📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা দিবস ও বাবা দিবস

📄 মা দিবস ও বাবা দিবস


পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও মা দিবস ও বাবা দিবস চালু হয়েছে। এর ভাল দিকও রয়েছে যেমন এই দিনগুলোতে মা এবং বাবার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে নানা রকম সেমিনার এবং পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, এতে আমাদের সন্তানরা অনেক কিছু জানতে পারে। তবে এই বিষয়ে আমাদেরকে একটু সতর্ক থাকতে হবে। তারা যেন মা দিবস এবং বাবা দিবসে অভ্যস্ত হয়ে না যায়, এই কালচার যেন তাদের রক্তে প্রবেশ করতে না পারে।

আমরা জানি পাশ্চাত্যে ছেলেমেয়েরা ১৮ বছর হলেই মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যায় এবং তারা পরবর্তী জীবনে একাকীই বড় হতে থাকে। একসময় মা-বাবার প্রতি তাদের আর টান থাকে না এবং তারা আর মা-বাবার কোন দায়িত্বও পালন করে না। দায়িত্ব পালন করাতো দূরের কথা অনেক সময় মা-বাবা জানেই না ছেলেমেয়েরা কোন দেশে বা কোন শহরে থাকে! তাই পাশ্চাত্য সমাজ দু'টি দিন নির্দিষ্ট করে নিয়েছে মা-বাবাকে স্মরণ করার জন্যে। একদিন বাবার জন্যে এবং অন্য আর একটি দিন মায়ের জন্যে। বছরের এই দিনটি আসলে ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে স্মরণ করে গ্রিটিংস কার্ড পাঠায়, গিফ্ট পাঠায়, ফুল পাঠায়, চকলেট/ক্যান্ডি পাঠায়। তারপর আবার একবছর কোন খোঁজ খবর রাখে না। কিন্তু ইসলাম তার উল্টো। মা-বাবার সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাদের সন্তানদের উপর। সন্তানরা যদি এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। ইসলামে প্রতিদিনই অর্থাৎ বছরের ৩৬৫ দিনই মা দিবস এবং বাবা দিবস।

একটি সত্য ঘটনা
টরন্টোতে বসবাসরত এক ভাইয়ের অভিজ্ঞতা। তিনি বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলেন তার পাশের সিটে এক ক্যানাডিয়ান বৃদ্ধা মহিলা বসা ছিলেন। কিছু দূর যেতে যেতে কোন এক বাস স্টপ থেকে একটি যুবক ঐ একই বাসে উঠল, উঠে ঐ মহিলাকে দেখে বলল "হায় মম”। তারপর কিছু দূর যাওয়ার পর ঐ ছেলেটা আবার কোন একটা বাস স্টপে নেমে গেল। এবার ঐ ভদ্রলোক তার পাশের সিটের মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন 'ছেলেটা কে?' মহিলা বললেন এটা তারই ছেলে এবং এই শহরেই কোথাও থাকে, সে ঠিক জানে না। মহিলার ছেলে তাকে "হায় মম" বলেছে তাতেই মা বেজায় খুশি। এই মা তার ছেলের কাছে এর চেয়ে আর বেশি কিছু আশা করে না। কারণ এটাই এখানকার কালচার। Mother's Day-তে হয়তো ছেলে greetings card পাঠাবে এতেই মা খুশি। কারণ কালচার অনুযায়ীই সেও হয়তো তার মা-বাবাকে এভাবেই স্মরণ করেছে। উপরের এই ক্যানাডিয়ান ঘটনায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের বাংলাদেশেও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে এর চেয়েও জঘন্যতম ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের ছেলেমেয়েরা আর তা পত্র-পত্রিকা খুললেই দেখা যায়। বাংলাদেশেও এখন অনেক বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইউটিউবে এর করুণ চিত্র রয়েছে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মায়ের অধিকার

📄 মায়ের অধিকার


আমাদের বেশীরভাগ ছেলেমেয়েরাই জানে না কুরআন-হাদীসের আলোকে মা- বাবার গুরুত্ব। সর্বপ্রথমে বলতে হয় যে এখানে ছেলেমেয়েদের তেমন একটা দোষ নেই। কারণ মা-বাবারাই তাদেরকে এই বিষয়ে সময় থাকতে শিক্ষা দেয় না। প্রতিটি ছেলেমেয়ের জন্য বিষয়টি এতো গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ভর করে মা-বাবার সন্তুষ্টির উপর। এই চ্যাপ্টারে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দেখবো যে মা-বাবাকে কীভাবে গুরুত্ব দিতে হয়। দেখবো আল্লাহ এবং তাঁর রসূল কীভাবে মা-বাবাকে সম্মান দিয়েছেন।

মায়ের অধিকার বাবার থেকে তিনগুণ বেশী
এক ব্যক্তি রসূল -এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রসূল! আমার সুন্দর আচরণের সবচেয়ে বেশী হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করলো, অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞেস করলো, অতঃপর কে? নাবী কারীম বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

এই হাদীসে আমরা দেখলাম যে বাবার চেয়ে মায়ের গুরুত্ব তিনগুণ বেশী। এর কারণ সূরা লুকমান এবং সূরা আহকাফে বলা হয়েছে। মা এমন তিনটি কাজ করেন যা বাবা করেন না আর তা হচ্ছে- ১) নয়-দশ মাস গর্ভধারণ করা, ২) সন্তান প্রসব করা ৩) দুই বৎসর দুধ পান করানো। মা সন্তানের জন্য যে পরিমান কষ্ট করেন তা বাবা করেন না। তাই ইসলামে মাকে এতো বেশী সম্মান দেয়া হয়েছে। সন্তানের ক্ষেত্রে মায়ের গুরুত্ব এবং সম্মান যেমন বেশী তেমনি তার সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যও বেশী। সন্তানের শিশুকালটি সাধারণত ঘরেই কাটে আর তার লালন-পালন এবং শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে মা-ই বেশী ভূমিকা রেখে থাকেন। তবে আজকাল বাবারাও এই বয়সে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমি মানুষকে মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণের তাগিদ দিয়েছি। তার মা অনেক কষ্টে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং বহু কষ্ট করে ভূমিষ্ট করেছে। গর্ভে ধারণ করা ও দুধ পান করানোর (কঠিন কাজের) সময়কাল হলো আড়াই বছর। (সূরা আল-আহকাফ: ১৫)

তিনি আরো বলেন: আমি মানুষকে তার মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট স্বীকার করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর দুধ ছাড়ানো হয় দু'বছরের মধ্যে। এ নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (সূরা লুকমান: ১৪)

বাহ্য ইবন হাকিম তাঁর বাবার সূত্রে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রসূলুল্লাহ! আমি কার সাথে সবচাইতে বেশী ভালো ব্যবহার করব? তিনি বললেন: তোমার মায়ের সাথে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কার সাথে? তিনি বললেন: তোমার মায়ের সাথে। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন: তারপর কার সাথে? এবারও তিনি বললেন: তোমার মায়ের সাথে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কার সাথে? তিনি বললেন : তোমার বাবার সাথে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নিকটতম আত্মীয়- স্বজনের সাথে। (ইবন মাজাহ)

মিকদাম ইবন মা'দিকারাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন; রসূলুল্লাহ বলেছেন: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মায়েদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ তাদের সাথে সদাচরণ করার আদেশ দিচ্ছেন। একথা তিনি তিনবার বললেন। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বাবাদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ পর্যায়ক্রমে নিকটবর্তীদের সম্পর্কে তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন [সদাচারের]। (সহীহ মুসলিম)

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ

📄 মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ


সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে মা-বাবার সাথে ভাল আচরণে তাদের কী লাভ

মহান আল্লাহ আল কুরআনে বলেন :
“আর তোমরা আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কর।” (সূরা নিসা : ৩৬)

“আল্লাহ আমাকে মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর তিনি আমাকে অত্যাচারী ও হতভাগা করেননি।” (সূরা মারইয়াম : ৩২)

আল্লাহ বলেছেন:
“এবং তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অবশ্যই অন্যের ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে থাকবে। তাঁদের মধ্যে কোনো একজন অথবা উভয়েই যদি তোমাদের সামনে বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তাহলে তাঁদেরকে উহ্! শব্দ পর্যন্ত বলবে না এবং তাদেরকে ধমকের স্বরে অথবা গালি দিয়ে কোনো কথার জবাব দেবে না। বরং তাদের সাথে আদব ও সম্মানের সাথে কথা বলো এবং নরম ও বিনীতভাবে তাঁদের সামনে অবনত হয়ে থাক এবং তাঁদের জন্য এ ভাষায় দু'আ করতে থাক যেমন, হে আল্লাহ! তাঁদের উপর (এ অসহায় জীবনে) রহম করো। যেমন শিশুকালে (আমার সহায়হীন সময়ে) তাঁরা আমাকে রহমত ও অপত্যস্নেহ দিয়ে লালন-পালন করেছিলেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-২৪)

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 মা-বাবার আনুগত্য করা ওয়াজিব

📄 মা-বাবার আনুগত্য করা ওয়াজিব


আবু দারদা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন - রসূল আমাকে ৯টি বিষয়ে ওয়াসিয়ত করেছেন:

১) ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো ফরয সলাত ত্যাগ করবে না। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত ত্যাগ করল আল্লাহর কাছ থেকে সে জিম্মা মুক্ত হয়ে গেল।
২) কেটে টুকরো টুকরো করলে অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দিলেও আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না।
৩) কখনো মদ্যপান করবে না, কারণ মদ্য হল সকল অপকর্মের চাবিকাঠি।
৪) তোমার মা-বাবার আনুগত্য কর। যদি তারা তোমাকে তোমার দুনিয়ার (যাবতীয় কাজ) থেকে বের হয়ে যেতে বলে তবে তাদের নির্দেশ পালনার্থে তাই করবে।
৫) যদিও তুমি তোমাকে অনেক বড় মনে কর তবুও তুমি যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পলায়ন করো না।
৬) যদিও তুমি ধ্বংস হয়ে যাও তবুও তুমি যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পলায়ন করো না।
৭) তোমার পরিবার বর্গের উপর হতে (আদবের) লাঠি উঠিয়ে নিও না।
৮) তাদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভয় দেখিও।
(সহীহ বুখারী)

মা-বাবার সেবা-যত্ন আনুগত্য করা এবং সব সময়ই তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব।

তবে মা-বাবা বার্ধক্যে উপনিত হলে তাঁরা সন্তানের সেবা-যত্নের প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন এবং সন্তানের দয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অপরদিকে বার্ধক্যের চাপে মানুষের মেজাজ রুক্ষ ও খিটখিটে হয়ে যায় এবং বিবেক-বুদ্ধিও কম বেশী লোপ পায়। ফলে তাঁরা অবুঝ শিশুর মতো দাবী দাওয়া পেশ করতে থাকে, যা পূরণ করা সন্তানের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্য বিমুখতাও তাঁদের অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। পবিত্র কুরআন এসব অবস্থায় মা-বাবার সন্তুষ্টি ও তাঁদের সুখ-শান্তি বিধানের আদেশ দেয়ার সাথে সাথে সন্তানকে তার শৈশবকাল স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, আজ মা-বাবা যতটুকু তোমার মুখাপেক্ষী, এক সময় তুমি তাঁদের আর চাইতেও বেশী মুখাপেক্ষী ছিলে। তখন তাঁরা যেমন তাঁদের আরাম আয়েশ হারাম করে তোমার চাওয়া পাওয়া ও বাহানা পূরণ করেছিলেন, তোমার অবুঝ কথাবার্তাকে স্নেহ মমতার আবরণ দ্বারা ঢেকে দিয়েছিলেন, তেমনি তাঁদের মুখাপেক্ষিতা ও অসহায়ত্বের দুঃসময়ে তাঁদের অবদানের কথা স্মরণ করে ঋণ পরিশোধ করা ও তাঁদের সেবা-যত্ন করা এবং তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করা তোমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। আলোচ্য আয়াতসমূহে মা-বাবার বার্ধক্যে উপনীত হওয়া সম্পর্কিত কতিপয় আদেশ দান করা হয়েছে।

এক: তাঁদেরকে উহ-শব্দটিও বলা যাবে না। অর্থাৎ তাঁদের কথা শুনে সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ পায়, এমন ধরনের কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না। তাঁদের কথা যতই অযৌক্তিক ও কর্কশ হোক না কেন।

দুই: মা-বাবার মর্যাদার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কথা-বার্তা বলার সময় তাদের মান-সম্মানের প্রতি খেয়াল রেখে কথা বলতে হবে। তাঁদের অযৌক্তিক দাবী ও রুক্ষ মেযায হাসিমুখে সইতে হবে। কোন সময় বিরক্ত হয়ে এমন কোন কথা উচ্চারণ করা যাবে না, যাতে তাঁরা সামান্যতমও মনে কষ্ট পায় এবং যা তাঁদের মান-সম্মানের পরিপন্থী হয়।

তিন: এ আদেশে মা-বাবার সাথে কথা বলার আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের উভয়ের সাথে পরম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সাথে নত ও বিনম্র স্বরে কথা বলতে হবে।

চার: মা-বাবার সামনে নিজেকে নত ও বিনম্রভাবে পেশ করতে হবে। মা-বাবার প্রতি পূর্ণ আন্তরিকতা, মায়া-মমতা এবং ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে নিজেকে ছোট করে তাঁদের সামনে হাজির হতে হবে।

পাঁচ: মা-বাবার সন্তুষ্টি ও সুখ-শান্তি ষোল আনা নিশ্চিত করা মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার সাথে সাথে তাঁদের জন্য দু'আ করতে হবে, আল্লাহ যেন অনুগ্রহ করে তাঁদের সকল সমস্যা সমাধান করে দেন এবং তাঁদের সব ধরনের কষ্ট দূর করে দেন। সর্বশেষ আদেশ হচ্ছে, মা-বাবার মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য অব্যাহতভাবে দু'আ করে যেতে হবে।

সাহাবী আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন, তার নাক ধুলি মলিন হোক! তার নাক ধুলি মলিন হোক! তার নাক ধুলি মলিন হোক (অর্থাৎ সে ধ্বংস হোক) জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! কে সে? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি মা-বাবা উভয়কে অথবা তাঁদের কোন একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেলো অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। (সহীহ মুসলিম)

কা'ব ইবন 'উজরা বলেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: তোমরা মিম্বরের কাছে এসো জামায়েত হও। আমরা সকলে মিম্বরের কাছে এসে জামায়েত হলাম। তিনি মিম্বরের প্রথম ধাপে আরোহন করে বললেন: আমীন। দ্বিতীয় ধাপে আরোহন করে পুনরায় বললেন আমীন। তৃতীয় ধাপে আরোহন করে আবারো বললেন: আমীন। তিনি মিম্বার থেকে অবতরণ করার পর আমরা তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, আজ আমরা আপনার কাছ থেকে এমন কিছু কথা শুনেছি যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। তিনি বললেন: জিবরাইল (এইমাত্র) আমাকে এসে বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমাদান মাস পেয়েছে, অথচ তার গুনাহ মাফ হয়নি। আমি বললাম আমীন (আল্লাহ কুবল করুন)। আমি দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করলে তিনি (জিবরাঈল) বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে দুরূদ পড়ল না। আমি বললাম : আমীন। আমি মিম্বারের তৃতীয় ধাপে আরোহন করলে জিবরাইল বললেন: সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে মা-বাবা উভয়কে অথবা তাঁদের কোন একজনকে পেল, কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। আমি বললামঃ আমিন। (সহীহ মুসলিম)

ব্যাখ্যা: বৃদ্ধ বয়সে মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। শরীর ক্রমাগত শক্তিহীন, দুর্বল ও নিস্তেজ হতে থাকে। কর্মক্ষমতা ও আত্ম নির্ভরশীলতা হারিয়ে ফেলে। এমনকি এক পর্যায়ে চলা-ফেরা করার ক্ষমতাও তাদের থাকে না। তখন দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব তাঁদেরকে গ্রাস করে ফেলে। ফলে তাঁরা পরনির্ভরশীল তথা সন্তান-সন্ততির উপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অপর দিকে বার্ধক্যের চাপে ও চতুর্মুখী রোগ যাতনায় তাঁদের মেজায খিটখিটে, কথা-বার্তা কর্কশ, আচার-আচরণ রূঢ় হয়ে যায়। এ সময়টা হয় মানুষের জন্য চরম দুর্দিন। বান্দার এ অসহায় ও দুর্দিনে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি বিশেষ করুণার হাত প্রসারিত করেন এবং দয়া ও রহমতের দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে সন্তানের জন্য মা-বাবার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি হিসেবে পরিগণিত করা হয় এবং তাঁদেরকে সন্তানের জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ মা-বাবার এ কঠিন মুহূর্তে তাঁরা যে সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট হন আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য জান্নাত নির্ধারণ করে দেন।

পক্ষান্তরে যে সন্তান তার অস্তিত্ব, জন্ম, শৈশব ও কৈশোর জীবনে তার জন্য মা-বাবার এ চরম অসহায় অবস্থায় তাঁদের সেবা-যত্নে আত্মনিয়োগ করার পরিবর্তে তাঁদের অবাধ্য হয় এবং তাঁদের অবাধ্যতা করে ও তাঁদের মনে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও রাগান্বিত হয়ে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে দেন।

বৃদ্ধ মা-বাবাকে বা তাদের কোন একজনকে পেয়েও যারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি তারা ধ্বংস হোক- রসূল -এর কাছে এ কথাটা জিবরাঈল বললেও এ কথাটা জিবরাঈল -এর নয় বরং এটা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্ত। জিবরাঈল হচ্ছেন বাণী বাহক মাত্র। আল্লাহ তা'আলার এ সিদ্ধান্তের প্রতি জিবরাঈল -এর পূর্ণ সমর্থন ছিল। রসূলুল্লাহ এ সিদ্ধান্ত কে বিনা বাক্যে গ্রহণ করেছেন। বরং তিনি এর সাথে পূর্ণ একাত্ম হয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্য আমীন বলে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছেন।

রসূলুল্লাহ উম্মাতের প্রতি অত্যন্ত উদার হৃদয়ের ছিলেন। উম্মতের শাস্তির কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। উম্মতের ইহকাল ও পরকালীন সুখ-শান্তি ও কল্যাণ সাধন করাই ছিল তাঁর নবুয়্যতী জীবনের মিশন। তা সত্ত্বেও মা-বাবার অবাধ্য এবং তাঁদের মনে কষ্ট দানকারী সন্তানের ধ্বংসের জন্য তিনি বদদু'আ করেছেন। কাজেই তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করে মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তাঁদের সেবা- যত্নে আত্মনিয়োগ করে তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জন করে। আর মা-বাবা মারা গেলে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর দরবারে নির্ভেজালভাবে তাওবা করে, মা-বাবার জন্য দু'আ ও দান-সদাকা করতে থাকে এবং মা-বাবার পক্ষের আত্মীয় স্বজনের সাথে ও মা-বাবার বন্ধু-মহলের সাথে সদ্ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে আশা করা যায় যে, তারা অনিবার্য ধ্বংস থেকে রেহাই পাবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px