📄 সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান
নিয়মিত নফল ইবাদতের সর্বোচ্চ প্রতিদানের কথা এখনো বলা হয়নি। এই প্রতিদান তা অর্জনকারীর জন্য সুমহান মর্যাদা ও অকল্পনীয় সুখের মোহনা। তা হচ্ছে, সে যা-ই চাইবে, তা-ই পেয়ে যাবে:
وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ
'সে যদি আমার কাছে চায়, আমি তাকে অবশ্যই দান করব।'
এবং যা থেকে সে বেঁচে থাকতে চাইবে, তা তার থেকে দূর হয়ে যাবে:
وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ
'আর যদি সে কোনো কিছু থেকে আমার কাছে পানাহ চায়, আমি তাকে অবশ্যই পানাহ দেবো।'
কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়া এবং অপছন্দনীয় বস্তু থেকে বেঁচে থাকা-দুনিয়াতে মানুষের এ দুটিই তো সবচেয়ে বড় কামনার বস্তু। যার এ দুটি অর্জিত হলো, সে যেন গোটা পৃথিবীটাই পেল।
শেষকথা:
জেনে রাখো, আল্লাহর অলি বা বন্ধু হওয়ার জন্য একদম গুনাহমুক্ত থাকা শর্ত নয়। বরং গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে কম্পন অনুভব করা এবং গুনাহের ওপর অটল না থেকে দ্রুত সত্য দিলে তাওবা করে নেওয়া যথেষ্ট। প্রকৃত অলি গুনাহকে তা-ই মনে করে, যেমনটা ইবনুল কাইয়িম বলেছেন:
'নিষিদ্ধ স্বাদ যখন গ্রহণ করা হয়, তখন তা হয় কদর্যতা-মিশ্রিত। গ্রহণ করার পর হয়ে পড়ে ব্যথা-যন্ত্রণা সৃষ্টিকারী।'
টিকাঃ
৮৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১/১৯২।
৮৫. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৮৬. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
📄 তারা দুআ কবুল হওয়ার অধিকার লাভ করেন
হাদিসে আল্লাহর প্রকৃত বন্ধুদের একটি গুণের বর্ণনায় এসেছে:
كَمْ مِنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ مِنْهُمُ البَرَاءُ بْنُ مَالِكِ
'মাথায় উশকোখুশকো চুল ও দেহে ধূলিমলিন দুখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করে কোনো কথা বললে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। বারা বিন মালিক তাদের একজন।'
আল্লাহর কাছে একজন বান্দার অবস্থান কতটা উন্নত হলে সে আল্লাহর ব্যাপারে কসম করতে পারে! অন্য কোনো বান্দা যদি এভাবে শপথ করে, তা বেয়াদবি ও দাসত্বের শিষ্টাচারবহির্ভূত বিবেচিত হবে। কারণ, আল্লাহর জন্য কোনো কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। তিনি মহান স্রষ্টা। যা ইচ্ছা তা-ই করার একচ্ছত্র ক্ষমতা আছে তাঁর। কিন্তু তিনি এ বান্দার সম্মানার্থে তার শপথ পূরণ করাকে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন! অর্থাৎ সে যদি শপথ করে কোনো কিছু সংঘটিত হওয়ার কথা বলে, আল্লাহ তাআলা তা সংঘটিত করেন; যাতে তার শপথ ভঙ্গ না হয়। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে উক্ত বান্দার উচ্চ অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
এবার দেখি, বারা বিন মালিক এই সুযোগের সদ্ব্যবহার কীভাবে করেছেন। কী ছিল তাঁর স্বপ্ন, যার জন্য তিনি আল্লাহকে ডেকেছেন?
তা কি দুনিয়ার সম্পদ ও প্রাচুর্য?
না সুন্দরী কোনো স্ত্রী বা ফলে ফুলে সুশোভিত কোনো কানন?
না তা ছিল ক্ষমতা, প্রভাব বা রাজত্ব?
আল্লাহর কসম, তিনি এসবের কিছুই চাননি। বরং তুসতার যুদ্ধের দিন সৈন্যরা যখন পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে পড়লেন, তখন সবাই তাঁর নিকট জড়ো হলেন। কারণ তাঁর দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারে রাসুল -এর সুসংবাদের কারণে তিনি তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, 'হে বারা, আপনার রবের ওপর কসম করুন!' তখন আল্লাহর এই বন্ধু আল্লাহর নামে কসম করে আবদার জানালেন : 'হে আল্লাহ, আমি আপনার নামে শপথ করে আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আপনি এদের প্রাণে রক্ষা করুন এবং আমাকে শাহাদাত দান করুন!' অথবা বলেছেন, 'আমাকে আপনার নবির সাথে মিলিত করুন!' নবিজি যেভাবে বলেছিলেন, সেভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর শপথ সত্যে পরিণত করেছেন। সবাই প্রাণে রক্ষা পেলেন; কিন্তু তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে নবিজির সাথে মিলিত হলেন।
আরেকজন অলির ঘটনা:
উহুদ যুদ্ধের দিন আমর বিন জামুহ রাসুল-এর নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আজকের দিনে যে শহিদ হবে, সে কি জান্নাতে প্রবেশ করবে?' রাসুল বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন তিনি বললেন, 'সেই সত্তার কসম- যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরে আসব না, যতক্ষণ না জান্নাতে প্রবেশ করি।' এ কথা শুনে উমর-এর মনে হলো, আমর বিন জামুহ আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করেছেন; অথচ আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করার অধিকার বান্দার নেই। কারণ আল্লাহর জন্য কোনো কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। বরং আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করার একচেটিয়া অধিকার রাখেন। তাই উমর রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'হে আমর, আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করো না।' তখন রাসুল বললেন:
مَهْلًا يَا عُمَرُ، فَإِنَّ مِنْهُمْ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ: مِنْهُمْ عَمْرُو بْنُ الْجُمُوحِ، يَخُوضُ فِي الْجَنَّةِ بِعَرْجَتِهِ
'থামো উমর! সে ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহর ব্যাপারে কসম করে কোনো কথা বললে আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। সে তার খঞ্জত্ব নিয়েই (খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে) জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
তৃতীয় আরেকজন অলি আনাস বিন নাজার-এর ঘটনা :
তাঁর বোন রুবাইয়ি একজন মহিলার সামনের দাঁত ভেঙে দিলেন। এতে ওই মহিলার পরিবারের লোকজন এর কিসাস (দাঁতের বদলে দাঁত ভেঙে দেওয়া) দাবি করল। আনাস' ও তাঁর বোন তাদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু তারা ক্ষমা করতে অস্বীকার করলেন এবং রাসুল-এর কাছে বিচার নিয়ে গেলেন। রাসুল কুরআনের বিধান অনুযায়ী দাঁতের বদলে দাঁত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন আনাস বললেন:
'ইয়া রাসুলাল্লাহ, রুবাইয়ির দাঁত ভেঙে ফেলা হবে? সেই সত্তার কসম—যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, কেউ তার দাঁত ভাঙতে পারবে না!'
কথাটি তিনি আল্লাহ ও রাসুলের হুকুমের বিরোধিতা করার জন্য বলেননি। বরং এ কথা বলে তিনি মূলত মহিলার পরিবারের লোকজনকে ক্ষমা অথবা রক্তপণের ব্যাপারে সম্মত করতে চাইছিলেন।
রাসুল বললেন, (يَا أَنْسُ كِتَابُ اللهِ القِصَاصُ) ‘আনাস, আল্লাহর কিতাব তো কিসাসের (দাঁতের বদলে দাঁত) কথা বলে।’
কিন্তু পরক্ষণেই তারা রক্তপণ নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করল। তখন রাসুল বললেন:
إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
‘আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা তাঁর নামে কসম করে কোনো কথা বললে, আল্লাহ তাআলা তা সত্যে পরিণত করেন।’
টিকাঃ
৮৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৮৫৪।
৮৮. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৭০২৪, আত-তালিকাতুল হিসান আলা সহিহি ইবনি হিব্বান: ৬৯৮৫। ১১ নং ফায়দা : উমর এ-ও এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিও আল্লাহর নামে কসম করে একটি কথা বলেছিলেন, যা আল্লাহ তাআলা বাস্তবায়ন করেছেন। হাফসা বলেন, 'উমর-কে আমি বলতে শুনেছিলাম, “হে আল্লাহ, আমি আপনার রাস্তায় শহিদ হতে চাই এবং আপনার নবির শহরে মৃত্যুবরণ করতে চাই।” আমি বললাম, "এটা কীভাবে সম্ভব হবে?” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ যদি চান, তাহলে তিনিই এটা সম্ভব করবেন।" (ফাতহুল বারি: ৪/৭১)
৮৯. সহিহুল বুখারি: ২৭০৩।
📄 আলিম অলিদের বিশ্বাস
আল্লাহর অলিদের স্বভাব হচ্ছে, তাঁরা উম্মাহর জন্য, উম্মাহর দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য বিশেষভাবে দুআ করতেন। তাঁদের অন্যতম হলেন শাইখুল ইসলাম উস্তাজ আবু উসমান আল-হিয়ারি। তাঁকে খোরাসানের জুনাইদ বাগদাদি বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁর বিস্ময়কর গল্পটি শোনো:
অত্যাচারী আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ খুজুস্তানি—যে বিভিন্ন শহরের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল—ইমাম হাইকান বিন জুহালিকে হত্যা করে ফেলল। এরপর থেকে তার জুলুম ও কঠোরতা আরও বেড়ে গেল। তার জুলুম এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গেল যে, তার নির্দেশে একটা বর্শা মাটিতে গেঁথে দেওয়া হলো, তারপর শহরের নেতৃস্থানীয় লোকদের বলা হলো, এর চতুষ্পার্শ্বে দিরহাম ঢালো। দিরহামের স্তূপ যদি বর্শার মাথা অবধি পৌঁছে সেটাকে অদৃশ্য করতে না পারে, তাহলে সবাইকে হত্যা করা হবে। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে এই অর্থদণ্ডের পরিমাণ ভাগ করে নিল। জনৈক ব্যবসায়ীকে তিরিশ হাজার দিরহাম দিতে বলল। কিন্তু তার হাতে শুধু তিন হাজার দিরহাম ছিল।
তাই সে ওই দিরহামসমূহ নিয়ে শাইখুল ইসলাম আবু উসমান হিয়ারির নিকট আসলো। তাঁকে বলল, 'শাইখ, আপনি তো শুনেছেন, এই লোকটা কী পরিমাণ দিরহাম জমা দিতে বলেছে; কিন্তু আমার কাছে শুধু এটুকুই আছে।' শাইখ বললেন, 'আমাকে অনুমতি দাও; যাতে এ দিরহামগুলো নিয়ে আমি এমন একটা কাজ করতে পারি, যা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে।' ব্যবসায়ী অনুমতি দিল। তখন তিনি ওই দিরহামগুলো গরিব ও অসহায়দের মাঝে বণ্টন করে দিলেন। আর ব্যবসায়ীকে বললেন, 'আমার নিকট অবস্থান করো।' শাইখ আবু উসমান সে রাতে ভোর পর্যন্ত মসজিদে আসা-যাওয়া করলেন। ফজরের আজান দিলে তিনি খাদিমকে বললেন, 'বাজারে গিয়ে সেখানের অবস্থা দেখে আসো।' খাদিম ফিরে এসে বলল, 'সেখানে তো উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু লক্ষ করলাম না। এরপর খাদিমকে আবার বাজারে পাঠিয়ে তিনি মুনাজাত ধরলেন। মুনাজাতে আল্লাহকে কসম দিয়ে বললেন, 'আপনাকে কসম দিয়ে বলছি, যতক্ষণ না আপনি দুর্দশাগ্রস্তদের দুর্দশা দূর করবেন, আমি এখান থেকে উঠব না।' বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর খাদিম এসে খবর দিল, 'আল্লাহ তাআলা কিতালকে মুমিনদের জন্য যথেষ্ট করে দিয়েছেন। আহমাদ বিন আব্দুল্লাহর পেট বিদীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে।' এ খবর শোনার পর আবু উসমান (ফজরের) নামাজের ইকামত দিলেন।
তাঁর মতো আরেকজন হলেন যুগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম ও প্রখ্যাত দায়ি ইলাল্লাহ আলিমকুল সম্রাট ইজ বিন আবদুস সালাম। 'তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ' কিতাবের প্রণেতা নিজ কিতাবের মধ্যে তাঁর আলোচনা এবং ইউরোপীয়দের দমইয়াত আক্রমণ করার সময় তাঁর দুআ কবুল হওয়া-সম্পর্কিত একটি কারামতের কথা বর্ণনা করেছেন:
ফিরিঙ্গিরা জাহাজের বহর নিয়ে মনসুরা পৌঁছে গেল এবং মুসলিমদের পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। শাইখ মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। সে সময় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো মুসলিমদের দিকে প্রবল বেগে বাতাস বইতে লাগল। মুসলিমদের এমন করুণ অবস্থা দেখে শাইখ বাতাসের দিকে হাত দ্বারা ইশারা করে উঁচু স্বরে বললেন, 'হে বাতাস, কাফিরদের ধরো।' এভাবে কয়েকবার বলার পর বিস্ময়করভাবে বাতাস গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরিঙ্গিদের নৌবহরের দিকে বইতে শুরু করল। ফলে অধিকাংশ ফিরিঙ্গি ডুবে প্রাণ হারাল। এমন কারামাত দেখে মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে একজন বলে উঠলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে মুহাম্মাদ -এর উম্মাহর ওই ব্যক্তিকে দেখালেন, যার জন্য তিনি বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছেন।'
টিকাঃ
৯০. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৪/৬৫-৬৬।
৯১. তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ আল-কুবরা: ৮/২১৬।
📄 মানুষের ভালোবাসা
আল্লাহ তোমাকে ভালোবেসেছেন; ফলে লোকেরাও তোমাকে ভালোবেসেছে। তুমি তাঁর কাছে এসেছ; ফলে লোকেরাও তোমাকে কাছে টেনে নিয়েছে। কারণ তিনি ছাড়া মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও মনের কর্তৃত্ব অন্য কারও নেই। আসমান ও জমিনে তোমাকে কেবল তিনিই গ্রহণযোগ্যতা দান করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালোবাসা দেবেন। '
একটি হাদিসে রাসুল এ আয়াতের খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন :
إِذَا أَحَبَّ اللَّهُ العَبْدَ نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحْبِبْهُ، فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، فَيُنَادِي جِبْرِيلُ فِي أَهْلِ السَّمَاءِ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ القَبُولُ فِي الْأَرْضِ
'যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরিল -কে ডেকে বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তুমিও তাকে ভালোবাসো।” তখন জিবরিল -ও তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরিল আসমানবাসীদের মাঝে ঘোষণা করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তাই তোমরাও তাকে ভালোবাসো।” তখন আসমানবাসীরাও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। অতঃপর পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। '
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস শোনার সাথে সাথেই বলে উঠলেন:
'যখন কোনো বান্দা নিজের অন্তর দিয়ে আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরের মাধ্যমে তার প্রতি মনোযোগী হন। '
হে সৎকর্মশীল ভাই, এই গ্রহণযোগ্যতা তোমার জান্নাতের সার্টিফিকেট এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ। তোমার ইবাদত তোমার জন্য মানুষের অন্তরসমূহ খুলে দেয়। তদ্রূপ তোমার পাপ তোমার জন্য মানুষের অন্তরসমূহকে তালাবদ্ধ করে দেয়; ফলে মানুষের মনে তোমার প্রতি অনুগ্রহ ও ভালোবাসা থাকে না। এ জন্যেই আবু দারদা মাসলামা বিন মাখলাদ আনসারি-কে চিঠি লিখলেন:
'পরসমাচার এই যে, বান্দা যখন আল্লাহর ইবাদত করে, তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে তাঁর মাখলুকের মাঝে প্রিয় করে তোলেন। কিন্তু যখন সে তাঁর নাফরমানি করে, তখন তিনি তাকে ঘৃণা করেন। আর তিনি যাকে ঘৃণা করেন, মাখলুকের মনেও তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দেন। '
নিচে আরেকটি হাদিসে তোমার জন্য মহা সুসংবাদ অপেক্ষা করছে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবুল আসওয়াদ দুয়ালি। তিনি বলেন :
আমি মদিনায় গিয়ে উমর বিন খাত্তাব-এর মজলিশে বসলাম। তখন উপস্থিত লোকদের পাশ দিয়ে একটি মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হলে তারা মৃত লোকটির প্রশংসা করলেন। তা দেখে উমর বললেন, 'তার জন্য আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।' আমি উমর-কে বললাম, 'কী আবশ্যক হয়ে গিয়েছে?' তিনি বললেন, 'আমি তা-ই বলেছি, যা রাসুল বলেছেন :
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ لَهُ ثَلَاثَةٌ إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الجَنَّةُ
“যে মুসলিমের পক্ষে তিনজন ব্যক্তি (ভালো হওয়ার) সাক্ষ্য দেবে, তার জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়ে যায়।”
তখন আমরা বললাম, “দুজন সাক্ষ্য দিলেও কি একই কথা?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, দুজন সাক্ষ্য দিলেও।” এরপর একজনের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসা করিনি। '
এখানে কারও মনে একটি অমূলক প্রশ্ন আসতে পারে যে, দ্বিতীয় হাদিসটি প্রথম হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, দ্বিতীয় হাদিসে মাত্র তিনজন বা দুজনের সাক্ষ্য জরুরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রথম হাদিসে অগণিত, অসংখ্য মুসলিমের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আগেই বলেছি, প্রশ্নটি অমূলক। দুই হাদিসের মধ্যে কোনো ধরনের বৈপরীত্য বা সংঘর্ষ নেই। কারণ, প্রথম হাদিসে গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, যা কেবল মানুষের মুখে শোনার মাধ্যমেই সাব্যস্ত হয়ে যায়। তাই সেখানে অধিক লোকের গ্রহণযোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাক্ষ্য, যার জন্য সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে তার অবস্থা পূর্ণরূপে জানার পরে দেওয়া হয়। তাই সেখানে চারজন, তিনজন বা দুইজনের সাক্ষ্যই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে।
যদি তুমি তোমার রবের আনুগত্য করো, তাহলে তিনি তোমাকে প্রতিদান দেবেন। অচিরেই আল্লাহ তাআলা মাখলুকের অন্তরে তোমার প্রভাব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। ফলে তাদের জিহ্বা তোমার প্রশংসা করবে এবং পৃথিবীতে তোমার কখনো নিজেকে একা মনে হবে না। একাকিত্বের কষ্টে তোমাকে ভুগতে হবে না। এটাই মুমিনের জন্য আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আগাম সুসংবাদ। এ জন্যই কাব বলতেন:
'দুনিয়াতে কোনো বান্দার তখনই প্রশংসা করা হয়, যখন আসমানে তার প্রশংসা করা হয়। '
তবে যার তার প্রশংসা তোমার কাজে আসবে না। তোমার ব্যাপারে তাদের প্রশংসাই তোমার কাজে আসবে, যাদের সাথে তুমি মেলামেশা করো এবং জীবন কাটাও। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সত্যবাদী ধরা হবে তোমার প্রতিবেশীদের। এ জন্যই একটি সহিহ হাদিসে তোমার ভালো হওয়া ও খারাপ হওয়ার মানদণ্ড স্থির করা হয়েছে প্রতিবেশীর সাক্ষ্যকে। রাসুল ইরশাদ করেন:
إِذَا قَالَ جِيرَانُكَ: إِنَّكَ مُحْسِنُ فَأَنْتَ مُحْسِنٌ، وَإِذَا قَالَ جِيرَانُكَ: إِنَّكَ مُسِيءُ فَإِنَّكَ مُسِيءٌ
'যখন তোমার প্রতিবেশীরা তোমার ব্যাপারে বলে যে, তুমি ভালো মানুষ, তাহলে তুমি ভালো মানুষ। আর যদি তারা তোমাকে খারাপ মানুষ বলে, তাহলে তুমি খারাপ মানুষ। '
দুনিয়াতে মানুষের প্রশংসা ও ভালোবাসার নিয়ামত আখিরাতের নিয়ামতের সুসংবাদ। যাদের অন্তরে প্রাণ আছে, ইমানের নুর আছে, তারা এটা উপলব্ধি করতে পারেন। তাদেরই একজন হলেন আলিমকুল শিরোমণি সুফইয়ান সাওরি । তিনি তোমার হৃদয়ের জন্য চমৎকার একটি বাণী উপহার দিয়েছেন:
'আল্লাহ তাআলা এমন নন যে, কোনো বান্দাকে দুনিয়াতে (মানুষের প্রশংসা ও ভালোবাসার) নিয়ামত দান করবেন; কিন্তু আখিরাতে তাকে লাঞ্ছিত করবেন। কেননা, তিনি কাউকে অসম্পূর্ণ নিয়ামত দান করেন না। যাকে দান করেন, তাকে পরিপূর্ণরূপে দান করেন। এটাকে তিনি নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন। '
এবার তুমি রাসুল-এর নিম্নোক্ত হাদিসের অর্থ ও রহস্য ঠিক ঠিক বুঝতে পারবে:
مَا مِنْ رَجُلٍ يُصَلِّي عَلَيْهِ مِائَةٌ إِلَّا غُفِرَ لَهُ
'যে ব্যক্তির জানাজার সালাতে একশ জন (ইমানদার) লোক শরিক হয়, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
নিঃসন্দেহে এটা তার গ্রহণযোগ্যতার লক্ষণ। এ সৌভাগ্য তখনই অর্জিত হবে, যখন তুমি আল্লাহর বিধান ও সন্তুষ্টিকে সকল কিছুর ওপর প্রাধান্য দেবে।
টিকাঃ
৯২. সুরা মারইয়াম, ১৯: ৯৬।
৯৩. সহিহুল বুখারি: ৩২০৯, সহিহু মুসলিম: ২৬৩৭।
৯৪. আজ-জুহদুল কবির: ১/২৯৯।
৯৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/২৪০।
৯৬. সুনানুত তিরমিজি: ১০৫৯।
৯৭. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩৬৭।
৯৮. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৫২৫, মুসনাদুল বাজ্জার: ১৬৭৫।
৯৯. উদ্দাতুস সাবিরিন: পৃ. ১৩৭।