📄 সন্তানদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি দৃষ্টি রাখা
আমাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পড়ুয়া বন্ধু-বান্ধবদের দিকে দৃষ্টি রাখার আগে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি শিক্ষা দেয়া উচিত। তাদের বন্ধুরা হয় তাদের চাইতে ছাত্র হিসেবে ভাল হবে অথবা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে উন্নত হবে। সন্তানগণ যদি এ নীতিতে একমত হয় তাহলে মা-বাবাদের মাথাব্যথা কিছুটা কমে যাবে বৈকি! একটি বাস্তবতা মা-বাবাদের স্মরণ রাখতে হবে যে সন্তানগণ সবসময় তাদের বন্ধুদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দিতে চেষ্টা করে। এমনকি তারা মা-বাবার চাইতে বন্ধুকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। তারা সবসময় বন্ধুদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। ক্ষেত্রবিশেষে বখাটে বন্ধুদের পক্ষ হয়ে সন্তানগণ মা-বাবার নির্দেশ ও উপদেশ অমান্য করে।
কিছু বিষয় আছে যে সম্পর্কে আমাকে অতিরিক্ত সতর্ক হতে হবে। আমার যাবতীয় প্রচেষ্টার পরও যদি সন্তান ঠিক না হয় তাহলে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে দু'আ করে যেতে হবে। তবে চেষ্টা ছাড়া যাবে না, চালিয়ে যাতে হবে। কিন্তু চেষ্টা-তদবীর করে যাওয়া আমার উপর অবশ্যকরণীয়। সন্তানদের বন্ধুরা যেন মাঝে মাঝে বাসায় আসতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। বন্ধুদের বাসায় আসার দরজা যদি বন্ধ করি তা হলে আমার সন্তান বিকল্প পথ খুঁজে একেবারে অন্ধকারে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ আমি কিছুই জানবো না সে কি ধরনের বন্ধুদের সাথে চলে, বন্ধুরা মিলে কি ধরনের তৎপরতা চালায় ইত্যাদি।
📄 আমার সন্তান যেন আমাকে বন্ধু ভাবে
আমার সন্তান যেন আমাকে বন্ধু ভাবে সে ধরনের পরিবেশ তৈরী করতে হবে। ফলে সে কী করে না করে সবই আমি জানতে পারবো। আল্লাহ না করুন, সে কোন নেশা জাতীয় মাদক সেবন করে কিনা, বা সে ধরনের কোন গ্রুপের সংস্পর্শে চলে যায় কিনা তা কৌশলে খেয়াল রাখতে হবে। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে সন্তানদের সাথে নিয়ে ইসলামিক ভিডিও দেখা যেতে পারে। এখন কোয়ালিটি সম্পন্ন ইসলামিক ডিভিডি আমেরিকা, ব্রিটেন আর ক্যানাডায় তৈরী হয়। এখানে ইসলামী বিশেষজ্ঞরা দিনরাত পরিশ্রম করে বিভিন্ন প্রকাশনা বাজারে ছাড়ছে। ব্যাপক হারে পাশ্চাত্য দেশের গুণীজন ইসলাম গ্রহণ করছেন। এটা গোটা মুসলিম জাতির জন্য শিক্ষার বিষয়।
📄 সন্তানের ধুমপানের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা
সাধারণত হাইস্কুল থেকেই ছেলেমেয়েরা ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই টিনএইজারদের ধূমপানের আর একটা কারণ তারা খুব তাড়াতাড়ি নিজেদেরকে বড়দের মতো ম্যাচিউর ভাবতে থাকে। এটা প্রধানতঃ ঘটে স্কুলের/ক্লাসের ধূমপায়ী সংগী-সাথীদের কুপ্রভাবে। যেসব পরিবারে মা-বাবা, বড় ভাইবোন, নিকটাত্মীয়রা ধূমপান করে, সেই সব পরিবারের ছেলেমেয়েরা অতি সহজেই ধূমপান শুরু করে। তবে অধুমপায়ী পরিবারের সন্তানও ধুমপান শুরু করতে পারে। শুরু হয় সস্তা সিগারেট দিয়ে, কিন্তু বয়স বাড়ার সংগে সংগে আরো বেশী নেশাযুক্ত টোব্যাকো, ড্রান্স, মারিজুয়ানা ইত্যাদিতে অভ্যস্থ্য হয়ে পড়ে। সেই অভ্যাস আর ছাড়া যায় না। রিসার্চ করে দেখা গেছে যে ধূমপায়ীদের ৭৭% চেষ্টা করেও সেই আসক্তির কবল থেকে মুক্তি পায় না।
ইসলাম ধর্ম যেমন মদ খাওয়া হারাম করেছ, ঠিক তেমনি যে কোন নেশার দ্রব্য খাওয়া বা পান করাও হারাম করেছে- এমনকি যদি অতি অল্প পরিমাণও হয়। আল্লাহ ও তাঁর রসূল মুহাম্মাদ ﷺ -এর আদেশ অমান্য করে কোন মুসলিম (নারী অথবা পুরুষ) যদি হারাম কাজে লিপ্ত হয়, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে, কঠিন শাস্তি পাবে, একথা কুরআন ও হাদীস বারবার জোর দিয়ে বলেছে। সুতরাং মুসলিমদের সাবধান হওয়া উচিত।
সিগারেট তৈরী করতে চার হাজার অধিক কেমিক্যাল্ল্স প্রয়োজন হয়। রিসার্চের ফলে জানা গেছে যে সেগুলোর মাঝে ৪০টিও অধিকসংখ্যক কেমিক্যাস্ ক্যান্সার রোগটি সৃষ্টি করে।
Smokeless Tobacco নামে এক ধরনের সিগারেট বাজারে পাওয়া যায়, লোকেরা তা কিনে খায়। রিসার্চের ফলে জানা গেছে যে smokeless Tobacco তৈরী করতে যেসব কেমিক্যাল্ল্স ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর মাঝে অন্ততঃ ২৮টি মানুষের দেহে Cancer রোগটির সৃষ্টি করে।
ধূমপানের অপকারিতা
১) হারাম বস্তু খাওয়া হয় এবং ফলে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশের অবাধ্যতা করা হয়। এতে আখিরাতে জাহান্নামী হওয়ার আশংকা রয়েছে যদি না আল্লাহ দয়া করে মাফ করেন।
২) অযথা অর্থের অপচয় যাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ইস্রাফ (অপব্যয়) যা আল্লাহ মু'মিনদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।
৩) গায়ে, মুখে, হাতে, পোশাকে দুর্গন্ধ জন্মে। নিজেদের রুমে, বইপত্রে, ব্যাকপ্যাকে দুর্গন্ধ জন্মে। কথা বললে শ্রোতা মুখের দুর্গন্ধ পেয়ে বিরক্ত হয়। সমস্ত পরিবেশটাই দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ে।
৪) এমন দুর্গন্ধ গায়ে নিয়ে সলাত ও অন্যান্য ইবাদত আল্লাহ কতটুকু কবুল করবেন তা জানা নেই।
৫) সিগারেটের আগুনে অনেক সময় জামা-কাপড় পুড়ে যায়, এমন কি ঘরে আগুনও ধরে যেতে পারে।
৬) ধূমপায়ীরা অধূমপায়ীদের তুলনায় ১০ বছর কম বাঁচে।
৭) ধূমপায়ীদের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ নারী-পুরুষ ক্যান্সার, হার্ট ডিজিজে মারা যায়। এর বাইরে আরো অন্ততঃ দুই ডজন রোগের জন্ম দেয় এই ধূমপান- লাং ক্যান্সার, হার্ট এটাক, হাই ব্লাড প্রেশার, ব্রংকাইটিস, আলসার ইত্যাদির কারণ এই স্মোকিং।
৮) অপারেশন করার পর ইনফেকশন হওয়ার অধিক আশংকা থাকে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে।
৯) বাচ্চাদের এজমা রোগটা সৃষ্টি হয় (দ্বিগুণ পরিমাণ)- যদি ওদের মা- বাবা ধূমপায়ী হয়।
মাঝেমধ্যে দেখতে হবে তার জামা-কাপড় দিয়ে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যায় কিনা, বা রুমে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যায় কিনা বা তার হাত মুখ দিয়ে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যায় কিনা। ছেলের সার্ট-প্যান্ট ধোয়ার সময় মায়ের খেয়াল রাখতে হবে যে পকেটে সিগারেটের গুড়া থাকে কিনা, যদি এটা পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে ছেলে সিগারেট ধরেছে। কোন চেচামেচি করা যাবে না, তাকে মারধোর করা যাবে না। হিকমতের সাথে এগুতে হবে। সন্তানকে ধূমপানের ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরতে হবে। প্রথমে এর খারাপ দিকগুলি তুলে ধরতে হবে। এ ব্যাপারে মৃদু কঠিন নীতি বেঁধে দিতে হবে। বলতে হবে আমি কোন অবস্থায় ধূমপান সহ্য করবো না। এটি একটি ঘৃণ্য কাজ। ধুমপান যে হারাম পরিবারের সবাই মিলে এর উপর ডা. জাকির নায়েকের লেকচার দেখতে পারি, আশা করি তারা ডা. জাকির নায়েকের কুরআন-হাদীস এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক লজিক পছন্দ করবে।
📄 মা-বাবাদের জন্য দু’টি তথ্য
বাস্তবতা তুলে ধরছি। একটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে অতি ম্যাচিউর কিছু ছাত্র কোন বন্ধুর বাসায় একত্র হয়ে জুয়া খেলে। মা-বাবা-রা তা জানেনই না, বাসার অন্যেরা হয়তো মনে করে ছেলে বন্ধুদের নিয়ে গ্রুপ স্টাডি করছে। দেখা যায় নিজ সন্তান তার বন্ধুদের নিয়ে নিজ রুমে এই কাজ করছে আর মা হয়তো তাদের চা-নাস্তা দিয়ে আপ্পায়ন করছেন কিন্তু তিনি তার কিছুই টের পাচ্ছেন না। প্রথম দিকে বন্ধুরা মিলে তাস দিয়ে স্পেকট্রাম খেলে এবং এক সময় তা টাকা দিয়ে জুয়াতে রূপান্তরিত হয়। (নাউযুবিল্লাহ) এই জুয়া দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে এবং পড়াশোনার চরম অবনতি ঘটতে থাকে। এমনও হয় জুয়ার টাকা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বড় ধরনের গন্ডগোলও হয়, বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। কোন কোন গ্রুপ শুধু জুয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে না তারা এর পাশাপাশি মদ খায় এবং পর্নগ্রাফী দেখে। এই জঘন্য নেশা দিনের পর দিন চলতে থাকে এবং ছাত্ররা প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা জুয়া খেলে সময় নষ্ট করে।
তারা একবারও চিন্তা করে না যে এই সময় নষ্ট করার জন্য তারা আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবে? তাই মা-বাবাদের এই বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সন্তান যখন বড় হয় অর্থাৎ হাইস্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তখন তার একটা পারসোনালিটি তৈরী হয়, এটি সত্যি কথা, তার এই পারসোনালিটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু ইবলিশ শয়তানকে এক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাস করা যাবে না, তাকে কোন প্রকার সুযোগ দেয়া যাবে না, সে বেশী ঘুরাঘুরি করে কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের পিছনে এর কারণ উঠতি বয়স। এই বয়সে যদি একটি ছেলে বা মেয়েকে নষ্ট করে দেয়া যায় তাহলেই তার সার্থকতা, বাকী জীবন আর তার তেমন কিছু করতে হবে না। তাই কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া সন্তানদের পারসোনালিটির কথা চিন্তা করে একেবারে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তাদের সাথে মা-বাবাকে মিশতে হবে যেন তারা মা-বাবা থেকে কোন কিছু না লুকায়।