📄 তারা কারও প্রতি রাগান্বিত হলে তিনিও তার প্রতি রাগান্বিত হন!
একদা আবু বকর, বিলাল, সুহাইব ও সালমান -এর পাশ দিয়ে গমন করলেন। আবু বকরের সাথে আবু সুফইয়ান ছিলেন। আবু সুফইয়ান তখনও কাফির ছিলেন। সময়টা ছিল হুদাইবিয়া-সন্ধি পরবর্তী যুদ্ধবিরতির সময়। আবু সুফইয়ানকে দেখে এই তিনজন নির্যাতিত মুসলিমের মনে পড়ে গেল, মক্কায় থাকতে তাঁদেরকে আবু সুফইয়ান কী কী কষ্ট দিয়েছিলেন সব। তাই তাঁরা তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'মুসলিমদের তরবারি এখনো আল্লাহর শত্রুর ঘাড় থেকে যা নেওয়ার তা নেয়নি (অর্থাৎ তোমার হিসাব এখনো বাকি আছে)।' এতে আবু বকর রেগে গেলেন। কারণ তিনি উত্তম আচরণের মাধ্যমে আবু সুফইয়ানকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছিলেন। কোনো কটু কথা বলে তাকে ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করতে চাইছিলেন না। তাই তিনি রাগতকণ্ঠে তাঁদের বললেন, 'একজন কুরাইশ নেতা ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এমন কথা বলা তোমাদের উচিত হয়নি।' অতঃপর রাসুল -এর কাছে গিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। কিন্তু রাসুল উল্টো আবু বকর -কে বললেন, 'হে আবু বকর, তুমি (তাঁদের শাসিয়ে) যদি তাঁদেরকে রাগান্বিত করে থাকো, তাহলে তোমার রবকেও রাগান্বিত করেছ!'
কী সে বিষয়, যা মানুষকে এমন উচ্চ স্তরে পৌঁছিয়ে দেয় যে, সে রাগান্বিত হলে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হন; অথচ আল্লাহর রাজত্বে অণু পরিমাণ কারও অংশ নেই। মাখলুকের মধ্য থেকে কেউই তাঁর সামান্যতম সাদৃশ্য রাখে না!? হ্যাঁ, এটা সেই মর্যাদা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রিয় বান্দাদের দান করেন, যারা তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে সকল কিছু থেকে অগ্রাধিকার দেন।
রাসুল-এর মুখ থেকে এমন বাক্য শোনার সাথে সাথেই আবু বকর তাঁদের কাছে ছুটে আসলেন। এসে বললেন, 'ভাইয়েরা, আমার কথায় কি তোমরা রাগ করেছ?' তাঁরা বললেন, 'না। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, প্রিয় ভাই। '
আল্লাহর বন্ধুদের মধ্যে অনেকের অবস্থা এমন যে, তাদের কোনো শান-শওকত ও আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা থাকে না। থাকে না কোনো সম্পদ ও পদবি। মানুষের ভিড়ে তারা অজ্ঞাত ও অখ্যাত হয়ে থাকেন। কেউ তাদের তেমন চেনে না। তবে ঊর্ধ্বলোকের বাসিন্দাদের কাছে তারা সুখ্যাত। সৃষ্টির মানদণ্ডে তাদের ওজন হালকা হলেও স্রষ্টার মানদণ্ডে তারা ভারী। আবু উমামা থেকে বর্ণিত নবিজির হাদিসে কেমন ব্যক্তিকে আল্লাহর সর্বোত্তম বন্ধু ও সর্বাধিক নিকটতর বান্দা বলা হয়েছে দেখো:
রাসুল ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَغْبَطَ أَوْلِيَائِي عِنْدِي لَمُؤْمِنٌ خَفِيفُ الْحَادِ ذُو حَقٌّ مِنَ الصَّلَاةِ، أَحْسَنَ عِبَادَةَ رَبِّهِ وَأَطَاعَهُ فِي السِّرِّ ، وَكَانَ غَامِضًا فِي النَّاسِ لَا يُشَارُ إِلَيْهِ بِالْأَصَابِعِ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافًا فَصَبَرَ عَلَى ذَلِكَ، ثُمَّ نَقَرَ بِإِصْبَعَيْهِ فَقَالَ: «عُجِّلَتْ مَنِيَّتُهُ قَلَّتْ بَوَاكِيهِ قَلَّ تُرَاثُهُ»
'আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষার যোগ্য সেই মুমিন ব্যক্তি, যার অবস্থা খুবই হালকা (ধন-সম্পদ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম) এবং যে নামাজে মনোযোগী, সুচারুরূপে তার প্রভুর ইবাদত করে, একান্ত নিভৃতেও তাঁর অনুগত থাকে, মানুষের মাঝে অখ্যাত, তার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না। ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তার রিজিক, তাতেই ধৈর্যধারণ করে।'
তারপর রাসুল তাঁর হস্তদ্বয় দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, 'অল্পসময়ে তার মৃত্যু হয়। তার জন্য ক্রন্দনকারীর সংখ্যা কম হয়, তার রেখে যাওয়া সম্পদও হয় খুব সামান্য। '
টিকাঃ
৩২. দেখুন, সহিহ মুসলিম: ২৫০৪, মুসনাদু আহমাদ: ২০৬৪০।
৩৩. সহিহু মুসলিম: ২৫০৪।
📄 তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ নেন
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল-এর বিশিষ্ট ছাত্র ইমামুস সুন্নাহ আহমাদ বিন নাসর-এর সাথে যারা শত্রুতা করেছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেকের থেকে বদলা নিয়েছেন। বিস্ময়কর উপায়ে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন।
তা এভাবে যে, খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করার পর থেকে বুকের মধ্যে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। তখন আরেক হত্যাকারী মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক আজ-জাইয়াত তার কক্ষে প্রবেশ করল। ওয়াসিক তাকে বললেন, 'হে আব্দুল মালিকের ছেলে, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' সে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'
এরপর তার কাছে হারসামা প্রবেশ করল। তাকে বললেন, 'হারসামা, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' হারসামা উত্তর দিল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ আমার শরীরকে টুকরো টুকরো করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'
এরপর খলিফার কাছে আহমাদ বিন দাউদ আসলে তাকেও একই কথা বললেন। উত্তরে আহমাদ বিন দাউদ বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'
খলিফা মুতাওয়াক্কিল বলেন, 'জাইয়াতকে আমি পুড়িয়ে মেরেছি। হারসামা পালিয়ে গিয়ে মরুবাসী হয়ে গিয়েছিল। একদিন খুজাআ কবিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় গ্রামের এক লোক তাকে চিনে ফেললেন। তখন লোকটি বলে উঠলেন, 'হে খুজাআ সম্প্রদায়, এ সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের চাচাতো ভাই আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করেছে।' তখন লোকেরা তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। ইবনে আবু দাউদের পরিণতিও তাদের মতো হয়েছিল—আল্লাহ তাআলা তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে নিজ চামড়ার মাঝেই আটকে রেখেছিলেন।
টিকাঃ
৩৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৭।
📄 তাদের হিফাজত করেন
বিশিষ্ট দায়ি মুহাম্মাদ দাসুকি আব্দুন নাসিরের কারাগারে বন্দী ছিলেন। আমাদের ধারণামতে, তিনি ছিলেন আল্লাহর অলি ও মুত্তাকি বান্দাদের অন্যতম। তাঁকে মরূদ্যানের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এই কারাগার ছিল মূলত শুষ্ক মরুভূমির মধ্যে বিক্ষিপ্ত কিছু তাঁবু। এই মরুভূমিতে তারিশা (Cerastes cerastes) নামের এক ধরনের বিষধর সাপের উপদ্রব আছে। এই সাপ অন্যান্য সাপের চেয়ে মারাত্মক। অন্যান্য সাপ তো চলার পথে গায়ের ছাপ রেখে যায়; কিন্তু এই সাপ নিজের পার্শ্বের ওপর ভর দিয়ে চলে বিধায় মাটিতে তার কোনো চিহ্ন থাকে না। পার্শ্বের ওপর ভর দিয়ে চলে বলে এই সাপকে লিবিয়াতে 'জান্নাবি' বলা হয়। ৭০ সেমি লম্বা এই সাপের মাথায় দুটি শিং থাকে। সে পুরো শরীর মাটির ভেতর লুকিয়ে রেখে কেবল শিংদুটি বের করে রাখে। এ জন্য সাপটিকে 'দাফিন'ও বলা হয়। এই সাপের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে এক লাফে কয়েক মিটার যেতে পারে এবং তার কাছাকাছি শিকারকে খুব সহজে ধরে ফেলতে পারে। তার বিষ খুব ভয়াবহ এবং তার কোনো ভ্যাকসিনও নেই। তাই কোনো মানুষ এই সাপের দংশনের শিকার হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যায়। দংশনের পর বিষ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলা ছাড়া তার কোনো চিকিৎসাও নেই।
এই কারাগারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ভাইয়েরা নিজ নিজ অসিয়তনামা লিখে ফেললেন এবং মালাকুল মাওতকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলেন। প্রথমদিন তারিশা একজন সৈনিকের ওপর আক্রমণ করল। চিকিৎসা দেওয়ার পূর্বেই সৈনিকটি মারা গেলেন। অতঃপর মৃত্যুবাহী সাপ সেনাছাউনির নিকটে চলে আসলো এবং বন্দীদের একদম কাছে চলে আসলো। পরেরদিন তারিশা কামড় বসিয়ে দিল মুহাম্মাদ দাসুকির পায়ে। সঙ্গীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আক্রান্ত পা দ্রুত কেটে ফেলার প্রস্তুতি নিলেন। চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ভাই মারা যাননি। এরচেয়েও আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সকল নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভাই বেঁচে গেলেন এবং দংশনকারী সাপ মারা গেল! হ্যাঁ, তারিশা মরে গিয়ে নিথর দেহ হয়ে পড়ে রইল!
এটা কি একজন নেককার বান্দার কারামাত? না আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুর হামলাকারী থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন? না সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তরসমূহকে সত্যের ওপর অবিচল রাখার জন্য এমনটি করেছেন? না সবকটিই?
আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুদের এভাবেই রক্ষা করেন এবং তাদের শত্রুদের থেকে এভাবেই প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তাই পশ্চিমা মুজাহিদ আব্দুল কারিম খাত্তাবি আল্লাহর একজন বন্ধুর হত্যাকাণ্ডের শাস্তির ব্যাপারে যে হুমকি দিয়েছেন, তা মোটেই অমূলক নয়। ইমাম বান্না-এর শাহাদাতের পর তাঁর শোকগাথায় তিনি লিখেছেন :
'আফসোস মিসর ও মিসরবাসীর জন্য! বান্নাকে হত্যা করার বিনিময়ে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে ধ্বংস! তারা আল্লাহর একজন বন্ধুকে হত্যা করেছে। বান্না যদি আল্লাহর বন্ধু না হন, তাহলে আল্লাহর কোনো বন্ধুই নেই।'
টিকাঃ
৩৫. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ১/৫১০-৫১১।
৩৬. হাজি আলি নোয়াইতো (ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রথম সারির নেতা) এর অপ্রকাশিত ডায়েরি থেকে।
📄 আল্লাহর বন্ধুদের স্তরে পৌঁছানোর সেতু
আল্লাহর বন্ধুদের উপরিউক্ত মর্যাদা ও ফজিলতের বিবরণ শোনার পর মনের মধ্যে উক্ত স্তরে পৌঁছার এবং তাদের দলভুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। রূপবতী ও গুণবতী মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইলে মোহরানা প্রদানে কার্পণ্য করা যায় না। মৌমাছির হুলের আঘাত সহ্য করা ছাডা মধু সংগ্রহ করা যায় না। উচ্চ মর্যাদা চাইলে রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়। কষ্ট ও মেহনতের পরিমাণ অনুযায়ী সফলতা ধরা দেয়। তেমনই আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের মর্যাদা লাভ করার জন্য মেহনত করতে হয়। অমানুষিক কোনো মেহনত নয়, কেবলমাত্র দুটি কাজ করতে হয়:
ফরজ ইবাদতসমূহ আঁকড়ে ধরা এবং নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া।
কিয়ামতের দিন আমলসমূহ সংখ্যা ও পরিমাণের ভিত্তিতে গণনা করা হবে না। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে ওজন করা হবে। কারণ, হিসাব-নিকাশের জন্য দাড়িপাল্লা রাখা হবে, গণনাযন্ত্র নয়। মোটকথা, নেক আমলসমূহ ওজন করা হবে, গণনা করা হবে না। ফলে অনেক সময় একটি নেক আমল ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণের কারণে হাজার হাজার নেক আমলের চেয়ে ভারী হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বান্দার নেক আমলসমূহের মধ্যে ফরজ ইবাদতগুলোই সবচেয়ে ভারী, ফরজ নফলের চেয়ে ভারী এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ও নিকটতর। বরং আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত নফল আমলসমূহ কবুল করেন না, যতক্ষণ না ফরজসমূহ আদায় করা হয়। ফরজই ইবাদতের মূলভিত্তি। আর বুদ্ধিমান ব্যক্তি সর্বপ্রথম ভিত্তির প্রতিই গুরুত্ব দেয়। কারণ, ভিত্তি নড়বড় হলে ধ্বংস অনিবার্য।
এ জন্যই ইবনে হুবাইরা বলেছেন, 'নফল আমলসমূহকে নফল (অতিরিক্ত) বলার কারণ হচ্ছে, তা ফরজের পরে অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করা হয়। সুতরাং যদি ফরজ ভালোভাবে আদায় করা না হয়, নফলের সাওয়াব পাওয়া যাবে না।'
তবে ফরজ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আদায় করা হলেই আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয়। এ জন্যই মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে আবু বকর উমর-কে ডেকে অসিয়ত করলেন :
'আল্লাহকে ভয় করুন, হে উমর। আর জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলার জন্য দিনে পালনীয় কিছু আমল আছে, সেগুলো রাতে আদায় করলে কবুল হবে না। কিছু আমল রাতে পালনীয়, দিনের বেলা তা কবুল হবে না।'
ফরজের ওপর নফলকে প্রাধান্য দেওয়াকে ইবনে আতা প্রবৃত্তির অনুসরণের মধ্যে গণ্য করেছেন। বলেছেন, 'প্রবৃত্তির অনুসরণের একটি নিদর্শন হলো, ঐচ্ছিক বিষয়াবলির প্রতি আগ্রহ এবং আবশ্যকীয় বিষয়াবলির প্রতি অনীহা।'
আবু হামিদ গাজালি এটাকে প্রতারিত ও বিভ্রান্তদের আলামত বলেছেন : 'ভালো কাজসমূহের ক্রমধারা ঠিক না থাকা (অর্থাৎ ফরজের আগে নফলকে গুরুত্ব দেওয়া) এক ধরনের বিভ্রান্তি। '
যে ব্যক্তি নফলের প্রতি খুব যত্নশীল, ফরজের প্রতি তার শিথিলতা ও অনীহা কখনো কাম্য নয়। সুতরাং যার ওপর মানুষের কর্জ আছে, কর্জ পরিশোধ না করে সদাকা করা তার উচিত নয়। যার নিজের শরীর আহত, অন্য আহতের চিকিৎসা করা তার জন্য অনুচিত। অনুরূপভাবে যার ফরজে ঘাটতি রয়ে গেছে, ফরজ পরিপূর্ণ না করে নফল নিয়ে পড়ে থাকা তার জন্য ঠিক নয়।
এ জন্যই আব্দুল্লাহ বিন মুবারক ফরজ ও নফলের যথাযথ পার্থক্য নিরূপণ করে প্রত্যেককে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়াকে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। ফলে শয়তান কখনো তাঁকে ধোঁকা দিতে পারেনি। কোনোভাবে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়নি। এ সম্পর্কিত তাঁর চমৎকার রায়টি শুনে দেখো :
'সন্দেহযুক্ত একটি দিরহাম ফিরিয়ে দেওয়া এক লক্ষ, দুই লক্ষ এমনকি ছয় লক্ষ দিরহাম সদাকা করার চেয়ে আমার নিকট পছন্দনীয়। '
সন্দেহযুক্ত দিরহামের ব্যাপারে এমন কথা! সেটা যদি হারাম দirham হয়, তাহলে কেমন হবে!?
এর কারণ হচ্ছে, হারাম দিরহাম থেকে বেঁচে থাকা ফরজ, যেখানে ছয় লক্ষ দিরহাম সদাকা করা নফল। আর নফলের ওপর ফরজ প্রাধান্যপ্রাপ্ত।
এ জন্যই হাসান বসরি অত্যাচারী দানশীলদের ওপর নিজের সকল রাগ ঝেড়ে দিয়ে বলেন:
'হে মিসকিনকে সদাকা দানকারী, সদাকা দেওয়ার পূর্বে ওই ব্যক্তির প্রতি দয়া করো, যার প্রতি তুমি জুলুম করেছ। '
তারপর ওয়াহাব বিন ওয়ারদ তোমাকে এই ফরজ (হালাল খাওয়া) নষ্ট করা থেকে সতর্ক করেছেন। খুব আন্তরিকতা নিয়ে তিনি বলেছেন:
'যদি তুমি এই খুঁটির মতো স্থির হয়ে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকো, কিন্তু তোমার পেটে হালাল ঢুকছে নাকি হারাম তার কোনো পরোয়া নেই তোমার, তাহলে এই ইবাদত তোমার কোনো কাজে আসবে না। '
এ কারনেই আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারা নফলের চেয়ে ফরজ ইবাদতের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতেন। হিশাম বিন উরওয়া বর্ণনা করেন যে, তাঁর পিতা ফরজ নামাজে অধিক সময় ধরে দাঁড়াতেন। নফলে ফরজের মতো দীর্ঘ সময় দাঁড়াতেন না। এ সম্পর্কে তিনি বলতেন, 'ফরজ হচ্ছে মূলধন। '
এ জন্য সালাফগণ ফরজ নামাজের মধ্যে অধিকহারে দুআ করতেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে দুআ করতেন। আওন বিন আব্দুল্লাহ তাঁর মূল্যবান উপদেশের মধ্যে বলেন:
টিকাঃ
৩৭. ফাতহুল বারি: ১১/৩৪৩।
৩৮. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/১০০।
৩৯. হুকমু ইবনি আতা।
৪০. আসনাফুল মাগরুরিন: ১/৫৯।
৪১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/৩২৬।
৪২. আল-ইশরাফ ফি মানাজিলিল আশরাফ পৃ. ১৪৫।
৪৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৫৪।
৪৪. তারিখু বাগদাদ: ৮/২৫১।