📄 (৬) কবরের আযাব
কবরের আযাব সত্য। কোন মু'মিন কোনও পাপ থেকে তওবা ক'রে মারা না গেলে তার কবরে আযাব হতে পারে। আর তার ফলে তার জাহান্নামের শাস্তি লাঘব হতে পারে অথবা মাফ হতে পারে।
কবরের শাস্তির মধ্যে মাটির চেপে ধরা অন্যতম। আর সেটা সকলের জন্য অনিবার্য। কেউ বাঁচলে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী সা'দ বিন মুআয বাঁচতেন। মহানবী বলেছেন,
((هَذَا الَّذِي تَحَرَّكَ لَهُ الْعَرْشِ وَفُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَشَهِدَهُ سَبْعُونَ أَلْفًا مِنَ الْمَلَائِكَةِ لَقَدْ ضُمَّ ضَمَّةً ثُمَّ فُرِّجَ عَنْهُ)).
“এই ব্যক্তি, যার (মৃত্যুর) জন্য আরশ কম্পিত হয়েছে, তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তার জানাযায় সত্তর হাজার ফিরিস্তা উপস্থিত হয়েছেন, তাকেও একবার চেপে ধরা হয়েছে। অতঃপর মুক্তি দেওয়া হয়েছে।” (নাসাঈ ২০৫৫নং)
এ ছাড়া পাপ অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি রয়েছে কবরে। আর সে শাস্তি কবরে পেয়ে গেলে জাহান্নামের শাস্তি হাল্কা অথবা মাফ হয়ে যাবে。
📄 (৭) ঈসালে সওয়াব
মানুষ মারা গেলে তার আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বেহেস্তী বারযাখী জীবনে তার মর্যাদাবর্ধন অথবা দোযখী জীবনের শাস্তি লাঘব করার কতিপয় পথ খোলা থাকে। আর সে পথ অবলম্বন করতে পারে তার আত্মীয়-বন্ধুগণ। তারা যেমন দুআ ব্যবহার করতে পারে, তেমনি কিছু নেক আমল করতে পারে, যার দ্বারা তাদের মৃতব্যক্তি মধ্য জগতে উপকৃত হতে পারে।
১। মাইয়্যেতের নযর-মানা রোযা যদি তার অভিভাবক কাযা রেখে দেয়, তবে তার সওয়াব তার উপকারে আসবে। প্রিয় রসূল বলেন,
مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ ..
"যে ব্যক্তি রোযা বাকী রেখে মারা যায়, তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক রোযা রেখে দেবে।" (বুখারী ১৯৫২, মুসলিম ২৭৪৮নং)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'এক মহিলা সমুদ্র-সফরে বের হলে সে নযর মানল যে, যদি আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা তাকে সমুদ্র থেকে পরিত্রাণ দান করেন, তাহলে সে একমাস রোযা রাখবে। অতঃপর সে সমুদ্র থেকে পরিত্রাণ পেয়ে ফিরে এল। কিন্তু রোযা না রেখেই সে মারা গেল। তার এক কন্যা নবী এর নিকট এসে সে ঘটনার উল্লেখ করলে তিনি বললেন, "মনে কর, তার যদি কোন ঋণ বাকী থাকত, তাহলে তা তুমি পরিশোধ করতে কি না?" বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন,
(( دَيْنُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُقْضَى)).
"তাহলে আল্লাহর ঋণ অধিকরূপে পরিশোধ-যোগ্য। সুতরাং তুমি তোমার মায়ের তরফ থেকে রোযা কাযা করে দাও।" (আহমাদ ১৮৬১, ৩১৩৮, আবু দাউদ ৩৩১০নং, ত্বাবারানী ১২১৯৫, প্রমুখ)
তদনুরূপ রমযানের রোযা কাযা রেখে মারা গেলে তার বিনিময়ে তার অভিভাবক ফিদয়্যাহ (প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে একটি মিসকীনকে একদিনের খাদ্য অথবা ১ কিলো ২৫০ গ্রাম করে চাল) দিলে তার সওয়াবও মাইয়্যেতের জন্য উপকারী।
আমরাহর মা রমযানের রোযা বাকী রেখে ইন্তিকাল করলে তিনি মা আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি আমার মায়ের তরফ থেকে কাযা করে দেব কি?' আয়েশা (রাঃ) বললেন, 'না। বরং তার তরফ থেকে প্রত্যেক দিনের পরিবর্তে এক একটি মিসকীনকে অর্ধ সা' (প্রায় ১কিলো ২৫০ গ্রাম খাদ্য) সদকাহ করে দাও।' (ত্বাহাবী ৩/১৪২, মুহাল্লা ৭/৪, আহকামুল জানাইয, টীকা ১৭০পৃঃ)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'কোন ব্যক্তি রমযান মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং তারপর রোযা না রাখা অবস্থায় মারা গেলে তার তরফ থেকে মিসকীন খাওয়াতে হবে; তার কাযা নেই। পক্ষান্তরে নযরের রোযা বাকী রেখে গেলে তার তরফ থেকে তার অভিভাবক (বা ওয়ারেস) রোযা রাখবে।' (আবু দাউদ ২৪০১নং প্রমুখ)
২। মাইয়্যেতের তরফ থেকে আত্মীয় বা যে কেউ তার ছেড়ে যাওয়া ঋণ পরিশোধ করলে সে কবরে উপকৃত হয়। মহানবী বলেছেন,
نَفْسُ المُؤمِنَ مُعَلَّقَةً بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ)).
"(মরণের পর ঐ ঋণের কারণে) মু'মিনের আত্মা (বেহেস্তের পথে) লটকে থাকবে; যতক্ষণ না তার তরফ থেকে তার সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।" (আহমাদ ১০৫৯৯, তিরমিযী ১০৭৮, ইবনে মাজাহ ২৪১৩, আবু য়্যা'লা ৬০২৬নং)
৩। মাইয়্যেত হজ্জ করার নযর মেনে মারা গেলে, অথবা হজ্জ ফরয হওয়ার পর কোন ওযরে না ক'রে মারা গেলে যদি তার ওয়ারেসীনদের কেউ (যে নিজের ফরয হজ্জ আগে পালন করে থাকবে) তার তরফ থেকে তা পালন করে, তবে এর সওয়াবেও সে লাভবান হবে।
ইবনে আব্বাস বলেন, এক ব্যক্তি নবী-এর নিকট এসে বলল, 'আমার বোন হজ্জ করার নযর মেনে মারা গেছে। (এখন কী করা যায়?) নবী বললেন, "তার ঋণ বাকী থাকলে কি তুমি পরিশোধ করতে?" লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "তাহলে আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করে দাও। কারণ, তা অধিক পরিশোধ-যোগ্য।" (বুখারী ৬৬৯৯নং)
অনুরূপ এক মহিলা বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার আব্বা বড় বৃদ্ধ। তার ফরয হজ্জ বাকী আছে। এখন সওয়ারীতে বসে থাকতেও সে অক্ষম। আমি কি তার তরফ থেকে হজ্জ করে দেব?' নবী বললেন, " 'হ্যাঁ।' করে দাও।" (মুসলিম ১৩৩৪-১৩৩৫নং প্রমুখ)
ইমাম নওবী বলেন, এই হাদীস বার্ধক্য, চিররোগ অথবা মৃত্যুর কারণে ফরয হজ্জ পালনে অসমর্থ ব্যক্তির তরফ থেকে হজ্জ পালন করার বৈধতা নির্দেশ করে। (শারহে নওবী ৫/৮৩)
অবশ্য ফরয হওয়া সত্ত্বেও যে বিনা ওজরে সময়ের অবহেলা বশতঃ হজ্জ না ক'রে মারা গেছে, তার তরফ থেকে হজ্জ আদায় কোন কাজে দেবে না। (আহকামুল জানাইয ১৭১পৃঃ, টীকা)
৪। মাইয়্যেতের ছেড়ে যাওয়া নেক সন্তান, যে নেক আমল করে, তার সওয়াবের অনুরূপ সওয়াব লাভ হয় তার পিতা-মাতারও। এতে সন্তানের সওয়াবও মোটেই কম হয় না। কারণ, সন্তান হল পিতা-মাতার আমলকৃত ও উপার্জিত ধনের ন্যায়। আর আল্লাহ তাআলা বলেন,
{وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (۳۹) سورة النجم
অর্থাৎ, এবং মানুষ তাই পায়; যা সে করে। (সূরা নাজম ৩৯ আয়াত)
আর আল্লাহ রসূল বলেন,
إِنَّ مِنْ أَطْيَبِ مَا أَكَلَ الرَّجُلُ مِنْ كَسْبِهِ وَوَلَدُهُ مِنْ كَسْبِهِ ..
"মানুষ সবচেয়ে হালাল বস্তু যেটা ভক্ষণ করে তা হল তার নিজ উপার্জিত খাদ্য। আর তার সন্তান হল তার নিজ উপার্জিত ধন স্বরূপ।" (আবু দাউদ ৩৫২৮, তিরমিযী ১৩৫৮, নাসাঈ ৪৪৬৪, ইবনে মাজাহ ২১৩৭নং প্রমুখ)
তাই সন্তান যদি তার পিতা-মাতার নামে দান করে অথবা ক্রীতদাস মুক্ত করে অথবা হজ্জ করে, তাহলে এসবের সওয়াবে তারা উপকৃত হবে।
ইবনে আব্বাস বলেন, সা'দ বিন উবাদাহর মা যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি আল্লাহর রসূল-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমার অনুপস্থিত থাকা কালে আমার আম্মা মারা গেছেন। এখন যদি তাঁর তরফ থেকে কিছু দান করি তাহলে তিনি উপকৃত হবেন কি?' নবী বললেন, "হ্যাঁ হবে।" সা'দ বললেন, 'তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি যে, আমার মিখরাফের বাগান তাঁর নামে সদকাহ করলাম।' (বুখারী ২৭৫৬, ২৭৬২নং প্রমুখ)
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী-কে বলল, 'আমার মা হঠাৎ মারা গেছে। আমার ধারণা যে, সে কথা বলার সুযোগ পেলে সাদকাহ করত। সুতরাং আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করি, তাহলে কি সে নেকী পাবে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।" (বুখারী ১৩৮৮, ২৭৬০, মুসলিম ২৩৭৩, ৪৩০৭-৪৩০৮নং)
আব্দুল্লাহ বিন আম্র বলেন, আস বিন ওয়াইল সাহমী তার তরফ হতে ১০০টি ক্রীতদাস মুক্ত করার অসিয়ত করে মারা যায়। সুতরাং তার ছোট ছেলে হিশাম ৫০টি দাস মুক্ত করে। অতঃপর তার বড় ছেলে আম্র বাকী ৫০টি দাস মুক্ত করার ইচ্ছা করলে বললেন, '(বাপ তো কাফের অবস্থায় মারা গেছে) তাই আমি এ কাজ আল্লাহর রসূল-কে জিজ্ঞাসা না করে করব না।' সুতরাং তিনি নবী-এর নিকট এসে ঘটনা খুলে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমি কি বাকী ৫০টি দাস তার তরফ থেকে মুক্ত করব?' উত্তরে আল্লাহর রসূল বললেন,
إِنَّهُ لَوْ كَانَ مُسْلِمًا فَأَعْتَقْتُمْ عَنْهُ أَوْ تَصَدَّقْتُمْ عَنْهُ أَوْ حَجَجْتُمْ عَنْهُ بَلَغَهُ ذَلِكَ ..
"সে যদি মুসলিম হতো এবং তোমরা তার তরফ থেকে দাস মুক্ত করতে, অথবা সদকাহ করতে অথবা হজ্জ করতে তাহলে তার সওয়াব তার নিকট পৌঁছত।" (আবু দাউদ ২৮৮৫নং, বাইহাকী ৬/২৭৯, আহমাদ ৬৭০৪নং)
📄 (৮) কিয়ামতের কঠিনতা
কিয়ামতের কঠিনতা ও ভয়াবহতা মু'মিনের জাহান্নামের শাস্তি লাঘব করবে। গোনাহগার তওহীদবাদী মু'মিন কিয়ামতের সেই ভীষণ কষ্ট পেয়ে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। মহান আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা ক'রে বেহেস্ত প্রবেশের অনুমতি দিতে পারেন। না চাইলে পাপ অনুসারে তাকে কিছুদিন জাহান্নামে শাস্তি ভোগাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সে জান্নাতের পথে পুলসিরাতেও হাত-পা কেটে শাস্তি পেতে পারে। অতঃপর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের সুখ লাভ করতে পারে। নচেৎ পুল থেকে নিচে পড়ে জাহান্নামে নির্ধারিত কাল পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করতে পারে।
📄 (৯) কিয়ামতের সুপারিশ
কিয়ামতের দিন সুপারিশের ফলে বহু অপরাধীর অপরাধের শাস্তি মকুব অথবা লাঘব করা হবে। কিয়ামতের দিন। ভীষণ কঠিন সেই দিন! { يَوْمَ تَكُونُ السَّمَاءُ كَالْمُهْل (۸) وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْن (۹) وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيماً (۱۰) يُبَصَّرُونَهُمْ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بَبَنِيهِ (۱۱) وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ (۱۲) وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ (۱۳) وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعاً ثُمَّ يُنجِيهِ} (١٤) المعارج "সেদিন আকাশ হবে গলিত ধাতুর মতো এবং পর্বতসমূহ হবে রঙ্গীন পশমের মতো। আর সুহৃদ সুহৃদের খবর নেবে না। (যদিও) তাদেরকে একে অপরের দৃষ্টির সামনে রাখা হবে। অপরাধী সেই দিনে শাস্তির বদলে দিতে চাইবে নিজ সন্তান-সন্ততিকে। তার স্ত্রী ও ভাইকে। তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত। এবং পৃথিবীর সকলকে, যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়।” (মাআ'রিজঃ ৮-১৪) কিন্তু তা দেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব নয় কারোর জন্য কারোর সাহায্য করা। সেদিন কেউ কারো নয়। সকলেই ব্যস্ত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে নিজেকে বাঁচানোর তাকীদে। { يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ} (۳۷) عبس “সেদিন মানুষ পলায়ন করবে আপন ভ্রাতা হতে এবং তার মাতা ও তার পিতা হতে, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।” (আবাসাঃ ৩৪-৩৭)
{يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِّنَفْسٍ شَيْئًا وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ} (۱۹) سورة الإنفطار “সেদিন কেউই কারোর জন্য কিছু করবার সামর্থ্য রাখবে না; আর সেদিন সমস্ত কর্তৃত্ব হবে (একমাত্র) আল্লাহর।” (ইনফিত্বারঃ ১৯)
“কিয়ামতের দিন, যেদিন কোন প্রকার ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না।” (বাক্বারাহঃ ২৫৪)
তবে শর্ত সাপেক্ষে সুপারিশ চলবে:-
১। সুপারিশকারীর সুপারিশ করার ক্ষমতা।
২। যার জন্য সুপারিশ করা হবে, সে যেন তাওহীদবাদী মুসলিম হয়।
৩। যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৪। সুপারিশকারীর জন্য আল্লাহর অনুমতি।
মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَكَم مِّن مَّلَكَ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْدْنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاء وَيَرْضَى) (٢٦) سورة النجم “আকাশমন্ডলীতে কত ফিরিশ্তা রয়েছে, তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।” (নাজম: ২৬)
আমাদের মহান নবী ﷺ কাল কিয়ামতে সুপারিশ করবেন, কিন্তু তাঁর ব্যাপারেও মহান প্রভু বলেছেন,
{قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا} (۲۱) سورة الجن অর্থাৎ, বল, 'আমি তোমাদের অপকার অথবা উপকার কিছুরই মালিক নই।' (জ্বিনঃ ২১) মহান আল্লাহর বাণী,
{وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ} “তোমার নিকটতম স্বজনবর্গকে তুমি সতর্ক ক’রে দাও।” (শুআ’রাঃ ২১৪)
আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর আত্মীয় ও বংশকে সম্বোধন করে বললেন, يَا مَعْشَرَ قُرَيْشِ اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ اللَّهِ لَا أُغْنِى عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا عَبَّاسَ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَا أُغْنِي عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا صَفِيَّةٌ عَمَّةَ رَسُولِ اللَّهِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا يَا فَاطِمَةُ بِنْتَ رَسُولِ اللَّهِ سَلِينِي بِمَا شِئْتِ لَا أُغْنِي عَنْكِ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا ..
"হে কুরাইশদল! তোমরা আল্লাহর নিকট নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নাও, আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কোন উপকার করতে পারব না। হে বানী আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে (চাচা) আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর দরবারে আপনার কোন কাজে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের ফুফু সাফিয়্যাহ! আমি আপনার জন্য আল্লাহর দরবারে কোন উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রসূলের বেটা ফাতেমা! আমার কাছে যে ধন-সম্পদ চাইবে চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” (বুখারী ৩৫২৭, মুসলিম ৫২২, ৫২৫নং)
বলা বাহুল্য, তিনি নিজের ইচ্ছায় কাউকে জান্নাত বা জাহান্নাম পাঠাতে পারবেন না। বরং মহান আল্লাহ তাঁকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। সুতরাং কিয়ামতে তিনি সুপারিশ করবেন।
তিনি বলেছেন,
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعِ وَأَوَّلُ مُشَفَع .. অর্থাৎ, আমি কিয়ামতের দিন আদম-সন্তানদের সর্দার। প্রথম আমাকেই কবর থেকে উঠানো হবে এবং প্রথম আমিই সুপারিশকারী ও আমার সুপারিশ গৃহীত হবে। (মুসলিম ৬০৭৯নং)
"কিয়ামতের দিন আমি হব সকল মানুষের নেতা। তোমরা কি জান, কী কারণে? কিয়ামতের দিন পূর্বাপর সমগ্র মানবজাতি একই ময়দানে সমবেত হবে। (সে ময়দানটি এমন হবে যে,) সেখানে দর্শক তাদেরকে দেখতে পাবে এবং আহবানকারী (নিজ আহবান) তাদেরকে শুনাতে পারবে। সূর্য একেবারে কাছে এসে যাবে। মানুষ এতই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিপতিত হবে যে, ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতাই তাদের থাকবে না। তারা বলবে, 'দেখ, তোমাদের সবার কী ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তোমাদের কী বিপদ এসে পৌঁছেছে! এমন কোন ব্যক্তির খোঁজ কর, যিনি পরওয়ারদেগারের কাছে সুপারিশ করতে পারেন।' লোকেরা বলবে, 'চল আদমের কাছে যাই।' সে মতে তারা আদমের কাছে এসে বলবে, 'আপনি মানব জাতির পিতা, আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং ফুঁক দিয়ে তাঁর 'রূহ' আপনার মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন। তাঁর নির্দেশে ফিরিস্তাগণ আপনাকে সিজদা করেছিলেন। আপনাকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলেন। সুতরাং আপনি কি আপনার পালনকর্তার দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী কষ্টের মধ্যে আছি? আমরা কী যন্ত্রণা ভোগ করছি?' আদম বলবেন, 'আমার প্রতিপালক আজ ভীষণ ক্রুদ্ধ আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি তার নির্দেশ অমান্য করেছিলাম। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা নূহের কাছে যাও।'
সুতরাং তারা সকলে নূহ-এর কাছে এসে বলবে, 'হে নূহ! আপনি পৃথিবীর প্রতি প্রথম প্রেরিত রসূল। আল্লাহ আপনাকে শোকর-গুজার বান্দা হিসাবে অভিহিত করেছেন। সুতরাং আপনি কি আপনার পালনকর্তার দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন না? আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী কষ্টের মধ্যে আছি? আমরা কী যন্ত্রণা ভোগ করছি?' নূহ বলবেন, আমার প্রতিপালক আজ ভীষণ ক্রুদ্ধ আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া আমার একটি দুআ ছিল, যার দ্বারা আমার জাতির উপর বদ্দুআ করেছি। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা ইব্রাহীমের কাছে যাও।'
সুতরাং তারা সবাই ইব্রাহীম-এর কাছে এসে বলবে, 'হে ইব্রাহীম! আপনি আল্লাহর নবী ও পৃথিবীবাসীদের মধ্য থেকে আপনিই তাঁর বন্ধু। আপনি আপনার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছি?' তিনি তাদেরকে বলবেন, 'আমার পালনকর্তা আজ ভীষণ রাগান্বিত হয়েছেন, এমন রাগান্বিত তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। তাছাড়া (দুনিয়াতে) আমি তিনটি মিথ্যা কথা বলেছি। সুতরাং আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা মুসার কাছে যাও।'
অতঃপর তারা মূসা-এর কাছে এসে বলবে, 'হে মুসা! আপনি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ আপনাকে তাঁর রিসালত দিয়ে এবং আপনার সাথে (সরাসরি) কথা বলে সমগ্র মানব জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী দুর্ভোগ পোহাচ্ছি?' তিনি বলবেন, 'আজ আমার প্রতিপালক এত ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন, এমন ক্রুদ্ধ তিনি আর আগে কখনো হননি এবং আগামীতেও আর কোনদিন হবেন না। তাছাড়া আমি তো (পৃথিবীতে) একটি প্রাণ হত্যা করেছিলাম, যাকে হত্যা করার কোন নির্দেশ আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা ঈসার কাছে যাও।'
অতঃপর তারা সবাই ঈসা -এর কাছে এসে বলবে, 'হে ঈসা! আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনি আল্লাহর সেই কালেমা, যা তিনি মারয়্যামের প্রতি প্রক্ষেপ করেছিলেন। আপনি হচ্ছেন তাঁর রূহ, আপনি (জন্ম নেওয়ার পর) শিশুকালে দোলনায় শুয়েই মানুষের সাথে কথা বলেছিলেন। অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছি?' তিনি তাদেরকে বলবেন, 'আমার পালনকর্তা আজ ভীষণ রাগান্বিত হয়েছেন, এমন রাগান্বিত তিনি আর কোনদিন হননি আর কখনো হবেনও না। (এখানে তিনি তাঁর কোন অপরাধ উল্লেখ করেননি।) আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! আমি নিজেকে নিয়েই চিন্তিত আছি! তোমরা বরং আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা মুহাম্মাদ-এর কাছে যাও।'
অন্য এক বর্ণনায় আছে, সুতরাং তারা সবাই আমার কাছে এসে বলবে, 'হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রসূল। আপনি আখেরী নবী। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ মাফ ক'রে দিয়েছেন। অতএব আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কী (ভয়াবহ) দুঃখ ও যন্ত্রণা ভোগ করছি।' তখন আমি চলে যাব এবং আরশের নীচে আমার প্রতিপালকের জন্য সিজদাবনত হব। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের জন্য আমার হৃদয়কে এমন উন্মুক্ত ক'রে দেবেন, যেমন ইতোপূর্বে আর কারো জন্য করেননি। অতঃপর তিনি বলবেন, 'হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও, চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।' তখন আমি মাথা উঠিয়ে বলব, আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে প্রতিপালক! আমার উম্মতকে (রক্ষা করুন) হে প্রতিপালক!' এর প্রত্যুত্তরে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) বলা হবে, 'হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে ডান দিকের দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও। এই দরজা ছাড়া তারা অন্য সব দরজাতেও সকল মানুষের শরীক।'
অতঃপর তিনি বললেন, "যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে, তাঁর কসম! জান্নাতের একটি দরজার প্রশস্ততা হচ্ছে মক্কা ও (বাহরাইনের) হাজারের মধ্যবর্তী দূরত্ব অথবা মক্কা ও (সিরিয়ার) বুসরার মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান।” (বুখারী ৪৭১২, মুসলিম ৪৯৫নং)
তবে সে সুপারিশ পেয়ে ধন্য হবে কেবল সেই অপরাধী, যে মহান প্রতিপালকের সাথে কোন কিছুকে শরীক ক'রে বিনা তওবায় মারা যায়নি। তিনি বলেছেন,
لِكُلِّ نَبِي دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِي دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا ..
"প্রত্যেক নবীর কবুলযোগ্য দুআ থাকে। সুতরাং প্রত্যেক নবী নিজ দুআকে সত্বর (দুনিয়াতে) প্রয়োগ করেছেন। আর আমি আমার দুআকে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের জন্য সুপারিশের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে জমা রেখেছি। সেই সুপারিশ---ইন শাআল্লাহ---আমার উম্মতের সেই ব্যক্তি লাভ করবে, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শির্ক না ক'রে মারা যাবে।” (মুসলিম ৫১২নং, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
((أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ)). অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত-লাভের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সেই হবে, যে নিজ অন্তর বা মন থেকে বিশুদ্ধভাবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে। (বুখারী ৯৯নং)
উপর্যুক্ত শর্তসাপেক্ষে মহানবী -এর সুপারিশ হবে কয়েক ধরনের:-
১। সর্ববৃহৎ সুপারিশ, যা কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষের জন্য।
২। যাদের পাপ-পুণ্য সমান হয়েছে এমন লোকেদের জান্নাত যাওয়ার জন্য সুপারিশ।
৩। যে তওহীদবাদীরা কাবীরা গোনাহর কারণে জাহান্নামী হবে, তারা যাতে জাহান্নাম প্রবেশ না করে, তার জন্য সুপারিশ।
৪। জান্নাতে কোন কোন জান্নাতীর মর্যাদা বর্ধনের জন্য সুপারিশ।
৫। কিছু লোকের জন্য বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার সুপারিশ।
৬। কোন জাহান্নামীর জাহান্নামে আযাব হাল্কা করার জন্য সুপারিশ।
৭। সকল মু'মিনদের জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি পাওয়ার জন্য সুপারিশ।
৮। যে তওহীদবাদীরা কাবীরা গোনাহর কারণে জাহান্নামী হবে, তারা যাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায় তার জন্য সুপারিশ। (আক্বীদাহ তাহাবিয়্যাহ দ্রঃ)
যে ব্যক্তি মদীনা নববীয়ায় শত কষ্ট বরণ করেও বাস ক'রে সেখানে মৃত্যুবরণ করে, (মুসলিম ১৩৬৩) যে ব্যক্তি আযানের জওয়াব দেওয়ার পর মহানবী -এর উপর দরূদ পাঠ করে তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে 'অসীলাহ' (মহানবী -এর জন্য জান্নাতের এক সুউচ্চ সুসম্মানিত স্থান) 'আল্লাহুম্মা রাব্বা হা-যিহিদ দা'ওয়াতিত তা-ম্মাহ' -এই দুআ পড়ে প্রার্থনা করে, (বুখারী ৬১৪, মুসলিম ৩৮৪নং) বিশেষ ক'রে সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রসূল কিয়ামতে সুপারিশ করবেন।
যেমন কিয়ামতে কুরআন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন, (( الْقُرْآنُ شَافِعُ مُشَفَعٌ ، وَمَاحِلٌ مُصَدَّقٌ ، مَنْ جَعَلَهُ أَمَامَهُ قَادَهُ إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَنْ جَعَلَهُ خَلْفَهُ سَاقَهُ إِلَى النَّارِ)).
"কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে।” (ইবনে হিব্বান ১২৪, সঃ তারগীব ১৪২৩নং)
তিনি আরো বলেছেন, اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لأَصْحَابِهِ اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آل عِمْرَانَ فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرِ صَوَافَ تُحَاجَّانِ عَنْ أَصْحَابِهِمَا اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةً وَتَرْكَهَا حَسْرَةً وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ ... قَالَ مُعَاوِيَةُ بَلَغَنِي أَنَّ الْبَطَلَةَ السَّحَرَةُ.
"তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বর্কত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না।" মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, 'আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকরদল।' (মুসলিম ১৯১০নং)
বিশেষ ক'রে সূরা মুল্কও তার নিয়মিত পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন, (( مِنَ القُرْآنِ سُورَةٌ ثَلاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُل حَتَّى غُفِرَ لَهُ ، وَهِيَ : {تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الملك )).
"কুরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা এমন আছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং শেষাবধি তাকে ক্ষমা ক'রে দেওয়া হবে, সেটা হচ্ছে 'তাবা-রাকাল্লাযী বিয়্যাদিহিল মুল্ক' (সূরা মুল্ক)।” (আবু দাউদ ১৪০২, তিরমিযী ২৮৯১নং)
তদনুরূপ রোযা রোযাদারের জন্য কিয়ামতে সুপারিশ করবে। মহানবী বলেছেন,
(اَلصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَي رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفَعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ باللَّيْلِ فَشَفَعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَعَانِ)).
"কিয়ামতের দিন রোযা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি ওকে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং ওর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।' আর কুরআন বলবে, 'আমি ওকে রাত্রে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং ওর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।' নবী বলেন, "অতএব ওদের উভয়ের সুপারিশ গৃহীত হবে।” (আহমাদ ৬৬২৬, হাকেম ২০৩৬, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৯৯৪, ইবনে আবিদ্দুনয়্যার 'কিতাবুল জু', সহীহ তারগীব ৯৮৪, ১৪২৯নং)
শহীদ কিয়ামতে নিজ পরিবারের ৭০ জন অপরাধীর জন্য সুপারিশ করতে পারবে। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ سِتَّ خِصَالٍ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ فِي أَوَّل دَفْعَةٍ مِنْ دَمِهِ وَيَرَى قَالَ الْحَكَمُ وَيُرَى مَقْعَدَهُ مِنْ الْجَنَّةِ وَيُحَلَّى حُلَّةَ الْإِيمَانِ وَيُزَوَّجَ مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُجَارَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَيَأْمَنَ مِنْ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ قَالَ الْحَكَمُ يَوْمَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ وَيُوضَعَ عَلَى رَأْسِهِ تَاجُ الْوَقَارِ الْيَاقُوتَةُ مِنْهُ خَيْرٌ مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا وَيُزَوَّجَ اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ زَوْجَةً مِنْ الْحُورِ الْعِينِ وَيُشَفَعَ فِي سَبْعِينَ إِنْسَانًا مِنْ أَقاربه)).
"মহান আল্লাহর নিকট শহীদের জন্য রয়েছে ৬টি দান; তার রক্তের প্রথম ক্ষরণের সাথে তার পাপ ক্ষমা করা হবে, জান্নাতে তার বাসস্থান দেখানো হবে, কবরের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে, কিয়ামতের মহাত্রাস থেকে নিরাপত্তা পাবে, ঈমানের অলঙ্কার পরিধান করবে, সুনয়না হুরীদের সাথে তার বিবাহ দেওয়া হবে এবং তার নিজ পরিজনের মধ্যে ৭০ জনের জন্য তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে।” (আহমাদ ১৭১৮২, তিরমিযী ১৬৬৩, ইবনে মাজাহ ২৭৯৯, সহীহ তিরমিযী ১৩৫৮নং)
সুপারিশ করবে মুসলিম নাবালক শিশু, যে শৈশবেই পিতামাতার কোল ছেড়ে পরকালে পাড়ি দেয় এবং তার পিতামাতা তাতে ধৈর্যধারণ করে ও সওয়াবের আশা রাখে। মহানবী বলেছেন,
((وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ السَّقْطَ لَيَجُرُّ أُمَّهُ بِسَرَرِهِ إِلَى الْجَنَّةِ إِذَا احْتَسَبَتْهُ)).
"সেই সত্তার শপথ; যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! গর্ভচ্যুত (মৃত) শিশু তার নাভির নাড়ী ধরে নিজের মাতাকে বেহেস্তের দিকে টেনে নিয়ে যাবে- যদি ঐ মা (তার গর্ভপাত হওয়ার সময়) ঐ সওয়াবের আশা রাখে তবে।” (আহমাদ ২২০৯০, ইবনে মাজাহ ১৬০৯, ত্বাবারানী ১৬৭২১নং)