📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 শিক্ষার্থীদের প্রতিজ্ঞা

📄 শিক্ষার্থীদের প্রতিজ্ঞা


নবিজির এ শিক্ষা হাতেকলমে শিখে নিয়েছিলেন তাঁর সুযোগ্য শিষ্যরা। জীবনের কঠিনতম সময়ে কিংবা যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও এ শিক্ষা তাঁরা ভুলে যাননি। আলি-এর কর্মে তার প্রমাণ দেখো :

রাসুল আলি ও ফাতিমা-কে ঘুমানোর পূর্বে ৩৪ বার 'আল্লাহু আকবার', ৩৩ বার 'সুবহানাল্লাহ' এবং ৩৩ বার 'আলহামদুলিল্লাহ' পড়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। আলি ও ফাতিমা কেউই সেদিনের পর থেকে এ আমল ছাড়েননি। এমনকি আলি বলেন, 'নবিজির মুখ থেকে এ আমলের কথা শোনার পর থেকে আজ অবধি কোনোদিন তা ছাড়িনি, এমনকি সিফফিন যুদ্ধের রাতেও না!'

এ ঘটনা আমাদেরকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ওজর-আপত্তিকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং অলসতার ডাকে সাড়া না দেওয়ার শিক্ষা দেয়।

এমনই ছিল সাহাবিদের অবস্থা। আর এমন হবে না-ই বা কেন? তাঁরা তো 'নুবুওয়াত বিশ্ববিদ্যালয়' থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন! যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষা হচ্ছে : যেহেতু জিকির বা আল্লাহর স্মরণ উত্তম ইবাদত, তাই তার ওপর অটল ও নিরবচ্ছিন্ন থাকাও উত্তম আমল।

এ জন্য রাসুল আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো জিকির শুরু করার পর তা যেন আর ছেড়ে না দিই। কেননা, অটলতা ও নিরবচ্ছিন্নতার মাধ্যমেই জিকিরের প্রকৃত উদ্দেশ্য তথা সব ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলা বাস্তবায়িত হয়। এই অনড়তা ও নিরবচ্ছিন্নতায় স্বয়ং নবি আমাদের আদর্শ। তিনি সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও কসম করে বলেন :

وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي اليَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
'আল্লাহর কসম, আমি প্রতিদিন সত্তর বারের বেশি গুনাহ মাফ চাই এবং তাওবা করি। '

অতঃপর ভাষার মধ্যে অলংকারিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে বলেন :
مَا أَصْبَحْتُ غَدَاةً قَطُّ إِلَّا اسْتَغْفَرْتُ اللَّهَ فِيهَا مِائَةَ مَرَّةٍ
'যত সকালে আমি উপনীত হয়েছি, প্রতিটিতেই একশ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। '

টিকাঃ
৬৫. সহিহুল বুখারি: ৫৩৬২, সহিহু মুসলিম: ২৭২৭।
৬৬. ৩ নং ফায়দা : আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ হচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর জিকির করা। ইবনুল কাইয়িম বলেন, 'আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিষয়ের জন্য একটি মাধ্যম রেখেছেন, আর ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে নিয়মিত জিকির করা। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা কামনা করে, সে যেন অধিকহারে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর জিকির করে।' (আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব: পৃ. ৬১)
৬৭. সহিহুল বুখারি: ৬৩০৭।
৬৮. আল-মুজামুল আওসাত: ৩৭৩৭।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 সময়ের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা

📄 সময়ের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা


নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল করা সহজ হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা সময়ের মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও সঙ্গতি রেখেছেন। বিশেষ কোনো দিন বা মাসকে একটু বেশি ফজিলত দিলেও, বাকি সময়গুলোকে একদম ফজিলতমুক্ত রাখা হয়েছে এমনও নয়। ফলে জুমআর দিনের আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং রমাদান মাসের বিশেষ ফজিলত অন্য সময়ে ইবাদত করা থেকে অনুৎসাহিত করে না। নিচে সময়ের সামঞ্জস্যতার কয়েকটি উপমা দেওয়া হলো:

* জুমআর দিনে দুআ কবুল হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে ঠিকই, কিন্তু এমন একটি সময় প্রতিটি রাতেও রাখা হয়েছে। যেমন, রাসুল-এর সুসংবাদ বাণীতে এসেছে:

إِنَّ فِي اللَّيْلِ لَسَاعَةً لَا يُوَافِقُهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ، يَسْأَلُ اللَّهَ خَيْرًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ، وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ
'নিশ্চয় রাতে এমন একটি প্রহর আছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি ঠিক সে প্রহরে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ তাআলা তার চাওয়া পূরণ করেন। এই প্রহর প্রতিটি রাতে রয়েছে। '

• অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা যদিও রমাদানকে ফরজ রোজার জন্য বাছাই করেছেন; কিন্তু ঠিক তার পরের মাস শাওয়ale বিশেষ ছয়টি রোজা বরাদ্দ রেখেছেন। শাওয়াল শেষ হতে না হতেই জিলহজের নয় রোজা। এর পরপরই আল্লাহর মাস মহররমের রোজা, যেটি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় রোজা। সবই তোমাকে নিয়মিত রোজা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য রাখা হয়েছে।

এভাবে রাসূল শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন। কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'এই মাসটি রজব ও রমাদানের মাঝামাঝি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ এ মাসে রোজা রাখতে গাফিলতি করে। তাই আমি রোজা রেখে এই মাসটিকে আবাদ রাখতে চাই। যাতে দ্বীনের জন্য ত্যাগ দেওয়ার ধারাবাহিকতা টিকে থাকে এবং বছরের অন্য মাসসমূহের তুলনায় এর মর্যাদা কমে না যায়।'

এবার তুমি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ সময়ের পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা কীভাবে তোমাকে আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর কারণে প্রতিটি দিনে ও মাসে ইবাদত করার ইচ্ছা তোমার মনে জাগরূক থাকে। কোনো দিন বা মাসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে অন্য সময়গুলোতে অবহেলা করার প্রবণতা তৈরি হয় না তোমার মনে। ফলে সময়ের প্রতিটি ক্ষণের সাথে তোমার একপ্রকার বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া সৃষ্টি হয় এবং ইবাদতের মাঝে সুষ্ঠু ভারসাম্য গড়ে ওঠে। তবে এটা তখনই হবে, যখন তুমি আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে ইবাদত করার তাওফিক দান করেছেন, তার ওপর নিরবচ্ছিন্ন ও অনড় থাকবে।

টিকাঃ
৬৯. সহিহ হাদিসে এসেছে: 'জুমআর দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি সময় আছে, যে সময়ে আল্লাহর কোনো বান্দা তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তা দান করেন। সুতরাং উক্ত সময়টিকে তোমরা আসরের পরের সময়ে অনুসন্ধান করো।' (সুনানু আবি দাউদ, সুনানুন নাসায়ি, সহিহুল জামি : ৮১৯০)
৪ নং ফায়দা: ইমাম নববি বলেন, 'এই হাদিস প্রমাণ করে, প্রতিটি রাতে দুআ কবুল হওয়ার বিশেষ একটি সময় আছে। সাথে সাথে এই হাদিস রাতের প্রতিটি অংশে দুআ করার প্রতি উৎসাহিত করে; যাতে কবুল হওয়ার সেই ক্ষণটি পাওয়া যায়।' (শারহুন নববি ৬/৩৬)
৭০. সহিহু মুসলিম: ৭৫৭।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 পরিবেশের ভারসাম্য

📄 পরিবেশের ভারসাম্য


তোমার চতুষ্পার্শ্বে অন্তর্দৃষ্টি বুলাও। দেখো, জগতের সবকিছুই তোমার প্রতিপালকের সামনে অবনমিত ও অনুগত। এই অনুভূতি তোমাকে নেক আমলের ওপর অটল ও অবিচল থাকতে সহায়তা করবে। এ জন্যই মাহান বলতেন:
'তোমার কি লজ্জা করে না যে, যে বাহনের ওপর তুমি সওয়ার হও এবং যে কাপড় তুমি পরিধান করো, সেগুলো তোমার চেয়ে অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করে? এই লজ্জা যদি তোমার মাঝে থাকে, তাহলে তুমি কখনো "আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জিকির থেকে বিরত থাকতে পারো না।'

প্রকৃত মুমিন বোঝে, এই সুপ্রশস্ত জগতের সাথে খাপ খাওয়াতে হলে তাকে ভালো আমল করতে হবে। সুতরাং তুমি যদি ভালো কর্মের ওপর অনড় ও অবিচল থাকো, তাহলে জড়জগৎ, প্রাণিজগৎ ও আসমান-জমিনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে এবং সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত এই বিশ্বজগতের সঙ্গে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু যদি তোমার ভালো কাজের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই বিশাল বিশ্বজগতের সাথে তাল মিলিয়ে চলা থেকে তুমি পথ হারিয়ে ফেলবে এবং দ্রুত ফিরে না আসলে সম্পূর্ণরূপে ছিটকে পড়ে যাবে।

টিকাঃ
৭১. ৫ নং ফায়দা: মাহান খুব বেশি জিকির করতেন। এ জন্য তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল খুব সুন্দরভাবে। এ সম্পর্কে বনি হানিফার মুয়াজ্জিন ইবরাহিম বর্ণনা করেন, 'হাজ্জাজ মাহান হানাফিকে তাঁর ঘরের দরজায় শূলিতে চড়ানোর নির্দেশ দিলেন। যখন তাঁকে গাছের সাথে বাঁধা হলো, তখন তাঁর মুখে ছিল 'সুবহানাল্লাহ', 'আল্লাহু আকবার', 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ও 'আলহামদুলিল্লাহ' জিকির। তিনি হাতের সাহায্যে গুণে গুণে উনত্রিশ বার জিকির করার সাথে সাথেই তাঁকে মেরে ফেলা হলো। মৃত্যুর সময় তাঁর হাত উনত্রিশ নির্দেশক অবস্থায় ছিল। এর এক মাস পর আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তখনও তাঁর হাত উনত্রিশ নির্দেশক অবস্থায় ছিল।' তিনি আরও বলেন, 'রাতের অন্ধকারের সময় তাঁর পাশে চেরাগের মতো একটি আলো দেখা যেত!' (সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৪২)

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ভালো কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভয়ংকর প্রভাব

📄 ভালো কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভয়ংকর প্রভাব


কোনো আমল শুরু করে তা বন্ধ করে দেওয়া থেকে রাসুল নিষেধ করেছেন এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আবদুল্লাহ বিন আমর-কে দেওয়া উপদেশে তিনি ইরশাদ করেছেন:
لَا تَكُنْ مِثْلَ فُلَانٍ كَانَ يَقُومُ اللَّيْلَ، فَتَرَكَ قِيَامَ اللَّيْلِ
'ওই ব্যক্তির মতো হয়ো না, যে তাহাজ্জুদ পড়া শুরু করে আবার বন্ধ করে দিয়েছে। '

এ জন্য আধ্যাত্মিক চিকিৎসকগণ তাদের পূর্বঅভিজ্ঞতার আলোকে আমল বন্ধ করে দেওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে তোমাকে সতর্ক করেছেন এবং আমল শুরু করার পর তার ওপর অটল ও অবিচল থাকার প্রতি জোর দিয়েছেন। আদেশসূচক ক্রিয়া ব্যবহার করে তারা বলেন :
'নফলকে ফরজের মতো গুরুত্ব দাও এবং গুনাহকে কুফরের মতো ভয়ংকর মনে করো।'

কারণ তারা খুব ভালোভাবে বোঝেন যে, এটা ছাড়া আমলের ওপর অটল থাকা সম্ভব নয়। এদিকে এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইবাদতের স্বাদ অনুভব না হলে তার ওপর অটল থাকা যায় না। একসময় না একসময় তা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ইবাদতের স্বাদ অনুভব করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সালাফদের অভিজ্ঞতা বলে, মনের ওপর জোর দিয়ে একনাগাড়ে আমল করে যাওয়া ইবাদতের স্বাদ সৃষ্টি হওয়ার উপায়।

কেউ গুপ্তধন হাতে পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় তা হাতছাড়া করে ফেলল, শীর্ষচূড়ায় পৌঁছানোর পর ছিটকে পড়ল এবং উৎকৃষ্টকে ভোগ করার পর তার বিনিময়ে নিকৃষ্টকে বেছে নিল। এমন ব্যক্তির বোকামি দেখে সালাফগণ বিস্ময়ে হতবাক। আবু সুলাইমান দারানি বলেন:
'যে ব্যক্তি ইবাদতে স্বাদ পায় না, তাকে নিয়ে আমার আশ্চর্য লাগে না, তবে যে ব্যক্তি ইবাদতের স্বাদ অনুভব করার পর তা ছেড়ে দিয়েছে, সে এই স্বাদ ছাড়া কীভাবে থাকতে পারে, তা নিয়ে আমার খুব আশ্চর্য লাগে। '

কাজেই প্রত্যেক মুমিনকে ইবাদতের স্বাদ অর্জন করাকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে আমল করে যেতে হবে। শুরুতে একটু কষ্ট হবে, তবে কিছুদিন পর তা অভ্যাসে পরিণত হবে এবং ভালো লাগতে শুরু করবে। এভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল করতে করতে একসময় তার স্বাদের মিষ্টতায় অবগাহন করতে শুরু করবে তুমি।

যে ব্যক্তি কোনো আমল শুরু করার পর তা ছেড়ে দিল, সে যেন উন্নতির পথ থেকে পেছনে সরে আসলো এবং নিজের এতদিনের প্রচেষ্টাকে জবাই করে দিল। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে তার ওপর অটল ও অবিচল রইল, সে অবশ্যই পার্থিব জান্নাতের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। এতক্ষণে তুমি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ, আল্লাহর কাছে নিয়মিত আমল পরিমাণে কম হলেও এত প্রিয় কেন?

তোমার মনে এ প্রশ্ন আসতেই পারে যে, নফল ছেড়ে দিলে তো কোনো গুনাহ নেই, তবুও নফল ছেড়ে দেওয়াটা এত ভয়াবহ কেন?

নিচের আলোচনায় এর উত্তর আসছে:

টিকাঃ
৭২. সহিহুল বুখারি: ১১৫২।
৭৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/২৬২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00