📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব

📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব


তুমি তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছ, তিনিও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন। তুমি তাঁকে অগ্রাধিকার দিয়েছ, তিনিও তোমাকে অন্যদের চেয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিয়ামত দান করেছেন। তবে তাঁর সাথে তোমার বন্ধুত্ব এবং তোমার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর প্রতি তোমার অনুদান এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুদান-এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমনকি তুমি যা করতে পেরেছ, তাও তাঁর অনুগ্রহেই করতে পেরেছ। তবুও তিনি তোমাকে তার প্রতিদান দিয়েছেন। ফলে তোমার অনুগ্রহ তাঁর অনুগ্রহের নিচে চাপা পড়ে গেছে। তুমি হেঁটে হেঁটে তাঁর দিকে গিয়েছ, তিনি দৌড়ে এসে তোমায় বরণ করে নিয়েছেন।

সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ،
“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। (অর্থাৎ ফরজের দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করা আমার নিকট বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা نفل ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে দিই এবং সে যদি আমার আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।...'

বিস্ময়কর এক হাদিস! যেখানে অল্প কয়েকটি শব্দে পূর্ণাঙ্গ ইমানের সকল দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে ইমানের সর্বোচ্চ স্তরের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব। অতঃপর উন্নত অলংকারিক ভাষায় বললেন, এই স্তরে পৌঁছানোর পথ হলো, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা এবং নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া। তারপর উক্ত স্তরে উপনীতদের পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বললেন যে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করবেন। এরপর বলা হয়েছে যে, এই ভালোবাসা লাভ করার পর তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিক কর্মসম্পাদনকারী হয়ে যাবে। এরপর বলা হলো, তাদের জন্য আরও একটি চমৎকার পুরস্কার রয়েছে। সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ কবুল করবেন।

কারা সেই বাছাইকৃত দল? কারা সেই কামেল মহাপুরুষ? আরবি ভাষায় তাদের 'অলি' বলা হয়েছে। 'অলি'র দুটি অর্থ রয়েছে :

এক. আরবি الولي )ওয়ার মধ্যে জবর এবং লামের মধ্যে সুকুন)-এর অর্থ, নৈকট্য। এ অর্থ হিসেবে শহরের তত্ত্বাবধায়ককে আরবিতে 'ওয়ালিল বালাদ' বলা হয়। অনুরূপভাবে এতিমের দায়িত্বশীল, প্রতিবেশী, সন্তানের পিতা ও অভিভাবককেও 'অলি' বলা হয়। সুতরাং এ অর্থ হিসেবে 'অলি' হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেছেন। ওই ব্যক্তিই বাদশাহর নিকটবর্তী হতে পারে, যে সর্বাবস্থায় তার আনুগত্য করে। এমনকি নিজের সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে হলেও তার আদেশ মেনে চলে। ফলে নিজের স্বার্থের ওপর বাদশাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। বিনিময়ে সে বাদশাহর প্রিয়ভাজনে পরিণত হয়। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনের ধারক-বাহকদের নিজের আপনজন ও বিশেষ লোক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের কাছে টেনে নিয়েছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিয়ামত দানে ভূষিত করেছেন, যেন তারা তাঁর একান্ত আপনজন।

দুই. 'অলি' অর্থ সাহায্যকারী। কোনো কিছুর 'অলি' বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে তার হিফাজত করে এবং তার থেকে অনিষ্টকে দূর করে। যেমন, আমাদের রব বলেন:
وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ 'বস্তুত, তিনিই সাহায্য করেন সৎকর্মশীল বান্দাদের।'

আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণির লোকদের দেখাশোনা করেন। এক পলকের জন্যও তাদেরকে নিজেদের জিম্মায় ছেড়ে দেন না। যখন তোমার প্রভু তোমার দেখাশোনা করবেন, তখন কারও কি সাধ্য আছে তোমার ক্ষতি করার? বিশেষ করে বিপদ ও দুর্যোগের সময় যদি তিনি তোমার তত্ত্বাবধান করেন, তাহলে আর ভয় কীসের? এটাই উমর বিন আব্দুল আজিজ-কে নিশ্চিন্ত ও নির্ভার রেখেছিল, যখন তাঁর জীবন-সায়াহ্নে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক তাঁকে বলেছিলেন:
'আমিরুল মুমিনিন, যদি আপনি আমার ব্যাপারে অথবা আপনার সন্তানদের মধ্যে আমার সমকক্ষ যারা আছে, তাদের কারও ব্যাপারে (পরবর্তী খলিফা নির্বাচন বিষয়ে) অসিয়ত করে যেতেন!'

তিনি তাঁকে ধরে বসিয়ে দিতে বললেন। অতঃপর বললেন, 'তুমি তাদের ব্যাপারে আমাকে অসিয়ত করে যেতে বলছ। কিন্তু আমি তাদের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সোপর্দ করেছি, যিনি কিতাব নাজিল করেছেন এবং সৎকর্মশীলদের দেখাশোনা করেন। আমার সন্তানরা হয়তো এমন ব্যক্তির মতো হবে, যে আল্লাহকে ভয় করে, তখন আল্লাহই তাদের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন। অথবা পাপে নিমজ্জিত ব্যক্তির মতো হবে, তখন আমি তাদের কাউকে খলিফা বানানোর অসিয়ত করে তার পাপের শক্তি জোগাব না।'

এই শ্রেণির লোকদের আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দেননি। তাদের বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাদের শত্রুদের নিজের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু এতটুকুই নয়, বরং...

টিকাঃ
২৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৩০. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৬।
৩১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩৭১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তারা কারও প্রতি রাগান্বিত হলে তিনিও তার প্রতি রাগান্বিত হন!

📄 তারা কারও প্রতি রাগান্বিত হলে তিনিও তার প্রতি রাগান্বিত হন!


একদা আবু বকর, বিলাল, সুহাইব ও সালমান -এর পাশ দিয়ে গমন করলেন। আবু বকরের সাথে আবু সুফইয়ান ছিলেন। আবু সুফইয়ান তখনও কাফির ছিলেন। সময়টা ছিল হুদাইবিয়া-সন্ধি পরবর্তী যুদ্ধবিরতির সময়। আবু সুফইয়ানকে দেখে এই তিনজন নির্যাতিত মুসলিমের মনে পড়ে গেল, মক্কায় থাকতে তাঁদেরকে আবু সুফইয়ান কী কী কষ্ট দিয়েছিলেন সব। তাই তাঁরা তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'মুসলিমদের তরবারি এখনো আল্লাহর শত্রুর ঘাড় থেকে যা নেওয়ার তা নেয়নি (অর্থাৎ তোমার হিসাব এখনো বাকি আছে)।' এতে আবু বকর রেগে গেলেন। কারণ তিনি উত্তম আচরণের মাধ্যমে আবু সুফইয়ানকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছিলেন। কোনো কটু কথা বলে তাকে ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করতে চাইছিলেন না। তাই তিনি রাগতকণ্ঠে তাঁদের বললেন, 'একজন কুরাইশ নেতা ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এমন কথা বলা তোমাদের উচিত হয়নি।' অতঃপর রাসুল -এর কাছে গিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। কিন্তু রাসুল উল্টো আবু বকর -কে বললেন, 'হে আবু বকর, তুমি (তাঁদের শাসিয়ে) যদি তাঁদেরকে রাগান্বিত করে থাকো, তাহলে তোমার রবকেও রাগান্বিত করেছ!'

কী সে বিষয়, যা মানুষকে এমন উচ্চ স্তরে পৌঁছিয়ে দেয় যে, সে রাগান্বিত হলে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হন; অথচ আল্লাহর রাজত্বে অণু পরিমাণ কারও অংশ নেই। মাখলুকের মধ্য থেকে কেউই তাঁর সামান্যতম সাদৃশ্য রাখে না!? হ্যাঁ, এটা সেই মর্যাদা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রিয় বান্দাদের দান করেন, যারা তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে সকল কিছু থেকে অগ্রাধিকার দেন।

রাসুল-এর মুখ থেকে এমন বাক্য শোনার সাথে সাথেই আবু বকর তাঁদের কাছে ছুটে আসলেন। এসে বললেন, 'ভাইয়েরা, আমার কথায় কি তোমরা রাগ করেছ?' তাঁরা বললেন, 'না। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, প্রিয় ভাই। '

আল্লাহর বন্ধুদের মধ্যে অনেকের অবস্থা এমন যে, তাদের কোনো শান-শওকত ও আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা থাকে না। থাকে না কোনো সম্পদ ও পদবি। মানুষের ভিড়ে তারা অজ্ঞাত ও অখ্যাত হয়ে থাকেন। কেউ তাদের তেমন চেনে না। তবে ঊর্ধ্বলোকের বাসিন্দাদের কাছে তারা সুখ্যাত। সৃষ্টির মানদণ্ডে তাদের ওজন হালকা হলেও স্রষ্টার মানদণ্ডে তারা ভারী। আবু উমামা থেকে বর্ণিত নবিজির হাদিসে কেমন ব্যক্তিকে আল্লাহর সর্বোত্তম বন্ধু ও সর্বাধিক নিকটতর বান্দা বলা হয়েছে দেখো:

রাসুল ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَغْبَطَ أَوْلِيَائِي عِنْدِي لَمُؤْمِنٌ خَفِيفُ الْحَادِ ذُو حَقٌّ مِنَ الصَّلَاةِ، أَحْسَنَ عِبَادَةَ رَبِّهِ وَأَطَاعَهُ فِي السِّرِّ ، وَكَانَ غَامِضًا فِي النَّاسِ لَا يُشَارُ إِلَيْهِ بِالْأَصَابِعِ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافًا فَصَبَرَ عَلَى ذَلِكَ، ثُمَّ نَقَرَ بِإِصْبَعَيْهِ فَقَالَ: «عُجِّلَتْ مَنِيَّتُهُ قَلَّتْ بَوَاكِيهِ قَلَّ تُرَاثُهُ»
'আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষার যোগ্য সেই মুমিন ব্যক্তি, যার অবস্থা খুবই হালকা (ধন-সম্পদ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম) এবং যে নামাজে মনোযোগী, সুচারুরূপে তার প্রভুর ইবাদত করে, একান্ত নিভৃতেও তাঁর অনুগত থাকে, মানুষের মাঝে অখ্যাত, তার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না। ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তার রিজিক, তাতেই ধৈর্যধারণ করে।'

তারপর রাসুল তাঁর হস্তদ্বয় দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, 'অল্পসময়ে তার মৃত্যু হয়। তার জন্য ক্রন্দনকারীর সংখ্যা কম হয়, তার রেখে যাওয়া সম্পদও হয় খুব সামান্য। '

টিকাঃ
৩২. দেখুন, সহিহ মুসলিম: ২৫০৪, মুসনাদু আহমাদ: ২০৬৪০।
৩৩. সহিহু মুসলিম: ২৫০৪।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ নেন

📄 তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ নেন


ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল-এর বিশিষ্ট ছাত্র ইমামুস সুন্নাহ আহমাদ বিন নাসর-এর সাথে যারা শত্রুতা করেছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেকের থেকে বদলা নিয়েছেন। বিস্ময়কর উপায়ে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন।

তা এভাবে যে, খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করার পর থেকে বুকের মধ্যে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। তখন আরেক হত্যাকারী মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক আজ-জাইয়াত তার কক্ষে প্রবেশ করল। ওয়াসিক তাকে বললেন, 'হে আব্দুল মালিকের ছেলে, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' সে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

এরপর তার কাছে হারসামা প্রবেশ করল। তাকে বললেন, 'হারসামা, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' হারসামা উত্তর দিল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ আমার শরীরকে টুকরো টুকরো করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

এরপর খলিফার কাছে আহমাদ বিন দাউদ আসলে তাকেও একই কথা বললেন। উত্তরে আহমাদ বিন দাউদ বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

খলিফা মুতাওয়াক্কিল বলেন, 'জাইয়াতকে আমি পুড়িয়ে মেরেছি। হারসামা পালিয়ে গিয়ে মরুবাসী হয়ে গিয়েছিল। একদিন খুজাআ কবিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় গ্রামের এক লোক তাকে চিনে ফেললেন। তখন লোকটি বলে উঠলেন, 'হে খুজাআ সম্প্রদায়, এ সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের চাচাতো ভাই আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করেছে।' তখন লোকেরা তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। ইবনে আবু দাউদের পরিণতিও তাদের মতো হয়েছিল—আল্লাহ তাআলা তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে নিজ চামড়ার মাঝেই আটকে রেখেছিলেন।

টিকাঃ
৩৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৭।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তাদের হিফাজত করেন

📄 তাদের হিফাজত করেন


বিশিষ্ট দায়ি মুহাম্মাদ দাসুকি আব্দুন নাসিরের কারাগারে বন্দী ছিলেন। আমাদের ধারণামতে, তিনি ছিলেন আল্লাহর অলি ও মুত্তাকি বান্দাদের অন্যতম। তাঁকে মরূদ্যানের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এই কারাগার ছিল মূলত শুষ্ক মরুভূমির মধ্যে বিক্ষিপ্ত কিছু তাঁবু। এই মরুভূমিতে তারিশা (Cerastes cerastes) নামের এক ধরনের বিষধর সাপের উপদ্রব আছে। এই সাপ অন্যান্য সাপের চেয়ে মারাত্মক। অন্যান্য সাপ তো চলার পথে গায়ের ছাপ রেখে যায়; কিন্তু এই সাপ নিজের পার্শ্বের ওপর ভর দিয়ে চলে বিধায় মাটিতে তার কোনো চিহ্ন থাকে না। পার্শ্বের ওপর ভর দিয়ে চলে বলে এই সাপকে লিবিয়াতে 'জান্নাবি' বলা হয়। ৭০ সেমি লম্বা এই সাপের মাথায় দুটি শিং থাকে। সে পুরো শরীর মাটির ভেতর লুকিয়ে রেখে কেবল শিংদুটি বের করে রাখে। এ জন্য সাপটিকে 'দাফিন'ও বলা হয়। এই সাপের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, সে এক লাফে কয়েক মিটার যেতে পারে এবং তার কাছাকাছি শিকারকে খুব সহজে ধরে ফেলতে পারে। তার বিষ খুব ভয়াবহ এবং তার কোনো ভ্যাকসিনও নেই। তাই কোনো মানুষ এই সাপের দংশনের শিকার হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যায়। দংশনের পর বিষ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলা ছাড়া তার কোনো চিকিৎসাও নেই।

এই কারাগারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ভাইয়েরা নিজ নিজ অসিয়তনামা লিখে ফেললেন এবং মালাকুল মাওতকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলেন। প্রথমদিন তারিশা একজন সৈনিকের ওপর আক্রমণ করল। চিকিৎসা দেওয়ার পূর্বেই সৈনিকটি মারা গেলেন। অতঃপর মৃত্যুবাহী সাপ সেনাছাউনির নিকটে চলে আসলো এবং বন্দীদের একদম কাছে চলে আসলো। পরেরদিন তারিশা কামড় বসিয়ে দিল মুহাম্মাদ দাসুকির পায়ে। সঙ্গীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আক্রান্ত পা দ্রুত কেটে ফেলার প্রস্তুতি নিলেন। চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ভাই মারা যাননি। এরচেয়েও আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সকল নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভাই বেঁচে গেলেন এবং দংশনকারী সাপ মারা গেল! হ্যাঁ, তারিশা মরে গিয়ে নিথর দেহ হয়ে পড়ে রইল!

এটা কি একজন নেককার বান্দার কারামাত? না আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুর হামলাকারী থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন? না সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তরসমূহকে সত্যের ওপর অবিচল রাখার জন্য এমনটি করেছেন? না সবকটিই?

আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুদের এভাবেই রক্ষা করেন এবং তাদের শত্রুদের থেকে এভাবেই প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তাই পশ্চিমা মুজাহিদ আব্দুল কারিম খাত্তাবি আল্লাহর একজন বন্ধুর হত্যাকাণ্ডের শাস্তির ব্যাপারে যে হুমকি দিয়েছেন, তা মোটেই অমূলক নয়। ইমাম বান্না-এর শাহাদাতের পর তাঁর শোকগাথায় তিনি লিখেছেন :
'আফসোস মিসর ও মিসরবাসীর জন্য! বান্নাকে হত্যা করার বিনিময়ে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে ধ্বংস! তারা আল্লাহর একজন বন্ধুকে হত্যা করেছে। বান্না যদি আল্লাহর বন্ধু না হন, তাহলে আল্লাহর কোনো বন্ধুই নেই।'

টিকাঃ
৩৫. তাহজিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল: ১/৫১০-৫১১।
৩৬. হাজি আলি নোয়াইতো (ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রথম সারির নেতা) এর অপ্রকাশিত ডায়েরি থেকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00