📄 আমার সন্তানের সালাতের ট্রেনিং
আমি কি জানি ১০ বছর বয়স থেকে আমার সন্তানের উপর সলাত ফরয? রসূল বলেছেন: “সাত বছর বয়স হলে তোমাদের সন্তানদের সলাত আদায়ের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়স হওয়ার পর এজন্য তাদের প্রতি কঠোর হও এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।” (আবু দাউদ)
অনেক মা-বাবারাই সন্তানের পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ের বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। কোন কোন মা-বাবা হয়তো সন্তানদের মাঝে মাঝে তাগাদা দেন যে 'এই নামায পড়ো' কিন্তু এই পর্যন্তই শেষ, সে পড়লো কি পড়লো না সেই বিষয়ে তারা খুব একটা সিরিয়াস না। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে কেউ যদি এক ওয়াক্ত সলাত ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয় বা না পড়ে তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়, তাকে তাওবা করে আবার ইসলামে ঢুকতে হয়। একটি বাচ্চার বয়স যখন ১০ বছর হয় (বা বালেগ হয়) তখন থেকে তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করা ফরয। সন্তান যদি পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় না করে এবং এক ওয়াক্তও ছেড়ে দেয় তাহলে সে জন্য সন্তানের পাশাপাশি মা-বাবাকেও আখিরাতের ময়দানে অপরাধী হিসেবে ধরা হবে।
আমরা হয়তো সন্তানের কষ্ট হবে বলে তাকে ফজরে সলাতের জন্য উঠাই না, বা বারে বারে ওযু করে সলাত আদায় করবে তার কষ্ট হবে মনে করে তাগাদা দেই না। কিন্তু আখিরাতের ময়দানে এই আদরের সন্তান মা-বাবাকে আল্লাহর সামনে দোষরূপ করবে। বলবে হে আল্লাহ, এরাই আমাকে সলাত আদায় করা শেখায় নাই, এরাই আমাকে সলাতের অভ্যাস করায় নাই, এরাই আমাকে সলাতের জন্য তাগাদা দেয় নাই, এদের জন্যই আমি বেনামাযী হয়েছি।
কোন কোন মা-বাবা মনে করেন, এখন বয়স কম, এখন এই বিষয়ে বেশী সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই, বড় হলে পড়বে। এই ধরনের ধারণা একেবারেই ভুল। পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করা ফরয, সে যেখানেই থাকুক না কেন। আমার সন্তান স্কুলে বা কলেজে বা ইউনিভার্সিটিতে যোহর ও আসরের ওয়াক্তে সলাত আদায় করে কিনা সে ব্যপারেও খেয়াল রাখতে হবে এবং তারা যেন সময় মতো যোহর ও আসর সলাত আদায় করে সে জন্য তাদেরকে সুন্দর করে বোঝাতে হবে, মোটিভেশন দিতে হবে এবং প্রয়োজনে কঠোরও হতে হবে। কোনভাবেই এই বিষয়ে ছাড় দেয়া যাবে না। এই বিষয়ে সন্তানদের ছাড় দেয়া মানে তাদের জীবনে মারাত্মক ক্ষতি করা, তাদের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনা, তাদের আখিরাত নষ্ট করা।
আমরা স্বামী-স্ত্রী যদি পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায়ে নিয়মিত না হই তাহলে আজ থেকে আমাদের দু'জনকেই নিয়মিত হতে হবে। যদি মা-বাবাকে সন্তান পাঁচ ওয়াক্ত সলাত নিয়মিত আদায় করতে না দেখে তাহলে তারাও কখনো সলাত আদায়ে উৎসাহী হবে না। স্বামী/স্ত্রী পরামর্শ করবে কিভাবে সন্তানদের সলাতের ব্যাপারে নিয়মানুবর্তী করা যায়। প্রথমে তাদের নরমভাবে বুঝাতে হবে। তাদের সাথে মোলায়েম ও ভাবগম্ভীরভাবে কথা বলতে হবে। সলাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কাজ না হলে মৃদু ধমক দেয়া যেতে পারে।
শুদ্ধভাবে সলাত শিক্ষা দেয়া: সলাতের সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আর তা হচ্ছে সন্তানদের সহীহ শুদ্ধভাবে সলাত শেখানো। বাজারে সলাতের প্রচুর বই পাওয়া যায় যা নামায শিক্ষা নামে প্রচলিত কিন্তু তাদের বেশীরভাগই সহীহ নয় অর্থাৎ আল্লাহর রসূল যেভাবে সলাত আদায় করেছেন তার উপর ভিত্তি করে নয় অর্থাৎ সহীহ হাদীস ভিত্তিক নয়। সন্তানদের শুরু থেকেই সহীহ দলিল অনুযায়ী সলাতের শিক্ষা দিলে পরবর্তীতে আর কোন সমস্যা হবে না। তাই শুদ্ধভাবে সহীহ হাদীস অনুযায়ী সলাত আদায়ের জন্য আমাদের প্রকাশিত ৭নং বইটি সংগ্রহ করার পরামর্শ রইল।
📄 সন্তানদের নিকট জামাতে সলাত আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরা
জামাতে সলাতের উদ্দেশ্য কি? কেন আল্লাহ এর এতো গুরুত্ব দিয়েছেন তা সন্তানদের নিকট তুলে ধরতে হবে। মহান রব্বুল আলামীন কুরআনে যত জায়গায় সলাতের কথা বলেছেন ততো জায়গায় বলেছেন “আকিমুসসালাত” অর্থাৎ সলাত একাকী আদায় করা নয় সলাত সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন। আর জামাতে সলাত আদায় করাই হচ্ছে সলাত প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ।
রসূল বলেছেন: লোকেরা যদি জানতো আযান দেয়া ও সলাতের প্রথম লাইনে দাঁড়ানোর মধ্যে কি পরিমাণ সওয়াব আছে তাহলে তারা লটারির মাধ্যম ছাড়া সেগুলো হাসিল করত না। আর যদি জানত সলাতে আগে আসার মধ্যে কি পরিমাণ সওয়াব আছে তাহলে তারা সে দিকেই অগ্রবর্তী হবার জন্য প্রতিযোগিতা করত, আর যদি জানত 'ইশা ও ফজরের সলাতের মধ্যে কি পরিমাণ সওয়াব আছে তাহলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসত। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
রসূল বলেছেন: যে ব্যক্তি আযান শুনে ওযর ব্যতীত মসজিদে না গিয়ে একাকী সলাত আদায় করে তার এ সলাত অগ্রাহ্য করা হবে। লোকেরা বললো, ওযর কি? রসূল বললেন, ওযর হল ভয় ও রোগ। (আবু দাউদ)
জুম্মার খুতবার একটি শিক্ষণীয় বিষয় শেয়ার করা যাক। আমাদের মেয়ে ক্লাশ ফাইভে পড়ে এবং সে যে স্কুলে পড়ে সেখানে বাধ্যতামূলক জামাতের সাথে যোহর, আসর এবং শুক্রবারে জুম্মার সলাত আদায় করতে হয়। তার ক্লাশ থেকে প্রতি সপ্তাহে জুম্মার খুতবার উপর একটি করে এসাইনমেন্ট থাকে যে সে ঐ খুতবাহ থেকে কি শিক্ষাগ্রহণ করলো তার উপর বিস্তারিত লিখে জমা দিতে হয়। উল্লেখ্য যে, এখানকার প্রতিটি মসজিদেই জুম্মার খুতবাহ আরবীতে না দিয়ে ইংরেজীতে দেয়া হয় যেন মুসল্লিগণ সব বুঝতে পারেন। ইসলামের সঠিক নিয়ম হচ্ছে জুম্মার খুতবা হতে হবে এলাকার বোধগম্য ভাষা অনুযায়ী।
এ বিষয়ে কিছু টিপ্সঃ
সন্তান মসজিদে যেতে না চাইলে কী উপায়ে তাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে? মা-বাবাদেরকে উপায় বের করতে হবে কিভাবে সন্তানদেরকে জামাতে নেয়া যেতে পারে। হতে পারে একেক সন্তানের জন্য একেক রকম উপায়।
মসজিদে বাচ্চা কাঁদলে কিভাবে সামলাতে হবে? বাচ্চা কাঁদলে তাকে আদর করতে হবে অথবা তাকে কোলে তুলে নিতে হবে। তার জন্য এমন খেলনা সংগে রাখা যেতে পারে যেটার শব্দ হয় না বা কার গায়ে ছুঁড়ে মারলে আঘাত লাগে না।
মসজিদে বাচ্চা নেবার কারণে কেউ বাচ্চাকে ধমক দিলে উক্ত বাবা কিভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে উত্তর দেবেন? যদি কেউ বাচ্চাকে ধমক দেন তার উপর রেগে গিয়ে কোন উত্তর দেয়া ঠিক হবে না। সলাতের পরে তাকে কুরআন হাদীসের আলোকে বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। রসূল তার নাতীদেরকে পিঠে নিয়ে মসজিদে নববীতে সলাত আদায় করেছেন।
ছোট বাচ্চা হলে ডাইপার পড়িয়ে নেবে কিনা? ছোট বাচ্চা হলে অবশ্যই ডাইপার পড়িয়ে নেবে।
📄 পরিবারের সাথে সলাত আদায়
সলাত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা দ্বীনের সাথে মানুষকে সম্পর্কযুক্ত রাখে। সলাত দ্বীনকে হিফাযতও করে। আবার দ্বীনের প্রতি আর্কষণও বাড়িয়ে থাকে। দ্বীনদার জীবন অতিবাহিত করার জন্য মানুষকে প্রস্তুতও করে। শুরু থেকেই শিশুদেরকে নিয়মিত সলাত আদায় করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তার এ ব্যাপারে অহেতুক স্নেহ-প্রীতি এবং অতিরিক্ত নরম মনোভাব প্রদর্শন খুবই ক্ষতিকারক। বাবা বা মা যখনই সলাত আদায়ের জন্য দাঁড়াবেন তখন অবশ্যই বাচ্চাদেরকে সাথে নিয়ে দাঁড়াবেন। এতে বাচ্চা ছোটবেলা থেকেই সলাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হলো:
"নিজের পরিবার-পরিজনকে সলাতের তাকিদ (আদেশ) দাও এবং নিজেও তা দৃঢ়তার সাথে পালন করতে থাক।” (সূরা ত্বহা : ১৩২)
'ইশার সলাত আদায় করা ব্যতিরেকে শিশুদেরকে শুতে যেন না দেই। শুয়ে পড়লেও উঠিয়ে সলাত আদায় করাই। ফজরের সলাতের জন্য প্রথম ওয়াক্তে তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাই এবং সকালে উঠার অভ্যাস করাই। ছেলেমেয়েরা যদি অনেক রাতে ঘুমাতে যায় তাহলে তাদের ভোরে উঠতে খুব কষ্ট হয় এবং ফজর সলাত আদায় করাও কষ্টকর হয়, তাই তাদের সকাল সকাল ঘুমিয়ে পরার অভ্যাস করাতে হবে। যদি কখনো বাসায় সলাত আদায় করা হয় তখন পরিবারের প্রধান হিসেবে বাবা সলাতের ইমামতি করবেন। পেছনে স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবা (থাকলে) সকলেই সলাত আদায় করবেন।
📄 সন্তানদের সিয়াম (রোযা) পালনের অভ্যাস করানো
অনেক মা-বাবারাই সন্তানের এই বিষয়টাতে গুরুত্ব দেন না। মনে রাখতে হবে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে সিয়াম বা রোযা চতুর্থতম। ইসলামের কোন ফরয হুকুম এবং ইবাদতের কোন মাফ নেই। যার উপর যেটা ফরয তাকে তা পালন করতেই হবে। অতি দুঃখের বিষয় অনেক মা-বাবারাই সন্তানদেরকে এই ফরয ইবাদত করতে বাধা দেন। তারা বলেন তোমার এখন সামনে পরীক্ষা এখন রোযা রাখার প্রয়োজন নেই বা তুমি এখন ছোট, স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে, সারাদিন না খেয়ে থাকতে পারবে না ইত্যাদি নানা রকম অজুহাত। বাস্তবে দেখা গেছে যে মা-বাবার গাফিলতির কারণে অনেক ছেলেমেয়েরা বড় হয়েও সিয়াম পালন করতে পারে না।
একটি ছেলে বা মেয়ের উপর ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই সিয়াম ফরয হয়ে যায়। তবে তাকে আরো ছোটবেলা থেকেই সিয়াম পালনের প্রাকটিস করাতে হবে তাহলে বালেগ হলে আর নিয়মিত ৩০টি সিয়াম পালন করতে কষ্ট হবে না। প্রথমদিকে ছেলেমেয়েদেরকে অর্ধ বেলা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার অভ্যাস করানো। পরবর্তী বছরে ১টি বা ২টি পূর্ণ সিয়াম পালনে উৎসাহিত করা। এভাবে প্রতিবছর একটু একটু করে সিয়ামের দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। সেই সাথে তাদেরকে রমাদান মাস ও সিয়ামের গুরুত্ব এবং তার শিক্ষাগুলো এক এক করে ব্রেইনে ঢুকিয়ে দিতে হবে যেন তারা বুঝে সিয়াম পালন করতে উৎসাহিত হয়, মা-বাবার ভয়ে নয়।