📄 ভালো বন্ধু নির্বাচন করুন
এমনও হতে পারে যে, আপনার পাপের কারণ হল অসৎ সঙ্গী, অবৈধ বন্ধু অথবা পাপাচারী সহপাঠী বা সহকর্মী। তাই তাদেরকে বর্জন ক'রে আপনি ভালো ও বৈধ বন্ধু গ্রহণ করুন।
নিশ্চয়ই বন্ধুত্বের প্রভাব আছে। ভালো-মন্দ উভয় দিক থেকে বন্ধুদের সহযোগিতা থাকে। এই বন্ধুত্বের উদাহরণ দিয়ে মহানবী বলেছেন,
(( إِنَّمَا مَثَلُ الجَلِيسِ الصَّالِحِ وَجَلِيسِ السُّوءِ ، كَحَامِلِ المِسْكِ، وَنَافِحُ الْكِيرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ : إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ ريحاً طَيِّبَةً ، وَنَافِخُ الكير : إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ ريحاً مُنْتِنَةً )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হল, কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) ও হাপরে ফুৎকারকারী (কামারের) ন্যায়। কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে অথবা তার কাছ থেকে সুবাস লাভ করবে। আর হাপরে ফুৎকারকারী (কামার) হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।" (বুখারী ৫৫৩৪, মুসলিম ৬৮৬০নং)
এটাই বাস্তব যে, 'সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে' এবং 'সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ'। আর তার জন্যই মহানবী বলেছেন,
(( الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ ، فَلِيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ)).
"মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।" (আহমাদ ৮০২৮, আবু দাউদ ৪৮৩৫, তিরমিযী ২৩৭৮নং)
অতএব পাপের কারণ যদি বন্ধু, সঙ্গী বা স্বামী-স্ত্রী হয়, তাহলে তা পরিবর্তন করে দেখুন, আপনি পাপ থেকে বাঁচতে পারছেন।
📄 চক্ষু অবনত করুন
এ নির্দেশ মহান প্রতিপালকের। তিনি বলেছেন,
{ قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ}
"বিশ্বাসী পুরুষদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের যৌন অঙ্গকে সাবধানে সংযত রাখে; এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। ওরা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। বিশ্বাসী নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে।" (নূরঃ৩০-৩১)
যেহেতু অবৈধ দর্শন এমন এক পাপ, যা ধীরে ধীরে মহাপাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এই ছোট্ট অগ্নিস্ফুলিঙ্গ থেকে শুরু হয় মহা অগ্নিকান্ডের।
আর জেনে রাখবেন, যা সরাসরি দেখা পাপ, তার ছবি দেখাও পাপ।
📄 অপরাধীর অবস্থা দেখে শিক্ষা নিন
অপরাধীদের দুর্দশা দেখে শিক্ষা নিন। এমন না হয়, আপনার মতো অপরাধ ক'রে অমুকের যে দশা হয়েছে, তেমনি আপনারও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনি নিজেকে স্বতন্ত্র ভাববেন না।
অমুক জুয়ারী তার সর্বস্ব হারিয়েছে। আপনি জুয়া খেললে আপনারও তাই হতে পারে।
অমুক মাতাল সবশেষে বিষ কিনে খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আপনারও একই দশা হতে পারে।
অমুক খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হয়েছে, ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। আপনি খুন করলে সেই হাল আপনারও হতে পারে।
অমুক ব্যভিচারী বা লম্পটের এস হয়েছে, তাকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। আপনি ব্যভিচার বা বেশ্যাগমন করলে আপনারও অবস্থা তাই হতে পারে।
অমুক প্রেমিক-প্রেমিকা চোরের মতো পালিয়ে বিয়ে ক'রে ঘর-ছাড়া হয়েছে, সমাজচ্যুত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। আপনি অবৈধ প্রেম করলে আপনারও একই দশা হতে পারে।
এইভাবে প্রত্যেক পাপের ব্যাপারে আপনি অন্য পাপীকে দেখে শিক্ষা নিতে পারলে পাপ থেকে বাঁচতে পারবেন। জ্ঞানীর কাজ হল পরের দেখে শিক্ষা নেওয়া। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَار (٢) سورة الحشر
"অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।" (হাশ্রঃ ২)
তিনি পূর্বযুগের এক অপরাধীদের কাহিনী বর্ণনা ক'রে বলেছেন,
{إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِّمَن يَخْشَى} (٢٦) سورة النازعات
"যে (আল্লাহকে) ভয় করে, তার জন্য অবশ্যই এতে শিক্ষা রয়েছে।" (না-যিআতঃ২৬)
তিনি আমভাবে ইতিহাসের কাহিনী থেকে শিক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে বলেছেন,
{لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُوْلِي الألْبَابِ} (۱۱۱) سورة يوسف
"তাদের কাহিনীতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা।" (ইউসুফঃ ১১১)
📄 অন্যান্য কিছু উপায়
এ ছাড়া অন্য আরো উপায় আছে, যার মাধ্যমে আপনি অপরাধ জগৎ থেকে নিজেকে পৃথক করতে পারেন। আপনি আল্লাহর সৃষ্টি-জগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন। ভেবে দেখুন, দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয় এবং মৃত্যুও জীবনের শেষ নয়। বরং মৃত্যু হল অনন্ত জীবনের শুরু। ধৈর্যধারণ করুন। মহান প্রতিপালককে আপনি ভালোবাসলে তাঁর আদেশ ও নিষেধ পালনে ধৈর্যধারণ করুন। তাঁর সীমা অতিক্রম করার ব্যাপারে ধৈর্য রাখুন। পাপ থেকে দূরে থাকবেন এবং দ্বিগুণ সওয়াব প্রাপ্ত হবেন। অপরাধের শাস্তির কথা ভেবে দেখুন। ধরা পড়বেন না---এমন সুধারণা না রেখে, ধরা পড়বেন---এই সম্ভাবনা মনের মধ্যে গেঁথে রাখুন। সমাজে লাঞ্ছনা ও ভর্ৎসনার কথা মাথায় রাখুন। আর ধরা না পড়লেও এটা অবশ্যই মনে রাখুন যে, পরকালে অবশ্যই ধরা পড়বেন। সে ধরা থেকে কেউ অধরা থাকতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمَن جَاء بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ}
"যে কেউ মন্দকাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, তাকে অধোমুখে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে (এবং ওদেরকে বলা হবে), 'তোমরা যা করতে কেবল তারই প্রতিফল তোমরা ভোগ করবে।" (নামূলঃ ৯০)
ধৈর্যের সাথে অপরাধ থেকে দূরে থেকে তার ইতিবাচক দিকটা খেয়াল করুন। আর এর জন্য মহান আল্লাহর এই কয়টি আয়াত অধ্যয়ন করুন। তিনি বলেছেন,
﴿الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ (۲۰) وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ (۲۱) وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ (۲۲) جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَابٍ (۲۳) سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ} (٢٤) الرعد
"যারা আল্লাহকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না। আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ্ণ রাখে এবং ভয় করে তাদের প্রতিপালককে ও ভয় করে কঠোর হিসাবকে। আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে, তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতিপত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তারাও। আর ফিরিস্তাগণ তাদের কাছে প্রবেশ করবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে। (তারা বলবে,) 'তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি! কতই না ভাল এই পরিণাম।" (রা'দঃ ২০-২৪)
অতি বিলাসী হওয়া থেকে বাঁচুন, তাহলে অনেক পাপ থেকে বেঁচে যাবেন। নচেৎ অতিরিক্ত ভোজনবিলাসী, শয্যাবিলাসী, কামবিলাসী ইত্যাদি হতে গিয়ে তার সামগ্রী সংগ্রহ করতে আপনি পাপে লিপ্ত হয়ে যাবেন।
পাপ থেকে বাঁচার জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করুন। যেহেতু আপনি জানেন যে, আদম-সন্তানের হৃদয় তাঁর দুই আঙ্গুলের মাঝে আছে, তিনি ইচ্ছামতো তা ঘোরান-ফিরান। আর এ কথাও আপনি বলে থাকেন,
لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ.
'আল্লাহর তওফীক ছাড়া পাপ থেকে ফিরার এবং সৎকাজ করার (নড়া-সড়ার) শক্তি কারো নেই।'
সুতরাং আপনি নামাযের শুরুতে এই বিশেষ দুআ পাঠ করুন,
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ تَقْنِي مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَس ، اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ.
'হে আল্লাহ! তুমি আমার মাঝে ও আমার গোনাহসমূহের মাঝে এতটা ব্যবধান রাখ, যেমন তুমি পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে ব্যবধান রেখেছ। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে গোনাহসমূহ থেকে পরিষ্কার করে দাও, যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! তুমি আমার গোনাহসমূহকে পানি, বরফ ও করকি দ্বারা ধৌত করে দাও।' (বুখারী ৭৪৪, মুসলিম ১৩৮২নং)
নামাযের শেষাংশে পড়ুন এই দুআ,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ.
'হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট পাপ ও ঋণ হতে পানাহ চাচ্ছি।' (বুখারী ৮৩২, ২৩৯৭, মুসলিম ১৩৫৩নং)
আর আপনার মুনাজাতে পড়ুন এই দুআ,
اللَّهُمَّ جَنَّبْنِي مُنْكَرَاتِ الأَخْلاقِ، وَالْأَعْمَالِ، وَالْأَهْوَاءِ، وَالْأَدْوَاءِ.
'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দুশ্চরিত্র, অসৎ কর্ম, কুপ্রবৃত্তি এবং কঠিন রোগসমূহ থেকে দূরে রাখো।' (ত্বাবারানী ১৫৩৭৯, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৮৫৪১, ইবনে হিব্বান ৯৬০, ইবনে আবী শাইবা ২৯৫৯৪ সঃ জামে' ১২৯৮নং) (আমীন)