📄 স্বাধীন বন্দী
এই যে অন্তরের প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা—এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত ও গুপ্ত অনুদান। এটা এমন এক মূল্যবান সম্পদ, যা বস্তুবাদীরা অনুভবই করতে পারে না। তবে যখন তাদের কর্মের দরুন তাদের ওপর বিপদ আসে অথবা তাদের আবাসের আশপাশে বিপদ আপতিত হয়, তখন বস্তুবাদীরাও আত্মিক প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততার মর্ম ও মাহাত্ম্য বুঝতে পারে। কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে এই গুণটি বদ্ধমূল হয়ে থাকে, বিপদ ও দুর্দশা যতই কঠিন ও জটিল হোক। এমনকি তাদের অনেকে হাতে-পায়ে শিকলাবদ্ধ হয়েও আলি বিন জাহামের মতো উচ্চকণ্ঠে গায় :
'আমি বন্দী হয়েছি, তবে এই বন্দিত্বই আমার শেষ নয়, প্রতিটি ধারালো তরবারি কিছু সময় খাপবদ্ধ থাকে। পূর্ণিমার চাঁদ কিছুদিন ক্রমশ হ্রাস পায় ঠিকই; কিন্তু কিছুদিন পর নতুন আঙ্গিকে আবার ফিরে আসে। জেলবন্দীর মনে যদি অধৈর্যের কদর্যতা না থাকে, তাহলে জেলখানা তার জন্য গোলাপশোভিত একটি মহল। যে মহল মর্যাদাবানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যেখানে শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে, তাকে কারও কাছে যেতে হয় না।'
অন্তরসমূহের চাবি একমাত্র আল্লাহর হাতেই আছে। তিনিই মুমিনের অন্তরে এই অপার্থিব প্রশান্তি সঞ্চার করেন। ফলে বন্দিশালা হয়ে যায় তার কাছে বিনোদনপার্ক। বন্দিত্ব হয়ে ওঠে উপভোগ্য নির্জনতা। শিকল-বেড়ির ঝনঝনানি তার কানে বাঁশির সুরের মতো বাজে।
📄 ঈরার শাস্তি
সময়ের পরিক্রমায় মানুষ নানাবিধ সমস্যা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। এটাই দুনিয়ার নীতি। দুনিয়ার এই পঙ্কিলতা কখনো সাফ হবে না। তখন আমাদের অনেকেই খেয়া হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। কেউ প্রবল ঝড়ের সামনে সুউচ্চ পাহাড় ও সুদৃঢ় ঢেউয়ের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই শক্তি তারা মনের ভেতর থেকে পায়, যা একজন ব্যক্তি তার দীর্ঘ ইমানি সফর থেকে অর্জন করে এবং প্রভুর সাথে সম্পর্ক ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টির মাধ্যমে পোক্ত করে নেয়।
বিপদ একটি তুফান, যা মানুষের অন্তরে প্রবলবেগে প্রবাহিত হয়। যে হৃদয়ের রবের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকে, এই তুফানে সে হৃদয় ভেঙে পড়ে না। যে হৃদয় দুর্বল, তা মুসিবতের গলনাধারে গলে যায় এবং জানবাজি রাখার ময়দানে ব্যর্থতা স্বীকার করে পরাজয় মেনে নেয়।
এ জন্যই তো বলা হয়, ইবাদত ও আনুগত্য একটি গুপ্ত সম্পদ, বিপদের আগুনে প্রজ্বলিত হওয়া ব্যতীত তার দীপ্তি প্রকাশ পায় না। বান্দা ইবাদতের প্রকৃত মূল্য তখনই অনুধাবন করতে পারে, যখন তার খারাপ সময় আসে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট, উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন। তিনি ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ
'নাপাককে পাক থেকে পৃথক করে দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ এমন নন যে, ইমানদারগণকে সে অবস্থাতেই রাখবেন, যাতে তোমরা রয়েছ।'
জামাখশারি আল্লাহর এই নীতির ব্যাখ্যায় বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের মিশ্রিত অবস্থায় রেখে দেন না; বরং উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে দেন। তা এভাবে যে, তোমাদের ওপর তিনি এমন কঠোর বিধান আরোপ করেন, যার ওপর কেবল আল্লাহর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিষ্ঠাবান বান্দারাই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারেন। যেমন: জিহাদে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া, আল্লাহর পথে সম্পদ খরচ করা ইত্যাদি। এ পরীক্ষা তোমাদের মনের আকিদা-বিশ্বাসের মাপকাঠি এবং হৃদয়ের গোপন অবস্থার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়। ফলে তোমরা একজন অপরজনের মনের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারো। তবে তা দলিলের ভিত্তিতে; মনের অবস্থা জানার যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। কারণ এ যোগ্যতা একচেটিয়াভাবে কেবল আল্লাহরই আছে।'
নিরাপত্তা ও সুস্থতার সময় সব মানুষ একসমান। যখন বিপদ-বিপর্যয় ও অসুস্থতার আঘাত আসে, তখন বিভিন্ন বর্ণ, প্রকার ও শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি তাদের কৃত আমল অনুযায়ী হয়। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে হাসান বসরি এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন:
‘ভালো সময়ে সকল মানুষ সমান থাকে। যখন খারাপ সময় আসে, তখন তাদের মাঝে স্পষ্টরূপে পার্থক্য প্রতিভাত হয়।’
টিকাঃ
২৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৭৯।
২৫. আল-কাশশাফ: ১/৪৪৫।
📄 দৃঢ় বিশ্বাস বিপদের প্রতিষেধক
নিশ্চিন্ততা অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাসের ফসল, আমাদের মাঝে যার বীজ বপন করেছেন নবিজি। অতঃপর তিনিই তার পরিচর্যা করেছেন, তাকে শক্ত করেছেন। ফলে তা পুষ্ট হয়েছে এবং স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে। সাহাবিদের সাথে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাতে রাসুল তাঁদের বিশ্বাসের পরিচর্যা করতেন। তার একটি চমৎকার নিদর্শন দেখো নিচের গল্পে:
রাসুল -এর প্রতিদিনকার মজলিশে সাহাবিদের একটি দল উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের একজন প্রতিদিন মজলিশে আসার সময় নিজের শিশুসন্তানকে পিঠে বহন করে নিয়ে আসতেন এবং তার সামনে বসাতেন। একদিন শিশুটি মারা গেল। ছেলের শোকে লোকটি মজলিশে আসাই ছেড়ে দিলেন। রাসুল তার অনুপস্থিতি টের পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, অমুককে দেখতে পাচ্ছি না কেন?’ তাঁরা জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তার ছেলেটি মারা গেছে।’
রাসুল লোকটির সাথে দেখা করে তার ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানালে রাসুল তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর বললেন:
‘হে ভাই, তুমি কোনটা চাও? তুমি কি এটাই চাও যে, তার দ্বারা এ জীবনে উপকৃত হবে, না এটা চাও যে, আগামীকাল তুমি জান্নাতে গিয়ে তাকে জান্নাতের ভেতরে তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে?’
লোকটি বললেন, ‘হে আল্লাহর নবি, আমি চাই যে, সে আমার আগে জান্নাতে গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে।’
রাসুল ﷺ বললেন, ‘এটাই হবে’।
সুবহানাল্লাহ, কী চমৎকার পরিচর্যা! এভাবেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মকে। তাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন, এখানে যা হারিয়েছে ওখানে তা অনেকগুণে লাভ করবে। আজকে যত কষ্ট পাচ্ছে, তার বিনিময়ে আগামীকাল সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দুনিয়ার একাকিত্ব ও নির্জনতার বিনিময়ে আখিরাতে মিলবে উত্তম সঙ্গীদের সাহচর্য।
প্রকৃত মুমিনের মনে বিপদের মুহূর্তে উক্ত মানসিকতাই কাজ করে। যার মধ্যে এ মানসিকতা অনুপস্থিত, বিপদের মুহূর্তে সে ভেঙে পড়ে। দুঃখের পরে সুখের আগমনকে সে অনেক দূরে মনে করে। এভাবে কঠিন মুহূর্তে অনেক সময় নিজের মহামূল্যবান ইমানটাই হারিয়ে ফেলে।
একজন ভালো মুসলিম এবং একজন পাপিষ্ঠ মুসলিম—বিপদ তাদের দুজনের মধ্যে কেমন ক্রিয়া করে এবং দুঃখ-দুর্দশাকে তাদের কে কেমন চোখে দেখে, তার তুলনামূলক বর্ণনা দিয়েছেন বিপদ-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির:
‘একজন প্রকৃত মুসলিম যখন বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন তার গুনাহসমূহ গাছের পাতার মতো ঝরে যায়। পক্ষান্তরে একজন কাফির অথবা পাপিষ্ঠ মুসলিম যখন বিপদে পড়ে, তার অবস্থা হয় বিচারবুদ্ধিহীন প্রাণীর মতো—যাকে বেঁধে রাখা হলে বুঝতে পারে না কেন বাঁধা হলো, ছেড়ে দেওয়া হলে বুঝতে পারে না কেন ছেড়ে দেওয়া হলো।’
তেমনিভাবে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি অনুভব করতে পারে না, কেন তার ওপর বিপদ এসেছে আর কেনই বা তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তার অন্তর্চক্ষু অন্ধ। বিপদ সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ যথার্থ নয়। দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদকে সে দুনিয়ার মানদণ্ডে পরিমাপ করে। এর সাথে আখিরাতের সংশ্লিষ্টতা সে দেখতে পায় না। অপরদিকে একজন প্রকৃত মুসলিম তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
টিকাঃ
২৬. সাইদুল খাতির: পৃ. ২৮৪।
২৭. সুনানুন নাসায়ি: ২০৮৮।
২৮. শুআবুল ইমান: ১২/৩১১।
📄 আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব
তুমি তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছ, তিনিও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন। তুমি তাঁকে অগ্রাধিকার দিয়েছ, তিনিও তোমাকে অন্যদের চেয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিয়ামত দান করেছেন। তবে তাঁর সাথে তোমার বন্ধুত্ব এবং তোমার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর প্রতি তোমার অনুদান এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুদান-এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমনকি তুমি যা করতে পেরেছ, তাও তাঁর অনুগ্রহেই করতে পেরেছ। তবুও তিনি তোমাকে তার প্রতিদান দিয়েছেন। ফলে তোমার অনুগ্রহ তাঁর অনুগ্রহের নিচে চাপা পড়ে গেছে। তুমি হেঁটে হেঁটে তাঁর দিকে গিয়েছ, তিনি দৌড়ে এসে তোমায় বরণ করে নিয়েছেন।
সহিহ বুখারিতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ،
“যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমার বান্দা যে সমস্ত জিনিস দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নিকট প্রিয়তম জিনিস হলো তা, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। (অর্থাৎ ফরজের দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করা আমার নিকট বেশি পছন্দনীয়।) আর আমার বান্দা نفل ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, পরিশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। অতঃপর যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। আর সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে দিই এবং সে যদি আমার আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।...'
বিস্ময়কর এক হাদিস! যেখানে অল্প কয়েকটি শব্দে পূর্ণাঙ্গ ইমানের সকল দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে ইমানের সর্বোচ্চ স্তরের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব। অতঃপর উন্নত অলংকারিক ভাষায় বললেন, এই স্তরে পৌঁছানোর পথ হলো, ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা এবং নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া। তারপর উক্ত স্তরে উপনীতদের পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বললেন যে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করবেন। এরপর বলা হয়েছে যে, এই ভালোবাসা লাভ করার পর তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিক কর্মসম্পাদনকারী হয়ে যাবে। এরপর বলা হলো, তাদের জন্য আরও একটি চমৎকার পুরস্কার রয়েছে। সেটি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাদের দুআ কবুল করবেন।
কারা সেই বাছাইকৃত দল? কারা সেই কামেল মহাপুরুষ? আরবি ভাষায় তাদের 'অলি' বলা হয়েছে। 'অলি'র দুটি অর্থ রয়েছে :
এক. আরবি الولي )ওয়ার মধ্যে জবর এবং লামের মধ্যে সুকুন)-এর অর্থ, নৈকট্য। এ অর্থ হিসেবে শহরের তত্ত্বাবধায়ককে আরবিতে 'ওয়ালিল বালাদ' বলা হয়। অনুরূপভাবে এতিমের দায়িত্বশীল, প্রতিবেশী, সন্তানের পিতা ও অভিভাবককেও 'অলি' বলা হয়। সুতরাং এ অর্থ হিসেবে 'অলি' হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন করেছেন। ওই ব্যক্তিই বাদশাহর নিকটবর্তী হতে পারে, যে সর্বাবস্থায় তার আনুগত্য করে। এমনকি নিজের সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে হলেও তার আদেশ মেনে চলে। ফলে নিজের স্বার্থের ওপর বাদশাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। বিনিময়ে সে বাদশাহর প্রিয়ভাজনে পরিণত হয়। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনের ধারক-বাহকদের নিজের আপনজন ও বিশেষ লোক বলে অভিহিত করেছেন। তাদের কাছে টেনে নিয়েছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিয়ামত দানে ভূষিত করেছেন, যেন তারা তাঁর একান্ত আপনজন।
দুই. 'অলি' অর্থ সাহায্যকারী। কোনো কিছুর 'অলি' বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে তার হিফাজত করে এবং তার থেকে অনিষ্টকে দূর করে। যেমন, আমাদের রব বলেন:
وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ 'বস্তুত, তিনিই সাহায্য করেন সৎকর্মশীল বান্দাদের।'
আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণির লোকদের দেখাশোনা করেন। এক পলকের জন্যও তাদেরকে নিজেদের জিম্মায় ছেড়ে দেন না। যখন তোমার প্রভু তোমার দেখাশোনা করবেন, তখন কারও কি সাধ্য আছে তোমার ক্ষতি করার? বিশেষ করে বিপদ ও দুর্যোগের সময় যদি তিনি তোমার তত্ত্বাবধান করেন, তাহলে আর ভয় কীসের? এটাই উমর বিন আব্দুল আজিজ-কে নিশ্চিন্ত ও নির্ভার রেখেছিল, যখন তাঁর জীবন-সায়াহ্নে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক তাঁকে বলেছিলেন:
'আমিরুল মুমিনিন, যদি আপনি আমার ব্যাপারে অথবা আপনার সন্তানদের মধ্যে আমার সমকক্ষ যারা আছে, তাদের কারও ব্যাপারে (পরবর্তী খলিফা নির্বাচন বিষয়ে) অসিয়ত করে যেতেন!'
তিনি তাঁকে ধরে বসিয়ে দিতে বললেন। অতঃপর বললেন, 'তুমি তাদের ব্যাপারে আমাকে অসিয়ত করে যেতে বলছ। কিন্তু আমি তাদের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সোপর্দ করেছি, যিনি কিতাব নাজিল করেছেন এবং সৎকর্মশীলদের দেখাশোনা করেন। আমার সন্তানরা হয়তো এমন ব্যক্তির মতো হবে, যে আল্লাহকে ভয় করে, তখন আল্লাহই তাদের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন। অথবা পাপে নিমজ্জিত ব্যক্তির মতো হবে, তখন আমি তাদের কাউকে খলিফা বানানোর অসিয়ত করে তার পাপের শক্তি জোগাব না।'
এই শ্রেণির লোকদের আল্লাহ তাআলা এমন মর্যাদা দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দেননি। তাদের বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাদের শত্রুদের নিজের শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু এতটুকুই নয়, বরং...
টিকাঃ
২৯. সহিহুল বুখারি: ৬৫০২।
৩০. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৯৬।
৩১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩৭১।