📄 উপদেশ : বাড়ি-ঘরে কারুকার্য করা থেকে বিরত থাকুন
বর্তমানে অনেক মানুষই তাদের বাড়িঘরে বিভিন্ন ডিজাইনের কারুকার্য করে থাকে। তা দৃষ্টিনন্দন করে হরেক কালারের বাতি দিয়ে। এটা দুনিয়ার সাথে গভীর সম্পর্ক, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকা ও পার্থিব জীবন নিয়ে গর্ব-অহংকার করার ফলাফল ছাড়া আর কিছুই নয়।
কোনো কোনো ঘরে প্রবেশ করলে আপনার মনে পড়ে যাবে ইবনে আব্বাস এর এই বাণীটি, 'শুধু নাম ব্যতীত জান্নাতের কিছু দুনিয়াতে নেই।' বর্তমানে যে সকল উপকরণে বাড়ি-ঘর কারুকার্য ও সাজসজ্জা করা হয়, তা এই সংক্ষিপ্ত বইয়ে বর্ণনা করাও সম্ভব নয়। তবে আমরা এখানে আল্লাহ তাআলার এই বাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَوْلَا أَن يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةٌ وَاحِدَةً لَّجَعَلْنَا لِمَن يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِّن فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْhَرُونَ. وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُونَ. وَزُخْرُفًا وَإِن كُلُّ ذَلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِندَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ
'যদি সব মানুষের এক মতাবলম্বী (কাফির) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তবে যারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে, আমি তাদের ঘরের ছাদও করে দিতাম রুপার এবং তারা যে সিঁড়ি দিয়ে চড়ে তাও। আর তাদের ঘরের দরজাগুলো এবং সেই পালংগুলোও, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসে। বরং স্বর্ণনির্মিতও দিতাম। এগুলো সবই তো পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী মাত্র। আর পরকাল আপনার পালনকর্তার কাছে তাঁদের জন্যই, যারা ভয় করে। '৩৯
'অর্থাৎ, যদি বেশির ভাগ জাহিলদের পক্ষ থেকে এই ধারণা বা বিশ্বাসের ভয় না থাকত যে, আমি যাদের সম্পদ দিই, তাদের এই কারণেই দিই যে, আমি তাদের ভালোবাসি। তবে এটা ভেবে সকলে সম্পদের জন্য কাফির হয়ে যেত।৪০ তাহলে আমি কাফিরদের বাড়ি, ছাদ, সিঁড়ি, এমনকি তাদের দরজার তালা পর্যন্ত দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের সামগ্রী সোনা-রুপা দিয়ে বানিয়ে দিতাম। যাতে তাদের সকল ভালো কাজের বিনিময়ে দুনিয়াতেই তারা পরিপূর্ণ অংশ নিয়ে নেয়। তাদের কাছে তো কোনো পুণ্য ও পুরস্কার থাকবে না। কেননা, তারা তো দুনিয়াতেই সব পেয়ে গেছে।
সহিহ মুসলিমে এসেছে। আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - خَرَجَ فِي غَزَاةٍ، فَأَخَذَتُ نَمَطًا فَسَتَرَتُهُ عَلَى الْبَابِ، فَلَمَّا قَدِمَ، فَرَأَى النَّمَطَ عَرَفْتُ الْكَرَاهِيَةَ فِي وَجْهِهِ، فَجَذَبَهُ حَتَّى هَتَكَهُ أَوْ قَطَعَهُ، وَقَالَ : إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَأْمُرْنَا أَنْ نَكْسُوَ الْحِجَارَةَ وَالطَّينَ
'রাসুলুল্লাহ ﷺ এক যুদ্ধে বের হলেন, তখন আমি একটি ঝালরবিশিষ্ট পর্দা নিয়ে দরজার ওপর টানিয়ে দিলাম। তিনি যখন ফিরে এলেন এবং পর্দাটি দেখতে পেলেন, তখন আমি তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ দেখলাম। অতঃপর তিনি পর্দাটি ধরে টেনে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। এবং বললেন “আল্লাহ তাআলা আমাদের এই আদেশ দেননি যে, আমরা পাথর ও মাটি পরিধান করব।”’৪১
মুসনাদে আহমাদে ফাতিমা এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার খাবার রান্না করে ফাতিমা আলি কে বললেন রাসুলুল্লাহ ﷺ কে দাওয়াত দিতে। রাসুলুল্লাহ ﷺ এসে দরজার পাল্লার ওপর তাঁর হাত রাখলেন। কিন্তু কারুকার্যমণ্ডিত একটি কাপড় দেখতে পেয়ে ফিরে গেলেন।
তখন ফাতিমা আলি কে বললেন, 'যান, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন ফিরে গেলেন?' আলি এর জিজ্ঞাসার জবাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আমার জন্য৪২ কারুকার্যমণ্ডিত সুসজ্জিত ঘরে প্রবেশ করা উচিত নয়। '৪৩
সুনানে আবু দাউদে এ হাদিসটি এসেছে 'দাওয়াতকৃত মেহমান যখন মেজবানের ঘরে শরিয়তের অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পায়' নামক অধ্যায়ে। ৪৪
সহিহ বুখারির 'দাওয়াতের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখলে কি ফিরে আসবে?' নামক অধ্যায়ের তা'লিকে বর্ণিত হয়েছে :
وَدَعَا ابْنُ عُمَرَ أَبَا أَيُّوبَ فَرَأَى فِي الْبَيْتِ سِتْرًا عَلَى الْجِدَارِ فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ غَلَبَنَا عَلَيْهِ النِّسَاءُ فَقَالَ مَنْ كُنْتُ أَخْشَى عَلَيْهِ فَلَمْ أَكُنْ أَخْشَى عَلَيْكَ وَاللَّهِ لَا أَطْعَمُ لَكُمْ طَعَامًا فَرَجَعَ
'ইবনে উমর আবু আইয়ুব কে দাওয়াত দিলেন। তিনি এসে (ইবনে উমর এর ঘরের) দেয়ালের ওপর কারুকার্য করা পর্দা দেখতে পেলেন। তখন ইবনে উমর বলেন, “এ ব্যাপারে মহিলারা আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে।” এ শুনে আবু আইয়ুব বললেন, “কিছু মানুষের ব্যাপারে আমি আশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু আপনার ব্যাপারে এমন কোনো আশঙ্কা করিনি। আল্লাহর শপথ, আমি আপনাদের ঘরের খাবার খাব না।”’৪৫
মুসনাদে আহমাদে সালিম বিন আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আমার পিতা বেঁচে থাকা অবস্থায় বিবাহ করেছি। তখন আমার বাবা লোকদের দাওয়াত দিলেন। দাওয়াতি মেহমানদের মধ্যে আবু আইয়ুব ও একজন ছিলেন। বাড়ির লোকেরা আমার ঘরে সবুজ নকশি একটি পর্দা ঝুলিয়েছিল। আবু আইয়ুব এসে ঘরে দৃষ্টি দিয়ে এটি দেখতে পেলেন এবং বললেন, "আব্দুল্লাহ, তোমরাও দেয়ালে এমন পর্দা টানাও!” তখন আমার বাবা লজ্জিত হয়ে বললেন, “হে আবু আইয়ুব, এ ব্যাপারে মহিলারা আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে।” এরপর আবু আইয়ুব বলেন, “যাদের ব্যাপারে আমি আশঙ্কা করতাম যে, তাদের ওপর মহিলারা প্রভাব বিস্তার করবে... (আপনাকে আমি তাদের মধ্যে মনে করতাম না)।”’৪৬
তাবারানির বর্ণনায় এসেছে, আবু জুহাইফা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سَتُفْتَحُ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا حَتَّى تُنَجِّدُوا بُيُوتَكُمْ كَمَا تُنَجَّدُ الْكَعْبَةُ
'তোমাদের ওপর দুনিয়াকে খুলে দেওয়া হবে, তখন তোমরা তোমাদের ঘরকে এমনভাবে সুসজ্জিত করবে, যেমনিভাবে কাবাকে সুসজ্জিত করা হয়। '৪৭
ঘর-বাড়ি কারুকার্য করার ক্ষেত্রে উলামায়ে কিরামের কথার খোলাসা হলো: তা হয়তো মাকরুহ, নয়তো হারাম। ৪৮
وَاللَّهُ أَعْلَمُ؛ وَصَلَّى اللهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ
টিকাঃ
৩৯. সুরা আজ-জুখরুফ: ৩৩-৩৫
৪০. ইবনু কাসির: ৭/২১৩
৪১. সহিহু মুসলিম: ৩/১৬৬৬
৪২. অন্য রিওয়ায়াতে এসেছে নবির জন্য।
৪৩. মুসনাদু আহমাদ: ৫/২২১, সহিহুল জামি': ২৪১১
৪৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩৮৫৫
৪৫. ফাতহুল বারি: ৯/২৪৯
৪৬. হাদিসের শেষ পর্যন্ত, যেভাবে ফাতহুল বারিতে বর্ণিত হয়েছে।
৪৭. সহিহুল জামি': ৩৬১৪
৪৮. ইবনে মুফলিহ কৃত আল-আদাবুশ শারইয়্যা।