📄 সন্তানদের মিথ্যা বলার কারণ ও প্রতিকার
আমাদের যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া উচিত, তা হল শিশুদের মিথ্যা কথা বলা। শিশুরা মিথ্যা বলে কিন্তু তারা বুঝাতে চাইবে যে তারা মিথ্যা বলেনি। তারা বলবে আমি এটা বলিনি, ওটা বলিনি, আমি এটা কখনও বলিনি, সত্যি বলছি। নিম্নে মা ও শিশুর উদাহরণ স্বরূপ একটি কথোপকথন দেখা যাক :
মা: তুমি এটা আমাকে বলেছো, আমি সেখানে ছিলাম।
শিশু: আমি বলিনি।
মা: আমি এটা রেকর্ড করেছি। এই হল ভিডিও।
শিশু: আমি এটা বলিনি।
ভিডিও দেখার পরেও তারা বলে, আমি এটা বলিনি। তারা স্বীকার করে না। তারা কোন ভাবে নিজেদের বুঝিয়ে নেয়।
আমরা কি জানি কেন এটা ঘটে? এটা ঘটে, কারণ প্রথম বার সে যখন মিথ্যা বলেছিল এবং সে স্বীকার করে নিয়েছিল তখন মা রাগ হয়ে তাকে কঠিন শাস্তি দিয়েছিল। যেন কিয়ামত ঘটে গেছে। তুমি? মিথ্যা বলেছ? আমার ঘরে? প্রথমে মা হয়তো বলেছেন যে, আমাকে সত্য বলো, কিচ্ছু হবে না। যখন সে সত্য স্বীকার করল, তখন মা তাকে প্রহার করলেন। পরবর্তী সময়ে, সে মনে মনে ভাবলো, আমি এতসব (বকা-ঝকা) গ্রহণ করতে রাজি। যখন আমি স্বীকার করে নিব আমি মিথ্যা বলেছি, আমি জানি এরপর কি হবে আমার। আমি এই অপরাধ (সত্য স্বীকার) আর করতে যাচ্ছি না। অপরাধ স্বীকারের কোন মূল্য এই বাসায় নেই।
আমাদেরকে এটা সর্বপ্রথম বন্ধ করতে হবে। আমি অতিরিক্ত শাস্তি দিতে পারবো না এমন কিছুর জন্য যা ঘটে গেছে এবং ইতিমধ্যেই আমাকে রাগান্বিত করেছে। এটা সংশোধন প্রক্রিয়া নয়। মা রাগান্বিত কারণ বাচ্চা মিথ্যা বলেছে, অথবা খারাপ কিছু করেছে। তারপর সে রাগান্বিত, কারণ সে কাজটি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। তারপর সে রাগান্বিত কারণ সে জিজ্ঞেস করছে- সত্য বল, আমি তোমাকে শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। আমি শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। যদিও সে আরও ৬ বার জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছে। কিন্তু সে বলে, শেষ বারের মতো আমাকে বল, আমি এই শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি, আমি আর দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করবো না। তুমি কি এটা করেছ? (শিশু) না। ঠিক আছে আমি তোমাকে এই শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। তোমার বাবাকে বলার আগে আর একবার। আমি এটা করেনি ৩ বার। সে বিছানায় যাবে, কান্নাকাটি করবে, কিন্তু সে স্বীকার করবে না। সে এটার উপরে অটল থাকবে। এই ছেলেকে নিয়ে আমি কী করবো? এরপর মা বলেন, আমি জানি তুমিই এটা করেছ। আমি জানি তুমিই এটা করেছ। মা হয়তো আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে যান। সে হয়ে যায় আরও বেশি রক্ষণাত্মক। সবশেষে, মা নিজের চুল ছিঁড়তে থাকেন। জানি না এটার শেষ কোথায়? এবার বাবা অফিস থেকে ঘরে আসলে মার অভিযোগ! আমি জানি না একে নিয়ে কী করব! সে মিথ্যা বলেছে! এবার বাবা আবার নতুন করে শুরু করলেন। বাবা: তুমি মিথ্যা বলেছ? শিশু: না।
কিভাবে আমরা এই সমস্যার সমাধান করবো? আমাদেরকে ঐ পরিস্থিতিগুলো নিতে হবে এভাবে, কিছু কিছু সময় আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করবো, যদিও আমরা জানি তারা মিথ্যা বলছে। বলতে হবে, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। তুমি আমার সাথে মিথ্যা বলবে না। তুমি শেষবার কথা দিয়েছ যে, তুমি মিথ্যা বলবে না। তাই আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। ঠিক আছে। তোমার কোন সমস্যা নেই। তাকে এই মিথ্যা বলাতে ৩/৪ বার সুযোগ দিতে হবে। কল্পনা করি। কি ঘটতে পারে। শিশুরা স্বভাবগতভাবে খারাপ না। তাদের প্রকৃতিতেই রয়েছে সততা। তাই যখন তারা খারাপ কিছু করে এবং আমরা সেজন্য তাদেরকে শাস্তি দেই না, তখন তাদের সুযোগ হয় বিবেককে প্রশ্ন করার। যদি আমরা এর জন্য তাদেরকে শাস্তি দেই, তাদের বিবেক কাজ করার সুযোগ পায় না। কারণ তারা এর জন্য ইতিমধ্যেই শাস্তি পেয়ে গেছে। যখন তারা শাস্তি পেয়ে যায়, তখন তাদের অপরাধবোধ আর কাজ করে না। তারা খারাপ কিছু করেছে এবং তার জন্য তারা মূল্যও দিয়েছে। তখন তাদের বিবেকের আর কিছু করার থাকে না।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিস্কার হওয়া যেতে পারে। যেমন একটি শিশু তার ছোট বোনের গালে চড় দিয়েছে। আমরা বিষয়টা সামলানোর জন্য তাকে কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে তার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একটি উপযুক্ত সময় বেছে নিতে পারি। সবসময় এটা করার সুযোগ হয়তো পাবো না। এবং বলতে হবে, ঠিক আছে আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম, তুমি এটা করনি তোমার বোন ভুল করেছে, সে ভালভাবে মনে রাখতে পারে নি। তার গালের উপর যে লাল দাগ রয়েছে, সেটা হয়ত কোন ভাবে হয়েছে। ঠিক আছে, তোমার কোন সমস্যা নেই।
সময়ের ব্যবধানে এতে কি হবে আমরা কি তা জানি? এক সময় সে এসে মাকে বলবে, "আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই। আমি এটা করেছি... কান্না...।" তখন মায়ের উচিত হবে তাকে সান্তনা দেয়া, তাকে আদর করা। ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি এখনো তোমাকে ভাল জানি। এখানে মা আসলে কি করলেন, মা তাকে রক্ষণাত্মক মনোভাব থেকে সরিয়ে আনলেন। কিন্তু এটা করার জন্য দীর্ঘ সময়ের চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন হয়। প্রথমেই আমরা এটা করতে সমর্থ হবো না। এটা খুব কঠিন এ ধরনের বিষয় ক্ষমা করে দেয়া। বিশেষভাবে যখন তারা আরেকটা বাচ্চাকে আঘাত করে। যদি তারা অন্য বাচ্চার সাথে অন্যায় করে। তাহলে আমাদেরকে সেই বাচ্চাটাকে সান্তনা দিতে হবে। আমি তোমাকেও বিশ্বাস করি। আমি তোমার প্রতি রাগান্বিত নই। এবং আমি জানি যে তুমি কোন অন্যায় করনি।
কিন্তু তুমি খুশি হতে পারবে না যদি সে শাস্তি পায়। এটা আরেক বিষয়, এক বাচ্চা শাস্তি পেলে আরেক বাচ্চা খুশি হয়ে যায়। এবং তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে এভাবে বলে, বাবা অন্য দিন সে আমার কান টান দিয়েছে। এবং ছোট জন হয়তো কাছে এসে বললো বাবা, তুমি জানো আপি একদিন আমার কান টান দিয়েছে। বললাম, কখন? (শিশু) আমি জানি না, কোন এক গতকাল। আমি বললাম আমাকে তুমি কি করতে বল? তাকে শাস্তি দাও। আমি বললাম, এতে কি তুমি খুশি হবে? হ্যা...। কখনও কখনও শিশুরা কৌশল অবলম্বন করে যাতে অন্যজন শাস্তি পায়। তারা এটা করে। আমরা হয়তো এই পরিস্থিতিও তৈরী করতে চাই না। যদি এটা একদম ছোট বাচ্চা হয়, ২ বছরের তাহলে সমস্যা মনে হয় না। আমি হয়তো তাদের আনন্দ দিতে চাই। আমি হয়তো বড় জনকে ধরে এভাবে নিজের হাতে নিজে কয়েকবার আঘাত করি এবং বলি, বলো আও, সে তখন বলে আও, আও, আমি ব্যাথা পাই, আমি ব্যাথা পাই। এবং আমি ছোটজনের দিকে ফিরে বলি, তুমি এখন খুশি? হ্যাঁ...। এটা মজার।
কিন্তু বড় সন্তানের বেলায় একজন শাস্তি পেলে যদি অন্য জন খুশি হয় তাহলে এটা একটা সমস্যা। এটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেন তুমি খুশি এটা থেকে তুমি কি পেলে? এ বিষয়গুলো আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।