📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 প্রথম অর্থ: পরিতুষ্টি

📄 প্রথম অর্থ: পরিতুষ্টি


প্রকৃত ও ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি পূর্ণ আত্মনিয়োগ করলে, বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অন্তরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে দেন এবং অভাব-অনটন দূর করে দেন। তাই তো অনেক মানুষ কুঁড়েঘরে বাস করেও সুখের সমুদ্রে অবগাহন করে। যে সময় অট্টালিকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের সাথে দুঃখ-দুর্দশা ও অভাববোধ আঠার মতো লেগে থাকে। কারণ, আল্লাহই একমাত্র সত্তা, যিনি কলবের ঐশ্বর্যের মতো অধরা নিয়ামত দান করতে পারেন, যে নিয়ামত প্রাপ্ত হলে মানুষের মনের অভাববোধ ও ক্ষুধা দূরীভূত হয়ে যায়। মনে অনুভূত হয় ঐশ্বর্য ও পরিতুষ্টি। আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্তা এমন নিয়ামত দান করতে পারে না। এখানে আমরা যে বিষয়টিকে ঐশ্বর্য ও ধনাঢ্যতা বলেছি, রাসুল সেটাকে আরও স্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন :
لَيْسَ الغِنَى عَنْ كَثْرَةِ العَرَضِ، وَلَكِنَّ الغِنَى غِنَى النَّفْسِ
'বিষয়-সম্পদের আধিক্য প্রকৃত ধনবত্তা নয়, প্রকৃত ধনবত্তা হলো অন্তরের ধনবত্তা। '

হাদিসে বিষয়-সম্পদের জন্য আরবি শব্দ ব্যবহার করেছেন 'আরদ'-যার ধাতুগত অর্থ হচ্ছে, ক্ষণস্থায়ী হওয়া। বিষয়-সম্পদ যেহেতু আজ আছে কাল নেই টাইপের, তাই এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, মনের ঐশ্বর্য হলো স্থায়ী ঐশ্বর্য, যা মৃত্যুঅবধি বান্দার সঙ্গ ছাড়ে না।

নবিজি আরেকটি হাদিসে কথাটি আরও জোর দিয়ে বলেছেন; যেন সাহাবিদের মনে তা ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়। যাতে জীবনের সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা ও সংকীর্ণতা-যেকোনো মুহূর্তে তাঁদের অন্তর থেকে বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে না যায়। হাদিসটির ভাষা নিম্নরূপ :
নবিজি একদিন আবু জার গিফারি -কে বললেন, 'আবু জার, তুমি কি সম্পর্দের আধিক্যকে ঐশ্বর্য মনে করো?' আবু জার বললেন, 'জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ।' রাসুল বললেন, 'তাহলে তুমি সম্পদ কম হওয়াকে দারিদ্র্য মনে করো?' আবু জার বললেন, 'জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ্।' রাসুল বললেন,
إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى الْقَلْبِ وَالْفَقْرُ فَقْرُ الْقَلْبِ
'প্রকৃত ঐশ্বর্য হলো মনের ঐশ্বর্য এবং প্রকৃত দারিদ্র্য হলো মনের দারিদ্র্য।'

অতঃপর আরও বিস্তারিত ও স্পষ্ট ভাষায় রাসুল ইরশাদ করেন :
مَنْ كَانَ الْغِنَى فِي قَلْبِهِ لَا يَضُرُّهُ، مَا لَقِيَ مِنَ الدُّنْيَا، وَمَنْ كَانَ الْفَقْرُ فِي قَلْبِهِ، فَلَا يُغْنِيهِ مَا أَكْثَرَ لَهُ فِي الدُّنْيَا، وَإِنَّمَا يَضُرُّ نَفْسَهُ شُحُها
'যার হৃদয়ে ধনবত্তা থাকে, দুনিয়ার কোনো বঞ্চনা তার ক্ষতি করতে পারে না। আর যার হৃদয়ে দরিদ্রতা থাকে, দুনিয়ার ধনাধিক্য তাকে অভাবমুক্ত করতে পারে না। আসলে হৃদয়ের কার্পণ্যই তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।'

হাদিসের ব্যাখ্যা : অভাবমুক্ত থাকাই হলো প্রকৃত ঐশ্বর্য বা ধনাঢ্যতা। অভাব মানে হচ্ছে, তুমি কোনো বস্তুর কামনা করছ; কিন্তু তা পাচ্ছ না। অনেক কোটিপতি ও ধনকুবের, যদি তার মাঝে লোভ-লালসা বেশি হয়, সে ঐশ্বর্যের গুণ অর্জন করতে পারে না। তার দরিদ্রতা কখনো দূরীভূত হয় না। কারণ, তার লোভের কারণে সে কখনো অভাবমুক্ত হয় না। সে যতই সম্পদ অর্জন করুক, আরও বেশির লালসা তার মাঝে অভাবকে সর্বদা জিইয়ে রাখে। তার অন্তর পূর্ণ হয়ে থাকে লালসার আগুনে, যা তার সকল সম্পত্তি ও নিয়ামতকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

এ জন্যই আবু হাতিম আল-বাস্তি বলেন, 'পরিতুষ্টির স্থান হৃদয়। যার অন্তর ধনী হয়, তার হাতও ধনী হয়। আর যার অন্তর দরিদ্র হয়, তার সম্পদের আধিক্য তার কোনো উপকার করতে পারে না।'

এ জন্যই আবুল আতাহিয়া সুন্দর ও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, 'লোভ কখনো বৃদ্ধ হয় না এবং অন্তরে ক্ষুধা কখনো নিবারিত হয় না।' মানুষের মনের অবস্থার যথাযথ বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন:
'আমার মাথার চুল পেকে গেছে; কিন্তু লোভের ওপর আদৌ ছাপ পড়েনি বার্ধক্যের। অথচ লোভই দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি ক্লান্তকর পরিশ্রম করে। আমার অবস্থা হলো, যখন আমি কোনো স্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে করতে তা পেয়ে যাই, তখনও তা নিয়ে তৃপ্ত হতে পারি না। মন আমার উথলা হয়ে ওঠে অন্য স্তরে গিয়ে পৌঁছানোর জন্য।'

সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস নিজ সন্তান উমরকে ধনাঢ্যতা সম্পর্কে উপদেশ দিয়ে বলেন:
'বৎস আমার, যদি তুমি ধনাঢ্যতা অনুসন্ধান করো, পরিতুষ্টির সাথে তা অনুসন্ধান করো। কারণ, তোমার মাঝে যদি পরিতুষ্টি না থাকে, তাহলে সম্পদ তোমার কোনো কাজে আসবে না।'

সুতরাং পরিতুষ্টিই ধনাঢ্যতা এবং লোভই দরিদ্রতা। লোভ-লালসা ও পরিতুষ্টি পরস্পর বিরোধী। এক খুতবার মধ্যে উমর সুন্দরভাবে তা উপস্থাপন করেছেন:
'তোমাদের অবশ্যই জানা উচিত যে, লোভ আর দরিদ্রতা একই জিনিস, মাখলুকের প্রতি আশাহীনতা এবং ধনাঢ্যতা অভিন্ন বস্তু। মানুষ যখন কোনো বিষয়ের প্রতি আশাহীন হয়, তার প্রতি সে অমুখাপেক্ষী থাকে।'

সৎকর্মশীল বন্ধুরা, লোভ কত নিন্দনীয় বিষয় এবার বুঝতে পেরেছ তো? আবুল আব্বাস মুরসি লোভ নিয়ে দারুণ মজার একটি বিষয় উদঘাটন করেছেন। তা হচ্ছে, আরবিতে লোভের প্রতিশব্দ হচ্ছে (طمع) , যার মধ্যে তিনটি অক্ষর আছে : ع م ط তিনোটাই পেটওয়ালা হরফ। যেন শব্দটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, যার মাঝে তমা' বা লোভ আছে, তার পেট কখনো পরিতৃপ্ত হবে না। জনৈক কবি বলেন:
'লোভ-লালসা পরিত্যাগ করা যুবকের সম্মান, লোভ-লালসা তার অসম্মান।'

এটি এমন এক অসম্মান ও লাঞ্ছনা, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে কখনো আলাদা হয় না। সাররাদুর যেমনটি বলেছেন:
'মানুষ লাঞ্ছিত ও নিচু হয়ে থাকে নিজের লোভের সামনে, যেভাবে ভৃত্য লাঞ্ছিত ও নিচু হয়ে থাকে মনিবের সামনে।'

যেভাবে ভৃত্য তার মনিবের সকল নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, কোনোরূপ অবাধ্যতা করে না, ঠিক সেভাবে লোভের দাসও তার লোভ-লালসার সকল নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এবং দাসত্বের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দেয়। এই দাসত্ব সম্পর্কে আরব্য কবি আবুল আতাহিয়া বলেন:
'আমি আমার লোভের আনুগত্য করেছি, বিনিময়ে সে আমাকে তার দাস বানিয়ে নিয়েছে। যদি আমি লোভের বশ্যতা স্বীকার না করে পরিতুষ্টি অবলম্বন করতাম, তাহলে আজ আমি স্বাধীন হতাম।'

এটা স্বেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া এক দাসত্ব। চরম লাঞ্ছনা ও অসম্মানজনক বন্দিত্বও বটে। সুতরাং যে ব্যক্তি লোভের কাছে বন্দী, সে যতই সম্পদশালী হোক, কখনো ধনী হতে পারে না। কেননা :
* ওই ব্যক্তি কি ধনী হতে পারে, যার মাঝে পরিতুষ্টি নেই এবং মানুষের সম্পদের প্রতি যে লালায়িত?
* ওই ব্যক্তি কি ধনী হতে পারে, যে সব সময় মজাদার খাবার, টাটকা ফল এবং দামি পোশাকের আগ্রহ করে, আর যখন তা হাতে আসে, তখন তুষ্ট না হয়ে অন্য কিছুর প্রতি লোভী হয়ে ওঠে?
* ওই ব্যক্তি কী করে ধনী হতে পারে, যে অন্যকে নিজের চেয়ে একটু অগ্রসর দেখলে নিজের ভাগ্যকে ভর্ৎসনা করে?
* ওই ব্যক্তিকে কীভাবে ধনী বলা যাবে, যে সব সময় নিজের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে অন্তর্জালায় পুড়তে থাকে; কিন্তু নিজের চেয়ে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা আদায় করে না?

টিকাঃ
১৪০. সহিহুল বুখারি : ৬৪৪৬, সহিহু মুসলিম: ১০৫১।
১৪১. সহিহু ইবুন হিব্বান: ৬৮৫, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি: ১১৭৮৫।
১৪২. আল-মুজামুল কাবির লিত তাবারানি: ১৬৪৩।
১৬ নং ফায়দা : হৃদয়ের দরিদ্রতার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা না থাকা, প্রয়োজনের সময় হৃদয় আল্লাহর প্রতি ধাবিত না হওয়া এবং অল্পক্ষণের জন্যও আল্লাহর প্রতি অমুখাপেক্ষিতা আসা। পক্ষান্তরে কোনো বান্দা যদি সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী থাকে এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তিনিই একমাত্র প্রদানকারী এবং বাধা দানকারী, উপকার ও অপকার করার একমাত্র মালিক তিনিই; ফলে সকল বিষয়ে সে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে ঐশ্বর্য দান করেন এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল কিছুর প্রতি তাকে অমুখাপেক্ষী রাখেন।
১৪৩. রওজাতুল উকালা ওয়া নুজহাতুল ফুজালা: পৃ. ১৫১।
১৪৪. উয়ুনুল আখইয়ার: ৩/২০৭।
১৪৫. আজ-জুহদ, ওয়াকি: ৩/৪২৬।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ধনী ও গরিবের দ্বন্দ্ব

📄 ধনী ও গরিবের দ্বন্দ্ব


এক ধনী ব্যক্তি তার রিজিকের প্রশস্ততা ও সম্পদের আধিক্য নিয়ে একজন গরিব ব্যক্তির সামনে খুব গর্ব করে বেড়াচ্ছিল, জবাবে সে গরিব লোকটি— যার অন্তর প্রকৃত ধনাঢ্যতা ও ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল, যার স্বাদ সে ধনী লোকটি আস্বাদন করতে পারেনি—বলল:
'হে দরিদ্রতার সমালোচক, একটু থামবে কি তুমি? দরিদ্রতার চেয়ে ধনাঢ্যতার দোষ বেশি পাবে, যদি একটু চিন্তা করে দেখো তুমি। তোমার দৃষ্টিভঙ্গি শুদ্ধ হলে তুমি দেখবে, ধনাঢ্যতার চেয়ে দরিদ্রতা অনেক মর্যাদামণ্ডিত ও ফজিলতপূর্ণ। কারণ, কোনো কোনো মানুষ ধনী হওয়ার জন্য আল্লাহর নাফরমানির আশ্রয় নিলেও, কোনো মানুষ গরিব হওয়ার জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা করে না।'

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ধনীদের নেতা

📄 ধনীদের নেতা


ধনী মনের অধিকারী একজন অনন্য আদর্শ ব্যক্তি। তার হৃদয় সর্বদা নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত থাকে। সে পীড়াপীড়ি করে কারও কাছে যাচনা করে না। সম্পদের পেছনে কুকুরের মতো হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দৌড়ায় না। কোনো লেনদেনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অথবা লাভজনক কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে আফসোস করতে করতে নিজেকে শেষ করে দেয় না। তাই তো সে মানুষের মাঝে সম্রাটের মতো বসবাস করতে পারে। কারণ, সে তাদের সহযোগিতার প্রতি মুখাপেক্ষী নয় এবং তাদের কাছ থেকে চাইতে গিয়ে তার চেহারা মলিন হয় না। প্রকৃত ধনীদের খবর শোনো তাদেরই একজন হাসান বিন সালিহ থেকে:
'অনেক সময় এমন অবস্থায় আমার সকাল হতো যে, একটি কানাকড়িও আমার হাতে থাকত না। তা সত্ত্বেও আমি এমনভাবে চলতাম, যেন দুনিয়ার সকল সম্পদ আমার মালিকানাধীন।'

আমাদের সমসাময়িক ইতিহাস থেকে একজনের গল্প শোনো:
বারা নেজার রাইয়ান স্বীয় পিতা ড. নেজার রাইয়ান এবং বস্তুবাদের এ যুগে তার আশ্চর্যজনক দুনিয়াবিমুখতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, 'একদিন তিনি আমাকে বললেন, “হে বারা, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, মানুষজন যে সহায়-সম্পত্তি ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি লালায়িত, সেসবের প্রতি আমার মনের মধ্যে কোনো লোভ অনুভব করি না। সবই আমি আল্লাহর জন্য পরিত্যাগ করেছি।” তাঁর এমন মহত্ত্বের বিনিময়ে আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।'

পকেট খালি তবে মন ঐশ্বর্য ও উদারতায় পূর্ণ, এমন প্রকৃত ধনীদের একজনের গল্প শোনো:

টিকাঃ
১৪৬. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৭/৩৬৯।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 যে গোলামের চরিত্র অভিজাত শ্রেণির লোকদের মতো!

📄 যে গোলামের চরিত্র অভিজাত শ্রেণির লোকদের মতো!


যারা প্রকৃত ধনী, তারা অত্যন্ত উদার ও দানশীল হয়। নিজেদের যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি দান করতেও তাদের গায়ে লাগে না। কারণ, তাদের ঐশ্বর্য থাকে মূলত তাদের মনে। হৃদয়ে তারা ধারণ করে প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি। এমনই একজনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন মুহিব্বুদ্দিন আল-খাতিব তার বিখ্যাত 'আল-হাদিকাহ' গ্রন্থে। তিনি সেখানে গরিবের জীর্ণ পোশাকে আচ্ছাদিত একজন ধনীর বিবরণ দিয়েছেন। লোকটি মূলত একজন কৃষ্ণাঙ্গ গোলাম। একদা তার পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন বসরার আমির উমর বিন আব্দুল্লাহ বিন মামার। লোকটি তখন একটি বাগানের দেয়ালের পাশে বসে খাবার খাচ্ছিলেন। তার সামনে ছিল একটি কুকুর। তিনি এক লুকমা খেয়ে আরেক লুকমা কুকুরকে খেতে দিচ্ছিলেন। এ দেখে উমর বিন আব্দুল্লাহ বললেন, 'কুকুরটি কি তোমার?'
-না।
-তাহলে তুমি যা খাচ্ছ, তাকে তা-ই খেতে দিচ্ছ যে?
-কারণ, একটি দুচোখওয়ালা প্রাণী আমার দিকে চেয়ে আছে, এমন সময় তাকে না দিয়ে একাকী খেতে আমার লজ্জা লাগে।
-তুমি স্বাধীন নাকি গোলাম?
-আমি বনি আসিম গোত্রের এক ব্যক্তির গোলাম।

অতঃপর উমর তার মালিকপক্ষকে ডেকে এনে তাদের থেকে তাকে কিনে নিলেন এবং পুরো বাগানটাও কিনে নিলেন। অতঃপর তার নিকট গিয়ে বললেন, 'তোমাকে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে আজাদ করে দিয়েছেন?'
-সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি একক, অদ্বিতীয়। তিনি ছাড়া আর কেইবা আমাকে আজাদ করতে পারে?
-এই বাগান এখন থেকে তোমার।
-আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, এটাকে আমি শহরের গরিবদের জন্য ওয়াকফ করে দিলাম।
-কী বলছ এসব! তোমার দরিদ্রতা ও অভাব সত্ত্বেও তুমি এমন সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছ?
-আসলে আল্লাহ আমার প্রতি বড় একটি অনুগ্রহ করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কার্পণ্য করতে আমার লজ্জা লাগছে!

পক্ষান্তরে, যার সম্পদ বেশি হয় এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে সম্পদ অর্জন করতে থাকে, এমনকি সম্পদ কামাই করা ছাড়া অন্য কিছু সে ভাবতেই পারে না এবং সব সময় কামনা করতে থাকে যে, অন্যান্য মানুষের হাতে যত সম্পদ আছে, সব তার হাতে চলে আসুক, সে পরশ্রীকাতরতা, মনঃকষ্ট ও অস্থিরতায় ভোগে সব সময়। সেই প্রকৃত গরিব। এ জন্যই অভিজ্ঞজনেরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একটি মূলনীতি দাঁড় করিয়েছেন :
'যে অল্পতে তুষ্ট হয় না, অধিক পেলেও সে তুষ্ট হতে পারে না।'

ফুজাইল বিন ইয়াজ ধনী ও গরিব নির্ণয়ের জন্য একটি সূক্ষ্ম মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন। কী ছিল সেই মানদণ্ড, নিচের গল্পটি থেকে তা জেনে নাও :
একদিন ফুজাইল বিন ইয়াজের এক ভক্ত এসে বলল, 'আপনি এই জুব্বাটি আমার থেকে হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করলে আমি খুশি হব।'
- যদি তুমি ধনী হও, তাহলে আমি তা গ্রহণ করব।
- আমি ধনী।
- তোমার কাছে কী পরিমাণ সম্পত্তি আছে?
- দুই হাজার।
- তুমি কি চাও, তা চার হাজার হয়ে যাক?
- অবশ্যই।
- তাহলে তো তুমি গরিব, আমি তোমার থেকে হাদিয়া গ্রহণ করতে পারব না।

টিকাঃ
১৪৭. আল-হাদিকাহ: পৃ. ১৩৫৪-১৩৫৫।
১৪৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১০/১৪৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00