📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 কোন্ পাপ মাফ হবে?

📄 কোন্ পাপ মাফ হবে?


ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, অতি মহাপাপ তওবা ছাড়া মাফ হয় না। অনুরূপ মহাপাপ মাফ করাতেও তওবা লাগে; বিশেষ ক'রে তা বান্দার হক সংক্রান্ত হলে। সুতরাং কিছু উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যায় যে, যে পাপ বিনা তওবায় বিভিন্ন কারণে মাফ হয়ে যায়, তা কেবল উপপাপ, লঘু পাপ বা ছোট পাপ, যাকে 'সাগীরা গোনাহ' বলা হয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلاً كَرِيمًا }
"তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে যা গুরুতর (পাপ) তা থেকে বিরত থাকলে, আমি তোমাদের লঘুতর পাপগুলিকে মোচন ক'রে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশাধিকার দান করব।” (নিসাঃ ৩১)
الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّهَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ} (۳۲)
"যারা ছোট-খাট অপরাধ ছাড়া গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্য হতে বিরত থাকে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক অপরিসীম ক্ষমাশীল।” (নাজমঃ ৩২)

আর মহানবী বলেছেন,
(( الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ ، وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنِبَ الكَبَائِرُ )). رواه مسلم
"পাঁচ অক্ত নামায, এক জুমআহ থেকে আর এক জুমআহ এবং এক রমযান থেকে আর এক রমযান পর্যন্ত (সংঘটিত সাগীরা গোনাহ) মুছে ফেলে; যদি কাবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায় তাহলে (নতুবা নয়)।” (মুসলিম ৫৭৪নং)

অন্য এক বর্ণনায় আছে,
(( الصَّلَوَاتُ الخَمْسُ ، وَالجُمُعَةُ إِلَى الجُمُعَةِ ، كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ ، مَا لَمْ تُعْشَ الكبائر)). رواه مسلم
"পাঁচ অক্তের নামায, এক জুমআহ থেকে পরবর্তী জুমআহ পর্যন্ত এর মধ্যবর্তী সময়ে যেসব পাপ সংঘটিত হয়, সে সবের মোচনকারী হয় (এই শর্তে যে,) যদি মহাপাপে লিপ্ত না হয়।” (মুসলিম ৫৭২, তিরমিযী ২১৪নং, প্রমুখ)

আরো একটি হাদীসে আছে,
(( مَا مِن امْرِئٍ مُسْلِمٍ تَحْضُرُهُ صَلَاةٌ مَكْتُوبَةٌ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهَا ، وَخُشُوعَهَا، وَرُكُوعَهَا إِلَّا كَانَتْ كَفَّارَةً لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ مَا لَمْ تُؤْتَ كَبِيرةٌ ، وَذَلِكَ الدَّهْرَ كُلَّهُ )). رواه مسلم
"যে ব্যক্তি ফরয নামাযের জন্য ওযু করবে এবং উত্তমরূপে ওযু সম্পাদন করবে। (অতঃপর) তাতে উত্তমরূপে ভক্তি-বিনয়-নম্রতা প্রদর্শন করবে এবং উত্তমরূপে 'রুকু' সমাধা করবে। তাহলে তার নামায পূর্বে সংঘটিত পাপরাশির জন্য কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হয়ে যাবে; যতক্ষণ মহাপাপে লিপ্ত না হবে। আর এ (রহমতে ইলাহীর ধারা) সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য।” (মুসলিম ৫৬৫নং)

অন্য কিছু বিবরণে জানা যায়, আমভাবে সকল গোনাহকে মহান প্রতিপালক ক্ষমা ক'রে থাকেন, কেবল শির্ক ও কুফরীর অতি মহাপাপ ছাড়া। মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللهَ لا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء) (٤٨) سورة النساء
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" (নিসাঃ ৪৮, ১১৬)
{إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ} (١١٤) سورة هود
"নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে।” (হ্রদঃ ১১৪)

এই শ্রেণীর সকল ব্যাপক দলীল দ্বারা বুঝা যায়, নামায, যাকাত, রোযা হজ্জ প্রভৃতি নেক আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সকল গোনাহকে ক্ষমা ক'রে দেন। কোন কোন হাদীসে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, কাবীরা গোনাহও মহান আল্লাহ নেক আমলের বদৌলতে ক্ষমা ক'রে দেন। যেমন মহানবী বলেছেন,
((مَنْ قَالَ : أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ ، غُفِرَتْ ذُنُوبُهُ ، وَإِنْ كَانَ قَدْ فَرَّ مِنَ الزَّحْفِ)).
"যে ব্যক্তি এ দুআ পড়বে, 'আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুমু অ আতুবু ইলাইহ।' অর্থাৎ, আমি সেই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি যিনি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর। এবং আমি তাঁর কাছে তওবা করছি।
সে ব্যক্তির পাপরাশি মার্জনা করা হবে; যদিও সে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে (যাওয়ার পাপ করে) থাকে।” (আবু দাউদ ১৫১৯নং, তিরমিযী ৩৫৭৭, হাকেম ১৮৮৪নং)

তিনি আরো বলেছেন,
(( ذَاكَ جِبريلُ أَتَانِي فَقَالَ : مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئاً دَخَلَ الْجَنَّةَ )) ، قلت : وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ؟ قَالَ : (( وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ )). متفقٌ عَلَيْهِ
"তিনি জিব্রাঈল, আমার কাছে এসে বললেন, 'আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না ক'রে মরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' আমি বললাম, 'যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও কি?' তিনি বললেন, 'যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে।” (বুখারী ৬৪৪৪, মুসলিম ২৩৫১নং)

তিনি আরো বলেছেন,
إلى لأَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دُخُولاً الْجَنَّةَ وَآخِرَ أَهْل النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا رَجُلٌ يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ اعْرِضُوا عَلَيْهِ صِغَارَ ذُنُوبِهِ وَارْفَعُوا عَنْهُ كِبَارَهَا. فَتُعْرَضُ عَلَيْهِ صِغَارُ ذُنُوبِهِ فَيُقَالُ عَمِلْتَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا وَعَمِلْتَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا. فَيَقُولُ نَعَمْ. لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنْكِرَ وَهُوَ مُشْفِقٌ مِنْ كِبَارٍ ذُنُوبِهِ أَنْ تُعْرَضَ عَلَيْهِ. فَيُقَالُ لَهُ فَإِنَّ لَكَ مَكَانَ كُلِّ سَيِّئَةٍ حَسَنَةً فَيَقُولُ رَبِّ قَدْ عَمِلْتُ أَشْيَاءَ لَا أَرَاهَا هَا هُنَا ..
"নিশ্চয় আমি সেই ব্যক্তিকে জানি, যে সবার শেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সবার শেষে জাহান্নাম থেকে বের হবে। সে এমন এক ব্যক্তি, যাকে কিয়ামতে আনা হবে এবং বলা হবে, 'ওর ছোট-ছোট পাপগুলো ওর কাছে পেশ কর এবং বড়-বড় পাপগুলো তুলে নাও।' সুতরাং তার ছোট-ছোট পাপগুলো তার কাছে পেশ করা হবে এবং বলা হবে, 'তুমি অমুক দিনে এই এই পাপ করেছ, অমুক দিনে এই এই পাপ করেছ?' সে বলবে, 'হ্যাঁ।' সে তা অস্বীকার করতে পারবে না। পরন্ত সে তার বড় পাপগুলো পেশ করার ভয়ে ভীত থাকবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, 'তোমার প্রত্যেক পাপের স্থলে একটি ক'রে পুণ্য দেওয়া হল।' তখন সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অনেক কিছু এমন (পাপ) করেছি, যা এখানে আমি দেখতে পাচ্ছি না।' এ হাদীস বর্ণনা ক'রে নবী হেসে ফেললেন, যাতে তাঁর চোয়ালের দাঁতগুলি প্রকাশিত হয়ে গেল। (আহমাদ ২১৩৯৩, মুসলিম ৪৮৭, তিরমিযী ২৫৯৬, ইবনে হিব্বান ৭৩৭৫নং)

বুঝা গেল যে, তওবা না করলেও কাবীরা গোনাহকেও মহান আল্লাহ ক্ষমা ক'রে দেন। অবশ্য কিয়ামতে তিনি ইচ্ছা করলে কাউকে কিছু শাস্তিও ভোগাতে পারেন। পরে তার শেষ ঠিকানা হয় বেহেস্ত।
আল্লামা ইবনে উষাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যাপারে উলামাগণের মতভেদ উল্লেখ করার শেষে বলেন, 'কিন্তু বলা যেতে পারে যে, আমরা এরূপ কথা বলা (মতভেদ করা) থেকে নীরব থেকে আল্লাহর নিকট এই আশা রাখব যে, তিনি (সাগীরা-কাবীরা) সকল গোনাহকেই ক্ষমা ক'রে দেবেন। বিশেষ ক'রে যখন হাদীসে বলা হয়েছে, "---তার সমুদ্রের ফেনা বরাবর পাপ হলেও মাফ হয়ে যাবে।" আর আল্লাহর কাছে এই আশা রাখব যে, কাবীরা গোনাহ থেকে বিরত না থাকলেও সে ক্ষমা সাব্যস্ত থাকবে।
বলা বাহুল্য, এ কথা বিচ্যুতি থেকে অধিক দূরে এবং আশার ব্যাপারে বেশি বলিষ্ঠ।' (বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যাপুস্তক ৭/৫৪)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00