📄 আকিদাগত ক্ষতি
১. ফিল্ম বা বিভিন্ন মুভির মাধ্যমে কুফর ও বিভিন্ন বাতিল ধর্মগুলোর নিদর্শন প্রকাশ করা হয়। যেমন: ক্রুশ, বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন মন্দির-গির্জার ছবি; আবার ভালোবাসা, কল্যাণ-অকল্যাণ, আলো-অন্ধকার, সুখ-দুঃখ, খরা-বৃষ্টি ইত্যাদির কাল্পনিক দেবতাদের ছবি ও প্রতিকৃতি। অনুরূপভাবে কুফরি ধর্ম প্রচারণামূলক ফিল্মগুলো খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাতে দীক্ষিত হবার বিষয়কে ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া তো আছেই।
২. জীবিতকে মৃত্যু দান করা ও মৃতকে জীবন দান করার ক্ষেত্রে কোনো কোনো মানুষের শক্তিকে আল্লাহর কুদরতের সমকক্ষ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। যেমন ফিল্ম বা মুভিতে বিশেষ কোনো ব্যক্তি ক্রুশ অথবা জাদুর লাঠির সাহায্যে মৃতকে জীবিত করছে, এমন দৃশ্য দেখানো হয়।
৩. মিথ্যা, কল্পকাহিনী, কুসংস্কার, জাদু, ভেলকি, ভবিষ্যদ্বাণী করা, ভাগ্য গণনা করা, তাওহিদের সাথে সাংঘর্ষিক ইত্যাদি বিষয়ের প্রসার করা হয়।
৪. দর্শকদের অন্তর ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের প্রতি সম্মান-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা হয়। ফিল্মের মাধ্যমে ফাদার, পাদরি, যাজক ও নানকদের মহান ও অতিমানব হিসেবে তুলে ধরা হয়। দেখানো হয় যে, এরা রোগীদের সুস্থ করছে, উত্তম উত্তম কাজ করছে!
৫. বিভিন্ন সিনেমা-মুভির মধ্যে গাইরুল্লাহর নামে কসম করা হয়। ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয় আল্লাহর নাম নিয়ে। যেমন: একজনকে একবার আব্দুল কিসাহ নামে একটি ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল।
৬. আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টি-ক্ষমতার প্রতি সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করা হয়। কারও জীবনকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হয় যে, যেন আল্লাহ ও সে মানুষের মধ্যে একটা যুদ্ধ চলছে।
৭. আল্লাহর শত্রুদের সাথে বারাআতের (সম্পর্কহীনতার) অনুভূতিকে দর্শকদের অন্তর থেকে বের করে ফেলে কাফির ও তাদের সমাজকে মহান করে ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে যে সকল মুসলিম এসব দেখে, তারা মুগ্ধ হয়ে পড়ে কাফির ও তাদের সমাজের প্রতি। ভেঙে যায় মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যকার ব্যক্তিত্ব পার্থক্যের দেয়াল। আর যখন কোনো মুসলিমের অন্তর থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঘৃণা, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শত্রুতা করার অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়ে, তখন সেখানে কাফির ও কুফরি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান দখল করে নেয়; চলতে থাকে তাদের মতো হওয়ার শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ।
📄 সামাজিক অবক্ষয়
১. দর্শক সিনেমা-মুভিতে নায়কের চরিত্রে অভিনয়কারী কাফির-মুশরিকদের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়। কারণ সেখানে এদের দেখানো হয় বীর ও দয়াবান হিসেবে।
২. চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মারামারি, হত্যার দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয় অপরাধের প্রতি।
৩. এসব ফিল্ম-মুভি বিশেষ ধরনের মানববৈকল্যের সৃষ্টি করে; যার ফলে মানুষ সীমালঙ্ঘন ও অপরাধ করতে দ্বিধা করে না। বালক অপরাধী ও সাধারণ বন্দী সংশোধন সংস্থা তাদের ওপর ফিল্ম ও মুভির প্রভাব থাকার সাক্ষ্য দিয়েছে।
৪. সাধারণ মানুষ চুরি, প্রতারণা, ছিনতাই, জালিয়াতি ও ঘুষগ্রহণ ইত্যাদি অপরাধ কর্মকাণ্ডের শিক্ষা পায়।
৫. পুরুষদেরকে মহিলাদের মতো সাজতে এবং মহিলাদের পুরুষের বেশধারণের প্রতি উৎসাহিত করা হয়। আর এটা তো রাসুলুল্লাহ ﷺ এর হাদিসের স্পষ্ট বিরোধী। যারা এমন করে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের লানত করেছেন। কতক লোক চালচলন, কথাবার্তা ও পোশাক-আশাকে নারীর অনুসরণ করে, মহিলার মতো সাজতে পরচুলা পরে, অলংকার পরে, নেইল পালিশ লাগায় এবং সাজসজ্জার জন্য মহিলাদের বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করে। এবং কতক মহিলা ভাড়া করা দাড়ি-গোঁফ লাগায়, গলার স্বর মোটা করে কথা বলে-এর মাধ্যমে সমাজে তারল্য ও উদাসীনতা ছড়ায়। তৃতীয় আরেক লিঙ্গের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
৬. ফিল্ম ও মুভির প্রভাবে পড়ে মানুষ রাসুল ﷺ, সাহাবায়ে কিরাম, কোনো আলিম বা মুজাহিদকে নিজের আদর্শ না বানিয়ে, আদর্শ বানায় কোনো সস্তা নায়ক, গায়ক, নর্তক কিংবা খেলোয়াড়কে।
৭. যারা এসব দেখে তাদের পরিবারের দায়িত্ব পালনের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারের প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি তারা যত্নশীল থাকে না। অসুস্থ মা-বাবার ঠিকমতো খেয়াল করে না। বাবা ফিল্ম দেখছে তো ছেলে এসে বাবাকে ডাকছে, তখন মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় বাবা ছেলেকে বেদম প্রহার করে বসে; আবার সে ফিল্মের মধ্যেই ডুবে থাকে।
৮. বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েদের এগুলো ছাড়তে বললে তারা বিদ্রোহ করে ওঠে। যখন কেউ এসব পণ্য কেনার জন্য তার বাবার কাছে টাকা-পয়সা চায়, তখন তার বাবা সত্যটা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু ছেলে তো এসবে বুঁদ হয়ে আছে, তাকে এসব ধরে কোথায়! সে উল্টো পিতাকে তার পাওনাটা তাকে দিয়ে দিতে বলে। অথচ রাসুল ﷺ বলেছেন:
أَنْتَ وَمَالُكَ لِأَبِيكَ
'তুমি ও তোমার সম্পদ—উভয়ই তোমার বাবার অধিকারে।'২০
৯. লোকেরা ফিল্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে পারিবারিক সাক্ষাৎগুলোর প্রতি নির্লিপ্ত ও নিরুৎসাহিত হয়ে যায়। ফলে আত্মীয়তার বন্ধন প্রায় ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর যদি আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়াও হয়; তবে তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা খুব কমই হয়। পরস্পরের সমস্যা নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে টিভিপর্দার সামনে চুপচাপ বসে থাকা বেশি পছন্দ করে তারা।
১০. মেহমানের সম্মান ও তাদের মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত হয়ে যায় এসব লোকেরা।
১১. এ সকল সামগ্রীর মাধ্যমে সময় নষ্ট করে করে মানুষ অলস-অকর্মণ্য ও কাজকর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে।
১২. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তারা একে অপরকে ঘৃণার চোখে দেখে। পরস্পরের মধ্যে সৃষ্টি হয় অন্যায় আত্মমর্যাদাবোধ। স্বামী টিভিপর্দায় নারীর রূপ-যৌবনের বিভিন্ন পরিস্ফুটন দেখে আর স্ত্রীর নিকট সে নারীর রূপ বর্ণনা করতে থাকে। আর স্ত্রী বেতার শুনে রেডিও জকির কণ্ঠে মুগ্ধ হয়, ফিল্ম দেখে অভিভূত হয় অভিনেতার গুণে; আর এসবই সে স্বামীর কাছে বলতে থাকে।
১৩. ফিল্মের মধ্যে অবাধ মেলামেশা বারবার দেখার কারণে তার মন থেকে প্রশংসনীয় আত্মমর্যাদাবোধ উঠে যায়। তখন অন্যের সামনে সে নিজের স্ত্রীর রূপ-লাবণ্য প্রকাশেও দ্বিধা করে না। তার মেয়ে ও বোনেরা একাকী দূরে কোথাও সফর করতে গেলে তার সম্মানহানি হয় কি না, এ ব্যাপারেও সে একেবারেই যেন অজ্ঞ থাকে। ধীরে ধীরে সে কথিত নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
টিকাঃ
২০. সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৩০
📄 চারিত্রিক অবক্ষয়
১. পুরুষ নারীদের দেখে, আর নারী পুরুষদের দেখে। ফলে তাদের মধ্যে হুড়হুড় করে বাড়তে থাকে জৈবিক উত্তেজনা।
২. মানুষ বিভিন্ন অশ্লীল ও নোংরা পোশাক পরিধানে অভ্যস্ত হতে উদ্বুদ্ধ হয়। পর্দাহীনতা ও শরীর প্রদর্শনকে তারা মনে করতে থাকে মামুলি ব্যাপার।
৩. নারী-পুরুষ হারামভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। তাদের সাথে পরিচয় কীভাবে হবে, প্রথম কথা কীভাবে বলবে, কীভাবে বিস্তৃত করবে সম্পর্কের ডালপালা, প্রেম-ভালাবাসা ও উত্তেজনাপূর্ণ কথায় কীভাবে মতবিনিময় করতে হবে, একে অপরের হাত কীভাবে ধরতে হবে ইত্যাদির ভরপুর শিক্ষা তারা এসব ফিল্মের মাধ্যমে পায়।
৪. ফিল্মের মধ্যে জিনা-ধর্ষণের দৃশ্য দেখার ফলে মানুষ অবাধ ও হারাম যৌন মিলনকে হালকা মনে করতে থাকে। নাউজুবিল্লাহ। এমনকি কেউ কেউ তো তার মাহরামদের সাথে ফিল্মে দেখানো দৃশ্যের বাস্তবায়ন ঘটায়। আবার অনেকে এ সকল ফিল্ম চলাকালে বিভিন্ন নোংরা ও কুৎসিত অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
৫. মেয়েরা বিভিন্ন নাচের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যাতে তাদের শরীরের অনেক অংশই প্রকাশ পায়। এসব পুরুষদের উত্তেজিত করে তোলে অনায়াসে। এসবেই নাকি শান্তি আর মুক্তি!
৬. বিভিন্ন কমেডি ও কৌতুকের মুভি দেখে নিজে রসিক হওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে নিজের দৃঢ়তা ও ভারত্ব হারিয়ে বসে। খুব বেশি পরিমাণে হাসার কারণে অন্তরের মৃত্যু ঘটে।
📄 ইবাদতের ওপর বিরূপ প্রভাব
১. ফিল্ম ইত্যাদিতে আসক্ত হওয়ার কারণে অনেকের সালাত ছুটে যায়। বিশেষ করে, রাত জেগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখার কারণে ফজরের সালাতে তো তাদের কখনো মসজিদে দেখা যায় না।
২. বিভিন্ন সিরিয়াল, ফিল্ম, টুর্নামেন্ট দেখার কারণে মসজিদে গিয়ে জামাআতের সাথে সালাত আদায় তো দূরের কথা সঠিক সময়েও সালাত আদায় করা হয় না।
৩. কারও কারও মধ্যে ইসলামের কোনো কোনো শিআরের (নিদর্শনের) প্রতি অল্প অল্প করে ঘৃণা জন্মাতে থাকে; যেমন কারও কারও ক্ষেত্রে এমন ঘটেছে যে, ম্যাচ চলছে। চরম উত্তেজনাকর মুহূর্ত। কিন্তু তখনই নামাজ আদায়ের জন্য টিভি বন্ধ করে দেওয়া হলো। যার কারণে তার মনে নামাজের প্রতি বিরূপভাব চলে এল। নাউজুবিল্লাহ।
৪. যারা এসবে আসক্ত, তারা তো রমজানেও এগুলো দেখা জারি রাখে। ফলে এসব হারাম জিনিস দেখার কারণে তাদের সিয়ামের সাওয়াব কমে যায়। আবার কারও কারও তো পুরো সিয়ামটাই শেষ হয়ে যায়।
৫. পর্দার বিধান, একাধিক বিয়ের বিধানসহ শরিয়তের বিভিন্ন হুকুম-আহকামের ওপর অনবরত আঘাত করে এসব মুভি-সিনেমা। ফলে পর্দার ফরজ বিধান, একাধিক বিয়ে জায়িজ হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর নির্ধারণের ওপর ফিল্ম-আসক্ত এসব ব্যক্তিরা বিরূপভাবাপন্ন হয়।