📄 ভাইদের আয়নায় নিজের চেহারায় কলঙ্ক দেখতে পেলে
একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়নাস্বরূপ। তাই কখনো যদি তোমার সঙ্গী ও ভালো লোকদের মধ্যে তোমার প্রতি পরিবর্তন ও রূঢ়তা লক্ষ করো, তাহলে ধরে নেবে, রবের সাথে তোমার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফুজাইল বলেন:
'মাঝেমধ্যে সময় তোমার বিরুদ্ধে প্রবাহিত হয় এবং মুমিন ভাইয়েরা তোমার থেকে দূরে সরে যায়। তোমার পাপের কারণেই এমনটা হয়।
ঠিক এ কথাটাই রাসুল হাদিসের মধ্যে বলেছেন :
مَا مِنْ عَبْدٍ إِلَّا وَلَهُ صِيتُهُ فِي السَّمَاءِ، فَإِنْ كَانَ صِيتُهُ فِي السَّمَاءِ حَسَنًا وُضِعَ فِي الْأَرْضِ، وَإِنْ كَانَ صِيتُهُ سَيِّئًا وُضِعَ فِي الْأَرْضِ
'আসমানের মধ্যে প্রত্যেক বান্দার খ্যাতি আছে। সুতরাং কোনো বান্দা যদি আসমানে সুখ্যাত হয়, তার সুখ্যাতি দুনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। আর যে বান্দা আসমানে কুখ্যাত, দুনিয়াতেও তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
কুখ্যাত ব্যক্তিকে মানুষ অপছন্দ করে। ঘৃণার নজরে দেখে। যদিও তাদের সাথে তার চলাফেরা খুব কম ও নিয়ন্ত্রিত হোক। মানুষের অন্তরসমূহ তাকে ভারী মনে করে। তার সাথে থাকতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এটা একমাত্র সেই পাপের শাস্তি, যা সে নিজের মালিকের সাথে করেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে তার পাপের শাস্তি দিয়েছেন। তাই তোমাকে মনে রাখতে হবে যে, তুমি মানুষের দৃষ্টিতে তখনই ঘৃণিত হবে, যখন আল্লাহর দৃষ্টিতে ঘৃণিত হবে।
এমনকি আল্লাহ তাআলা ভালো লোকের কথাকে মানুষের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন; যদিও সে কথা বাহ্যিকভাবে খারাপ হোক। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সাথে যার সম্পর্ক খারাপ, সে নিজের কথা মানুষের মাঝে যতই রচাতে চাক, মানুষের অন্তর সে কথা মেনে নেয় না এবং তার থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তার বাস্তব প্রমাণ দেখেছেন বিশিষ্ট ফকিহ ইবরাহিম নাখয়ি। তাই তিনি বলেন: 'যখন কোনো ব্যক্তি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে বাহ্যিকভাবে শুনতে খারাপ লাগে এমন কোনো কথা বলে, আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে সে কথার পক্ষে অজুহাত সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারা বলে, “লোকটি কথাটি যেভাবেই বলুক, কথা কিন্তু ভালোর জন্যই বলেছেন।” অপরদিকে, যদি কোনো ব্যক্তি খারাপ উদ্দেশ্যে সুন্দর কথা বলে, আল্লাহ তাআলা মানুষের মনে তার মনের অবস্থা জানিয়ে দেন। তাই তারা বলেন, “লোকটির কথা ঠিক; কিন্তু মতলব খারাপ।”
এ জন্যই মুহাম্মাদ বিন হিব্বান আল-বুস্তি একটি সুদৃঢ় মূলনীতি দাঁড় করিয়েছেন, যা তিনি মূলত নবিজি ﷺ-এর হাদিস থেকেই চয়ন করেছেন। মূলনীতিটি নিম্নরূপ: 'যার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো, আল্লাহ তাআলা তার বাইরের অবস্থাও ভালো করে দেন। যার অভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ, আল্লাহ তাআলা তার বাইরের অবস্থাও খারাপ করে দেন। '
তবে বাস্তবতা হলো, তোমার অবস্থা সব সময় এক রকম থাকবে না। কখনো তুমি আল্লাহর কাছাকাছি হবে, কখনো দূরে সরে পড়বে। কখনো তিনি তোমাকে ভালোবাসবেন, কখনো তোমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন। কারণ তোমার ইমানের অবস্থা সব সময় এক ধরনের থাকবে না। দিনে ভালো তো রাতে খারাপ, রাতে ভালো তো দিনে খারাপ এ ধরনের অবস্থা হবে। তাই যেদিন তুমি আল্লাহর সকল বিধিনিষেধ মেনে চলবে, কোনোরূপ উদাসীনতা করবে না, সেদিন তুমি রবের একদম নিকটে চলে যাবে। কিন্তু পরেরদিন হয়তো তুমি শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে যাবে; ফলে মনের চাহিদা অনুযায়ী তুমি করে বসবে কোনো গুনাহ। তখন গতকাল যে অবস্থানে তুমি ছিলে, সেখান থেকে নিচে পড়ে যাবে।
আল্লাহর কাছে তোমার অবস্থানের উন্নতি হয়েছে নাকি অবনতি, তা মাখলুকের আচরণেই তুমি বুঝতে পারবে, যদি তোমার হৃদয়ে প্রাণ থাকে। ফুজাইল বিন ইয়াজ কী বলতে চেয়েছেন, তা ভালোভাবে অনুধাবন করো:
'আমি যখন গুনাহ করি, তখন তার লক্ষণ দেখতে পাই আমার সাথে আমার গাধার আচরণে।'
টিকাঃ
১০০. আল-মুজামুল কাবির : ৫০৩, সহিহুল জামি: ৫৭১৬।
১০১. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৪/৫৪।
১০২. মুসনাদুল বাজ্জার : ৯২০২।
১০৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/২২৯-২৩০।
১০৪. রওজাতুল উকালা: পৃ. ২৭১।
১০৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১০৯।
📄 অতীত ঠিক করে দেয় ভবিষ্যতের পথ
উস্তাজ মুহাম্মাদ আহমাদ রাশিদ গুনাহের প্রভাব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ তুলে ধরেছেন তোমার সামনে; যাতে তুমি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হতে পারো। তিনি বলেন:
'কোনো ব্যক্তি যখন রাতের বেলা কোনো অন্যায় কাজ করে, যেমন: হয়তো সে কারও গিবত করল, বা কৃপণতা করল, বা কাউকে সাহায্য করতে গড়িমসি করল, বা নামাজ দেরি করে পড়ল, বা কাউকে খারাপ উপাধি দিয়ে সম্বোধন করল, বা ভালো কাজ করতে বাধা দিল, বা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিল অথবা প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে লেনদেনে নিজের স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে সাহায্য করেছে, পরদিন তার সাথে কী হবে জানো?
পরদিন যখন সে ঘুম থেকে উঠবে, তখন দেখবে স্ত্রী খুব রেগে আছে! কোনো কারণ ছাড়াই তার সাথে রূঢ় আচরণ করছে! কিছুক্ষণ পর সে বকবক করতে করতে পুরো ঘর মাথায় তুলবে। তাকে নানান ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ভর্ৎসনা করতে শুরু করবে। অনেক সময় এমন হবে যে, তার ছেলের জুতো খুঁজতে খুঁজতে আধা ঘণ্টা চলে যাবে; ফলে তার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে। সেদিনের খাবারে লবণ বেশি হওয়ার ফলে খেতে কষ্ট হবে। তার গাড়িটি অবাধ্য জন্তুর মতো তাকে কষ্ট দেবে, তার সময় নষ্ট করবে। চলা শুরু করার পর রাস্তার মাঝখানে লাল সিগন্যালে আটকা পড়ে যাবে। সামান্য ইস্যু নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সাথে ঝামেলা বেধে যাবে। সব শেষ করে যখন অফিসে পৌঁছাবে, তখন অফিসের অবস্থা গোলযোগপূর্ণ দেখতে পাবে। একদিকে থাকবে কাজের চাপ, অপরদিকে দেরি করে অফিসে আসার জন্য বসের রাগ। কাটা যেতে পারে মাইনেও। এরপর যখন দুপুরের খাবার খেতে যাবে, তখন দেখবে, খাবার সব পুড়ে গেছে। কারণ, স্ত্রী উনুনের ওপর পাতিল রেখে নামাতে ভুলে গিয়েছিল! এভাবে তার পুরো দিনটি কাটবে চরম বিরক্তি ও দুঃখকে সঙ্গী করে। এসবের কিছু না হলেও অন্তত এতটুকু অবশ্যই হবে যে, সে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তারপর চোখে মজার ঘুম আসতেই মোবাইলটা বেজে উঠল!'
গুনাহ করার পর যখন তুমি তাওবা করবে এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন তোমার মাঝে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখতে পাবে। তোমার অন্তর স্থিরসংকল্প ও প্রত্যয়ী হয়ে উঠবে। এতটুকু পরিবর্তনই তোমার জন্য যথেষ্ট।
এ ব্যাপারে প্রখ্যাত বুজুর্গ হাবিব আজামির ফিরে আসার গল্পটি না বললে নয়:
হাবিব প্রাথমিক জীবনে দ্বীন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। নির্দ্বিধায় সুদ খেতেন তিনি। একদিন বাচ্চারা পথের ধারে খেলছিল। তিনি সেখান থেকে যাওয়ার সময় বাচ্চারা বলে উঠল, 'ওই দেখো, সুদখোর যাচ্ছে!' এতে লজ্জায় তার মাথা নুয়ে পড়ল এবং তিনি বললেন, 'প্রভু, আমার পাপ তো শিশুদের মাঝেও ফাঁস হয়ে গেল!' অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে তার সমুদয় সম্পত্তি হাতে নিলেন এবং বললেন, 'প্রভু আমার, এই সম্পদের বিনিময়ে আমি নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এখন আমাকে আজাদ করুন।' পরদিন সকালে তার সকল সম্পদ সদাকা করে দিলেন। তারপর থেকে তিনি ইবাদতে আত্মনিয়োগ করলেন। রোজা, কিয়ামুল লাইল, জিকির, নামাজ-সব ধরনের ইবাদতে মনোযোগী হলেন। এর কিছুদিন পর একদিন তিনি সেই শিশুদের পাশ দিয়ে গেলেন, যারা তাকে সুদখোর বলে তিরস্কার করেছিল। শিশুদের নজর যখন তার ওপর পড়ল, তখন তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, 'চুপ হয়ে যাও, আবিদ হাবিব এসেছেন!' এ কথা শুনে তিনি কেঁদে দিলেন।
টিকাঃ
১০৬. সানাআতুল হায়াত: পৃ. ৫৯।
১০৭. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ৫/৩৯০।
📄 অন্ধের সুখ
তাই কেউ ইবাদতের মাঝে সুখ অনুভব না করলে তার উচিত ইবাদতকে আরও সুন্দর ও উত্তম উপায়ে আদায় করা। কেননা, আমরা আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হলে তিনিও আমাদের প্রতি মনোযোগী হন। আমরা তাঁর প্রতি হেঁটে হেঁটে অগ্রসর হলে তিনি আমাদের প্রতি দৌড়ে আসেন।
ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'যদি তুমি হৃদয়ে আমলের স্বাদ না পাও এবং আমলের কারণে অন্তরে প্রফুল্লতা অনুভব না করো, তাহলে নিজের আমলের ওপরই দোষ চাপাও। কেননা, আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞ। অর্থাৎ বান্দা যদি যথাযথভাবে আমল করে, তিনি অবশ্যই দুনিয়াতে আমলের মিষ্টতা অনুভব করানোর মাধ্যমে তার প্রতিদান দেন। হৃদয়ে আনন্দ ও প্রফুল্লতা দান করেন। সুতরাং তুমি যদি তোমার আমলের বিনিময়ে স্বাদ অনুভব না করো, তাহলে বুঝতে হবে তোমার আমলের কোথাও সমস্যা আছে। '
প্রকৃত সুখ অনুভব করার অন্যতম উপায় হলো, আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অকুণ্ঠ সন্তুষ্টি। এটি অন্তরকে বাইতুল মামুরের মতো প্রশান্ত ও প্রশস্ত করে দেয়। এ জন্য একজন দৃষ্টিহীন লোক ইজুদ্দিন আহমাদ বিন আব্দুদ দায়িম আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন:
'আল্লাহ আমার চোখের দৃষ্টি নিয়ে নিয়েছেন, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। কারণ, আমার হৃদয় দৃষ্টিসম্পন্ন। আমি হৃদয়ের চোখ দিয়ে আমার দুনিয়া ও আখিরাত দেখতে পাই। আর হৃদয়ের চোখ দ্বারা এমন বস্তুও দেখা সম্ভব, যা চর্মচক্ষু দ্বারা দেখা সম্ভব নয়।'
অন্ধ কবি নাসর আলি সাইদ মনে করেন যে, তিনি এমন অনেক দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের চেয়ে উত্তম, যারা দুনিয়াতে হিদায়াতবিহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। এমন অসংখ্য অন্ধ লোক আছে, যাদের অন্তর্দৃষ্টি খুবই তীক্ষ্ণ এবং মনোবল উন্নত। অন্ধদের এই সময়ে ওরাই প্রকৃত দৃষ্টিশক্তি-সম্পন্ন।
কত অন্ধ আছে, যাদের বাহ্যিক চোখ নেই, তবুও তারা দেখে। হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে দেখে তারা সত্যের পথে চলে। আবার অনেক মানুষ চোখ থাকার পরেও অন্ধ। সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত তারা। যেন তাদের চোখের ওপর পর্দা পড়ে আছে।
কাতাদা -কে একজন প্রশ্ন করলেন, 'দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের চেয়ে দৃষ্টিহীন লোক অধিক মেধাবী ও বুদ্ধিমান হয় কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'কারণ তাদের চোখের দৃষ্টিক্ষমতা হৃদয়ে স্থানান্তরিত হয়।'
বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিজ দৃষ্টিশক্তি-বঞ্চিত লোকদের উন্নত মেধার রহস্য উদঘাটন করে বলেন:
'অন্ধ ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি মেধাবী ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী হয়ে থাকে। কারণ, তারা মানুষের মধ্যে পার্থক্যকরণ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত থাকে। দৃষ্টিশক্তি থাকলে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাভাবনা মাথায় আসে। তাই দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তির মাথায় চিন্তার জট বাঁধে না। ফলে তার মাথা ও বুদ্ধি নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে।'
বাশশার বিন বুরদ জন্মগতভাবেই অন্ধ ছিলেন। বরং তার কথা অনুযায়ী মায়ের উদরেও তিনি অন্ধ ছিলেন। এ অন্ধত্বকেই তিনি নিজের অকল্পনীয় মেধার রহস্য বলে অভিহিত করতেন। কারণ, চোখের আলো যখন নিভে যায়, তখন সে আলো স্থানান্তরিত হয়ে হৃদয়ে স্থান নেয়। ফলে তার কলবি শক্তি দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের চেয়ে বেশি হয়। এ ব্যাপারে তিনি বলেন:
'মায়ের উদর থেকেই আমি অন্ধ। এই অন্ধত্বই আমার মেধাকে সুতীক্ষ্ণ করেছে। ফলে জ্ঞানসম্বন্ধীয় জটিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমার কাছে অনেক সহজ মনে হয়। তাই তো বলি, আমি অন্ধ নই; বরং চোখের জ্যোতি কলবে স্থানান্তরিত হয়েছে মাত্র। যার ফলে সাধারণ মানুষ জ্ঞানের যেসব বিষয় খুইয়ে বসে, আমার তা অর্জিত হয়।'
এ হলো অন্ধত্বের ইহলৌকিক ও জাগতিক উপকারিতা। এটা ছাড়া ইমানি ও পারলৌকিক উপকারিতাও আছে। জনৈক অন্ধ তবে দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি এই উপকারিতা অনুভব করে কী বলেছেন দেখো :
জুনাইদ বাগদাদি বর্ণনা করেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহ আশনানদির নিকট গেলাম। তিনি চোখে দেখতেন না। সেখানে একজন কারি তিলাওয়াত করলেন :
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
"চোখের খিয়ানত এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।" এ আয়াত শোনার পর তিনি বললেন, “অর্ধেক আমলের হিসাব থেকে আমি মুক্ত."
এ জন্যই বাশশার বিন বুরদকে কেউ অন্ধ বলে তিরস্কার করলে তিনি কোনো পরোয়া করতেন না এবং মনঃক্ষুণ্ণ হতেন না। বরং তিনি চোখের দৃষ্টি না থাকার মধ্যে নিয়ামত অনুভব করতেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন :
'শত্রুরা আমাকে অন্ধ বলে লজ্জা দেয়। এতে আমি লজ্জিত হই না। মানুষ যদি মনুষ্যত্ব ও তাকওয়াকে দেখতে পায়, তাহলে চোখ অন্ধ হলেও কোনো ক্ষতি নেই। অন্ধত্ব পুণ্য অর্জনের মাধ্যম, পুণ্য সঞ্চয়ের উপায় এবং পাপ থেকে বিরত থাকার সহায়ক—যে তিন বিষয়ের আমি ভিখারি।'
তবে এই বোধ মনের মধ্যে আসার জন্য মনটা হতে হবে ইমান ও বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত। সত্যিকার মুমিন ব্যতীত অন্য কারও মনে এই অনুভূতি জাগে না। সত্যিকার মুমিনের মন আল্লাহর আলোয় আলোকিত হয় এবং তিনি যা দিয়ে তাকে সাহায্য করেছেন, তার মধ্যেই শক্তি অনুভব করে। মুস্তফা সাদিক রাফিয়ি এই অনুভূতিকে উন্নত ইচ্ছাশক্তি বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন,
'সুখের রহস্য হচ্ছে তোমার অভ্যন্তরে এমন একটি শক্তি থাকা, যা তোমাকে উত্তম বিষয়কে আরও উত্তম করে অনুধাবন করায় এবং মন্দ বিষয়কে অধিক মন্দ মনে করা থেকে বাধা দেয়।'
তবে মনের মধ্যে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস না থাকার কারণে অন্ধত্বকে অনেক অন্ধ ব্যক্তি আপদ মনে করে। এমনই এক অন্ধ নিজের ঘরকে কবর আখ্যায়িত করে অভিযোগের সুরে বলে:
'হায়, আমি যেন নিজের ঘরেই কবরস্থ হয়ে আছি—যেখানে আমার সকাল- বিকাল একসমান। এ দেখে হিংসুকের মনেও আমার জন্য দয়া আসে। আমার জন্য তারা কাঁদে। তবে এই দয়া ও কান্না আমার কোনো কাজে আসে না。
দুই শ্রেণির মানুষের মাঝে কত বিশাল পার্থক্য দেখো! এ পার্থক্য দেখে অনেক পাশ্চাত্য লেখক ও গবেষক বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। নিচে এ সংক্রান্ত একটি গল্প তুলে ধরা হলো:
টিকাঃ
১৩১. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৬৮।
১৩২. আল-লাতায়িফ ওয়াজ জারায়িফ পৃ. ১১০।
১৩۳. আল-লাতায়িফ ওয়াজ জারায়িফ পৃ. ১১০।
১৩৪. সুরা গাফির, ৪০: ১৯।
১৩৫. দুরারুল হিকাম : পৃ. ৪৯।
১৩৬. ওয়াহইয়ুল কলাম: ১/৫২।
১৩৭. ১৫ নং ফায়দা: ইবনুল কাইয়িম ️ স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রাখার মতো একটি কথা বলেছেন, যা আশাহতদের মনে আশার সঞ্চার করে। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দার জন্য যে ফয়সালাই করেন, সেটাই তার জন্য কল্যাণকর; চাই এ ফয়সালা তার ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যদি কোনো মুমিনকে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা না দেওয়ার পদ্ধতিতে দান করা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তার ওপর যত বালা-মুসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা আসে, সবই মূলত নিয়ামত। তবে বান্দা নিজের অজ্ঞতার কারণে কেবল সেই নিয়ামতটিই অনুধাবন করতে পারে, যা তার চাহিদার সাথে মিলে যায় এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ দান করে। সে বান্দার মাঝে সামান্যতমও আল্লাহর মারিফাত বা যথাযথ পরিচয় থাকত, তাহলে সে বঞ্চিত হওয়াকেও নিয়ামত মনে করত এবং বালা-মুসিবতকে রহমত মনে করত। আর সুস্থতা ও নিরাপত্তায় যে রকম সুখ অনুভব করে, তার চেয়ে বেশি সুখ অনুভব করত বালা-মুসিবত ও দুঃখ-দুর্দশায়। প্রাচুর্যে যে সুখ অনুভব করত, তা অপেক্ষা বেশি সুখ অনুভব করত, দারিদ্র্যের মাঝে। অসচ্ছলতার সময়ে সচ্ছলতার সময়ের চেয়ে বেশি আনন্দ অনুভব করত। (মাদারিজুস সালিকিন: ২/২০৭)
📄 আমি আল্লাহর জান্নাতে বাস করি
ডেল কার্নেগি তার প্রসিদ্ধ বই How to Stop Worrying and Start Living-এ প্রখ্যাত পশ্চিমা লেখক রোনাল্ড ভিক্টর কোর্টনি বডলির একটি চমৎকার প্রবন্ধ উদ্ধৃত করেছেন। যেখানে বডলি লিখেছেন :
১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে আমি আমার পরিচিত পৃথিবী থেকে ফিরে এসে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় চলে গেলাম। সেখানে মরুভূমিতে বেদুইন লোকদের সাথে সাত বছর কাটালাম। এ সময়ে বেদুইনদের ভাষা-সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ খুব ভালোভাবেই আয়ত্ত করে নিয়েছিলাম। তাদের মতো করে পোশাক পরিধান করতাম। তারা যা খায় আমিও তা-ই খেতাম। বেশভূষায়ও সম্পূর্ণরূপে তাদের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। এভাবে আমি তাদেরই একজন হয়ে উঠেছিলাম। তাদের মতো আমারও ছাগলের পাল ছিল। তাদের মতো আমিও তাঁবুতে ঘুমাতাম। সে সময় আমি ইসলামকে নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করলাম এবং ইসলামের নবি মুহাম্মাদকে নিয়ে 'রাসুল' নামে একটি বইও লিখলাম।
তাদের সাথে কাটানো সাতটি বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও উপভোগ্য সময়। শান্তি, প্রশান্তি ও নিশ্চিন্তময় ছিল প্রতিটি ক্ষণ।
সে সময় মরুবাসী আরবদের থেকে আমি শিখেছি কীভাবে দুশ্চিন্তাকে জয় করতে হয়। তারা ইসলামধর্মের অনুসারী। আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও তাকদিরের ওপর আছে তাদের অটল বিশ্বাস। এই বিশ্বাস তাদের নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতে সহায়তা করে এবং এই বিশ্বাসের ফলেই জীবনকে তারা খুব সহজভাবে নেয়। কোনো বিষয়ে তারা তাড়াহুড়ো করে না এবং নিজেদের অপ্রয়োজনীয় চিন্তার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখে না। তারা বিশ্বাস করে, তাকদিরে যার জন্য যা-ই লিখা আছে, তার সাথে তা-ই হবে। তবে এর অর্থ তারা এটা বোঝে না যে, তাদের কোনো কাজ করতে হবে না; হাত গুটিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকলেই হবে।
এরপর তিনি বলেন:
একটি উদাহরণ দিলে তাদের অবস্থা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। একদিন তীব্র ঝড়ো হাওয়া বইল। এই ঝড়ে সাহারা মরুভূমির বালি উড়ে গিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে একদম ফ্রান্সের রাউন উপত্যকায় পৌঁছে যায়। এই ঝড় ছিল প্রচণ্ড রকমের গরম। এমনকি আমি অনুভব করছিলাম যে, গরমের তীব্র তাপে আমার মাথার চুলগুলো কাঁপতে শুরু করেছে। তীব্র গরমের কারণে আমার মনে হয়েছিল, যেন আমাকে কোনো গরম চুল্লির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
কিন্তু আরব বেদুইনদের এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ নেই। সবার মুখে চিরাচরিত সেই উক্তি : 'আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন।' তবে ঝড় যখন আরও তীব্র হলো, তখন তারা কাজের গতি বাড়িয়ে দিল। গরম হাওয়ায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পূর্বে তাদের দুর্বল পশুগুলো জবাই করে দিল। অতঃপর বাকি পশুগুলোকে দক্ষিণ দিকে পানির কাছে নিয়ে গেল। এসব তারা করল বিস্ময়কর নীরবতা ও স্থিরতার সাথে। কারও মুখে অভিযোগের কোনো শব্দ নেই।
গোত্রপ্রধান বললেন, 'আমাদের বড় ধরনের কোনো কিছু হারাতে হয়নি। অথচ আমরা সবকিছু হারানোর জন্যই সৃষ্টি হয়েছি। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের প্রায় ৪০% গবাদি পশু সুরক্ষিত আছে। এ জন্য তাঁর প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া। ইনশাআল্লাহ, আমরা প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবকিছু আবার নতুনভাবে শুরু করব।'
বডলি বলেন:
আরেকদিনের ঘটনা। একদিন আমি গাড়ি দিয়ে মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিলাম। তখন মাঝপথে হঠাৎ করে গাড়ির একটি টায়ার ফেটে গেল। ড্রাইভার গাড়িতে রিজার্ভ টায়ারও রাখেনি। এতে আমার ভীষণ রাগ হলো এবং চরম দুশ্চিন্তা চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরল। আমি রাগতস্বরে বেদুইন সহযাত্রীদের বললাম, 'এখন আমাদের কী করা উচিত?'
তারা বলল, ‘রাগ করে তো কোনো উপকার হবে না। রাগ মানুষকে বোকামি ও সিদ্ধান্তহীনতায় ঠেলে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।’
উপায়ান্তর না দেখে আমাদের নিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করল তিন চাকার ওপরেই। তবে বেশিদূর যেতে পারেনি। কিছুদূর যাওয়ার পরেই পেট্রল ফুরিয়ে গেল।
এখানেও আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, আমার বেদুইন সহযাত্রীদের কেউই উত্তেজিত হয়নি। তারা বাকি পথ সম্পূর্ণ স্থির ও শান্তভাবে হেঁটে হেঁটে পাড়ি দিল।
বডলি মরুবাসী আরবদের সাথে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পর বলেন:
বেদুইনদের সাথে কাটানো সাতটি বছর আমাকে অনুভব করিয়েছে যে, যেসব মানসিক রোগী ও মাদকাসক্ত লোকে আমেরিকা-ইউরোপ ভরে গেছে, তারা সভ্যতার বলি ছাড়া কিছুই নয়, যে সভ্যতা দ্রুততা ও অস্থিরতাকে নিজের ভিত্তি বানিয়ে নিয়েছে। যতদিন আমি মরুভূমিতে ছিলাম, হতাশা ও দুশ্চিন্তা আমাকে স্পর্শ করেনি। বরং সেখানে আমি আল্লাহর জান্নাতে ছিলাম এবং শান্তি, প্রশান্তি, তৃপ্তি ও সন্তুষ্টির মাঝে জীবন অতিবাহিত করেছি।
একদম শেষের দিকে তিনি বলেন: সারকথা হলো, আমি মরুভূমি থেকে চলে এসেছি আজ সতেরো বছর অতিবাহিত হলো। কিন্তু এখনো আমি আল্লাহর যেকোনো সিদ্ধান্ত ও ফয়সালার ব্যাপারে আরবদের অবস্থানকেই ফলো করি। ফলে আমার সকল দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদাপদকে আমি স্থিরতার সহিত শান্তভাবে মোকাবিলা করি।
এই যে স্বভাব, যা আমি আরবদের থেকে অর্জন করেছি, তা আমার স্নায়ুকে স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে এতটাই কাজ করে, যা হাজার হাজার ডাক্তারি ওষুধ করতে পারে না。
টিকাঃ
১৩৮. দায়িল কালকা ওয়াবদায়িল হায়াত: পৃ. ২৯০-২৯২।