📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 সন্তান প্রতিপালনে আমাদের করণীয়

📄 সন্তান প্রতিপালনে আমাদের করণীয়


আমাদের সন্তানদের প্রতি যে সচেতনতা কাজ করে তা আমাদের দ্বীনেরই ভিত্তি। আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে যে চিন্তা এটা আমরা পেয়েছি আমাদের বাবা ইব্রাহিম-এর কাছ থেকে। আসলে তারও আগে আমরা প্রথম যেই সচেতন বাবার কথা জানতে পেরেছি তিনি ছিলেন নূহ। নূহ তার সন্তানের ব্যাপারে খুব বেশী উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে তার সন্তানকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। তো আমাদের সন্তানের দ্বীনি বিষয়ে আমাদের সচেতনতা এই ধর্মের বহু পুরোনো ভিত্তি। আল্লাহ আমাদের একটা বিষয় শেখাতে চেয়েছেন যে, আমাদের নাবীদের সন্তানেরাও সমস্যাগ্রস্ত ছিল। ইব্রাহীম -কে আল্লাহ অত্যন্ত নেককার দু'জন সন্তান দিয়েছিলেন, তাকে দিয়েছিলেন ইসমাঈল এবং ইসহাক। তিনি দু'জন অপূর্ব সন্তান পেয়েছিলেন। কিন্তু নূহ তেমন পাননি। ইয়াকুব পেয়েছিলেন কয়েকজন অনুগত সন্তান আবার কয়েকজন সমস্যাগ্রস্ত সন্তান। তবে তার সন্তানদের বেশীরভাগই অবাধ্য ছিলেন।

তার মানে আমাদের নাবীদের মধ্যেই এমন কয়েকজন আছেন যাঁরা সন্তানের ব্যাপারে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আর এ কথাটা মাথায় রাখা জরুরি কারণ যদি নাবীদের তাদের সন্তানের ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে আমি.... আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন.... আমরা সন্তানের ব্যাপারে আমাদের সমস্যাকে এড়িয়ে যেতে পারব না! এটা আল্লাহর ক্বদরেরই অংশ। আল্লাহ আমাদের কয়েকজনকে অনুগত সন্তান দান করবেন, কিংবা আমাদের কিছু সন্তান অনুগত হবে আবার কিছু সন্তান আমাদের জন্যে পরীক্ষাস্বরূপ হবে। আর আমাদের সব ধরনের সন্তানকেই বড় করে তুলতে হবে। এটা আমাদের দ্বীনেরই একটা অংশ, আমাদের জীবনের অংশ।

দু'টি বাচ্চা কখনোই একই রকমের হবে না। কেবল একটা সূত্র প্রয়োগ করে আমাদের সব বাচ্চাকে বড় করতে পারবো না। উদাহরণস্বরূপ ইয়াকূব- এর কথাই ধরি, আমরা এটা বিশ্বাস করি না যে তিনি ইউসূফ-কে বেশী স্নেহ করেছিলেন এবং অন্যদের প্রতি কম যত্ন নিয়েছিলেন তাই তারা অমন আচরণ করেছিলো। তিনি একজন নাবী ছিলেন। অবশ্যই একজন নাবীর অন্যতম প্রধান কাজ হল ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবনযাপন করা। আর এতে সুবিচার হবে না আমি যদি আমার এক সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হই আর অন্য সন্তানের প্রতি তা না হই। আমরা ইয়াকূব-এর কাছে এমনটা আশা করি না। অর্থাৎ বাবা হিসেবে যতটুকু করা সম্ভব ছিল তিনি করেছিলেন কিন্তু তারপরেও তাঁর সন্তানেরা তাঁকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! শেষে তারাও তাওবা করেছিলেন আর এটা তার প্রতি আল্লাহর উপহার।

কিন্তু নুহ-এর ক্ষেত্রে তাঁর ছেলে শেষ পর্যন্ত তাওবা করেনি। তিনি নাবী ছিলেন দেখে আমরা হয়ত ভাবতে পারি যে, তাঁর ছেলেকে মাফ করে দেয়া হবে এটা ঠিক নয়। বুঝার সুবিধার্থে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন- যিনি ভাল চাকরি করেন তার কিছু অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা থাকে। যেমন- হেলথ ইন্স্যুরেন্স, গাড়ি, টেলিফোন, বিভিন্ন রকম ভাতা ইত্যাদি। তাই নাবীর ক্ষেত্রে বিষয়টা একেবারেই এরকম নয়। নাবীর ছেলে হয়েছে বলেই আল্লাহর থেকে বাড়তি কোন সুযোগ-সুবিধাই সে পাবে না।

কোন নাবীকেই তাঁর পরিবারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি, না তাঁর স্ত্রী, না তাঁর সন্তান। এমনকি আমাদের নাবী মুহাম্মাদ -এর ক্ষেত্রে। একটা হাদীসে আমরা দেখি যে তিনি যখন তার সন্তানের সঙ্গে কথা বলছেন... ফাতিমা তুয জহরা -এর সঙ্গে, তিনি বলছেন: "ফাতিমা, মুহাম্মাদের কন্যা! আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, কারণ আল্লাহর সামনে আমি তোমাকে কোন সাহায্য করতে পারব না, তোমার উপরেও আমার কোন অধিকার থাকবে না!" তিনি এই কথা বলছেন নিজের মেয়েকে! অন্য কথায় তিনি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিখাতে চাইছেন।

কেবল আমরা মুসলিম হয়েছি বলে, আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি বলে... আমরা এমন সন্দেহ পোষণ করতে পারি না যে আমাদের নাবীজী তাঁর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার চেয়ে কোন অংশে কম করেছেন। তিনি ভবিষ্যতের সকল বাবাদের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে কন্যা সন্তানের বাবাদের জন্যে। আমাদের মধ্যে যাদের মেয়ে আছে আমরা তো অনুগৃহীত। আমরা সম্মানিত নাবী - এর সুন্নাকে বহাল রাখতে পেরে। কারণ তিনিও ছিলেন কন্যা সন্তানের বাবা। তাঁর ছেলেও হয়েছিল কিন্তু তারা খুব অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিল। আল্লাহ তাকে একাধিক মেয়ে সন্তান উপহার দিয়েছিলেন এবং তাঁদের লালন-পালনের দায়িত্ব উপভোগ করতে দিয়েছেন। এটা এমন একটা দায়িত্ব যার জন্যে আমাদের সম্মানিত বোধ করা উচিত। এ কারণে মেয়ে সন্তান হওয়ার ব্যাপারে আমাদের চিন্তা ধারণা বদলে গিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মেয়ে সন্তান হওয়ার যে কালচার ইসলামের পূর্বে এমনকি আরব দেশেও যখন মেয়ে সন্তান হত তখন তারা চেহারা বিকৃত করতেন : এহ! এখন আমি সমাজকে মুখ দেখাব কিভাবে। অবাক কথা এই যে, এই যুগে এসেও মুসলিম সমাজে কারো কারো পরিবারেই স্বামী তার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। সে প্রায় মরেই যাচ্ছিল সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে কিন্তু সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর মা এস.এম.এস করলেন: 'ভালো খবর তো?' এ কথার মানে কি? তিনি আসলে জিজ্ঞেস করেছেন ছেলে হয়েছে কিনা। এরপর স্বামী কোন উত্তর না দিলে তিনি সান্তনা দিয়ে বলেন: অসুবিধা নেই, এর পরের বার হবে ইনশাআল্লাহ। যেন মেয়ে হওয়ার ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। সুবহানাল্লাহ। কত নীচে নেমে গিয়েছি আমরা।

আল্লাহ আসলে তাদের ব্যাপারে কুরআনে অভিযোগ করেছেন যারা তাদের কন্যা সন্তানকে মর্যাদা দেয় না। যখন মেয়ে জন্ম দেয় তার মুখ কালো হয়ে যায়। যেন কালোমেঘ তার মুখকে ঢেকে রেখেছে আর সে হতাশায় ডুবে ভাবছে আমার এই মাত্র একটা মেয়ে হয়েছে। সুবহানাল্লাহ। তো আমাদের সন্তানদের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করা নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের প্রথমে ভাবা উচিত মা-বাবা হিসেবে আমরা কতটা যোগ্য। এ বিষয়টা প্রথমে খেয়ালে আনতে হবে। আর এটা আসলে বেশ বড় একটা সমস্যা।

আমাদের মনে রাখতে হবে সন্তানের প্রতি সচেতনতা আমাদের দ্বীনের একটা ভিত্তি। দ্বীনের একটা মৌলিক অংশ। আলহামদুলিল্লাহ! সন্তানকে বড় করার কাজে আমরা বেশ ভালো যুগ যুগ ধরে। অবশ্যই পৃথিবী অনেক বদলে গিয়েছে নাবী ﷺ -এর জন্মের পরে। কিন্তু সন্তান লালন-পালনে মুসলিমদের সফলতা অন্য কিছুর তুলনায় অনেক ভালো ছিল বর্তমান সময়ের আগ পর্যন্ত। আজকের দুনিয়া এতটা আকস্মিকভাবে বদলে যাচ্ছে যে, এটা শুধু সরকার কিভাবে পরিচালিত হবে তাতে প্রভাব রাখছে না। কিভাবে এক দেশ অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে, কিভাবে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে শুধু তাতেই প্রভাব বিস্তার করছে না বরং এটা আমাদের পরিবারগুলোকেও প্রভাবিত করছে। শুধু মুসলিম পরিবার নয়, সকল পরিবার।

বর্তমান বিশ্ব নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পরিবারের এখন যেমন অবস্থা দেখতে পাচ্ছি এর আগে কখনো এমনটা ছিল না। সন্তানদেরকে এমনভাবে বড় করা হচ্ছে ইতিহাসের আর কোন যুগে কিংবা অন্য কোন সংস্কৃতিতে এমন আকার ধারণ করেনি। শুধু মুসলিম সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নয়, সবার ক্ষেত্রে। বিশ্বায়ন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার বৃহৎ উন্নয়নের কারণে। তার উপর ভোগবাদের চরম পর্যায় সৃষ্টি হওয়ায় একে পুঁজিবাদ না বলে বরং বলা উচিত ভোগবাদ। আমরা পণ্যের আসক্ত ভোক্তায় পরিণত হয়েছি। আর এই মানসিকতা আমাদের ঘরের ভিতরেও প্রবেশ করে ফেলেছে।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যাক সে ব্যাপারে। আমাদের বাচ্চারা আমাদের কাছে কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি আবদার করে? তারা কিসের জন্যে সব সময় বায়না ধরে বসে থাকে? চকলেট? না তারা এখন কেবল চকলেট চায় না! তারা এখন আইপ্যাড, প্লে স্টেশন ইত্যাদি চায়। তারা বড় হয়ে গিয়েছে? তারা এখন খেলনা দিয়ে খেলতে চায় না। তারা এসব আইপ্যাডের খবর কোথায় পায়? তারা কি স্বপ্নে দেখতে পায়? না। হয় তাদের বন্ধুর কাছে এসব আছে অথবা টিভিতে দেখেছে। তারা যখন দেখল তার অন্য বন্ধুদের এসব আছে তারা বলে 'আমি ওরকম স্নিকার চাই' 'আমি ওরকম শার্ট চাই' 'আমি ওরকম খেলনা চাই'।

এরকম খেলনার আইডিয়া তারা কোথায় পায়? এসবের ইলহাম কোথা থেকে আসে? এসব এসেছে মিডিয়া থেকে। আমরা আমদের বাচ্চাদের সামনে মিডিয়ার জগৎটা উন্মুক্ত করে দিয়েছি। আর এই মিডিয়া, বাচ্চাদেরকে মূলতঃ এসব খেলনার জন্যে বায়না করতে শেখায়। যেন আমরা তাদের এসব খেলনা কিনে দেই। আর তখন আমরা এগুলো কিনি। তাছাড়া বাচ্চারাই যে এসবের একমাত্র শিকার তা কিন্তু নয়, আমরাও এর অন্তর্ভুক্ত। আমরা যেসব ব্রান্ডের ড্রেস পরি, তখন আমরা আসলে নিজেকে খুব হাই ক্লাস মানুষ ভাবতে শুরু করি যখন আমি একটা দামি ঘড়ি পরি। হঠাৎ যেন আমার মনে হতে থাকে সব মানুষের ভিড়ে আমার মান-মর্যাদা বেশী। যেই মুহূর্তে আমি একটা অ্যাপল স্টোর থেকে একটা আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসি হঠাৎ যেন আমার নিজেকে খুব হ্যান্ডসাম লাগে! কিছু একটা তো হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না আমি কিভাবে এত কুল হয়ে গেলাম, এটা জাস্ট হয়ে গেল! আমরা আসলে ভেবে নিই মানুষ হিসেবে আমাদের মর্যাদা বেড়ে গিয়েছে এসব পণ্যের ক্রেতা হয়েছি বলে।

আর আমি যদি কোনো ব্র্যান্ড-এর কাপড় না পরি, অথবা ওই ফোনটা যদি আমার না থাকে কিংবা আমার এই খেলনাটা নেই অথবা ওই খেলনাটা নেই তাহলে আমি মূল্যহীন। কোন কারণে আমি অন্যদের সমমান সম্পন্ন নই। অন্যরা আমার চেয়ে ভালো। শুধু এই কারণে যে, তাদের হাতে যেটা আছে সেটা আমারটার থেকে ভালো। তো আমরা মুসলিম আমরা কেমন যেন অচেতন ভোক্তায় পরিণত হয়ে গিয়েছি। এমনটাই আমাদের অবস্থা।

এই সমাজে সন্তান লালনের কথা বলার আগে আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, আর সারা দুনিয়াতে কী হচ্ছে? কার্যকর উপায়ে সন্তান লালনের কথা ভাবতে গিয়ে আমাদের এসব ব্যাপারে ভেবে দেখতে হবে। এটা একটা বড় সমস্যা। দ্বিতীয় বড় সমস্যা হল, আমার কাছে সাফল্যের মানে কি? কিসে আমাদের মর্যাদা বাড়ায়? এখনতো বাচ্চাদেরকে এই মানসিকতা দিয়ে বড় করা হচ্ছে যে তাদের মূল্য এই প্রোডাক্ট দ্বারা নির্ধারিত হয়... যে ব্রান্ডের কাপড় পরছে, যে বাসায় থাকছে, যে গাড়িটা চালিয়ে তাকে স্কুলে দিয়ে আসা হচ্ছে, যে ব্রান্ডের ব্যাগ কাঁধে নিচ্ছে, এসব ব্যাপার! এগুলোই আমাদের মূল্য যাচাই করছে! আর এর সাথে যোগ হয়েছে আরও একটা সমস্যা: জীবনে সফলতা বলতে কি বুঝায়?'

সাফল্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা ২০, ৩০, ৪০ বছর আগেও যা ছিল... মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশের জন্য ব্যাপারটা সত্য যে, আমাদের মধ্যে কারও কারও হয়ত শিক্ষার ভালো সুযোগ ছিল না, কিংবা আমাদের বাবা-মায়ের সুযোগ হয়নি। তো তারা তাদের সব ধরনের প্রচেষ্টা লাগিয়ে দেয় তাদের বাচ্চাকে শিক্ষিত করে তুলতে। আর আমি আমার জীবন থেকে এই শিক্ষা পেয়েছি তাই আমি বলি 'আমি আমার বাচ্চার জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা রাখব'। যদিও এই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আমার তাকে প্রাইভেট স্কুলে পাঠাতে হয়, বাড়ি ভাড়া করতে হয়, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে হয়, অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকতে হয়, তারপরেও তাদের সুশিক্ষার স্বার্থে আমি তা করতে রাজি আছি। যদিও আমাকে অস্বাভাবিক লোন নিতে হয়... কেন? কারণ আমাদের কাছে সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কি? আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা।

আর এখানে যারা আমাদের সন্তান, তাদেরকে বার বার বলা হয়েছে। তোমাকে শিক্ষা নিতেই হবে। তুমি একজন ব্যর্থ মানুষে পরিণত হবে যদি শিক্ষা না পাও। তোমাকে ডাক্তার হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, এটা পাস করতে হবে, ওটা পাস করতে হবে ইত্যাদি। এখন আমার জন্য কেবল একটাই দরজাই খোলা আছে আর সেটা হলো আখিরাত। কারণ আমি ডাক্তার হতে পারিনি দেখে আমার মা-বাবা আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না। তবে খেয়াল করি ডাক্তার হওয়া আমাদের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ নাম ও টাকা। এজন্যে না যে আমি কারও জীবন বাঁচাতে পারছি কিংবা মানবতার সাহায্য করছি। এ ধারণার সাথে ডাক্তার হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই!

আমাদের মাঝে কোন উৎসাহ নেই নিজেদের সন্তানকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখার। মা-বাবা খুব খুশি হয়ে যায় যখন দেখে ছেলে ডাক্তার হয়ে ফিরছে। কিন্তু ছেলে যদি বলে 'আমি তিন বছরের জন্য ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিওতে ভলান্টিয়ার কাজ করবো। আমি বাংলাদেশের বন্যা কবলিত এলাকায় যাবো, এরপর আমি আফ্রিকা যাবো তারপর ফিলিস্তিনিদের সাহায্যার্থে যাবো, আমি শুধু সেবা দান করব, এই তিন বছর বেতন নিব না, কোন লাভের জন্য কাজ করব না, শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানব সেবা করব।' তখন সেই মা- বাবা বলবে "ইয়া আল্লাহ! আমরা আমাদের সব টাকা পয়সা ঢেলে দিয়েছি তোমাকে ডাক্তার বানাবার জন্যে আর এখন তুমি এসব করবে? নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াবে? তুমি কেন বিনা পারিশ্রমিকে অসহায় মানুষদের জীবন বাঁচাবে? তোমার সমস্যা কি?” এই হলো আমাদের বাস্তব চিত্র।

অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। হাইস্কুল পাস মেয়েরা আজকাল নিজেরাই একটা আদর্শ তৈরী করে নেয়। সেটি হতে পারে Rock n Roll এর আদর্শ, কিংবা আমেরিকান আইডলের আদর্শ, কিংবা ইন্ডিয়ান কোন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গায়ক বা গায়িকার আদর্শ। শুধু তাই নয়, এর বাইরে কোন কিছুকে তারা সেকেলে বা নিম্নস্তরের জিনিস মুখে না বললেও ভাবে তা প্রকাশ করে দেয়। অন্যদের সে আদর্শের অনুসারী বানানোর চেষ্টা করে। আফসোস, এই পরিবারটি বিষয়টি বুঝলেন না। তাই আসুন শিশুদের উপযোগী ইসলামী ডিভিডি ইত্যাদি সংগ্রহ করি। সন্তানদের সেগুলি উপভোগ করার জন্য উৎসাহিত করি। হিকমতের সাথে ও তাদের স্বতন্ত্র সত্তার কথা বিবেচনা করে ধীরে ধীরে এগুতে থাকি। এসব ইসলামী শিক্ষামূলক বই, ডিভিডি খুব সহজেই আজকাল পাওয়া যায়। এছাড়া ইউটিউবতো রয়েছেই।

সবশেষে কথা একই। এই ধারণা আগের যুগ থেকে ভিন্ন। আগে সকলের ধারনা ছিলো আমি শিক্ষিত হয়েছি এর মানে হচ্ছে আমি নিজেকে বুঝি, আমার চারপাশের পরিবেশকে বুঝি, আর আমি পৃথিবীকে আরও সুন্দর বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কাজ করছি। আর এর জন্য কখনো আমাকে ইতিহাস পড়তে হবে, কখনো সামাজ বিজ্ঞান পড়তে হবে, কখনো পলিটিক্যাল সাইন্স পড়তে হবে, কখনো সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে। কেবল একটা ক্ষেত্র নিয়েই পড়ে থাকলে চলবে না। আর তাছাড়া যে দিক থেকেই বিচার করি না কেন, সবচেয়ে সফল কমিউনিটি হলো তারাই যারা নিজেদের ছেলেমেয়েকে কেবল একটা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

এখন সন্তান বড় করা সম্পর্কে অল্প কিছু কথা বলা যাক। সবচেয়ে আগে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। তারা যদি আমাদের মাঝে সফলতার সঠিক সংজ্ঞা খুঁজে না পায়, তারা যদি আমাদের ব্যক্তিত্বে এর প্রতিফলন না দেখতে পায়, আমাদের দৈনিক কথাবার্তায়, তবে আমরাও এটা আশা করতে পারি না যে তারা সফলতার সঠিক মানে নিজে থেকে বুঝে নিয়েছে। তাদের কাছে এ নির্দেশনা আমাদের পক্ষ থেকেই আসতে হবে। আমরা যা নিয়ে সব সময় কথা বলি, আমাদের কাছে যে বিষয়গুলো সব সময় গুরুত্বপূর্ণ, যখন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কথা বলি তখন বাচ্চা তা শুনতে থাকে, তাই না? তাদের কান সবসময় খোলা থাকে। এখন আমরা যদি বিল ফাঁকি দেয়া নিয়ে কথা বলি, বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার বদনাম করি কিংবা আমরা সবসময় নাটক-সিনেমা নিয়ে কথা বলি কিংবা অন্য পরিবার সম্পর্কে কেবল বাজে কথা বলি, তারা ভেবে নিবে যে বড়রা এমনই, আমার মা-বাবা এসব করে! এগুলো তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু আমি আর আমার স্ত্রী যদি কুরআন নিয়ে কথা বলি, আখিরাত নিয়ে কথা বলি, অন্যের জন্য ভালো কিছু করার কথা বলি, কাউকে সাহায্য করার কথা বলি, তারা আমারটা দেখে শিখে নিবে। আমাদের তাকে লেকচার দিতে হবে না এ ব্যাপারে, তারা কেবল বাবা-মাকে দেখবে। সবচেয়ে কার্যকর প্যারেন্টিং সেটাই যেখানে বাচ্চাকে কোনো কাজ করাতে বাবা-মার কিছু বলতেই হয় না, তারা দেখতে দেখতে শিখে ফেলে। কারণ তারা এসবই সব সময় দেখছে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 সন্তানদেরকে সময় দেয়া

📄 সন্তানদেরকে সময় দেয়া


আমাদের প্রজন্মের নিকট সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার হচ্ছে নুমান আলী খান। অনেক মা-বাবরাই তার কাছে যান এই বলে যে, "আপনি কী আমার সন্তানের সাথে একটু কথা বলতে পারবেন?” এই মা-বাবাদের মধ্যে বেশীরভাগই টিনেজারদের মা-বাবা। টিনেজারদের মা-বাবা প্রায় সময়ই তার কাছে যান বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে। যেমন বলেন, "আমার ছেলেটা না, আমার কথা শোনেই না আজকাল। আপনি ওর সাথে একটু কথা বলবেন?” তখন তিনি মনে মনে বলেন বরং আপনি নিজে আপনার ছেলের সাথে কথা বলছেন না কেন? কোথায় ছিলেন আপনি যখন তার সাথে কথা বলার প্রকৃত সময় ছিল?

মা-বাবা এবং স্বামী-স্ত্রী এই দু'টো খুবই মৌলিক সম্পর্ক। একটা আমাদের সন্তানদের সাথে, আরেকটা আমাদের জীবনসঙ্গীর সাথে। এই দু'টো সম্পর্কের ব্যাপারেই খুব বেসিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমাদের সন্তান যখন ছোট, খুবই ছোট, ধরি যখন তাদের বয়স পাঁচ, ছয়, সাত, দুই, তিন, চার, তখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন্ জিনিসটি? তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের সমর্থন। তারা মা-বাবাকে গর্বিত করতে চায়। তারা যা যা করেছে সব মা-বাবাকে দেখাতে চায়।

ধরি, আমি জরুরী কোনো কাজের আলাপ করছি ফোনে, আর এ সময় আমার দুই বছরের ছেলে এসে বলবে, "আব্বু আব্বু আব্বু আব্বু।"... "ভাই একটু লাইনে থাকেন"... "কী হয়েছে?"..."হে হে হে” ব্যস! আমি আবার ফোনালাপে ফিরে গেলাম, সে আবার আমাকে ডাকা শুরু করল। আমি বললাম, "আচ্ছা ঠিক আছে, কী হয়েছে বলো"... "আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো" "কি দেখাতে চাও বাবা? সে হয়তো একটা লাফ দিয়ে বাবাকে দেখালো ... ব্যস এটাই! কিন্তু আমার এ ক্ষেত্রে কী করা উচিত? অনেক বাবাই হয়তো বিরক্ত হবে বা তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিবে, এটা মোটেও ঠিক না।

বরং বন্ধুর সাথে ফোনের কথা বন্ধ করে দিয়ে শিশুটিকে উৎসাহ দিয়ে বলা যেতে পারে, "আল্লাহ! দারুন তো! আবার করো দেখি।" আমাদের সন্তানরা যা যা করে আমাদের উচিত তার কদর করা। এটা তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি তারা এটাই চায় আমাদের কাছ থেকে। ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য কি আমরা তা জানি কিনা? ছেলেরা এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না, আর মেয়েরা কথা বলা থামাতে পারে না।

আমার (নুমান আলী খান) মেয়েরা একজন ক্লাস ওয়ানে আরেক জন ক্লাস থ্রিতে পড়ে আমি ওদের স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসি ২৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে। আর এই পুরোটা সময় তারা কি করে জানেন? একজন বলতে থাকে "জানো আজকে ক্লাসে কি হয়েছে? আমরা একটা ডাইনোসর রং করেছি, এটা করেছি, ওটা করেছি, প্রথমে আমি বেগুনী রং করলাম, তারপর ভাবলাম একটু সবুজ রং-ও দেই”- এভাবে বলতে থাকলো তো বলতেই থাকলো। থামার কোনো নামই নেই। থামা সম্ভবই না ওদের পক্ষে। আর আমাকেও মনোযোগ দিয়ে সেটা শুনতে হবে। আমি বললাম, "ও তাই? নীল রং দাও নি?".. "না অল্প একটু নীল দিয়েছি"। আমাকে মনোযোগ দিতে হবে।

অন্য একটা গল্প বলি। আমার (নুমান আলী খান) বড় মেয়েটা, হুসনা, যখন ছোট ছিল তখন আঙ্গুল দিয়ে ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করত। সে তার আঙ্গুলগুলো রঙের মধ্যে চুবিয়ে তারপর সেগুলো দিয়ে হাবিজাবি আঁকত। তো একদিন এক বিশাল কার্ডবোর্ড নিয়ে সে আমার কাছে হাজির! সেখানে নীল রং দিয়ে বিশাল কি যেন আঁকা, আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। সে বলল, “আব্বু, দেখো আমি কী এঁকেছি?” আর আমি বললাম, বাহ, দারুন! একটা পাহাড়!" আর সে বলল, "না এটা তো আম্মু। আমি বললাম, "খাইছে!” "আম্মুকে এই কথা বোলো না কিন্তু”। তবে যে কথাটা বলতে চাচ্ছি তা হলো ওরা আমাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। ব্যাকুল তারা এর জন্য।

কিন্তু যাদের সন্তানরা টিনেজার, এমন কি হয় যে স্কুল থেকে আনার সময় তারা গাড়িতে উঠে কথা বলা থামাতে পারছে না? হয় এমন? জানো আজকে ক্লাসে কি হয়েছে? টিচার এটা বলেছে, ওটা করেছে, পরীক্ষায় ‘এ’ পেয়েছি”। না! তারা একদম চুপ! বরং মা-বাবারাই তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে, "কেমন গেলো দিন?" “মোটামুটি”.. "কি করলে সারাদিন?" "কিছু একটা” "আজকে কোথায় যাবে?" ... "যাব কোথাও"। কথা বলেই না তারা! তাদের কথা বলানো অনেকটা পুলিশের আসামীকে জেরা করার মত ব্যাপার। মা- বাবাকে তারা কিছুই বলে না, এক দুই শব্দে উত্তর দেয়। আর যখন মা-বাবা তাকে প্রশ্ন করছেন, তখন হয়ত সে তার বন্ধুকে এস.এম.এস পাঠাচ্ছে, “আব্বু আজকে বেশি প্রশ্ন করছে! ঘটনা কি? তুমি ওনাকে কিছু বলেছ নাকি....?"

ছোট বয়সে আমাদের বাচ্চারা আমাদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য পাগল থাকে। আর যখন তারা বড় হবে, তখন আমরা তাদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য পাগল হবো। কিন্তু তারা যখন ছোট থাকে তখন যদি আমরা তাদের মনোযোগ না দেই তারা খেলনা নিয়ে আমাদের কাছে আসলে যদি বলি, "ঘরে যাও! আমি সংবাদ দেখছি”, “খেলা চলছে। এই, তুমি একটু সরাও তো!", "সারাদিন অনেক কাজ করেছি, এখন ওকে সামলাতে পারব না", "বাসায় আমার বন্ধুরা এসেছে, কি বলবে ওরা? যাও ঘুমাতে যাও! যাও এখান থেকে" ইত্যাদি! এগুলো মোটেও ঠিক না।

আমরা যখন ওদের সাথে এমন আচরণ করবো, যেন তারা আমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা, আমাদের কাজ হচ্ছে চাকরি করা, আর বাসায় এসে শুধু বিশ্রাম নেয়া? আসলে আমাদের কাজ শুরু হয়েছে তখনই যখন আমরা ঘরে ফিরি। সেটাই আমাদের আসল কাজ। চাকরিতে যে কাজ করেছি সেটা শুধুমাত্র এজন্য যেন ঘরের আসল কাজটা ঠিকমত করতে পারি। একজন প্রকৃত বাবা হই। আমাদের সন্তানদের সাথে সময় কাটাই। তারা শুধু এ জন্য নয় যে আমি তাদের স্কুলে ছেড়ে দিয়ে আসবো, আর বাসায় ফিরে শুধু ঘুমাতে যাবো, কোনো ঝামেলায় যাবো না, তাদের সাথে কথা বলবো না। এবং তাদের সাথে কথা না বলার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তাদের একটা আইপ্যাড টাচ অথবা আইফোন ধরিয়ে দেয়া, তাদের নিজস্ব রুমে একটা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ দিয়ে দেয়া হাই-স্পিড ইন্টারনেট সহ! সুতরাং আমাদেরকে তাদের চেহারাও দেখতে হবে না। তারা সারাদিন তাদের ঘরে ফেইসবুকিং করতে থাকবে, অনলাইনেই নিজেদের জন্য নতুন মা-বাবা খুঁজে নিবে না হয়।

আসুন আমরা প্রকৃত বাবা হই, প্রকৃত মা হই। আমাদের মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের বদলি হিসেবে এইসব জিনিসকে আসতে না দেই। কারণ যদি তা না দেই, তাহলে ওরা যখন স্বাবলম্বী হয়ে যাবে তখন বেশির ভাগ মা-বাবার কী হয়? বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে দেখে কতগুলো টাকার মেশিন হিসেবে। শুধুমাত্র কখন তারা মা-বাবার কাছে আসে? "বাবা, আমাকে ৫০০ টাকা দাও তো” অথবা “শপিং মলে যেতে চাই, আমাকে একটু পৌঁছে দাও তো", বন্ধুদের বাসায় যাই?” “এটা করতে পারি?" "ওটা কিনতে পারি?” যখন তাদের কোনো কিছুর দরকার তখন তারা আমাদের কাছে আসে। এর বাইরে আমরা তাদের খুঁজেও পাবো না।

আর যখন তারা বড় হবে, নিজেরাই একটু কামাই করতে পারবে, তখন কি হবে? তাদের দেখাই পাবো না আর। কারণ আমাদের টাকার মেশিনও এখন আর দরকার নেই। এর প্রয়োজন শেষ। সন্তানদের সাথে আমরা যদি এই ধরনের সম্পর্ক তৈরী করি, তাহলে আমরা নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছি। আমাদেরকে এখনই পরিবর্তন আনতে হবে। আর পরিবর্তনের উপায় হলো- হয়তো এটা অনেকের জন্যই করাটা কঠিন হবে- কিন্তু আমাদেরকে সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। আমাদেরকে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হতে হবে। আমাদের সাথে সময় কাটানোটা তাদের কাছে উপভোগ্য হতে হবে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 সন্তানদের মিথ্যা বলার কারণ ও প্রতিকার

📄 সন্তানদের মিথ্যা বলার কারণ ও প্রতিকার


আমাদের যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া উচিত, তা হল শিশুদের মিথ্যা কথা বলা। শিশুরা মিথ্যা বলে কিন্তু তারা বুঝাতে চাইবে যে তারা মিথ্যা বলেনি। তারা বলবে আমি এটা বলিনি, ওটা বলিনি, আমি এটা কখনও বলিনি, সত্যি বলছি। নিম্নে মা ও শিশুর উদাহরণ স্বরূপ একটি কথোপকথন দেখা যাক :

মা: তুমি এটা আমাকে বলেছো, আমি সেখানে ছিলাম।
শিশু: আমি বলিনি।
মা: আমি এটা রেকর্ড করেছি। এই হল ভিডিও।
শিশু: আমি এটা বলিনি।

ভিডিও দেখার পরেও তারা বলে, আমি এটা বলিনি। তারা স্বীকার করে না। তারা কোন ভাবে নিজেদের বুঝিয়ে নেয়।

আমরা কি জানি কেন এটা ঘটে? এটা ঘটে, কারণ প্রথম বার সে যখন মিথ্যা বলেছিল এবং সে স্বীকার করে নিয়েছিল তখন মা রাগ হয়ে তাকে কঠিন শাস্তি দিয়েছিল। যেন কিয়ামত ঘটে গেছে। তুমি? মিথ্যা বলেছ? আমার ঘরে? প্রথমে মা হয়তো বলেছেন যে, আমাকে সত্য বলো, কিচ্ছু হবে না। যখন সে সত্য স্বীকার করল, তখন মা তাকে প্রহার করলেন। পরবর্তী সময়ে, সে মনে মনে ভাবলো, আমি এতসব (বকা-ঝকা) গ্রহণ করতে রাজি। যখন আমি স্বীকার করে নিব আমি মিথ্যা বলেছি, আমি জানি এরপর কি হবে আমার। আমি এই অপরাধ (সত্য স্বীকার) আর করতে যাচ্ছি না। অপরাধ স্বীকারের কোন মূল্য এই বাসায় নেই।

আমাদেরকে এটা সর্বপ্রথম বন্ধ করতে হবে। আমি অতিরিক্ত শাস্তি দিতে পারবো না এমন কিছুর জন্য যা ঘটে গেছে এবং ইতিমধ্যেই আমাকে রাগান্বিত করেছে। এটা সংশোধন প্রক্রিয়া নয়। মা রাগান্বিত কারণ বাচ্চা মিথ্যা বলেছে, অথবা খারাপ কিছু করেছে। তারপর সে রাগান্বিত, কারণ সে কাজটি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। তারপর সে রাগান্বিত কারণ সে জিজ্ঞেস করছে- সত্য বল, আমি তোমাকে শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। আমি শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। যদিও সে আরও ৬ বার জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছে। কিন্তু সে বলে, শেষ বারের মতো আমাকে বল, আমি এই শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি, আমি আর দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করবো না। তুমি কি এটা করেছ? (শিশু) না। ঠিক আছে আমি তোমাকে এই শেষ বারের মত জিজ্ঞেস করছি। তোমার বাবাকে বলার আগে আর একবার। আমি এটা করেনি ৩ বার। সে বিছানায় যাবে, কান্নাকাটি করবে, কিন্তু সে স্বীকার করবে না। সে এটার উপরে অটল থাকবে। এই ছেলেকে নিয়ে আমি কী করবো? এরপর মা বলেন, আমি জানি তুমিই এটা করেছ। আমি জানি তুমিই এটা করেছ। মা হয়তো আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে যান। সে হয়ে যায় আরও বেশি রক্ষণাত্মক। সবশেষে, মা নিজের চুল ছিঁড়তে থাকেন। জানি না এটার শেষ কোথায়? এবার বাবা অফিস থেকে ঘরে আসলে মার অভিযোগ! আমি জানি না একে নিয়ে কী করব! সে মিথ্যা বলেছে! এবার বাবা আবার নতুন করে শুরু করলেন। বাবা: তুমি মিথ্যা বলেছ? শিশু: না।

কিভাবে আমরা এই সমস্যার সমাধান করবো? আমাদেরকে ঐ পরিস্থিতিগুলো নিতে হবে এভাবে, কিছু কিছু সময় আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করবো, যদিও আমরা জানি তারা মিথ্যা বলছে। বলতে হবে, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। তুমি আমার সাথে মিথ্যা বলবে না। তুমি শেষবার কথা দিয়েছ যে, তুমি মিথ্যা বলবে না। তাই আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। ঠিক আছে। তোমার কোন সমস্যা নেই। তাকে এই মিথ্যা বলাতে ৩/৪ বার সুযোগ দিতে হবে। কল্পনা করি। কি ঘটতে পারে। শিশুরা স্বভাবগতভাবে খারাপ না। তাদের প্রকৃতিতেই রয়েছে সততা। তাই যখন তারা খারাপ কিছু করে এবং আমরা সেজন্য তাদেরকে শাস্তি দেই না, তখন তাদের সুযোগ হয় বিবেককে প্রশ্ন করার। যদি আমরা এর জন্য তাদেরকে শাস্তি দেই, তাদের বিবেক কাজ করার সুযোগ পায় না। কারণ তারা এর জন্য ইতিমধ্যেই শাস্তি পেয়ে গেছে। যখন তারা শাস্তি পেয়ে যায়, তখন তাদের অপরাধবোধ আর কাজ করে না। তারা খারাপ কিছু করেছে এবং তার জন্য তারা মূল্যও দিয়েছে। তখন তাদের বিবেকের আর কিছু করার থাকে না।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিস্কার হওয়া যেতে পারে। যেমন একটি শিশু তার ছোট বোনের গালে চড় দিয়েছে। আমরা বিষয়টা সামলানোর জন্য তাকে কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে তার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একটি উপযুক্ত সময় বেছে নিতে পারি। সবসময় এটা করার সুযোগ হয়তো পাবো না। এবং বলতে হবে, ঠিক আছে আমি তোমাকে বিশ্বাস করলাম, তুমি এটা করনি তোমার বোন ভুল করেছে, সে ভালভাবে মনে রাখতে পারে নি। তার গালের উপর যে লাল দাগ রয়েছে, সেটা হয়ত কোন ভাবে হয়েছে। ঠিক আছে, তোমার কোন সমস্যা নেই।

সময়ের ব্যবধানে এতে কি হবে আমরা কি তা জানি? এক সময় সে এসে মাকে বলবে, "আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই। আমি এটা করেছি... কান্না...।" তখন মায়ের উচিত হবে তাকে সান্তনা দেয়া, তাকে আদর করা। ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি এখনো তোমাকে ভাল জানি। এখানে মা আসলে কি করলেন, মা তাকে রক্ষণাত্মক মনোভাব থেকে সরিয়ে আনলেন। কিন্তু এটা করার জন্য দীর্ঘ সময়ের চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন হয়। প্রথমেই আমরা এটা করতে সমর্থ হবো না। এটা খুব কঠিন এ ধরনের বিষয় ক্ষমা করে দেয়া। বিশেষভাবে যখন তারা আরেকটা বাচ্চাকে আঘাত করে। যদি তারা অন্য বাচ্চার সাথে অন্যায় করে। তাহলে আমাদেরকে সেই বাচ্চাটাকে সান্তনা দিতে হবে। আমি তোমাকেও বিশ্বাস করি। আমি তোমার প্রতি রাগান্বিত নই। এবং আমি জানি যে তুমি কোন অন্যায় করনি।

কিন্তু তুমি খুশি হতে পারবে না যদি সে শাস্তি পায়। এটা আরেক বিষয়, এক বাচ্চা শাস্তি পেলে আরেক বাচ্চা খুশি হয়ে যায়। এবং তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে এভাবে বলে, বাবা অন্য দিন সে আমার কান টান দিয়েছে। এবং ছোট জন হয়তো কাছে এসে বললো বাবা, তুমি জানো আপি একদিন আমার কান টান দিয়েছে। বললাম, কখন? (শিশু) আমি জানি না, কোন এক গতকাল। আমি বললাম আমাকে তুমি কি করতে বল? তাকে শাস্তি দাও। আমি বললাম, এতে কি তুমি খুশি হবে? হ্যা...। কখনও কখনও শিশুরা কৌশল অবলম্বন করে যাতে অন্যজন শাস্তি পায়। তারা এটা করে। আমরা হয়তো এই পরিস্থিতিও তৈরী করতে চাই না। যদি এটা একদম ছোট বাচ্চা হয়, ২ বছরের তাহলে সমস্যা মনে হয় না। আমি হয়তো তাদের আনন্দ দিতে চাই। আমি হয়তো বড় জনকে ধরে এভাবে নিজের হাতে নিজে কয়েকবার আঘাত করি এবং বলি, বলো আও, সে তখন বলে আও, আও, আমি ব্যাথা পাই, আমি ব্যাথা পাই। এবং আমি ছোটজনের দিকে ফিরে বলি, তুমি এখন খুশি? হ্যাঁ...। এটা মজার।

কিন্তু বড় সন্তানের বেলায় একজন শাস্তি পেলে যদি অন্য জন খুশি হয় তাহলে এটা একটা সমস্যা। এটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেন তুমি খুশি এটা থেকে তুমি কি পেলে? এ বিষয়গুলো আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px