📄 আইন দিয়ে জীবন-সংসার চলে না
মুহতারাম হাজেরীন! এবার আসা যাক, বউমার প্রতি বিশেষ কিছু পরামর্শ সম্পর্কে। একটু আগে বলেছিলাম, পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। এটা তো আইনের কথা। বাস্তবতা হল আইনের রুক্ষ বাঁধনের ওপর ভিত্তি করে হয়ত 'তালাক' ঠেকানো যাবে- যদিও অনেক সময় তাও সম্ভব হয় না; কিন্তু সুখ-শান্তি কখনই আসবে না।
কেননা এটা যেমন আইন তেমনিভাবে এটাও আইন যে, স্ত্রীকে তার মা- বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যবস্থা করে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়। বরং ফকিহগণ এ পর্যন্তও বলেছেন, স্ত্রীর মা-বাবা সপ্তাহে মাত্র একবার আসবে, তাও মেয়েকে দূর থেকে দেখে চলে যাবে। তাদেরকে ঘরে বসিয়ে সাক্ষাৎ করতে দেয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়।
সুতরাং আইনের এসব চৌহদ্দিতে পড়ে থাকা মানে অশান্তি ডেকে আনা। বরং বউমাকেও ভাবতে হবে যে, তাকেও একদিন শাশুড়ি হতে হবে। হতে হবে বৃদ্ধা। আর বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রবধূর কাছ থেকে কীরূপ আচরণ প্রত্যাশা করে- এ প্রশ্ন নিজেকে করলে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে কেমন আচরণ করবে তার জবাব সে পেয়ে যাবে।
📄 স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার দ্বারা পারিবারিক কল্যাণ পূর্ণ হয়
মুহতারাম হাজেরীন! ইতিপূর্বে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির একটি জরিপের কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম যে, পরিবারগুলোতে ঝগড়া-বিবাদের বিষয়টি সবচাইতে বেশি দেখা যায় বউ-শাশুড়ির মধ্যে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বামী-স্ত্রী। অথচ শান্তিময় জীবন যাপনে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কের বিকল্প নেই।
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহ. লিখেছেন
تواد الزوجين به تتم المصلحة المنزلية
স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার দ্বারা পারিবারিক কল্যাণ পূর্ণ হয়। তাই স্বামী-স্ত্রী যেন ঝগড়া এড়িয়ে চলতে পারে এ পর্যায়ে এ লক্ষে উভয়ের প্রতি আরও কিছু পরামর্শ সংক্ষেপে পেশ করছি।
📄 ত্রিশ বছরের বৈবাহিক জীবনে একবারও ঝগড়া-বিবাদ হয়নি
পরিশেষে চমৎকার ও শিক্ষণীয় একটা ঘটনা শুনিয়ে দিচ্ছি। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. যখন বিয়ে করতে মনস্থির করেন তখন তার চাচীকে বলেন, 'ওই শায়খের বাড়িতে দুজন বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে, আপনি তাদের দেখে আসুন এবং তাদের সম্পর্কে আমাকে জানান।' চাচী মেয়ে দুটিকে দেখে আসার পর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের কাছে তাদের বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। তিনি বাড়ির ছোট মেয়ের ব্যাপারে অনেক প্রশংসা করলেন। ফর্সা চেহারা, তার চোখ ও চুলের সৌন্দর্য, দীর্ঘতা বর্ণনায় পঞ্চমুখ হলেন।
ইমাম আহমদ তখন তাকে বড় মেয়েটির ব্যাপারে বলতে বললেন। বড় মেয়েটির ব্যাপারে তিনি অনেকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথা বললেন। অবিন্যস্ত চুল, খর্বকায় উচ্চতা, শ্যাম বর্ণ এবং একটি চোখে ত্রুটি থাকার কথা উল্লেখ করলেন।
এরপর ইমাম আহমদ তাকে দুজনের দীনদারির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে চাচী বললেন, 'বড় মেয়েটি দীনদারির দিক থেকে ছোট মেয়ের তুলনার বেশ এগিয়ে।'
এ কথা শুনে ইমাম আহমদ বললেন, তাহলে আমি বড় মেয়েটিকেই বিয়ে করব।
বিয়ের ত্রিশ বছর কেটে যাওয়ার পর ইমাম আহমদের স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলেন। দাফনের সময় ইমাম আহমদ বললেন, 'ইয়া উম্মা আবদিল্লাহ! মহান আল্লাহ তোমার কবর শান্তিময় রাখুন। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের বৈবাহিক জীবনে আমাদের মধ্যে একবারও ঝগড়া-বিবাদ হয়নি।'
একথা শুনে তাঁর এক ছাত্র অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া শায়খ! এটা কীভাবে সম্ভব?'
জবাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বললেন, 'যখনই আমি তার প্রতি রেগে যেতাম তখন তিনি চুপ থাকতেন, আর যখন তিনি আমার প্রতি রেগে যেতেন তখন আমি চুপ থাকতাম। তাই আমাদের মধ্যে কখনোই ঝগড়া-বিবাদ হয়নি।
আলোচনা দীর্ঘ হয়ে গেল। যা কিছু ভুল বলেছি আল্লাহ আমাদের স্মৃতি থেকে তা তুলে নিন। যা কিছু সঠিক বলেছি, আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ