📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 সুন্দর ও অসুন্দর কথা শিক্ষাদান

📄 সুন্দর ও অসুন্দর কথা শিক্ষাদান


সুন্দর কথা: সুন্দর বা সকলের পছন্দনীয়, সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কথা বলার ধরণ আমাদের জানা প্রয়োজন। কেননা সুখী পরিবার গঠনে সুন্দর কথা বিশেষ তাৎপর্যবহ। অবশ্য সুন্দর করে কথা বলা অভ্যাসের উপর নির্ভর করে। কাজেই এ বিষয়ে আমাদের অভ্যাস গঠন করা অত্যন্ত জরুরী। সুতরাং শিখি:

১) বাঁকা চোখে তাকিয়ে, ভ্রু কুঞ্চিত করে, বাঁকা-বাঁকা, পেচানো, কথায় কথায় খোঁচা না মেরে সোজা করে কথা বলতে চেষ্টা করা।
২) ভাষার ও কথার জটিলতা বা কৃত্রিমতা পরিহার করে সহজ, সকলের বোধগম্য করে কথা বলা।
৩) সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করে কথা বলতে চেষ্টা করা, অসুন্দর, অসামাজিক, অশ্রাব্য মন্দ ভাষাগুলোকে কথোপকথনে ব্যবহার না করা।
৪) যেকোন কথা প্রকাশ্যে মুখ কালো করে না বলে স্বাভাবিকভাবে বা হেসে হেসে বলা উত্তম। রসূল বলেছেন, “তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলা একটি দান।”
৫) কোমল ভাষায় কথা বলা উত্তম, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন : “এটা আল্লাহরই দয়া যে, তুমি তোমার সাথীদের প্রতি কোমল। তা না হয়ে তুমি যদি কঠোর হতে তা হলে, তারা তোমার চারদিক থেকে দূরে সরে যেতো।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)
৬) সুন্দর শ্রুতিমধুর শব্দ ব্যবহার করা।
৭) স্পষ্ট ও উপস্থিত শ্রোতার বা যার উদ্দেশ্যে কথা তার বোধগম্য করে বলা।
৮) আঞ্চলিকতা, সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রুতা পরিহার করে বইয়ের ভাষায় বিশুদ্ধ কথা বলা।
৯) শ্রোতার বা উপস্থিত সভ্যদের কল্যাণকামী, হিতকর কথা বলা।
১০) বাসায়, সামাজিক পরিমণ্ডলে এবং অফিস কর্মস্থলে একইভাবে সবসময় কথা বলার চেষ্টা করা।
১১) সদালাপী ও মিষ্টভাষী হওয়া।
১২) অর্থবহ কথা বলা, অর্থহীন বাজে কথা না বলা।
১৩) তর্ক-বিতর্ক না করা, তর্কে কোন সমাধান হয় না।
১৪) শুধু যুক্তি দেখিয়ে কথা না বলা, সব বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শন করা যায় না। কাজেই অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে জ্ঞানগর্ভ কথা বলা-- যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে।
১৫) একজনের পেছনে বা অনুপস্থিতিতে আরেকজনের কাছে তার প্রসঙ্গে মন্দ কথা না বলা। এটি গীবতের সাথে সম্পৃক্ত। এজন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তি অবধারিত।
১৬) কথা বলার ক্ষেত্রে এমন মনে করা আল্লাহর দেয়া জবানকে আল্লাহর নির্দেশমত ব্যবহার করছি। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
১৭) কটু কর্কশ, রুক্ষ, আঘাত বা হিট করামূলক, অপমানসূচক কথা না বলা।
১৮) অপ্রাসঙ্গিক, বেশি কথা, অনর্গল কথা না বলা।
১৯) শ্রোতাকে কখনো উপহাস, বিদ্রুপ, ঠাট্টা ও তিরস্কার করে কথা না বলা।
২০) মিথ্যা কথা না বলা কারণ মিথ্যা সকল পাপ কাজের জননী।
২১) কারোর নামে অপবাদ না দেয়া, কারণ এমন অপবাদ একসময় নিজের জন্যে অপেক্ষা করতে পারে তা মনে রাখা।
২২) শপথ না করা কারণ সময়ের ব্যবধানে বিপদ কেটে গেলে বা সুসময়ে সে শপথের কথা অনেকেরই মনে থাকে না। যদিও এটি মানার ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কঠোর।
২৩) কথায় কথায় চেঁচামেচি করা, জোরে কথা বলা, মেজাজ গরম করে কথা না বলা।
২৪) অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে না বেড়ানো।
২৫) মেয়েরা মেয়েদের মত, মহিলারা মহিলাদের মত, ছেলেরা ছেলেদের মত, পুরুষেরা পুরুষের মত কথা বলা।
২৬) স্থান-কাল পাত্রভেদে কথা বলা।
২৭) ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করা, অশ্লীল, গালি বা বকা দিয়ে কথা না বলা।
২৮) কখনো কখনো আনন্দদায়ক, বৈধ রসিকতা করে কথা বলা।
২৯) কারোর কথা বলতে যেয়ে নেতিবাচক বিশ্লেষণ গাধা, গর্দভ, বোকা, পাগল-ছাগল, গরু, বলদ ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে কথা না বলা।
৩০) ভাল কাজের স্বীকৃতি দেয়া, প্রশংসা করা। বিরোধিতার কারণে বিরোধিতা না করা।
৩১) যে উপকার করেছে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উত্তম। প্রিয় নাবী ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না।” (আবু দাউদ)
৩২) সুন্দর ভাষায় সহজ করে উপদেশ বা পরামর্শ দেয়া, নিজের ব্যাপারে শ্রোতার কোন কথা, কোন পরামর্শ আছে কিনা জানতে চাওয়া এবং পরামর্শ-দানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো।
৩৩) ভাষা আল্লাহর মহিমা: সুতরাং সব সময় তার পবিত্রতা রক্ষা করা।
৩৪) শ্রোতার জন্যে দু'আ করা, নিজের শুভ কামনার কথা তাকে বলা।
৩৫) ভুল করে ফেললে বা ভুল হয়ে গেলে আমি দুঃখিত কথাটি বিনয়ের সাথে বলার চেষ্টা করা।

সর্বোপরি এমন কথা না বলা যাতে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ কষ্ট পায় - এ নীতিতে প্রতিদিন প্রত্যেক বিষয়ে সচেতনতার সাথে স্রষ্টা ও মানুষের পছন্দনীয় দৃষ্টিভঙ্গী ও মন-মেজাজে কথা বলার চেষ্টা এবং বাস্তবায়ন করা সচ্চরিত্রের উত্তম বহিঃপ্রকাশ। যা সকল মানুষ একে অপরের কাছে প্রত্যাশা করে এবং পাওয়ার অধিকারও রাখে।

অসুন্দর কথা : অসুন্দর কথা মানে সর্বত্র অশান্তির বিষ বাস্প ছড়িয়ে দেয়া। অসুন্দর কথার ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এতে অস্থির হয়ে উঠতে পারে পারিবারিক জীবন, লুন্ঠিত হতে পারে দুনিয়ার শান্তি। কিন্তু কিভাবে?

১) অসুন্দর কথায় মানুষ অসন্তুষ্ট হয়। ২) পারস্পরিক ঘৃণা বিদ্বেষ শুরু হয়। ৩) সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ৪) প্রতিবেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, বিপদে এগিয়ে আসতে চায় না। ৫) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ৬) একে অপরের সাথে অন্তরঙ্গতা নষ্ট হয়। বন্ধুত্ব বিনষ্ট হয়। ৭) পরিবারের ভাঙ্গন শুরু হয়, সন্তান অমানুষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ৮) রাগারাগি, মারামারি ও হানাহানির সৃষ্টি হয়। ৯) মান-ইজ্জত, সম্মান, পজিশান বিনষ্ট হয়। ১০) সমাজে দ্বন্দ্ব-কলহ, ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয়। ১১) ঐক্য ও একতা বিনষ্ট হয়। ১২) পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহবোধ বিলীন হয়ে যায়। ১৩) এমন ব্যক্তির মৃত্যু হলে প্রতিবেশীরা লাশ দাফন করতে যেতে চায় না। ১৪) রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দানা বেঁধে উঠে। ১৫) সর্বোপরি দুনিয়ায় অশান্তি এবং আখিরাতে জাহান্নামের অধিবাসী হওয়া অবধারিত হয়ে যেতে পারে।

সুতরাং এমন অনিষ্টতা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের উচিত সুন্দর করে কথা বলা, সদালাপী হওয়া।

ফন্ট সাইজ
15px
17px