📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 দৃঢ় বিশ্বাস বিপদের প্রতিষেধক

📄 দৃঢ় বিশ্বাস বিপদের প্রতিষেধক


নিশ্চিন্ততা অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাসের ফসল, আমাদের মাঝে যার বীজ বপন করেছেন নবিজি। অতঃপর তিনিই তার পরিচর্যা করেছেন, তাকে শক্ত করেছেন। ফলে তা পুষ্ট হয়েছে এবং স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে। সাহাবিদের সাথে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাতে রাসুল তাঁদের বিশ্বাসের পরিচর্যা করতেন। তার একটি চমৎকার নিদর্শন দেখো নিচের গল্পে:

রাসুল -এর প্রতিদিনকার মজলিশে সাহাবিদের একটি দল উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের একজন প্রতিদিন মজলিশে আসার সময় নিজের শিশুসন্তানকে পিঠে বহন করে নিয়ে আসতেন এবং তার সামনে বসাতেন। একদিন শিশুটি মারা গেল। ছেলের শোকে লোকটি মজলিশে আসাই ছেড়ে দিলেন। রাসুল তার অনুপস্থিতি টের পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, অমুককে দেখতে পাচ্ছি না কেন?’ তাঁরা জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তার ছেলেটি মারা গেছে।’

রাসুল লোকটির সাথে দেখা করে তার ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানালে রাসুল তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর বললেন:
‘হে ভাই, তুমি কোনটা চাও? তুমি কি এটাই চাও যে, তার দ্বারা এ জীবনে উপকৃত হবে, না এটা চাও যে, আগামীকাল তুমি জান্নাতে গিয়ে তাকে জান্নাতের ভেতরে তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে?’

লোকটি বললেন, ‘হে আল্লাহর নবি, আমি চাই যে, সে আমার আগে জান্নাতে গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে।’

রাসুল ﷺ বললেন, ‘এটাই হবে’।

সুবহানাল্লাহ, কী চমৎকার পরিচর্যা! এভাবেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মকে। তাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন, এখানে যা হারিয়েছে ওখানে তা অনেকগুণে লাভ করবে। আজকে যত কষ্ট পাচ্ছে, তার বিনিময়ে আগামীকাল সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দুনিয়ার একাকিত্ব ও নির্জনতার বিনিময়ে আখিরাতে মিলবে উত্তম সঙ্গীদের সাহচর্য।

প্রকৃত মুমিনের মনে বিপদের মুহূর্তে উক্ত মানসিকতাই কাজ করে। যার মধ্যে এ মানসিকতা অনুপস্থিত, বিপদের মুহূর্তে সে ভেঙে পড়ে। দুঃখের পরে সুখের আগমনকে সে অনেক দূরে মনে করে। এভাবে কঠিন মুহূর্তে অনেক সময় নিজের মহামূল্যবান ইমানটাই হারিয়ে ফেলে।

একজন ভালো মুসলিম এবং একজন পাপিষ্ঠ মুসলিম—বিপদ তাদের দুজনের মধ্যে কেমন ক্রিয়া করে এবং দুঃখ-দুর্দশাকে তাদের কে কেমন চোখে দেখে, তার তুলনামূলক বর্ণনা দিয়েছেন বিপদ-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির:
‘একজন প্রকৃত মুসলিম যখন বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন তার গুনাহসমূহ গাছের পাতার মতো ঝরে যায়। পক্ষান্তরে একজন কাফির অথবা পাপিষ্ঠ মুসলিম যখন বিপদে পড়ে, তার অবস্থা হয় বিচারবুদ্ধিহীন প্রাণীর মতো—যাকে বেঁধে রাখা হলে বুঝতে পারে না কেন বাঁধা হলো, ছেড়ে দেওয়া হলে বুঝতে পারে না কেন ছেড়ে দেওয়া হলো।’

তেমনিভাবে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি অনুভব করতে পারে না, কেন তার ওপর বিপদ এসেছে আর কেনই বা তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তার অন্তর্চক্ষু অন্ধ। বিপদ সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ যথার্থ নয়। দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদকে সে দুনিয়ার মানদণ্ডে পরিমাপ করে। এর সাথে আখিরাতের সংশ্লিষ্টতা সে দেখতে পায় না। অপরদিকে একজন প্রকৃত মুসলিম তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

টিকাঃ
২৬. সাইদুল খাতির: পৃ. ২৮৪।
২৭. সুনানুন নাসায়ি: ২০৮৮।
২৮. শুআবুল ইমান: ১২/৩১১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব

📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব


তুমি তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছ, তিনিও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন। তুমি তাঁকে অগ্রাধিকার দিয়েছ, তিনিও তোমাকে অন্যদের চেয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিয়ামত দান করেছেন। তবে তাঁর সাথে তোমার বন্ধুত্ব এবং তোমার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর প্রতি তোমার অনুদান এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুদান-এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমনকি তুমি যা করতে পেরেছ, তাও তাঁর অনুগ্রহেই করতে পেরেছ। তবুও তিনি তোমাকে তার প্রতিদান দিয়েছেন। ফলে তোমার অনুগ্রহ তাঁর অনুগ্রহের নিচে চাপা পড়ে গেছে। তুমি হেঁটে হেঁটে তাঁর দিকে গিয়েছ, তিনি দৌড়ে এসে তোমায় বরণ করে নিয়েছেন।

সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ،
“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। (অর্থাৎ ফরজের দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করা আমার নিকট বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা نفل ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে দিই এবং সে যদি আমার আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।...'

বিস্ময়কর এক হাদিস! যেখানে অল্প কয়েকটি শব্দে পূর্ণাঙ্গ ইমানের সকল দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে ইমানের সর্বোচ্চ স্তরের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব। অতঃপর উন্নত অলংকারিক ভাষায় বললেন, এই স্তরে পৌঁছানোর পথ হলো, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা এবং নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া। তারপর উক্ত স্তরে উপনীতদের পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বললেন যে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করবেন। এরপর বলা হয়েছে যে, এই ভালোবাসা লাভ করার পর তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিক কর্মসম্পাদনকারী হয়ে যাবে। এরপর বলা হলো, তাদের জন্য আরও একটি চমৎকার পুরস্কার রয়েছে। সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ কবুল করবেন।

কারা সেই বাছাইকৃত দল? কারা সেই কামেল মহাপুরুষ? আরবি ভাষায় তাদের 'অলি' বলা হয়েছে। 'অলি'র দুটি অর্থ রয়েছে :

এক. আরবি الولي )ওয়ার মধ্যে জবর এবং লামের মধ্যে সুকুন)-এর অর্থ, নৈকট্য। এ অর্থ হিসেবে শহরের তত্ত্বাবধায়ককে আরবিতে 'ওয়ালিল বালাদ' বলা হয়। অনুরূপভাবে এতিমের দায়িত্বশীল, প্রতিবেশী, সন্তানের পিতা ও অভিভাবককেও 'অলি' বলা হয়। সুতরাং এ অর্থ হিসেবে 'অলি' হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেছেন। ওই ব্যক্তিই বাদশাহর নিকটবর্তী হতে পারে, যে সর্বাবস্থায় তার আনুগত্য করে। এমনকি নিজের সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে হলেও তার আদেশ মেনে চলে। ফলে নিজের স্বার্থের ওপর বাদশাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। বিনিময়ে সে বাদশাহর প্রিয়ভাজনে পরিণত হয়। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনের ধারক-বাহকদের নিজের আপনজন ও বিশেষ লোক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের কাছে টেনে নিয়েছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিয়ামত দানে ভূষিত করেছেন, যেন তারা তাঁর একান্ত আপনজন।

দুই. 'অলি' অর্থ সাহায্যকারী। কোনো কিছুর 'অলি' বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে তার হিফাজত করে এবং তার থেকে অনিষ্টকে দূর করে। যেমন, আমাদের রব বলেন:
وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ 'বস্তুত, তিনিই সাহায্য করেন সৎকর্মশীল বান্দাদের।'

আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণির লোকদের দেখাশোনা করেন। এক পলকের জন্যও তাদেরকে নিজেদের জিম্মায় ছেড়ে দেন না। যখন তোমার প্রভু তোমার দেখাশোনা করবেন, তখন কারও কি সাধ্য আছে তোমার ক্ষতি করার? বিশেষ করে বিপদ ও দুর্যোগের সময় যদি তিনি তোমার তত্ত্বাবধান করেন, তাহলে আর ভয় কীসের? এটাই উমর বিন আব্দুল আজিজ-কে নিশ্চিন্ত ও নির্ভার রেখেছিল, যখন তাঁর জীবন-সায়াহ্নে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক তাঁকে বলেছিলেন:
'আমিরুল মুমিনিন, যদি আপনি আমার ব্যাপারে অথবা আপনার সন্তানদের মধ্যে আমার সমকক্ষ যারা আছে, তাদের কারও ব্যাপারে (পরবর্তী খলিফা নির্বাচন বিষয়ে) অসিয়ত করে যেতেন!'

তিনি তাঁকে ধরে বসিয়ে দিতে বললেন। অতঃপর বললেন, 'তুমি তাদের ব্যাপারে আমাকে অসিয়ত করে যেতে বলছ। কিন্তু আমি তাদের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সোপর্দ করেছি, যিনি কিতাব নাজিল করেছেন এবং সৎকর্মশীলদের দেখাশোনা করেন। আমার সন্তানরা হয়তো এমন ব্যক্তির মতো হবে, যে আল্লাহকে ভয় করে, তখন আল্লাহই তাদের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন। অথবা পাপে নিমজ্জিত ব্যক্তির মতো হবে, তখন আমি তাদের কাউকে খলিফা বানানোর অসিয়ত করে তার পাপের শক্তি জোগাব না।'

এই শ্রেণির লোকদের আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দেননি। তাদের বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাদের শত্রুদের নিজের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু এতটুকুই নয়, বরং...

টিকাঃ
২৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৩০. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৬।
৩১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩৭১।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তারা কারও প্রতি রাগান্বিত হলে তিনিও তার প্রতি রাগান্বিত হন!

📄 তারা কারও প্রতি রাগান্বিত হলে তিনিও তার প্রতি রাগান্বিত হন!


একদা আবু বকর, বিলাল, সুহাইব ও সালমান -এর পাশ দিয়ে গমন করলেন। আবু বকরের সাথে আবু সুফইয়ান ছিলেন। আবু সুফইয়ান তখনও কাফির ছিলেন। সময়টা ছিল হুদাইবিয়া-সন্ধি পরবর্তী যুদ্ধবিরতির সময়। আবু সুফইয়ানকে দেখে এই তিনজন নির্যাতিত মুসলিমের মনে পড়ে গেল, মক্কায় থাকতে তাঁদেরকে আবু সুফইয়ান কী কী কষ্ট দিয়েছিলেন সব। তাই তাঁরা তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'মুসলিমদের তরবারি এখনো আল্লাহর শত্রুর ঘাড় থেকে যা নেওয়ার তা নেয়নি (অর্থাৎ তোমার হিসাব এখনো বাকি আছে)।' এতে আবু বকর রেগে গেলেন। কারণ তিনি উত্তম আচরণের মাধ্যমে আবু সুফইয়ানকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চাইছিলেন। কোনো কটু কথা বলে তাকে ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করতে চাইছিলেন না। তাই তিনি রাগতকণ্ঠে তাঁদের বললেন, 'একজন কুরাইশ নেতা ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এমন কথা বলা তোমাদের উচিত হয়নি।' অতঃপর রাসুল -এর কাছে গিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। কিন্তু রাসুল উল্টো আবু বকর -কে বললেন, 'হে আবু বকর, তুমি (তাঁদের শাসিয়ে) যদি তাঁদেরকে রাগান্বিত করে থাকো, তাহলে তোমার রবকেও রাগান্বিত করেছ!'

কী সে বিষয়, যা মানুষকে এমন উচ্চ স্তরে পৌঁছিয়ে দেয় যে, সে রাগান্বিত হলে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রাগান্বিত হন; অথচ আল্লাহর রাজত্বে অণু পরিমাণ কারও অংশ নেই। মাখলুকের মধ্য থেকে কেউই তাঁর সামান্যতম সাদৃশ্য রাখে না!? হ্যাঁ, এটা সেই মর্যাদা, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য নিবেদিতপ্রাণ প্রিয় বান্দাদের দান করেন, যারা তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিকে সকল কিছু থেকে অগ্রাধিকার দেন।

রাসুল-এর মুখ থেকে এমন বাক্য শোনার সাথে সাথেই আবু বকর তাঁদের কাছে ছুটে আসলেন। এসে বললেন, 'ভাইয়েরা, আমার কথায় কি তোমরা রাগ করেছ?' তাঁরা বললেন, 'না। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, প্রিয় ভাই। '

আল্লাহর বন্ধুদের মধ্যে অনেকের অবস্থা এমন যে, তাদের কোনো শান-শওকত ও আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা থাকে না। থাকে না কোনো সম্পদ ও পদবি। মানুষের ভিড়ে তারা অজ্ঞাত ও অখ্যাত হয়ে থাকেন। কেউ তাদের তেমন চেনে না। তবে ঊর্ধ্বলোকের বাসিন্দাদের কাছে তারা সুখ্যাত। সৃষ্টির মানদণ্ডে তাদের ওজন হালকা হলেও স্রষ্টার মানদণ্ডে তারা ভারী। আবু উমামা থেকে বর্ণিত নবিজির হাদিসে কেমন ব্যক্তিকে আল্লাহর সর্বোত্তম বন্ধু ও সর্বাধিক নিকটতর বান্দা বলা হয়েছে দেখো:

রাসুল ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَغْبَطَ أَوْلِيَائِي عِنْدِي لَمُؤْمِنٌ خَفِيفُ الْحَادِ ذُو حَقٌّ مِنَ الصَّلَاةِ، أَحْسَنَ عِبَادَةَ رَبِّهِ وَأَطَاعَهُ فِي السِّرِّ ، وَكَانَ غَامِضًا فِي النَّاسِ لَا يُشَارُ إِلَيْهِ بِالْأَصَابِعِ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافًا فَصَبَرَ عَلَى ذَلِكَ، ثُمَّ نَقَرَ بِإِصْبَعَيْهِ فَقَالَ: «عُجِّلَتْ مَنِيَّتُهُ قَلَّتْ بَوَاكِيهِ قَلَّ تُرَاثُهُ»
'আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষার যোগ্য সেই মুমিন ব্যক্তি, যার অবস্থা খুবই হালকা (ধন-সম্পদ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম) এবং যে নামাজে মনোযোগী, সুচারুরূপে তার প্রভুর ইবাদত করে, একান্ত নিভৃতেও তাঁর অনুগত থাকে, মানুষের মাঝে অখ্যাত, তার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না। ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তার রিজিক, তাতেই ধৈর্যধারণ করে।'

তারপর রাসুল তাঁর হস্তদ্বয় দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, 'অল্পসময়ে তার মৃত্যু হয়। তার জন্য ক্রন্দনকারীর সংখ্যা কম হয়, তার রেখে যাওয়া সম্পদও হয় খুব সামান্য। '

টিকাঃ
৩২. দেখুন, সহিহ মুসলিম: ২৫০৪, মুসনাদু আহমাদ: ২০৬৪০।
৩৩. সহিহু মুসলিম: ২৫০৪।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ নেন

📄 তাদের যারা কষ্ট দেয়, তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ নেন


ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল-এর বিশিষ্ট ছাত্র ইমামুস সুন্নাহ আহমাদ বিন নাসর-এর সাথে যারা শত্রুতা করেছিল, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেকের থেকে বদলা নিয়েছেন। বিস্ময়কর উপায়ে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন।

তা এভাবে যে, খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করার পর থেকে বুকের মধ্যে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। তখন আরেক হত্যাকারী মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালিক আজ-জাইয়াত তার কক্ষে প্রবেশ করল। ওয়াসিক তাকে বললেন, 'হে আব্দুল মালিকের ছেলে, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' সে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

এরপর তার কাছে হারসামা প্রবেশ করল। তাকে বললেন, 'হারসামা, আমি বুকের মধ্যে আহমাদ বিন নাসর হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অনুভব করছি।' হারসামা উত্তর দিল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ আমার শরীরকে টুকরো টুকরো করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

এরপর খলিফার কাছে আহমাদ বিন দাউদ আসলে তাকেও একই কথা বললেন। উত্তরে আহমাদ বিন দাউদ বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করুক। আমিরুল মুমিনিন ওয়াসিক তো একজন কাফিরকেই হত্যা করেছেন।'

খলিফা মুতাওয়াক্কিল বলেন, 'জাইয়াতকে আমি পুড়িয়ে মেরেছি। হারসামা পালিয়ে গিয়ে মরুবাসী হয়ে গিয়েছিল। একদিন খুজাআ কবিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় গ্রামের এক লোক তাকে চিনে ফেললেন। তখন লোকটি বলে উঠলেন, 'হে খুজাআ সম্প্রদায়, এ সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের চাচাতো ভাই আহমাদ বিন নাসরকে হত্যা করেছে।' তখন লোকেরা তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। ইবনে আবু দাউদের পরিণতিও তাদের মতো হয়েছিল—আল্লাহ তাআলা তাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে নিজ চামড়ার মাঝেই আটকে রেখেছিলেন।

টিকাঃ
৩৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৩৪৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00