📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 (৭) ঈসালে সওয়াব

📄 (৭) ঈসালে সওয়াব


মানুষ মারা গেলে তার আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বেহেস্তী বারযাখী জীবনে তার মর্যাদাবর্ধন অথবা দোযখী জীবনের শাস্তি লাঘব করার কতিপয় পথ খোলা থাকে। আর সে পথ অবলম্বন করতে পারে তার আত্মীয়-বন্ধুগণ। তারা যেমন দুআ ব্যবহার করতে পারে, তেমনি কিছু নেক আমল করতে পারে, যার দ্বারা তাদের মৃতব্যক্তি মধ্য জগতে উপকৃত হতে পারে।

১। মাইয়্যেতের নযর-মানা রোযা যদি তার অভিভাবক কাযা রেখে দেয়, তবে তার সওয়াব তার উপকারে আসবে। প্রিয় রসূল বলেন,
مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ ..
"যে ব্যক্তি রোযা বাকী রেখে মারা যায়, তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক রোযা রেখে দেবে।" (বুখারী ১৯৫২, মুসলিম ২৭৪৮নং)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'এক মহিলা সমুদ্র-সফরে বের হলে সে নযর মানল যে, যদি আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা তাকে সমুদ্র থেকে পরিত্রাণ দান করেন, তাহলে সে একমাস রোযা রাখবে। অতঃপর সে সমুদ্র থেকে পরিত্রাণ পেয়ে ফিরে এল। কিন্তু রোযা না রেখেই সে মারা গেল। তার এক কন্যা নবী এর নিকট এসে সে ঘটনার উল্লেখ করলে তিনি বললেন, "মনে কর, তার যদি কোন ঋণ বাকী থাকত, তাহলে তা তুমি পরিশোধ করতে কি না?" বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
(( دَيْنُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُقْضَى)).
"তাহলে আল্লাহর ঋণ অধিকরূপে পরিশোধ-যোগ্য। সুতরাং তুমি তোমার মায়ের তরফ থেকে রোযা কাযা করে দাও।" (আহমাদ ১৮৬১, ৩১৩৮, আবু দাউদ ৩৩১০নং, ত্বাবারানী ১২১৯৫, প্রমুখ)

তদনুরূপ রমযানের রোযা কাযা রেখে মারা গেলে তার বিনিময়ে তার অভিভাবক ফিদয়্যাহ (প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে একটি মিসকীনকে একদিনের খাদ্য অথবা ১ কিলো ২৫০ গ্রাম করে চাল) দিলে তার সওয়াবও মাইয়্যেতের জন্য উপকারী।
আমরাহর মা রমযানের রোযা বাকী রেখে ইন্তিকাল করলে তিনি মা আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি আমার মায়ের তরফ থেকে কাযা করে দেব কি?' আয়েশা (রাঃ) বললেন, 'না। বরং তার তরফ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে এক একটি মিসকীনকে অর্ধ সা' (প্রায় ১কিলো ২৫০ গ্রাম খাদ্য) সদকাহ করে দাও।' (ত্বাহাবী ৩/১৪২, মুহাল্লা ৭/৪, আহকামুল জানাইয, টীকা ১৭০পৃঃ)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'কোন ব্যক্তি রমযান মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং তারপর রোযা না রাখা অবস্থায় মারা গেলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাওয়াতে হবে; তার কাযা নেই। পক্ষান্তরে নযরের রোযা বাকী রেখে গেলে তার তরফ থেকে তার অভিভাবক (বা ওয়ারেস) রোযা রাখবে।' (আবু দাউদ ২৪০১নং প্রমুখ)

২। মাইয়্যেতের তরফ থেকে আত্মীয় বা যে কেউ তার ছেড়ে যাওয়া ঋণ পরিশোধ করলে সে কবরে উপকৃত হয়। মহানবী বলেছেন,
نَفْسُ المُؤمِنَ مُعَلَّقَةً بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ)).
"(মরণের পর ঐ ঋণের কারণে) মু'মিনের আত্মা (বেহেস্তের পথে) লটকে থাকবে; যতক্ষণ না তার তরফ থেকে তার সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।" (আহমাদ ১০৫৯৯, তিরমিযী ১০৭৮, ইবনে মাজাহ ২৪১৩, আবু য়‍্যা'লা ৬০২৬নং)

৩। মাইয়্যেত হজ্জ করার নযর মেনে মারা গেলে, অথবা হজ্জ ফরয হওয়ার পর কোন ওযরে না ক'রে মারা গেলে যদি তার ওয়ারেসীনদের কেউ (যে নিজের ফরয হজ্জ আগে পালন করে থাকবে) তার তরফ থেকে তা পালন করে, তবে এর সওয়াবেও সে লাভবান হবে।
ইবনে আব্বাস বলেন, এক ব্যক্তি নবী-এর নিকট এসে বলল, 'আমার বোন হজ্জ করার নযর মেনে মারা গেছে। (এখন কী করা যায়?) নবী বললেন, "তার ঋণ বাকী থাকলে কি তুমি পরিশোধ করতে?" লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "তাহলে আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করে দাও। কারণ, তা অধিক পরিশোধ-যোগ্য।" (বুখারী ৬৬৯৯নং)
অনুরূপ এক মহিলা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার আব্বা বড় বৃদ্ধ। তার ফরয হজ্জ বাকী আছে। এখন সওয়ারীতে বসে থাকতেও সে অক্ষম। আমি কি তার তরফ থেকে হজ্জ করে দেব?' নবী বললেন, " 'হ্যাঁ।' করে দাও।" (মুসলিম ১৩৩৪-১৩৩৫নং প্রমুখ)
ইমাম নওবী বলেন, এই হাদীস বার্ধক্য, চিররোগ অথবা মৃত্যুর কারণে ফরয হজ্জ পালনে অসমর্থ ব্যক্তির তরফ থেকে হজ্জ পালন করার বৈধতা নির্দেশ করে। (শারহে নওবী ৫/৮৩)
অবশ্য ফরয হওয়া সত্ত্বেও যে বিনা ওজরে সময়ের অবহেলা বশতঃ হজ্জ না ক'রে মারা গেছে, তার তরফ থেকে হজ্জ আদায় কোন কাজে দেবে না। (আহকামুল জানাইয ১৭১পৃঃ, টীকা)

৪। মাইয়্যেতের ছেড়ে যাওয়া নেক সন্তান, যে নেক আমল করে, তার সওয়াবের অনুরূপ সওয়াব লাভ হয় তার পিতা-মাতারও। এতে সন্তানের সওয়াবও মোটেই কম হয় না। কারণ, সন্তান হল পিতা-মাতার আমলকৃত ও উপার্জিত ধনের ন্যায়। আর আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (۳۹) سورة النجم
অর্থাৎ, এবং মানুষ তাই পায়; যা সে করে। (সূরা নাজম ৩৯ আয়াত)
আর আল্লাহ রসূল বলেন,
إِنَّ مِنْ أَطْيَبِ مَا أَكَلَ الرَّجُلُ مِنْ كَسْبِهِ وَوَلَدُهُ مِنْ كَسْبِهِ ..
"মানুষ সবচেয়ে হালাল বস্তু যেটা ভক্ষণ করে তা হল তার নিজ উপার্জিত খাদ্য। আর তার সন্তান হল তার নিজ উপার্জিত ধন স্বরূপ।" (আবু দাউদ ৩৫২৮, তিরমিযী ১৩৫৮, নাসাঈ ৪৪৬৪, ইবনে মাজাহ ২১৩৭নং প্রমুখ)
তাই সন্তান যদি তার পিতা-মাতার নামে দান করে অথবা ক্রীতদাস মুক্ত করে অথবা হজ্জ করে, তাহলে এসবের সওয়াবে তারা উপকৃত হবে।
ইবনে আব্বাস বলেন, সা'দ বিন উবাদাহর মা যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি আল্লাহর রসূল-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার অনুপস্থিত থাকা কালে আমার আম্মা মারা গেছেন। এখন যদি তাঁর তরফ থেকে কিছু দান করি তাহলে তিনি উপকৃত হবেন কি?' নবী বললেন, "হ্যাঁ হবে।" সা'দ বললেন, 'তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি যে, আমার মিখরাফের বাগান তাঁর নামে সদকাহ করলাম।' (বুখারী ২৭৫৬, ২৭৬২নং প্রমুখ)
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী-কে বলল, 'আমার মা হঠাৎ মারা গেছে। আমার ধারণা যে, সে কথা বলার সুযোগ পেলে সাদকাহ করত। সুতরাং আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করি, তাহলে কি সে নেকী পাবে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।" (বুখারী ১৩৮৮, ২৭৬০, মুসলিম ২৩৭৩, ৪৩০৭-৪৩০৮নং)
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, আস বিন ওয়াইল সাহমী তার তরফ হতে ১০০টি ক্রীতদাস মুক্ত করার অসিয়ত করে মারা যায়। সুতরাং তার ছোট ছেলে হিশাম ৫০টি দাস মুক্ত করে। অতঃপর তার বড় ছেলে আম্র বাকী ৫০টি দাস মুক্ত করার ইচ্ছা করলে বললেন, '(বাপ তো কাফের অবস্থায় মারা গেছে) তাই আমি এ কাজ আল্লাহর রসূল-কে জিজ্ঞাসা না করে করব না।' সুতরাং তিনি নবী-এর নিকট এসে ঘটনা খুলে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমি কি বাকী ৫০টি দাস তার তরফ থেকে মুক্ত করব?' উত্তরে আল্লাহর রসূল বললেন,
إِنَّهُ لَوْ كَانَ مُسْلِمًا فَأَعْتَقْتُمْ عَنْهُ أَوْ تَصَدَّقْتُمْ عَنْهُ أَوْ حَجَجْتُمْ عَنْهُ بَلَغَهُ ذَلِكَ ..
"সে যদি মুসলিম হতো এবং তোমরা তার তরফ থেকে দাস মুক্ত করতে, অথবা সদকাহ করতে অথবা হজ্জ করতে তাহলে তার সওয়াব তার নিকট পৌঁছত।" (আবু দাউদ ২৮৮৫নং, বাইহাকী ৬/২৭৯, আহমাদ ৬৭০৪নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 (৮) কিয়ামতের কঠিনতা

📄 (৮) কিয়ামতের কঠিনতা


কিয়ামতের কঠিনতা ও ভয়াবহতা মু'মিনের জাহান্নামের শাস্তি লাঘব করবে। গোনাহগার তওহীদবাদী মু'মিন কিয়ামতের সেই ভীষণ কষ্ট পেয়ে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। মহান আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা ক'রে বেহেস্ত প্রবেশের অনুমতি দিতে পারেন। না চাইলে পাপ অনুসারে তাকে কিছুদিন জাহান্নামে শাস্তি ভোগাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সে জান্নাতের পথে পুলসিরাতেও হাত-পা কেটে শাস্তি পেতে পারে। অতঃপর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের সুখ লাভ করতে পারে। নচেৎ পুল থেকে নিচে পড়ে জাহান্নামে নির্ধারিত কাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করতে পারে।

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 (৯) কিয়ামতের সুপারিশ

📄 (৯) কিয়ামতের সুপারিশ


কিয়ামতের দিন সুপারিশের ফলে বহু অপরাধীর অপরাধের শাস্তি মকুব অথবা লাঘব করা হবে। কিয়ামতের দিন। ভীষণ কঠিন সেই দিন! { يَوْمَ تَكُونُ السَّمَاءُ كَالْمُهْل (۸) وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْن (۹) وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيماً (۱۰) يُبَصَّرُونَهُمْ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بَبَنِيهِ (۱۱) وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ (۱۲) وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ (۱۳) وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً ثُمَّ يُنجِيهِ} (١٤) المعارج "সেদিন আকাশ হবে গলিত ধাতুর মতো এবং পর্বতসমূহ হবে রঙ্গীন পশমের মতো। আর সুহৃদ সুহৃদের খবর নেবে না। (যদিও) তাদেরকে একে অপরের দৃষ্টির সামনে রাখা হবে। অপরাধী সেই দিনে শাস্তির বদলে দিতে চাইবে নিজ সন্তান-সন্ততিকে। তার স্ত্রী ও ভাইকে। তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত। এবং পৃথিবীর সকলকে, যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়।” (মাআ'রিজঃ ৮-১৪) কিন্তু তা দেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় কারোর জন্য কারোর সাহায্য করা। সেদিন কেউ কারো নয়। সকলেই ব্যস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে নিজেকে বাঁচানোর তাকীদে। { يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ} (۳۷) عبس “সেদিন মানুষ পলায়ন করবে আপন ভ্রাতা হতে এবং তার মাতা ও তার পিতা হতে, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।” (আবাসাঃ ৩৪-৩৭)

{يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِّنَفْسٍ شَيْئًا وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ} (۱۹) سورة الإنفطار “সেদিন কেউই কারোর জন্য কিছু করবার সামর্থ্য রাখবে না; আর সেদিন সমস্ত কর্তৃত্ব হবে (একমাত্র) আল্লাহর।” (ইনফিত্বারঃ ১৯)

“কিয়ামতের দিন, যেদিন কোন প্রকার ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না।” (বাক্বারাহঃ ২৫৪)

তবে শর্ত সাপেক্ষে সুপারিশ চলবে:-
১। সুপারিশকারীর সুপারিশ করার ক্ষমতা।
২। যার জন্য সুপারিশ করা হবে, সে যেন তাওহীদবাদী মুসলিম হয়।
৩। যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৪। সুপারিশকারীর জন্য আল্লাহর অনুমতি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكَم مِّن مَّلَكَ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْدْنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاء وَيَرْضَى) (٢٦) سورة النجم “আকাশমন্ডলীতে কত ফিরিশ্তা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।” (নাজম: ২৬)
আমাদের মহান নবী ﷺ কাল কিয়ামতে সুপারিশ করবেন, কিন্তু তাঁর ব্যাপারেও মহান প্রভু বলেছেন,
{قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا} (۲۱) سورة الجن অর্থাৎ, বল, 'আমি তোমাদের অপকার অথবা উপকার কিছুরই মালিক নই।' (জ্বিনঃ ২১) মহান আল্লাহর বাণী,
{وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ} “তোমার নিকটতম স্বজনবর্গকে তুমি সতর্ক ক’রে দাও।” (শুআ’রাঃ ২১৪)
আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর আত্মীয় ও বংশকে সম্বোধন করে বললেন, يَا مَعْشَرَ قُرَيْشِ اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ اللَّهِ لَا أُغْنِى عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا عَبَّاسَ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا صَفِيَّةٌ عَمَّةَ رَسُولِ اللَّهِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا فَاطِمَةُ بِنْتَ رَسُولِ اللَّهِ سَلِينِي بِمَا شِئْتِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا ..
"হে কুরাইশদল! তোমরা আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নাও, আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোন উপকার করতে পারব না। হে বানী আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে (চাচা) আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে আপনার কোন কাজে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের ফুফু সাফিয়্যাহ! আমি আপনার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের বেটা ফাতেমা! আমার কাছে যে ধন-সম্পদ চাইবে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” (বুখারী ৩৫২৭, মুসলিম ৫২২, ৫২৫নং)

বলা বাহুল্য, তিনি নিজের ইচ্ছায় কাউকে জান্নাত বা জাহান্নাম পাঠাতে পারবেন না। বরং মহান আল্লাহ তাঁকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। সুতরাং কিয়ামতে তিনি সুপারিশ করবেন।
তিনি বলেছেন,
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعِ وَأَوَّلُ مُشَفَع .. অর্থাৎ, আমি কিয়ামতের দিন আদম-সন্তানদের সর্দার। প্রথম আমাকেই কবর থেকে উঠানো হবে এবং প্রথম আমিই সুপারিশকারী ও আমার সুপারিশ গৃহীত হবে। (মুসলিম ৬০৭৯নং)

"কিয়ামতের দিন আমি হব সকল মানুষের নেতা। তোমরা কি জান, কী কারণে? কিয়ামতের দিন পূর্বাপর সমগ্র মানবজাতি একই ময়দানে সমবেত হবে। (সে ময়দানটি এমন হবে যে,) সেখানে দর্শক তাদেরকে দেখতে পাবে এবং আহবানকারী (নিজ আহবান) তাদেরকে শুনাতে পারবে। সূর্য একেবারে কাছে এসে যাবে। মানুষ এতই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিপতিত হবে যে, ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতাই তাদের থাকবে না। তারা বলবে, 'দেখ, তোমাদের সবার কী ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তোমাদের কী বিপদ এসে পৌঁছেছে! এমন কোন ব্যক্তির খোঁজ কর, যিনি পরওয়ারদেগারের কাছে সুপারিশ করতে পারেন।' লোকেরা বলবে, 'চল আদমের কাছে যাই।' সে মতে তারা আদমের কাছে এসে বলবে, 'আপনি মানব জাতির পিতা, আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং ফুঁক দিয়ে তাঁর 'রূহ' আপনার মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন। তাঁর নির্দেশে ফিরিস্তাগণ আপনাকে সিজদা করেছিলেন। আপনাকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলেন। সুতরাং আপনি কি আপনার পালনকর্তার দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী কষ্টের মধ্যে আছি? আমরা কী যন্ত্রণা ভোগ করছি?' আদম বলবেন, 'আমার প্রতিপালক আজ ভীষণ ক্রুদ্ধ আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি তার নির্দেশ অমান্য করেছিলাম। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা নূহের কাছে যাও।'
সুতরাং তারা সকলে নূহ-এর কাছে এসে বলবে, 'হে নূহ! আপনি পৃথিবীর প্রতি প্রথম প্রেরিত রসূল। আল্লাহ আপনাকে শোকর-গুজার বান্দা হিসাবে অভিহিত করেছেন। সুতরাং আপনি কি আপনার পালনকর্তার দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী কষ্টের মধ্যে আছি? আমরা কী যন্ত্রণা ভোগ করছি?' নূহ বলবেন, আমার প্রতিপালক আজ ভীষণ ক্রুদ্ধ আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া আমার একটি দুআ ছিল, যার দ্বারা আমার জাতির উপর বদ্দুআ করেছি। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা ইব্রাহীমের কাছে যাও।'
সুতরাং তারা সবাই ইব্রাহীম-এর কাছে এসে বলবে, 'হে ইব্রাহীম! আপনি আল্লাহর নবী ও পৃথিবীবাসীদের মধ্য থেকে আপনিই তাঁর বন্ধু। আপনি আপনার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছি?' তিনি তাদেরকে বলবেন, 'আমার পালনকর্তা আজ ভীষণ রাগান্বিত হয়েছেন, এমন রাগান্বিত তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া (দুনিয়াতে) আমি তিনটি মিথ্যা কথা বলেছি। সুতরাং আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা মুসার কাছে যাও।'
অতঃপর তারা মূসা-এর কাছে এসে বলবে, 'হে মুসা! আপনি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ আপনাকে তাঁর রিসালত দিয়ে এবং আপনার সাথে (সরাসরি) কথা বলে সমগ্র মানব জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী দুর্ভোগ পোহাচ্ছি?' তিনি বলবেন, 'আজ আমার প্রতিপালক এত ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর আগে কখনো হননি এবং আগামীতেও আর কোনদিন হবেন না। তাছাড়া আমি তো (পৃথিবীতে) একটি প্রাণ হত্যা করেছিলাম, যাকে হত্যা করার কোন নির্দেশ আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা ঈসার কাছে যাও।'
অতঃপর তারা সবাই ঈসা -এর কাছে এসে বলবে, 'হে ঈসা! আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনি আল্লাহর সেই কালেমা, যা তিনি মারয়‍্যামের প্রতি প্রক্ষেপ করেছিলেন। আপনি হচ্ছেন তাঁর রূহ, আপনি (জন্ম নেওয়ার পর) শিশুকালে দোলনায় শুয়েই মানুষের সাথে কথা বলেছিলেন। অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছি?' তিনি তাদেরকে বলবেন, 'আমার পালনকর্তা আজ ভীষণ রাগান্বিত হয়েছেন, এমন রাগান্বিত তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। (এখানে তিনি তাঁর কোন অপরাধ উল্লেখ করেননি।) আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা মুহাম্মাদ-এর কাছে যাও।'
অন্য এক বর্ণনায় আছে, সুতরাং তারা সবাই আমার কাছে এসে বলবে, 'হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রসূল। আপনি আখেরী নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ মাফ ক'রে দিয়েছেন। অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী (ভয়াবহ) দুঃখ ও যন্ত্রণা ভোগ করছি।' তখন আমি চলে যাব এবং আরশের নীচে আমার প্রতিপালকের জন্য সিজদাবনত হব। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের জন্য আমার হৃদয়কে এমন উন্মুক্ত ক'রে দেবেন, যেমন ইতোপূর্বে আর কারো জন্য করেননি। অতঃপর তিনি বলবেন, 'হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও, চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' তখন আমি মাথা উঠিয়ে বলব, আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে প্রতিপালক! আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে প্রতিপালক!' এর প্রত্যুত্তরে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) বলা হবে, 'হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে ডান দিকের দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও। এই দরজা ছাড়া তারা অন্য সব দরজাতেও সকল মানুষের শরীক।'
অতঃপর তিনি বললেন, "যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, তাঁর কসম! জান্নাতের একটি দরজার প্রশস্ততা হচ্ছে মক্কা ও (বাহরাইনের) হাজারের মধ্যবর্তী দূরত্ব অথবা মক্কা ও (সিরিয়ার) বুসরার মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান।” (বুখারী ৪৭১২, মুসলিম ৪৯৫নং)

তবে সে সুপারিশ পেয়ে ধন্য হবে কেবল সেই অপরাধী, যে মহান প্রতিপালকের সাথে কোন কিছুকে শরীক ক'রে বিনা তওবায় মারা যায়নি। তিনি বলেছেন,
لِكُلِّ نَبِي دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِي دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا ..
"প্রত্যেক নবীর কবুলযোগ্য দুআ থাকে। সুতরাং প্রত্যেক নবী নিজ দুআকে সত্বর (দুনিয়াতে) প্রয়োগ করেছেন। আর আমি আমার দুআকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে জমা রেখেছি। সেই সুপারিশ---ইন শাআল্লাহ---আমার উম্মতের সেই ব্যক্তি লাভ করবে, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক না ক'রে মারা যাবে।” (মুসলিম ৫১২নং, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

((أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ)). অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত-লাভের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সেই হবে, যে নিজ অন্তর বা মন থেকে বিশুদ্ধভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে। (বুখারী ৯৯নং)

উপর্যুক্ত শর্তসাপেক্ষে মহানবী -এর সুপারিশ হবে কয়েক ধরনের:-
১। সর্ববৃহৎ সুপারিশ, যা কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষের জন্য।
২। যাদের পাপ-পুণ্য সমান হয়েছে এমন লোকেদের জান্নাত যাওয়ার জন্য সুপারিশ।
৩। যে তওহীদবাদীরা কাবীরা গোনাহর কারণে জাহান্নামী হবে, তারা যাতে জাহান্নাম প্রবেশ না করে, তার জন্য সুপারিশ।
৪। জান্নাতে কোন কোন জান্নাতীর মর্যাদা বর্ধনের জন্য সুপারিশ।
৫। কিছু লোকের জন্য বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার সুপারিশ।
৬। কোন জাহান্নামীর জাহান্নামে আযাব হাল্কা করার জন্য সুপারিশ।
৭। সকল মু'মিনদের জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পাওয়ার জন্য সুপারিশ।
৮। যে তওহীদবাদীরা কাবীরা গোনাহর কারণে জাহান্নামী হবে, তারা যাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায় তার জন্য সুপারিশ। (আক্বীদাহ তাহাবিয়্যাহ দ্রঃ)

যে ব্যক্তি মদীনা নববীয়ায় শত কষ্ট বরণ করেও বাস ক'রে সেখানে মৃত্যুবরণ করে, (মুসলিম ১৩৬৩) যে ব্যক্তি আযানের জওয়াব দেওয়ার পর মহানবী -এর উপর দরূদ পাঠ করে তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে 'অসীলাহ' (মহানবী -এর জন্য জান্নাতের এক সুউচ্চ সুসম্মানিত স্থান) 'আল্লাহুম্মা রাব্বা হা-যিহিদ দা'ওয়াতিত তা-ম্মাহ' -এই দুআ পড়ে প্রার্থনা করে, (বুখারী ৬১৪, মুসলিম ৩৮৪নং) বিশেষ ক'রে সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রসূল কিয়ামতে সুপারিশ করবেন।

যেমন কিয়ামতে কুরআন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন, (( الْقُرْآنُ شَافِعُ مُشَفَعٌ ، وَمَاحِلٌ مُصَدَّقٌ ، مَنْ جَعَلَهُ أَمَامَهُ قَادَهُ إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَنْ جَعَلَهُ خَلْفَهُ سَاقَهُ إِلَى النَّارِ)).
"কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে।” (ইবনে হিব্বান ১২৪, সঃ তারগীব ১৪২৩নং)

তিনি আরো বলেছেন, اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لأَصْحَابِهِ اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آل عِمْرَانَ فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرِ صَوَافَ تُحَاجَّانِ عَنْ أَصْحَابِهِمَا اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةً وَتَرْكَهَا حَسْرَةً وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ ... قَالَ مُعَاوِيَةُ بَلَغَنِي أَنَّ الْبَطَلَةَ السَّحَرَةُ.
"তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বর্কত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না।" মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, 'আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকরদল।' (মুসলিম ১৯১০নং)

বিশেষ ক'রে সূরা মুল্কও তার নিয়মিত পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন, (( مِنَ القُرْآنِ سُورَةٌ ثَلاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُل حَتَّى غُفِرَ لَهُ ، وَهِيَ : {تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الملك )).
"কুরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা এমন আছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং শেষাবধি তাকে ক্ষমা ক'রে দেওয়া হবে, সেটা হচ্ছে 'তাবা-রাকাল্লাযী বিয়্যাদিহিল মুল্ক' (সূরা মুল্ক)।” (আবু দাউদ ১৪০২, তিরমিযী ২৮৯১নং)

তদনুরূপ রোযা রোযাদারের জন্য কিয়ামতে সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন,
(اَلصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَي رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفَعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ باللَّيْلِ فَشَفَعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَعَانِ)).
"কিয়ামতের দিন রোযা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি ওকে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং ওর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।' আর কুরআন বলবে, 'আমি ওকে রাত্রে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং ওর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।' নবী বলেন, "অতএব ওদের উভয়ের সুপারিশ গৃহীত হবে।” (আহমাদ ৬৬২৬, হাকেম ২০৩৬, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৯৯৪, ইবনে আবিদ্দুনয়্যার 'কিতাবুল জু', সহীহ তারগীব ৯৮৪, ১৪২৯নং)

শহীদ কিয়ামতে নিজ পরিবারের ৭০ জন অপরাধীর জন্য সুপারিশ করতে পারবে। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ سِتَّ خِصَالٍ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ فِي أَوَّل دَفْعَةٍ مِنْ دَمِهِ وَيَرَى قَالَ الْحَكَمُ وَيُرَى مَقْعَدَهُ مِنْ الْجَنَّةِ وَيُحَلَّى حُلَّةَ الْإِيمَانِ وَيُزَوَّجَ مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُجَارَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَيَأْمَنَ مِنْ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ قَالَ الْحَكَمُ يَوْمَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ وَيُوضَعَ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهُ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَيُزَوَّجَ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُشَفَعَ فِي سَبْعِينَ إِنْسَانًا مِنْ أَقاربه)).
"মহান আল্লাহর নিকট শহীদের জন্য রয়েছে ৬টি দান; তার রক্তের প্রথম ক্ষরণের সাথে তার পাপ ক্ষমা করা হবে, জান্নাতে তার বাসস্থান দেখানো হবে, কবরের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে, কিয়ামতের মহাত্রাস থেকে নিরাপত্তা পাবে, ঈমানের অলঙ্কার পরিধান করবে, সুনয়না হুরীদের সাথে তার বিবাহ দেওয়া হবে এবং তার নিজ পরিজনের মধ্যে ৭০ জনের জন্য তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে।” (আহমাদ ১৭১৮২, তিরমিযী ১৬৬৩, ইবনে মাজাহ ২৭৯৯, সহীহ তিরমিযী ১৩৫৮নং)

সুপারিশ করবে মুসলিম নাবালক শিশু, যে শৈশবেই পিতামাতার কোল ছেড়ে পরকালে পাড়ি দেয় এবং তার পিতামাতা তাতে ধৈর্যধারণ করে ও সওয়াবের আশা রাখে। মহানবী বলেছেন,
((وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ السَّقْطَ لَيَجُرُّ أُمَّهُ بِسَرَرِهِ إِلَى الْجَنَّةِ إِذَا احْتَسَبَتْهُ)).
"সেই সত্তার শপথ; যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! গর্ভচ্যুত (মৃত) শিশু তার নাভির নাড়ী ধরে নিজের মাতাকে বেহেস্তের দিকে টেনে নিয়ে যাবে- যদি ঐ মা (তার গর্ভপাত হওয়ার সময়) ঐ সওয়াবের আশা রাখে তবে।” (আহমাদ ২২০৯০, ইবনে মাজাহ ১৬০৯, ত্বাবারানী ১৬৭২১নং)

📘 পাপ তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় > 📄 (১০) পরকালে প্রতিপালকের অপার করুণা

📄 (১০) পরকালে প্রতিপালকের অপার করুণা


অসীম করুণাময় মহান আল্লাহর ইচ্ছায় বহু অপরাধী জাহান্নামের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে। তিনি সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক, তিনিই দুর্বল সৃষ্টির প্রতি রহম করবেন। মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( إِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى مِئَةَ رَحْمَةٍ ، أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً بَيْنَ الجِنَّ وَالإِنسِ وَالبهائم والهَوامَ ، فَبِهَا يَتَعَاطَفُونَ، وبهَا يَتَرَاحَمُونَ ، وبهَا تَعْطِفُ الوَحْشِ عَلَى وَلَدِهَا ، وَأَخَّرَ اللهُ تَعَالَى تِسْعاً وَتِسْعِينَ رَحْمَةً يَرْحَمُ بِهَا عِبَادَهُ يَوْمَ القِيَامَة )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"নিশ্চয় আল্লাহর একশটি রহমত আছে, যার মধ্য হতে একটি মাত্র রহমত তিনি মানব-দানব, পশু ও কীটপতঙ্গের মধ্যে অবতীর্ণ করেছেন। ঐ এক ভাগের কারণেই (সৃষ্টজীব) একে অপরকে মায়া করে, তার কারণেই একে অন্যকে দয়া করে এবং তার কারণেই হিংস্র জন্তুরা তাদের সন্তানকে মায়া ক'রে থাকে। বাকী নিরানব্বইটি আল্লাহ পরকালের জন্য রেখে দিয়েছেন, যার দ্বারা তিনি কিয়ামতের দিন আপন বান্দাদের উপর রহম করবেন।” (বুখারী ৬০০০, মুসলিম ৭১৪৮-৭১৫১নং)

উমার ইবনে খাত্ত্বাব রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট কিছু সংখ্যক বন্দী এল। তিনি দেখলেন যে, বন্দীদের মধ্যে একজন মহিলা (তার শিশুটি হারিয়ে গেলে এবং স্তনে দুধ জমে উঠলে বাচ্চার খোঁজে অস্থির হয়ে) দৌড়াদৌড়ি করছে। হঠাৎ সে বন্দীদের মধ্যে কোন শিশু পেলে তাকে ধরে কোলে নিয়ে (দুধ পান করাতে লাগল। অতঃপর তার নিজের বাচ্চা পেয়ে গেলে তাকে বুকে-পেটে লাগিয়ে) দুধ পান করাতে লাগল। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "তোমরা কি মনে কর যে, এই মহিলা তার সন্তানকে আগুনে ফেলতে পারে?” আমরা বললাম, 'না, আল্লাহর কসম!' তারপর তিনি বললেন,
(( اللَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا )).
"এই মহিলাটি তার সন্তানের উপর যতটা দয়ালু, আল্লাহ তার বান্দাদের উপর তার চেয়ে অধিক দয়ালু।” (বুখারী ৫৯৯৯, মুসলিম ৭১৫৪নং)

সুতরাং মহান প্রতিপালক নিজ দয়াগুণে নিজ দাসগণকে আগুনে ফেলবেন না; যদিও তারা অপরাধ করেছে। বিশেষ ক'রে শেষ নবী ﷺ-এর বহু উম্মতকে পরকালে আযাব দেবেন না। তিনি বলেছেন,
أُمَّتِي هَذِهِ أُمَّةً مَرْحُومَةٌ لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِي الآخِرَةِ عَذَابُهَا فِي الدُّنْيَا الْفِتَنُ وَالزَّلازِلُ وَالْقَتْلُ ..
"আমার এই উম্মত করুণাপ্রাপ্ত উম্মত। পরকালে তার কোন আযাব নেই। তার আযাব হল ইহকালে ফিতনা, ভূমিকম্প ও হত্যা।” (আহমাদ ১৯৬৭৮, আবু দাউদ ৪২৮০, হাকেম ৭৬৪৯, ৮৩৭২, ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪০৫৫, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৯৭৯৯, আবু য়‍্যা'লা ৭২৭৭, সিঃ সহীহাহ ৯৫৯নং)

কিয়ামতে শেষ বিচারের সময় তিনি মু'মিনদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করবেন। মহানবী বলেছেন,
يُدْنَى الْمُؤْمِنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَضَعَ عَلَيْهِ كَنَفَهُ فَيُقَرِّرُهُ بِذُنُوبِهِ فَيَقُولُ هَلْ تَعْرِفُ فَيَقُولُ أَي رَبِّ أَعْرِفُ . قَالَ فَإِنِّى قَدْ سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَإِنِّي أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ. فَيُعْطَى صَحِيفَةَ حَسَنَاتِهِ وَأَمَّا الْكُفَّارُ وَالْمُنَافِقُونَ فَيُنَادَى بِهِمْ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ } ..
"কিয়ামতের দিন ঈমানদারকে রাব্বুল আলামীনের এত নিকটে নিয়ে আসা হবে যে, আল্লাহ তাআলা তার উপর নিজ পর্দা রেখে তার পাপসমূহের স্বীকারোক্তি আদায় করে নেবেন। তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই পাপ তুমি জান কি? এই পাপ চিনো কি? মু'মিন বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি জানি। অতঃপর যখন সে ভাববে যে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন তিনি বলবেন, আমি পৃথিবীতে তোমার পাপকে গোপন রেখেছি, আর আজ তা তোমার জন্য ক্ষমা করে দিচ্ছি। অতঃপর তাকে তার নেক আমলের আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিকদেরকে সৃষ্টির সামনে ডাকা হবে। তাদের ব্যাপারে সাক্ষী (ফিরিশ্তা)গণ বলবেন, এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।” (বুখারী ২৪৪১, মুসলিম ৭১৯১, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

কাউকে কাউকে জাহান্নামে দিলেও নিজ ইচ্ছামতো মহান আল্লাহ তাকে সেখান থেকে তুলে এনে জান্নাতে দেবেন। অনেকের মহাপাপ গোপন ক'রে লঘু পাপের হিসাব নেবেন এবং তা পুণ্যে পরিবর্তন ক'রে দেবেন। রসূল বলেছেন,
إِنِّى أَعْلَمُ آخِرَ أَهْلِ الْجَنَّةِ دُخُولاً الْجَنَّةَ وَآخِرَ أَهْلِ النَّارِ خُرُوجًا مِنْهَا رَجُلٌ يُؤْتَى بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ اعْرِضُوا عَلَيْهِ صِغَارَ ذُنُوبِهِ وَارْفَعُوا عَنْهُ كِبَارَهَا. فَتُعْرَضُ عَلَيْهِ صِغَارُ ذُنُوبِهِ فَيُقَالُ عَمِلْتَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا وَعَمِلْتَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا كَذَا وَكَذَا، فَيَقُولُ نَعَمْ. لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنْكِرَ وَهُوَ مُشْفِقٌ مِنْ كِبَارِ ذُنُوبِهِ أَنْ تُعْرَضَ عَلَيْهِ. فَيُقَالُ لَهُ فَإِنَّ لَكَ مَكَانَ كُلَّ سَيِّئَةٍ حَسَنَةً فَيَقُولُ رَبِّ قَدْ عَمِلْتُ أَشْيَاءَ لَا أَرَاهَا هَا هُنَا ...
"নিশ্চয় আমি সেই ব্যক্তিকে জানি, যে সবার শেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সবার শেষে জাহান্নাম থেকে বের হবে। সে এমন এক ব্যক্তি, যাকে কিয়ামতে আনা হবে এবং বলা হবে, 'ওর ছোট-ছোট পাপগুলো ওর কাছে পেশ কর এবং বড়-বড় পাপগুলো তুলে নাও।' সুতরাং তার ছোট-ছোট পাপগুলো তার কাছে পেশ করা হবে এবং বলা হবে, 'তুমি অমুক দিনে এই এই পাপ করেছ, অমুক দিনে এই এই পাপ করেছ?' সে বলবে, 'হ্যাঁ।' সে তা অস্বীকার করতে পারবে না। পরন্তু সে তার বড় পাপগুলো পেশ করার ভয়ে ভীত থাকবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, 'তোমার প্রত্যেক পাপের স্থলে একটি ক'রে পুণ্য দেওয়া হল।' তখন সে বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তো অনেক কিছু এমন (পাপ) করেছি, যা এখানে আমি দেখতে পাচ্ছি না।' এ হাদীস বর্ণনা ক'রে নবী হেসে ফেললেন, যাতে তাঁর চোয়ালের দাঁতগুলি প্রকাশিত হয়ে গেল। (আহমদ ২১৩৯৩, মুসলিম ৪৮৭, তিরমিযী ২৫৯৬, ইবনে হিব্বান ৭৩৭৫নং)

মহান প্রতিপালক কিয়ামতে ফিরিস্তাগণকে বলবেন, (أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزْنُ شَعِيرَةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ ذَرَّةً أَخْرِجُوا مِنْ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِنْ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ بُرَّةً)).
"সেই ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে অণু (বা ভুট্টা) পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে। আর সেই ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের কর, যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে এবং তার হৃদয়ে গমের দানা পরিমাণ মঙ্গল (ঈমান) আছে।” (আহমাদ ৩/২৭৬, তিরমিযী ২৫৯৩নং, এ হাদীসের মূল রয়েছে সহীহায়নে)

কিয়ামতের বিবরণ দিতে গিয়ে মহানবী বিচার-পরবর্তী অবস্থার কথা বলেছেন, "অতঃপর জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। শাফাআতেরও অনুমতি দেওয়া হবে। মানুষ বলতে থাকবে, 'হে আল্লাহ! আমাদের নিরাপত্তা দিন, আমাদের নিরাপত্তা দিন।' জিজ্ঞাসা করা হল, 'হে আল্লাহর রাসূল! পুল কী? রাসুলুল্লাহ বললেন, "এটি এমন স্থান যেখানে পা পিছলে যায়। সেখানে আছে নানা প্রকারের লৌহ শলাকা ও কাঁটা, দেখতে নজদের সা'দান বৃক্ষের কাঁটার ন্যায়। মু'মিনগণের কেউ তো এ পথ পলকের গতিতে, কেউ বিদ্যুত গতিতে কেউ বায়ুর গতিতে, কেউ অশ্ব গতিতে, কেউ উষ্ট্রের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ তো অক্ষত অবস্থায় নাজাত পাবে, আর কেউ তো হবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নাজাতপ্রাপ্ত। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে পিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে মু'মিনগণ জাহান্নাম হতে মুক্তিলাভ করবে।"

রাসূলুল্লাহ বলেন, "সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, ঐ দিন মু'মিনগণ তাদের ঐ সব ভাইদের স্বার্থে আল্লাহর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে, যারা জাহান্নামে রয়ে গেছে। তোমরা পার্থিব অধিকারের ক্ষেত্রেও এমন বিতর্কে লিপ্ত হও না। তারা বলবে, 'হে রব! এরা তো আমাদের সাথেই সালাত আদায় করত, সিয়াম পালন করত, হজ্জ করত।' তখন আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দেবেন, 'যাও তোমাদের পরিচিতদের উদ্ধার ক'রে আনো।'
উল্লেখ্য এরা জাহান্নামে পতিত হলেও মুখমন্ডল আযাব থেকে রক্ষিত থাকবে। (তাই তাদেরকে চিনতে কোন অসুবিধা হবে না।) সুতরাং মু'মিনগণ জাহান্নাম হতে এক বিরাট দলকে উদ্ধার ক'রে আনবে। এদের অবস্থা এমন হবে যে, কারোর তো পায়ের অর্ধ গোড়ালী পর্যন্ত, আবার কারোর হাঁটু পর্যন্ত দেহকে অগ্নি ভস্ম ক'রে দিয়েছে। উদ্ধার শেষ ক'রে মুমিনগণ বলবে, 'হে রব! যাদের সম্পর্কে আপনি নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, তাদের মাঝে আর কেউ অবশিষ্ট নেই।' আল্লাহ বলবেন, 'পুনরায় যাও, যার অন্তরে এক দীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে, তাকেও উদ্ধার ক'রে আনো।' তখন তারা আবার এক দলকে উদ্ধার ক'রে এনে বলবে, 'হে রব! অনুমতিপ্রাপ্তদের কাউকেই রেখে আসিনি।' আল্লাহ বলবেন, 'আবার যাও, যার অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে, তাকেও বের করে আনো।' তখন তারা আবার এক দলকে উদ্ধার ক'রে এনে বলবে, 'হে রব! যাদের সম্পর্কে আপনি নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, তাদের মাঝে আর কেউ অবশিষ্ট নেই।' আল্লাহ বলবেন, 'পুনরায় যাও, যার অন্তরে অণু পরিমাণও ঈমান বিদ্যমান, তাকেও উদ্ধার ক'রে আনো।' তখন তারা আবার এক দলকে উদ্ধার ক'রে এনে বলবে, 'হে রব! যাদের কথা বলেছিলেন, তাদের কাউকেও রেখে আসিনি।'
সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী বলেন, 'তোমরা যদি আমাকে এ হাদীসের ব্যাপারে সত্যবাদী মনে না কর, তবে এর সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাঅত করতে পার।
{إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِن تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا }
"নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না এবং তা পুণ্যকার্য হলে, আল্লাহ তাকে বহুগুণে বর্ধিত করেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকট হতে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” (নিসাঃ ৪০)

অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করবেন, 'ফিরিস্তারা সুপারিশ করল, নবীগণ সুপারিশ করল এবং মু'মিনগণও সুপারিশ করল, কেবলমাত্র আরহামুর রাহিমীন রয়ে গেছেন।' এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো তুলে আনবেন। ফলে এমন একদল লোক মুক্তি পাবে যারা কখনো কোন সৎকর্ম করেনি এবং আগুনে জ্বলে অঙ্গার হয়ে গেছে। পরে তাদেরকে জান্নাতের প্রবেশ মুখের 'নাহরুল হায়াত'-এ নিক্ষেপ করা হবে। তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে, যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর স্রোতবাহিত পানিতে সতেজ হয়ে উঠে। রাসুলুল্লাহ বললেন, "তোমরা কি কোন বৃক্ষ কিংবা পাথরের আড়ালে কোন শস্যদানা অঙ্কুরিত হতে দেখনি? যেগুলো সূর্য কিরণের মাঝে থেকে হলদে ও সবুজ রূপ ধারণ করে। আর যেগুলো ছায়াযুক্ত স্থানে থাকে সেগুলো সাদা হয়ে যায়।”
সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! মনে হয় আপনি যেন গ্রামাঞ্চলে পশু চরিয়েছেন। রাসুল বললেন, "এরপর তারা নহর থেকে মুক্তার ন্যায় ঝকঝকে অবস্থায় উঠে আসবে এবং তাদের গ্রীবাদেশে মোহরাংকিত থাকবে, যা দেখে জান্নাতীগণ তাদেরকে চিনতে পারবে। এরা হল 'উতাক্বাউল্লাহ' আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা সৎ আমল ব্যতীতই তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন। এরপর আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য ক'রে বলবেন, 'যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। আর যা কিছু দেখছ সব কিছু তোমাদেরই।' তারা বলবে, 'হে রব! আপনি আমাদেরকে এত দিয়েছেন সৃষ্ট জগতের কাউকে দেননি।' আল্লাহ বলবেন, 'তোমাদের জন্য আমার নিকট এর চেয়েও উত্তম বস্তু আছে।' তারা বলবে, 'কী সে উত্তম বস্তু?' আল্লাহ বলবেন, 'সে হল আমার সন্তুষ্টি। এরপর আর কখনো তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো না।' (বুখারী ৭৪৩৯, মুসলিম ৪৭২নং)

কিন্তু এই রহমতের আশাধারী কে হতে পারবে? কে হবে সেই অসীম করুণার পাত্র?
পূর্বোক্ত কিছু হাদীস থেকে জানা যায় যে, সে করুণার অধিকারী হবে একমাত্র তওহীদবাদী মু'মিনগণ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّ رَحْمَتَ اللهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ} (٥٦) سورة الأعراف
"নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মপরায়ণদের নিকটবর্তী।” (আ'রাফঃ ৫৬)
মুসলিম নামধারী মুশরিকরা সে রহমতের উপযুক্ত নয়।

মুআয ইবনে জাবাল বলেন, আমি গাধার উপর নবী-এর পিছনে সওয়ার ছিলাম। তিনি বললেন, "হে মুআয! তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী?” আমি বললাম, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূলই অধিক জানেন।' তিনি বললেন,
((فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ ، وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيئاً ، وَحَقَّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ أَنْ لَا يُعَذِّبَ مَنْ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيئاً )).
"বান্দার উপর আল্লাহর হক এই যে, সে তাঁরই ইবাদত করবে, এতে তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক এই যে, যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, তিনি তাকে আযাব দেবেন না।"
অতঃপর আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি কি লোকেদেরকে (এ) সুসংবাদ দেব না?' তিনি বললেন, "তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ো না। কেননা, তারা (এরই উপর) ভরসা ক'রে বসবে।” (বুখারী ২৮৫৬, মুসলিম ۱۵৩নং)

জান্নাত-জাহান্নাম নির্ণয় করার জন্য নেকী-বদী আমল মীযানে ওজন করা হবে। সেদিন তাওহীদের কালেমার পাল্লার চাইতে অন্য কিছু ভারী হবে না। সুতরাং কেউ তওহীদবাদী হলে সে মুক্তি পেয়ে যাবে।
মহানবী বলেছেন, ((إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَسْتَخْلِصُ رَجُلاً مِنْ أُمَّتِي ، عَلَى رُؤُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، فينشرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلاً ، كُلُّ سِجِل مَدُّ الْبَصَرِ ، ثُمَّ يَقُولُ لَهُ : أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا ؟ أَظَلَمَتْكَ كَتَبَتِي الْحَافِظُونَ ؟ قَالَ : لَا يَا رَبِّ ، فَيَقُولُ : أَلَكَ عُدْرٌ ، أَوْ حَسَنَةٌ ؟ فَيُبْهَتُ الرَّجُلُ ، فَيَقُولُ : لَا يَا رَبِّ ، فَيَقُولُ بَلَى ، إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً وَاحِدَةً، لَأَظُلْمَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ ، فَتُخْرَجُ لَهُ بِطَاقَةٌ ، فِيهَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهَ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولُ : أَحْضِرُوهُ ، فَيَقُولُ : يَارَبِّ ، مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السَّجِلاتِ ؟ فَيُقَالُ : إِنَّكَ لا تُظْلَمُ . قَالَ : فَتُوضَعُ السجلاتُ فِي كِفَةٍ ، قَالَ : فَطَاشَتِ السَّجِلاتُ، وَثَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ، وَلَا يَثْقُلُ مِعَ اسْمِ اللَّهِ شَيْءٌ)).
"(কিয়ামতের দিন) আল্লাহ আমার উম্মতের একটি লোককে বেছে নিয়ে তার সামনে নিরানব্বইটি (আমল-নামা) রেজিষ্টার বিছিয়ে দেবেন; প্রত্যেকটি রেজিষ্টার দৃষ্টি বরাবর লম্বা! অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, 'তুমি কি লিখিত পাপের কোন কিছু অস্বীকার কর? আমার আমল সংরক্ষক ফিরিস্তা কি তোমার প্রতি কোন অন্যায় করেছে?' লোকটি বলবে, 'না, হে আমার প্রতিপালক!' আল্লাহ বলবেন, তোমার কি কোন পেশ করার মত ওযর আছে অথবা তোমার কি কোন নেকী আছে?' লোকটি হতবাক হয়ে বলবে, 'না, হে আমার প্রতিপালক!' আল্লাহ বলবেন, 'অবশ্যই আমাদের কাছে তোমার একটি নেকী আছে। আর আজ তোমার প্রতি কোন প্রকার অবিচার করা হবে না।' অতঃপর একটি কার্ড বের করা হবে, যাতে লেখা থাকবে, 'আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অআন্না মুহাম্মাদান আবদুহু অরসূলুহ।' আল্লাহ মীযান (দাঁড়িপাল্লা) আনতে আদেশ করবেন। লোকটি বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! এতগুলি বড় বড় রেজিষ্টারের কাছে এই কার্ডটির ওজন আর কী হবে?' আল্লাহ বলবেন, 'তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না।' অতঃপর রেজিষ্টারগুলোকে দাঁড়ির এক পাল্লায় এবং ঐ কার্ডটিকে অন্য পাল্লায় চড়ানো হবে। দেখা যাবে, রেজিষ্টারগুলোর ওজন হাল্কা এবং কার্ডটির ওজন ভারী হয়ে গেছে! যেহেতু আল্লাহর নামের চেয়ে অন্য কিছু ভারী নয়।” (আহমাদ ৬৯৯৪, তিরমিযী ২৬৩৯, ইবনে মাজাহ ৪৩০০নং, হাকেম ১/৪৬)

দুনিয়ায় যারা সৃষ্টির প্রতি রহম করে, তারা পরকালে স্রষ্টার রহম লাভ করবে। দুনিয়ায় যারা অপরকে মার্জনা করে, তাদেরকে আল্লাহ কিয়ামতে মার্জনা করবেন। মহানবী বলেছেন,
(إِنَّ رَجُلاً لَمْ يَعْمَلْ خَيْراً قَطُّ، وَكَانَ يُدَايِنُ (۱) النَّاسَ ، فَيَقُولُ لِرَسُولِهِ : خُذْ مَا تَيَسَّرَ، واتْرُكْ مَا عَشْرَ، وَتَجَاوَزْ لَعَلَّ اللَّهَ تَعَالى أَنْ يَتَجَاوَزَ عَنَّا ، فَلَمَّا هَلَكَ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ : هَلْ عَمِلْتَ خَيْراً قَطُّ؟ قَالَ : لا ، إلا أَنَّهُ كَانَ لِي غُلامٌ وَكُنْتُ أُدَايِنُ النَّاسَ، فَإِذَا بَعَثْتُهُ ليتقاضى، قُلْتُ لَهُ: خُذْ مَا تَيَسَرَ ، وَاتْرُكْ مَا عَسُرَ ، وَتَجَاوَزْ لَعَلَّ اللَّهَ يَتَجَاوَزُ عَنَا، قَالَ اللهُ تَعَالَى : قَدْ تَجَاوَزْتُ عَنْكَ).
"এক ব্যক্তি কোন দিন কোন নেক আমল করেনি। তবে সে লোককে ঋণ দান করত এবং নিজের তহসীলদার দূতকে বলত, 'সামর্থ্যবান ব্যক্তির নিকট থেকে আদায় কর, অসামর্থ্যবান ব্যক্তিকে অবকাশ দাও এবং মাফ করে দাও। সম্ভবতঃ আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করে দেবেন।' অতঃপর লোকটি যখন মারা গেল, তখন আল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি কি কোন দিন কোন ভাল কাজ করেছ?' লোকটি বলল, 'না। তবে আমার একজন (তহসীলদার) কিশোর ছিল। আমি মানুষকে ঋণ দান করতাম। আর আমি যখন তাকে সেই ঋণ আদায় করতে পাঠাতাম, তখন বলতাম, 'সামর্থ্যবান ব্যক্তির নিকট থেকে আদায় কর, অসামর্থ্যবান ব্যক্তিকে অবকাশ দাও এবং মাফ করে দাও। সম্ভবতঃ আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করে দেবেন।' আল্লাহ বললেন, 'আমিও তোমাকে মাফ করে দিলাম।” (আহমদ ৮৭১৫, নাসাঈ ৪৬৯৪, ইবনে হিব্বান ৫০৪৩, হাকেম ২২২৩, সহীহুল জামে' ২০৭৮নং)
অবশ্য এ মাফ লাভের যোগ্যতা হিসাবে তওহীদ অবশ্যই থাকতে হবে; যেমন পূর্বোক্ত হাদীসসমূহে উল্লিখিত হয়েছে।

মহান করুণাময়ের করুণায় আশাবাদী হওয়া ভালো, তা বলে তার প্রতি ভরসা রেখে আমল বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ মহান প্রতিপালক যেমন 'গাফফার' (মহাক্ষমাশীল), তেমনি তিনি 'ক্বাহহার' (প্রবল প্রতাপশালী) ও 'আযীযুন যুনতিক্বাম' (পরাক্রমশালী প্রতিশোধগ্রহণকারী)। এ জন্যই মহানবী বলেছেন, لَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ مَا عِنْدَ اللَّهُ مِنَ العُقُوبَةِ مَا طَمِعَ بِجَنَّتِهِ أَحَدٌ ، وَلَوْ يَعْلَمُ الْكَافِرُ مَا عِنْدَ اللَّهِ مِنَ الرَّحْمَةِ مَا قَنَطَ مِنْ جَنَّتِهِ أَحَدٌ )). رواه مسلم "যদি মু'মিন জানত যে, আল্লাহর নিকট কী শাস্তি রয়েছে, তাহলে কেউ তার জান্নাতের আশা করত না। আর যদি কাফের জানত যে, আল্লাহর নিকট কী করুণা রয়েছে, তাহলে কেউ তার জান্নাত থেকে নিরাশ হত না।” (মুসলিম ৭১৫৫নং) আর মহান আল্লাহ বলেছেন, نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (٤٩) وَ أَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمَ} (٥٠) "আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, 'নিশ্চয় আমিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু এবং আমার শাস্তিই হল অতি মর্মন্তুদ শাস্তি।' (হিজরঃ ৪৯-৫০)
সুতরাং আক্বীদা সংশোধন করুন, আল্লাহর রহমতের আশা রাখুন এবং সেই সাথে মুক্তির জন্য কাজ ক'রে যান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00