📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ইলমের জাকাত হলো প্রচার করা

📄 ইলমের জাকাত হলো প্রচার করা


এই বই তোমার জ্ঞানের ভান্ডারে নতুন মূলধন সংযোজন করবে। তোমাকে তার জাকাত আদায় করে দিতে হবে। ইলমের জাকাত সম্পর্কে ইবনে হিব্বান আল-বাস্তি বলেন:
'কোনো ব্যক্তি যখন ইলম অর্জন করে, তার উচিত সে ইলম দ্বারা অন্যকে উপকৃত করা। এতে ইলমে বরকত হয়। আমি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে দেখিনি, যে ইলম নিয়ে কৃপণতা করে সে ইলম দ্বারা নিজে উপকৃত হয়েছে। পানি যতক্ষণ মাটির গর্ভে স্থির হয়ে থাকে, স্বর্ণ যতক্ষণ খনিতে পড়ে থাকে, দামি মুক্তা যতক্ষণ সাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকে, ততক্ষণ সেগুলো দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না। উপকার পেতে হলে সেগুলোকে বাইরে নিয়ে আসতে হয়। তদ্রূপ ইলম যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, তা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না। উপকৃত হতে হলে ইলম প্রচার করতে হয় এবং তা দ্বারা মানুষের উপকার করতে হয়।

তোমার ওপর আল্লাহর কী কী নিয়ামত অবতরণ করেছে?
হারিস মুহাসিবি বলেন:
'যে ব্যক্তি তার ওপর আল্লাহর কী কী নিয়ামত আছে তা জানে না, সে তার পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে কী কী যাচ্ছে, সে সম্পর্কে অজ্ঞ ও উদাসীন হয়ে পড়ে।

তুমি যদি জানতে না পারো, সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার ওপর আল্লাহর কী কী নিয়ামত অবতীর্ণ হচ্ছে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তিনি কী কী উপকার তোমার জন্য করছেন, তাহলে ধরে নেবে তোমার কলব অন্ধ হয়ে গেছে। এই অন্ধত্ব তোমাকে ভালো-খারাপের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ে বাধা সৃষ্টি করবে। জান্নাতি কাজ ও জাহান্নামি কাজে পার্থক্য নিরূপণ করতে বাধা দেবে। অন্তরের অন্ধত্বই সবচেয়ে খারাপ অন্ধত্ব। সুতরাং তোমার অন্তর যদি অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে প্রতিমুহূর্তে কী কী আমল তোমার থেকে আল্লাহর কাছে যাচ্ছে, যা চিহ্নিত করতে সে ব্যর্থ হবে।

এই বই আল্লাহর সুপ্ত নিয়ামতের ওপর আলোর কিরণ ফেলবে, যাতে তুমি তা দেখতে পেয়ে তার মিষ্টতা অনুভব করতে পারো। তখন তুমি সে নিয়ামতের বিনিময়ে ভালো ভালো আমল আল্লাহর কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে পারবে। তিনি যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তেমনই তুমি তাঁর কথা মান্য করে তাঁর প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে পারবে। যেভাবে তিনি তোমাকে অন্য অনেকের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন, তেমনই তুমি তাঁকে সকল কিছুর ওপর অগ্রাধিকার দিতে পারবে।

একটি শর্ত
আমি এ বইয়ে যেসব কথার অবতারণা করেছি, সেগুলো যদি তুমি মনোযোগ দিয়ে না পড়ো, তাহলে শুধু শুধু তোমার সময় নষ্ট হবে এবং আমার পরিশ্রম বৃথা যাবে।

আশার পাল্লা ভারী
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
يَا ابْنَ آدَمَ، قُمْ إِلَيَّ أَمْشِ إِلَيْكَ، وَامْشِ إِلَيَّ أُهَرُوِلُ إِلَيْكَ
'হে আদম-সন্তান, আমার জন্য দাঁড়াও, আমি তোমার দিকে হেঁটে হেঁটে আসব। আমার দিকে হেঁটে হেঁটে এসো, আমি তোমার দিকে দৌড়ে যাব।

বইটি উপকারী নাকি ক্ষতিকর?
রাবি বলেন, 'আমি শাফিয়ি -কে একাধিকবার বলতে শুনেছি :
“যা মুখস্থ করা হয়েছে, তা ইলম নয়; ইলম হলো যা দ্বারা উপকার লাভ হয়েছে।”'

এ বই তখনই উপকারী হবে, যখন তুমি এখানে যা বলা হয়েছে, সে অনুযায়ী আমল করবে। তখন এই বই দ্বারা তুমি যেমন উপকৃত হবে, তোমার আশপাশের লোকেরাও উপকৃত হবে। তুমি উপকৃত হবে এ বই অনুযায়ী আমল করে এবং অন্যরা উপকৃত হবে তোমার ইলম ও আমলের প্রতি তাদের দাওয়াত দেওয়ার মাধ্যমে।

সারকথা হলো, আমি এ বইয়ে যেসব কথার অবতারণা করেছি, সেগুলো যদি তুমি মনোযোগ দিয়ে না পড়ো, তাহলে শুধু শুধু তোমার সময় নষ্ট হবে এবং আমার পরিশ্রম বৃtha যাবে।

সুধারণার সুফল
জুননুন মিসরি বলেন :
'বান্দা আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে, অথচ আল্লাহ তার প্রতি করুণা করেন না—এমনটা হওয়া অসম্ভব।'

কথা বেশি কাজ কম
একদা আবু জাফর মানসুর সুফইয়ান সাওরি -কে তলব করলেন। সুফইয়ান সাওরি মহলে প্রবেশ করলে আবু জাফর তাঁকে বললেন, 'আমাকে উপদেশ দিন, হে আবু আব্দুল্লাহ্।' তিনি বললেন, 'আপনি যা জানেন, সে অনুযায়ীই তো আমল করেন না। নতুন উপদেশ দিয়ে কী লাভ হবে?' এ কথা শুনে মানসুর লা-জবাব হয়ে গেলেন।'

রবের প্রতি সুধারণা রাখো
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন:
'সেই সত্তার শপথ—যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, বান্দা যদি আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে, আল্লাহ তার ধারণা অনুযায়ী তাকে দান করেন। কেননা, সকল কল্যাণের ভান্ডার তো তাঁরই হাতে।

বক্ষ্যমাণ বইটি তোমাকে যথাযথ পন্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা লালন করতে শেখাবে। যথাযথ পন্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা মানে, উত্তম আমল ও চেষ্টা-মেহনতের সাথে আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা। আমল খারাপ, কিন্তু ক্ষমার আশা আছে—এমন সুধারণা নয়।

ভালোবাসার আসর
বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মুহাম্মাদ বিন সুবাইব (যিনি ইবনুস সাম্মাক নামে পরিচিত) -এর মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসলো, তখন তিনি বললেন :
'হে আল্লাহ, আপনি নিশ্চয় জানেন, আমি জীবনে যত আসর ও মজলিশ কায়িম করেছি সবকটির উদ্দেশ্য ছিল মাখলুকের প্রতি আপনার ভালোবাসা কামনা করা এবং মাখলুকের মনে আপনার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা।

এ বইটিকে তুমি ইবনুস সাম্মাকের পদ্ধতিতে পাঠ করো। মাখলুকের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার আশায় এবং মাখলুকের মনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির লক্ষ্যে বইটি প্রচার-প্রসার করো। এর ফলে তোমার ও তোমার সঙ্গীদের পরিণাম উত্তম হবে।

তোমার প্রতি বেশি অনুগ্রহশীল কে? তোমার রব, নাকি পিতামাতা?
সুফইয়ান সাওরি বলেন:
'আমি এটা একদমই চাই না যে, আমার হিসাব-নিকাশের দায়িত্ব আমার পিতামাতার ওপর অর্পণ করা হোক। কেননা, আমার পিতামাতার চেয়ে আমার রব আমার প্রতি বেশি করুণাময়।'

দুই প্রত্যাশার ব্যবধান
সৃষ্টির প্রতি আশা-ভরসা—সে যতই বড় আর শক্তিশালী হোক—তা মরীচিকা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, কোনো মানুষ অনেক সময় তোমার উপকারের কথা ভাবে; কিন্তু তা তার অজান্তে তোমার ক্ষতি করে বসে। কেউ তোমাকে সুখী করতে গিয়ে অসুখী করে দেয়। কেউ তোমার ভালো করতে গিয়ে খারাপ করে বসে। অনেক সময় তোমার কল্যাণ করার চেষ্টা করে; কিন্তু সফল হয় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর প্রতি আশা-ভরসা মানে মহা শক্তিশালীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন, যাঁকে কোনো কিছুই অপারগ করতে পারে না; অত্যন্ত উদার সত্তার কাছে আশা করা, যাঁর কাছে চেয়ে কেউ বঞ্চিত হয় না এবং দুআ করে খালি হাতে ফিরে না; এমন এক মহাজ্ঞানীর ওপর ভরসা করা, যিনিই একমাত্র জানেন, কীসে তোমার উপকার আর কীসে তোমার ক্ষতি।

একটি গুনাহ চাপা পড়ে যায় দুটি অনুগ্রহের মাঝে!
আলি বলেন:
'যে ব্যক্তির গুনাহ আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে গোপন রেখেছেন, আখিরাতে সে গুনাহ ফাঁস করে দেওয়া আল্লাহর মহান উদারতার পরিপন্থী। আর যে ব্যক্তির গুনাহের কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতে শাস্তি দিয়েছেন, তাকে আখিরাতে দ্বিতীয়বার শাস্তি দেওয়া তাঁর ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।'

হে পাপের আবরণে আচ্ছাদিত ভাই...
যার কল্যাণে তুমি রাত ও দিন অতিবাহিত করো, তাঁর গোপন অনুগ্রহ এবং সুন্দর কর্মগুলো নিয়ে চিন্তা করে দেখো! তুমি তাঁর প্রেমে পাগল না হয়ে থাকতে পারবে না। কী সুন্দর তাঁর ব্যবস্থা দেখো! তুমি পাপ করেছ; কিন্তু সে পাপ তিনি গোপন রেখেছেন! তার নামগন্ধও প্রকাশ হতে দেননি! ফলে মানুষ তোমার এমন প্রশংসা করেছে, যার যোগ্য তুমি নও। তারা জানতেই পারেনি, তোমার ভেতরে কদর্যতায় ভরা। এমন উদারতা ও অনুগ্রহ কোনো মানুষের কাছে কি আশা করতে পারো, যারা তোমার দোষ গোপন রাখে না, তোমার অপরাধ ক্ষমা করে না এবং তাদের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক কোনো অবস্থার ওপর তুমি নিরাপদ বোধ করতে পারো না?

সত্য আশা ও মিথ্যা আশা
মুআজ বিন জাবাল বলেন: 'অচিরেই কুরআন মানুষের মনে পুরাতন হয়ে যাবে, যেভাবে কাপড় পুরাতন হয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে যায়। তারা কুরআন পড়বে; কিন্তু তাতে কোনো স্বাদ পাবে না। বাঘের অন্তরের ওপর ভেড়ার চামড়া পরাবে তারা। তাদের কাজ হবে শুধুই আশা করা। আশার সাথে ভয় মিশ্রিত থাকবে না তাদের মাঝে। আমলে অসম্পূর্ণতা রেখে তারা বলবে, "সামনে পুষিয়ে নেব।” আর বদ আমল করে বলবে, "আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে; কারণ, আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করি না।”

প্রভুর উদারতা
হাসান বিন আলি কাবার একটি খুঁটি আঁকড়ে ধরে বলেন: 'প্রভু হে, আপনি আমাকে নিয়ামত দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন; কিন্তু আমি কৃতজ্ঞতা আদায় করিনি। আপনি আমাকে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেছেন; কিন্তু আমি ধৈর্যধারণ করতে পারিনি। তা সত্ত্বেও আপনি আমার নিয়ামত ছিনিয়ে নেননি। এবং বিপদ স্থায়ী করেননি। কারণ, উদার সত্তা থেকে তো উদারতাই প্রকাশ পায় এবং নির্দয় সত্তা থেকে নির্দয়তাই প্রকাশ পায়।'

আল্লাহই সকল কল্যাণের আধার
এক বেদুইন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে বলা হলো, 'তুমি তো মারা যাবে।' তিনি বললেন, 'মৃত্যুর পর আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে?' তারা বলল, 'আল্লাহর কাছে।' তিনি বললেন, 'তাহলে অসুবিধা কী? আমি তো তাঁর কাছেই যাচ্ছি, যাঁর কাছেই আছে সকল কল্যাণ ও অনুগ্রহ। '

টিকাঃ
৬. রওজাতুল উকালা: পৃ. ৪১-৪২।
৭. আদাবুন নুফুস: পৃ. ১৭৬।
৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৯২৫।
৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/১২৩।
১০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৯/৩৮৪।
১১. আল-ইকদুল ফারিদ: ১/৫৫।
১২. হুসনুজ জন: পৃ. ৯৬।
১৩. তারিখু বাগদাদ: ২/৪৪৯।
১৪. হুসনুজ জন: ১/৪৫।
১৫. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৪/১৫২।
১৬. আত-তাজকিরাহ বি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখিরাহ: ১/১২৩০।
১৭. সিরাজুল মুলুক: ১/১০৯।
১৮. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ৪/৪৬৬।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 বিপদের সময় দৃঢ়পদ থাকা

📄 বিপদের সময় দৃঢ়পদ থাকা


আল্লাহ বলেন, (لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ) 'আমি মানুষকে কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।' আমাদের প্রত্যেকে এ দুনিয়ায় বিপদগ্রস্ত। পঙ্কিলতার আলয়ে পরিচ্ছন্নতা কামনা করে যে, সে এ আলয় চিনে না এবং এখানে থাকার যোগ্য নয়। তবে হে মুমিন, তোমার ইমান তোমাকে রক্ষা করেছে এবং পূর্বের কৃতিত্ব তোমাকে মুক্তি দিয়েছে। ফলে পেরেশানি ও দুর্যোগের ঝড় তোমার পরোপকারের শিলাখণ্ডের ওপর আছড়ে পড়ে গতি হারিয়েছে। ফলে অন্যরা যখন হতাশায় কাঁদে, তুমি তখন সফলতার হাসি হাসো। তোমার হৃদয়মন তখন শান্ত ও স্থির থাকে।

এটা সেই স্থিরতা ও নিশ্চিন্ততা, যেটাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দার ভীতি ও অস্থিরতার সময় তার অন্তরে ঢেলে দেন। এটা প্রথমে হৃদয়ে অনুভূত হয়। পরবর্তী সময়ে তা শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কঠিন বিপদের মুহূর্তেও তার তনুমন এক আশ্চর্যজনক নিশ্চিন্ততা ও প্রশান্তিতে অবগাহন করে। এই প্রশান্তি তখনই অর্জিত হয়, যখন বান্দা বিপদ-বিপর্যয়কে তার গুনাহের কাফফারা মনে করে। মর্যাদা বৃদ্ধিকারী এবং পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা দানকারী মনে করে। এই প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা অর্জন করেছিলেন বলেই ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বন্দীর শিকলে আবদ্ধ থাকাবস্থাতেও এমন উক্তি করতে পেরেছিলেন, যা দুশমনদের হিংসার অনলে ঘি ঢেলে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন:
'শত্রুরা আমার কীই বা ক্ষতি করবে?! আমার জান্নাত আমার হৃদয়ে। আমার সাথে আছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবির সুন্নাহ। যদি তারা আমাকে হত্যা করে, সেটা হবে আমার জন্য শাহাদাত। যদি বন্দী করে রাখে, তা হবে আমার জন্য রবের সাথে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ। প্রকৃত রুদ্ধ তো সেই, যে নিজের রব থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রকৃত বন্দী সেই, যে নিজের প্রবৃত্তির কাছে বন্দী হয়ে আছে।'

বন্দিশালার মধ্যে তিনি বলতেন:
'যদি আমি এই দুর্গ পরিমাণ স্বর্ণ দান করি, তবুও বন্দিত্বের এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে না। আমার শত্রুরা আমাকে বন্দী করার মাধ্যমে আমার জন্য যে কল্যাণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, তার প্রতিদান দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।'

গ্রেফতার করার পর যখন তাঁকে প্রাচীরঘেরা বন্দিশালায় আবদ্ধ করা হলো, তখন তিনি প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে তিলাওয়াত করলেন:
فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابُ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ
'অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আজাব।'

তাঁর এই চমৎকার ইমানি শক্তির বর্ণনা দিয়েছেন তাঁরই সুযোগ্য শাগরিদ ইবনুল কাইয়িম। তিনি এটাকে জান্নাতের পূর্বে জান্নাত এবং সর্বমহান নিয়ামতের পূর্বে মহান নিয়ামত বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন:
'আল্লাহর ইলমের কসম, আমি তাঁর চেয়ে উত্তম জীবনযাপন করতে কাউকে দেখিনি। অথচ তাঁর জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও সংকীর্ণতায় ভরা। সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতার উপকরণ তাঁর ছিল না। দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অনটনের উপকরণে ভরা ছিল তাঁর জীবন। এসব ছাড়াও বন্দিত্ব এবং বিভিন্ন দিক থেকে হুমকি-ধমকি ও কষ্ট পাওয়া ছিল তাঁর জীবনের নিয়মিত রুটিন। এতসব সত্ত্বেও তাঁর জীবন ছিল সর্বাধিক সুন্দর, তাঁর মন ছিল সবচেয়ে নিশ্চিন্ত, প্রশান্ত ও আনন্দিত। তাঁর মনোবলও ছিল অন্য সবার চেয়ে শক্তিশালী। প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততার দ্যুতি ঠিকরে বের হতো তাঁর চেহারা থেকে। যখন চারিদিক থেকে দুশ্চিন্তা ও ভীতি আমাদের গ্রাস করে নিত এবং আমরা মানুষের ভুল ধারণার শিকার হওয়ার কারণে পৃথিবী আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে আসত, তখন আমরা তাঁর কাছে যেতাম। তাঁকে দেখে এবং তাঁর কথা শুনে আমাদের সকল পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা এক নিমিষেই গায়েব হয়ে যেত। মনে অনুভব করতাম এক অপার্থিব প্রশান্তি ও সুদৃঢ় মনোবল।

পবিত্র সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাদের মৃত্যুর পূর্বেই জান্নাতের সুখ আস্বাদন করান এবং আমলের ঘর দুনিয়াতেই তাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেন। ফলে যতক্ষণ তারা আমলে মগ্ন থাকেন, জান্নাতের মৃদুমন্দ বাতাস ও সুবাসে তারা সুবাসিত হতে থাকেন।'

তিনি তাঁর জীবনে এমন কঠিন কঠিন বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন, কোনো লোহা যদি তার মুখোমুখি হতো, তাহলে মোমের মতো গলে যেত; টগবগে যুবক এমন বিপদের মুখোমুখি হলে বুড়ো হয়ে যেত।

বলা হয়ে থাকে, তিনি আজীবন এক বিপদ থেকে অন্য বিপদে, এক বিপর্যয় থেকে আরেক বিপর্যয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তবে তাঁর নেক আমলের বরকত তাঁকে কঠিন বিপদের সময়ে অবিচল থাকার পাথেয় জুগিয়েছে। যেন দুঃখের পরে সুখ আসে—নামক পুস্তিকাটি তিনি ইন্দ্রিয় ও বিবেক-বুদ্ধি সব নিয়ে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। এভাবে সত্যিই একসময় তাঁর দুঃখ লাঘব হয়েছিল, দূরীভূত হয়েছিল বিপদের কালো মেঘ।

এ জন্যই বলা হয়, বিপদের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া বান্দার ইমানের পরীক্ষা হয় না এবং অন্তরের গোপন অবস্থা প্রকাশিত হয় না। ইবনে তাইমিয়া বলেন: 'মনের ভেতরের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয় বিপদের মুহূর্তে।'

সম্ভবত তাঁর নানামুখী পুণ্যকর্মের কারণে তাঁকে কেন্দ্র করে একটি অলৌকিক কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। তা হচ্ছে: তিনি যখন মিসরের কারাগারে বন্দী ছিলেন, তখন একটি মুসলিম জিন তাঁর আকৃতি ধারণ করে দামেস্কে তাঁর ভূমিকা পালন করেছিলেন। চলুন, অদ্ভুত সেই ঘটনাটি সরাসরি ইমামের জবানিতেই শুনি:

'যখন আমি মিসরের কারাগারে বন্দী ছিলাম, তখন হুবহু আমার মতো এক ব্যক্তি উত্তর অঞ্চলে তাতারিদের নিকট যাওয়া-আসা করছিল। লোকটি নিজেকে ইবনে তাইমিয়া বলে পরিচয় দিচ্ছিল সবাইকে। সেখানকার আমিরের সন্দেহ হলো। কারণ তখন আমি বন্দী ছিলাম। তাই সে মিসরে প্রতিনিধি পাঠাল যাচাই করার জন্য। আমাকে মিসরে বন্দী দেখে তারা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ল। আসল কাহিনি হলো, তাতারিরা যখন দামেস্কে আগমন করত, তখন আমি তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করতাম। তাদের কেউ কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে সাধ্য অনুযায়ী খাবারদাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতাম। যখন আমি বন্দী হয়ে মিসরে চলে আসলাম, তখন একটি জিন আমার আকৃতি ধারণ করে আমার ভূমিকা পালন করতে শুরু করল। সে আমার ভক্ত ছিল। তার ধারণা অনুযায়ী সে এভাবে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছিল। তা ছাড়া আমার আকৃতিতে কাজ করলে মানুষ মনে করবে, স্বয়ং আমিই এসব করছি। ফলে কাজ অধিক ফলপ্রসূ হবে।

এ ঘটনা বর্ণনা করার পর কিছু লোক আমাকে বলল, "আপনি লোকটিকে জিন বলছেন কেন? ফেরেশতাও তো হতে পারে?" তখন আমি বললাম, "না। সে কোনোভাবেই ফেরেশতা হতে পারে না। কারণ, ফেরেশতারা মিথ্যা বলেন না। অথচ লোকটি জেনেশুনে নিজেকে ইবনে তাইমিয়া বলে পরিচয় দিয়েছিল।”

টিকাঃ
১৯. সুরা আল-বালাদ, ৯০:৪।
২০. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১৩।
২১. আল-ওয়াবিলুস সাইয়িব: পৃ. ৪৮।
২২. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৩/৯২-৯৩।
২৩. মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/৯।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 স্বাধীন বন্দী

📄 স্বাধীন বন্দী


এই যে অন্তরের প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা—এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত ও গুপ্ত অনুদান। এটা এমন এক মূল্যবান সম্পদ, যা বস্তুবাদীরা অনুভবই করতে পারে না। তবে যখন তাদের কর্মের দরুন তাদের ওপর বিপদ আসে অথবা তাদের আবাসের আশপাশে বিপদ আপতিত হয়, তখন বস্তুবাদীরাও আত্মিক প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততার মর্ম ও মাহাত্ম্য বুঝতে পারে। কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে এই গুণটি বদ্ধমূল হয়ে থাকে, বিপদ ও দুর্দশা যতই কঠিন ও জটিল হোক। এমনকি তাদের অনেকে হাতে-পায়ে শিকলাবদ্ধ হয়েও আলি বিন জাহামের মতো উচ্চকণ্ঠে গায় :
'আমি বন্দী হয়েছি, তবে এই বন্দিত্বই আমার শেষ নয়, প্রতিটি ধারালো তরবারি কিছু সময় খাপবদ্ধ থাকে। পূর্ণিমার চাঁদ কিছুদিন ক্রমশ হ্রাস পায় ঠিকই; কিন্তু কিছুদিন পর নতুন আঙ্গিকে আবার ফিরে আসে। জেলবন্দীর মনে যদি অধৈর্যের কদর্যতা না থাকে, তাহলে জেলখানা তার জন্য গোলাপশোভিত একটি মহল। যে মহল মর্যাদাবানের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যেখানে শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে, তাকে কারও কাছে যেতে হয় না।'

অন্তরসমূহের চাবি একমাত্র আল্লাহর হাতেই আছে। তিনিই মুমিনের অন্তরে এই অপার্থিব প্রশান্তি সঞ্চার করেন। ফলে বন্দিশালা হয়ে যায় তার কাছে বিনোদনপার্ক। বন্দিত্ব হয়ে ওঠে উপভোগ্য নির্জনতা। শিকল-বেড়ির ঝনঝনানি তার কানে বাঁশির সুরের মতো বাজে।

📘 পার্থিব জীবনে জান্নাতি সুখ > 📄 ঈরার শাস্তি

📄 ঈরার শাস্তি


সময়ের পরিক্রমায় মানুষ নানাবিধ সমস্যা ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। এটাই দুনিয়ার নীতি। দুনিয়ার এই পঙ্কিলতা কখনো সাফ হবে না। তখন আমাদের অনেকেই খেয়া হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। কেউ প্রবল ঝড়ের সামনে সুউচ্চ পাহাড় ও সুদৃঢ় ঢেউয়ের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই শক্তি তারা মনের ভেতর থেকে পায়, যা একজন ব্যক্তি তার দীর্ঘ ইমানি সফর থেকে অর্জন করে এবং প্রভুর সাথে সম্পর্ক ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্টির মাধ্যমে পোক্ত করে নেয়।

বিপদ একটি তুফান, যা মানুষের অন্তরে প্রবলবেগে প্রবাহিত হয়। যে হৃদয়ের রবের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকে, এই তুফানে সে হৃদয় ভেঙে পড়ে না। যে হৃদয় দুর্বল, তা মুসিবতের গলনাধারে গলে যায় এবং জানবাজি রাখার ময়দানে ব্যর্থতা স্বীকার করে পরাজয় মেনে নেয়।

এ জন্যই তো বলা হয়, ইবাদত ও আনুগত্য একটি গুপ্ত সম্পদ, বিপদের আগুনে প্রজ্বলিত হওয়া ব্যতীত তার দীপ্তি প্রকাশ পায় না। বান্দা ইবাদতের প্রকৃত মূল্য তখনই অনুধাবন করতে পারে, যখন তার খারাপ সময় আসে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট, উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন। তিনি ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ اللهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ
'নাপাককে পাক থেকে পৃথক করে দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ এমন নন যে, ইমানদারগণকে সে অবস্থাতেই রাখবেন, যাতে তোমরা রয়েছ।'

জামাখশারি আল্লাহর এই নীতির ব্যাখ্যায় বলেন:
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের মিশ্রিত অবস্থায় রেখে দেন না; বরং উত্তম ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে দেন। তা এভাবে যে, তোমাদের ওপর তিনি এমন কঠোর বিধান আরোপ করেন, যার ওপর কেবল আল্লাহর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিষ্ঠাবান বান্দারাই ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারেন। যেমন: জিহাদে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া, আল্লাহর পথে সম্পদ খরচ করা ইত্যাদি। এ পরীক্ষা তোমাদের মনের আকিদা-বিশ্বাসের মাপকাঠি এবং হৃদয়ের গোপন অবস্থার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়। ফলে তোমরা একজন অপরজনের মনের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারো। তবে তা দলিলের ভিত্তিতে; মনের অবস্থা জানার যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। কারণ এ যোগ্যতা একচেটিয়াভাবে কেবল আল্লাহরই আছে।'

নিরাপত্তা ও সুস্থতার সময় সব মানুষ একসমান। যখন বিপদ-বিপর্যয় ও অসুস্থতার আঘাত আসে, তখন বিভিন্ন বর্ণ, প্রকার ও শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি তাদের কৃত আমল অনুযায়ী হয়। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে হাসান বসরি এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন:
‘ভালো সময়ে সকল মানুষ সমান থাকে। যখন খারাপ সময় আসে, তখন তাদের মাঝে স্পষ্টরূপে পার্থক্য প্রতিভাত হয়।’

টিকাঃ
২৪. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৭৯।
২৫. আল-কাশশাফ: ১/৪৪৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00