📄 বাসায় সন্তানদের জন্য লাইব্রেরী করে দেয়া
মুম্বাইতে ডা. জাকির নায়েক-এর একটি কোয়ালিটি সম্পন্ন ইসলামিক স্কুল আছে। ডা. জাকির নায়েক তার একটি প্রোগ্রামে বলেছিলেন যে, এই স্কুল থেকে তার চেয়েও আরো উন্নতমানের শতশত জাকির নায়েক বের হবে ইনশাআল্লাহ। এই স্কুলে সন্তান ভর্তি করার পূর্বশর্ত হচ্ছে "বাড়ি থেকে ডিশ এন্টেনার লাইন আগে কাটতে হবে”। সন্তানের চরিত্র গঠনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্ট্রাটেজীর অংশ হিসেবে হলিউড, বলিউডের কুখাদ্যের বিপরীতে যে সামান্য কিছু নৈতিকতার উপকার আমরা পেতে পারি তার মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি “ফ্যামিলি লাইব্রেরী” প্রতিষ্ঠা। এছাড়া ইসলামিক টিভি চ্যানেলগুলোর মেম্বার হতে পারি। ইন্টারনেট থেকেও নিয়মিত ফ্রী Peace TV দেখতে পারি।
ছোটদের উপযোগী ইসলামিক ডিভিডি, ভিসিডি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে পারি। আল-কুরআনের তাফসীর, সহীহ হাদিস গ্রন্থ, রসূল এর জীবনী, ইসলামী অর্থনীতি, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামী সমাজ, চার খলিফার বিস্তারিত জীবনী, সাহাবীদের জীবনী, অন্যান্য নাবীদের জীবনী, Comparative religion, ইসলামী শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের বই দিয়ে নিজ ঘরে একটি পারিবারিক লাইব্রেরী তৈরী করতে পারি। নিজে যেন পড়ি ও সন্তানদের পড়ার উৎসাহ প্রদান করি।
📄 সন্তান প্রতিপালনে মুসলিম ও অমুসলিম মায়ের পার্থক্য
ইসলাম থেকে বঞ্চিত মা (অমুসলিম মা) তার সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে যা কিছু চিন্তা করে তা এ নশ্বর দুনিয়া পর্যন্তই সীমিত। মৃত্যুর সীমানা পার হয়ে তার দৃষ্টি অনন্ত জগত পর্যন্ত প্রসারিত হয় না। নিজের সন্তান হওয়ার কারণে সে তার শিশুর লালন-পালন করে। তার অন্তরে সন্তানের প্রতি মমত্ববোধের সীমাহীন আবেগ রয়েছে। সে এ চিন্তা করে যে, সন্তানের মাধ্যমে তার বংশ টিকে থাকবে অথবা সন্তান বড়ো হয়ে তাকে আরাম ও শান্তি দেবে এবং তার সাহায্যকারী হবে। এ ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে সে নিজের সন্তানকে এমনভাবে প্রতিপালন করে যাতে সে পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে সার্থক জীবনযাপন করতে পারে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন অর্থাৎ যারা ইসলাম প্র্যাকটিস করেন না তাদের মধ্যে আর অমুসলিম মায়ের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা আর কাজের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য দেখা যায় না।
কিন্তু মুসলিম ও অমুসলিম মায়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
একজন প্রকৃত মুসলিম মা (যিনি ইসলাম প্র্যাকটিস করেন) সন্তান প্রতিপালনকে তিনি একটি দ্বীনি দায়িত্ব এবং আখিরাতের মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম মনে করেন। সন্তানকে প্রাচুর্যপূর্ণ আরামদায়ক একটি জীবন উপহার দেবার লক্ষ্যে তারা সন্তানকে প্রতিপালন করেন না। তারা নিজের অভিভাবকত্বে এমন মু'মিন তৈরী করেন যাদের দৃষ্টি সুদূর প্রসারী হবে, যারা দুনিয়ায় আল্লাহর মর্জি মুতাবেক জীবন কাটানো এবং আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে ঐভাবে পরিচালিত করবে।
তাই একজন প্রকৃত মুসলিম মায়ের নিকট সন্তান প্রতিপালনের প্রশ্নটি শুধু পার্থিব দুনিয়ার ব্যাপারই নয়, বরং তার ভালোমন্দের প্রভাব সে জীবনেও প্রতিভাত হবে। তার চিন্তা ভাবনা হলো, তিনি যদি সন্তানকে ইসলামী ধ্যানধারণায় গড়ে তোলেন এবং ইসলামী নির্দেশ মোতাবেক লালন-পালন করেন তা হলে তার এই জীবন এবং পরকালীন জীবন দুই-ই সুন্দর হবে। আল্লাহ তার উপর খুশী হবেন এবং তাকে এই পৃথিবীতে শান্তি দেবেন এবং পরকালে জান্নাত দান ও পুরস্কারের বারি বর্ষণ করবেন। যদি তিনি এ দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা দেখান অথবা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সন্তানদের গড়ে না তোলেন তাহলে পরকালে লজ্জিত হবেন এবং আখিরাত নষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হবেন এবং শাস্তি দেবেন।
এ ধরনের চিন্তা ও কর্মের সবচেয়ে বড় উপকারী দিক হলো যে, সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যদি সন্তান মায়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অক্ষম হন, তাহলেও সে মা লজ্জিত হন না। তিনি নিরাশও হন না এবং তার কাজে ভাটা পড়ে না। বরং এ আস্থায় তিনি সবসময় বলীয়ান থাকেন যে, দুনিয়ায় যদি সন্তান তার আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থও হয় তবুও তিনি আল্লাহর নিকট যে প্রতিদানের প্রত্যাশী তা তিনি পূরণ করবেন। তিনি বড়ো শক্তিশালী। তিনি বান্দার সুন্দর কাজের পুরোপুরি প্রতিদান দেন এবং কখনো বান্দাকে প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করেন না।
“স্ত্রী স্বামীর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক এবং জিম্মাদার। যেসব ব্যক্তি ও বস্তুর তত্ত্বাবধায়ক তাকে বানানো হয়েছে সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
📄 সন্তানকে মানুষ করার পিছনে মায়ের কর্তব্য
অতি ছোট অবস্থা হতে সন্তানদের লালন-পালনে মায়ের উপস্থিতি ও সঙ্গ খুবই প্রয়োজন। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতার গুরুরা মহিলাদের সমঅধিকারের কথা বলে এক প্রকার উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এতে কোন কোন শিক্ষিতা মহিলা শুধুমাত্র ঘর-সংসার করাটাকে সময় ও শ্রমের অপচয় বলে মনে করে থাকেন। এটি একটি সামাজিক উম্মাদনা ও শোষণ। আর মহিলারা নিজেদের স্বকীয়তা ভুলে কেবল প্রচারণা আর অপসংস্কৃতির ফাঁদে পড়ে একই শ্লোগান শুরু করেন। তারা ঘরে থাকাটাকে অপেক্ষাকৃত নীচু কাজ মনে করেন। এতে কয়েকটি ধীরগতির বিপর্যয় শুরু হয়। একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন শিশু সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একজন মা শোষিত হন (যদিও তিনি তা মনে করেন না)। পরিণতিতে সমাজের সকল শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে গোটা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যে পশ্চিমা সংস্কৃতি এ সমঅধিকার নামক আগুনের স্রষ্টা তারাই আবার প্রমাণ করছে যে শিশু সন্তানগণ মায়ের অনুপস্থিতি-তে চরম মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একটি উন্নত দেশ যেখানে শতকরা সর্বোচ্চ হারে মেয়েরা পুরুষের পাশাপাশি সর্বত্রই কাজ করে, সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়ে নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেছে।
দুই হাজার শিশুর উপর জরিপ চালানো হয়। এ জরিপ চলে টানা তিন বছর ধরে। এতে দেখা যায়, যেসব শিশু দিনভর তাদের মা ছাড়া অন্য কারো দ্বারা লালিত-পালিত হয়, যেমন: ডে কেয়ার সেন্টার, মেইড ইত্যাদি তাদের সার্বিক বেড়ে উঠা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ। Doctor Bernadine Woo (যিনি এ জরিপ পরিচালনা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন) বলেন, দিনের সিংহভাগ সময় মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুরা যথাযথ মনস্তাত্বিক সাপোর্ট পায় না, ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিকমত গড়ে উঠে না। Institute of Mental Health-এর Deputy Chief Dr. Daniel বলেন, শিশুদের দেখাশুনার জন্য প্রথম ৬ বছর একজন সঙ্গী বা তদারককারী দরকার যিনি নিয়মিত/সার্বক্ষণিক শিশুর পরিচর্যা করবেন, শিশুকে সঙ্গ দেবেন ও তার যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। আর এটি সম্ভব মাকে দিয়ে। এ জরিপে আরো বলা হয়, শিশুদের মনস্তত্ব দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় যখন তারা একেক সময় একেকজনকে মূল পরিচর্যাকারী হিসেবে দেখতে পায়। ফলে অন্যদের তুলনায় তারা নিম্ন IQ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তিনগুণ।
এটি মাত্র একটি জরিপের ফলাফল। এ ধরনের সকল জরিপ একই কথা বলে। মূল কথা একটাই। শিশুদের পরিচর্যার জন্য মায়ের কোন বিকল্প নেই। এখন সিদ্ধান্ত আমার। আমার শিশুর অধিকার রক্ষা করে তার সার্বিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবো নাকি বাইরে চাকুরী করে সংসারের স্টেটাস ঠিক রাখার জন্য টাকা কামাবো?
মহিলাদের চাকুরী করার কারণে সংসারে উপরি আয় হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচক উর্ধে উঠে। ঘরে ও বাইরে যন্ত্র আর বাহ্যিক চাকচিক্যের সমাগম ঘটে। কিন্তু এরজন্য যে মূল্য দিতে হয় তা কি একেবারে কম? সর্বপ্রথম এ বিষয়টি মহিলারা বুঝেন না যে, চাকুরী করে তারা শোষণের শিকার হচ্ছেন। পুরুষরা চাকুরী করে একটি। তাদের প্রাকৃতিক স্বভাবই ঘরের বাইরের কর্মচাঞ্চল্য। শতকরা ১জন পুরুষও পাওয়া যাবে না যিনি সারাদিন অফিস বা ব্যবসায়ের কাজ করে ঘরের কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করে স্ত্রী ও পরিবারকে সহায়তা করছেন। কেউ কেউ আবার যুক্তি দেখান যে পুরুষরা বাহির হতে বাসায় এসে ক্লান্তশ্রান্ত দেহে ঘরের কাজে সহযোগিতার শক্তি থাকে না।
এবার আসি স্ত্রীদের কথায়। স্ত্রীগণ কোন অবস্থাতেই নিজ বাসার সার্বিক দায়- দায়িত্ব হতে মুক্ত হতে পারবেন না। স্ত্রী যত বড় চাকুরীই করুক না কেন, বাইরে যত ব্যস্ত সময়ই কাটান না কেন, তিনি সন্তান পালন, রান্না, তার ঘরের সৌন্দর্য রক্ষা, বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও সার্বিক অবস্থার দেখভাল করার সহজাত মানসিকতা হতে কখনো মুক্ত হতে পারবেন না। এবার দেখি, পুরুষ কয়টি চাকুরী করছেন আর স্ত্রী কয়টি চাকুরী করছেন? পুরুষ আসলে চাকুরী করছেন একটি। আর স্ত্রী করছেন তিনটি। একটি অফিসের চাকুরী, একটি ঘর দেখাশুনার সার্বিক চাকুরী, আরেকটি সন্তানদের দেখাশুনার চাকুরী । এটি কি নারী শোষণ নয়?
অতএব সন্তানের মা যাই করেন না কেন, সন্তানদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি তিনি কাছে থাকতে না পারেন তাহলে এটা একটা বিরাট অবিচার। সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে উঠার জন্য, প্রকৃত শিক্ষালাভের স্বার্থে, একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার লক্ষ্যে মাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
📄 সন্তানদের সামনে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকা
আরো একটি ক্ষতিকর বিষয় হলো সন্তানদের সামনে অন্যায় কাজ করা ও তা নিয়ে আলোচনা করা। এতে কচি ছেলেমেয়েদের কোমল মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। ফলে তারা অন্যায় কাজ করার মনমানসিকতা নিয়ে বড় হয়। পরবর্তীতে মা-বাবারা অবাক হয়ে দেখেন কিভাবে সন্তানরা অন্যায় কাজ করছে। প্রকৃত কথা হলো সন্তানগণ এ অন্যায়গুলি শিখেছে তাদের মা-বাবার কাছ থেকে। যেমন: মা-বাবারা অবৈধ ইনকাম করে থাকেন, সরকারকে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে থাকেন, মিথ্যা কথা বলে থাকেন, সবসময় অন্যের সমালোচনা বা গীবত করে থাকেন, অন্য পরিবারের ক্ষতি করে থাকেন, স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই ঝগড়া-ঝাটি করে থাকেন, টিভিতে আপত্তিকর অনুষ্ঠান দেখে থাকেন ইত্যাদি।
উদাহরণ ১: যেমন কেউ একজন ফোন করেছে আমার কাছে, আমার সন্তান ফোন রিসিভ করে আমাকে বলছে বাবা তোমার ফোন। আমি আমার সন্তানকে বলছি 'বল বাবা বাসায় নেই'। এতে সন্তান অবাক হয়ে চিন্তা করে এটা কেমন কথা! বাবা বাসায় থেকে বলছে সে নেই! সন্তান তখন অংক মিলাতে পারে না।
উদাহরণ ২: যেমন কেউ একজন আমাকে ফোন করেছে রাত ১১টার দিকে। আমি ফোন রিসিভ করেছি এবং যিনি ফোন করেছেন অপর প্রান্ত থেকে তিনি বলছেন 'এতো রাতে ফোন করে বিরক্ত করলাম না তো?' আমি উত্তরে বলছি 'না না বিরক্ত হইনি'! কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ফোনে কথোপকথোন শেষে স্ত্রী-সন্তানদের সামনে বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করছি যে 'ব্যাটা ফোন করার আর সময় পেল না!' এখানেও সন্তান অবাক হয়ে বাবাকে দেখে যে বাবা ভদ্রলোককে ফোনে বলল 'না বিরক্ত হইনি' কিন্তু এখন বলছে পুরো বিপরীত! এখানেও সে জীবনের অংক মিলাতে পারে না।
উদাহরণ ৩ : বাসায় সাধারণত মেহমান আসলে ছেলেমেয়েরা খুশি হয়। কিন্তু কোন কোন মা-বাবারা বিরক্ত হন। মেহমানদের সামনে এক রকম আচরণ করেন এবং মেহমান চলে গেলে সন্তানদের সামনে মেহমানদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করেন। এতে সন্তানরা অবাক হয়, কেন এমন আচরণ? মেহমানদের সামনে বাবা বলছেন 'আপনারা আসাতে আমরা খুব খুশি হয়েছি, আবার আসবেন কিন্তু'। আবার মেহমান চলে যাওয়ার পর সন্তানরা দেখছে আসলে বাবা অখুশি!