধা মহিলার স্বভাব।' রাফিয়ি এটাকে চতুষ্পদ জন্তু- জানোয়ারের স্বভাব বলে আখ্যায়িত করেছেন:
'বিছানার ওপর সে আমার দৃঢ়তা ও অস্থিরতার আধিক্য দেখতে পেয়েছে। তাই বলল, “তুমি তো সাহসিকতার মূর্তপ্রতীক, বীরপুরুষ। অল্পতে তুষ্ট হতে পারো না?” বললাম, "অল্পতে তুষ্ট হওয়া তো চতুষ্পদ জন্তুর স্বভাব।”

কবিসম্রাট আহমাদ শাওকিও এই পরিতুষ্টির নিন্দা করেছেন এবং এর বিপরীতে যে উচ্চ মনোবাসনা আছে, সেটার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন:
'পরিতুষ্ট যুবকদলের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। উচ্চ আকাঙ্ক্ষা লালনকারী যুবকদের মোবারকবাদ জানাই।'

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 দ্বিতীয় অর্থ: মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা

📄 দ্বিতীয় অর্থ: মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা


এক ব্যক্তি বসরা শহরে প্রবেশ করে বলল, 'এই শহরের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি কে?' লোকেরা হাঁসান বসরির নাম বলল। লোকটি বলল, 'কীসের বিনিময়ে তিনি পুরো শহরবাসীর মর্যাদার আসনে বসেছেন?' তারা বলল, 'সকল মানুষ তাঁর জ্ঞানের মুখাপেক্ষী; কিন্তু তিনি তাদের মধ্য থেকে কারও পার্থিব সম্পদের মুখাপেক্ষী নন। '

এই অমুখাপেক্ষিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইমানি আমল এবং একটি বড় আত্মিক ইবাদত। আবু সাইদ খুদরি - এর হাদিসের মধ্যে এসেছে, রাসুল ইরশাদ করেছেন:
وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ
'আর যে অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন।'

হাদিসের অর্থ হলো : কেউ যদি কোনো কিছু অর্জন করার জন্য নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলা তাকে তা পাইয়ে দেন। সুতরাং কেউ যদি পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাআলা তাকে অভাবশূন্য করে দেন。

নবিজি আমাদের জন্য ওয়াদা দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বনকারীকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। তাঁর ওয়াদা দুভাবে পূরণ হতে পারে : হয়তো আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে ঐশ্বর্য দান করবেন; ফলে সে অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী হবে না। অথবা আল্লাহ তাআলা তাকে এ পরিমাণ রিজিক দান করবেন যে, কোনো মাখলুকের কাছে চাওয়ার প্রয়োজন হবে না তার।

সুতরাং যতটুকু করার সামর্থ্য তোমার আছে, তা করো এবং মাখলুকের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা অবলম্বনে আল্লাহর নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এত নিয়ামত দান করবেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে তুমি প্রয়োজনমুক্ত থাকবে।
গাইরুল্লাহর প্রতি অমুখাপেক্ষিতা প্রকৃতপক্ষে তোমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ দান। এটি আল্লাহর প্রতি তোমার দাসত্বের পূর্ণতা। এই অমুখাপেক্ষিতা ব্যতীত তুমি আল্লাহর প্রকৃত দাস হতে পারবে না।

আল্লাহর সাথে তোমার সম্পর্ক যত শক্ত হবে, মাখলুকের সাথে তোমার সম্পর্ক তত দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতাই প্রকৃতপক্ষে তিনি ব্যতীত অন্য সবার প্রতি অমুখাপেক্ষিতা।

বাস্তবতা হলো, যে মানুষের প্রতি তুমি মুখাপেক্ষী হবে, সে আরও বড় ফকির। তোমাকে দান করার বা তোমার সহযোগিতা করার শক্তি তার নেই। ধনাঢ্যতার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে সেই রাজত্ব, যা কখনো নিঃশেষ হবার নয়। সে হিসেবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য ধনী শব্দটিও তার বাস্তবিক অর্থ হিসেবে মানানসই নয়। আল্লাহই একমাত্র ধনী, অন্য সবাই তাঁর প্রতি মুহতাজ, ফকির। আর মাখলুকের মধ্যে যে যত বেশি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী, সে তত বেশি ধনী। তাঁর সামনে যে যত বেশি লাঞ্ছিত, সে বান্দাদের মাঝে তত বেশি সম্মানিত। তাঁর সামনে যে যত বেশি দুর্বল, মানুষের মাঝে সেই সবচেয়ে বেশি সবল ও শক্তিশালী।

এ জন্যই জনৈক কবি বান্দার কাছে চাওয়া এবং বান্দার রবের কাছে চাওয়ার পার্থক্য তুলে ধরে বলেন :
'তুমি যে সময়ে আমার নিকট তোমার সমস্যার কথা পেশ করছ, সে সময়ে আমি স্বয়ং নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমি আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে দাঁড়িয়েছি আর বলছি, প্রভু আমার, আমি আপনার কাছে সমস্যা সমাধানের আকুতি নিয়ে এসেছি। এমন কারও দরজায় আমি দাঁড়াইনি, যেখানে বলা হয়, আজ যাও, সাহেব আজকে বিশ্রাম নিচ্ছেন।'

পর-অমুখাপেক্ষিতাই মান-মর্যাদা ও আত্মসম্মানের চাবিকাঠি। দুনিয়াবিমুখ সাধকপুরুষ হাসান বসরি তা-ই বলেছেন:
'তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মাঝে সম্মানিত থাকবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তোমাকে সমীহ করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মাল-সম্পদ তোমাকে দিতে না হয়। তুমি যদি তাদের কাছ থেকে কিছু চাও, তখন তাদের দৃষ্টিতে তোমার মান কমে যাবে এবং তোমার কথা তাদের পছন্দ হবে না এবং একসময় তোমাকে তারা ঘৃণা করতে শুরু করবে。

টিকাঃ
১৬১. কবিতাটি মূলত বুরকায়ির (-অনুবাদক)।
১৬২. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২/২০৬।
১৬৩. সহিহুল বুখারি: ১৪২৭, সহিহু মুসলিম: ১০৫৩।
১৬৪. কাশফুল মুশকাল মিন হাদিসিস সহিহাইন: ৩/১২৭।
১৬৫. ১৭ নং ফায়দা: আব্দুর রহমান সাদি একটি মূলনীতি তুলে ধরেছেন যে, আল্লাহর একটি নীতি হচ্ছে, যে ব্যক্তি উপকারী বিষয় দ্বারা উপকৃত হতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা দ্বারা উপকৃত হয় না, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে একটি অপকারী বিষয়ে লিপ্ত করে দেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে মূর্তিপূজায় লাগিয়ে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা, ভয় ও আশা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার মনে গাইরুল্লাহর ভয়, ভালোবাসা ও আশা সৃষ্টি করে দেন। যে আল্লাহর আনুগত্যের পথে সম্পদ খরচ করে না, তার সম্পদ শয়তানের আনুগত্যে ব্যয়িত হয়। যে আল্লাহর সামনে অবনমিত ও বিনম্র হয় না, বান্দার সামনে তাকে নিচু ও লাঞ্ছিত হতে হয়। যে হক পরিত্যাগ করে, সে বাতিলে জড়িয়ে পড়ে। (তাফসিরুস সাদি: ১/১৮)
১৬৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00