📄 সন্তানকে মানুষ করার পিছনে মায়ের কর্তব্য
অতি ছোট অবস্থা হতে সন্তানদের লালন-পালনে মায়ের উপস্থিতি ও সঙ্গ খুবই প্রয়োজন। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতার গুরুরা মহিলাদের সমঅধিকারের কথা বলে এক প্রকার উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এতে কোন কোন শিক্ষিতা মহিলা শুধুমাত্র ঘর-সংসার করাটাকে সময় ও শ্রমের অপচয় বলে মনে করে থাকেন। এটি একটি সামাজিক উম্মাদনা ও শোষণ। আর মহিলারা নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে কেবল প্রচারণা আর অপসংস্কৃতির ফাঁদে পড়ে একই শ্লোগান শুরু করেন। তারা ঘরে থাকাটাকে অপেক্ষাকৃত নীচু কাজ মনে করেন। এতে কয়েকটি ধীরগতির বিপর্যয় শুরু হয়। একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন শিশু সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন মা শোষিত হন (যদিও তিনি তা মনে করেন না)। পরিণতিতে সমাজের সকল শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে গোটা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যে পশ্চিমা সংস্কৃতি এ সমঅধিকার নামক আগুনের স্রষ্টা তারাই আবার প্রমাণ করছে যে শিশু সন্তানগণ মায়ের অনুপস্থিতি-তে চরম মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একটি উন্নত দেশ যেখানে শতকরা সর্বোচ্চ হারে মেয়েরা পুরুষের পাশাপাশি সর্বত্রই কাজ করে, সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়ে নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেছে।
দুই হাজার শিশুর উপর জরিপ চালানো হয়। এ জরিপ চলে টানা তিন বছর ধরে। এতে দেখা যায়, যেসব শিশু দিনভর তাদের মা ছাড়া অন্য কারো দ্বারা লালিত-পালিত হয়, যেমন: ডে কেয়ার সেন্টার, মেইড ইত্যাদি তাদের সার্বিক বেড়ে উঠা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ। Doctor Bernadine Woo (যিনি এ জরিপ পরিচালনা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন) বলেন, দিনের সিংহভাগ সময় মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুরা যথাযথ মনস্তাত্বিক সাপোর্ট পায় না, ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকমত গড়ে উঠে না। Institute of Mental Health-এর Deputy Chief Dr. Daniel বলেন, শিশুদের দেখাশুনার জন্য প্রথম ৬ বছর একজন সঙ্গী বা তদারককারী দরকার যিনি নিয়মিত/সার্বক্ষণিক শিশুর পরিচর্যা করবেন, শিশুকে সঙ্গ দেবেন ও তার যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। আর এটি সম্ভব মাকে দিয়ে। এ জরিপে আরো বলা হয়, শিশুদের মনস্তত্ব দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় যখন তারা একেক সময় একেকজনকে মূল পরিচর্যাকারী হিসেবে দেখতে পায়। ফলে অন্যদের তুলনায় তারা নিম্ন IQ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তিনগুণ।
এটি মাত্র একটি জরিপের ফলাফল। এ ধরনের সকল জরিপ একই কথা বলে। মূল কথা একটাই। শিশুদের পরিচর্যার জন্য মায়ের কোন বিকল্প নেই। এখন সিদ্ধান্ত আমার। আমার শিশুর অধিকার রক্ষা করে তার সার্বিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবো নাকি বাইরে চাকুরী করে সংসারের স্টেটাস ঠিক রাখার জন্য টাকা কামাবো?
মহিলাদের চাকুরী করার কারণে সংসারে উপরি আয় হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচক উর্ধে উঠে। ঘরে ও বাইরে যন্ত্র আর বাহ্যিক চাকচিক্যের সমাগম ঘটে। কিন্তু এরজন্য যে মূল্য দিতে হয় তা কি একেবারে কম? সর্বপ্রথম এ বিষয়টি মহিলারা বুঝেন না যে, চাকুরী করে তারা শোষণের শিকার হচ্ছেন। পুরুষরা চাকুরী করে একটি। তাদের প্রাকৃতিক স্বভাবই ঘরের বাইরের কর্মচাঞ্চল্য। শতকরা ১জন পুরুষও পাওয়া যাবে না যিনি সারাদিন অফিস বা ব্যবসায়ের কাজ করে ঘরের কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করে স্ত্রী ও পরিবারকে সহায়তা করছেন। কেউ কেউ আবার যুক্তি দেখান যে পুরুষরা বাহির হতে বাসায় এসে ক্লান্তশ্রান্ত দেহে ঘরের কাজে সহযোগিতার শক্তি থাকে না।
এবার আসি স্ত্রীদের কথায়। স্ত্রীগণ কোন অবস্থাতেই নিজ বাসার সার্বিক দায়- দায়িত্ব হতে মুক্ত হতে পারবেন না। স্ত্রী যত বড় চাকুরীই করুক না কেন, বাইরে যত ব্যস্ত সময়ই কাটান না কেন, তিনি সন্তান পালন, রান্না, তার ঘরের সৌন্দর্য রক্ষা, বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও সার্বিক অবস্থার দেখভাল করার সহজাত মানসিকতা হতে কখনো মুক্ত হতে পারবেন না। এবার দেখি, পুরুষ কয়টি চাকুরী করছেন আর স্ত্রী কয়টি চাকুরী করছেন? পুরুষ আসলে চাকুরী করছেন একটি। আর স্ত্রী করছেন তিনটি। একটি অফিসের চাকুরী, একটি ঘর দেখাশুনার সার্বিক চাকুরী, আরেকটি সন্তানদের দেখাশুনার চাকুরী । এটি কি নারী শোষণ নয়?
অতএব সন্তানের মা যাই করেন না কেন, সন্তানদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি তিনি কাছে থাকতে না পারেন তাহলে এটা একটা বিরাট অবিচার। সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে উঠার জন্য, প্রকৃত শিক্ষালাভের স্বার্থে, একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার লক্ষ্যে মাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
📄 সন্তানদের সামনে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকা
আরো একটি ক্ষতিকর বিষয় হলো সন্তানদের সামনে অন্যায় কাজ করা ও তা নিয়ে আলোচনা করা। এতে কচি ছেলেমেয়েদের কোমল মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। ফলে তারা অন্যায় কাজ করার মনমানসিকতা নিয়ে বড় হয়। পরবর্তীতে মা-বাবারা অবাক হয়ে দেখেন কিভাবে সন্তানরা অন্যায় কাজ করছে। প্রকৃত কথা হলো সন্তানগণ এ অন্যায়গুলি শিখেছে তাদের মা-বাবার কাছ থেকে। যেমন: মা-বাবারা অবৈধ ইনকাম করে থাকেন, সরকারকে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে থাকেন, মিথ্যা কথা বলে থাকেন, সবসময় অন্যের সমালোচনা বা গীবত করে থাকেন, অন্য পরিবারের ক্ষতি করে থাকেন, স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই ঝগড়া-ঝাটি করে থাকেন, টিভিতে আপত্তিকর অনুষ্ঠান দেখে থাকেন ইত্যাদি।
উদাহরণ ১: যেমন কেউ একজন ফোন করেছে আমার কাছে, আমার সন্তান ফোন রিসিভ করে আমাকে বলছে বাবা তোমার ফোন। আমি আমার সন্তানকে বলছি 'বল বাবা বাসায় নেই'। এতে সন্তান অবাক হয়ে চিন্তা করে এটা কেমন কথা! বাবা বাসায় থেকে বলছে সে নেই! সন্তান তখন অংক মিলাতে পারে না।
উদাহরণ ২: যেমন কেউ একজন আমাকে ফোন করেছে রাত ১১টার দিকে। আমি ফোন রিসিভ করেছি এবং যিনি ফোন করেছেন অপর প্রান্ত থেকে তিনি বলছেন 'এতো রাতে ফোন করে বিরক্ত করলাম না তো?' আমি উত্তরে বলছি 'না না বিরক্ত হইনি'! কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ফোনে কথোপকথোন শেষে স্ত্রী-সন্তানদের সামনে বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করছি যে 'ব্যাটা ফোন করার আর সময় পেল না!' এখানেও সন্তান অবাক হয়ে বাবাকে দেখে যে বাবা ভদ্রলোককে ফোনে বলল 'না বিরক্ত হইনি' কিন্তু এখন বলছে পুরো বিপরীত! এখানেও সে জীবনের অংক মিলাতে পারে না।
উদাহরণ ৩ : বাসায় সাধারণত মেহমান আসলে ছেলেমেয়েরা খুশি হয়। কিন্তু কোন কোন মা-বাবারা বিরক্ত হন। মেহমানদের সামনে এক রকম আচরণ করেন এবং মেহমান চলে গেলে সন্তানদের সামনে মেহমানদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করেন। এতে সন্তানরা অবাক হয়, কেন এমন আচরণ? মেহমানদের সামনে বাবা বলছেন 'আপনারা আসাতে আমরা খুব খুশি হয়েছি, আবার আসবেন কিন্তু'। আবার মেহমান চলে যাওয়ার পর সন্তানরা দেখছে আসলে বাবা অখুশি!
📄 রাগ নিয়ন্ত্রন কিভাবে করবো?
সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে রাগ বা ক্রোধকে দমন করে সহনশীলতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে পারা মা-বাবাদের একটি বিশেষ গুণ। ক্রোধ আসে শয়তানের পক্ষ হতে। শয়তান মানুষের চরম শত্রু। সে কারণে কখনো কেউ ক্রোধ বা রাগের বশীভূত হলে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে হয়। কেননা ক্রোধ মানুষের হিতাহিত জ্ঞানকে নিঃশেষ করে দেয়। ফলে ক্রোধ মানুষকে যে কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ফেলে দিতে পারে। তাইতো আল কুরআনুল কারীম ও হাদীসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ক্রোধের অপকারিতা বর্ণিত হয়েছে এবং সহনশীলতা, ধৈর্য ও কোমলতার নীতি অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তাঁদের (মু'মিনদের) বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা ক্রোধকে হজম করে এবং লোকদের সাথে ক্ষমার নীতি অবলম্বন করে চলে।” (সূরা আলে ইমরান ৩ : ১৩৪)
অনেক সময় আমরা মা-বাবারা নিজ সন্তানদের কিছু কার্যকলাপ দেখে খুবই অস্থির হয়ে যাই এবং নিজেদের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারি না। আমরা পত্র-পত্রিকায় এরকমের কয়েকটি দুর্ঘটনা দেখেছি। বাবা রাগের বশবর্তী হয়ে নিজ সন্তানকে আঘাত করতে গিয়ে মেরেই ফেলেছেন। আবার নিজ মেয়েকে শাসন করতে গিয়ে নিজেকেই শেষে জেলে যেতে হয়েছে। যাহোক সবসময় একটা কথা মনে রাখতে হবে যে সন্তানদেরকে শাসন করতে হবে ধৈর্যের মাধ্যমে। কিছুতেই তাদের উপর অত্যাচার করা যাবে না। শিশুদের শাস্তির নামে অত্যাচার করা এক প্রকার child abuse। সঠিক সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুকে শুধরাতে হবে। নিম্নে রাগ দমনের কিছু টিপ্স দেয়া হলো। রাগ হলেঃ
১. ওযু করা অথবা গোসল করে নেয়া আর বুঝতে হবে এখানে শয়তান উপস্থিত।
২. নফল সলাত আদায় করা, এমতাবস্থায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। নিশ্চয়ই আল্লাহ সাহায্যকারী, আমাদের প্রতিপালক ও সর্বনিয়ন্তা মালিক।
৩. দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়া, বসে থাকলে শুয়ে যাওয়া।
৪. চোখ বন্ধ করা, দীর্ঘ নিশ্বাস নেয়া।
৫. উল্টো দিক থেকে গণনা করা।
৬. নিজে নিজে পজিটিভ কথা বলা, নিজের কাছে নিজে আপিল করা。
📄 পরিবারের সাথে সময় কাটানো
আমি যে পেশায়ই নিয়োজিত থাকি না কেন সর্বদা সুযোগ খুঁজতে হবে স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে সময় কাটানোর। এমন অনেক কেতাদুরস্ত লোকের সন্ধান পাওয়া যায় যারা সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে যখন রাতে বাসায় ফেরেন তখন তার সন্তানদের গায়ে হাত বুলানোর আর কোন শক্তি বা আগ্রহ থাকে না।
ছোট সন্তানদের হাত ধরে রাস্তায়, পার্কে বেড়াতে যাওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে আর কিছুদিন পর আমি চাইবো কিন্তু সন্তানরা আর আমার হাত ধরে হাঁটতে চাইবে না। মেয়ে কিছু বড় হলে তো সেই আমার কাছ হতে দূরে সরে থাকবে। সুতরাং এখনই সময়। বেশী বেশী করে তাদের সাথে সময় কাটানো উচিত। সপ্তাহান্তে তাদের পার্কে, যাদুঘরে, চিরিয়াখানায়, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া উচিত। যেখানেই যাই সবাই যেন সলাত আদায়ের ব্যাপারটি ভুলে না যাই। তা না হলে সন্তানরা মনে করবে সলাত কেবল ঘরের ভেতরের বিষয়।