📄 উপদেশ : কাফির-মুশরিকদের ধর্মীয় প্রতীক, তাদের উপাস্য, দেব-দেবীসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চিহ্ন ঘর থেকে অপসারণ করুন
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَتْرُكُ فِي بَيْتِهِ شَيْئًا فِيهِ تَصَالِيبُ إِلَّا نَقَضَهُ
'ঘরে যেই জিনিসের মধ্যেই কোনো ক্রুশের চিহ্নসদৃশ আলামত থাকত, নবিজি তা ভেঙে ফেলতেন। ২২
এই জমানায় আমরা অনেক বড় একটি পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি। বর্তমানে কাফির-মুশরিকদের দেশ থেকে তাদের তৈরিকৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র আমাদের দেশে আমদানি হয়। যেগুলোতে তাদের উপাস্য বা ধর্মীয় প্রতীকের ছবি অঙ্কিত থাকে। বিভিন্ন আকৃতিতে ক্রুশ চিহ্ন, যিশু, মেরির কাল্পনিক ছবি; অনুরূপভাবে গির্জার ছবি, দেব-দেবীর মূর্তি, গৌতম বুদ্ধের মূর্তি; আবার গ্রিকদের উপাস্যকে প্রেম-ভালোবাসার দেবতার প্রতিমা বলে আমদানি করা হয়। এভাবে কল্যাণ-অকল্যাণের দেবতার প্রতিমা থেকে শুরু করে নানান ধরনের শিরকি ছবি, মূর্তি, প্রতিমা আমাদের ঘরে প্রবেশ করে।
কোনো তাওহিদবাদী মুসলিমের ঘরে কোনোভাবেই শিরকের প্রতীক থাকতে পারে না। বরং একজন মুসলিম তো শিরককে তার মূলসহ উপড়ে ফেলবে। আর এ কারণেই তো রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজ ঘরে যখন কোনো ক্রুশের চিহ্ন দেখতেন, সাথে সাথে তিনি তা ভেঙে ফেলতেন।
এখানে ভাঙা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সেগুলো অপসারণ করা। যদি অঙ্কিত ছবি হয়, তাহলে মুছে ফেলে তা অপসারণ করতে হবে। আর যদি নকশিকৃত থাকে, তবে নকশাটা তুলে ফেলতে হবে। আর যদি কোনো স্টিকারের মাধ্যমে হয়, তাহলে স্টিকার উঠিয়ে ফেলার মাধ্যমে সমাধান হয়ে যাবে। আর যদি খোদাই করার মাধ্যমে হয়, তাহলে ঘষে বা অন্য কোনোভাবে তার চিহ্ন মুছে ফেললেই হবে। মোট কথা যেভাবেই চিহ্নটা দূর করা যাবে, সেভাবে করে একে মূলোৎপাটিত করতে হবে এবং পুরোপুরি দূর করতে হবে।
এখন কেউ কেউ এটাকে বাড়াবাড়ি বলতে পারে। কিন্তু এটা দ্বীনের ক্ষেত্রে غلو বা বাড়াবাড়ি নয়। কারণ যিনি আমাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, খোদ তিনিই (ﷺ) আমাদের এটি করে দেখিয়েছেন, তাঁর থেকেই আমরা এ আদর্শ পেয়েছি। তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, কোথায় কী করতে হবে, কোথায় কোন কর্ম যথার্থ হবে।
এ কারণে সকলের উচিত যখন ঘরের জন্য পাত্র, চাদর, পর্দা বা অন্য কোনো আসবাবপত্র কিনবে, তখন ভালোভাবে খেয়াল করে কিনবে যে, তার মধ্যে তাওহিদবিরোধী বিধর্মীদের কোনো প্রতীক আছে কি না? যদি থেকে থাকে, তাহলে সেগুলো পরিহার করে চলবে। এ ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা হলো, তার মধ্যে যদি শিরকের চিহ্ন বা কোনো আলামত না থাকে, তাহলে এতে থাকা নকশা মিটানো ওয়াজিব নয়।
টিকাঃ
২২. সহিহুল বুখারি, ফাতহুল বারি : ১০/৩৮৫
📄 উপদেশ: ঘর থেকে প্রাণীর ছবি অপসারণ করুন
অনেক মানুষই তাদের ঘর সাজাতে দেয়ালে বিভিন্ন ছবি ও চিত্র ঝুলায়। ঘরের কোণে তাকের ওপর বিভিন্ন পশুপাখি, এমনকি মানুষের মূর্তি বসায়। ঝুলানো চিত্রগুলোর কোনোটি আছে জড় বস্তু, আবার কোনোটি জীব; জীব, যেমন : মানুষ ও পশুপাখি ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের কথা স্পষ্ট যে, প্রাণীর স্থির চিত্র হারাম; চাই সেটা খোদাই করা হোক বা আঁকা কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে হোক। যেখানে ছবি স্থির থাকে না, তা যেমন: আয়না বা পানির ওপরের ক্ষণিকের ভাসমান ছবি। হাদিসে ছবি অঙ্কনকারীদের লানত করা হয়েছে। এবং বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন তাদের এ অসাধ্য কাজ সাধন করতে বলা হবে। তাদের অঙ্কিত ছবির মধ্যে রুহ ফুঁকতে বলা হবে। যারা ছবি অঙ্কন করবে, তাদের সকলের জন্যই এমন বিপদঘন মুহূর্তটি অবধারিত। তবে যা একান্ত প্রয়োজনের কারণে করা হয় তার হুকুম ভিন্ন। যেমন, কারও ব্যক্তিগত পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে, কোনো অপরাধীকে ধরার জন্য তার স্থির চিত্র করা হারাম নয়।
দেয়ালে প্রাণীর ছবি ঝুলানো তো হারামই, দ্বিতীয়ত এ ছবি ঝুলানোর মধ্যে আরও একটি গুনাহ রয়েছে—এই ছবির মাধ্যমে ছবিওয়ালাকে এক ধরনের সম্মান করা হয়। এবং কখনো কখনো এটা মানুষকে শিরকে পতিত করে ছাড়ে। যেমনটি হয়েছিল নুহ عليه السلام এর সম্প্রদায়ের। ছবি টানানোর সর্বনিম্ন ক্ষতি হলো, এটি মানুষের মধ্যে দুঃখ-বেদনা জাগিয়ে তোলে। অথবা তার বাপ-দাদার কৃতকর্মে অন্তরে গর্ব-অহংকার সৃষ্টি করে। এমন লোকেরা যেন না বলে যে, ছবি রাখলে ক্ষতি কী? আমরা তো আর ছবিকে সিজদা করছি না। তাদের উদ্দেশে বলছি, যারা নিজেদের ঘরকে ফেরেশতাদের প্রবেশের বরকত থেকে বঞ্চিত করতে চায়, তারা তাদের ঘরে ছবি ঝুলাতে পারে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ صُوَرُ لَا تَدْخُلُهُ الْمَلَائِكَةُ
‘যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে, তাতে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।'২৩
প্রাণীর ছবি নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এখানে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো :
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ
'কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি শাস্তির সম্মুখীন হবে চিত্রশিল্পীরা। '২৪
আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذِّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
'যারা এ সকল ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে, তাদের বলা হবে “তোমরা যা সৃষ্টি করেছিলে, তা জীবিত করো।”’২৫
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন, তিনি একবার মদিনার এক বাড়িতে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, বাড়ির ওপরের দিকে (দেয়ালে) এক চিত্রশিল্পী চিত্র আঁকছে। তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন:
يَقُولُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي، فَلْيَخْلُقُوا حَبَّةٌ وَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةٌ
'আল্লাহ তাআলা বলেন, “সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক জালিম আর কে আছে, যে আমার মতো সৃষ্টি করতে যায়! সুতরাং তারা যেন একটি দানা সৃষ্টি করে দেখায় এবং তারা যেন একটি ক্ষুদ্র কণা তৈরি করে দেখায়।”’২৬
আবু জুহাইফা বর্ণনা করেন :
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ المُصَوَّرَ
‘নবিজি ﷺ ছবি অঙ্কনকারীদের লানত করেছেন।'২৭
বিষয়টি যেন আপনার নিকট আরও স্পষ্ট হয়, সে জন্য এ ব্যাপারে আহলে ইলমদের কিছু মতামত তুলে ধরছি :
إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ صُوَرُ لَا تَدْخُلُهُ الْمَلَائِكَةُ ]যে ঘরে ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।[ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানি বলেন:
'এখানে ঘর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন সকল স্থান, যেখানে মানুষ অবস্থান করে; সেটা বাড়িও হতে পারে আবার তাঁবু বা অন্য কিছু যেখানে মানুষ বাস করে।'২৮
যে সকল ছবি ফেরেশতাদের প্রবেশে বাধা দেয়, তা হলো এমন প্রাণীর ছবি, যার মাথা কাটা হয়নি (অর্থাৎ মাথাসহ ছবি) অথবা যাকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়নি।২৯ (তুচ্ছজ্ঞানের অর্থ হলো, তাকে পা দিয়ে মাড়ানো এবং লাথি দেওয়া।)
কোনো প্রাণীর ছবি বানানোর কাজটি এমন বিদাআতপূর্ণ কাজ, যা ছবি-পূজারিরা শুরু করেছে। যা নুহ عليه السلام এর কওমের লোকদের কর্ম থেকে বুঝা যায়। হাবশায় অবস্থিত গির্জা এবং তাতে যে ছবি ছিল, তা নিয়ে আয়িশা থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
كَانُوا إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّورَةِ أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ
'তাদের মধ্যে যখন কোনো সৎ লোক মৃত্যুবরণ করত, তারা তার কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করত এবং তাতে তার ছবি তৈরি করত। আল্লাহ তাআলার নিকট তারাই হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি।'৩০
ইবনে হাজার এর সাথে আরও একটু যুক্ত করে বলেন :
'নববি বলেন, প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা জঘন্য হারাম। এটা কবিরা গুনাহ। কারণ এ ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ধমক এসেছে। ছবিটা সে নিজের জন্য আঁকুক বা অন্যের জন্য, সর্বাবস্থায় এটা হারাম। জামা-কাপড়, পর্দা-চাদর, টাকা-পয়সা, ঘরের দেওয়াল, ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদি কোনো স্থানেই প্রাণীর ছবি আঁকা জায়িজ নেই। তবে প্রাণীর ছবি ব্যতীত অন্য ছবি আঁকা জায়িজ; হারাম নয়।
আমি বলব, হাদিসের ব্যাপকতা এমন প্রতিটি অবয়বকেই শামিল করে যার ছায়া রয়েছে বা যার ছায়া নেই। মুসনাদে আহমাদে এসেছে, আলি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَيُّكُمْ يَنْطَلِقُ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَا يَدَعُ بِهَا وَثَنَا إِلَّا كَسَرَهُ، وَلَا صُورَةٌ إِلَّا لَطَّخَهَا
“তোমাদের যে-ই মদিনায় পৌঁছবে, সে যত মূর্তি পাবে সব ভেঙে ফেলবে এবং যত ছবি পাবে সব মুছে ফেলবে।”’৩১
রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বদা নিজ ঘরকে নিষিদ্ধ ছবি থেকে পবিত্র রাখতে চেয়েছেন। এখানে তার একটা উদাহরণ উল্লেখ করছি, এটি সহিহ বুখারিতে منْ لَمْ يَدْخُلْ بَيْتًا فِيهِ صُورَةٌ (ঘরে ছবি থাকায় যিনি প্রবেশ করেননি) শিরোনামের অধ্যায়ে এসেছে, আয়িশা থেকে বর্ণিত,
'তিনি একটি বালিশ কিনলেন, যাতে অনেক ছবি ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন তা দেখলেন, তখন ঘরে প্রবেশ না করে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আয়িশা তখন তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ দেখে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের দিকেই প্রত্যাবর্তন করব। আমি কী অপরাধ করেছি?" তিনি বললেন, "এই বালিশের ব্যাপারটি কী?" আয়িশা বললেন, "আমি এটা কিনেছি যেন আপনি এতে হেলান দিতে পারেন এবং এতে মাথা রাখতে পারেন।" তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন:
إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّورِ يُعَذِّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ : أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ، وقال : إِنَّ الْبَيْتَ الَّذِي فِيهِ صُوَرُ لَا تَدْخُلُهُ الْمَلَائِكَةُ
“নিশ্চয় এই ছবি অঙ্কনকারীদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তা জীবিত করো।” এবং তিনি বলেন, “নিশ্চয় যে ঘরে ছবি থাকে, তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।"৩২
কেউ কেউ এই প্রশ্ন করতে পারে যে, এই বিষয়টি নিয়ে এত দীর্ঘ আলোচনার কী প্রয়োজন? আমরা তাদের বলব, আমরা অনেক ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পাই, সেখানে দেয়ালে, ছাদের সাথে, তাকের ওপর ও টেবিলের ওপর বিভিন্ন গায়ক-গায়িকার উলঙ্গ, অর্ধ উলঙ্গ ছবি ঝুলানো থাকে। ঘরের মালিক সকাল-সন্ধ্যা তা দেখে। কেউ কেউ আবার তাতে চুমু খায় এবং বিভিন্ন খারাপ চিন্তা করে। ফলে এই ছবিগুলোই অনেক ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট হওয়ার বড় কারণ হয়। এবং এর মাধ্যমে জ্ঞানীদের নিকট প্রাণীর ছবি শরিয়তে হারাম হওয়ার হিকমতও প্রকাশ পাবে, ইন শা আল্লাহ।
আমরা এই অনুচ্ছেদটি শেষ করার আগে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই :
১. কেউ কেউ বলেন, বর্তমান সময়ে তো ছবি রীতিমতো আমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত আছে। প্রতিটি জিনিসের ওপরই ছবি থাকে। যেমন খাবারের প্যাকেট, কৌটার ওপর, বই, খাতা, পেপার-পত্রিকা প্রায় সবকিছুর ওপরই ছবি থাকে। এখন আমরা যদি সকল ছবি মুছতে যাই, তাহলে তো আমাদের সারাদিন শুধু এর পেছনেই ব্যয় করতে হবে, তবে আমরা কী করব?
আমরা বলব, আপনারা সম্ভব হলে ছবিহীন জিনিস কেনার চেষ্টা করুন। আর বাকিগুলোর ওপরের অংশের কাভারের ছবিগুলো মুছে ফেলুন বা উঠিয়ে ফেলুন। যেমন বইয়ের ওপরের পৃষ্ঠার ছবি মুছে ফেলুন এরপর বই থেকে উপকার অর্জন করুন। আর যেগুলো ব্যবহার করা শেষ, তা বাড়ির বাইরে বের করে দিন। যেমন পত্রিকা পড়া শেষ হলে ঘর থেকে বের করে অন্যত্র রাখুন। আর যেগুলো ওঠানো সম্ভব নয়, যেমন খাবারের প্যাকেটের ওপরের ছবি, এগুলো থাকলে কোনো সমস্যা হবে না, ইন শা আল্লাহ। উলামায়ে কিরামের মতামত এমনটিই। এটি আমাদের ওপর উমুমে বালওয়া তথা ব্যাপক আকারে ছড়ানো বিপদের আকার ধারণ করেছে। কোনো বিষয় অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়লে সেখানে কিছুটা ছাড় থাকে। এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হয়।
২. যদি দেয়ালের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তাতে ছবি ঝুলানোর খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে কোনো প্রাণহীন প্রকৃতির ছবি ঝুলাতে হবে অথবা কোনো মসজিদের ছবি বা শরয়িভাবে নিষিদ্ধ নয়, এমন ছবি ঝুলাতে হবে।
৩. যারা ঘরের দেয়ালে কুরআনের আয়াত ঝুলায়, তাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, কুরআন ঘরে টানিয়ে রাখার জন্য নাজিল হয়নি। এ ছাড়া কোনো সিজদারত মানুষ, পাখি অথবা এ ধরনের অন্য কিছুর আকারে কুরআনের আয়াত অঙ্কন করে টানিয়ে রাখা কুরআনের আয়াতের সাথে বেয়াদবির শামিল। এবং যারা কুরআনের আয়াত টানিয়ে রাখেন, তাদের ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে যে, তার ওপর যে আয়াত টানানো আছে, এর খেলাফ কোনো কিছু যেন তার থেকে প্রকাশ না পায়।
টিকাঃ
২৩. সহিহুল বুখারি: ৪/৩২৫
২৪. সহিহুল বুখারি: ১/৩৮২
২৫. সহিহুল বুখারি: ১/৩৮২
২৬. সহিহুল বুখারি: ১/৩৮৫
২৭. সহিহুল বুখারি : ১/৩৯৩
২৮. ফাতহুল বারি: ১/৩৯৩
২৯. ফাতহুল বারি: ১/৩৮২
৩০. ফাতহুল বারি: ১/৩৮২
৩১. ফাতহুল বারি: ১/৩৮৪
৩২. ফাতহুল বারি : ১/৩৯২
📄 উপদেশ: ধূমপান বর্জন করুন
ধূমপান হারাম হওয়ার জন্য এই আয়াতই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
'আর তিনি তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ।'৩৩
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা খাদ্য ও পানীয়কে দুভাগে ভাগ করেছেন :
১. পবিত্র হালাল খাবার।
২. অপবিত্র হারাম খাবার।
এখানে তৃতীয় আর কোনো প্রকার নেই। এখন কার এই সাহস আছে যে, দুর্গন্ধ নির্গমন, সম্পদের অপচয় এবং শারীরিক ও আত্মিক ক্ষতিতে ভরপুর এ ধূমপানকে উত্তম ও পবিত্র বলবে?
কোনো ভদ্র ও ভালো পরিবারে সিগারেট জ্বালানোর লাইটার ও ছাইদানিও থাকে না, হুঁকো বা এ জাতীয় অন্য কিছু থাকবে তো দূরের কথা।
আপনার পরিবারের কেউ ধূমপান করবে তো দূরের কথা আপনার বাড়িতে আগমণকারীদের মধ্যেও যেন কেউ ধূমপান করতে না পারে, সে জন্য 'ধূমপান নিষেধ' লিখে বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে দেবেন। আর যদি কাউকে আপনার সামনে এ হারামে লিপ্ত হতে দেখেন, তাহলে উপযুক্ত মাধ্যম গ্রহণ করে তাকে নিষেধ করে দেবেন।
টিকাঃ
৩৩. সুরা আল-আরাফ: ১৫৭
📄 উপদেশ: ঘরে কুকুর রাখা থেকে বিরত থাকুন
আমাদের অনেকেই কাফির-মুশরিকদের অনুকরণ করতে করতে এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, ওরা এখন যা করে, এরাও তাদের অনুসরণ করে তাই করে। কাফিররা ঘরে কুকুর পালে তো এরাও এখন ঘরে কুকুর পালা শুরু করেছে। এবং এর পেছনে বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করছে। অথচ মুসনাদে আহমাদের এক হাদিসে এসেছে 'কুকুরের মূল্য হারাম'৩৪। তারা কুকুরের খাবার ও তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পেছনে অনেক টাকা ঢালছে। এ সম্পর্কে অবশ্যই তাদের কিয়ামতের দিন হিসেব দিতে হবে।
এখন তো কুকুর পালন অনেক ধনী ও উচ্চপদস্থ চাকরিজীবীদের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এমনকি বড় বড় কর্মচারী ও ধনী ব্যক্তিদের ধনাঢ্যতার চিহ্ন হচ্ছে—তাদের ঘরে কুকুর থাকবে। কুকুর তাদের শরীরে এমনকি কারও কারও মুখে জিহ্বা লাগায়। তাদের বিভিন্ন পাত্রে মুখ লাগায়। অথচ কুকুরের লালা নাপাক, কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয়, তবে সেটা ধোয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। একবার মাটি দিয়ে ঘষাসহ সাতবার ধোয়ার আগে তা পবিত্র হয় না।
যারা কুকুর পালন করে তাদের দৈনিক কত নেকি নষ্ট হয়, তার কোনো হিসেব আছে? হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন :
مَا مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ يَرْتَبِطُونَ كَلْبًا إِلَّا نَقَصَ مِنْ عَمَلِهِمْ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطٌ إِلَّا كَلْبَ صَيْدٍ أَوْ كَلْبَ حَرْثٍ أَوْ كَلْبَ غَنَمٍ
'যারা কুকুর পালন করে প্রতিদিন তাদের এক কিরাত৩৫ নেকি নষ্ট হয়। (আর মুসলিম শরিফের বর্ণনায় এসেছে দুই কিরাত করে নেকি নষ্ট হয়।) তবে শিকারি কুকুর, ফসল ও বকরি পাহারা দেওয়ার জন্য কুকুর রাখা যাবে।’৩৬
কিন্তু যারা শখ করে ঘরে কুকুর রাখে, প্রতিদিন তাদের কত নেকি নষ্ট হয়, একটু চিন্তা করে দেখুন।
শিকারি, পাহারাদারি, খেত ও পশুর জন্য কুকুর রাখাটা কুকুর পালনের নিষেধাজ্ঞার বাইরে। এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে অপরাধী ধরা, মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত কুকুর। অর্থাৎ প্রয়োজনে এগুলো লালন পালন করা জায়িজ। এ বিষয়ে এটাই আহলে ইলমদের মূল বক্তব্য। ৩৭
এই তো আমরা হাদিসে দেখতে পাই যে, ঘরে কুকুর থাকার কারণে জিবরিল عليه السلام রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাথে পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাৎ করতে আসেননি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
'আমার নিকট জিবরিল আসলো এবং আমাকে বলল, “আমি রাতে আপনার কাছে এসেছিলাম কিন্তু আপনার ঘরে একটি মানুষের প্রতিকৃতি ছিল। একটি পর্দার কাপড়ে ছিল অনেক ছবি। ঘরে একটি কুকুর ছিল, তাই আমি প্রবেশ করিনি। সুতরাং আপনি মানুষের প্রতিকৃতির মাথা কেটে ফেলতে বলুন, যাতে তা কোনো একটি গাছের আকৃতিতে থাকে, পর্দাটা কেটে ফেলতে বলুন, যাতে তা দিয়ে হেলান দেওয়ার দুটি বলিশ বানানো যায়। কুকুরকে ঘর থেকে বের করে দিতে বলুন।” তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তা-ই করলেন। '৩৮
বর্তমানে আমরা আমলে কতটা দুর্বল, তা তো আমরা নিজেরাই জানি। প্রত্যেকে অবগত আছি নিজ নিজ অবস্থা সম্পর্কে। যদি আমলের ঘাটতি সম্পর্কে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে সালাফে সালিহিনের সাথে আমাদের তুলনা করে দেখি। আমরা আর আমাদের আমল কতই না নগণ্য ও সামান্য! কিন্তু আমরা যদি ঘরে কুকুর রেখে সে আমলকে প্রতিদিন ব্যাপক আকারে কমাতে থাকি, তবে আমাদের আর সম্বল হিসেবে কীই-বা থাকবে!?
টিকাঃ
৩৪. মুসনাদু আহমাদ: ১/৩৫৬, সহিহুল জামি': ৩০৭১
৩৫. কিরাত হলো ওজন পরিমাপের একটি একক।
৩৬. সুনানুত তিরমিজি: ১৪৮৯, সহিহ আল-জামি': ৫৩২১
৩৭. দেখুন, আহমাদ শাকির কৃত তিরমিজির টীকা: ৩/২৬৭।
৩৮. আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, সহিহুল জামি' : ৬৮