📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর বন্ধুদের স্তরে পৌঁছানোর সেতু

📄 আল্লাহর বন্ধুদের স্তরে পৌঁছানোর সেতু


আল্লাহর বন্ধুদের উপরিউক্ত মর্যাদা ও ফজিলতের বিবরণ শোনার পর মনের মধ্যে উক্ত স্তরে পৌঁছার এবং তাদের দলভুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। রূপবতী ও গুণবতী মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইলে মোহরানা প্রদানে কার্পণ্য করা যায় না। মৌমাছির হুলের আঘাত সহ্য করা ছাডা মধু সংগ্রহ করা যায় না। উচ্চ মর্যাদা চাইলে রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়। কষ্ট ও মেহনতের পরিমাণ অনুযায়ী সফলতা ধরা দেয়। তেমনই আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের মর্যাদা লাভ করার জন্য মেহনত করতে হয়। অমানুষিক কোনো মেহনত নয়, কেবলমাত্র দুটি কাজ করতে হয়:
ফরজ ইবাদতসমূহ আঁকড়ে ধরা এবং নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া।

কিয়ামতের দিন আমলসমূহ সংখ্যা ও পরিমাণের ভিত্তিতে গণনা করা হবে না। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে ওজন করা হবে। কারণ, হিসাব-নিকাশের জন্য দাড়িপাল্লা রাখা হবে, গণনাযন্ত্র নয়। মোটকথা, নেক আমলসমূহ ওজন করা হবে, গণনা করা হবে না। ফলে অনেক সময় একটি নেক আমল ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণের কারণে হাজার হাজার নেক আমলের চেয়ে ভারী হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বান্দার নেক আমলসমূহের মধ্যে ফরজ ইবাদতগুলোই সবচেয়ে ভারী, ফরজ নফলের চেয়ে ভারী এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও নিকটতর। বরং আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত নফল আমলসমূহ কবুল করেন না, যতক্ষণ না ফরজসমূহ আদায় করা হয়। ফরজই ইবাদতের মূলভিত্তি। আর বুদ্ধিমান ব্যক্তি সর্বপ্রথম ভিত্তির প্রতিই গুরুত্ব দেয়। কারণ, ভিত্তি নড়বড় হলে ধ্বংস অনিবার্য।

এ জন্যই ইবনে হুবাইরা বলেছেন, 'নফল আমলসমূহকে নফল (অতিরিক্ত) বলার কারণ হচ্ছে, তা ফরজের পরে অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করা হয়। সুতরাং যদি ফরজ ভালোভাবে আদায় করা না হয়, নফলের সাওয়াব পাওয়া যাবে না।'

তবে ফরজ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আদায় করা হলেই আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয়। এ জন্যই মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে আবু বকর উমর-কে ডেকে অসিয়ত করলেন :
'আল্লাহকে ভয় করুন, হে উমর। আর জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলার জন্য দিনে পালনীয় কিছু আমল আছে, সেগুলো রাতে আদায় করলে কবুল হবে না। কিছু আমল রাতে পালনীয়, দিনের বেলা তা কবুল হবে না।'

ফরজের ওপর নফলকে প্রাধান্য দেওয়াকে ইবনে আতা প্রবৃত্তির অনুসরণের মধ্যে গণ্য করেছেন। বলেছেন, 'প্রবৃত্তির অনুসরণের একটি নিদর্শন হলো, ঐচ্ছিক বিষয়াবলির প্রতি আগ্রহ এবং আবশ্যকীয় বিষয়াবলির প্রতি অনীহা।'

আবু হামিদ গাজালি এটাকে প্রতারিত ও বিভ্রান্তদের আলামত বলেছেন : 'ভালো কাজসমূহের ক্রমধারা ঠিক না থাকা (অর্থাৎ ফরজের আগে নফলকে গুরুত্ব দেওয়া) এক ধরনের বিভ্রান্তি। '

যে ব্যক্তি নফলের প্রতি খুব যত্নশীল, ফরজের প্রতি তার শিথিলতা ও অনীহা কখনো কাম্য নয়। সুতরাং যার ওপর মানুষের কর্জ আছে, কর্জ পরিশোধ না করে সদাকা করা তার উচিত নয়। যার নিজের শরীর আহত, অন্য আহতের চিকিৎসা করা তার জন্য অনুচিত। অনুরূপভাবে যার ফরজে ঘাটতি রয়ে গেছে, ফরজ পরিপূর্ণ না করে নফল নিয়ে পড়ে থাকা তার জন্য ঠিক নয়।

এ জন্যই আব্দুল্লাহ বিন মুবারক ফরজ ও নফলের যথাযথ পার্থক্য নিরূপণ করে প্রত্যেককে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়াকে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। ফলে শয়তান কখনো তাঁকে ধোঁকা দিতে পারেনি। কোনোভাবে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়নি। এ সম্পর্কিত তাঁর চমৎকার রায়টি শুনে দেখো :
'সন্দেহযুক্ত একটি দিরহাম ফিরিয়ে দেওয়া এক লক্ষ, দুই লক্ষ এমনকি ছয় লক্ষ দিরহাম সদাকা করার চেয়ে আমার নিকট পছন্দনীয়। '

সন্দেহযুক্ত দিরহামের ব্যাপারে এমন কথা! সেটা যদি হারাম দirham হয়, তাহলে কেমন হবে!?

এর কারণ হচ্ছে, হারাম দিরহাম থেকে বেঁচে থাকা ফরজ, যেখানে ছয় লক্ষ দিরহাম সদাকা করা নফল। আর নফলের ওপর ফরজ প্রাধান্যপ্রাপ্ত।

এ জন্যই হাসান বসরি অত্যাচারী দানশীলদের ওপর নিজের সকল রাগ ঝেড়ে দিয়ে বলেন:
'হে মিসকিনকে সদাকা দানকারী, সদাকা দেওয়ার পূর্বে ওই ব্যক্তির প্রতি দয়া করো, যার প্রতি তুমি জুলুম করেছ। '

তারপর ওয়াহাব বিন ওয়ারদ তোমাকে এই ফরজ (হালাল খাওয়া) নষ্ট করা থেকে সতর্ক করেছেন। খুব আন্তরিকতা নিয়ে তিনি বলেছেন:
'যদি তুমি এই খুঁটির মতো স্থির হয়ে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকো, কিন্তু তোমার পেটে হালাল ঢুকছে নাকি হারাম তার কোনো পরোয়া নেই তোমার, তাহলে এই ইবাদত তোমার কোনো কাজে আসবে না। '

এ কারনেই আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারা নফলের চেয়ে ফরজ ইবাদতের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতেন। হিশাম বিন উরওয়া বর্ণনা করেন যে, তাঁর পিতা ফরজ নামাজে অধিক সময় ধরে দাঁড়াতেন। নফলে ফরজের মতো দীর্ঘ সময় দাঁড়াতেন না। এ সম্পর্কে তিনি বলতেন, 'ফরজ হচ্ছে মূলধন। '

এ জন্য সালাফগণ ফরজ নামাজের মধ্যে অধিকহারে দুআ করতেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে দুআ করতেন। আওন বিন আব্দুল্লাহ তাঁর মূল্যবান উপদেশের মধ্যে বলেন:

টিকাঃ
৩৭. ফাতহুল বারি: ১১/৩৪৩।
৩৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/১০০।
৩৯. হুকমু ইবনি আতা।
৪০. আসনাফুল মাগরুরিন: ১/৫৯।
৪১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩২৬।
৪২. আল-ইশরাফ ফি মানাজিলিল আশরাফ পৃ. ১৪৫।
৪৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৫৪।
৪৪. তারিখু বাগদাদ: ৮/২৫১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ফরজের দুই শাখা

📄 ফরজের দুই শাখা


'তোমাদের যেসব প্রয়োজন আছে, তা আল্লাহর কাছে ফরজ নামাজ পড়াকালীন চেয়ে নাও। কারণ, নফল নামাজের ওপর যে রকম ফরজ নামাজের ফজিলত রয়েছে, তেমনই ফরজ নামাজে যে দুআ করা হয়, তা নফল নামাজের দুআ অপেক্ষা অধিক ফজিলতপূর্ণ। '

ফরজ দুই প্রকার: আদেশসূচক ও নিষেধসূচক
আল্লাহ তাআলা যেসব বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, তা মেনে চলা এবং যেসব বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাঞ্ছনীয়। উমর বিন আব্দুল আজিজ খুতবার মধ্যে বলতেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো, ফরজসমূহ আদায় করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকা। '

বর্তমান সময়ে বহুল প্রচলিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় হচ্ছে :

* জিহ্বার গুনাহ: মিথ্যা, পরচর্চা, পরনিন্দা, গালাগালি ইত্যাদি।
* কানের গুনাহ: যা শোনা হারাম তা শোনা।
* অন্তরের গুনাহ: অহংকার, আত্মম্ভরিতা, আমিত্ব, হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতারণা ইত্যাদি。
অন্তরের এই গুনাহসমূহের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা জেনে নাও, যে পর্যালোচনায় এই গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকাকে সবচেয়ে বেশি জরুরি বলা হয়েছে। এবার তনুমন দিয়ে ইবনে তাইমিয়া -এর সেই পর্যালোচনাটি শোনো:
'অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও লোকদেখানোর গুনাহ মদপান করার গুনাহের চেয়ে ভয়াবহ। যে ব্যক্তি মদপান করে, তবে অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় লালন করে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে আল্লাহর রহমতের অধিক নিকটবর্তী, যে লোকদেখানোর জন্য রোজা রাখে এবং তা নিয়ে অহংকার ও অহমিকায় ভোগে। '

যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকে, সে 'সর্বাধিক ইবাদতকারী' উপাধি পাওয়ার যোগ্য। মর্যাদার এই মালা তার গলায় পরিয়েছেন খোদ রাসুল । ইরশাদ করেছেন:
اِتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ
'নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো; মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ইবাদতকারী হয়ে যাবে। '

এই হাদিসটি তুলনামূলক শ্রেষ্ঠ আমল নির্ণয়ের মূলনীতি, যেটাকে পরবর্তী হকপন্থী উলামায়ে কিরাম উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করেছেন। তাদের অন্যতম হলেন মুআবিয়া বিন কুররা মুজানি। তিনি সত্তর জন সাহাবির সান্নিধ্য পাওয়া একজন হকপন্থী আলিম। তাঁদের থেকে তিনি সেই বক্তব্য শিক্ষা করেছেন, যার সারসংক্ষেপ তিনি হাসান বসরি-এর একটি মজলিশে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমরা হাসান বসরি-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। সেখানে আমাদের মাঝে কোন আমল সর্বোত্তম এ সম্পর্কে আলোচনা হলো। সবাই একবাক্যে তাহাজ্জুদকেই সর্বোত্তম আমল বললেন। কিন্তু আমি বললাম, "নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকাই সর্বোত্তম আমল।” আমার কথা শুনে হাসান-এর ভুল ভাঙল। তিনি বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, এটাই যথার্থ অভিমত।””

এ জন্য সালাফগণ ওয়াজ করার সময় নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকার প্রতি যে পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন, আদিষ্ট ও পালনীয় বিষয়সমূহের প্রতি সে পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন না। মালিক বিন দিনার উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়ম অনুসরণ করতেন। তিনি বলতেন, 'আমি তোমাদেরকে এমন আমলও করতে বলি, যা আমি করি না। কিন্তু যখন আমি তোমাদেরকে কোনো বিষয় থেকে নিষেধ করি, তা থেকে আমি অবশ্যই বিরত থাকি। কেননা, যদি আমি তা থেকে বিরত না থাকি, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি মহামিথ্যুক হিসেবে গণ্য হব। উপদেশদানের জন্য সালাফগণের এমন পন্থা অবলম্বন মূলত নবি-এর হাদিসের অনুসরণ। হাদিসের মধ্যে তিনি প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজের দুই শাখা তথা পালনীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহের জন্য সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন:
مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ، فَاجْتَنِبُوهُ وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَافْعَلُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ،
'আমি যেসব বিষয় থেকে তোমাদের নিষেধ করেছি, তা থেকে বেঁচে থাকো। আর যেসব বিষয় পালন করার নির্দেশ দিয়েছি, তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী তা পালন করো।'

এই হাদিসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে কোনো ধাপ ও কাটছাঁট নেই। কারণ, হারামের দরজা সামান্য খুলে দেওয়া হলেই শয়তান প্রবেশ করে কলবের কর্তৃত্ব নিয়ে নেবে। এ জন্য রাসুল সুদৃঢ় নির্দেশ দিয়েছেন : )فَاجْتَنِبُوهُ( তা থেকে বিরত থাকো।'

বান্দা হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বেঁচে থাকার মাধ্যমে 'সিদ্দিক' স্তরে উপনীত হয়। এটা সাহল তুসতারি-এর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মন্তব্য। তিনি নেককার ও বদকার উভয় শ্রেণির লোকদের কাজকর্ম ও আচার- আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। হিলইয়াতুল আওলিয়া নামক কিতাবে তাঁর সেই যুগান্তকারী মন্তব্যটি এসেছে এভাবে:
'নেক আমল ভালো-খারাপ উভয় প্রকারের লোক করে থাকে; কিন্তু গুনাহ পরিত্যাগ করে কেবল 'সিদ্দিক' স্তরে উপনীত লোকেরাই।'

জান্নাতুল ফিরদাওসের জন্য প্রতিযোগিতাকারীদের প্রতি দারুণ একটি উপদেশ দিয়েছেন উম্মুল মুমিনিন আয়িশা যেন তারা প্রতিযোগিতার ময়দানে দৃঢ়পদ থাকতে পারে। কেমন যেন এর মাধ্যমে তিনি প্রতিযোগীদের হাত ধরে জান্নাতিদের প্রথম সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
'যে (জান্নাত অর্জনের প্রতিযোগিতায়) অক্লান্ত আমলকারী ব্যক্তির চেয়ে আগে যেতে চায়, সে যেন গুনাহ থেকে বিরত থাকে। কারণ, অক্লান্ত আমলকারীরা যেসব আমল নিয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, তার কোনোটাই গুনাহের স্বল্পতার চেয়ে উত্তম নয়।'

আমাদের এই সময়ে যেসব ফরজ বিধান মানুষের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ন্যায়বিচার তথা প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার অধীনস্থদের প্রতি ইনসাফ করা। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী-আমলা ও মেম্বার-চেয়ারম্যানের ওপর যেমন জনগণের প্রতি সুবিচার করা ফরজ, তেমনই প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর নিজ নিজ পরিবার ও অধীনস্থদের প্রতি ইনসাফ করা ফরজ। কিয়ামতের দিন ইনসাফ ও ন্যায়বিচার অনেকের ক্ষেত্রে আমল পরিমাপের মানদণ্ডে অন্য অনেক ইবাদতের চেয়ে ভারী ও কার্যকর প্রমাণিত হবে। ইবনুল কাইয়িম এ সম্পর্কে বলেন:
'দায়িত্বশীল ব্যক্তি-যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করার জন্য নির্বাচিত করেছেন-জালিম থেকে মজলুমের হক আদায় করার উদ্দেশ্যে অথবা আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তার এক ঘণ্টার মজলিশ আরেকজন সাধারণ ব্যক্তির কয়েক বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম।'

টিকাঃ
৪৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/২৫৩।
৪৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/২৯৬।
৪৭. আর-রাদ্দু আলাশ শাজিলি: ১/৬৫।
৪৮. সুনানুত তিরমিজি: ২৩০৫।
৪৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৫১।
৫০. সহিহু মুসলিম: ১৩৩৭।
৫১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১০/২১১।
৫২. কিতাবুজ জুহদ: ১/২২।
৫৩. উদ্দাতুস সাবিরিন ওয়া জাখিরাতুশ শাকিরিন: ১/১১৪-১১৫। ২ নং ফায়দা: ইবনুল কাইয়িম এ সম্পর্কে আরও কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন: যে সম্পদশালী ব্যক্তির মন সদাকা করতে চায় না; কিন্তু সে মনের বিরোধিতা করে উদারহস্তে সদাকা করে, তার সদাকা রাতের নফল নামাজ এবং দিনের নফল রোজার চেয়ে উত্তম। একজন বাহাদুর ও জানবাজ মুজাহিদের জিহাদের ময়দানে এক ঘণ্টা অতিবাহিত করে আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলা করা হজ, রোজা, সদাকা ও অন্যান্য নফল ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। একজন প্রকৃত আলিম, যে সুন্নাহ, হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ সবকিছু ভালোভাবে জেনে মানুষের মাঝে বসবাস করে, তাদের দ্বীন শিক্ষা দেয় এবং উত্তম উপদেশ দেয়, তার এ কাজ তার একাকী নির্জনে বসে নফল নামাজ পড়া, তাসবিহ পাঠ করা ও কুরআন তিলাওয়াত করা অপেক্ষা উত্তম।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 পথের মধ্যখানে

📄 পথের মধ্যখানে


ফরজ আমলসমূহ নিরবচ্ছিন্নভাবে পালন করলে সফলতার মহাসড়কের ঠিক মাঝখানে থাকবে তুমি। এই সড়কের শেষপ্রান্তে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে প্রভুর ভালোবাসা ও নৈকট্য। তোমার মনে সৃষ্টি হবে প্রিয়তমের সাক্ষাৎ লাভের অব্যক্ত কামনা। তোমার মাঝে সৃষ্টি হবে দৃঢ় প্রত্যয়, যা তোমাকে অপেক্ষমাণ সুখ-সমৃদ্ধি ও জান্নাতের পথে পথ চলতে সাহায্য করবে, অবিরাম পথচলা তোমার জন্য সহজ করে দেবে এবং সফরের কষ্ট-ক্লেশ থেকে ভুলিয়ে রাখবে।

তবে এই যাত্রায় তোমাকে সাথে রাখতে হবে সততার পাথেয়। তোমার দৃঢ়তা ও অটলতাই সে সততার প্রমাণ বহন করবে। এ জন্যই ইবনে হাজার আসকালানি আলি তথা আল্লাহর প্রকৃত বন্ধুর সংজ্ঞায় লিখেছেন :
'আল্লাহর অলি বলতে ওই ব্যক্তিকেই বোঝায়, যে আল্লাহকে জানে, তাঁর ইবাদতের ওপর অটল ও অবিচল থাকে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করে। '

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 এর জন্য চাই নিরবচ্ছিন্নতা ও অবিচলতা

📄 এর জন্য চাই নিরবচ্ছিন্নতা ও অবিচলতা


আল্লাহর কাছে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্নতা শর্ত। এমনকি নফলের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে হয়। জোশে এসে দুয়েক দিন বা দুয়েক সপ্তাহ আমল করল, এরপর ছেড়ে দিল—এমন আমলের দাম আল্লাহর কাছে খুব একটা নেই। হাদিসের শব্দের দিকে খেয়াল করো :
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
'আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। এভাবে একসময় আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি...।'

হাদিসের শব্দ থেকে এ কথা একদম স্পষ্ট হয় যে, নিরবচ্ছিন্নতা ছাড়া আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হবে না। আসলে ইবাদতে নিরবচ্ছিন্নতা ব্যতীত অন্তর আলোকিত হয় না। এ জন্যই যুগশ্রেষ্ঠ দুনিয়াবিমুখ সাধক আবু সুলাইমান দারানি বলেন:
'নিরবচ্ছিন্নতার আলাদা একটা প্রতিদান আছে। আমরা যারা এক রাত ইবাদত করে দুই রাত ঘুমিয়ে কাটাই, এক দিন রোজা রেখে দুই দিন ছেড়ে দিই, এভাবে আমাদের অন্তরসমূহ আলোকিত হবে না।' আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকপ্রাপ্ত আমলের ওপর নিরবচ্ছিন্নতা ধরে রাখতে না পারার পেছনে দুটি কারণ: আমাদের চিরাচরিত স্বভাব ভুলে যাওয়া অথবা সংকল্পের দুর্বলতা।

মূলত এ দুটি আমাদের পিতা আদম-এর কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি আমরা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَى آدَمَ مِنْ قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا
'আমি তো ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম; কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল; আমি তাকে সংকল্পে দৃঢ় পাইনি। '

এখানে স্বভাবতই কারও মনে একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, কেউ নিজ পিতার অনুরূপ হলে অপরাধের কী আছে?
কিন্তু এখানে দেখতে হবে, আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে তোমার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও তোমাকে অটলতা ও নিরবচ্ছিন্নতার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তা ছাড়া এর বিনিময়ে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হয়। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর ভালোবাসা লাভের চেয়ে উত্তম পুরস্কার আর কী হতে পারে!? আল্লাহর ভালোবাসা এমন এক অদ্ভুত বিষয়, যা সাধারণ বিবেক দ্বারা অনুভব করা যায় না। আল্লাহ যেমন বড় ও মহিমান্বিত, তেমনই তাঁর ভালোবাসাও অনেক অনেক বড় নিয়ামত। আল্লাহকে চিনে এমন হৃদয় ব্যতীত তা অনুভব করা যায় না। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারা যেকোনো মাখলুকের জন্য অনেক বড় সফলতা ও উন্নতি।

তিনি প্রথমে ফরজের কল্যাণে তোমার কাজকে ভালোবাসেন। যেমন, হাদিসে এসেছে:
وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ
'আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।'

অতঃপর নফলের কল্যাণে তিনি সরাসরি তোমাকেই ভালোবাসেন। যেমন তিনি বলেন:
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
'আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। এভাবে একসময় তাকে আমি ভালোবেসে ফেলি।'

অর্থাৎ নফলের মাধ্যমে বান্দা ইমানের ধাপ অতিক্রম করে ইহসানে উন্নীত হয়।

একটি সংশয় ও তার নিরসন
সংশয় : আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের সেতু নফল কেন? ফরজ কেন নয়? ভালোবাসার পাখি নফলের ডানা ছাড়া গন্তব্য অভিমুখে উড়াল দিতে পারে না কেন?
নিরসন: উলামায়ে কিরাম এর উত্তর দিয়েছেন, বান্দা সাধারণত ফরজ আদায় করে আল্লাহর শান্তির ভয়ে। কিন্তু নফল ইবাদত করে তাঁর নৈকট্য হাসিলের নিয়তে। যেহেতু নফলের সময় তার নিয়ত অধিক নিষ্ঠাপূর্ণ থাকে, তাই নফলই আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের কারণ হয়।

একটি উদাহরণ:
তোমার একজন পরিচারক তোমার সকল কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কোনো আদেশ অমান্য করে না। কোন কোন বিষয় তোমার অপছন্দ, তা জেনে নিয়ে সেসব থেকে বিরত থাকে। তোমার পছন্দের কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করে। তুমি কি তার মজুরি পুরোপুরি বুঝিয়ে দেবে না তাকে? আবার এই পরিচারক যদি আরও বেশি চতুর ও বুদ্ধিমান হয়, ফলে তুমি আদেশ করার আগেই তোমার পছন্দনীয় কাজগুলো ঠিকঠাকভাবে করে ফেলে এবং নিষেধ করা ছাড়াই তোমার অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকে, তখন তোমার বিবেক কি তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে ভালোবাসার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে না? কোনো সময় সে যদি তোমার থেকে অধিক পারিশ্রমিক চায়, তুমি কি না দিয়ে থাকতে পারবে?

আল্লাহ তাআলা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মহান ও উদার। তাই তাঁর আবশ্যকীয় বিধানসমূহ পালন করার পাশাপাশি কোনো বান্দা যদি অতিরিক্ত হিসেবে নিয়মিত নফল আমল করে, তাহলে তিনিও অতিরিক্ত প্রতিদান হিসেবে সে বান্দাকে তাঁর ভালোবাসায় সিক্ত করেন।

টিকাঃ
৫৪. ফাতহুল বারি: ১১/৩৪২।
৫৫. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৫৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/২৭১।
৫৭. সুরা তহা, ২০: ১১৫।
৫৮. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৫৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00