📄 আমি কি চাই না আমার সন্তানের মনে ভাল উপাদানগুলি বেশী করে ঢুকুক?
শিশু, বালক, যুবক, বৃদ্ধ সকলের মন এক চলমান মেশিন। এ মেশিন সর্বদা সচেতন ও অবচেতনমনে ইনপুট গ্রহণ করছে। সে ইনপুট প্রসেস হয়ে আউটপুট বেরোয় মানুষের কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে। ফলে কেউ হয় দানশীল, কেউ উদ্ধত, কেউ হয় আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা আবার কেউ হয় বিপথগামী। আমার শিশু কোন না কোন কিছু শিখছে। প্রতিদিন সে নিত্য নতুন কায়দা রপ্ত করছে। এটা ভাবা যাবে না যে আমি যদি কিছু না শেখাই তাহলে কোথা হতে সে শিখবে? আসলে এই ধারণা ভুল, আশেপাশের পরিবেশ, টিভি, রেডিও, বাবা-মায়ের আচরণ সবকিছু হতে প্রতিনিয়ত সে ইনপুট সংগ্রহ করছে。
সুতরাং আমি কি সতর্ক হবো না? আমি কি চাই না আমার সন্তানের মনে ভাল উপাদানগুলি বেশী করে ঢুকুক? আমি কি চাই না আমার সন্তান একজন ভাল প্রফেশনাল হওয়ার পাশাপাশি একজন ভাল মুসলিম হোক? আমি কি চাই না সে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি কুরআন হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্বীনের উপর অনর্গল বক্তৃতা দিয়ে অমুসলিমদের হিদায়াতের নূর দেখাক?
আসুন চোখ বন্ধ করে খানিক চিন্তা করি। হলিউড-বলিউড বা এর অন্ধ অনুসারী অন্য টিভি চ্যানেলগুলি প্রতিনিয়ত মুভি আর বিচিত্র অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে। বলিউডের প্রভাব এখন প্রযুক্তির আশীর্বাদে সর্বত্রই দৃঢ়ভাবে প্রসারিত। আমি এবং আমার সন্তানেরা প্রতিনিয়তই এগুলি হতে মনের খোরাক নিচ্ছি। শিশুরা অনুকরণ প্রিয় হবার কারণে এসব বিনোদনের মৌলিক বিষয়গুলির সাথে খুব সহজে পরিচিত হয়ে যায়। এভাবেই তাদের মননশীলতার উপর ঐসব উপাদানগুলির স্থায়ী প্রভাব পড়ে। আসুন এবার চিন্তা করি এসব অখাদ্য কুখাদ্যের বিপরীতে আমি নিজে ও আমার শিশু কী ইনপুট নিচ্ছি? খোদ হলিউডের জন্মস্থান হতেই এখন এর কুরুচি আর বিকৃত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শ্লোগান উঠেছে। এর বদৌলতে শিশুরা বইয়ের চাইতে বন্দুকের প্রতি বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ড্রাগ, ভায়োলেন্স, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া ইত্যাদির অবদানে হলিউড বেশ নাম করেছে。
হলিউড সংস্কৃতি আজ এমন এক টর্ণেডোর নাম যা সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে লজ্জা শরমের অবশিষ্টাংশ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে ফেলতে চায়। এক আমেরিকান আইডলই দুনিয়া কাঁপানোর জন্য যথেষ্ট। আমি এবং আমার পরিবারকে এগুলি হতে বিরত রাখার দায়িত্ব আমার নিজের। এটি আমার একান্ত বুঝ ও বিশ্বাসের গভীরতার উপর নির্ভর করে। তবে সন্তানের চরিত্র গঠনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্ট্রাটেজীর অংশ হিসেবে হলিউড, বলিউডের কুখাদ্যের পাশাপাশি যদি কিছু সুস্থ খাবার সরবরাহ না করা হয় তাহলে এ সন্তানটি যে কি হবে তা ভবিষ্যতে টের পাওয়া যাবে যখন আমার বয়স ৫০/৬০ এর কোঠায় গিয়ে পৌঁছবে। তখন চিন্তা করে কোন কুলকিনারা করা যাবে না। কারণ আমার শিশু তখন বড় হয়ে যুবক হয়ে গেছে। তার নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরী হয়ে গেছে। এখন তার নতুন বিশ্বাস (ঈমান) ও মূল্যবোধের দাওয়াতী কাজের প্রথম টার্গেট হবো আমরা নিজে。
একটি সত্য ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষণীয় হিসেবে একজন অধ্যাপকের চিন্তা-চেতনা এখানে তুলে ধরা হলো। ইনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। তিনি এখন সন্তানদের মূল্যবোধ নিয়ে চিন্তাক্লিষ্ট। কেবল ভাবেন আর ভাবেন। ইতিমধ্যে সন্তানগণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করেছে। তিনি কি পারবেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের মন আর বিশ্বাসের উপর নতুন কোন প্রলেপ দিয়ে নিজের মত করে নিতে? এটা সহজ হতো যদি তিনি শিশু বয়স থেকে সন্তানকে একজন আধুনিক মানুষ ও আল্লাহর একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন。
আরেকটি সত্য ঘটনা: আমাদের পরিচিত একটি পরিবার, ভাই ভাবী দু'জনেই উচ্চ শিক্ষিত, দুই ছেলে এক মেয়ে, মেয়েটি বড় এবং হাইস্কুলে পড়ে। একদিন ভাইকে পরামর্শ দিলাম মেয়েটিকে সপ্তাহে বন্ধের একদিন ইসলামিক স্কুলে দেয়ার জন্য, পাঁচ ঘন্টা ক্লাস। যেন সে সাধারণ পড়ালেখার পাশাপাশি ইসলাম শিখতে পারে। এই প্রস্তাব শুনে বাবা বললেন, "আমার মেয়ে তো খুব ভাল স্টুডেন্ট, এই ইসলাম শিখতে গিয়ে তার পড়ালেখার কোন ক্ষতি হবে না তো?” শেষ পর্যন্ত বাবা মেয়েটিকে সপ্তাহে একদিন কয়েক ঘন্টার জন্য ইসলাম শিখতে দেননি। অনেক পরিবারেরই ভুল ধারণা, তাদের ভয় ইসলাম শিখতে গিয়ে সন্তানের পড়ালেখার ক্ষতি হতে পারে, সে যদি আবার ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পারে!
অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। হাইস্কুল পাস মেয়েরা আজকাল নিজেরাই একটা আদর্শ তৈরী করে নেয়। সেটি হতে পারে Rock n Roll এর আদর্শ, কিংবা আমেরিকান আইডলের আদর্শ, কিংবা ইন্ডিয়ান কোন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গায়ক বা গায়িকার আদর্শ। শুধু তাই নয়, এর বাইরে কোন কিছুকে তারা সেকেলে বা নিম্নস্তরের জিনিস মুখে না বললেও ভাবে তা প্রকাশ করে দেয়। অন্যদের সে আদর্শের অনুসারী বানানোর চেষ্টা করে। আফসোস, এই পরিবারটি বিষয়টি বুঝলেন না। তাই আসুন শিশুদের উপযোগী ইসলামী ডিভিডি ইত্যাদি সংগ্রহ করি। সন্তানদের সেগুলি উপভোগ করার জন্য উৎসাহিত করি। হিকমতের সাথে ও তাদের স্বতন্ত্র সত্তার কথা বিবেচনা করে ধীরে ধীরে এগুতে থাকি। এসব ইসলামী শিক্ষামূলক বই, ডিভিডি খুব সহজেই আজকাল পাওয়া যায়। এছাড়া ইউটিউবতো রয়েছেই।
📄 আমি কি চাই এই প্রতিকূল পরিবেশে আমার সন্তানের ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি হোক?
একসময় আধুনিক ছেলেমেয়েরা রেডিও শুনতো না। কিন্তু যুগ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন ছেলেমেয়েরা নিয়মিত রেডিও শুনে মোবাইলের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এখন কয়েকটি রেডিও চ্যানেল চালু হয়েছে। এই চ্যানেলগুলো উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কারণ এই চ্যানেলগুলো ছেলেমেয়েদের অবাধ প্রেম নিবেদনের মিডিয়া হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে তারা তাদের ভালবাসা-ভালোলাগার কথা ব্যক্ত করতে পারে। এছাড়া টিভি চ্যানেলগুলোতেও এই জাতীয় প্রোগ্রামও চালু হয়েছে যার মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা তাদের প্রথম (ক্রাস) ভালোলাগার কথা ব্যক্ত করে। এছাড়া আরো রয়েছে মোবাইল কোম্পানীগুলোর রাত বারটার পর ফ্রী টক টাইম ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ প্যাকেজ যার মাধ্যমে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের অবাধ এবং সীমাহীন কথোপকথোন। এরপর তো রয়েছে ফেইসবুকের মাধ্যমে অবাধ বুন্ধুত্ব। সারাদিন স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং বাইরের পরিবেশ তারপর ডিসের মাধ্যমে ঘরে ঘরে হিন্দি চ্যানেলে সিনেমা, নাচ, গান, সিরিয়াল。
চারিদিক দিয়ে আমাদের সন্তানদের আক্রমণ করছে! কোথায় যাবে তারা? পালাবার কোন রাস্তা নেই! কুরআনের ইতিহাস থেকে আমরা দেখেছি যে, পূর্বে যখন একেকটা জাতি এভাবে পাপের সীমা ছাড়িয়ে গেছে তখন আল্লাহ সেই জাতিগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, যেমন আদ জাতি, সামুদ জাতি, লুত জাতি। আমাদের সামনেও মহাবিপদ! চারিদিকে আগুন, আমাদের সন্তানরা এই আগুনের মধ্যে বসবাস করছে。
আমাদের সন্তানদেরকে এই আগুন থেকে রক্ষা করতে হলে একটিই পথ আর তা হচ্ছে তাদের ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করতে হলে সর্বপ্রথমে তাদেরকে ঈমানের উপর সঠিক জ্ঞান দিতে হবে। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে আল্লাহ ভীতি এবং আল্লার প্রতি ভালবাসা বাড়াতে হবে। এই দু'টি বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট প্যাকেজ সিরিজের প্রকাশিত ১ম ও ২য় বই ঈমানের স্বচ্ছ ধারণা ও তাকওয়া জোগাড় করে খুব ভালভাবে পড়তে হবে। ইনশাআল্লাহ এর মাধ্যমে আমরা শিখতে পারবো কীভাবে ঈমানকে মজবুত করা যায়, কীভাবে ঈমানকে renew করা যায়, কীভাবে ঈমানের উপর টিকে থাকা যায় ইত্যাদি। আর তাকওয়ার মাধ্যমে জানতে পারবো কীভাবে আল্লাহকে ভালবাসা যায় এবং তাঁর ভালবাসা অর্জন করা যায়, কীভাবে আল্লাহর প্রতি ভয় বাড়ানো যায়, কীভাবে আল্লাহর প্রতি সচেতনতা বাড়ানো যায় ইত্যাদি।
📄 আমি কি এখনও সাবধান হবো না?
১. আমি কি জানি সন্তানদের মনে নিয়মিত কালচার আর ফ্যাশনের নামে আল্লাহবিরোধী বিশ্বাস ঢুকছে?
২. আমি কি জানি স্কুল-কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি থেকেই তারা নানা রকম শিরকে লিপ্ত হচ্ছে?
৩. আমি কি জানি কী ধরনের বই তারা পড়ে? এবং এই গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে স্লো-পয়জনে তারা কিভাবে আক্রান্ত হচ্ছে?
৪. আমি কি জানি তাদের কাছে এডাল্ট ডিভিডি বা পর্নগ্রাফী আছে কি না?
৫. আমি কি জানি তারা কী ধরনের গান শুনে? আর অনেক গানের কথাই তো শিরক মিশ্রিত!
৬. আমি কি জানি ইসলামী অনুষ্ঠানের নামে আমি এবং আমার সন্তানেরা নানা রকম সুন্নাতের বিপরীত "বিদ'আতী” কাজ করে যাচ্ছি?
৭. বেশীরভাগ স্কুল-কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিগুলোতে শিক্ষার এমন কোন ব্যবস্থা নেই যেখানে ইসলামী নীতি-নৈতিকতা শেখানো হয়।
৮. আমি কি জানি ১৩ (সাবালিকা) বছর বয়স থেকে আমার মেয়ের উপর পর্দা ফরয?
৯. আমার কন্যা পর্দা না করার কারণে যারা তাকে দেখে চোখ ও মনের জিনায় লিপ্ত হচ্ছে তাদের এ কবীরা গুণাহের জন্য আখিরাতে আমি দায়ী হবো সে কথাটা ভেবে দেখেছি কখনো?
📄 আমাদের প্রয়োজন আগেই মানসিক প্রস্তুতি
এই অধ্যায় পড়ে আমরা কেউ কেউ ঘাবড়ে যেতে পারি বা মনের মধ্যে নানা রকম চিন্তা এবং প্রশ্ন আসতে পারে। হতে পারে সেটা ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা। যেমন:
* আমার সন্তানতো অনেক ভাল এবং ভদ্র। আমার সন্তানের মধ্যে তো এ সকল দোষত্রুটি নেই, কেন এসব কথা বলা হচ্ছে?
* আমার সন্তানতো ইসলামিক মাইন্ডের, আমার সন্তানতো আমার বাধ্য। আমরা মা-বাবারাও ইসলামিক মাইন্ডের। আমরা সবাই সলাত আদায়কারী। তাহলে সমস্যা কোথায়?
* এতো নেগেটিভ কথা বলা হচ্ছে কেন? আমাদের সন্তানদের মধ্যে তো অনেক ভাল গুণও আছে। আর নেগেটিভ কথাগুলো এতো সরাসরি বা এতো কঠিন করে বলা হচ্ছে কেন?
ভুল ধারণার অবসান
মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ এই অধ্যায় পড়েই যেন কেউ ভুল ধারণা পোষণ না করি। হয়তো এই সমস্যা আমার সন্তানদের নিয়ে নেই, হয়তো আমার সন্তান এখনো অনেক ছোট, বা আমার সন্তান স্কুল কলেজ পাশ করে ফেলেছে অথবা আমার এখনো সন্তান হয়নি। এই সমস্যাগুলো যে শুধু আমার একার তা হয়তো না, হতে পারে এটা অন্য কারো। আসলে এ চিত্র শুধু যে মুসলিমদের মাঝে তাও নয়, হতে পারে এটা মুসলিম-অমুসলিম সব দিকেই আছে। আমাদের সকলের দায়িত্ব একে অপরকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা。
আমাদের সন্তানেরা এই প্রতিকূল পরিবেশে ইসলামিক স্কুলে পড়তে পারলে ভাল, না পারলে অবশ্যই সাধারণ স্কুলে পড়বে। সাধারণ স্কুল থেকে সব ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে ইসলামিক স্কুলে ভর্তি করে দিতেও বলা হচ্ছে না। এটাই বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে সাধারণ স্কুলে পড়েও আমাদের সন্তানরা কিভাবে একজন ভাল একাডেমিক হওয়ার পাশাপাশি একজন ভাল মুসলিম হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক, কোন মা-বাবা নিজ সন্তানদের সম্পর্কে নেগেটিভ কথা শুনতে পছন্দ করেন না। কিন্তু কিছু কিছু সত্য কথা সরাসরি না বললে ভালভাবে বুঝা যায় না এবং অনুধাবনও করা যায় না。
তাই বুঝার সুবিধার্থে এই বইতে অনেক সত্য কথা এবং সত্য ঘটনাই সরাসরি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কথাগুলো যে সবাইকে বলা হচ্ছে ব্যাপারটাও তা নয়। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের সকলেরই দায়িত্ব সমাজের কল্যাণের কথা চিন্তা করা। ঘটনা ঘটবার আগে নিজেরা সচেতন হওয়া এবং অপরকে সচেতন করা। আর এটাই আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে প্রতিটি মু'মিনের দায়িত্ব। তাই আসুন পুরো বইটি খুব মনোযোগের সাথে পড়ার চেষ্টা করি এবং বাস্তব ভিত্তিক সমাধানের চিন্তা করি।