📄 নফল মজবুত দুর্গ
হে ভাই, নফল ত্যাগ করার ভয়াবহতম পরিণতি হচ্ছে তোমার ওপর শয়তান নিজের প্রভাব খাটানো এবং তোমার ফরজ নষ্ট করার সুয়োগ পেয়ে যায়। কারণ নফল হচ্ছে একটি মজবুত দুর্গ, যা ফরজের ভূমিকে শত্রুর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে এবং তার মূল্যবান সম্পদ চুরি হওয়া থেকে হিফাজত করে। ফলে শত্রু যখন তোমার নিকটে চলে আসে, তখন নফলের অস্ত্রের মুখে পড়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।
নফলের প্রাচীর তোমাকে শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করে। কেননা, যে ব্যক্তি কেবল ফরজ আদায় করে, শয়তান যদি তার ফরজের ওপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসে, তখন সে তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। ফলে শয়তান ধাপে ধাপে তার ফরজের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে এবং তদস্থলে হারাম ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু যে ব্যক্তির ধনভান্ডারে নফলের মজুদ আছে, তখন শয়তান লুট করতে এসে যদি কিছু নিয়ে যেতে পারে, তা নফল থেকেই নিতে পারে। ফরজ তথা মূলধন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। ফলে সে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। এ জন্যই বলা হয়, ফরজের ঘাটতি পূরণের জন্যই নফলের প্রবর্তন করা হয়েছে। একটি হাদিস এই বক্তব্যকে সুদৃঢ় করে। যেখানে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন যখন বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেনঃ
انْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ فَتُكْمِلُوا بِهَا فَرِيضَتَهُ؟ ثُمَّ الزَّكَاةُ) كَذَلِكَ، ثُمَّ تُؤْخَذُ الْأَعْمَالُ عَلَى حَسَبِ ذَلِكَ(
'দেখো, এই বান্দার কোনো নফল নামাজ আছে কি না, যা দ্বারা ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে?' তারপর এভাবে জাকাতসহ অন্যান্য আমলের হিসাব করা হবে।
)ثُمَّ تُؤْخَذُ الْأَعْمَالُ عَلَى حَسَبٍ ذَلِكَ( 'তারপর এই পদ্ধতিতে অন্যান্য আমলের হিসাব নেওয়া হবে।' কথাটি আরেকবার পড়ো। এ থেকে বোঝা যায়, প্রত্যেক ফরজ ইবাদতের নফল ভার্সন রয়েছে।
• পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নফল ভার্সন হচ্ছে তাহাজ্জুদ, মধ্যদিনের নামাজ, বিতির এবং ফরজ নামাজের পূর্বে ও পরে নির্ধারিত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ নামাজ।
• জাকাতের নফল ভার্সন হচ্ছে সদাকা, করজে হাসানা ও ঋণ মাফ করা।
• রমাদানের রোজার নফল ভার্সন হচ্ছে নফল রোজাসমূহ, যার মধ্যে রয়েছে শ্বেত দিনসমূহের (প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের) রোজা, সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা, আরাফাত দিবসের রোজা, আশুরার (১০ মহররম) রোজা ইত্যাদি。
• হজের নফল ভার্সন হচ্ছে উমরা এবং অন্যের পক্ষ থেকে হজ করা।
এখন নিশ্চয় তোমার সামনে চূড়ান্ত সফলতা অর্জনের রোডম্যাপ পরিষ্কার হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৭৪. ৬ নং ফায়দা : ইবনুল কাইয়িম মনে করেন, পুণ্যকর্ম পাপকর্মকে প্রতিহত করে এবং ভালো কাজ খারাপ কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই তিনি বলেন, 'গুনাহের মূল হচ্ছে, ওয়াজিব (অবশ্যপালনীয় আমলসমূহ) আদায় না করা, নিষিদ্ধ কর্ম করা নয়।' (আল-মাদারিজ: ২/১৫৬)
৭৫. মুসনাদু আহমাদ: ১৬৬১৪, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৪২৬।
৭৬. ৭ নং ফায়দা: করজ দেওয়া বা করজ মাফ করে দেওয়া সম্পর্কে অনেক সাহাবি ও সালাফের রায় হলো, এটা সদাকা করার চেয়ে উত্তম। কেননা, নবি ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি পরিশোধে অক্ষম কোনো ঋণগ্রহীতাকে (তার সচ্ছলতা আসা অবধি) অবকাশ দেবে, সে ঋণ পরিশোধ করার সময় হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন ঋণের পরিমাণ সদাকা করার সাওয়াব পাবে। অতঃপর ঋণ পরিশোধ করার সময় হওয়ার পরে সময় বাড়িয়ে দিলে প্রতিদিন সে পরিমাণ সদাকা করার সাওয়াব পাবে।' (মুসনাদু আহমাদ, সুনানু ইবনি মাজাহ, সহিহুল জামি: ৬১০৮)
৭৭. মুসনাদে আহমাদ ও সহিহ মুসলিমে আবু কাতাদা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি পরিশোধে অক্ষম ঋণগ্রহীতাকে অবকাশ দেবে (পরিশোধের মেয়াদকাল বাড়িয়ে দেবে), অথবা ক্ষমা করে দেবে (ঋণ মাফ করে দেবে), কিয়ামতের দিন সে আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে।' (সহিহুল জামি: ৬৫৭৬)
৮ নং ফায়দা: মুনাবি বলেন, 'কারণ, ঋণপরিশোধে অক্ষম হওয়া দুনিয়াতে মানুষের জন্য বড় একটি দুর্দশা ও মুসিবত। তাই কেউ যদি কোনো ব্যক্তি থেকে দুনিয়ার এই বিপদ দূর করে দেয়, কিয়ামতের দিন তার আখিরাতের বড় বিপদ দূর হয়ে যাবে। অর্থাৎ কিয়ামতের ভয়াবহ কষ্ট থেকে সে রেহাই পাবে এবং সম্মানিত স্থানে স্থান পাবে। এ জন্যই সালাফগণ বলেন, "অনেক সময় নফল আমলের সাওয়াব ও প্রতিদান ওয়াজিব আমলের সাওয়াবের চেয়ে বেশি হয়।" (ফাইজুল কাদির: ৬/৩০৩)
৭৮. রাসুল ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি প্রতিমাসে তিনদিন রোজা রাখে, সে যেন সারাজীবন রোজা রাখে।' (মুসনাদু আহমাদ, সুনানুত তিরমিজি, সহিহুল জামি: ৬৩২৪) অন্য একটি হাদিসে রাসুল সেই তিনদিন নির্ধারিত করে দিয়েছেন: 'প্রতিমাসের তিনটি রোজা রাখা মানে আজীবন রোজা রাখা। সেই তিনদিন হচ্ছে, শ্বেত দিনসমূহ তথা (চান্দ্রমাসের) ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ।' (সুনানুন নাসায়ি, বাইহাকি, সহিহুল জামি: ৩৮৪৯)
📄 একটি চমৎকার নফল ইবাদত
ইলম অর্জন করা অন্য অনেক নফল ইবাদতের চেয়ে একটি উৎকৃষ্ট নফল ইবাদত। সহিহ হাদিসে এসেছে:
فَضْلُ الْعِلْمِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ فَضْلِ الْعِبَادَةِ
'আমার কাছে ইবাদতের আধিক্যের চেয়ে ইলমের আধিক্য বেশি প্রিয়। '
আবু দারদা বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বলেন, 'রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার চেয়ে একটি মাসআলা শিখা আমার কাছে অধিক প্রিয়। '
উম্মাহর আরও দুজন নেতৃস্থানীয় আলিম সুফইয়ান সাওরি ও শাফিয়ি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন:
'ফরজের পরে ইলম অর্জন করার চেয়ে উত্তম কোনো আমল নেই।'
ইবনুল জাওজি 'তালবিসু ইবলিস' নামক কিতাবের শুরুতে ইবাদতে আগ্রহী লোকদের ইলম অর্জনের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বসরার ইমাম মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহর একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন :
'ইলমের আধিক্য ইবাদতের আধিক্য অপেক্ষা উত্তম।'
শামের বিখ্যাত আবিদ ইউসুফ বিন আসবাতের একটি উক্তি উল্লেখ করেছেন:
'ইলমের একটি অধ্যায় শিক্ষা করা সত্তরটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার চেয়ে উত্তম।'
ইরাকের ইয়াকুত খ্যাত মুআফি বিন ইমরানেরও একটি কথা উল্লেখ করেছেন :
'একটি হাদিস লিপিবদ্ধ করা আমার কাছে এক রাত তাহাজ্জুদ পড়ার চেয়ে বেশি প্রিয়। '
বদরুদ্দিন বিন জামাআহ ইলমপিপাসুদের দারুণ একটি কথা উপহার দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইলম অর্জনের ফজিলত ও গুরুত্বের ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
'আল্লাহর জন্য ইলম অর্জন করা নামাজ, রোজা, তাসবিহ, দুআ প্রভৃতি শারীরিক ইবাদতের চেয়ে উত্তম। কেননা :
* ইলমের উপকারিতা তার অর্জনকারীকে যেমন অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনই সাধারণভাবে সকল মাখলুককেও অন্তর্ভুক্ত করে।
* ইলম অন্যান্য ইবাদতকে সংশোধন করে। সুতরাং সেগুলো ইলমের প্রতি মুখাপেক্ষী এবং নির্ভরশীল। কিন্তু ইলম সেগুলোর প্রতি মুখাপেক্ষী নয়।
* তদুপরি, হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আলিমগণ নবিগণের উত্তরসূরি। আবিদগণের ব্যাপারে এমন কথা বলা হয়নি।
* ইলমের ব্যাপারে সাধারণ লোকদের ওপর আলিমের আনুগত্য করা ওয়াজিব।
* ইলমের প্রভাব তার ধারকের মৃত্যুর পরেও জীবিত থাকে; কিন্তু অন্যান্য নফলের প্রভাব তার আদায়কারী মারা যাওয়ার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়।
* ইলম বাকি থাকলে শরিয়াহ জীবিত থাকবে এবং উম্মাহর নিদর্শনসমূহ সুরক্ষিত থাকবে। '
টিকাঃ
৭৯. মুসনাদুল বাজ্জার: ২৯৬৯, মুসতাদরাকুল হাকিম: ৩১৪, সহিহুল জামি: ৪২১৪। ৯ নং ফায়দা : ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'আমলের সাওয়াব সেই আমলের উপকারিতা ও ফায়দার ভিত্তিতে হয়।
৮০. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ১/৯।
৮১. জামিউ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি: ১/১২৩-১২৪।
৮২. তালবিসু ইবলিস: পৃ. ১২১।
৮৩. তাজকিরাতুস সামি: পৃ. ১৩। ১০ নং ফায়দা: ইবনে হাজম বলেন, 'যে ব্যক্তি ইলম নিয়ে কৃপণতা করে, সে সম্পদ নিয়ে কৃপণতাকারী ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট। কেননা, যে ব্যক্তি সম্পদ নিয়ে কৃপণতা করে, সে এমন বস্তু নিয়ে কৃপণতা করে, যা খরচ করলে কমে যায়। কিন্তু কৃপণ আলিম এমন বস্তু নিয়ে কৃপণতা করে, যা যতই খরচ করুক, ফুরায় না।' (আল-আখলাকু ওয়াস সিয়ার: ১/২২)
📄 আল্লাহর ভালোবাসার স্তরে পৌঁছানোর লক্ষণ
ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, নিয়মিত নফল ইবাদতের ফলে অর্জিত চূড়ান্ত সফলতা হচ্ছে আল্লাহর ভালোবাসা। তবে সফলতার এই স্তরে উপনীত হওয়ার আলামত কী? খোদ আল্লাহই জানিয়ে দিচ্ছেন তার আলামত:
'আমি তার কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যাই!'
• ফলে তোমার কান তার রবের নির্দেশ মেনে চলে, শয়তান ও মন্দকর্মের নির্দেশ দানকারী নফসের কথা শোনে না। যেহেতু কান দিয়ে যা-ই প্রবেশ করে, তা-ই কলবে স্থানান্তরিত হয়, তা-ই তোমার জীবিত কলব খুব সতর্ক থেকে আল্লাহর বিধানবিরোধী বিষয়গুলোকে প্রতিহত করে। ফলে এরপর থেকে কান কেবল বিধিসম্মত বিষয়গুলোকেই গ্রহণ করে। তাই যেকোনো ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা ও বিভ্রান্ত মানহাজের ব্যাপারে তোমার কান বধির এবং কলব তালাবদ্ধ হয়ে থাকে。
• তোমার চোখ দূরদর্শী হয়। কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর ওপর তা নিবদ্ধ হয় না। অজান্তে নিবদ্ধ হলে দ্রুত ফিরে আসে। তুমি সবকিছু আখিরাতের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে শুরু করো। ফলে যেসব বিষয় আখিরাতের ধনভান্ডার সমৃদ্ধ করে তা তোমার চোখে সুন্দর দেখায়, আর যেসব বিষয় আমল পরিমাপের মানদণ্ডে তোমার সাওয়াবের পাল্লা হালকা করবে, তা অসুন্দর দেখায়। চোখের এই ক্ষমতা তুমি এ জন্যই লাভ করেছ যে, তুমি দৃষ্টিকে সংযত ও অবনত রেখেছ। ফলে আল্লাহ তাআলা তোমার দৃষ্টিকে দূরদর্শী করে দিয়েছেন। অপরদিকে অন্যজন তার দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত ছেড়ে দিয়েছে। যেখানে ইচ্ছা নিবদ্ধ করেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতা ছিনিয়ে নিয়েছেন।
• যেদিকে গেলে তোমার রব অসন্তুষ্ট হন, তোমার পা সেদিকে অগ্রসর হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সৃষ্টির সেবার প্রতি ধাবিত হয়। দাওয়াহ ও কল্যাণের অলিগলিতে বিচরণ করে। অকল্যাণ, জুলুম, জালিমের সহায়তা ও পাপিষ্ঠদের প্রাঙ্গণে আনাগোনা করে না。
• তোমার হাত আল্লাহর পথে অবিরাম লিখে চলে। কাজ করে। কষ্ট সহ্য করে। এতটুকুই নয়; বরং জালিমের জুলুম প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয় তোমার হাত। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে যায়। জুলুম ও সীমালঙ্ঘনে অংশ নেয় না। হারাম স্পর্শ করে না। চুরি করে না। খিয়ানত করে না।
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে তুমি সত্যিকার অর্থে তাঁর দাসে পরিণত হবে। তাঁর বিধিনিষেধের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পিত হবে। ফলে তোমার সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে সেসব বিষয়ের প্রতি, যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। যেসব বিষয় তাঁর অপছন্দনীয়, সেসব থেকে দূরে থাকবে। হালাল দিয়েই তোমার হয়ে যাবে, হারামের দিকে পা বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যে যতটা সুখ অনুভূত হবে, অন্য কারও নৈকট্যে ততটুকু হবে না।
অধিকাংশ মানুষ ইবাদতের ওপর অটল থাকার ক্ষেত্রে যে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং ভালো ও মন্দ কর্মের ব্যাপারে যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, তার সমাধান এটাই। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যে সুখ অনুভব করা। সুতরাং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে ভালো-মন্দের মধ্যকার দ্বিধাবোধ কেটে গিয়ে ভালোর ওপর স্থিরতা সৃষ্টি হয়। ফিতনা ও অশ্লীলতার এ যুগে এটাই চরম আকাঙ্ক্ষিত বিষয়।
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে তোমার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহপ্রেম তোমার হৃদয়ের কর্তৃত্ব নিয়ে নেবে। ফলে তুমি সেটাই দেখতে পাবে, যা আল্লাহর পছন্দনীয়। তা-ই শুনতে পাবে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। আসলে মনের অবস্থা এমন হওয়াটাই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকার প্রমাণ।
প্রেমিকা আবলার প্রতি কবি আনতারার ভালোবাসা কত গভীর ছিল, তা জানলে আল্লাহপ্রেমের দাবিদার বান্দাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। কবি বলেন:
‘তোমাকে আমার তখনও মনে পড়েছে, যখন বর্শা আমার রক্ত চুষছিল এবং আমার ভারতীয় শুভ্র তরবারি থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল তরবারির গায়ে চুমু এঁকে দিই। কারণ, তা তোমার হাস্যময়ী উষ্টদ্বয়ের মতো ঝিকমিক করছিল।’
দেখো, যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও কবি তার প্রিয়তমাকে ভুলে থাকতে পারেননি। বরং শত্রুর তরবারি ও বর্শার চমকে প্রেয়সীর হাসিমুখ দেখতে পেয়েছেন। এই যদি হয় সৃষ্টির প্রতি সৃষ্টির ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম, তাহলে স্রষ্টার প্রতি আমাদের প্রেম-ভালোবাসা কেমন হতে হবে!? তদুপরি, তিনি আমাদের কেবল স্রষ্টাই নন; বরং তিনি আমাদের এমন প্রভুও বটেন, যিনি আমাদের দান করেছেন অসংখ্য অগণিত নিয়ামত; যিনি আমাদের ভালোবেসেছেন আমরা তাঁকে ভালোবাসার পূর্বে; আমাদের স্মরণ করেছেন আমরা তাঁকে স্মরণ করার আগে এবং আমাদের তাঁর প্রিয়জন করেছেন; অথচ তাঁর প্রিয়জন হওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমাদের নেই!
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হওয়ার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে অবস্থার পরিবর্তন ও উন্নয়ন। তার কয়েকটি স্বরূপ এখানে তুলে ধরা হলো:
* কুরআন তিলাওয়াত করার প্রাথমিক অবস্থা থেকে কুরআন বুঝে পড়া, কুরআন নিয়ে পরিশোধিত ও প্রভাবিত হওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন করার অবস্থায় উন্নীত হওয়া。
* রাগ দমন করার অবস্থা, মন্দ আচরণকারীকে ক্ষমা করা এবং তার সাথে সদাচরণ করায় পরিবর্তিত হওয়া。
* দায়িত্ববোধ থেকে জাকাত আদায় করার অবস্থা থেকে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করতে আনন্দ অনুভব করা অবস্থায় উন্নীত হওয়া。
* আল্লাহর রাস্তায় কষ্ট সহ্য করা ও ধৈর্যধারণ করার অবস্থা উন্নত হয়ে তাকদিরের ফয়সালার ওপর আনন্দিত হওয়ার অবস্থা আসা।
📄 সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান
নিয়মিত নফল ইবাদতের সর্বোচ্চ প্রতিদানের কথা এখনো বলা হয়নি। এই প্রতিদান তা অর্জনকারীর জন্য সুমহান মর্যাদা ও অকল্পনীয় সুখের মোহনা। তা হচ্ছে, সে যা-ই চাইবে, তা-ই পেয়ে যাবে:
وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ
'সে যদি আমার কাছে চায়, আমি তাকে অবশ্যই দান করব।'
এবং যা থেকে সে বেঁচে থাকতে চাইবে, তা তার থেকে দূর হয়ে যাবে:
وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ
'আর যদি সে কোনো কিছু থেকে আমার কাছে পানাহ চায়, আমি তাকে অবশ্যই পানাহ দেবো।'
কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়া এবং অপছন্দনীয় বস্তু থেকে বেঁচে থাকা-দুনিয়াতে মানুষের এ দুটিই তো সবচেয়ে বড় কামনার বস্তু। যার এ দুটি অর্জিত হলো, সে যেন গোটা পৃথিবীটাই পেল।
শেষকথা:
জেনে রাখো, আল্লাহর অলি বা বন্ধু হওয়ার জন্য একদম গুনাহমুক্ত থাকা শর্ত নয়। বরং গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথে কম্পন অনুভব করা এবং গুনাহের ওপর অটল না থেকে দ্রুত সত্য দিলে তাওবা করে নেওয়া যথেষ্ট। প্রকৃত অলি গুনাহকে তা-ই মনে করে, যেমনটা ইবনুল কাইয়িম বলেছেন:
'নিষিদ্ধ স্বাদ যখন গ্রহণ করা হয়, তখন তা হয় কদর্যতা-মিশ্রিত। গ্রহণ করার পর হয়ে পড়ে ব্যথা-যন্ত্রণা সৃষ্টিকারী।'
টিকাঃ
৮৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১/১৯২।
৮৫. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৮৬. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।