📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 একটি চমৎকার নফল ইবাদত

📄 একটি চমৎকার নফল ইবাদত


ইলম অর্জন করা অন্য অনেক নফল ইবাদতের চেয়ে একটি উৎকৃষ্ট নফল ইবাদত। সহিহ হাদিসে এসেছে:
فَضْلُ الْعِلْمِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ
'আমার কাছে ইবাদতের আধিক্যের চেয়ে ইলমের আধিক্য বেশি প্রিয়। '

আবু দারদা বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বলেন, 'রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার চেয়ে একটি মাসআলা শিখা আমার কাছে অধিক প্রিয়। '

উম্মাহর আরও দুজন নেতৃস্থানীয় আলিম সুফইয়ান সাওরি ও শাফিয়ি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন:
'ফরজের পরে ইলম অর্জন করার চেয়ে উত্তম কোনো আমল নেই।'

ইবনুল জাওজি 'তালবিসু ইবলিস' নামক কিতাবের শুরুতে ইবাদতে আগ্রহী লোকদের ইলম অর্জনের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বসরার ইমাম মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহর একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন :
'ইলমের আধিক্য ইবাদতের আধিক্য অপেক্ষা উত্তম।'

শামের বিখ্যাত আবিদ ইউসুফ বিন আসবাতের একটি উক্তি উল্লেখ করেছেন:
'ইলমের একটি অধ্যায় শিক্ষা করা সত্তরটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার চেয়ে উত্তম।'

ইরাকের ইয়াকুত খ্যাত মুআফি বিন ইমরানেরও একটি কথা উল্লেখ করেছেন :
'একটি হাদিস লিপিবদ্ধ করা আমার কাছে এক রাত তাহাজ্জুদ পড়ার চেয়ে বেশি প্রিয়। '

বদরুদ্দিন বিন জামাআহ ইলমপিপাসুদের দারুণ একটি কথা উপহার দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইলম অর্জনের ফজিলত ও গুরুত্বের ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
'আল্লাহর জন্য ইলম অর্জন করা নামাজ, রোজা, তাসবিহ, দুআ প্রভৃতি শারীরিক ইবাদতের চেয়ে উত্তম। কেননা :
* ইলমের উপকারিতা তার অর্জনকারীকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনই সাধারণভাবে সকল মাখলুককেও অন্তর্ভুক্ত করে।
* ইলম অন্যান্য ইবাদতকে সংশোধন করে। সুতরাং সেগুলো ইলমের প্রতি মুখাপেক্ষী এবং নির্ভরশীল। কিন্তু ইলম সেগুলোর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়।
* তদুপরি, হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আলিমগণ নবিগণের উত্তরসূরি। আবিদগণের ব্যাপারে এমন কথা বলা হয়নি।
* ইলমের ব্যাপারে সাধারণ লোকদের ওপর আলিমের আনুগত্য করা ওয়াজিব।
* ইলমের প্রভাব তার ধারকের মৃত্যুর পরেও জীবিত থাকে; কিন্তু অন্যান্য নফলের প্রভাব তার আদায়কারী মারা যাওয়ার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়।
* ইলম বাকি থাকলে শরিয়াহ জীবিত থাকবে এবং উম্মাহর নিদর্শনসমূহ সুরক্ষিত থাকবে। '

টিকাঃ
৭৯. মুসনাদুল বাজ্জার: ২৯৬৯, মুসতাদরাকুল হাকিম: ৩১৪, সহিহুল জামি: ৪২১৪। ৯ নং ফায়দা : ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আমলের সাওয়াব সেই আমলের উপকারিতা ও ফায়দার ভিত্তিতে হয়।
৮০. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ১/৯।
৮১. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি: ১/১২৩-১২৪।
৮২. তালবিসু ইবলিস: পৃ. ১২১।
৮৩. তাজকিরাতুস সামি: পৃ. ১৩। ১০ নং ফায়দা: ইবনে হাজম বলেন, 'যে ব্যক্তি ইলম নিয়ে কৃপণতা করে, সে সম্পদ নিয়ে কৃপণতাকারী ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট। কেননা, যে ব্যক্তি সম্পদ নিয়ে কৃপণতা করে, সে এমন বস্তু নিয়ে কৃপণতা করে, যা খরচ করলে কমে যায়। কিন্তু কৃপণ আলিম এমন বস্তু নিয়ে কৃপণতা করে, যা যতই খরচ করুক, ফুরায় না।' (আল-আখলাকু ওয়াস সিয়ার: ১/২২)

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর ভালোবাসার স্তরে পৌঁছানোর লক্ষণ

📄 আল্লাহর ভালোবাসার স্তরে পৌঁছানোর লক্ষণ


ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, নিয়মিত নফল ইবাদতের ফলে অর্জিত চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আল্লাহর ভালোবাসা। তবে সফলতার এই স্তরে উপনীত হওয়ার আলামত কী? খোদ আল্লাহই জানিয়ে দিচ্ছেন তার আলামত:
'আমি তার কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যাই!'

• ফলে তোমার কান তার রবের নির্দেশ মেনে চলে, শয়তান ও মন্দকর্মের নির্দেশ দানকারী নফসের কথা শোনে না। যেহেতু কান দিয়ে যা-ই প্রবেশ করে, তা-ই কলবে স্থানান্তরিত হয়, তা-ই তোমার জীবিত কলব খুব সতর্ক থেকে আল্লাহর বিধানবিরোধী বিষয়গুলোকে প্রতিহত করে। ফলে এরপর থেকে কান কেবল বিধিসম্মত বিষয়গুলোকেই গ্রহণ করে। তাই যেকোনো ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা ও বিভ্রান্ত মানহাজের ব্যাপারে তোমার কান বধির এবং কলব তালাবদ্ধ হয়ে থাকে。

• তোমার চোখ দূরদর্শী হয়। কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর ওপর তা নিবদ্ধ হয় না। অজান্তে নিবদ্ধ হলে দ্রুত ফিরে আসে। তুমি সবকিছু আখিরাতের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে শুরু করো। ফলে যেসব বিষয় আখিরাতের ধনভান্ডার সমৃদ্ধ করে তা তোমার চোখে সুন্দর দেখায়, আর যেসব বিষয় আমল পরিমাপের মানদণ্ডে তোমার সাওয়াবের পাল্লা হালকা করবে, তা অসুন্দর দেখায়। চোখের এই ক্ষমতা তুমি এ জন্যই লাভ করেছ যে, তুমি দৃষ্টিকে সংযত ও অবনত রেখেছ। ফলে আল্লাহ তাআলা তোমার দৃষ্টিকে দূরদর্শী করে দিয়েছেন। অপরদিকে অন্যজন তার দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত ছেড়ে দিয়েছে। যেখানে ইচ্ছা নিবদ্ধ করেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতা ছিনিয়ে নিয়েছেন।

• যেদিকে গেলে তোমার রব অসন্তুষ্ট হন, তোমার পা সেদিকে অগ্রসর হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সৃষ্টির সেবার প্রতি ধাবিত হয়। দাওয়াহ ও কল্যাণের অলিগলিতে বিচরণ করে। অকল্যাণ, জুলুম, জালিমের সহায়তা ও পাপিষ্ঠদের প্রাঙ্গণে আনাগোনা করে না。

• তোমার হাত আল্লাহর পথে অবিরাম লিখে চলে। কাজ করে। কষ্ট সহ্য করে। এতটুকুই নয়; বরং জালিমের জুলুম প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয় তোমার হাত। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে যায়। জুলুম ও সীমালঙ্ঘনে অংশ নেয় না। হারাম স্পর্শ করে না। চুরি করে না। খিয়ানত করে না।
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে তুমি সত্যিকার অর্থে তাঁর দাসে পরিণত হবে। তাঁর বিধিনিষেধের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পিত হবে। ফলে তোমার সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে সেসব বিষয়ের প্রতি, যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। যেসব বিষয় তাঁর অপছন্দনীয়, সেসব থেকে দূরে থাকবে। হালাল দিয়েই তোমার হয়ে যাবে, হারামের দিকে পা বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যে যতটা সুখ অনুভূত হবে, অন্য কারও নৈকট্যে ততটুকু হবে না।

অধিকাংশ মানুষ ইবাদতের ওপর অটল থাকার ক্ষেত্রে যে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং ভালো ও মন্দ কর্মের ব্যাপারে যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, তার সমাধান এটাই। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যে সুখ অনুভব করা। সুতরাং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে ভালো-মন্দের মধ্যকার দ্বিধাবোধ কেটে গিয়ে ভালোর ওপর স্থিরতা সৃষ্টি হয়। ফিতনা ও অশ্লীলতার এ যুগে এটাই চরম আকাঙ্ক্ষিত বিষয়।

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে তোমার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহপ্রেম তোমার হৃদয়ের কর্তৃত্ব নিয়ে নেবে। ফলে তুমি সেটাই দেখতে পাবে, যা আল্লাহর পছন্দনীয়। তা-ই শুনতে পাবে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। আসলে মনের অবস্থা এমন হওয়াটাই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকার প্রমাণ।

প্রেমিকা আবলার প্রতি কবি আনতারার ভালোবাসা কত গভীর ছিল, তা জানলে আল্লাহপ্রেমের দাবিদার বান্দাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। কবি বলেন:
‘তোমাকে আমার তখনও মনে পড়েছে, যখন বর্শা আমার রক্ত চুষছিল এবং আমার ভারতীয় শুভ্র তরবারি থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল তরবারির গায়ে চুমু এঁকে দিই। কারণ, তা তোমার হাস্যময়ী উষ্টদ্বয়ের মতো ঝিকমিক করছিল।’

দেখো, যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও কবি তার প্রিয়তমাকে ভুলে থাকতে পারেননি। বরং শত্রুর তরবারি ও বর্শার চমকে প্রেয়সীর হাসিমুখ দেখতে পেয়েছেন। এই যদি হয় সৃষ্টির প্রতি সৃষ্টির ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম, তাহলে স্রষ্টার প্রতি আমাদের প্রেম-ভালোবাসা কেমন হতে হবে!? তদুপরি, তিনি আমাদের কেবল স্রষ্টাই নন; বরং তিনি আমাদের এমন প্রভুও বটেন, যিনি আমাদের দান করেছেন অসংখ্য অগণিত নিয়ামত; যিনি আমাদের ভালোবেসেছেন আমরা তাঁকে ভালোবাসার পূর্বে; আমাদের স্মরণ করেছেন আমরা তাঁকে স্মরণ করার আগে এবং আমাদের তাঁর প্রিয়জন করেছেন; অথচ তাঁর প্রিয়জন হওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমাদের নেই!

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হওয়ার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে অবস্থার পরিবর্তন ও উন্নয়ন। তার কয়েকটি স্বরূপ এখানে তুলে ধরা হলো:
* কুরআন তিলাওয়াত করার প্রাথমিক অবস্থা থেকে কুরআন বুঝে পড়া, কুরআন নিয়ে পরিশোধিত ও প্রভাবিত হওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন করার অবস্থায় উন্নীত হওয়া。
* রাগ দমন করার অবস্থা, মন্দ আচরণকারীকে ক্ষমা করা এবং তার সাথে সদাচরণ করায় পরিবর্তিত হওয়া。
* দায়িত্ববোধ থেকে জাকাত আদায় করার অবস্থা থেকে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করতে আনন্দ অনুভব করা অবস্থায় উন্নীত হওয়া。
* আল্লাহর রাস্তায় কষ্ট সহ্য করা ও ধৈর্যধারণ করার অবস্থা উন্নত হয়ে তাকদিরের ফয়সালার ওপর আনন্দিত হওয়ার অবস্থা আসা।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান

📄 সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান


নিয়মিত নফল ইবাদতের সর্বোচ্চ প্রতিদানের কথা এখনো বলা হয়নি। এই প্রতিদান তা অর্জনকারীর জন্য সুমহান মর্যাদা ও অকল্পনীয় সুখের মোহনা। তা হচ্ছে, সে যা-ই চাইবে, তা-ই পেয়ে যাবে:
وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ
'সে যদি আমার কাছে চায়, আমি তাকে অবশ্যই দান করব।'

এবং যা থেকে সে বেঁচে থাকতে চাইবে, তা তার থেকে দূর হয়ে যাবে:
وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ
'আর যদি সে কোনো কিছু থেকে আমার কাছে পানাহ চায়, আমি তাকে অবশ্যই পানাহ দেবো।'

কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়া এবং অপছন্দনীয় বস্তু থেকে বেঁচে থাকা-দুনিয়াতে মানুষের এ দুটিই তো সবচেয়ে বড় কামনার বস্তু। যার এ দুটি অর্জিত হলো, সে যেন গোটা পৃথিবীটাই পেল।

শেষকথা:
জেনে রাখো, আল্লাহর অলি বা বন্ধু হওয়ার জন্য একদম গুনাহমুক্ত থাকা শর্ত নয়। বরং গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে কম্পন অনুভব করা এবং গুনাহের ওপর অটল না থেকে দ্রুত সত্য দিলে তাওবা করে নেওয়া যথেষ্ট। প্রকৃত অলি গুনাহকে তা-ই মনে করে, যেমনটা ইবনুল কাইয়িম বলেছেন:
'নিষিদ্ধ স্বাদ যখন গ্রহণ করা হয়, তখন তা হয় কদর্যতা-মিশ্রিত। গ্রহণ করার পর হয়ে পড়ে ব্যথা-যন্ত্রণা সৃষ্টিকারী।'

টিকাঃ
৮৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১/১৯২।
৮৫. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৮৬. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তারা দুআ কবুল হওয়ার অধিকার লাভ করেন

📄 তারা দুআ কবুল হওয়ার অধিকার লাভ করেন


হাদিসে আল্লাহর প্রকৃত বন্ধুদের একটি গুণের বর্ণনায় এসেছে:
كَمْ مِنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ مِنْهُمُ البَرَاءُ بْنُ مَالِكِ
'মাথায় উশকোখুশকো চুল ও দেহে ধূলিমলিন দুখানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করে কোনো কথা বললে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। বারা বিন মালিক তাদের একজন।'

আল্লাহর কাছে একজন বান্দার অবস্থান কতটা উন্নত হলে সে আল্লাহর ব্যাপারে কসম করতে পারে! অন্য কোনো বান্দা যদি এভাবে শপথ করে, তা বেয়াদবি ও দাসত্বের শিষ্টাচারবহির্ভূত বিবেচিত হবে। কারণ, আল্লাহর জন্য কোনো কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। তিনি মহান স্রষ্টা। যা ইচ্ছা তা-ই করার একচ্ছত্র ক্ষমতা আছে তাঁর। কিন্তু তিনি এ বান্দার সম্মানার্থে তার শপথ পূরণ করাকে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন! অর্থাৎ সে যদি শপথ করে কোনো কিছু সংঘটিত হওয়ার কথা বলে, আল্লাহ তাআলা তা সংঘটিত করেন; যাতে তার শপথ ভঙ্গ না হয়। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর কাছে উক্ত বান্দার উচ্চ অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।

এবার দেখি, বারা বিন মালিক এই সুযোগের সদ্ব্যবহার কীভাবে করেছেন। কী ছিল তাঁর স্বপ্ন, যার জন্য তিনি আল্লাহকে ডেকেছেন?

তা কি দুনিয়ার সম্পদ ও প্রাচুর্য?
না সুন্দরী কোনো স্ত্রী বা ফলে ফুলে সুশোভিত কোনো কানন?
না তা ছিল ক্ষমতা, প্রভাব বা রাজত্ব?

আল্লাহর কসম, তিনি এসবের কিছুই চাননি। বরং তুসতার যুদ্ধের দিন সৈন্যরা যখন পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে পড়লেন, তখন সবাই তাঁর নিকট জড়ো হলেন। কারণ তাঁর দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারে রাসুল -এর সুসংবাদের কারণে তিনি তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, 'হে বারা, আপনার রবের ওপর কসম করুন!' তখন আল্লাহর এই বন্ধু আল্লাহর নামে কসম করে আবদার জানালেন : 'হে আল্লাহ, আমি আপনার নামে শপথ করে আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি, আপনি এদের প্রাণে রক্ষা করুন এবং আমাকে শাহাদাত দান করুন!' অথবা বলেছেন, 'আমাকে আপনার নবির সাথে মিলিত করুন!' নবিজি যেভাবে বলেছিলেন, সেভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর শপথ সত্যে পরিণত করেছেন। সবাই প্রাণে রক্ষা পেলেন; কিন্তু তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে নবিজির সাথে মিলিত হলেন।

আরেকজন অলির ঘটনা:
উহুদ যুদ্ধের দিন আমর বিন জামুহ রাসুল-এর নিকট এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আজকের দিনে যে শহিদ হবে, সে কি জান্নাতে প্রবেশ করবে?' রাসুল বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন তিনি বললেন, 'সেই সত্তার কসম- যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরে আসব না, যতক্ষণ না জান্নাতে প্রবেশ করি।' এ কথা শুনে উমর-এর মনে হলো, আমর বিন জামুহ আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করেছেন; অথচ আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করার অধিকার বান্দার নেই। কারণ আল্লাহর জন্য কোনো কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। বরং আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করার একচেটিয়া অধিকার রাখেন। তাই উমর রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'হে আমর, আল্লাহর ব্যাপারে শপথ করো না।' তখন রাসুল বললেন:
مَهْلًا يَا عُمَرُ، فَإِنَّ مِنْهُمْ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ: مِنْهُمْ عَمْرُو بْنُ الْجُمُوحِ، يَخُوضُ فِي الْجَنَّةِ بِعَرْجَتِهِ
'থামো উমর! সে ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহর ব্যাপারে কসম করে কোনো কথা বললে আল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। সে তার খঞ্জত্ব নিয়েই (খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে) জান্নাতে প্রবেশ করবে।'

তৃতীয় আরেকজন অলি আনাস বিন নাজার-এর ঘটনা :
তাঁর বোন রুবাইয়ি একজন মহিলার সামনের দাঁত ভেঙে দিলেন। এতে ওই মহিলার পরিবারের লোকজন এর কিসাস (দাঁতের বদলে দাঁত ভেঙে দেওয়া) দাবি করল। আনাস' ও তাঁর বোন তাদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু তারা ক্ষমা করতে অস্বীকার করলেন এবং রাসুল-এর কাছে বিচার নিয়ে গেলেন। রাসুল কুরআনের বিধান অনুযায়ী দাঁতের বদলে দাঁত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন আনাস বললেন:
'ইয়া রাসুলাল্লাহ, রুবাইয়ির দাঁত ভেঙে ফেলা হবে? সেই সত্তার কসম—যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, কেউ তার দাঁত ভাঙতে পারবে না!'

কথাটি তিনি আল্লাহ ও রাসুলের হুকুমের বিরোধিতা করার জন্য বলেননি। বরং এ কথা বলে তিনি মূলত মহিলার পরিবারের লোকজনকে ক্ষমা অথবা রক্তপণের ব্যাপারে সম্মত করতে চাইছিলেন।

রাসুল বললেন, (يَا أَنْسُ كِتَابُ اللهِ القِصَاصُ) ‘আনাস, আল্লাহর কিতাব তো কিসাসের (দাঁতের বদলে দাঁত) কথা বলে।’

কিন্তু পরক্ষণেই তারা রক্তপণ নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করল। তখন রাসুল বললেন:
إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
‘আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা তাঁর নামে কসম করে কোনো কথা বললে, আল্লাহ তাআলা তা সত্যে পরিণত করেন।’

টিকাঃ
৮৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৮৫৪।
৮৮. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৭০২৪, আত-তালিকাতুল হিসান আলা সহিহি ইবনি হিব্বান: ৬৯৮৫। ১১ নং ফায়দা : উমর এ-ও এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনিও আল্লাহর নামে কসম করে একটি কথা বলেছিলেন, যা আল্লাহ তাআলা বাস্তবায়ন করেছেন। হাফসা বলেন, 'উমর-কে আমি বলতে শুনেছিলাম, “হে আল্লাহ, আমি আপনার রাস্তায় শহিদ হতে চাই এবং আপনার নবির শহরে মৃত্যুবরণ করতে চাই।” আমি বললাম, "এটা কীভাবে সম্ভব হবে?” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ যদি চান, তাহলে তিনিই এটা সম্ভব করবেন।" (ফাতহুল বারি: ৪/৭১)
৮৯. সহিহুল বুখারি: ২৭০৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00