📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ

📄 মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ


সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ

মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেন :
“আর তোমরা আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কর।” (সূরা নিসা : ৩৬)

“আল্লাহ আমাকে মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর তিনি আমাকে অত্যাচারী ও হতভাগা করেননি।” (সূরা মারইয়াম : ৩২)

আল্লাহ বলেছেন:
“এবং তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অবশ্যই অন্যের ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে থাকবে। তাঁদের মধ্যে কোনো একজন অথবা উভয়েই যদি তোমাদের সামনে বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তাহলে তাঁদেরকে উহ্! শব্দ পর্যন্ত বলবে না এবং তাদেরকে ধমকের স্বরে অথবা গালি দিয়ে কোনো কথার জবাব দেবে না। বরং তাদের সাথে আদব ও সম্মানের সাথে কথা বলো এবং নরম ও বিনীতভাবে তাঁদের সামনে অবনত হয়ে থাক এবং তাঁদের জন্য এ ভাষায় দু'আ করতে থাক যেমন, হে আল্লাহ! তাঁদের উপর (এ অসহায় জীবনে) রহম করো। যেমন শিশুকালে (আমার সহায়হীন সময়ে) তাঁরা আমাকে রহমত ও অপত্যস্নেহ দিয়ে লালন-পালন করেছিলেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪)

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার আনুগত্য করা ওয়াজিব

📄 মা-বাবার আনুগত্য করা ওয়াজিব


আবু দারদা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন - রসূল আমাকে ৯টি বিষয়ে ওয়াসিয়ত করেছেন:

১) ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো ফরয সলাত ত্যাগ করবে না। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত ত্যাগ করল আল্লাহর কাছ থেকে সে জিম্মা মুক্ত হয়ে গেল।
২) কেটে টুকরো টুকরো করলে অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দিলেও আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না।
৩) কখনো মদ্যপান করবে না, কারণ মদ্য হল সকল অপকর্মের চাবিকাঠি।
৪) তোমার মা-বাবার আনুগত্য কর। যদি তারা তোমাকে তোমার দুনিয়ার (যাবতীয় কাজ) থেকে বের হয়ে যেতে বলে তবে তাদের নির্দেশ পালনার্থে তাই করবে।
৫) যদিও তুমি তোমাকে অনেক বড় মনে কর তবুও তুমি যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পলায়ন করো না।
৬) যদিও তুমি ধ্বংস হয়ে যাও তবুও তুমি যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পলায়ন করো না।
৭) তোমার পরিবার বর্গের উপর হতে (আদবের) লাঠি উঠিয়ে নিও না।
৮) তাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভয় দেখিও।
(সহীহ বুখারী)

মা-বাবার সেবা-যত্ন আনুগত্য করা এবং সব সময়ই তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব।

তবে মা-বাবা বার্ধক্যে উপনিত হলে তাঁরা সন্তানের সেবা-যত্নের প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন এবং সন্তানের দয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অপরদিকে বার্ধক্যের চাপে মানুষের মেজাজ রুক্ষ ও খিটখিটে হয়ে যায় এবং বিবেক-বুদ্ধিও কম বেশী লোপ পায়। ফলে তাঁরা অবুঝ শিশুর মতো দাবী দাওয়া পেশ করতে থাকে, যা পূরণ করা সন্তানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্য বিমুখতাও তাঁদের অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। পবিত্র কুরআন এসব অবস্থায় মা-বাবার সন্তুষ্টি ও তাঁদের সুখ-শান্তি বিধানের আদেশ দেয়ার সাথে সাথে সন্তানকে তার শৈশবকাল স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, আজ মা-বাবা যতটুকু তোমার মুখাপেক্ষী, এক সময় তুমি তাঁদের আর চাইতেও বেশী মুখাপেক্ষী ছিলে। তখন তাঁরা যেমন তাঁদের আরাম আয়েশ হারাম করে তোমার চাওয়া পাওয়া ও বাহানা পূরণ করেছিলেন, তোমার অবুঝ কথাবার্তাকে স্নেহ মমতার আবরণ দ্বারা ঢেকে দিয়েছিলেন, তেমনি তাঁদের মুখাপেক্ষিতা ও অসহায়ত্বের দুঃসময়ে তাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করে ঋণ পরিশোধ করা ও তাঁদের সেবা-যত্ন করা এবং তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা তোমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। আলোচ্য আয়াতসমূহে মা-বাবার বার্ধক্যে উপনীত হওয়া সম্পর্কিত কতিপয় আদেশ দান করা হয়েছে।

এক: তাঁদেরকে উহ-শব্দটিও বলা যাবে না। অর্থাৎ তাঁদের কথা শুনে সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ পায়, এমন ধরনের কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না। তাঁদের কথা যতই অযৌক্তিক ও কর্কশ হোক না কেন।

দুই: মা-বাবার মর্যাদার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কথা-বার্তা বলার সময় তাদের মান-সম্মানের প্রতি খেয়াল রেখে কথা বলতে হবে। তাঁদের অযৌক্তিক দাবী ও রুক্ষ মেযায হাসিমুখে সইতে হবে। কোন সময় বিরক্ত হয়ে এমন কোন কথা উচ্চারণ করা যাবে না, যাতে তাঁরা সামান্যতমও মনে কষ্ট পায় এবং যা তাঁদের মান-সম্মানের পরিপন্থী হয়।

তিন: এ আদেশে মা-বাবার সাথে কথা বলার আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের উভয়ের সাথে পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সাথে নত ও বিনম্র স্বরে কথা বলতে হবে।

চার: মা-বাবার সামনে নিজেকে নত ও বিনম্রভাবে পেশ করতে হবে। মা-বাবার প্রতি পূর্ণ আন্তরিকতা, মায়া-মমতা এবং ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে নিজেকে ছোট করে তাঁদের সামনে হাজির হতে হবে।

পাঁচ: মা-বাবার সন্তুষ্টি ও সুখ-শান্তি ষোল আনা নিশ্চিত করা মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার সাথে সাথে তাঁদের জন্য দু'আ করতে হবে, আল্লাহ যেন অনুগ্রহ করে তাঁদের সকল সমস্যা সমাধান করে দেন এবং তাঁদের সব ধরনের কষ্ট দূর করে দেন। সর্বশেষ আদেশ হচ্ছে, মা-বাবার মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য অব্যাহতভাবে দু'আ করে যেতে হবে।

সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন, তার নাক ধুলি মলিন হোক! তার নাক ধুলি মলিন হোক! তার নাক ধুলি মলিন হোক (অর্থাৎ সে ধ্বংস হোক) জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! কে সে? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি মা-বাবা উভয়কে অথবা তাঁদের কোন একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেলো অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। (সহীহ মুসলিম)

কা'ব ইবন 'উজরা বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: তোমরা মিম্বরের কাছে এসো জামায়েত হও। আমরা সকলে মিম্বরের কাছে এসে জামায়েত হলাম। তিনি মিম্বরের প্রথম ধাপে আরোহন করে বললেন: আমীন। দ্বিতীয় ধাপে আরোহন করে পুনরায় বললেন আমীন। তৃতীয় ধাপে আরোহন করে আবারো বললেন: আমীন। তিনি মিম্বার থেকে অবতরণ করার পর আমরা তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, আজ আমরা আপনার কাছ থেকে এমন কিছু কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। তিনি বললেন: জিবরাইল (এইমাত্র) আমাকে এসে বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমাদান মাস পেয়েছে, অথচ তার গুনাহ মাফ হয়নি। আমি বললাম আমীন (আল্লাহ কুবল করুন)। আমি দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করলে তিনি (জিবরাঈল) বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে দুরূদ পড়ল না। আমি বললাম : আমীন। আমি মিম্বারের তৃতীয় ধাপে আরোহন করলে জিবরাইল বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে মা-বাবা উভয়কে অথবা তাঁদের কোন একজনকে পেল, কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। আমি বললামঃ আমিন। (সহীহ মুসলিম)

ব্যাখ্যা: বৃদ্ধ বয়সে মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। শরীর ক্রমাগত শক্তিহীন, দুর্বল ও নিস্তেজ হতে থাকে। কর্মক্ষমতা ও আত্ম নির্ভরশীলতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি এক পর্যায়ে চলা-ফেরা করার ক্ষমতাও তাদের থাকে না। তখন দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব তাঁদেরকে গ্রাস করে ফেলে। ফলে তাঁরা পরনির্ভরশীল তথা সন্তান-সন্ততির উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অপর দিকে বার্ধক্যের চাপে ও চতুর্মুখী রোগ যাতনায় তাঁদের মেজায খিটখিটে, কথা-বার্তা কর্কশ, আচার-আচরণ রূঢ় হয়ে যায়। এ সময়টা হয় মানুষের জন্য চরম দুর্দিন। বান্দার এ অসহায় ও দুর্দিনে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি বিশেষ করুণার হাত প্রসারিত করেন এবং দয়া ও রহমতের দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে সন্তানের জন্য মা-বাবার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি হিসেবে পরিগণিত করা হয় এবং তাঁদেরকে সন্তানের জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ মা-বাবার এ কঠিন মুহূর্তে তাঁরা যে সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট হন আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য জান্নাত নির্ধারণ করে দেন।

পক্ষান্তরে যে সন্তান তার অস্তিত্ব, জন্ম, শৈশব ও কৈশোর জীবনে তার জন্য মা-বাবার এ চরম অসহায় অবস্থায় তাঁদের সেবা-যত্নে আত্মনিয়োগ করার পরিবর্তে তাঁদের অবাধ্য হয় এবং তাঁদের অবাধ্যতা করে ও তাঁদের মনে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হয়ে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে দেন।

বৃদ্ধ মা-বাবাকে বা তাদের কোন একজনকে পেয়েও যারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি তারা ধ্বংস হোক- রসূল -এর কাছে এ কথাটা জিবরাঈল বললেও এ কথাটা জিবরাঈল -এর নয় বরং এটা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্ত। জিবরাঈল হচ্ছেন বাণী বাহক মাত্র। আল্লাহ তা'আলার এ সিদ্ধান্তের প্রতি জিবরাঈল -এর পূর্ণ সমর্থন ছিল। রসূলুল্লাহ এ সিদ্ধান্ত কে বিনা বাক্যে গ্রহণ করেছেন। বরং তিনি এর সাথে পূর্ণ একাত্ম হয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্য আমীন বলে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছেন।

রসূলুল্লাহ উম্মাতের প্রতি অত্যন্ত উদার হৃদয়ের ছিলেন। উম্মতের শাস্তির কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। উম্মতের ইহকাল ও পরকালীন সুখ-শান্তি ও কল্যাণ সাধন করাই ছিল তাঁর নবুয়্যতী জীবনের মিশন। তা সত্ত্বেও মা-বাবার অবাধ্য এবং তাঁদের মনে কষ্ট দানকারী সন্তানের ধ্বংসের জন্য তিনি বদদু'আ করেছেন। কাজেই তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করে মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তাঁদের সেবা- যত্নে আত্মনিয়োগ করে তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জন করে। আর মা-বাবা মারা গেলে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর দরবারে নির্ভেজালভাবে তাওবা করে, মা-বাবার জন্য দু'আ ও দান-সদাকা করতে থাকে এবং মা-বাবার পক্ষের আত্মীয় স্বজনের সাথে ও মা-বাবার বন্ধু-মহলের সাথে সদ্ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে আশা করা যায় যে, তারা অনিবার্য ধ্বংস থেকে রেহাই পাবে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার

📄 মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার


আল্লাহ তা'আলা বলেন: আপনার প্রতিপালক ফায়সালা করে দিয়েছেন যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। (সূরা বানী ইসরাঈল: ২৩)

আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমি বনী ইসরাঈলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করবে না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। (সূরা আল-বাকারা : ৮৩)

তোমরা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করো, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো। (সূরা আন-নিসাঃ ৩৬)

তিনি অন্য এক আয়াতে বলেন: তোমার মা-বাবা যদি আমার সাথে এমন সব বিষয়কে শরীক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। (সূরা লুকমান : ১৫)

মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা নাবীগণের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তা'আলা বলেন: হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সাথে এই গ্রন্থ ধারণ করো আমি তাকে শৈশবেই বিচার বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে দয়ার্দ্রতা ও পবিত্রতা দান করেছি। সে ছিল পরহেজগার। মা-বাবার অনুগত এবং সে উদ্ধত অবাধ্য ছিলো না। (সূরা মারইয়াম : ১২-১৪)

ঈসা বলেন: তিনি (আল্লাহ) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সলাত কায়েম ও যাকাত আদায় করতে এবং মায়ের অনুগত থাকতে। (সূরা মারইয়াম : ৩১-৩২)

মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, আমি রসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল আল্লাহর নিকট সবচাইতে বেশি প্রিয়? রসূলুল্লাহ বললেন: সময় মতো সলাত আদায় করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন কাজ? তিনি বললেনঃ মা-বাবার সাথে সুন্দর আচারণ করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরপর? তিনি বললেন : আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। (সহীহ বুখারী)

মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহারের উপকারিতা
মা-বাবা আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। সন্তানের জন্ম ও তাদের লালন-পালনে আল্লাহর পরেই মা-বাবার অবদান সবচাইতে বেশী। মা-বাবার অবদান ও ইহসানের কৃতজ্ঞতা জানালে আল্লাহর ইহসানের কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। তাদের অকৃতজ্ঞতা আল্লাহর অকৃতজ্ঞতারই শামিল।

• মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করলে ঈমান পরিপূর্ণ হয় এবং ইসলামী জীবন যাত্রা সুন্দর হয়।
• মা-বাবার আনুগত্য করা উত্তম ইবাদত ও শ্রেষ্ঠ আনুগত্য।
• মা-বাবার সন্তুষ্টি জান্নাতের চাবিকাঠি। মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার জান্নাতের পথে ধাবিত করে। যাকে আল্লাহ মা-বাবার সেবা-যত্ন করার সৌভাগ্য দান করেছেন, প্রকৃতপক্ষে তাকে তিনি জান্নাতের পথে চলারই সুযোগ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ সৌভাগ্য অর্জন করেছে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
• মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করলে, তাঁদের সেবা-যত্ন করলে হায়াত বৃদ্ধি পাবে।
• মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করলে পরকালে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষের কাছে সে প্রশংসিত হবে।
• যে ব্যক্তি মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করে, তার সন্তানরাও তার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং তাকে মর্যাদা প্রদান করবে। মা-বাবার সাথে ভালো আচরণ করলে আল্লাহ তার সন্তানদেরকেও সেই শিক্ষাই দেবেন।
• মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করলে এবং তাদের সেবা-যত্ন করলে বিপদ মুসিবত দুর হয় ও দুশ্চিন্তা মুক্ত হওয়া যায়।
• যে ব্যক্তি মা-বাবার বন্ধুদের সাথে সদাচরণ করবে, তার নূর বিলুপ্ত করা হবে না।
• মা-বাবার সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টি। মা-বাবাকে সন্তুষ্ট করার কাজ করতে থাকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
• আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করা, হাজ্জ ও উমরাহ পালন করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যে ব্যক্তি মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করে, তাঁদের অধিকার আদায় করে এবং তাদের সেবা যত্ন করে, আল্লাহ তাকে কবুল হাজ্জ ও উমরাহর সমান সাওয়াব দান করেন।
• মা-বাবার সেবা-যত্ন করা যুদ্ধের সমতুল্য ইবাদত। ক্ষেত্র বিশেষে তার চাইতেও বড়। মা-বাবার খেদমতে নিয়েজিত থাকলে দ্বীন প্রতিষ্ঠাকারী মুজাহিদগণের মধ্যে গণ্য হওয়া যাবে এবং যুদ্ধের ময়দানে অংশ গ্রহণকারীদের সমতুল্য মর্যাদার অধিকারী হওয়া যাবে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার জন্য অর্থ ব্যয়

📄 মা-বাবার জন্য অর্থ ব্যয়


যেভাবে সন্তানের উপর মা-বাবার অধিকার রয়েছে তেমনিভাবে সন্তানের সম্পদের উপরও তাদের অধিকার রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

“হে নাবী লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, আমরা কি ব্যয় করবো? আপনি তাদেরকে বলে দিন, যে মালই তোমরা ব্যয় করো না কেন? তার প্রথম হকদার হলো তোমার মা-বাবা।” (সূরা আল বাকারা : ২১৫)

এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ -এর নিকট স্বীয় বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বললো, তিনি যখনই ইচ্ছা করেন আমার সম্পদ নিয়ে নেন। রসূলুল্লাহ তার বাবাকে ডাকলেন। লাঠি ভর করে এক দুর্বল বৃদ্ধ হাযির হলেন। তিনি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। বৃদ্ধলোকটি জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রসূল! এক সময় আমার এ ছেলে দুর্বল অসহায় ও কপর্দকহীন ছিল। আমি তখন ছিলাম শক্তিশালী ও বিত্তশালী। আমি কখনও তাকে আমার সম্পদ নিতে বাধা দেইনি। আজ আমি দুর্বল ও কপর্দকহীন, সে শক্তিশালী ও বিত্তশালী। এখন তার সম্পদ আমাকে দেয় না। একথা শুনে রসূলুল্লাহ বললেন: তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার বাবার। (ইবনু মাজাহ)

ছেলে ও তার উপার্জন তার বাবার জন্যই
ইবনু মাযাহ জাবির হতে এই মর্মে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল আমার সম্পদ ও সন্তানাদি আছে, আর আমার বাবা আমার সম্পদ বিনষ্ট (খরচ) করতে চায়। রসূলূল্লাহ বললেন: তুমি এবং তোমার সম্পদ (সবই) তোমার বাবার। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

ইবনু আবী শায়বাহ মায়ায ইবনু জাবাল হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সন্তানের উপর মা-বাবার কী হক? তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তোমার সমস্ত ধন সম্পদ যদি তাদেরকে দিয়েও দাও তবুও তাদের হক আদায় করতে পারবে না।

মা-বাবার প্রতিদান
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত. নাবী বলেছেন: কোন সন্তান বাবার স্নেহে-ভালবাসা, লালন-পালন এবং কষ্টের হক আদায় করতে বা তার বদলা দিতে সক্ষম নয়। তবে সে যদি তাঁকে কারো দাস রূপে পায়, অতঃপর তাঁকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেয়, তাহলে কিছু হক আদায় হয়। (সহীহ মুসলিম)

মা-বাবার অবাধ্যতা
"তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন, তোমরা তাঁদের ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলবে না এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে না। বরং তাদের সাথে সম্মান ও শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলবে এবং বিনয় ও নম্রতাসহকারে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে। আর এ দু'আ করতে থাকবে : হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪)

আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকরা থেকে বর্ণিত. তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে সবচাইতে বড় কবীরা (জঘন্যতম) গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করবো না. একথা তিনি তিন বার বললেন. সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কেন নয়, অবশ্যই করবেন, হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা, মা-বাবার অবাধ্যতা করা. তিনি হেলান দিয়ে বসা ছিলেন, অতঃপর সোজা হয়ে বসে বলতে লাগলেন, (খুব ভালো করে শোন!) মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া. তিনি বারবার একথা বলতে থাকনে. অবশেষে আমরা (মনে মনে) বললাম, হায়! তিনি যদি চুপ হয়ে যেতেন. (সহীহ বুখারী)

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস বলেন, নাবী বলেছেন: কবীরা গুনাহসমূহ হচ্ছে, ১. আল্লাহর সাথে শরীক করা ২. মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, ৩. মানুষ হত্যা করা ও ৪. মিথ্যা শপথ করা. (সহীহ বুখারী)

মা-বাবাকে গালি দেয়া কবীরা গুনাহ
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: কোন ব্যক্তির নিজের মা-বাবাকে গালি দেয়া অন্যতম কবীরা গুনাহ. সাহাবীগণ বললেন, কোন লোক কি নিজের মা-বাবাকে গালি দেয়? তিনি বললেন: হ্যাঁ দেয়. কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির বাবাকে গালি দেয়, প্রত্যুত্তরে সেও তার বাবাকে গালি দেয়. অনুরূপভাবে সে অপর কোন ব্যক্তির মাকে গালি দেয়, এর উত্তরে সেও তার (গালি দাতার) মাকে গালি দেয়. (সহীহ বুখারী)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: জঘন্যতম কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কোন ব্যক্তির নিজের মা-বাবাকে লা'নত করা. বলা হলো, হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তি কিভাবে তার মা-বাবাকে লা'নত করতে পারে? তিনি বললেন: কোন ব্যক্তি অন্যের বাবাকে গালি দেয়, প্রত্যুত্তরে সেও তার বাবাকে গালি দেয়. অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি অন্যের মাকে গালি দেয়, এর উত্তরে সেও তার মাকে গালি দেয়. (সহীহ মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, নাবী বলেছেন: যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে পশু জবাই করে, যে ব্যক্তি জমির সীমানা বদলে দেয় এবং যে ব্যক্তি নিজের মা-বাবাকে গালি দেয়, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি লা'নত (অভিসম্পাত) করেন. (সহীহ বুখারী)

যে বাবাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর অভিশাপ
সাহাবী আবু তুফায়েল আমির ইবন ওয়াসিলা বলেন, আমি আলী এর নিকট ছিলাম. তখন জনৈক ব্যক্তি এসে তাঁকে বলল, রসূলুল্লাহ কি আপনাকে এমন কোন কথা বলেছেন, যা অন্য কাউকে বলেননি? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, রসূলুল্লাহ আমাকে এমন কোন কথা বলেননি, যা তিনি অন্যকে বলেননি. তবে তিনি আমার নিকট চারটি বিষয় বর্ণনা করেছেন. বর্ণনাকারী বলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! সে চারটি বিষয় কী? তিনি বলেন: তিনি (রসূলুল্লাহ) বলেছেন: যে ব্যক্তি বাবাকে অভিশাপ দেয়, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অভিসম্পাত করেন. যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে পশু জবাই করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অভিসম্পাত করেন. যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করে এবং যে ব্যক্তি জমির সীমানা বদলে দেয়, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অভিসম্পাত করেন. (সহীহ মুসলিম)

অবাধ্য সন্তান জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ বলেছেন: তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না. ১. মা-বাবাকে কষ্টদানকারী অবাধ্য সন্তান. ২. পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও ৩. দাইয়্যুস. আর তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না. ১. মা-বাবার অবাধ্য সন্তান. ২. মদপানে আসক্ত ব্যক্তি ও ৩. দান করে খোঁটাদানকারী. (না'সাঈ)

মা-বাবার অধিকার আদায় করা ও না করার পরিণাম
আব্দুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত. তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন, মা-বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে. (তিরমিযী)

আবূ উমামা থেকে বর্ণিত. জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রসূলুল্লাহ! সন্তানের উপর মা-বাবার কি অধিকার আছে? তিনি বলেন: তাঁরা উভয়ে তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম. (ইবনু মাজাহ)

মায়ের সাথে অবাধ্যতা
সাহাবী মুগীরা ইবনে শোবা রা. থেকে বর্ণিত, নাবী বলেছেন: আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর মায়ের অবাধ্যতা, কন্যা শিশুকে জীবিত কবর দেয়া, কৃপণতা করা ও ভিক্ষা বৃত্তি হারাম করে দিয়েছেন. আর বৃথা তর্ক-বিতর্ক, অধিক জিজ্ঞাসা সম্পদ নষ্ট করাকে তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন. (সহীহ বুখারী)

মা-বাবার অবাধ্যতার অপকারিতা
• মা-বাবা আল্লাহর বড় নিয়ামত. অবাধ্য সন্তান আল্লাহর নিয়ামতের অস্বীকার করে. ফলে সে মা-বাবার অনুগ্রহকেও অস্বীকার করে.
• মা-বাবার সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টি. তাদের অসন্তুষ্টি আল্লাহর অসন্তুষ্টি. মা- বাবার অবাধ্য সন্তান আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে দূর হয়ে যায়.
• মা-বাবার অবাধ্যতা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে. যে ব্যক্তি মা-বাবার সাথে অসদাচরণ করে তার সন্তান, তার প্রতিবেশী ও তার সমাজের লোকেরাও তার সাথে অসদাচরণ করবে.
• মা-বাবার অবাধ্যতার কারণে সমাজ থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা দূরীভূত হয়.
• অবাধ্য সন্তান, মা-বাবার অবাধ্যতার প্রতিফল দুনিয়াতেও পাবে.
• মা-বাবার অবাধ্যতার কারণে চেহারার লাবণ্যতা ও নূর দূরীভূত হয়.
• অবাধ্য সন্তান কিয়ামতের দিন আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে.

মা-বাবার দু'আ কবুল হয়
সাহাবী আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত. তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন, তিন ব্যক্তির দু'আ কবুল হয়. এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই. এক : মাজলুমের দু'আ, দুই: মুসাফিরের দু'আ, তিন: সন্তানের বেলায় মা-বাবার দু'আ. (তিরমিযী)

ফন্ট সাইজ
15px
17px