📄 শিশুদের সাথে কথা বলা
শিশুদের কথা বলার সময় প্যারেন্টদের উপস্থিত থাকা উচিত
* শিশুরা সাধারণত যে বয়সে বেশী কথা বলে। যেমন: ঘুমানোর আগে শুয়ে শুয়ে, ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার আগে, গাড়িতে কোথাও যাবার সময়।
* তাদেরকে এটা বুঝতে দিতে হবে যে, সে যে বিষয়ের গুরুত্ব দিচ্ছে তা তার মা-বাবাও গুরুত্ব দিচ্ছে।
* শিশুরা যে কাজগুলো করে তার সাথে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে একদিন মা-বাবার উচিত সময় দেয়া এবং সেই কাজগুলো করা।
* শিশুদের কাছে যে বিষয়গুলো বেশী আগ্রহ সেই বিষয়গুলোর উপর মা-বাবার উচিত দক্ষতা অর্জন করা।
শিশুদের বুঝতে দিতে হবে যে প্যারেন্ট তার কথা গুরুত্বসহকারে শুনছে
* শিশুরা যখন কোন একটি বিষয়ে কথা বলা শুরু করে তখন মা-বাবার উচিত তাদের নিজের কাজ বন্ধ করে দিয়ে শিশুর কথা শুনা।
* তাকে বিরক্ত না করে বা তাকে কথার মাঝখানে বন্ধ করে না দিয়ে তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
* যদি তার কথা ঠিক মতো বুঝাও না যায় তবুও তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনা উচিত।
* তাদের কথা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা-বাবা কোন কথা বলা ঠিক নয়।
* তার কোন কথা বুঝা না গেলে তাকে আবার জিজ্ঞেস করা উচিত。
এমনভাবে শিশুদের সাথে আচরণ করতে হবে যেন তারা কথা শুনে
* তাদের সাথে শক্ত কথাও নরম করে বলতে হবে, তাদের সাথে রাগান্বিত কন্ঠে অথবা প্রতিরোধের কন্ঠে কথা বলা যাবে না।
• তাদেরকে ছোট করে বা হেয় করে কোন কথা বলা যাবে না। স্বীকার করতে হবে যে তার দ্বিমত করার অধিকার আছে।
• তাদের সাথে দ্বিমত নিয়ে তর্ক করা ঠিক নয়। বরং এভাবে বলা যেতে পারে যে, "আমি জানি তুমি আমার সাথে একমত নও কিন্তু আমি এটা মনে করি"।
• শিশুর সাথে কথোপকথনের সময় শ্রোতার নিজের অনুভূতির কথা বাদ দিয়ে শিশুদের অনুভূতির দিকে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে।
প্যারেন্টদের আরো মনে রাখা উচিত
• শিশুর সাথে কথোপকথনের সময় তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, সে কি কিছু চায়? বা তার কি কিছুর প্রয়োজন আছে?
• শিশুরা সাধারণত মা-বাবাকে নকল (অনুকরণ) করে। তারা দেখে মা-বাবা কিভাবে সমস্যার সমাধান করেন。
• শিশুদের সাথে তাদের মতো করে কথা বলতে হবে। তাদেরকে লেকচার দেয়া যাবে না, তাদেরকে বিরূপ সমালোচনা করা যাবে না, তাদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলা যাবে না এবং তারা মনে কষ্ট পেতে পারে এমন কোন কথাই বলা যাবে না।
• শিশুরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী নতুন নতুন বিষয় শিখতে থাকে। যদি তার শিক্ষার মধ্যে ক্ষতিকারক কিছু না থাকে তাহলে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়।
• শিশুরা অনেক সময় বাবা-মাকে পরীক্ষা করে যে বাবা-মা তার কথা শুনে কিনা। সে যে বিষয়ই নিয়ে আসুক না কেন তার গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। তা না হলে সে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
📄 শিশুদের নিয়ে আরো কিছু মূল্যবান টিপস
১. শিশুরা যেন কখনো শুয়ে শুয়ে না খায়।
২. শিশুরা যখন ঘুমায় তার সাথে মা অথবা বাবারও ঘুমানো উচিত।
৩. শিশুদের সামনের কখনো উঁচু গলায় কথা বলা ঠিক নয়।
৪. দুই বছরের আগে শিশুদের টিভি দেখতে দেয়া ঠিক নয়।
৫. শিশুদের দিনে দুই ঘন্টার বেশী টিভি দেখতে দেয়া ঠিক নয়。
৬. গানে গানে যে সকল শিক্ষণীয় বিষয় আছে তা তিন বছর বয়স থেকে দেখতে দিলে ভাল।
৭. শিশুদের দেহ কখনো ঝাঁকানো ঠিক না বা তাদেরকে ছুঁড়ে মারা ঠিক নয়।
৮. মা-বাবারা শিশুদের সামনে কখনো ঝগড়া করতে নেই।
৯. মা-বাবারা শিশুদের সামনে কখনো তর্ক করাও উচিত নয়।
১০. শিশুদের শাস্তি দেয়া মোটেও ঠিক নয়।
১১. দিনে অন্তত পক্ষে ২০ মিনিট শিশুদের কিছু একটা পড়তে দেয়া উচিত।
১২. শিশুদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন কিছুক্ষণ ব্যায়াম করা উচিত।
১৩. শিশুদের একেবারেই মারামারির কোন কার্টুন দেখতে দেয়া উচিত নয়।
১৪. শিশুদের কোন সাহায্য ছাড়া নিজে থেকেই দাঁড়াতে উৎসাহ দেয়া উচিত।
১৫. শিশুদের কোন আজেবাজে নামে ডাকা ঠিক নয়।
১৬. শিশুদের নতুন একটা খেলনা দেয়ার আগে পুরোনোটা সরিয়ে ফেলা উচিত।
১৭. শিশুদের অভ্যাস করানো উচিত সে যেন নিজের ময়লা করা জায়গা নিজেই পরিষ্কার করে।
১৮. শিশুদের সার এবং কেমিক্যালমুক্ত শাক-সবজি এবং অন্যান্য খাবার খাওয়ানো উচিত।
১৯. দুই বছরের শিশু দায়িত্ববোধ করে এবং নিজের কাজ নিজে করা শিখে।
২০. প্রত্যেক শিশুকে কিছু সময় একা একা থাকতে দেয়া উচিত, এতে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তবে সেই একাকীত্বটা মা-বাবার দৃষ্টির আড়ালে নয়।
২১. শিশুরা বাবা এবং মা দু'জনের কাছ থেকেই যেন গিফ্ট বা উপহার পায়।
২২. স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই তারা যেন খেলাধুলা করে।
২৩. শিশুদের বিভিন্ন কালচারের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
২৪. তাদের নিজেদেরকেই নিজের জিনিস পছন্দ করতে দেয়া উচিত।
২৫. শিশুদেরকে সাথে নিয়ে সবাই এক টেবিলে খেতে বসা উচিত।
২৬. শিশুদেরকে সাথে নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা অতি উত্তম অভ্যাস।
২৭. সবসময় তাদেরকে পজিটিভভাবে উৎসাহ দেয়া উচিত।
২৮. শিশুদেরকে খেলায় হারতে দেয়া উচিত এবং এভাবে শিক্ষা দেয়া উচিত যে কিভাবে খেলায় ভাল করতে হয়।
২৯. শিশুদের কখনো চড়-থাপ্পড় দেয়া উচিত নয়।
৩০. তাদেরকে বুঝতে দিতে হবে যে খারাপ কাজের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
৩১. সময় সময় তাদেরকে অন্যান্য শিশুদের সাথেও খেলতে দেয়া উচিত।
৩২. শিশুদের আগুন নিয়ে অথবা ধারালো কিছু নিয়ে কখনো খেলতে দেয়া মোটেও ঠিক নয়।
৩৩. শিশুদের কখনো খেলনা পিস্তল বা বন্দুক দিয়ে খেলতে দেয়া উচিত নয়।
৩৪. খেলার শেষে তার খেলনাগুলো যেন সে গুছিয়ে এক জায়গায় রাখে এই শিক্ষা দেয়া।
৩৫. শিশুরা যখন কাঁদে তখন তাদেরকে কাঁদতে দেয়া উচিত, জোড় করে থামিয়ে দেয়া উচিত নয়।
৩৬. শিশুদেরকে কাদা, মাটি, ধুলা ইত্যাদি দিয়েও খেলতে দেয়া উচিত।
৩৭. মেয়ে শিশুদেরকে নিজ মায়ের বড় বড় ড্রেসগুলো পড়তে বাধা দেয়া উচিত নয়।
৩৮. একইভাবে ছেলে শিশুদেরকে নিজ বাবার জুতা, শার্ট ইত্যাদি পড়তে বাধা দেয়া উচিত নয়।
৩৯. শিশুদের জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
৪০. পটি (potty) ট্রেনিং ছেলে শিশুদের তিন বছর বয়সে এবং মেয়ে শিশুদের দুই বছর বয়সে দেয়া উচিত।
৪১. শিশুদের গায়ে মাথা রেখে কখনো শোয়া ঠিক নয়।
৪২. শিশুদের নতুন নতুন কাজ করতে দেয়া উচিত, তাদের কাজে বাধা না দিয়ে উৎসাহ দেয়া উচিত।
৪৩. শিশুদের সাথে প্রতিদিন ফান (fun) করা এবং হাসাহাসি করা উচিত।
৪৪. তাদেরকে নিজের ভুল নিজেই সংশোধন করতে দেয়া উচিত।
৪৫. মা-বাবা যখন কোন ভুল করবেন, তখন শিশুদেরকে সরি (sorry) বলা উচিত।
৪৬. শিশুরা যেন দেখে যে মা-বাবাকে এবং বাবা মাকে ভালবাসে।
৪৭. শিশুদেরকে মা-বাবার প্রতিদিন বলা উচিত যে আমরা তোমাকে খুব ভালবাসি।
৪৮. শিশুদের যখন দাঁত উঠা শুরু করে তখন তাদেরকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী অথবা আরবী ভাষাও শিক্ষা দেয়া উচিত।
৪৯. শিশু বয়সে একটি শিশু এক সাথে চারটি ভাষা আয়ত্ত করতে পারে।
৫০. স্বামী-স্ত্রীর গোপনীয় মুহূর্তগুলো যেন শিশুর সামনে প্রকাশ না পায় কখনো।
৫১. তাদের সাথে সবসময় ধৈর্যধারণ করতে হবে।
কাজের বুয়ার মাধ্যমে শিশু লালন-পালন ঠিক নয়
সন্তানের বেড়ে উঠার বয়সে আমরা বাবা-মায়েরা একটা বড় ধরণের ভুল করে থাকি আর তা হচ্ছে ছোট সন্তানকে কাজের বুয়ার মাধ্যমে লালন-পালন করা। স্বাভাবিকভাবেই একজন কাজের বুয়ার কতটুকু জ্ঞান রয়েছে একটি শিশুকে নীতি-নৈতিকতা দিয়ে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। বুয়াদের সাধারণত সাধারণ শিক্ষাই থাকে না তার উপর আবার ইসলামী শিক্ষা থাকা তো দূরের কথা। আমরা যদি খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা গেছে যে বাংলাদেশের ডে-কেয়ারগুলোতে মূলতঃ কাজের বুয়ারাই শিশুদের লালন-পালন করে থাকে যেখানে উন্নত দেশগুলোর ডে-কেয়ারে বেবীসিটার হিসেবে চাকুরী করতে হলে আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশনের উপর ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন নিতে হয় এবং এই সার্টিফিকেশন ছাড়া কেউ বাচ্চা ধরতেই পারে না। সেখানে আমাদের দেশে উচ্চবিত্তদের সন্তানরাও বুয়ার হাতে মানুষ হয়। তাই এই বিষয়ে বিশেষ করে সন্তানের মায়ের এগিয়ে আসা উচিত। একটি শিশুর সর্বপ্রথম গৃহ শিক্ষীকা হচ্ছেন তার মা। সন্তান আল্লাহর দেয়া আমানত, এই মহামূল্যবান আমানত বুয়ার হাতে ছেড়ে না দিয়ে মায়ের উচিত সেই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করা। যারা চাকুরী করেন তাদেরও এই বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে একটি উপায় বের করে আনা।