📄 বিপদের সময় দৃঢ়পদ থাকা
আল্লাহ বলেন, (لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ) 'আমি মানুষকে কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।' আমাদের প্রত্যেকে এ দুনিয়ায় বিপদগ্রস্ত। পঙ্কিলতার আলয়ে পরিচ্ছন্নতা কামনা করে যে, সে এ আলয় চিনে না এবং এখানে থাকার যোগ্য নয়। তবে হে মুমিন, তোমার ইমান তোমাকে রক্ষা করেছে এবং পূর্বের কৃতিত্ব তোমাকে মুক্তি দিয়েছে। ফলে পেরেশানি ও দুর্যোগের ঝড় তোমার পরোপকারের শিলাখণ্ডের ওপর আছড়ে পড়ে গতি হারিয়েছে। ফলে অন্যরা যখন হতাশায় কাঁদে, তুমি তখন সফলতার হাসি হাসো। তোমার হৃদয়মন তখন শান্ত ও স্থির থাকে।
এটা সেই স্থিরতা ও নিশ্চিন্ততা, যেটাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দার ভীতি ও অস্থিরতার সময় তার অন্তরে ঢেলে দেন। এটা প্রথমে হৃদয়ে অনুভূত হয়। পরবর্তী সময়ে তা শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কঠিন বিপদের মুহূর্তেও তার তনুমন এক আশ্চর্যজনক নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তিতে অবগাহন করে। এই প্রশান্তি তখনই অর্জিত হয়, যখন বান্দা বিপদ-বিপর্যয়কে তার গুনাহের কাফফারা মনে করে। মর্যাদা বৃদ্ধিকারী এবং পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা দানকারী মনে করে। এই প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা অর্জন করেছিলেন বলেই ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বন্দীর শিকলে আবদ্ধ থাকাবস্থাতেও এমন উক্তি করতে পেরেছিলেন, যা দুশমনদের হিংসার অনলে ঘি ঢেলে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন:
'শত্রুরা আমার কীই বা ক্ষতি করবে?! আমার জান্নাত আমার হৃদয়ে। আমার সাথে আছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবির সুন্নাহ। যদি তারা আমাকে হত্যা করে, সেটা হবে আমার জন্য শাহাদাত। যদি বন্দী করে রাখে, তা হবে আমার জন্য রবের সাথে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ। প্রকৃত রুদ্ধ তো সেই, যে নিজের রব থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রকৃত বন্দী সেই, যে নিজের প্রবৃত্তির কাছে বন্দী হয়ে আছে।'
বন্দিশালার মধ্যে তিনি বলতেন:
'যদি আমি এই দুর্গ পরিমাণ স্বর্ণ দান করি, তবুও বন্দিত্বের এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে না। আমার শত্রুরা আমাকে বন্দী করার মাধ্যমে আমার জন্য যে কল্যাণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, তার প্রতিদান দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।'
গ্রেফতার করার পর যখন তাঁকে প্রাচীরঘেরা বন্দিশালায় আবদ্ধ করা হলো, তখন তিনি প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে তিলাওয়াত করলেন:
فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابُ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ
'অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আজাব।'
তাঁর এই চমৎকার ইমানি শক্তির বর্ণনা দিয়েছেন তাঁরই সুযোগ্য শাগরিদ ইবনুল কাইয়িম। তিনি এটাকে জান্নাতের পূর্বে জান্নাত এবং সর্বমহান নিয়ামতের পূর্বে মহান নিয়ামত বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন:
'আল্লাহর ইলমের কসম, আমি তাঁর চেয়ে উত্তম জীবনযাপন করতে কাউকে দেখিনি। অথচ তাঁর জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও সংকীর্ণতায় ভরা। সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতার উপকরণ তাঁর ছিল না। দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অনটনের উপকরণে ভরা ছিল তাঁর জীবন। এসব ছাড়াও বন্দিত্ব এবং বিভিন্ন দিক থেকে হুমকি-ধমকি ও কষ্ট পাওয়া ছিল তাঁর জীবনের নিয়মিত রুটিন। এতসব সত্ত্বেও তাঁর জীবন ছিল সর্বাধিক সুন্দর, তাঁর মন ছিল সবচেয়ে নিশ্চিন্ত, প্রশান্ত ও আনন্দিত। তাঁর মনোবলও ছিল অন্য সবার চেয়ে শক্তিশালী। প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততার দ্যুতি ঠিকরে বের হতো তাঁর চেহারা থেকে। যখন চারিদিক থেকে দুশ্চিন্তা ও ভীতি আমাদের গ্রাস করে নিত এবং আমরা মানুষের ভুল ধারণার শিকার হওয়ার কারণে পৃথিবী আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে আসত, তখন আমরা তাঁর কাছে যেতাম। তাঁকে দেখে এবং তাঁর কথা শুনে আমাদের সকল পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা এক নিমিষেই গায়েব হয়ে যেত। মনে অনুভব করতাম এক অপার্থিব প্রশান্তি ও সুদৃঢ় মনোবল।
পবিত্র সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাদের মৃত্যুর পূর্বেই জান্নাতের সুখ আস্বাদন করান এবং আমলের ঘর দুনিয়াতেই তাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেন। ফলে যতক্ষণ তারা আমলে মগ্ন থাকেন, জান্নাতের মৃদুমন্দ বাতাস ও সুবাসে তারা সুবাসিত হতে থাকেন।'
তিনি তাঁর জীবনে এমন কঠিন কঠিন বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন, কোনো লোহা যদি তার মুখোমুখি হতো, তাহলে মোমের মতো গলে যেত; টগবগে যুবক এমন বিপদের মুখোমুখি হলে বুড়ো হয়ে যেত।
বলা হয়ে থাকে, তিনি আজীবন এক বিপদ থেকে অন্য বিপদে, এক বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তবে তাঁর নেক আমলের বরকত তাঁকে কঠিন বিপদের সময়ে অবিচল থাকার পাথেয় জুগিয়েছে। যেন দুঃখের পরে সুখ আসে—নামক পুস্তিকাটি তিনি ইন্দ্রিয় ও বিবেক-বুদ্ধি সব নিয়ে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। এভাবে সত্যিই একসময় তাঁর দুঃখ লাঘব হয়েছিল, দূরীভূত হয়েছিল বিপদের কালো মেঘ।
এ জন্যই বলা হয়, বিপদের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া বান্দার ইমানের পরীক্ষা হয় না এবং অন্তরের গোপন অবস্থা প্রকাশিত হয় না। ইবনে তাইমিয়া বলেন: 'মনের ভেতরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয় বিপদের মুহূর্তে।'
সম্ভবত তাঁর নানামুখী পুণ্যকর্মের কারণে তাঁকে কেন্দ্র করে একটি অলৌকিক কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। তা হচ্ছে: তিনি যখন মিসরের কারাগারে বন্দী ছিলেন, তখন একটি মুসলিম জিন তাঁর আকৃতি ধারণ করে দামেস্কে তাঁর ভূমিকা পালন করেছিলেন। চলুন, অদ্ভুত সেই ঘটনাটি সরাসরি ইমামের জবানিতেই শুনি:
'যখন আমি মিসরের কারাগারে বন্দী ছিলাম, তখন হুবহু আমার মতো এক ব্যক্তি উত্তর অঞ্চলে তাতারিদের নিকট যাওয়া-আসা করছিল। লোকটি নিজেকে ইবনে তাইমিয়া বলে পরিচয় দিচ্ছিল সবাইকে। সেখানকার আমিরের সন্দেহ হলো। কারণ তখন আমি বন্দী ছিলাম। তাই সে মিসরে প্রতিনিধি পাঠাল যাচাই করার জন্য। আমাকে মিসরে বন্দী দেখে তারা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ল। আসল কাহিনি হলো, তাতারিরা যখন দামেস্কে আগমন করত, তখন আমি তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করতাম। তাদের কেউ কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে সাধ্য অনুযায়ী খাবারদাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতাম। যখন আমি বন্দী হয়ে মিসরে চলে আসলাম, তখন একটি জিন আমার আকৃতি ধারণ করে আমার ভূমিকা পালন করতে শুরু করল। সে আমার ভক্ত ছিল। তার ধারণা অনুযায়ী সে এভাবে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছিল। তা ছাড়া আমার আকৃতিতে কাজ করলে মানুষ মনে করবে, স্বয়ং আমিই এসব করছি। ফলে কাজ অধিক ফলপ্রসূ হবে।
এ ঘটনা বর্ণনা করার পর কিছু লোক আমাকে বলল, "আপনি লোকটিকে জিন বলছেন কেন? ফেরেশতাও তো হতে পারে?" তখন আমি বললাম, "না। সে কোনোভাবেই ফেরেশতা হতে পারে না। কারণ, ফেরেশতারা মিথ্যা বলেন না। অথচ লোকটি জেনেশুনে নিজেকে ইবনে তাইমিয়া বলে পরিচয় দিয়েছিল।”
টিকাঃ
১৯. সুরা আল-বালাদ, ৯০:৪।
২০. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৩।
২১. আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব: পৃ. ৪৮।
২২. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৩/৯২-৯৩।
২৩. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/৯।
📄 স্বাধীন বন্দী
এই যে অন্তরের প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা—এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত ও গুপ্ত অনুদান। এটা এমন এক মূল্যবান সম্পদ, যা বস্তুবাদীরা অনুভবই করতে পারে না। তবে যখন তাদের কর্মের দরুন তাদের ওপর বিপদ আসে অথবা তাদের আবাসের আশপাশে বিপদ আপতিত হয়, তখন বস্তুবাদীরাও আত্মিক প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততার মর্ম ও মাহাত্ম্য বুঝতে পারে। কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে এই গুণটি বদ্ধমূল হয়ে থাকে, বিপদ ও দুর্দশা যতই কঠিন ও জটিল হোক। এমনকি তাদের অনেকে হাতে-পায়ে শিকলাবদ্ধ হয়েও আলি বিন জাহামের মতো উচ্চকণ্ঠে গায় :
'আমি বন্দী হয়েছি, তবে এই বন্দিত্বই আমার শেষ নয়, প্রতিটি ধারালো তরবারি কিছু সময় খাপবদ্ধ থাকে। পূর্ণিমার চাঁদ কিছুদিন ক্রমশ হ্রাস পায় ঠিকই; কিন্তু কিছুদিন পর নতুন আঙ্গিকে আবার ফিরে আসে। জেলবন্দীর মনে যদি অধৈর্যের কদর্যতা না থাকে, তাহলে জেলখানা তার জন্য গোলাপশোভিত একটি মহল। যে মহল মর্যাদাবানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যেখানে শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে, তাকে কারও কাছে যেতে হয় না।'
অন্তরসমূহের চাবি একমাত্র আল্লাহর হাতেই আছে। তিনিই মুমিনের অন্তরে এই অপার্থিব প্রশান্তি সঞ্চার করেন। ফলে বন্দিশালা হয়ে যায় তার কাছে বিনোদনপার্ক। বন্দিত্ব হয়ে ওঠে উপভোগ্য নির্জনতা। শিকল-বেড়ির ঝনঝনানি তার কানে বাঁশির সুরের মতো বাজে।
📄 ঈরার শাস্তি
সময়ের পরিক্রমায় মানুষ নানাবিধ সমস্যা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। এটাই দুনিয়ার নীতি। দুনিয়ার এই পঙ্কিলতা কখনো সাফ হবে না। তখন আমাদের অনেকেই খেয়া হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। কেউ প্রবল ঝড়ের সামনে সুউচ্চ পাহাড় ও সুদৃঢ় ঢেউয়ের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই শক্তি তারা মনের ভেতর থেকে পায়, যা একজন ব্যক্তি তার দীর্ঘ ইমানি সফর থেকে অর্জন করে এবং প্রভুর সাথে সম্পর্ক ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টির মাধ্যমে পোক্ত করে নেয়।
বিপদ একটি তুফান, যা মানুষের অন্তরে প্রবলবেগে প্রবাহিত হয়। যে হৃদয়ের রবের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকে, এই তুফানে সে হৃদয় ভেঙে পড়ে না। যে হৃদয় দুর্বল, তা মুসিবতের গলনাধারে গলে যায় এবং জানবাজি রাখার ময়দানে ব্যর্থতা স্বীকার করে পরাজয় মেনে নেয়।
এ জন্যই তো বলা হয়, ইবাদত ও আনুগত্য একটি গুপ্ত সম্পদ, বিপদের আগুনে প্রজ্বলিত হওয়া ব্যতীত তার দীপ্তি প্রকাশ পায় না। বান্দা ইবাদতের প্রকৃত মূল্য তখনই অনুধাবন করতে পারে, যখন তার খারাপ সময় আসে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট, উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন। তিনি ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ
'নাপাককে পাক থেকে পৃথক করে দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ এমন নন যে, ইমানদারগণকে সে অবস্থাতেই রাখবেন, যাতে তোমরা রয়েছ।'
জামাখশারি আল্লাহর এই নীতির ব্যাখ্যায় বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের মিশ্রিত অবস্থায় রেখে দেন না; বরং উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে দেন। তা এভাবে যে, তোমাদের ওপর তিনি এমন কঠোর বিধান আরোপ করেন, যার ওপর কেবল আল্লাহর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিষ্ঠাবান বান্দারাই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারেন। যেমন: জিহাদে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া, আল্লাহর পথে সম্পদ খরচ করা ইত্যাদি। এ পরীক্ষা তোমাদের মনের আকিদা-বিশ্বাসের মাপকাঠি এবং হৃদয়ের গোপন অবস্থার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়। ফলে তোমরা একজন অপরজনের মনের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারো। তবে তা দলিলের ভিত্তিতে; মনের অবস্থা জানার যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। কারণ এ যোগ্যতা একচেটিয়াভাবে কেবল আল্লাহরই আছে।'
নিরাপত্তা ও সুস্থতার সময় সব মানুষ একসমান। যখন বিপদ-বিপর্যয় ও অসুস্থতার আঘাত আসে, তখন বিভিন্ন বর্ণ, প্রকার ও শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি তাদের কৃত আমল অনুযায়ী হয়। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে হাসান বসরি এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন:
‘ভালো সময়ে সকল মানুষ সমান থাকে। যখন খারাপ সময় আসে, তখন তাদের মাঝে স্পষ্টরূপে পার্থক্য প্রতিভাত হয়।’
টিকাঃ
২৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৭৯।
২৫. আল-কাশশাফ: ১/৪৪৫।
📄 দৃঢ় বিশ্বাস বিপদের প্রতিষেধক
নিশ্চিন্ততা অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাসের ফসল, আমাদের মাঝে যার বীজ বপন করেছেন নবিজি। অতঃপর তিনিই তার পরিচর্যা করেছেন, তাকে শক্ত করেছেন। ফলে তা পুষ্ট হয়েছে এবং স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে। সাহাবিদের সাথে প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাতে রাসুল তাঁদের বিশ্বাসের পরিচর্যা করতেন। তার একটি চমৎকার নিদর্শন দেখো নিচের গল্পে:
রাসুল -এর প্রতিদিনকার মজলিশে সাহাবিদের একটি দল উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের একজন প্রতিদিন মজলিশে আসার সময় নিজের শিশুসন্তানকে পিঠে বহন করে নিয়ে আসতেন এবং তার সামনে বসাতেন। একদিন শিশুটি মারা গেল। ছেলের শোকে লোকটি মজলিশে আসাই ছেড়ে দিলেন। রাসুল তার অনুপস্থিতি টের পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, অমুককে দেখতে পাচ্ছি না কেন?’ তাঁরা জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তার ছেলেটি মারা গেছে।’
রাসুল লোকটির সাথে দেখা করে তার ছেলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানালে রাসুল তাকে সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর বললেন:
‘হে ভাই, তুমি কোনটা চাও? তুমি কি এটাই চাও যে, তার দ্বারা এ জীবনে উপকৃত হবে, না এটা চাও যে, আগামীকাল তুমি জান্নাতে গিয়ে তাকে জান্নাতের ভেতরে তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে?’
লোকটি বললেন, ‘হে আল্লাহর নবি, আমি চাই যে, সে আমার আগে জান্নাতে গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে।’
রাসুল ﷺ বললেন, ‘এটাই হবে’।
সুবহানাল্লাহ, কী চমৎকার পরিচর্যা! এভাবেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মকে। তাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন, এখানে যা হারিয়েছে ওখানে তা অনেকগুণে লাভ করবে। আজকে যত কষ্ট পাচ্ছে, তার বিনিময়ে আগামীকাল সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। দুনিয়ার একাকিত্ব ও নির্জনতার বিনিময়ে আখিরাতে মিলবে উত্তম সঙ্গীদের সাহচর্য।
প্রকৃত মুমিনের মনে বিপদের মুহূর্তে উক্ত মানসিকতাই কাজ করে। যার মধ্যে এ মানসিকতা অনুপস্থিত, বিপদের মুহূর্তে সে ভেঙে পড়ে। দুঃখের পরে সুখের আগমনকে সে অনেক দূরে মনে করে। এভাবে কঠিন মুহূর্তে অনেক সময় নিজের মহামূল্যবান ইমানটাই হারিয়ে ফেলে।
একজন ভালো মুসলিম এবং একজন পাপিষ্ঠ মুসলিম—বিপদ তাদের দুজনের মধ্যে কেমন ক্রিয়া করে এবং দুঃখ-দুর্দশাকে তাদের কে কেমন চোখে দেখে, তার তুলনামূলক বর্ণনা দিয়েছেন বিপদ-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির:
‘একজন প্রকৃত মুসলিম যখন বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন তার গুনাহসমূহ গাছের পাতার মতো ঝরে যায়। পক্ষান্তরে একজন কাফির অথবা পাপিষ্ঠ মুসলিম যখন বিপদে পড়ে, তার অবস্থা হয় বিচারবুদ্ধিহীন প্রাণীর মতো—যাকে বেঁধে রাখা হলে বুঝতে পারে না কেন বাঁধা হলো, ছেড়ে দেওয়া হলে বুঝতে পারে না কেন ছেড়ে দেওয়া হলো।’
তেমনিভাবে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি অনুভব করতে পারে না, কেন তার ওপর বিপদ এসেছে আর কেনই বা তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তার অন্তর্চক্ষু অন্ধ। বিপদ সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ যথার্থ নয়। দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদকে সে দুনিয়ার মানদণ্ডে পরিমাপ করে। এর সাথে আখিরাতের সংশ্লিষ্টতা সে দেখতে পায় না। অপরদিকে একজন প্রকৃত মুসলিম তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
টিকাঃ
২৬. সাইদুল খাতির: পৃ. ২৮৪।
২৭. সুনানুন নাসায়ি: ২০৮৮।
২৮. শুআবুল ইমান: ১২/৩১১।