📄 আমরা সবাই চাই সন্তানরা ভাল হোক, ভাল পথে চলুক
প্রতিটি মা-বাবাই চান তাদের সন্তানরা ভাল হোক, সঠিক পথে থাকুক, তারা ইসলামী মনমানসিকতার হোক। কিন্তু আমাদের এই চাওয়াটা শুধু “One way”, অর্থাৎ আমরা মা-বাবারা সবাই চাই সন্তান ভাল হোক কিন্তু আমরা নিজেদের ভাল হওয়ার ব্যাপারে তেমন সচেতন এবং সচেষ্ট নই। আমরা নিজে যেভাবে ইচ্ছে চলবো, যেখানে ইচ্ছে যাবো কিন্তু সন্তানদের বেলায় চাই বিনা চেষ্টাতেই তারা সঠিক পথে চলুক যা কখনো সম্ভব নয়।
মাটি যখন নরম থাকে তখন তা দিয়ে যেমন ইচ্ছে তেমন পাত্র তৈরী করা যায়। কিন্তু মাটি শক্ত হয়ে গেলে তখন তা দিয়ে যেমন ইচ্ছে তেমন পাত্র তৈরী করা খুবই কঠিন। পাত্র যদিও তৈরী করা যেতে পারে সেজন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। তাই আমাদের সন্তান যখন কম বয়সের থাকে তখন থেকেই উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বড় হয়ে গেলে এই পরিবেশে সঠিক পথে নিয়ে আসা খুবই কঠিন। যাদের সন্তান বড় হয়ে গেছে তাদের তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
উদাহরণ ১: টরন্টোর একটি বাস্তব ঘটনা। একটি ইসলামিক প্রোগামে মা তার ক্লাস নাইনে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে এসেছেন কিছু ইসলামী কথা শুনানোর জন্যে। প্রোগ্রাম চলছে কিন্তু এক মুহূর্তে এসে ঐ মেয়ের আর এসব কুরআন-হাদীসের কথা ভাল লাগছে না। সে কোনভাবেই বসে থাকতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে দুই হাত দিয়ে নিজের দুই কান চেপে ধরে বসে আছে যেন ইসলামের কথা শুনতে না হয়। এখানে মেয়ের কোন দোষ নেই, কারণ সে ছোটবেলা থেকে এই ধরনের কোন কথা শুনেনি। তাই তার কাছে কুরআনের কথাগুলো ভাল লাগছে না, অসহ্য মনে হচ্ছে। এখানে দোষ মা-বাবার।
উদাহরণ ২: এটিও টরোেন্টর একটি ঘটনা। একটি পরিবার তার সন্তানদের ইসলামের কথা শুনানোর জন্য তার নিজের বাসায়ই একদিন ইসলামিক প্রোগ্রামের আয়োজন করেছেন। ড্রইংরুমে প্রোগ্রাম চলছে কিন্তু বাড়িওয়ালার হাইস্কুলে বা কলেজে পড়ুয়া ছেলেটি প্রোগ্রামে না বসে নিজের রুমে বসে আছে। বাবা বারবার তাকে ডাকছেন কিন্তু আসছে না। এক সময় বাবা ছেলের এক বন্ধুকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছেন ছেলেকে আনতে। ছেলেটি এবার এসে সকলের সামনে বাবাকে একটি ধমক দিয়ে বলে গেল "বারবার ডাকছো কেন"? তারপর সে প্রোগ্রামে না বসে আবার তার রুমে চলে গেল, বাবা কিছুই বলতে পারলেন না। এই ঘটনায়ও সন্তানের কোন দোষ নেই, সে ছোটবেলা থেকে ইসলামিক গাইড পায়নি। এখন তাকে জোর করে একদিন ইসলামিক প্রোগ্রামে বসিয়ে অ্যান্টিবাইয়টিক দিয়ে লাইনে আনা যাবে না। বিষয়টা একদিনের না।
এমন অনেক মা-বাবা আছেন যারা তাদের সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তুলেননি কিন্তু সন্তান বড় হবার পর তাকে সঠিক বানাতে চান, ইসলামের পথে আনতে চান। সন্তানকে ইসলামের পথে আনতে চেয়ে সন্তানকে জোর করে হাজ্জে পর্যন্ত পাঠান এই আশায় যে, হাজ্জ থেকে ফিরে এসে সন্তান ভালো সন্তান হয়ে যাবে। অথচ হাজ্জে যাবার সময় ঐ সন্তান ওযুর ফরয কয়টি তাও জানে না, ফরয গোসলের নিয়মও জানে না, সলাতে শুধু উঠা বসাই করতে জানে। যে সকল মা-বাবাদের সন্তানরা এখনো শিশু, তারা অবহেলা করে নিজ জীবন দিয়ে অভিজ্ঞতা নেবার সাহস যেন না করি। এখুনি সচেতন হই।
তাই সকল মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ, আমরা আমাদের সন্তানদের যদি ভাল চাই তাহলে তাদের পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরকেও ভাল হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাদেরকে গাইড করার পাশাপাশি নিজেদেরকেও ইসলামিক গাইড অনুযায়ী চলতে হবে। তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি নিজেরাও নিয়মিত পড়াশোনা করে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। কারণ আমরা নিজেরা যদি সঠিক পন্থায় না চলি, কুরআনের দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে জীবনযাপন না করি তাহলে শুধু সন্তানদের ভাল চাওয়ায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া যাবে না।
📄 বেশীরভাগ মা-বাবার ভুল ধারণা
যদি মনে করি যে ভাল স্কুলে বা ভাল কলেজে বা ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেই আমি চিন্তা-মুক্ত, এখন কেবল সন্তানের ভাল রেজাল্ট আর ভাল চাকুরীর অপেক্ষা, আর এভাবেই আমার সন্তান একজন বড় কর্মকর্তা হবেন। এভাবে একমুখী (ওয়ান ওয়ে) চিন্তা করলে আমার সন্তান একজন বড় কর্মকর্তা হওয়ার পাশাপাশি একজন অমানুষ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। কারণ এখনকার স্কুল কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার এমন কোন ব্যবস্থা নেই যেখানে নীতি নৈতিকতা শেখানো হয় যা ইসলামের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মা-বাবাদের মধ্যে কোন কোন সময় একটি ভুল হিসেব কাজ করে। আমরা মনে করি আমার সন্তান সবসময় আমার কথা শুনবে। এটা সবসময় ঠিক নয়। আমার সন্তান এক স্বাধীন সত্তা। তার নিজস্ব অভিরুচি, ধ্যানধারণা, কল্পনা শক্তি, বোধশক্তি, পছন্দ-অপছন্দের স্বতন্ত্র তালিকা রয়েছে। আমি চাইবো আর সে তা মেনে নেবে এটা সবক্ষেত্রে আশা করা ঠিক নয়। সুতরাং তার জন্য মা-বাবাদের উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। তাকে কেবল ভাল হওয়ার Theory শিক্ষা দেয়া যাবে না। সাথে Practical ও করাতে হবে। নিজে একটি ভাল কাজ করে তাকে তা উপলব্ধি করার সুযোগ দিতে হবে।
যেমন: আমার গরীব আত্মীয়ের খোঁজ খবর যেন নেই। সামর্থানুযায়ী তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করি। সন্তানকেও এর গুরুত্ব বুঝিয়ে বলি। নিজে ঘরে ঢুকার সময় সালাম দিয়ে প্রবেশ করি। সন্তানকে প্রতিদিন সালাম দেই। আমাদের সমাজে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভুল প্রত্যাশা হলো ছোটদের কাছ থেকে সালাম আশা করা। এটা এক জঘন্য বিকৃতি ও সত্যের খেলাফ। আসলে সালামের মাধ্যমে আমি দু'আ করি। আমি তো চাই সন্তানের কল্যাণ। সুতরাং সন্তানকে দেখা মাত্রই যেন সালাম দেই। তাহলে সে খুব সহজে শিখে নেবে। রসূলুল্লাহ ﷺ বেশী বেশী সালামের প্রচলনের জোর তাগিদ দিয়েছেন। এতে করে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়। সম্মান বৃদ্ধি পায়।
📄 দ্বীন সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা
ঈমানের অন্যতম দাবী হলো দ্বীনের জ্ঞানার্জন করা। আমার যদি দ্বীন সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞানই না থাকে তাহলে কিভাবে নিজ পরিবারকে দ্বীনের আলোকে গাইড করবো? কিভাবে সন্তানদের অন্তরে সামান্য হলেও দ্বীনের আলো ঢুকাবো? যুগ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার ভাসাভাসা দ্বীনি জ্ঞান দিয়ে উঠতি বয়সের সন্তানদের আর বুঝ দিতে পারবো না।
আমাদেরকে কিছু কুরআনের তাফসীর, সহীহ হাদীস গ্রন্থ, হারাম-হালালের বিধান সম্বলিত বই, কিছু ইসলামী সাহিত্য, রসূল (ﷺ)-এর জীবনী, সাহাবীদের জীবনী ইত্যাদি জোগাড় করে অধ্যয়ন করে নিতে হবে। তাহলে পরবর্তী জেনারেশনকে দ্বীনের চির-আধুনিক চিত্রটি তুলে ধরা সম্ভব হবে। তা না হলে আমাদের এই চরম সীমাবদ্ধতা ও কেবল বাপদাদার রসম রেওয়াজের জ্ঞান দিয়ে আমরা আমাদের পরবর্তী বংশধরদের দ্বীন হতে দূরে ঠেলে দেবো। আসুন জ্ঞানের সবচাইতে বিশুদ্ধ মাধ্যম কুরআন ও সহীহ হাদীস হতে যাবতীয় সবকিছু জানার ও বুঝার চেষ্টা করি। এভাবে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পাবো। জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করতে পারবো। তখন উপলব্ধি হবে যে জীবন মানে কেবল সকালে ঘুমঘুম চোখে অফিসে দৌড়ানো নয়। জীবন মানে কেবল সংসারের ঘানি টানা নয়। জীবন মানে শুধু অর্থ কামাই করাই নয়। এর বাইরে জীবনের বিশাল ক্ষেত্র রয়ে গেছে। সেগুলি আরো আনন্দদায়ক, আরো চ্যালেঞ্জিং, আরো কালারফুল। তখন বুঝবো আসল মানবপ্রেম কাকে বলে। দেখবো দুনিয়াটা কতগুলি সূদী মহাজনের নেতৃত্বে চলছে। বুঝবো তারা আমাদের যে মূল্যবোধ গিলাচ্ছে তা কতগুলি অখাদ্য আর কুখাদ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ রয়েছে আল কুরআনে। মানুষ পরিচালনার জন্য রয়েছে উন্নত মানবিক পদ্ধতি। তখন আফসোস করবো বর্তমানের অর্থহীন বস্তুপূজার জন্য। সময় নষ্ট করার অভিযোগে নিজেকে তিরস্কার করবো। দ্বীনের বিশাল এ নিয়ামত হতে বঞ্চিত করার জন্য নিজেকে নিজে ভর্ৎসনা করবো। কেবল ৩৩ মার্কস পেয়ে পাশ করার ছোট মনের চিন্তা হতে বেরিয়ে লেটার মার্কস পেয়ে আল্লাহর প্রিয় হবার লোভনীয় বাসনা জাগবে। দেখবো জীবনের রুটিন ও স্টাইল আগাগোড়া পরিবর্তন হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন। আমিন।
📄 আমরা সন্তানদের সবসময় ছোট মনে করি
আমার সন্তান একটি স্বতন্ত্র সত্ত্বা। মা-বাবাদের একপেশে স্বভাব হলো সন্তানদের সবসময় ছোট মনে করা। আমরা প্রায় এরকম মন্তব্য করি যে, আমার ছেলে এখনো অল্প বয়স্ক, সে আর একটু বড় হোক তারপর নিয়মকানুনের ব্যাপারে কঠোর হওয়া যাবে। আমরা মা-বাবারা মনে করি সন্তানগণ সবসময় আমাদের কথা শুনবে। এ একটি ভুল ধারণা। আমার দৃষ্টির আগোচরে সন্তানগণ বড় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন টের পাওয়া যাবে যে সে আর আমার কথা শুনছে না। আমার যৌক্তিক দাবীগুলিও মানছে না। আমাকে হেয় করা শুরু করেছে। তখন আর কিছু করার সময় থাকবে না। পারিবারিক, ধর্মীয় ও সামাজিক কোন মূল্যবোধে যদি আমি বিশ্বাস করি তাহলে সেগুলিতে ছোটকাল হতেই অভ্যাস করাতে হবে।
বিত্তবান মা-বাবাদের অবস্থা আরো করুণ। তাদের জন্য আফসোস। যে অর্থের পেছনে ছুটে তারা সন্তানদের সময় দেন না, পরবর্তীতে সে অর্থকে অনর্থের মূল বলে মনে করতে থাকেন। বেলাশেষে আফসোস করেন কিন্তু তখন বেশ দেরী হয়ে যায়। বিত্তশালী পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিয়ে ক্ষতি করেন। কিন্তু শেখার এ সময়টিতে মা-বাবারা সন্তানদের প্রাচুর্যে ভাসিয়ে দেন। ফলে সন্তানদের মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা সৃষ্টি হয় না। কঠিন অবস্থায় নিজেকে সামলিয়ে চলার শিক্ষার অভাবে সে খেই হারিয়ে ফেলে।