📄 মানুষের ভালোবাসা
আল্লাহ তোমাকে ভালোবেসেছেন; ফলে লোকেরাও তোমাকে ভালোবেসেছে। তুমি তাঁর কাছে এসেছ; ফলে লোকেরাও তোমাকে কাছে টেনে নিয়েছে। কারণ তিনি ছাড়া মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও মনের কর্তৃত্ব অন্য কারও নেই। আসমান ও জমিনে তোমাকে কেবল তিনিই গ্রহণযোগ্যতা দান করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালোবাসা দেবেন। '
একটি হাদিসে রাসুল এ আয়াতের খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন :
إِذَا أَحَبَّ اللَّهُ العَبْدَ نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحْبِبْهُ، فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، فَيُنَادِي جِبْرِيلُ فِي أَهْلِ السَّمَاءِ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ القَبُولُ فِي الْأَرْضِ
'যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরিল -কে ডেকে বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তুমিও তাকে ভালোবাসো।” তখন জিবরিল -ও তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরিল আসমানবাসীদের মাঝে ঘোষণা করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তাই তোমরাও তাকে ভালোবাসো।” তখন আসমানবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। অতঃপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। '
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস শোনার সাথে সাথেই বলে উঠলেন:
'যখন কোনো বান্দা নিজের অন্তর দিয়ে আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরের মাধ্যমে তার প্রতি মনোযোগী হন। '
হে সৎকর্মশীল ভাই, এই গ্রহণযোগ্যতা তোমার জান্নাতের সার্টিফিকেট এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ। তোমার ইবাদত তোমার জন্য মানুষের অন্তরসমূহ খুলে দেয়। তদ্রূপ তোমার পাপ তোমার জন্য মানুষের অন্তরসমূহকে তালাবদ্ধ করে দেয়; ফলে মানুষের মনে তোমার প্রতি অনুগ্রহ ও ভালোবাসা থাকে না। এ জন্যেই আবু দারদা মাসলামা বিন মাখলাদ আনসারি-কে চিঠি লিখলেন:
'পরসমাচার এই যে, বান্দা যখন আল্লাহর ইবাদত করে, তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে তাঁর মাখলুকের মাঝে প্রিয় করে তোলেন। কিন্তু যখন সে তাঁর নাফরমানি করে, তখন তিনি তাকে ঘৃণা করেন। আর তিনি যাকে ঘৃণা করেন, মাখলুকের মনেও তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দেন। '
নিচে আরেকটি হাদিসে তোমার জন্য মহা সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবুল আসওয়াদ দুয়ালি। তিনি বলেন :
আমি মদিনায় গিয়ে উমর বিন খাত্তাব-এর মজলিশে বসলাম। তখন উপস্থিত লোকদের পাশ দিয়ে একটি মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হলে তারা মৃত লোকটির প্রশংসা করলেন। তা দেখে উমর বললেন, 'তার জন্য আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।' আমি উমর-কে বললাম, 'কী আবশ্যক হয়ে গিয়েছে?' তিনি বললেন, 'আমি তা-ই বলেছি, যা রাসুল বলেছেন :
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ لَهُ ثَلَاثَةٌ إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الجَنَّةُ
“যে মুসলিমের পক্ষে তিনজন ব্যক্তি (ভালো হওয়ার) সাক্ষ্য দেবে, তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়ে যায়।”
তখন আমরা বললাম, “দুজন সাক্ষ্য দিলেও কি একই কথা?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, দুজন সাক্ষ্য দিলেও।” এরপর একজনের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসা করিনি। '
এখানে কারও মনে একটি অমূলক প্রশ্ন আসতে পারে যে, দ্বিতীয় হাদিসটি প্রথম হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, দ্বিতীয় হাদিসে মাত্র তিনজন বা দুজনের সাক্ষ্য জরুরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রথম হাদিসে অগণিত, অসংখ্য মুসলিমের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আগেই বলেছি, প্রশ্নটি অমূলক। দুই হাদিসের মধ্যে কোনো ধরনের বৈপরীত্য বা সংঘর্ষ নেই। কারণ, প্রথম হাদিসে গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, যা কেবল মানুষের মুখে শোনার মাধ্যমেই সাব্যস্ত হয়ে যায়। তাই সেখানে অধিক লোকের গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্য, যার জন্য সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে তার অবস্থা পূর্ণরূপে জানার পরে দেওয়া হয়। তাই সেখানে চারজন, তিনজন বা দুইজনের সাক্ষ্যই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে।
যদি তুমি তোমার রবের আনুগত্য করো, তাহলে তিনি তোমাকে প্রতিদান দেবেন। অচিরেই আল্লাহ তাআলা মাখলুকের অন্তরে তোমার প্রভাব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। ফলে তাদের জিহ্বা তোমার প্রশংসা করবে এবং পৃথিবীতে তোমার কখনো নিজেকে একা মনে হবে না। একাকিত্বের কষ্টে তোমাকে ভুগতে হবে না। এটাই মুমিনের জন্য আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আগাম সুসংবাদ। এ জন্যই কাব বলতেন:
'দুনিয়াতে কোনো বান্দার তখনই প্রশংসা করা হয়, যখন আসমানে তার প্রশংসা করা হয়। '
তবে যার তার প্রশংসা তোমার কাজে আসবে না। তোমার ব্যাপারে তাদের প্রশংসাই তোমার কাজে আসবে, যাদের সাথে তুমি মেলামেশা করো এবং জীবন কাটাও। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সত্যবাদী ধরা হবে তোমার প্রতিবেশীদের। এ জন্যই একটি সহিহ হাদিসে তোমার ভালো হওয়া ও খারাপ হওয়ার মানদণ্ড স্থির করা হয়েছে প্রতিবেশীর সাক্ষ্যকে। রাসুল ইরশাদ করেন:
إِذَا قَالَ جِيرَانُكَ: إِنَّكَ مُحْسِنُ فَأَنْتَ مُحْسِنٌ، وَإِذَا قَالَ جِيرَانُكَ: إِنَّكَ مُسِيءُ فَإِنَّكَ مُسِيءٌ
'যখন তোমার প্রতিবেশীরা তোমার ব্যাপারে বলে যে, তুমি ভালো মানুষ, তাহলে তুমি ভালো মানুষ। আর যদি তারা তোমাকে খারাপ মানুষ বলে, তাহলে তুমি খারাপ মানুষ। '
দুনিয়াতে মানুষের প্রশংসা ও ভালোবাসার নিয়ামত আখিরাতের নিয়ামতের সুসংবাদ। যাদের অন্তরে প্রাণ আছে, ইমানের নুর আছে, তারা এটা উপলব্ধি করতে পারেন। তাদেরই একজন হলেন আলিমকুল শিরোমণি সুফইয়ান সাওরি । তিনি তোমার হৃদয়ের জন্য চমৎকার একটি বাণী উপহার দিয়েছেন:
'আল্লাহ তাআলা এমন নন যে, কোনো বান্দাকে দুনিয়াতে (মানুষের প্রশংসা ও ভালোবাসার) নিয়ামত দান করবেন; কিন্তু আখিরাতে তাকে লাঞ্ছিত করবেন। কেননা, তিনি কাউকে অসম্পূর্ণ নিয়ামত দান করেন না। যাকে দান করেন, তাকে পরিপূর্ণরূপে দান করেন। এটাকে তিনি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন। '
এবার তুমি রাসুল-এর নিম্নোক্ত হাদিসের অর্থ ও রহস্য ঠিক ঠিক বুঝতে পারবে:
مَا مِنْ رَجُلٍ يُصَلِّي عَلَيْهِ مِائَةٌ إِلَّا غُفِرَ لَهُ
'যে ব্যক্তির জানাজার সালাতে একশ জন (ইমানদার) লোক শরিক হয়, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
নিঃসন্দেহে এটা তার গ্রহণযোগ্যতার লক্ষণ। এ সৌভাগ্য তখনই অর্জিত হবে, যখন তুমি আল্লাহর বিধান ও সন্তুষ্টিকে সকল কিছুর ওপর প্রাধান্য দেবে।
টিকাঃ
৯২. সুরা মারইয়াম, ১৯: ৯৬।
৯৩. সহিহুল বুখারি: ৩২০৯, সহিহু মুসলিম: ২৬৩৭।
৯৪. আজ-জুহদুল কবির: ১/২৯৯।
৯৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/২৪০।
৯৬. সুনানুত তিরমিজি: ১০৫৯।
৯৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩৬৭।
৯৮. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৫২৫, মুসনাদুল বাজ্জার: ১৬৭৫।
৯৯. উদ্দাতুস সাবিরিন: পৃ. ১৩৭।
📄 ভাইদের আয়নায় নিজের চেহারায় কলঙ্ক দেখতে পেলে
একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়নাস্বরূপ। তাই কখনো যদি তোমার সঙ্গী ও ভালো লোকদের মধ্যে তোমার প্রতি পরিবর্তন ও রূঢ়তা লক্ষ করো, তাহলে ধরে নেবে, রবের সাথে তোমার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফুজাইল বলেন:
'মাঝেমধ্যে সময় তোমার বিরুদ্ধে প্রবাহিত হয় এবং মুমিন ভাইয়েরা তোমার থেকে দূরে সরে যায়। তোমার পাপের কারণেই এমনটা হয়।
ঠিক এ কথাটাই রাসুল হাদিসের মধ্যে বলেছেন :
مَا مِنْ عَبْدٍ إِلَّا وَلَهُ صِيتُهُ فِي السَّمَاءِ، فَإِنْ كَانَ صِيتُهُ فِي السَّمَاءِ حَسَنًا وُضِعَ فِي الْأَرْضِ، وَإِنْ كَانَ صِيتُهُ سَيِّئًا وُضِعَ فِي الْأَرْضِ
'আসমানের মধ্যে প্রত্যেক বান্দার খ্যাতি আছে। সুতরাং কোনো বান্দা যদি আসমানে সুখ্যাত হয়, তার সুখ্যাতি দুনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। আর যে বান্দা আসমানে কুখ্যাত, দুনিয়াতেও তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
কুখ্যাত ব্যক্তিকে মানুষ অপছন্দ করে। ঘৃণার নজরে দেখে। যদিও তাদের সাথে তার চলাফেরা খুব কম ও নিয়ন্ত্রিত হোক। মানুষের অন্তরসমূহ তাকে ভারী মনে করে। তার সাথে থাকতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এটা একমাত্র সেই পাপের শাস্তি, যা সে নিজের মালিকের সাথে করেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে তার পাপের শাস্তি দিয়েছেন। তাই তোমাকে মনে রাখতে হবে যে, তুমি মানুষের দৃষ্টিতে তখনই ঘৃণিত হবে, যখন আল্লাহর দৃষ্টিতে ঘৃণিত হবে।
এমনকি আল্লাহ তাআলা ভালো লোকের কথাকে মানুষের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন; যদিও সে কথা বাহ্যিকভাবে খারাপ হোক। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সাথে যার সম্পর্ক খারাপ, সে নিজের কথা মানুষের মাঝে যতই রচাতে চাক, মানুষের অন্তর সে কথা মেনে নেয় না এবং তার থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তার বাস্তব প্রমাণ দেখেছেন বিশিষ্ট ফকিহ ইবরাহিম নাখয়ি। তাই তিনি বলেন: 'যখন কোনো ব্যক্তি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে বাহ্যিকভাবে শুনতে খারাপ লাগে এমন কোনো কথা বলে, আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে সে কথার পক্ষে অজুহাত সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারা বলে, “লোকটি কথাটি যেভাবেই বলুক, কথা কিন্তু ভালোর জন্যই বলেছেন।” অপরদিকে, যদি কোনো ব্যক্তি খারাপ উদ্দেশ্যে সুন্দর কথা বলে, আল্লাহ তাআলা মানুষের মনে তার মনের অবস্থা জানিয়ে দেন। তাই তারা বলেন, “লোকটির কথা ঠিক; কিন্তু মতলব খারাপ।”
এ জন্যই মুহাম্মাদ বিন হিব্বান আল-বুস্তি একটি সুদৃঢ় মূলনীতি দাঁড় করিয়েছেন, যা তিনি মূলত নবিজি ﷺ-এর হাদিস থেকেই চয়ন করেছেন। মূলনীতিটি নিম্নরূপ: 'যার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো, আল্লাহ তাআলা তার বাইরের অবস্থাও ভালো করে দেন। যার অভ্যন্তরীণ অবস্থা খারাপ, আল্লাহ তাআলা তার বাইরের অবস্থাও খারাপ করে দেন। '
তবে বাস্তবতা হলো, তোমার অবস্থা সব সময় এক রকম থাকবে না। কখনো তুমি আল্লাহর কাছাকাছি হবে, কখনো দূরে সরে পড়বে। কখনো তিনি তোমাকে ভালোবাসবেন, কখনো তোমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন। কারণ তোমার ইমানের অবস্থা সব সময় এক ধরনের থাকবে না। দিনে ভালো তো রাতে খারাপ, রাতে ভালো তো দিনে খারাপ এ ধরনের অবস্থা হবে। তাই যেদিন তুমি আল্লাহর সকল বিধিনিষেধ মেনে চলবে, কোনোরূপ উদাসীনতা করবে না, সেদিন তুমি রবের একদম নিকটে চলে যাবে। কিন্তু পরেরদিন হয়তো তুমি শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে যাবে; ফলে মনের চাহিদা অনুযায়ী তুমি করে বসবে কোনো গুনাহ। তখন গতকাল যে অবস্থানে তুমি ছিলে, সেখান থেকে নিচে পড়ে যাবে।
আল্লাহর কাছে তোমার অবস্থানের উন্নতি হয়েছে নাকি অবনতি, তা মাখলুকের আচরণেই তুমি বুঝতে পারবে, যদি তোমার হৃদয়ে প্রাণ থাকে। ফুজাইল বিন ইয়াজ কী বলতে চেয়েছেন, তা ভালোভাবে অনুধাবন করো:
'আমি যখন গুনাহ করি, তখন তার লক্ষণ দেখতে পাই আমার সাথে আমার গাধার আচরণে।'
টিকাঃ
১০০. আল-মুজামুল কাবির : ৫০৩, সহিহুল জামি: ৫৭১৬।
১০১. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৪/৫৪।
১০২. মুসনাদুল বাজ্জার : ৯২০২।
১০৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/২২৯-২৩০।
১০৪. রওজাতুল উকালা: পৃ. ২৭১।
১০৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১০৯।
📄 অতীত ঠিক করে দেয় ভবিষ্যতের পথ
উস্তাজ মুহাম্মাদ আহমাদ রাশিদ গুনাহের প্রভাব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ তুলে ধরেছেন তোমার সামনে; যাতে তুমি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হতে পারো। তিনি বলেন:
'কোনো ব্যক্তি যখন রাতের বেলা কোনো অন্যায় কাজ করে, যেমন: হয়তো সে কারও গিবত করল, বা কৃপণতা করল, বা কাউকে সাহায্য করতে গড়িমসি করল, বা নামাজ দেরি করে পড়ল, বা কাউকে খারাপ উপাধি দিয়ে সম্বোধন করল, বা ভালো কাজ করতে বাধা দিল, বা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিল অথবা প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে লেনদেনে নিজের স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে সাহায্য করেছে, পরদিন তার সাথে কী হবে জানো?
পরদিন যখন সে ঘুম থেকে উঠবে, তখন দেখবে স্ত্রী খুব রেগে আছে! কোনো কারণ ছাড়াই তার সাথে রূঢ় আচরণ করছে! কিছুক্ষণ পর সে বকবক করতে করতে পুরো ঘর মাথায় তুলবে। তাকে নানান ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ভর্ৎসনা করতে শুরু করবে। অনেক সময় এমন হবে যে, তার ছেলের জুতো খুঁজতে খুঁজতে আধা ঘণ্টা চলে যাবে; ফলে তার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে। সেদিনের খাবারে লবণ বেশি হওয়ার ফলে খেতে কষ্ট হবে। তার গাড়িটি অবাধ্য জন্তুর মতো তাকে কষ্ট দেবে, তার সময় নষ্ট করবে। চলা শুরু করার পর রাস্তার মাঝখানে লাল সিগন্যালে আটকা পড়ে যাবে। সামান্য ইস্যু নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সাথে ঝামেলা বেধে যাবে। সব শেষ করে যখন অফিসে পৌঁছাবে, তখন অফিসের অবস্থা গোলযোগপূর্ণ দেখতে পাবে। একদিকে থাকবে কাজের চাপ, অপরদিকে দেরি করে অফিসে আসার জন্য বসের রাগ। কাটা যেতে পারে মাইনেও। এরপর যখন দুপুরের খাবার খেতে যাবে, তখন দেখবে, খাবার সব পুড়ে গেছে। কারণ, স্ত্রী উনুনের ওপর পাতিল রেখে নামাতে ভুলে গিয়েছিল! এভাবে তার পুরো দিনটি কাটবে চরম বিরক্তি ও দুঃখকে সঙ্গী করে। এসবের কিছু না হলেও অন্তত এতটুকু অবশ্যই হবে যে, সে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তারপর চোখে মজার ঘুম আসতেই মোবাইলটা বেজে উঠল!'
গুনাহ করার পর যখন তুমি তাওবা করবে এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন তোমার মাঝে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখতে পাবে। তোমার অন্তর স্থিরসংকল্প ও প্রত্যয়ী হয়ে উঠবে। এতটুকু পরিবর্তনই তোমার জন্য যথেষ্ট।
এ ব্যাপারে প্রখ্যাত বুজুর্গ হাবিব আজামির ফিরে আসার গল্পটি না বললে নয়:
হাবিব প্রাথমিক জীবনে দ্বীন সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। নির্দ্বিধায় সুদ খেতেন তিনি। একদিন বাচ্চারা পথের ধারে খেলছিল। তিনি সেখান থেকে যাওয়ার সময় বাচ্চারা বলে উঠল, 'ওই দেখো, সুদখোর যাচ্ছে!' এতে লজ্জায় তার মাথা নুয়ে পড়ল এবং তিনি বললেন, 'প্রভু, আমার পাপ তো শিশুদের মাঝেও ফাঁস হয়ে গেল!' অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে তার সমুদয় সম্পত্তি হাতে নিলেন এবং বললেন, 'প্রভু আমার, এই সম্পদের বিনিময়ে আমি নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এখন আমাকে আজাদ করুন।' পরদিন সকালে তার সকল সম্পদ সদাকা করে দিলেন। তারপর থেকে তিনি ইবাদতে আত্মনিয়োগ করলেন। রোজা, কিয়ামুল লাইল, জিকির, নামাজ-সব ধরনের ইবাদতে মনোযোগী হলেন। এর কিছুদিন পর একদিন তিনি সেই শিশুদের পাশ দিয়ে গেলেন, যারা তাকে সুদখোর বলে তিরস্কার করেছিল। শিশুদের নজর যখন তার ওপর পড়ল, তখন তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, 'চুপ হয়ে যাও, আবিদ হাবিব এসেছেন!' এ কথা শুনে তিনি কেঁদে দিলেন।
টিকাঃ
১০৬. সানাআতুল হায়াত: পৃ. ৫৯।
১০৭. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ৫/৩৯০।
📄 অন্ধের সুখ
তাই কেউ ইবাদতের মাঝে সুখ অনুভব না করলে তার উচিত ইবাদতকে আরও সুন্দর ও উত্তম উপায়ে আদায় করা। কেননা, আমরা আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হলে তিনিও আমাদের প্রতি মনোযোগী হন। আমরা তাঁর প্রতি হেঁটে হেঁটে অগ্রসর হলে তিনি আমাদের প্রতি দৌড়ে আসেন।
ইবনে তাইমিয়া বলেন:
'যদি তুমি হৃদয়ে আমলের স্বাদ না পাও এবং আমলের কারণে অন্তরে প্রফুল্লতা অনুভব না করো, তাহলে নিজের আমলের ওপরই দোষ চাপাও। কেননা, আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞ। অর্থাৎ বান্দা যদি যথাযথভাবে আমল করে, তিনি অবশ্যই দুনিয়াতে আমলের মিষ্টতা অনুভব করানোর মাধ্যমে তার প্রতিদান দেন। হৃদয়ে আনন্দ ও প্রফুল্লতা দান করেন। সুতরাং তুমি যদি তোমার আমলের বিনিময়ে স্বাদ অনুভব না করো, তাহলে বুঝতে হবে তোমার আমলের কোথাও সমস্যা আছে। '
প্রকৃত সুখ অনুভব করার অন্যতম উপায় হলো, আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অকুণ্ঠ সন্তুষ্টি। এটি অন্তরকে বাইতুল মামুরের মতো প্রশান্ত ও প্রশস্ত করে দেয়। এ জন্য একজন দৃষ্টিহীন লোক ইজুদ্দিন আহমাদ বিন আব্দুদ দায়িম আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন:
'আল্লাহ আমার চোখের দৃষ্টি নিয়ে নিয়েছেন, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। কারণ, আমার হৃদয় দৃষ্টিসম্পন্ন। আমি হৃদয়ের চোখ দিয়ে আমার দুনিয়া ও আখিরাত দেখতে পাই। আর হৃদয়ের চোখ দ্বারা এমন বস্তুও দেখা সম্ভব, যা চর্মচক্ষু দ্বারা দেখা সম্ভব নয়।'
অন্ধ কবি নাসর আলি সাইদ মনে করেন যে, তিনি এমন অনেক দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের চেয়ে উত্তম, যারা দুনিয়াতে হিদায়াতবিহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। এমন অসংখ্য অন্ধ লোক আছে, যাদের অন্তর্দৃষ্টি খুবই তীক্ষ্ণ এবং মনোবল উন্নত। অন্ধদের এই সময়ে ওরাই প্রকৃত দৃষ্টিশক্তি-সম্পন্ন।
কত অন্ধ আছে, যাদের বাহ্যিক চোখ নেই, তবুও তারা দেখে। হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখে দেখে তারা সত্যের পথে চলে। আবার অনেক মানুষ চোখ থাকার পরেও অন্ধ। সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত তারা। যেন তাদের চোখের ওপর পর্দা পড়ে আছে।
কাতাদা -কে একজন প্রশ্ন করলেন, 'দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের চেয়ে দৃষ্টিহীন লোক অধিক মেধাবী ও বুদ্ধিমান হয় কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'কারণ তাদের চোখের দৃষ্টিক্ষমতা হৃদয়ে স্থানান্তরিত হয়।'
বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিজ দৃষ্টিশক্তি-বঞ্চিত লোকদের উন্নত মেধার রহস্য উদঘাটন করে বলেন:
'অন্ধ ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি মেধাবী ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী হয়ে থাকে। কারণ, তারা মানুষের মধ্যে পার্থক্যকরণ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত থাকে। দৃষ্টিশক্তি থাকলে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাভাবনা মাথায় আসে। তাই দৃষ্টিশক্তিহীন ব্যক্তির মাথায় চিন্তার জট বাঁধে না। ফলে তার মাথা ও বুদ্ধি নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে।'
বাশশার বিন বুরদ জন্মগতভাবেই অন্ধ ছিলেন। বরং তার কথা অনুযায়ী মায়ের উদরেও তিনি অন্ধ ছিলেন। এ অন্ধত্বকেই তিনি নিজের অকল্পনীয় মেধার রহস্য বলে অভিহিত করতেন। কারণ, চোখের আলো যখন নিভে যায়, তখন সে আলো স্থানান্তরিত হয়ে হৃদয়ে স্থান নেয়। ফলে তার কলবি শক্তি দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের চেয়ে বেশি হয়। এ ব্যাপারে তিনি বলেন:
'মায়ের উদর থেকেই আমি অন্ধ। এই অন্ধত্বই আমার মেধাকে সুতীক্ষ্ণ করেছে। ফলে জ্ঞানসম্বন্ধীয় জটিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমার কাছে অনেক সহজ মনে হয়। তাই তো বলি, আমি অন্ধ নই; বরং চোখের জ্যোতি কলবে স্থানান্তরিত হয়েছে মাত্র। যার ফলে সাধারণ মানুষ জ্ঞানের যেসব বিষয় খুইয়ে বসে, আমার তা অর্জিত হয়।'
এ হলো অন্ধত্বের ইহলৌকিক ও জাগতিক উপকারিতা। এটা ছাড়া ইমানি ও পারলৌকিক উপকারিতাও আছে। জনৈক অন্ধ তবে দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি এই উপকারিতা অনুভব করে কী বলেছেন দেখো :
জুনাইদ বাগদাদি বর্ণনা করেন, 'আমি আবু আব্দুল্লাহ আশনানদির নিকট গেলাম। তিনি চোখে দেখতেন না। সেখানে একজন কারি তিলাওয়াত করলেন :
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
"চোখের খিয়ানত এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।" এ আয়াত শোনার পর তিনি বললেন, “অর্ধেক আমলের হিসাব থেকে আমি মুক্ত."
এ জন্যই বাশশার বিন বুরদকে কেউ অন্ধ বলে তিরস্কার করলে তিনি কোনো পরোয়া করতেন না এবং মনঃক্ষুণ্ণ হতেন না। বরং তিনি চোখের দৃষ্টি না থাকার মধ্যে নিয়ামত অনুভব করতেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন :
'শত্রুরা আমাকে অন্ধ বলে লজ্জা দেয়। এতে আমি লজ্জিত হই না। মানুষ যদি মনুষ্যত্ব ও তাকওয়াকে দেখতে পায়, তাহলে চোখ অন্ধ হলেও কোনো ক্ষতি নেই। অন্ধত্ব পুণ্য অর্জনের মাধ্যম, পুণ্য সঞ্চয়ের উপায় এবং পাপ থেকে বিরত থাকার সহায়ক—যে তিন বিষয়ের আমি ভিখারি।'
তবে এই বোধ মনের মধ্যে আসার জন্য মনটা হতে হবে ইমান ও বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত। সত্যিকার মুমিন ব্যতীত অন্য কারও মনে এই অনুভূতি জাগে না। সত্যিকার মুমিনের মন আল্লাহর আলোয় আলোকিত হয় এবং তিনি যা দিয়ে তাকে সাহায্য করেছেন, তার মধ্যেই শক্তি অনুভব করে। মুস্তফা সাদিক রাফিয়ি এই অনুভূতিকে উন্নত ইচ্ছাশক্তি বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন,
'সুখের রহস্য হচ্ছে তোমার অভ্যন্তরে এমন একটি শক্তি থাকা, যা তোমাকে উত্তম বিষয়কে আরও উত্তম করে অনুধাবন করায় এবং মন্দ বিষয়কে অধিক মন্দ মনে করা থেকে বাধা দেয়।'
তবে মনের মধ্যে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস না থাকার কারণে অন্ধত্বকে অনেক অন্ধ ব্যক্তি আপদ মনে করে। এমনই এক অন্ধ নিজের ঘরকে কবর আখ্যায়িত করে অভিযোগের সুরে বলে:
'হায়, আমি যেন নিজের ঘরেই কবরস্থ হয়ে আছি—যেখানে আমার সকাল- বিকাল একসমান। এ দেখে হিংসুকের মনেও আমার জন্য দয়া আসে। আমার জন্য তারা কাঁদে। তবে এই দয়া ও কান্না আমার কোনো কাজে আসে না。
দুই শ্রেণির মানুষের মাঝে কত বিশাল পার্থক্য দেখো! এ পার্থক্য দেখে অনেক পাশ্চাত্য লেখক ও গবেষক বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। নিচে এ সংক্রান্ত একটি গল্প তুলে ধরা হলো:
টিকাঃ
১৩১. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৬৮।
১৩২. আল-লাতায়িফ ওয়াজ জারায়িফ পৃ. ১১০।
১৩۳. আল-লাতায়িফ ওয়াজ জারায়িফ পৃ. ১১০।
১৩৪. সুরা গাফির, ৪০: ১৯।
১৩৫. দুরারুল হিকাম : পৃ. ৪৯।
১৩৬. ওয়াহইয়ুল কলাম: ১/৫২।
১৩৭. ১৫ নং ফায়দা: ইবনুল কাইয়িম ️ স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রাখার মতো একটি কথা বলেছেন, যা আশাহতদের মনে আশার সঞ্চার করে। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দার জন্য যে ফয়সালাই করেন, সেটাই তার জন্য কল্যাণকর; চাই এ ফয়সালা তার ভালো লাগুক বা খারাপ লাগুক। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যদি কোনো মুমিনকে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা না দেওয়ার পদ্ধতিতে দান করা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তার ওপর যত বালা-মুসিবত ও দুঃখ-দুর্দশা আসে, সবই মূলত নিয়ামত। তবে বান্দা নিজের অজ্ঞতার কারণে কেবল সেই নিয়ামতটিই অনুধাবন করতে পারে, যা তার চাহিদার সাথে মিলে যায় এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ দান করে। সে বান্দার মাঝে সামান্যতমও আল্লাহর মারিফাত বা যথাযথ পরিচয় থাকত, তাহলে সে বঞ্চিত হওয়াকেও নিয়ামত মনে করত এবং বালা-মুসিবতকে রহমত মনে করত। আর সুস্থতা ও নিরাপত্তায় যে রকম সুখ অনুভব করে, তার চেয়ে বেশি সুখ অনুভব করত বালা-মুসিবত ও দুঃখ-দুর্দশায়। প্রাচুর্যে যে সুখ অনুভব করত, তা অপেক্ষা বেশি সুখ অনুভব করত, দারিদ্র্যের মাঝে। অসচ্ছলতার সময়ে সচ্ছলতার সময়ের চেয়ে বেশি আনন্দ অনুভব করত। (মাদারিজুস সালিকিন: ২/২০৭)