📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 শিশুর বেড়ে ওঠা এবং ক্রমবিকাশ

📄 শিশুর বেড়ে ওঠা এবং ক্রমবিকাশ


১ থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত
এক মাস বয়সের শিশু শব্দ শুনলে চমকে উঠে এবং কোন কিছুর দিকে নির্দিষ্টভাবে তাকায়। ২ মাসের সময় কাৎ করে শুইয়ে দিলে চিৎ হতে পারে এবং মানুষের গলার শব্দে আনন্দ বা দুঃখ পায়। ৩ মাসের সময় উপুড় অবস্থায় মাথা ও ঘাড় তোলে, শব্দের উৎস খোঁজে এবং হাসির জবাবে হাসি দিতে চেষ্টা করে। ৪ মাসের সময় কোন জিনিস দেখলে তার দিকে হাত বাড়ায়, পরিচিত চেহারা এবং গলার স্বর চিনতে পারে। ৫ মাসের সময় দু'হাত ধরে টানলে উঠে বসে এবং আয়নায় নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে চায়। ৬ মাসের সময় স্বল্প অবলম্বনে বসতে পারে এবং কথা বলতে চেষ্টা করে。

৭ থেকে ১২ মাস বয়স পর্যন্ত
৭ মাসের সময় দু'হাতে খেলনা ধরতে পারে এবং কোন কিছু পড়ে গেলে তা অনুসরণ করে। ৮ মাসের সময় হামাগুড়ি দেয় এবং লুকোচুরি খেলতে পছন্দ করে। ৯ মাসের সময় ধরে দাঁড়াতে পারে এবং কারো মুখে শোনা ছন্দ বা সংকেত অনুকরণ করে। ১০ মাসের সময় কাউকে ধরে হাঁটতে পারে এবং একাধিক শব্দ উচ্চারণ করে। ১১ মাসের সময় হাঁটু গেড়ে বসে কোন কিছু অবলম্বন করে মাটি থেকে খেলনা তুলতে পারে এবং বাবা, মামা, দাদা ইত্যাদি শব্দ বলতে চেষ্টা করে। ১২ মাসের সময় বেয়ে বেয়ে উঠানামা করতে পারে, হাততালি দেয় এবং দু' তিনটা শব্দ বুঝতে ও বলতে পারে。

২ থেকে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত
২৪ মাসের মধ্যে শিশুরা দুই তিনটা জিনিসের মধ্যে থেকে তার পছন্দের জিনিসটা খুঁজে বের করতে পারে। দুই বছর বয়সে একটি শিশু ৫০টির মতো শব্দ শিখে ফেলে। যখন সে প্রথম কথা বলতে শিখে তখন দু'টি অথবা তিনটি শব্দের বাক্য তৈরী করতে পারে, যেমন : আরো চাই, উঠো, চলো, বাইরে যাবো, খাবো না ইত্যাদি। চব্বিশ মাসের সময় তারা দৌড়াতে পারে, বলে লাথি দিতে পারে। তিন বছর বয়সে ৩০০ পর্যন্ত শব্দ মনে রাখতে পারে。

৪ থেকে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত
এই বয়সে বিভিন্ন রংয়ের নাম শিখে, সাধারণ গুনতে পারে এবং সময় বুঝতে পারে। চার বছর বয়সে গিয়ে ১৫০০ পর্যন্ত শব্দ মনে রাখতে পারে এবং পাঁচ বছর বয়সে গিয়ে ২৫০০ শব্দ পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। এই শব্দগুলো দিয়েই সে কথা বলে, বাক্য তৈরী করে। এই সময়ে ছবি আঁকতে পারে। এই বয়সে আল্লাহকে চিনে, পরিবারের মর্ম বুঝে, অন্যদের সাথে খেলতে পছন্দ করে। কিছু কিছু সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে。

৭ থেকে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত
এই বয়স থেকে তারা কে ছেলে আর কে মেয়ে তা বুঝতে পারে। ছেলেরা ছেলেদের সাথে এবং মেয়েরা মেয়েদের সাথে খেলতে পছন্দ করে। এই বয়সে মনের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্নের উদয় হয়। এই বয়সে যে যার কালচার বুঝে। এই বয়সে তাদের মধ্যে মানসিক অনুভূতিও জন্ম নেয়。

১০ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত
এই বয়সে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েরা সাধারণত বালেগ হয়ে থাকে। এই বয়সে তারা মানসিক দুঃখ এবং আনন্দ অনুভব করে। ব্যক্তিগত বিষয়গুলো কিছুটা বুঝতে থাকে। তারা বড়দের মতো চিন্তা করে কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ সময় তারা নানা রকম মানসিক বিষন্নতায়ও ভুগে থাকে。

১ বছর ২ বছর ৩ বছর ৪ বছর ৫ বছর ৬ বছর ৭ বছর

নিম্মে আমরা শিশুর লালন-পালন এবং শিশু শিক্ষার উপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

শিশুকে ঘুম পাড়ানো: অনেক মায়েরা শিশুকে যখন ঘুম পাড়ান তখন আজেবাজে কবিতা এবং গান গেয়ে ঘুম পাড়ান যেগুলোর কোন সুন্দর অর্থ হয় না। যেমন আয় আয় চাঁদ মামা শিশুর কপালে টিপ দিয়ে যা অথবা আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাঝে অথবা হাট্টিমাটিম টিম তারা মাঠে পাড়ে ডিম তাদের খাড়া দুটো শিং ইত্যাদি। সর্বপ্রথমে আমাদের উচিত শিশুর ঘুমের জন্য দু'আ বলা জোরে জোরে যা শিশু শুনতে পায়, তারপর তাকে আল্লাহর প্রশংসামূলক গান গেয়ে ঘুম পাড়ানো যেতে পারে যা শুনে শিশু উপকৃত হবে, এবং শিশুর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে। এছাড়া কুরআন থেকে ছোট ছোট সূরা এবং অন্যান্য দু'আও তাকে শুনানো যেতে পারে। এভাবে একদিন দেখা যাবে ছোট ছোট সূরা এবং দু'আগুলো তার মুখস্থ হয়ে গেছে।

শিশুর সাথে কথা বলা: যে শিশু এখনো কথা বলতে পারে না তার সাথেও কথা বলা উচিত। সে কথা বলতে না পারলেও ঠিকই শুনতে পারে। তাকে এখন যা ভাল ভাল কথা শুনানো হবে এর প্রভাব তার মধ্যে পড়বে। তাই শিশুর সাথে কুরআন হাদীস থেকে সুন্দর সুন্দর কথা বলা উচিত।

শিশুকে গল্প বলা: আমাদের দেশে দাদী-নানীরা নাতী-নাতনীর সাথে নানা রকম গল্প করে থাকেন। কিন্তু তারা সাধারণত শিশুদের সাথে রাজা-রানী, রাজকুমারী, রাজপুত্র আর রাক্ষসের গল্প করে থাকেন যার সাথে বাস্তবের কোন সম্পর্কে নেই। এগুলো সবই বানানো গল্প, শিশুদের এসব না বলাই ভালো। এই ধরনের রূপকথার গল্প থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত।

শিশুদের বই কিনে দেয়া: শিশুদের সাথে ভূত প্রেতের গল্প বলা ঠিক নয়। অনেক মা-বাবারা শিশুদের ভূত-পেতনীর গল্পের বই কিনে দেন যা মোটেও ঠিক না। এই সকল আজগুবি বই-পত্র থেকে সন্তানদেরকে দূরে রাখতে হবে। আজকাল বাজারে শিশুদের ইসলামী শিক্ষামূলক এবং জেনারেল নলেজভিত্তিক অনেক বই পাওয়া যায়। আমাদের শিশুদের এই ধরনের বই কিনে দেয়া উচিত এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে পড়া উচিত। শিশুরা দেখে দেখে শেখে বেশি। আমরা যদি চাই আমাদের সন্তান বই পড়ুক তাহলে আমাদেরকেও বই পড়তে হবে তাদের সামনে।

শিশুর সাথে খেলাধুলা করা: খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের মানসিক এবং শারীরিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। তাই তাদের খেলার সুযোগ করে দিতেই হবে। মা-বাবার উচিত শিশুদের সাথে খেলাধুলা করা, সামর্থ অনুযায়ী তাদেরকে খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দেয়া উচিত। আজকাল বাজারে অনেক প্রকার খেলনা পাওয়া যায় যা শিশুর মানসিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। অধিকাংশ মা-বাবাদের প্রশ্ন এই যে, কোন বয়সের বাচ্চার জন্য কোন ধরনের খেলনা দেবো? এছাড়াও অনেক মা-বাবা আছেন যে, বাচ্চা পছন্দ করলেই খেলনা কিনে দেন। কিন্তু হতে পারে ঐ খেলনার গায়ে উপযোগি বয়স লিখাই আছে। তারা সেটা মানতে চান না। তাতে একটু পরে বাচ্চাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং পয়সাও নষ্ট হয়। ওদিকে চকিং হ্যাজার্ড (choking hazard) তো আছেই। তাই মা-বাবাদের উচিত বাচ্চার বয়স অনুযায়ী খেলনা কিনে দেয়া। আরও একটি বিষয় হচ্ছে শিশুদেরকে শুধু কোলে কোলে না রেখে তাদেরকে ধুলা-বালি-মাটি-কাদার সাথে মিশতে দেয়া। প্রাকৃতিক জিনিস দিয়ে তাদেরকে খেলতে দেয়া উচিত।

শিশুকে টিভির সামনে বসিয়ে দিয়ে আবদ্ধ/অকেজো (engaged) না রাখা: কোন কোন শিশুর মা নিজে হয়তো কারো সাথে ফোনে গল্প করছেন অথবা কোন একটা কাজ করছেন তখন শিশুকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য টিভি ছেড়ে দিয়ে তার সামনে বসিয়ে দেন। শিশুকে একটা আপদ মনে করেন। এতে ধীরে ধীরে এক সময় শিশু টিভিতে আসক্ত হয়ে যায়। তারপর থেকে মা যখনই সুযোগ পান শিশুর যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এই সহজ কাজটি প্রায় প্রতিদিনই করে থাকেন। তিনি জানেন না তিনি শিশুর কতবড় ক্ষতি করছেন। আজকাল অহরহই বাড়িতে বা গাড়িতে দেখা যায় ছোটছোট শিশুদের হাতে একটা video game ধরিয়ে দিয়ে মা-বাবা গল্পে মত্ত। এতে কথা বলার সুযোগ হারিয়ে শিশুরা অসামাজিক (unsocial) এবং অন্তর্মুখী (introvert) হয়ে পড়ে।

টিভি ছেড়ে শিশুকে খাওয়ানো: প্রায় মায়েরাই শিশুকে খাওয়ানোর জন্য একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেয় আর তা হচ্ছে শিশুর সামনে টিভি ছেড়ে দিয়ে তাকে ঐ দিকে তার দৃষ্টির মনোযোগ দিয়ে তাকে আহার করান। এই কাজটি করা উচিত নয় কারণ খাবারের প্রতি মনোযোগ দিয়ে খাবার না খেলে সেই খাবার তেমন একটা কাজে লাগে না। আরও ক্ষতিকারক বিষয় হচ্ছে যখন মায়েরা এই শিশুর সামনে হিন্দি-বাংলা নাচ-গান ছেড়ে দিয়ে কাজটি করেন। আমরা কি একবার ভেবে দেখেছি যে আমরা নিজ সন্তানের কতবড় ক্ষতি করছি?

শিশুর সঙ্গী কে হবে? বড়দের যেমন সঙ্গ প্রয়োজন তেমনি শিশুরও সঙ্গ প্রয়োজন। তাকে শুধু বড়দের কোলে কোলে বা স্ট্রোলারে করে না রাখা। যদি এমনটি করা হয় তাহলে সে বড়দের মাঝে থাকতে থাকতে একসময় একমুখি হয়ে যায়, জেদী হয়ে যায়, অন্য শিশুদের পছন্দ করে না, তাদের সাথে মিশতে চায় না, ভয় পায়। এতে তার ব্রেইন ডেভেলপ করে না সে অসামাজিক হয়ে পড়ে। তাই অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে তাকে মেলামেশা করতে দেয়া উচিত।

শিশুর প্রশ্নের জবাব দেয়া: শিশুরা যখন কথা বলতে শিখে তখন তারা নানা রকম প্রশ্ন করে। একই প্রশ্ন হয়তো বার বার করে, হয়তো খুবই সহজ প্রশ্ন করে, হয়তো খুব কঠিন প্রশ্ন করে, হয়তো বড়দের মতো প্রশ্ন করে। এতে কিছুতেই বিরক্ত হওয়া যাবে না। তাদের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে তার উত্তর দিতে হবে। বাচ্চাদের কথার উত্তর ঠিকমতো না দিয়ে এটাসেটা বলে তাকে প্রবোধ দেয়া ঠিক না। একটু বড় শিশু যারা কিছুটা বুঝে তারা আরো স্পর্শকাতর। তাদের প্রশ্নের উত্তর ঠিক মতো জানা না থাকলে ধামাচাপা দিয়ে বা দায়সারা গোছের কথা বলা উচিত নয়। হয়তো বলা যেতে পারে, "আমি জেনে নিয়ে পরে তোমাকে জানাব", এবং সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে হবে। শিশুরা কোন প্রশ্ন করে যেন অবহেলিত না হয় সেদিকে রক্ষ্য রাখতে হবে।

একটা সত্য ঘটনা উল্লেখ করা যাক। একজন বাবা চেষ্টা করেন তার জমজ সন্তানদ্বয়কে সঠিক নির্দেশনায় গড়তে। তো, একদিন তারা আত্মীয়-স্বজনসহ দীর্ঘ ভ্রমণে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একজন আত্মীয় উক্ত বাবাকে বলেছিলেন "আমি বিগত দেড় দুই ঘন্টা ধরে খেয়াল করলাম তুমি তোমার দুই বাচ্চার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলে। একটা প্রশ্নের উত্তরও বিরক্তির সাথে দিলে না। একটিবারও বললে না যে চুপ করো, বিরক্ত করো না।” ঐ বাবা জবাবে বলেছিলেন “আমি খুশী হয়েছি আপনি এটা খেয়াল করেছেন। আমি এটা ইচ্ছে করেই করি। আমি যদি আমার বাচ্চাদের প্রশ্নের জবাব না দেই, ওরা অন্যের কাছে জবাব খুঁজবে এবং অন্যের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। অন্য কেউ ওদের কাছে ইন্টারেস্টিং হয়ে যাবে। আমি বাবা হয়েও ওদের কাছে ইন্টারেস্টিং কারেক্টার হতে পারবো না।”

আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া : শিশু যখন একটু একটু বুঝতে শিখে তখন তাকে মহান আল্লাহ তা'আলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তা তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে। তিনি আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন তা সুন্দর করে উপস্থাপন করতে হবে। তাদেরকে বুঝতে দিতে হবে যে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হতে পারেন এমন কোন কাজ করা যাবে না। এমনকি যদি লুকিয়েও কিছু করা হয় তাও আল্লাহ দেখবেন এবং পরে শাস্তি দেবেন। আর আল্লাহর কথা শুনলে তিনি খুশী হবেন এবং যা চাওয়া হবে তাই তিনি দিবেন।

কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া : আমাদের দেশে মুসলিমদের মাঝে কুরআনের প্রতি এক প্রকার ভীতি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। একে ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, মখমলের কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখতে হবে, শেলফের সবচেয়ে উঁচু তাকে রাখতে হবে, মাঝেমধ্যে তাকে চুমু খেতে হবে ইত্যাদি। এগুলো সবই ভুল আচরণ এবং কুরআন থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ইবলিস শয়তানের কারসাজি (প্ররোচনা)। শিশুদেরকে কায়দা, আমপারা পড়ার পাশাপাশি কুরআনের আরবী কপিও হাতে দিতে হবে যেন তাদের এর প্রতি কোন ভয়-ভীতি না থাকে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলা: শিশুদের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়েও কথা বলা যেতে পারে। এটা মনে করা ঠিক না যে তারা এগুলোর কি বুঝবে? বিজ্ঞানের এমন অনেক বিষয় আছে যা শিশুর উপযোগী। বাজারে শিশুতোষ বিজ্ঞানের বইও পাওয়া যায়, তা সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে এই বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত করে কুরআন-হাদীস দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলে তাদের মনে আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে ভালবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ জাগবে।

শিশুদের পুতুল খেলা: শিশুরা পুতুল খেলতে পারবে কিনা এই বিষয়টা অনেকের কাছেই পরিষ্কার না। কারণ পুতুলের সাথে শিরকে একটি সম্পর্ক রয়েছে, হিন্দুরা মূর্তি অর্থাৎ পুতুলকে পূজা করে। শিশুদের খেলার জন্য বাজারে যে পুতুল পাওয়া যায় তা সাধারণত প্লাষ্টিকের বা কাপড়ের, বা মাটির বা অন্য কোন উপকরণ দিয়ে তৈরী করা হয়। এই পুতুলগুলো আসলে পূজার জন্য তৈরী করা হয় না। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুরা একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ছোট সাইজের পুতুল দিয়ে খেলতে পারবে। সহীহ বুখারীর হাদীসে রয়েছে আয়িশা ছোট বয়সে মাটির তৈরী পুতুল দিয়ে খেলা করতেন।

বিশেষ পরামর্শ: শিশুরা যখন ছোট, তখন থেকেই অল্প অল্প করে ওদের ব্রেইনে দিতে হবে যে, ওরা যখন বড় হতে থাকবে ধীরে ধীরে পুতুল খেলা বাদ দিতে হবে। তাহলে ওরা বড় হতে হতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে যে, বড় হলে পুতুল খেলা যাবে না। ওদের সাথে আলোচনা করে প্রতি বছর ওদের কিছু পুতুল ওদের হাত দিয়েই গরীব বাচ্চাদের (বা কোনো হাসপাতালের শিশু বিভাগে) উপহার দেয়া যেতে পারে। এতে ওদের বড় বয়সে গিয়ে পুতুলগুলিও শেষ হবে এবং ওদের দান করার মানসিকতা তৈরি হবে।

বাচ্চাদের সাথে গ্রামের গল্প করা: অনেক মা-বাবাই সন্তানদেরকে গ্রাম থেকে দূরে রাখেন, তাদেরকে গ্রামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন না। আমাদের উচিত হবে তাদেরকে মাঝেমধ্যেই গ্রামে নিয়ে যাওয়া, তাদেরকে গ্রামের সাথে, গ্রামের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া; কৃষক, রাখাল, গবাদী পশু, ফসল, ক্ষেত-খামার ইত্যাদির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। তেমনি গ্রামের মানুষজন বেড়াতে এলে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা উচিত। নইলে সন্তানরা মনে করবে গ্রামের মানুষদের সাথে খারাপ আচরণ করতে হয়। আর ইসলামেও খারাপ আচরণ করার কোনো অনুমতি নেই।

Sharing (ভাগাভাগি) করতে শেখানো: অনেক শিশুরা একজন আরেকজনের সাথে কিছু ভাগাভাগি করতে রাজী হয় না। যে সকল শিশুরা এক সন্তান তারা অনেক সময় শেয়ার করা শিখে না, আবার কয়েকজন ভাইবোনের মধ্যে থেকেও কোন কোন শিশু শেয়ার করতে শিখে না, এটি মূলতঃ মা-বাবার দুর্বলতা, তারা শিশুকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেননি। মা-বাবা গোড়া থেকেই সচেতন হলে শিশুর জন্য এই বিষয়টা কোন সমস্যা হবে না।

ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো: যে সকল মা-বাবার কয়েকটি সন্তান তাদের উচিত সন্তানদের মধ্যে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা। যে বড় সে তার ছোট ভাই বা বোনকে বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করবে। এই দায়িত্ববোধ কোন কোন শিশু নিজে নিজেই শিখে নেয় কিন্তু এই বিষয়েও মা-বাবার সচেতন থাকা এবং সাহায্য করা প্রয়োজন। শিশু সব কিছু একা একা শিখে না, এজন্য তাকে গাইড করতে হয়। আমরা জেনে অবাক হবো যে, পাহাড়ী এলাকায় উপজাতি বড় ভাই-বোনেরা তাদের ছোট ভাইবোনদের দেখাশুনা করে। এমন কি পিঠে করে ছোট ভাইবোনকে বেঁধে নিয়েও সংসারের টুকটাক কাজ করে থাকে।

CHILD DEVELOPMENT

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 শিশুদের নিয়ে সতর্কতা

📄 শিশুদের নিয়ে সতর্কতা


কত বছর পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ পান করানো যাবে? আমাদের দেশের অনেক মায়েরাই (এবং বাবারাও) জানেন না যে শিশুকে কত বছর পর্যন্ত বুকের দুধ পান করানো যাবে। এই বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সূরা বাকারার ২৩৩ নং আয়াতে পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, দুই বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ একটি শিশুকে জন্মের পর থেকে দুই বছর বা ২৪ মাস পর্যন্ত বুকের দুধ পান করানো যাবে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:

“যে স্তন্য পানকাল পূর্ণ করতে চায় তার জন্য মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর বুকের দুধ পান করাবে।” (সূরা বাকারা ২: ২৩৩)

"তার জননী তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস" (সূরা আহকাফ: ১৫)

ইবনে আব্বাস বলেন যে, যদি কোন নারী নয় মাসে সন্তান প্রসব করে তবে তার দুধ পান করানোর সময়কাল একুশ মাসই যথেষ্ট। আর যদি সাত মাসে সন্তান ভূমিষ্ট হয় তবে দুধ পানের সময়কাল হবে তেইশ মাস। আর যদি ছয় মাসে সন্তান প্রসব করে তবে দুধ পান করানোর সময়কাল হবে পূর্ণ দুই বছর। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর সময়কাল হলো ত্রিশ মাস। (ইবনে কাসীর)

২য় সন্তান হলে ১ম সন্তানকে গুরুত্ব কম দেয়া: এই কাজটি মোটেও ঠিক নয়। কিন্তু বেশীরভাগ মা-বাবারা এবং পরিবারের অন্যান্যরা এই ভুল কাজটি করে থাকেন। ১ম সন্তান এবং ২য় সন্তান যদি কাছাকাছি বয়সের হয়ে থাকে তাহলে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করে। ১ম সন্তান নিজেকে অসহায় মনে করে, তাকে অবহেলার কারণে সে দিন দিন ক্ষেপে যায়, ছোট ভাই বা বোনকে শত্রু মনে করে, তাকে সহ্য করতে পারে না, সুযোগ পেলে তাকে আঘাতও করে। ১ম সন্তানকে গুরুত্ব কম দেয়ার কারণে দিন দিন তার মনমানসিকতার উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। এতে সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, তার পড়ালেখারও ক্ষতি হতে পারে, মা-বাবার প্রতিও তার ভালবাসা কমে যেতে পারে।

২য় সন্তান গর্ভে এলে তখন থেকেই ১ম শিশু সন্তানকে বোঝাতে হবে যে, তার একটা ছোট ভাই বা বোন আসছে। সে তাকে অনেক ভালোবাসে, তার সাথে খেলবে ইত্যাদি। এভাবে ১ম সন্তানকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। ১ম সন্তানের বয়স যদি ৫+ বছর হয়, তাহলে তাকে দিয়ে নবজাতকের কিছু কাজে যুক্ত করানো যেতে পারে। তবে মা-বাবার চেষ্টা করা উচিত নবজাতকের পাশাপাশি পূর্বের শিশু সন্তানগুলিকেও আলাদা করে একটু সময় দেয়া। তা না হলে তারা হিংসাত্মক মনোভাব ধারণ করবে।

বাচ্চারা খেলতে গিয়ে ব্যাথা পেলে: অনেক সময় খেলতে গিয়ে বাচ্চারা ব্যাথা পায়, হয়তো হাত-পায়ের কোথাও ছিলে যায়, হয়তো রক্ত বের হয় অথবা মচকে যায়। কোন কোন মা-বাবারা সন্তানের এই দুর্ঘটনার জন্য তার প্রতি সহানুভূতিসূলভ আচরণ না করে বরং তাকে বকাঝকা করেন। যেমন বলে : ভাল হয়েছে, তুই মর, মর, আরো বেশী করে কর ইত্যাদি। মা-বাবা সন্তানের চিকিৎসা ঠিকই করেন কিন্তু একই সাথে এই অমানবিক আচরণও করেন। শিশু দুষ্টামী করতে গিয়ে বা খেলতে গিয়ে ব্যাথা পেতেই পারে। তখন তাকে সহানুভূতি না দেখিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাটা মোটেও ঠিক না। এতে সে মানসিকভাবেও প্রচন্ড আঘাত পায়। নিম্নে একটি ভিডিও লিংক দেয়া হলো যা দেখে আমরা এ বিষয়ে খুবই উপকৃত হতে পারি।

YouTube Link: https://youtu.be/XHc9IBR6cOU
Facebook link: https://www.facebook.com/shishu.lalon.palon/videos/787926311319946/

সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করা ঠিক নয় : মা-বাবাদের আরো একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, আর তা হচ্ছে সন্তানদের মধ্যে যেন পক্ষপাতিত্ব না করা। যাদের কয়েকটি সন্তান তারা অনেক সময় নিজ সন্তানদের একেকজনকে একেক রকম চোখে দেখে থাকেন, একেকজনকে একেক রকম ভালবাসেন বা একেকজনকে একেক রকম গুরুত্ব দেন। যেমন, ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে সব ছেলেমেয়েরা এক সাথে, সেখানে হয়তো ভাল ভাল আইটেমগুলো প্রায় সময়ই একটি সন্তানকে দেয়া হয়, এতে অন্য সন্তানরা মনে কষ্ট পায়। মনে রাখতে হবে সন্তান সবগুলোই একই মা-বাবার। মা-বাবা যদি তাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করেন তাহলে তা তারা অনায়াসেই বুঝতে পারে এবং মনে প্রচন্ড কষ্ট পায়। এতে সন্তানের পড়ালেখার ক্ষতি হয় এবং মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসা কমে যায়।

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: তোমাদের সন্তানদের সম-অধিকার ও সম-ব্যবহারের অধিকার রয়েছে যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে সন্তানদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভের। (আবু দাউদ)

রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহকে ভয় কর, আর তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ কর। (সহীহ বুখারী)

ছোট বাচ্চাদেরকে একা বাসায় রেখে বাইরে যাওয়া ঠিক নয়: আমার সন্তান কি একা একা বাসায় থাকার উপযোগী হয়েছে? মা-বাবাদের অনেক সময় সন্তানদেরকে একা বাসায় রেখে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। বাসায় যদি বড় কেউ না থাকে এবং সন্তান যদি একা থাকার মতো উপযোগী না হয় তাহলে তাকে একা বাসায় রেখে যাওয়া অবশ্যই ঠিক না। আমেরিকা এবং ক্যানাডায় এ সম্পর্কে আইন রয়েছে। কোন মা-বাবা ১২ বছরের নীচের কোন বাচ্চাকে বাসায় একা রেখে যেতে পারবে না, এটা একটা অপরাধ। যদি কোন মা-বাবা এই অপরাধ করেন তাহলে তাদের জেল অথবা জরিমানা হতে পারে। এই বিষয়ে কড়াকড়ির অনেক কারণ আছে। বাচ্চা একা বাসায় থাকলে নানা রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাচ্চারা হচ্ছে অবুঝ, তারা খেলার ছলে ও কৌতুহলবশতঃ কত কিছুই না করতে পারে।

একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করা যাক। আমরা টরন্টো শহরের যে বিল্ডিংটাতে বাস করি সেটার ৮ তলায় এক পরিবারে দু'টি ছেলে- একটির বয়স পাঁচ এবং অপরটির বয়স ছয়ের কাছাকাছি। একদিন ওদের মা বাচ্চাদেরকে বাসায় রেখে একই ফ্লোরে পাশের ফ্লাটে গেছেন কোন কাজে। ইতিমধ্যে বাচ্চা দু'টি খেলার অংশ হিসেবে তাদের ছোট ছোট দু'টি ছাতা কিচেনে ওভেনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে ওভেন অন করে দিয়েছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন ধরে গিয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে সেই আগুন নিভিয়েছে।

বাচ্চা একা বাসায় রেখে গেলে আরো অনেক রকম দুঘর্টনাই ঘটতে পারে যেমন, দা-বঁটি বা ছুরি-কাঁচি দিয়ে খেলতে পারে, বারান্দার রেলিংয়ে উঠতে পারে, ছাদে যেতে পারে, দিয়াশলাই নিয়ে খেলতে পারে। বাচ্চাদের common sense এতোটুকু কাজ করে যে বড় কেউ বাসায় থাকলে তারা বড়দের কোন জিনিস দিয়ে সাধারণত খেলে না। এই কাজগুলো সাধারণতঃ তখনই করে যখন বাসায় কেউ থাকে না, তখন তারা নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে।

শিশুদের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়: আমরা ছোটবেলায় মা-বাবার হাতে অনেক মার খেয়েছি। স্কুলে তো শিক্ষকের বেতের বাড়ির কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে। যাহোক, তারা আমাদের ভালোর কথা চিন্তা করেই হয়তো গায়ে হাত তুলেছেন। তৎকালীন সময়ে শিশুদের সংশোধন প্রক্রিয়া অমানবিক ছিল যা শিশু মনোবিজ্ঞান বা ইসলাম কেউ সমর্থন করে না। নর্থ- আমেরিকায় শিশুর গায়ে হাত তোলা দন্ডনীয় অপরাধ, সেটা মা-বাবা হোক কিংবা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা হোক। এছাড়া ইসলামে কারো মুখে আঘাত করা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ।

দশ বছর বয়স হলে শিশুদের বিছানা আলাদা করে দিতে হবে: আমাদের দেশের কালচারে শিশুরা সাধারণত মা-বাবার সাথেই ঘুমায়। এখন প্রশ্ন: শিশুরা কত বছর বয়স পর্যন্ত মা-বাবার সাথে ঘুমাতে পারবে? আবু দাউদের সহীহ হাদীসে রসূল বলেছেন দশ বছর বয়স হলে শিশুদেরকে আলাদা বিছানা করে দিতে, সে যেন আর মা-বাবার সাথে না ঘুমায়।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 শিশুদের সাথে কথা বলা

📄 শিশুদের সাথে কথা বলা


শিশুদের কথা বলার সময় প্যারেন্টদের উপস্থিত থাকা উচিত
* শিশুরা সাধারণত যে বয়সে বেশী কথা বলে। যেমন: ঘুমানোর আগে শুয়ে শুয়ে, ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার আগে, গাড়িতে কোথাও যাবার সময়।
* তাদেরকে এটা বুঝতে দিতে হবে যে, সে যে বিষয়ের গুরুত্ব দিচ্ছে তা তার মা-বাবাও গুরুত্ব দিচ্ছে।
* শিশুরা যে কাজগুলো করে তার সাথে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে একদিন মা-বাবার উচিত সময় দেয়া এবং সেই কাজগুলো করা।
* শিশুদের কাছে যে বিষয়গুলো বেশী আগ্রহ সেই বিষয়গুলোর উপর মা-বাবার উচিত দক্ষতা অর্জন করা।

শিশুদের বুঝতে দিতে হবে যে প্যারেন্ট তার কথা গুরুত্বসহকারে শুনছে
* শিশুরা যখন কোন একটি বিষয়ে কথা বলা শুরু করে তখন মা-বাবার উচিত তাদের নিজের কাজ বন্ধ করে দিয়ে শিশুর কথা শুনা।
* তাকে বিরক্ত না করে বা তাকে কথার মাঝখানে বন্ধ করে না দিয়ে তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
* যদি তার কথা ঠিক মতো বুঝাও না যায় তবুও তার কথা মনোযোগ সহকারে শুনা উচিত।
* তাদের কথা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা-বাবা কোন কথা বলা ঠিক নয়।
* তার কোন কথা বুঝা না গেলে তাকে আবার জিজ্ঞেস করা উচিত。

এমনভাবে শিশুদের সাথে আচরণ করতে হবে যেন তারা কথা শুনে
* তাদের সাথে শক্ত কথাও নরম করে বলতে হবে, তাদের সাথে রাগান্বিত কন্ঠে অথবা প্রতিরোধের কন্ঠে কথা বলা যাবে না।
• তাদেরকে ছোট করে বা হেয় করে কোন কথা বলা যাবে না। স্বীকার করতে হবে যে তার দ্বিমত করার অধিকার আছে।
• তাদের সাথে দ্বিমত নিয়ে তর্ক করা ঠিক নয়। বরং এভাবে বলা যেতে পারে যে, "আমি জানি তুমি আমার সাথে একমত নও কিন্তু আমি এটা মনে করি"।
• শিশুর সাথে কথোপকথনের সময় শ্রোতার নিজের অনুভূতির কথা বাদ দিয়ে শিশুদের অনুভূতির দিকে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে।

প্যারেন্টদের আরো মনে রাখা উচিত
• শিশুর সাথে কথোপকথনের সময় তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, সে কি কিছু চায়? বা তার কি কিছুর প্রয়োজন আছে?
• শিশুরা সাধারণত মা-বাবাকে নকল (অনুকরণ) করে। তারা দেখে মা-বাবা কিভাবে সমস্যার সমাধান করেন。
• শিশুদের সাথে তাদের মতো করে কথা বলতে হবে। তাদেরকে লেকচার দেয়া যাবে না, তাদেরকে বিরূপ সমালোচনা করা যাবে না, তাদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলা যাবে না এবং তারা মনে কষ্ট পেতে পারে এমন কোন কথাই বলা যাবে না।
• শিশুরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী নতুন নতুন বিষয় শিখতে থাকে। যদি তার শিক্ষার মধ্যে ক্ষতিকারক কিছু না থাকে তাহলে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়।
• শিশুরা অনেক সময় বাবা-মাকে পরীক্ষা করে যে বাবা-মা তার কথা শুনে কিনা। সে যে বিষয়ই নিয়ে আসুক না কেন তার গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। তা না হলে সে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

📘 প্যারেন্টিং এই আধুনিক যুগে সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবো 📄 শিশুদের নিয়ে আরো কিছু মূল্যবান টিপস

📄 শিশুদের নিয়ে আরো কিছু মূল্যবান টিপস


১. শিশুরা যেন কখনো শুয়ে শুয়ে না খায়।
২. শিশুরা যখন ঘুমায় তার সাথে মা অথবা বাবারও ঘুমানো উচিত।
৩. শিশুদের সামনের কখনো উঁচু গলায় কথা বলা ঠিক নয়।
৪. দুই বছরের আগে শিশুদের টিভি দেখতে দেয়া ঠিক নয়।
৫. শিশুদের দিনে দুই ঘন্টার বেশী টিভি দেখতে দেয়া ঠিক নয়。
৬. গানে গানে যে সকল শিক্ষণীয় বিষয় আছে তা তিন বছর বয়স থেকে দেখতে দিলে ভাল।
৭. শিশুদের দেহ কখনো ঝাঁকানো ঠিক না বা তাদেরকে ছুঁড়ে মারা ঠিক নয়।
৮. মা-বাবারা শিশুদের সামনে কখনো ঝগড়া করতে নেই।
৯. মা-বাবারা শিশুদের সামনে কখনো তর্ক করাও উচিত নয়।
১০. শিশুদের শাস্তি দেয়া মোটেও ঠিক নয়।
১১. দিনে অন্তত পক্ষে ২০ মিনিট শিশুদের কিছু একটা পড়তে দেয়া উচিত।
১২. শিশুদের সাথে নিয়ে প্রতিদিন কিছুক্ষণ ব্যায়াম করা উচিত।
১৩. শিশুদের একেবারেই মারামারির কোন কার্টুন দেখতে দেয়া উচিত নয়।
১৪. শিশুদের কোন সাহায্য ছাড়া নিজে থেকেই দাঁড়াতে উৎসাহ দেয়া উচিত।
১৫. শিশুদের কোন আজেবাজে নামে ডাকা ঠিক নয়।
১৬. শিশুদের নতুন একটা খেলনা দেয়ার আগে পুরোনোটা সরিয়ে ফেলা উচিত।
১৭. শিশুদের অভ্যাস করানো উচিত সে যেন নিজের ময়লা করা জায়গা নিজেই পরিষ্কার করে।
১৮. শিশুদের সার এবং কেমিক্যালমুক্ত শাক-সবজি এবং অন্যান্য খাবার খাওয়ানো উচিত।
১৯. দুই বছরের শিশু দায়িত্ববোধ করে এবং নিজের কাজ নিজে করা শিখে।
২০. প্রত্যেক শিশুকে কিছু সময় একা একা থাকতে দেয়া উচিত, এতে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তবে সেই একাকীত্বটা মা-বাবার দৃষ্টির আড়ালে নয়।
২১. শিশুরা বাবা এবং মা দু'জনের কাছ থেকেই যেন গিফ্ট বা উপহার পায়।
২২. স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই তারা যেন খেলাধুলা করে।
২৩. শিশুদের বিভিন্ন কালচারের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
২৪. তাদের নিজেদেরকেই নিজের জিনিস পছন্দ করতে দেয়া উচিত।
২৫. শিশুদেরকে সাথে নিয়ে সবাই এক টেবিলে খেতে বসা উচিত।
২৬. শিশুদেরকে সাথে নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা অতি উত্তম অভ্যাস।
২৭. সবসময় তাদেরকে পজিটিভভাবে উৎসাহ দেয়া উচিত।
২৮. শিশুদেরকে খেলায় হারতে দেয়া উচিত এবং এভাবে শিক্ষা দেয়া উচিত যে কিভাবে খেলায় ভাল করতে হয়।
২৯. শিশুদের কখনো চড়-থাপ্পড় দেয়া উচিত নয়।
৩০. তাদেরকে বুঝতে দিতে হবে যে খারাপ কাজের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
৩১. সময় সময় তাদেরকে অন্যান্য শিশুদের সাথেও খেলতে দেয়া উচিত।
৩২. শিশুদের আগুন নিয়ে অথবা ধারালো কিছু নিয়ে কখনো খেলতে দেয়া মোটেও ঠিক নয়।
৩৩. শিশুদের কখনো খেলনা পিস্তল বা বন্দুক দিয়ে খেলতে দেয়া উচিত নয়।
৩৪. খেলার শেষে তার খেলনাগুলো যেন সে গুছিয়ে এক জায়গায় রাখে এই শিক্ষা দেয়া।
৩৫. শিশুরা যখন কাঁদে তখন তাদেরকে কাঁদতে দেয়া উচিত, জোড় করে থামিয়ে দেয়া উচিত নয়।
৩৬. শিশুদেরকে কাদা, মাটি, ধুলা ইত্যাদি দিয়েও খেলতে দেয়া উচিত।
৩৭. মেয়ে শিশুদেরকে নিজ মায়ের বড় বড় ড্রেসগুলো পড়তে বাধা দেয়া উচিত নয়।
৩৮. একইভাবে ছেলে শিশুদেরকে নিজ বাবার জুতা, শার্ট ইত্যাদি পড়তে বাধা দেয়া উচিত নয়।
৩৯. শিশুদের জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
৪০. পটি (potty) ট্রেনিং ছেলে শিশুদের তিন বছর বয়সে এবং মেয়ে শিশুদের দুই বছর বয়সে দেয়া উচিত।
৪১. শিশুদের গায়ে মাথা রেখে কখনো শোয়া ঠিক নয়।
৪২. শিশুদের নতুন নতুন কাজ করতে দেয়া উচিত, তাদের কাজে বাধা না দিয়ে উৎসাহ দেয়া উচিত।
৪৩. শিশুদের সাথে প্রতিদিন ফান (fun) করা এবং হাসাহাসি করা উচিত।
৪৪. তাদেরকে নিজের ভুল নিজেই সংশোধন করতে দেয়া উচিত।
৪৫. মা-বাবা যখন কোন ভুল করবেন, তখন শিশুদেরকে সরি (sorry) বলা উচিত।
৪৬. শিশুরা যেন দেখে যে মা-বাবাকে এবং বাবা মাকে ভালবাসে।
৪৭. শিশুদেরকে মা-বাবার প্রতিদিন বলা উচিত যে আমরা তোমাকে খুব ভালবাসি।
৪৮. শিশুদের যখন দাঁত উঠা শুরু করে তখন তাদেরকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী অথবা আরবী ভাষাও শিক্ষা দেয়া উচিত।
৪৯. শিশু বয়সে একটি শিশু এক সাথে চারটি ভাষা আয়ত্ত করতে পারে।
৫০. স্বামী-স্ত্রীর গোপনীয় মুহূর্তগুলো যেন শিশুর সামনে প্রকাশ না পায় কখনো।
৫১. তাদের সাথে সবসময় ধৈর্যধারণ করতে হবে।

কাজের বুয়ার মাধ্যমে শিশু লালন-পালন ঠিক নয়
সন্তানের বেড়ে উঠার বয়সে আমরা বাবা-মায়েরা একটা বড় ধরণের ভুল করে থাকি আর তা হচ্ছে ছোট সন্তানকে কাজের বুয়ার মাধ্যমে লালন-পালন করা। স্বাভাবিকভাবেই একজন কাজের বুয়ার কতটুকু জ্ঞান রয়েছে একটি শিশুকে নীতি-নৈতিকতা দিয়ে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। বুয়াদের সাধারণত সাধারণ শিক্ষাই থাকে না তার উপর আবার ইসলামী শিক্ষা থাকা তো দূরের কথা। আমরা যদি খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবে দেখা গেছে যে বাংলাদেশের ডে-কেয়ারগুলোতে মূলতঃ কাজের বুয়ারাই শিশুদের লালন-পালন করে থাকে যেখানে উন্নত দেশগুলোর ডে-কেয়ারে বেবীসিটার হিসেবে চাকুরী করতে হলে আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশনের উপর ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন নিতে হয় এবং এই সার্টিফিকেশন ছাড়া কেউ বাচ্চা ধরতেই পারে না। সেখানে আমাদের দেশে উচ্চবিত্তদের সন্তানরাও বুয়ার হাতে মানুষ হয়। তাই এই বিষয়ে বিশেষ করে সন্তানের মায়ের এগিয়ে আসা উচিত। একটি শিশুর সর্বপ্রথম গৃহ শিক্ষীকা হচ্ছেন তার মা। সন্তান আল্লাহর দেয়া আমানত, এই মহামূল্যবান আমানত বুয়ার হাতে ছেড়ে না দিয়ে মায়ের উচিত সেই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করা। যারা চাকুরী করেন তাদেরও এই বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে একটি উপায় বের করে আনা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px