📄 (২) তওবা
আমার 'সুখের সন্ধান' বইয়ে এ বিষয়ে বিষদভাবে আলোচনা করেছি। এখানেও সংক্ষেপে কিছু বলে রাখি।
তওবা করলে মহান আল্লাহ গোনাহগার বান্দাকে ক্ষমা ক'রে দেন। দুর্বল মানুষকে তিনি যেমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তেমন তার প্রতি দয়াশীল ও ক্ষমাশীলও হয়েছেন। তিনি নিজের এ গুণের কথা কুরআন মাজীদে উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
{وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَن السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ} (٢٥)
"তিনিই তাঁর দাসদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন।" (শূরাঃ ২৫)
মহানবী বলেছেন, (لَوْ أَنَّ لابنِ آدَمَ وَادِياً مِنْ ذَهَبٍ أَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَادِيانِ ، وَلَنْ يَمْلأَ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ )). مُتَّفَقٌ عليه
"যদি আদম সন্তানের সোনার একটি উপত্যকা হয়, তবুও সে চাইবে যে, তার কাছে দুটি উপত্যকা হোক। (কবরের) মাটিই একমাত্র তার মুখ পূর্ণ করতে পারবে। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।" (বুখারী ৬৪৩৪, ৬৪৩৯, মুসলিম ২৪৬২নং)
তিনি আরো বলেছেন, (( إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَبْسُطُ يَدَهُ بالليل لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيلِ ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبها )). رواه مسلم .
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা নিজ হাত রাতে প্রসারিত করেন; যেন দিনে পাপকারী (রাতে) তওবা করে। এবং দিনে তাঁর হাত প্রসারিত করেন; যেন রাতে পাপকারী (দিনে) তওবাহ করে। যে পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় না হবে, সে পর্যন্ত এই রীতি চালু থাকবে।" (মুসলিম ৭১৬৫নং)
কিন্তু বান্দা তওবা করলে তবেই তো? সুতরাং তিনি বান্দাকে তওবা করতে আদেশ দিয়ে বলেছেন,
{وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (۳۱) سورة النور
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (নূর: ৩১)
তওবাকারী বান্দা সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা। বান্দা তওবা করলে মহান প্রতিপালক খুশী হন। কতটা খুশী হন, তার উদাহরণ পড়ুন হাদীসে। রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
(( لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ سَقَطَ عَلَى بَعِيره وقد أضله في أرض فلاة)).
"আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দার তওবা করার জন্য ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বেশী আনন্দিত হন, যে তার উঁট জঙ্গলে হারিয়ে ফেলার পর পুনরায় ফিরে পায়।" (বুখারী ৬৩০৯, মুসলিম ৭১৩১-৭১৩৭নং)
মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এইভাবে এসেছে যে, "নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় যখন সে তওবা করে তোমাদের সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী খুশী হন, যে তার বাহনের উপর চড়ে কোন মরুভূমি বা জনহীন প্রান্তর অতিক্রমকালে বাহনটি তার নিকট থেকে পালিয়ে যায়। আর খাদ্য ও পানীয় সব ওর পিঠের উপর থাকে। অতঃপর বহু খোঁজাখুঁজির পর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বাহনটি হঠাৎ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। সে তার লাগাম ধরে খুশীর চোটে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ! তুমি আমার দাস, আর আমি তোমার প্রভু!' সীমাহীন খুশীর কারণে সে ভুল ক'রে ফেলে।"
উক্ত হাদীসে স্পষ্ট যে, তওবা মানে ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা।
তওবা হল পারলৌকিক সুখের পথের পথিকের প্রথম মঞ্জিল।
তওবা হল শরীয়তে যা নিন্দনীয়, তা হতে শরীয়তে যা প্রশংসনীয়, তার প্রতি ফিরে আসা।
বান্দার তওবা কবুল হলে মহান আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন।
এক: তিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং শান্তি থেকে রেহাই দেন। মহানবী বলেছেন,
(التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لا ذَنْبَ لَه).
"গোনাহ থেকে তওবাকারী সেই ব্যক্তির মতো, যার কোন গোনাহ নেই।" (ইবনে মাজাহ ৪২৫০, ত্বাবারানী ১০১২৮, সঃ তারগীব ৩১৪৫নং)
দুইঃ ইহ-পরকালে তাকে সাফল্য দান করেন। তিনি বলেছেন,
{وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} (৩১) سورة النور
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (নূর : ৩১)
তিনঃ তিনি তাকে ভালোবাসতে লাগেন। তিনি বলেছেন,
{إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ) (۲۲۲) سورة البقرة
"নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদেরকে এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরকে ভালোবাসেন।" (বাক্বারাহঃ ২২২)
চার: তওবার কারণে তিনি তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে বর্কত দান করেন। তিনি হৃদ-এর কথা কুরআন মাজীদে বলেছেন,
{وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ} (٥٢) سورة هود
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (তোমাদের পাপের জন্য) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।" (হৃদঃ ৫২)
তিনি নূহ-এর কথা উল্লেখ ক'রে বলেছেন,
{ فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا (۱۰) يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا (۱۱) وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالِ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا} (۱۲) سورة نوح
“(নূহ বলল) সুতরাং আমি বলেছি, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন বহু বাগান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।" (নূহঃ ১০-১২)
সতর্কতার বিষয় যে, বহু পাপী তওবা না করলেও যাবতীয় পার্থিব সুখ-সম্ভোগ লাভ ক'রে থাকে। সেটা তাদের জন্য অবকাশ ও পরীক্ষা মাত্র। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى} (۱۳۱) سورة طه
"আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য-স্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি কখনোও তোমার চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করো না। তোমার প্রতিপালকের জীবিকাই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী।" (ত্বা-হাঃ ১৩১)
{فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلَّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ (٤٤) فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِينَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} (٤٥) سورة الأنعام
"তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন তাদের জন্য সমস্ত কিছুর দ্বার উন্মুক্ত ক'রে দিলাম, অবশেষে তাদেরকে যা দেওয়া হল, যখন তারা তাতে মত্ত হল, তখন অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখনই তারা নিরাশ হয়ে পড়ল। অতঃপর যালেম-সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হল এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই; যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।" (আনআমঃ ৪৪-৪৫)
পাঁচ : তওবার ফলে মহান আল্লাহ পাপীর পাপসমূহকে পুণ্যে পরিণত ক'রে দেন। তিনি বলেছেন,
{إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا} (৭০) সূরা ফুরকান
"তবে যারা তওবা করে, বিশ্বাস ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপকর্মগুলিকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন ক'রে দেবেন। আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (ফুরক্বান: ৭০)
ছয়ঃ তিনি তাকে পরকালে জান্নাত দান করবেন। তিনি বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ} (৮) সূরা আত-তাহরীম
"হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা। সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলোকে মোচন ক'রে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত।" (তাহরীমঃ ৮)
বিশুদ্ধ তওবাঃ
কেবল তওবাই নয়, তওবা করতে হবে খাঁটি ও বিশুদ্ধ তওবা। মহান আল্লাহ বান্দাকে বিশুদ্ধ তওবা করতে বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ} (৮) সূরা আত-তাহরীম
"হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা। সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলোকে মোচন ক'রে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত।" (তাহরীমঃ ৮)
যে তওবা কবুল হবে, সে তওবা ছাড়া তো বান্দার কোন উপকার নেই। আর বিশুদ্ধ তওবা ছাড়া আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার কোন অন্য উপায়ও নেই।
কীভাবে হবে বিশুদ্ধ তওবা?
বিশুদ্ধ তওবার ৬টি শর্ত আছে, সে শর্তাবলী পালন না ক'রে তওবা করলে কেবল মৌখিক তওবা মহান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না এবং তা পাপীকে তাঁর শাস্তি হতে নিস্তার দান করে না। শর্তাবলী নিম্নরূপঃ-
(১) তওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে।
তার মানে তওবাতে উদ্বুদ্ধকারী মহান আল্লাহর ভয় বা সন্তষ্টি ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টির ভয় বা সন্তুষ্টি যেন না হয়। কারো চাপে পড়ে তওবা করলে, সুনাম নেওয়ার জন্য তওবা করলে, কারো মন রক্ষার জন্য তওবা করলে অথবা কোন স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে তওবা করলে, সে তওবা খাঁটি তওবা হবে না।
(২) যে গুনাহ হতে তওবা করা হচ্ছে, তা সত্বর ত্যাগ করতে হবে।
গোনাহ বর্জন না করলে তওবার কথা ঘোষণা করা স্ববিরোধিতা। অপবিত্রতা বন্ধ না ক'রে তার উপর পানি ঢেলে পবিত্রতা অর্জনের মানসিকতা মূর্খতা ছাড়া আর কী? কাদা থেকে পা ধুয়ে সেই পা কোন কাদাহীন জায়গা শুকনো মাটি বা ইট-পাথরের উপর রাখতে হবে। নচেৎ কাদায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পা ধুলে অথবা ধোয়া পা কাদাতেই রাখলে পা ধোয়া নিরর্থক হবে।
বাড়ির ভিতরের পাত-কুয়ায় বিড়াল পড়ার গল্প অনেকে শুনেছেন। পানি থেকে গন্ধ আসে, সে পানিতে ওযু-গোসল হবে কি না? মুফতী সাহেবকে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেললে পানি পাক হয়ে যাবে।'
সুতরাং অতি কষ্টে ৪০ বালতি পানি তুলে ফেলা হল, কিন্তু পানির দুর্গন্ধ গেল না। পানি কি পাক হবে? মুফতী সাহেব আবারও ৪০ বালতি পানি তুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন নেই। আরো ৪০ বালতি পানি তুলে ফেলতে আদেশ করার পরও যখন পানির দুর্গন্ধ গেল না, তখন বাড়ি-ওয়ালা মুফতী সাহেবের প্রতি খাপ্পা হল। এবার মুফতী সাহেব সরে-জমিনে তদন্তে নামলেন। কুয়ার নিচে তাকিয়ে দেখলেন, কী যেন সাদা মতো একটা জিনিস ভাসছে। জিজ্ঞাসা করতেই বাড়ি-ওয়ালা বলল, 'ওই যে বিড়ালটা, যেটা পড়ে মারা গেছে।'
মুফতী সাহেব বললেন, 'ওটা তুলে ফেলেননি কেন?'
বাড়ি-ওয়ালা বলল, 'হুযুর! তা তো আপনি বলেননি।'
মুফতী সাহেব বললেন, 'আরে বোকা লোক! সেটাও কি বলতে হয়? এ কথা কি তোমার আক্কেলে ধরে না যে, পানি থেকে বিড়ালের পচা-গলা দেহ না তুলে ফেলে বালতির পর বালতি পানি তুলে ফেললে কুয়ার পানি পাক ও দুর্গন্ধহীন হয় কীভাবে?'
পাপরত অবস্থায় তওবা ও ইস্তিগফারের কী মূল্য হতে পারে? মদ খেতে খেতে 'তওবা-তওবা' করলে, ব্যভিচারে লিপ্ত থাকা অবস্থায় 'আস্তাগফিরুল্লাহ-আস্তাগফিরুল্লাহ' পড়লে কী লাভ হতে পারে? তাই আগে পাপ বর্জন করুন, তারপর তওবা করুন। তবেই তা ফলদায়ক হবে।
(৩) এই গুনাহ ক'রে ফেলার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে।
মহানবী বলেছেন,
((النَّدم توبة)).
অর্থাৎ, অনুতাপ হল তওবা। (ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ তারগীব ৩১৪৬-৩১৪৭নং)
ইসলামের নীতিতে এ কথা বিদিত যে, পাপকাজ ক'রে লজ্জিত হলে পাপ কমে যায়। আর পুণ্য কাজ ক'রে গর্ববোধ করলে পুণ্য বরবাদ হয়ে যায়। যে পাপ করে, সে সাধারণ মানব। যে পাপ ক'রে অনুতাপ করে, সে সাধু ব্যক্তি। আর যে পাপের বড়াই করে, সে শয়তান। অবশ্যই এমন অনেক পাপ আছে, যা অনেক মানুষের নিকট গর্বের বিষয়। ফলে পাপী সেই পাপ ক'রে বন্ধুমহলে অথবা অন্যত্র প্রকাশ ক'রে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু তওবা করতে হলে অপরাধ ক'রে ফেলার ফলে অপরাধীকে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। নচেৎ মহানবী বলেছেন,
(( كُلُّ أُمَّتِي مُعَافَى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنْ الْمُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَيَقُولَ : يَا فُلَانُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ)).
"আমার প্রত্যেক উম্মতের পাপ মাফ করে দেওয়া হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (অথবা পাপ করে বলে বেড়ায়) তার পাপ মাফ করা হবে না। আর পাপ প্রকাশ করার এক ধরন এও যে, একজন লোক রাত্রে কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর আল্লাহ তা গোপন করে নেন। (অর্থাৎ, কেউ তা জানতে পারে না।) কিন্তু সকাল বেলায় উঠে সে লোকের কাছে বলে বেড়ায়, 'হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি।' রাতের বেলায় আল্লাহ তার পাপকে গোপন রেখে দেন; কিন্তু সে সকাল বেলায় আল্লাহর সে গোপনীয়তাকে নিজে নিজেই ফাঁস করে ফেলে।" (বুখারী ৬০৬৯নং, মুসলিম ৭৬৭৬নং)
(৪) আগামীতে এই গুনাহ 'আর করব না' বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
নচেৎ তওবার সময় যদি মনে মনে শৈথিল্য থাকে, অন্য কথায় তওবার সময়েই যদি পাপ পূর্ণমাত্রায় বর্জন করার সংকল্প না থাকে অথবা পাপ থেকে পরিপূর্ণরূপে ফিরে আসার নিয়ত না থাকে, তাহলে তওবা (ফিরে আসা) আবার কাকে বলে? হ্যাঁ, পাপ পুনরায় না করার পাক্কা সংকল্প থাকা সত্ত্বেও যদি আবার তা ঘটে যায়, তাহলে বলা যায় যে, পাপীর আগের তওবা কবুল হয়েছে, তা বাতিল হয়ে যায়নি এবং পুনরায় তার জন্য তওবা ওয়াজেব হয়ে গেছে।
মহানবী তাঁর প্রতিপালক থেকে বর্ণনা করে বলেন,
(( أَذْنَبَ عَبْدٌ ذَنْباً ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي ، فَقَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : أَذنَبَ عبدي ذنباً ، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبَّاً يَغْفِرُ الذَّنْبَ ، وَيَأْخُذُ بالذَّنْبِ ، ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ ، فَقَالَ : أي رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي ، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : أَذنَبَ عبدِي ذَنْباً، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبِّاً ، يَغْفِرُ الذَّنْبَ ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ ، قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي فَلْيَفْعَلْ مَا شَاءَ)). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"কোন বান্দা একটি পাপ ক'রে বলল, 'হে প্রভু! তুমি আমার পাপ ক্ষমা কর।' তখন আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা বলেন, 'আমার বান্দা একটি পাপ করেছে, অতঃপর সে জেনেছে যে, তার একজন প্রভু আছেন, যিনি পাপ ক্ষমা করেন অথবা তা দিয়ে পাকড়াও করেন।' অতঃপর সে আবার পাপ করল এবং বলল, 'হে প্রভু! তুমি আমার পাপ ক্ষমা কর।' তখন আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা বলেন, 'আমার বান্দা একটি পাপ করেছে, অতঃপর সে জেনেছে যে, তার একজন প্রভু আছেন, যিনি পাপ ক্ষমা করেন অথবা তা দিয়ে পাকড়াও করেন। আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করলাম। সুতরাং সে যা ইচ্ছা করুক।" (বুখারী ৭৫০৭, মুসলিম ৭১৬২নং)
'সে যা ইচ্ছা করুক' কথার অর্থ হল, সে যখন এইরূপ করে; অর্থাৎ পাপ ক'রে সাথে সাথে তওবা করে এবং আমি তাকে মাফ ক'রে দিই, তখন সে যা ইচ্ছা করুক, তার কোন চিন্তা নেই। যেহেতু তওবা পূর্বকৃত পাপ মোচন ক'রে দেয়।
অবশ্যই তওবা না ক'রে একই পাপ জেনেশুনে বারবার করলে অথবা তওবার সময় পাপ বর্জনের দৃঢ় সংকল্প না করলে সে ক্ষমার্হ নাও হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ} (١٣٥) سورة آل عمران
"যারা কোন অশ্লীল কাজ ক'রে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কে পাপ ক্ষমা করতে পারে? এবং তারা যা (অপরাধ) ক'রে ফেলে, তাতে জেনে-শুনে অটল থাকে না।" (আলে ইমরানঃ ১৩৫)
মহানবী বলেছেন,
ارْحَمُوا تُرْحَمُوا وَاغْفِرُوا يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ، وَيْلٌ لِأَقْمَاعِ الْقَوْلِ، وَيْلٌ لِلْمُصِرِّينَ الَّذِينَ يُصِرُّونَ عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ)).
"তোমরা দয়া কর, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। তোমরা ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা কথা শুনেও শোনে না। দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা জেনেশুনে তাদের কৃত অপরাধের উপর অটল থাকে।" (আহমাদ ৬৫৪১, বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ৩৮০, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৭২৩৬, সিঃ সহীহাহ ৪৮২নং)
(৫) যদি এই গুনাহের সম্পর্ক কোন বান্দার অধিকারের সাথে হয়, তবে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা ক্ষমা চেয়ে তার সাথে মিটমাট ক'রে নিতে হবে। যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
মহানবী বলেছেন,
(( مَنْ كَانَتْ عِنْدَهُ مَظْلِمَةٌ لأخِيهِ ، مِنْ عِرْضِهِ أَوْ مِنْ شَيْءٍ ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٍ وَلَا دِرْهَمْ ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ )). رواه البخاري
"যদি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্ভ্রম বা অন্য কিছুতে কোন যুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার পূর্বেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়; যেদিন (ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য) না দীনার হবে না দিরহাম। (সেদিন) যালেমের নেক আমল থাকলে তার যুলুম অনুপাতে নেকী তার নিকট থেকে কেটে নিয়ে (মযলুমকে দেওয়া) হবে। পক্ষান্তরে যদি তার নেকী না থাকে (অথবা নিঃশেষ হয়ে যায়) তাহলে তার (মযলুম) প্রতিবাদীর গোনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপানো হবে।" (বুখারী ২৪৪৯, ৬৫৩৪, তিরমিযী ২৪১৯নং)
অধিকারীর মৃত্যু ঘটে থাকলে তার ওয়ারেসকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সম্ভব না হলে তার নামে সাদকা ক'রে নিজেকে পাপমুক্ত করতে হবে।
(৬) যথাসময়ে তওবা করতে হবে।
পাপ করার পরে পরেই তওবা করা ওয়াজেব। কিন্তু বহু পাপী সে ব্যাপারে গয়ংগচ্ছ করে; ভাবে শেষ জীবনে তওবা করবে। তাতে অনেক সময় আকস্মিক মৃত্যু তাদেরকে সে সুযোগ দেয় না। অনেকে মৃত্যুর সময় তওবা করতে বাধ্য হয়। অথচ মৃত্যুর যথেষ্ট সময়ের পূর্বে তওবা করতে হবে। নচেৎ প্রাণ কণ্ঠাগত হওয়ার সময় ফিরিশতা দেখে তওবা করতে চাইলে তখন তওবা গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُوْلَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللهُ عَلِيماً حَكِيماً (۱۷) وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُوْلَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا } (۱۸) سورة النساء
"আল্লাহ কেবল সেই সব লোকের তওবা গ্রহণ করবেন, যারা অজ্ঞাতসারে মন্দ কাজ ক'রে বসে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা ক'রে নেয়; এরাই তো তারা, যাদের তওবা আল্লাহ গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। এবং (আজীবন) যারা মন্দ কাজ করে, তাদের জন্য তওবা নয়, আর তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, 'আমি এখন তওবা করছি।' আর যারা অবিশ্বাসী অবস্থায় মারা যায়, তাদের জন্যও তওবা নয়। এরাই তো তারা, যাদের জন্য আমি মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।" (নিসাঃ ১৭-১৮)
আর মহানবী বলেছেন,
(( إنَّ الله - عز وجل - يَقْبَلُ تَوبَةَ العَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ)). رواه الترمذي
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বান্দার তওবাহ সে পর্যন্ত কবুল করবেন, যে পর্যন্ত তার প্রাণ কণ্ঠাগত না হয়।" (আহমাদ ৬১৬০, তিরমিযী ৩৫৩৭, আবু য়্যা'লা ৫৬০৯, হাকেম ৭৬৫৯, ইবনে হিব্বান ৬২৮নং)
মহান আল্লাহর আযাব দেখার পরেও তওবা উপকারে আসবে না। মৃত্যুর সময় ফিরআউনের ঈমান কোন কাজে দেয়নি। সুতরাং কাউকে মহান প্রতিপালকের ধ্বংস গ্রাস করার মুহূর্তে তার তওবা উপকারী হবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{ فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا قَالُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَحْدَهُ وَكَفَرْنَا بِمَا كُنَّا بِهِ مُشْرِكِينَ (٨٤) فَلَمْ يَكُ يَنفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا سُنَّتَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ} (٨٥) سورة غافر
"অতঃপর ওরা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন বলল, 'আমরা এক আল্লাহতেই বিশ্বাস করলাম এবং আমরা তাঁর সঙ্গে যাদেরকে অংশী করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম।' কিন্তু ওরা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন ওদের বিশ্বাস ওদের কোন উপকারে এল না। আল্লাহর এ বিধান (পূর্ব হতেই) তাঁর দাসদের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে। আর তখন অবিশ্বাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হল।" (মু'মিনঃ ৮৪-৮৫)
তদনুরূপ কিয়ামতের পূর্বে তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। যখন কেউ তওবা করতে চাইলেও তখন তার তওবা প্রতিপালকের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن تَأْتِيهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا قُل انتَظِرُوا إِنَّا مُنتَظِرُونَ} (١٥٨) سورة الأنعام
"তারা কি এরই প্রতীক্ষা করে যে, তাদের নিকট ফিরিশ্তা আসবে কিংবা তোমার প্রতিপালক আসবেন কিংবা তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন আসবে? যেদিন তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন আসবে, সেদিন সে ব্যক্তির বিশ্বাস কোন কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে বিশ্বাস স্থাপন করেনি কিংবা স্বীয় বিশ্বাস সহ কল্যাণ অর্জন (সৎকর্ম) করেনি। বল, 'তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষা করছি।" (আনআমঃ ১৫৮)
মহানবী ﷺ বলেছেন,
(( مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِها تَابَ اللهُ عَلَيْهِ )) رواه مسلم .
"যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় হওয়ার পূর্বে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করবেন।" (মুসলিম ৭০৩৬নং)
উক্ত সকল শর্ত পালন ক'রে যে তওবা করবে, তার তওবা হবে বিশুদ্ধ তওবা। যে তওবা মহান আল্লাহ নিজ বান্দা থেকে গ্রহণ করবেন এবং তাকে অপরাধের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দেবেন।
কালবী বলেছেন, 'বিশুদ্ধ তওবা হল, (পাপের জন্য) হৃদয়ে অনুতপ্ত হওয়া, জিহ্বায় (পাপের কথা) স্বীকার করা, দৈহিকভাবে তা বর্জন করা এবং পুনরায় না ফিরার সংকল্প করা।'
সাঈদ বিন জুবাইর বলেছেন, 'বিশুদ্ধ তওবা হল সেই তওবা, যা কবুল হয়ে থাকে। আর তিনটি শর্ত ছাড়া তা কবুল হয় নাঃ- এক: এই ভয় যে, তার তওবা কবুল হবে না। দুইঃ এই আশা যে, তার তওবা কবুল হবে। তিনঃ আনুগত্য করতে থাকা।'
আবু বাক্স আল-অরাক বলেছেন, 'তা হল সেই তওবা, যার ফলে প্রশস্ত পৃথিবী সংকীর্ণ মনে হতে থাকে এবং হৃদয়ে সেই তিন ব্যক্তির মতো সংকীর্ণতা অনুভূত হয়', যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ আল-কুরআনে বলেছেন,
{وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحْبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ} (১১৮) সূরা আত-তাওবাহ
"ঐ তিন ব্যক্তির তওবাও আল্লাহ কবুল করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছিল; পরিশেষে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল, আর তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও হতে বাঁচার অন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহই হচ্ছেন তওবা গ্রহণকারী, পরম করুণাময়।" (তাওবাহ:১১৮, তফসীর কুরতুবী ১৮/১৯৮)
বিশুদ্ধ তওবা হল ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী মায়েযের মতো তওবা। যাঁর ব্যাপারে নবী ﷺ বলেছিলেন,
لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ ..
"তোমরা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। সে এমন তওবা করেছে যে, যদি তা একটি জাতির মাঝে বন্টন ক'রে দেওয়া হত, তাহলে সকলের জন্য তা যথেষ্ট হত! আর তার জন্য সে এখন জান্নাতের নদীসমূহে গোসল করছে।" (মুসলিম ৪৫২৭নং)
বিশুদ্ধ তওবা হল ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধিনী গামেদিয়ার মতো তওবা। যাঁর ব্যাপারে রসূল বলেছিলেন,
لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ)).
"এই স্ত্রী লোকটি এমন বিশুদ্ধ তওবা করেছে, যদি তা মদীনার ৭০টি লোকের মধ্যে বন্টন করা হত তা তাদের জন্য যথেষ্ট হত।" (মুসলিম ৪৫২৮-৪৫২৯নং)
বিশুদ্ধ তওবা হল, যার পরে গুপ্ত ও প্রকাশ্যভাবে আমলে কোন প্রকার পাপের চিহ্ন থাকবে না। যে তওবা তওবাকারীকে বিলম্বে ও অবিলম্বে সাফল্য দান করে।
বিশুদ্ধ তওবা হল তাই, যার পরে তওবাকারী বিগত অপরাধ-জীবনের জন্য কান্না করে, পুনরায় সেই অপরাধ যাতে ঘটে না যায়, তার জন্য ভীত-আতঙ্কিত থাকে, কুসঙ্গীদের সংসর্গ বর্জন করে এবং সুসঙ্গীদের সাহচর্য অবলম্বন করে।
তওবার পর করণীয় কী?
তওবার পর তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকতে অনেক কিছু করণীয় আছে। যেমন:-
(১) পাপের পরিবেশ ত্যাগ করতে হবে।
এ ব্যাপারে একশত মানুষ খুনকারী খুনীর তওবা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির হাদীস প্রসিদ্ধ। মহানবী বলেছেন, "তোমাদের পূর্বে (বনী ইস্রাইলের যুগে) একটি লোক ছিল; যে ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, 'সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোন সুযোগ আছে?' সে বলল, 'না।' সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা ক'রে একশত পূরণ ক'রে দিল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, সে একশত মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোন সুযোগ আছে? সে বলল, 'হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশ চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।' সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আযাবের উভয় প্রকার ফিরিশতা উপস্থিত হলেন। ফিরিশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফিরিশতাগণ বললেন, 'এই ব্যক্তি তওবা ক'রে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।' আর আযাবের ফিরিশ্বারা বললেন, 'এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।' এমতাবস্থায় একজন ফিরিশা মানুষের রূপ ধারণ ক'রে উপস্থিত হলেন। ফিরিস্তাগণ তাঁকে সালিস মানলেন। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, 'তোমরা দু' দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশী নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।' অতএব তাঁরা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশী নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফিরিস্তাগণ তার জান কবয করলেন।"
সহীহতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, "পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।"
সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এইরূপ এসেছে যে, "আল্লাহ তাআলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, 'তোমরা এ দু'য়ের দূরত্ব মাপ।' সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।"
আরো একটি বর্ণনায় আছে, "সে ব্যক্তি নিজের বুকের উপর ভর করে ভালো দেশের দিকে একটু সরে গিয়েছিল।" (বুখারী ৩৪৭০, মুসলিম ৭১৮৪-৭১৮৫নং)
তওবার পর ভালো পরিবেশে না থাকলে পুনরায় 'সঙ্গদোষে লোহা ভাসে'র অবস্থা আসতে পারে। কিন্তু বর্তমানে ভালো দেশ কোথায়? আর ভালো দেশে যাওয়ারই সুবিধা কোথায়?
তার চেয়ে উত্তম উপায় হল, তওবাকারী দুষ্কৃতীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। যদিও তারা তওবাকারীকে সহজে বর্জন করবে না। সুতরাং সক্ষম হলে বাসা পাল্টে দেবে, চাকরি বা পড়াশোনার স্থল অন্যত্র করবে, ফোন নম্বর বদলে দেবে, চলার পথ পরিবর্তন করবে ইত্যাদি।
(২) মনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। পুরনো অভ্যাসের দিকে ফিরে যেতে ইচ্ছা হলে ধৈর্যধারণ করতে হবে, আল্লাহর ভয়কে প্রাধান্য দিতে হবে এবং মরণকে স্মরণ করতে হবে।
(৩) পাপ ও অপরাধের পরিণাম ও শান্তি খেয়ালে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অপরাধের কথা মানুষে না জানতে পারলেও মহান প্রভু জানছেন এবং দুনিয়াতে শাস্তি থেকে বেঁচে গেলেও পরকালে বাঁচার উপায় নেই।
(৪) নিজ মনকে জান্নাত-জাহান্নাম প্রদর্শন করতে হবে। জান্নাতের সুখ ও জাহান্নামের দুঃখের কথা স্মরণ করতে হবে।
(৫) মনকে কাজ দিতে হবে এবং অবসর ও একাকিত্ব থেকে দূরে রাখতে হবে। ইত্যাদি।
কাদের তওবা কবুল নয়
এমন কতিপয় অপরাধী আছে, যাদের তওবা দুনিয়ায় কবুল ক'রে শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী উক্তি আছে উলামাগণের। যদিও এ কথা বিদিত যে, মহান অনুগ্রহশীল 'তাওয়াব' আল্লাহ মুসলিম ও কাফের সকলের নিকট থেকে তওবা কবুল করার ওয়াদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
{وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ} (٢٥)
"তিনিই তাঁর দাসদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন।" (শূরাঃ ২৫)
মহান আল্লাহ মুর্তাদদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ سَبيلاً} (۱۳৭) سورة النساء
"যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং আবার বিশ্বাস করে, অতঃপর আবার অবিশ্বাস করে, অতঃপর তাদের অবিশ্বাস-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখাবেন না।" (নিসাঃ ১৩৭)
{إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ ثُمَّ ازْدَادُوا كُفْرًا لَّن تُقْبَلَ تَوْبَتُهُمْ وَأَوْلَئِكَ هُمُ الضَّالُّونَ}
"নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং যাদের অবিশ্বাস-প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাদের তওবা কখনো মঞ্জুর করা হয় না। এরাই তো পথভ্রষ্ট।" (আলে ইমরান: ৯০)
অন্যদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُوْلَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ} (١٦٠)
"কিন্তু যারা তওবা করে (ক্ষমা প্রার্থনা করে) আর নিজেদেরকে সংশোধন করে এবং (আল্লাহর আয়াতকে) স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, এরাই তো তারা, যাদের তওবা আমি গ্রহণ করি। আর আমি তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।" (বাক্বারাহঃ ১৬০)
{قُل لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِن يَنتَهُوا يُغَفَرْ لَهُم مَّا قَدْ سَلَفَ وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّةٌ الأولين) (۳۸) سورة الأنفال
"অবিশ্বাসীদেরকে বল, যদি তারা (কুফরী ও অবিশ্বাস থেকে) বিরত হয়, তাহলে অতীতে তাদের যা (পাপ) হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন, কিন্তু তারা যদি অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে পূর্ববর্তীদের (সাথে আমার আচরিত) রীতি তো রয়েছেই।" (আনফালঃ ৩৮)
মহানবী বলেছেন,
(( أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لا إلهَ إلا الله ، وَأَنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ الله ، وَيُقِيمُوا الصَّلاةَ ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الإسلام ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهُ تَعَالَى )). مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"আমাকে লোকেদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে; যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। আর তারা নামায প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত প্রদান করবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে, তখন তারা আমার নিকট থেকে তাদের রক্ত (জান) এবং মাল বাঁচিয়ে নেবে; কিন্তু ইসলামের হক ব্যতীত (অর্থাৎ সে যদি কাউকে হত্যা করে, তবে তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে হত্যা করা হবে।) আর তাদের হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত হবে।" (বুখারী ২৫, মুসলিম ১৩৮নং)
(( مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا الله ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ ، حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ ، وَحِسَابُهُ على الله تَعَالَى )). رواه مسلم
"যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলল এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্যকে অস্বীকার করল, তার মাল ও রক্ত হারাম হয়ে গেল ও তার (অন্তরের) হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে।" (মুসলিম ১৩৯নং)
মহান আল্লাহ মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُوْلَئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا } (١٤٦) سورة النساء
"কিন্তু যারা তওবা করে, নিজেদেরকে সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মকে নির্মল করে, তারা বিশ্বাসীদের সঙ্গে থাকবে এবং অচিরেই আল্লাহ বিশ্বাসিগণকে মহা পুরস্কার দান করবেন।" (নিসাঃ ১৪৬)
তিনি দুষ্কৃতীদের ব্যাপারে বলেছেন,
{إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن قَبْلِ أَن تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (٣٤)
“তবে তোমাদের আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে যারা তওবা করবে (তাদের জন্য) জেনে রাখ যে, আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (মায়িদাহঃ ৩৪)
উলামাগণ বলেছেন, যে কোনও পাপী তওবা করলে, মহান আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। প্রশাসনকে গোপন ক'রে নিজেকে দুনিয়ার শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নিলে মহান আল্লাহ তার তওবা কবুল করলে ক্ষমা ক'রে দেবেন। কিন্তু প্রশাসনের কাছে ব্যাপারটা গড়িয়ে গেলে প্রশাসন ক্ষমা করবে না। ইসলামী সংবিধানে তার নির্ধারিত শাস্তি তার উপর প্রয়োগ করা হবে।
📄 (৪) মু’মিনদের পারস্পরিক দুআ
ইসলামের রীতিতে আছে, বান্দা সরাসরি নিজে প্রভুর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হতে পারে এবং কাউকে দুআ করতে বলে তার মাধ্যমেও ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা করতে পারে। মু'মিনদের মাঝে এটাই রীতি আছে যে, তারা পরস্পর একে অপরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে। মহান আল্লাহ উভয় ভাবেই সকলকে ক্ষমা করবেন।
ইউসুফ নবী-এর প্রতি চরম অন্যায় ক'রে তাঁর ভাইয়েরা যে অপরাধ করেছিল, তার জন্য লাঞ্ছিত হয়ে তারা নিজ পিতাকে বলেছিল,
{يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِئِينَ (۹۷) قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّيَ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} (۹۸) سورة يوسف
'হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী।' সে বলল, 'আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (ইউসুফঃ ৯৭-৯৮)
মহাক্ষমাশীল পরম করুণাময় তাঁর দয়াবান নবী-কে আদেশ করেছেন, তিনি যেন মু'মিনদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তিনি বলেছেন,
{فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (১৫৯) সূরা আলে ইমরান
"আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল-হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর-চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন।" (আলে ইমরানঃ ১৫৯)
{إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَأْذِنُوهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضٍ شَأْنِهِمْ فَأَذَن لِّمَن شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} (৬২)
"তারাই বিশ্বাসী যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলে বিশ্বাস করে এবং রসূলের সঙ্গে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্রিত হলে, তার অনুমতি ব্যতীত সরে পড়ে না। যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ এবং রসূলে বিশ্বাসী। অতএব তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য তোমার অনুমতি চাইলে, তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা তুমি অনুমতি দাও এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (নূর : ৬২)
তিনি বিশেষভাবে মু'মিন নারীদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলেছেন,
{يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانِ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفِ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ } (১২) سورة الممتحنة
"হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা ক'রে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (মুমতাহিনাহঃ ১২)
আর রসূল -এর ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ মহান আল্লাহ কবুল করতেন এবং মু'মিনদেরকে ক্ষমা ক'রে দিতেন। তিনি বলেছেন,
{وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاؤُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا} (৬৪) সূরা নিসা
"রসূল এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তার আনুগত্য করা হবে। আর যখন তারা নিজেদের প্রতি যুলুম ক'রে (পাপ করে) ছিল, তখন যদি তারা তোমার নিকট আসত ও আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করত এবং রসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত, তাহলে নিশ্চয়ই তারা আল্লাহকে তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালুরূপে পেত।" (নিসাঃ ৬৪)
তিনি ব্যাপকভাবে সকল মু'মিন নারী-পুরুষের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।
আস্নেম আহওয়াল হতে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে সার্জিস হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ -এর জন্য দুআ ক'রে বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।' তিনি বললেন, "আর তোমাকেও (আল্লাহ ক্ষমা করুন)।" আসেম বলেন, আমি আব্দুল্লাহকে প্রশ্ন করলাম, 'আল্লাহর রসূল কি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আর তোমার জন্যও তো।' অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন,
{وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ} (১৯) সূরা মুহাম্মদ
“(হে নবী!) তুমি নিজের জন্য ও মু'মিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।" (সূরা মুহাম্মাদ ১৯ আয়াত, মুসলিম ৬২৩৪নং)
কেউ পানাহার করালে মহানবী তার জন্য এই বলে দুআ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন,
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِيمَا رَزَقْتَهُمْ وَاغْفِرْ لَهُمْ وَارْحَمْهُمْ.
"হে আল্লাহ! ওদেরকে তুমি যা দান করেছ, তাতে ওদের জন্য বর্কত দান কর। ওদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং ওদের প্রতি রহম কর।" (মুসলিম ৫৪৪৯, আবু দাউদ ৩৭৩১, তিরমিযী ৩৫৭৬নং)
তিনি আল্লাহর প্রিয় বান্দার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। উসাইর ইবনে আম্র মতান্তরে ইবনে জাবের থেকে বর্ণিত, উমার -এর নিকট যখনই ইয়ামান থেকে সহযোগী যোদ্ধারা আসতেন, তখনই তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের মধ্যে কি উয়াইস ইবনে আমের আছে?' শেষ পর্যন্ত (এক দলের সঙ্গে) উয়াইস (ক্বারনী) (মদীনা) এলেন। অতঃপর উমার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি উয়াইস ইবনে আমের?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমার বললেন, 'মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন (গোত্রের)?' উয়াইস বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি (পুনরায়) জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার শরীরে শ্বেত রোগ ছিল, তা এক দিরহাম সম জায়গা ব্যতীত (সবই) দূর হয়ে গেছে?' উয়াইস বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'তোমার মা আছে?' উয়াইস বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি,
(( يَأْتِي عَلَيْكُمْ أُويْسُ بْنُ عَامِرٍ مَعَ أَمْدَادِ أَهْلِ اليَمَنِ مِنْ مُرَادٍ ، ثُمَّ مِنْ قَرَن كَانَ بِهِ بَرَضٌ ، فَبَرَأَ مِنْهُ إِلَّا مَوْضِعَ دِرْهَم ، لَهُ وَالدَةٌ هُوَ بِهَا بَرٌّ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهُ لأَبَرَّهُ ، فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ فَافْعَل ))
"মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন (গোত্রের) উয়াইস ইবনে আমের ইয়ামানের সহযোগী ফৌজের সঙ্গে তোমাদের কাছে আসবে। তার দেহে ধবল দাগ আছে, যা এক দিরহাম সম স্থান ছাড়া সবই ভাল হয়ে গেছে। সে তার মায়ের সাথে সদাচারী হবে। সে যদি আল্লাহর প্রতি কসম খায়, তবে আল্লাহ তা পূরণ ক'রে দেবেন। সুতরাং (হে উমার!) তুমি যদি নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ করাতে পার, তাহলে অবশ্যই করায়ো।” সুতরাং তুমি আমার জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা কর।'
শোনামাত্র উয়াইস উমারের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। অতঃপর উমার তাঁকে বললেন, 'তুমি কোথায় যাবে?' উয়াইস বললেন, 'কুফা।' তিনি বললেন, 'আমি কি তোমার জন্য সেখানকার গর্ভনরকে পত্র লিখে দেব না?' উয়াইস বললেন, 'আমি সাধারণ গরীব-মিসকীনদের সাথে থাকতে ভালবাসি।'
অতঃপর যখন আগামী বছর এল তখন কুফার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হজ্জে এল। সে উমার-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাকে উয়াইস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, 'আমি তাঁকে এই অবস্থায় ছেড়ে এসেছি যে, তিনি একটি ভগ্ন কুটির ও স্বল্প সামগ্রীর মালিক ছিলেন।' উমার বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, "মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন (গোত্রের) উয়াইস ইবনে আমের ইয়ামানের সহযোগী ফৌজের সঙ্গে তোমাদের নিকট আসবে। তার দেহে ধবল রোগ আছে, যা এক দিরহামসম স্থান ছাড়া সবই ভালো হয়ে গেছে। সে তার মায়ের সাথে সদাচারী (মা-ভক্ত) হবে। সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ ক'রে দেবেন। যদি তুমি তোমার জন্য তার দ্বারা ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ করাতে পার, তাহলে অবশ্যই করায়ো।"
অতঃপর সে (কুফার লোকটি হজ্জ সম্পাদনের পর) উয়াইস (ক্বারনীর) নিকট এল এবং বলল, 'আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' উয়াইস বললেন, 'তুমি এক শুভযাত্রা থেকে নব আগমন করেছ। অতএব তুমি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।' অতঃপর তিনি বললেন, 'তুমি উমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' সুতরাং উয়াইস তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। (এসব শুনে) লোকেরা (উয়াইসের) মর্যাদা জেনে নিল। সুতরাং তিনি তার সামনের দিকে (অন্যত্র) চলে গেলেন।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, উমার বলেন, 'আমি আল্লাহর রসূল -এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন,
(( إِنَّ خَيْرَ التَّابِعِينَ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ : أُوَيْسٌ ، وَلَهُ وَالِدَةٌ وَكَانَ بِهِ بَيَاضٍ ، فَمُرُوهُ ، فَلْيَسْتَغْفِرْ لَكُمْ )).
"নিশ্চয় সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেঈন হল এক ব্যক্তি, যাকে উয়াইস বলা হয়। তার মা আছে। তার ধবল রোগ ছিল। তোমরা তাকে আদেশ করো, সে যেন তোমাদের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমাপ্রার্থনা করে।" (মুসলিম ৬৬৫৪-৬৬৫৬নং)
মহানবী মৃত মুসলিমদের জন্য ইস্তিগফার করতেন। মুসলিমদেরকে মৃতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে আদেশ দিতেন। আর জানাযা পড়ার সময় বলতেন,
(( اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا ، وَصَغِيرنَا وَكَبيرنَا ، وَذَكَرنَا وَأَنْتَانَا ، وَشَاهِدنَا وَغَائِبِنَا ، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلامِ ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ ، اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ ، وَلَا تَفْتِنَا بَعْدَهُ )).
"হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত-মৃত, ছোট-বড়, পুরুষ ও নারী, উপস্থিত ও অনুপস্থিতকে ক্ষমা ক'রে দাও। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাকে তুমি জীবিত রাখবে তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখ এবং যাকে মরণ দিবে তাকে ঈমানের উপর মরণ দাও। হে আল্লাহ! ওর সওয়াব থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করো না এবং ওর পরে আমাদেরকে ফিতনায় ফেলো না।" (তিরমিযী ১০২৪, আবু দাউদ ৩২০৩, নাসাঈ ১৯৮৬, ইবনে মাজাহ ১৪৯৮নং)
(( اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ ، وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ ، وَاغْسِلْهُ بِالمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالبَرَدِ ، وَنَقِّهِ مِن الخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ ، وَأَدْخِلهُ الجَنَّةَ ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ ، وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ )).
"হে আল্লাহ! তুমি ওকে ক্ষমা করে দাও এবং ওকে রহম কর। ওকে নিরাপত্তা দাও এবং মার্জনা ক'রে দাও, ওর মেহেমানী সম্মানজনক কর এবং ওর প্রবেশস্থল প্রশস্ত কর। ওকে তুমি পানি, বরফ ও শিলাবৃষ্টি দ্বারা ধৌত করে দাও এবং ওকে গোনাহ থেকে এমন পরিষ্কার কর, যেমন তুমি সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করেছ। আর ওকে তুমি ওর ঘর অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ঘর, ওর পরিবার অপেক্ষা উত্তম পরিবার, ওর জুড়ী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট জুড়ী দান কর। ওকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবর ও দোযখের আযাব থেকে রেহাই দাও।" (মুসলিম ২২৭৬-২২৭৮, নাসাঈ ১৯৮৩নং)
তিনি বলেছেন,
(( مَا مِنْ مَيتٍ يُصَلِّي عَلَيْهِ أُمَّةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَبْلُغُونَ مِئَةً كُلُّهُمْ يَشْفَعُونَ لَهُ إِلَّا شُفْعُوا فيه )). رواه مسلم
"যে মৃতের জানাযার নামায একটি বড় জামাআত পড়ে, যারা সংখ্যায় একশ' জন পৌঁছে এবং সকলেই তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করে, তার ব্যাপারে তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।" (মুসলিম ২২৪১নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, "তাকে ক্ষমা ক'রে দেওয়া হয়।" (সহীহ ইবনে মাজাহ ১২০৯নং)
অন্য এক হাদীসে আছে,
(( مَا مِنْ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَمُوتُ ، فَيَقُومُ عَلَى جَنَازَتِهِ أَرْبَعُونَ رَجُلاً لَا يُشْرِكُونَ بِاللَّهِ شَيْئاً ، إلَّا شَفَعَهُمُ اللَّهُ فِيهِ)). رواه مسلم
"যে কোন মুসলমান মারা যাবে এবং তার জানাযায় এমন চল্লিশজন লোক নামায পড়বে, যারা আল্লাহর সাথে কোন জিনিসকে শরীক করে না, আল্লাহ তার ব্যাপারে তাদের সুপারিশ গ্রহণ করবেন।" (মুসলিম ২২৪২নং)
মহানবী মৃতকে সমাধিস্থ করার পর তার নিকট দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলতেন,
( اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ ، فَإِنَّهُ الْآنَ يُسأَلُ )).
"তোমরা তোমাদের ভাইদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য স্থিরতার দুআ কর। কেননা, এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।" (আবু দাউদ ৩২২৩নং)
কবর যিয়ারতে গিয়েও ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ করা বিধেয়। (বিস্তারিত দেখুন: 'জানাযা দর্পণ')
তবে মহান আল্লাহর কাছে অপরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করার শর্ত রয়েছে। আর তা হল এই যে, যার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা হবে, সে যেন আল্লাহর দুশমন, আল্লাহদ্রোহী, বেদ্বীন, নাস্তিক, মুনাফিক, কাফের বা মুশরিক (মতান্তরে বেনামাযী) না হয়। যেহেতু তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার অনুমতি নেই।
লালনকারী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় আল্লাহর রসূল তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, "চাচা! আপনি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ব্যতীত কেউ সত্য উপাস্য নেই) বলুন, আমি কিয়ামতে তা দলীলস্বরূপ আল্লাহর সামনে পেশ করে তাঁর আযাব থেকে রক্ষা করার সুপারিশ করব।" কিন্তু পার্শ্বেই আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়া ও আবু জাহল বসেছিল, তারা তাঁকে স্ব-ধর্ম ত্যাগ করতে বাধা দিলে আবু তালেব কালেমা পড়তে অস্বীকার করলেন। মহানবী বললেন,
(أَمَا وَاللَّهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أَنْهَ عَنْكَ).
"আল্লাহর কসম! যতক্ষণ না আমাকে আপনার ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে, ততক্ষণ আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট 'ইস্তিগফার' (ক্ষমা প্রার্থনা) করতে থাকব।"
কিন্তু আল্লাহর তরফ থেকে উত্তর এল,
{مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أَوْلِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ} (۱۱۳) سورة التوبة
"নবী এবং মুমিনদের জন্য সঙ্গত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও বা তারা আত্মীয়-স্বজন হয়; যখন এ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ওরা দোযখবাসী।" (তাওবাহঃ ১১৩)
আবু তালেবের ব্যাপারে আরো অবতীর্ণ হল,
{إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ} (٥٦)
“(হে নবী!) তুমি যাকে প্রিয় মনে কর, তাকে হেদায়াত করতে (সৎপথে আনতে) পার না। বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনতে পারেন। আর তিনিই ভাল জানেন কারা সৎপথের অনুসারী।” (কাসাসঃ ৫৬, বুখারী ১৩৬০, মুসলিম ১৪১নং)
আল্লাহর রসূল একবার মায়ের কবর যিয়ারতে গেলেন। সঙ্গে কিছু সাহাবাও ছিলেন। সেখানে পৌছে তিনি কেঁদে উঠলেন। সাহাবাগণ কাঁদার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন,
اسْتَأْذِنْتُ رَبِّي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لأُمِّى فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذِنْتُهُ أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي ..
"আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আমার আম্মার জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু তিনি অনুমতি দিলেন না। আমি তাঁর কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলাম, তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন।" (মুসলিম ২৩০৩নং)
আল্লাহর রসূল এর মনে প্রশ্ন জাগল যে, ইব্রাহীম তো তাঁর পিতার জন্য (মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও) ইস্তিগফার করেছিলেন। আল্লাহর তরফ থেকে উত্তর এল,
{وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَن مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لأَوَّاهُ حَلِيمٌ } (١١٤) سورة التوبة
"ইব্রাহীম তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল এবং তা (ইস্তিগফার) তাকে দেওয়া আল্লাহর একটি প্রতিশ্রুতির জন্য সম্ভব হয়েছিল। অতঃপর যখন এ তার নিকট সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন ইব্রাহীম তার সম্পর্কে নির্লিপ্ত হয়ে গেল। নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিল কোমল হৃদয় ও সহনশীল।" (তাওবাহঃ ১১৪, তফসীর ইবনে কাষীর ২/৩৯৩)
বলাই বাহুল্য যে, আল্লাহর দুশমনদের জন্য না ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ করা যাবে, আর না তাদের ব্যাপারে সে দুআ কবুল হবে।
মোটকথা, মৃতব্যক্তির জন্য দুআ বিধেয়। আর সে কথার ইঙ্গিত রয়েছে আল-কুরআনে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ} (١٠) سورة الحشر
"যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।" (হাশ্রঃ ১০)
অনুরূপভাবে নেক সন্তান পিতামাতার জন্য দুআ করলে, তাদের কাজে লাগবে। মহানবী বলেছেন,
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ..
"আদম সন্তান মারা গেলে তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অবশ্য তিনটি আমল বিচ্ছিন্ন হয় না; সদকাহ জা-রিয়াহ (ইষ্টাপূর্ত কর্ম), উপকারী ইল্ম, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে থাকে।" (মুসলিম ৪৩১০, আবু দাউদ ২৮৮২নং প্রমুখ)
((إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَرْفَعُ الدَّرَجَةَ لِلْعَبْدِ الصَّالِحِ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ يَا رَبِّ أَنَّى لِي هَذِهِ فَيَقُولُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ)).
"নিশ্চয় আল্লাহ আয্যা অজাল্ল জান্নাতে নেক বান্দার দর্জা উঁচু করেন। সে তখন বলে, 'হে আমার প্রতিপালক! এ উন্নতি কীভাবে?' আল্লাহ বলেন, 'তোমার জন্য তোমার ছেলের ক্ষমা প্রার্থনার ফলে।" (আহমাদ ১০৬১০নং)
আর সে সব দুআ কবুল হলে জাহান্নামের শাস্তি থেকে অবশ্যই রেহাই পাবে মু'মিন।
📄 (৫) বিপদাপদ
দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত এ জীবন। এমন কোন মানুষ নেই, যে কোন দুঃখ বা কষ্ট পায় না। কিন্তু সেই দুঃখ-কষ্ট অনেক সময় মানুষের নিজ কৃতকর্মের প্রতিফল হয়। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত শাস্তি হয়। কারো জন্য ঈমানের পরীক্ষা হয়। সুতরাং যে যত বেশি ভালো মানুষ, তার দুঃখ-কষ্ট তত বেশি হয়। মহানবী বলেছেন,
(أَشَدُّ النَّاسِ بَلاء الأنبياء ثُمَّ الأَمْثَلُ فالأمْثَلُ يُبْتَلى الرَّجُلُ عَلى حَسَبِ دِينِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صُلْباً اشْتَدَّ بَلاؤُهُ وإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةٌ ابْتُلِيَ على قَدْرِ دِينِهِ فَمَا يَبْرَحُ البَلاءُ بالعَبْدِ حَتَّى يَتْرُكَهُ يَمْشِي على الأرض وما عليهِ خَطِيئَةٌ)).
"সকল মানুষ অপেক্ষা নবীগণই অধিকতর কঠিন বিপদের সম্মুখীন হন। অতঃপর তাঁদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তি এবং তারপর তাদের চেয়েও নিম্নমানের ব্যক্তিগণ অপেক্ষাকৃত হাল্কা বিপদে আক্রান্ত হন। মানুষকে তার দ্বীনের (পূর্ণতার) পরিমাণ অনুযায়ী বিপদগ্রস্ত করা হয়; সুতরাং তার দ্বীনে যদি মজবুতি থাকে, তবে (যে পরিমাণ মজবুতি আছে) ঠিক সেই পরিমাণ তার বিপদও কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি তার দ্বীনে দুর্বলতা থাকে তবে তার দ্বীন অনুযায়ী তার বিপদও (হাল্কা) হয়। পরন্ত বিপদ এসে এসে বান্দার শেষে এই অবস্থা হয় যে, সে জমীনে চলা ফেরা করে অথচ তার কোন পাপ অবশিষ্ট থাকে না।" (তিরমিযী ২৩৯৮, ইবনে মাজাহ ৪০২৩, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৯৯২ নং)
মু'মিন নারী-পুরুষের জীবনে কোন বালা-মসিবত বা বিপদাপদ এলে তার ফলে তার গোনাহ মোচন হয়ে যায়। যে কষ্ট সে পায়, তার বিনিময়ে করুণাময় তাকে পাপমুক্ত, শুদ্ধ ও পবিত্র করেন। মহানবী বলেছেন,
(( مَا يَزَالُ البَلاءُ بِالْمُؤْمِن وَالْمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهُ تَعَالَى وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئة )). رواه الترمذي
"মু'মিন পুরুষ ও নারীর জান, সন্তান-সন্ততি ও তার ধনে (বিপদ-আপদ দ্বারা) পরীক্ষা হতে থাকে, পরিশেষে সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে নিষ্পাপ হয়ে সাক্ষাৎ করবে।" (তিরমিযী ২৩৯৯নং)
((مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ ، وَلَا وَصَبٍ ، وَلَا هُمْ ، وَلَا حَزَن ، وَلَا أَدْى ، وَلَا غَم ، حَتَّى الشَّوكَةُ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَرَ اللهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
"মুসলিমকে যে কোন ক্লান্তি, অসুখ, চিন্তা, শোক এমন কি (তার পায়ে) কাঁটাও লাগে, আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে তার গোনাহসমূহ ক্ষমা ক'রে দেন।" (বুখারী ৫৬৪১-৫৬৪২, মুসলিম ৬৭৩৩নং)
ইবনে মাসউদ বলেন, একদা আমি নবী -এর খিদমতে উপস্থিত হলাম। সে সময় তিনি জ্বর ভুগছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনার যে প্রচন্ড জ্বর!' তিনি বললেন, "হ্যাঁ! তোমাদের দু'জনের সমান আমার জ্বর আসে।" আমি বললাম, 'তার জন্যই কি আপনার পুরস্কারও দ্বিগুণ?' তিনি বললেন,
(( أَجَلْ ، ذلِكَ كَذلِكَ ، مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أذى ، شَوْكَةٌ فَمَا فَوقَهَا إِلَّا كَفَرَ اللَّهُ بِهَا سَيِّئَاتِهِ ، وَحُطَّتْ عَنْهُ ذُنُوبُهُ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ وَرَقَهَا )).
"হ্যাঁ! ব্যাপার তা-ই। (অনুরূপ) যে কোন মুসলিমকে কোন কষ্ট পৌঁছে, কাঁটা লাগে অথবা তার চেয়েও কঠিন কষ্ট হয়, আল্লাহ তাআলা এর কারণে তার পাপসমূহকে মোচন ক'রে দেন এবং তার পাপসমূহকে এইভাবে ঝরিয়ে দেওয়া হয়; যেভাবে গাছ তার পাতা ঝরিয়ে দেয়।" (বুখারী ৫৬৪৮, মুসলিম ৬৭২৪নং)
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
((مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذَى مَرَضٌ فَمَا سِوَاهُ إِلَّا حَطَّ اللَّهُ لَهُ سَيِّئَاتِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ ورقها )).
"কোন মুমিনকে যখনই কোন রোগ অথবা অন্য কিছুর মাধ্যমে কষ্ট পৌঁছে, তখনই আল্লাহ তার বিনিময়ে তার পাপরাশিকে ঝরিয়ে দেন; যেমন বৃক্ষ তার পত্রাবলীকে ঝরিয়ে থাকে।" (বুখারী ৫৬৬০, ৫৬৬৭, মুসলিম ৬৭২৪নং)
তিনি আরো বলেছেন,
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنَ مِنْ شَوْكَةٍ فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً أَوْ حَطَّ عَنْهُ بِهَا خطيئة ». رواه مسلم
"মু'মিন কোন কাঁটা বা তার চাইতে বড় কোন কিছু দ্বারা বিপদগ্রস্ত হলে আল্লাহ তার বিনিময়ে তাকে একটি মর্যাদায় উন্নত করেন অথবা তার একটি পাপ মোচন ক'রে দেন।" (মুসলিম ৬৭২৭নং)
জাবের বলেন, রাসূলুল্লাহ (একবার) উম্মে সায়েব কিংবা উম্মে মুসাইয়িবের নিকট প্রবেশ ক'রে বললেন, "হে উম্মে সায়েব কিংবা উম্মে মুসাইয়িব! তোমার কী হয়েছে যে, থর করে কাঁপছ?" সে বলল, 'জ্বর হয়েছে; আল্লাহ তাতে বর্কত না দিন।' (এ কথা শুনে) তিনি বললেন,
(( لَا تَسبِّي الحُمَّى فَإِنَّهَا تُذْهِبُ خَطَايَا بَنِي آدَمَ كَمَا يُذْهِبُ الكِيْرُ خَبَثَ الحَدِيدِ )) .
“জ্বরকে গালি দিয়ো না। জ্বর তো আদম সন্তানের পাপ মোচন করে; যেমন হাপর (ও ভাটি) লোহার ময়লা দূর ক'রে ফেলে।” (মুসলিম ৬৭৩৫নং)
অবশ্য পাপ ক্ষয়ের জন্য শর্ত হল, মু'মিন বালা-মসিবতে ধৈর্যধারণ করবে এবং সওয়াবের আশা রাখবে। উপরন্তু সে তাতেও মহান প্রতিপালকের প্রশংসা করলে এমন পাপমুক্ত হবে, যেমন সদ্যভূমিষ্ঠ শিশু নিষ্পাপ হয়। মহানবী বলেছেন,
((إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ : إِنِّي إِذا ابْتَلَيْتُ عَبْدًا مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنًا فَحَمِدَنِي عَلَى مَا ابْتَلَيْتُهُ فَإِنَّهُ يَقُومُ مِنْ مَضْجَعِهِ ذَلِكَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ مِنْ الْخَطَايَا، وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: أَنَا فَيَدْتُ عَبْدِي وَابْتَلَيْتُهُ وَأَجْرُوا لَهُ كَمَا كُنْتُمْ تُجْرُونَ لَهُ وَهُوَ صَحِيحٌ)).
"আল্লাহ আয্যা অজাল্ল বলেন, "আমি যখন আমার কোন মুমিন বান্দাকে (রোগ-বালা দিয়ে) পরীক্ষা করি এবং সে ঐ রোগ-বালাতে আমার প্রশংসা করে, তখন সে তার ঐ বিছানা থেকে সেই দিনকার মত নিষ্পাপ হয়ে ওঠে, যেদিন তার মা তাকে ভূমিষ্ঠ করেছিল।" রব্ব আয্যা অজাল্ল (কিরামান কাতেবীনকে) বলেন, “আমি আমার বান্দাকে (অনেক আমল থেকে) বিরত রেখেছি এবং রোগগ্রস্ত করেছি। সুতরাং তোমরা তার জন্য সেই আমলের সওয়াব লিখতে থাক, যে আমলের সওয়াব তার সুস্থ অবস্থায় লিখতে।” (আহমাদ ১৭১১৮, সহীহ তারগীব ৩৪২৩নং)
সুতরাং যাদের দুঃখ-কষ্টের সংসার, যারা চিররোগা ও অসুস্থ, তাদের জন্য অবশ্যই সুসংবাদ। তারা দুনিয়াতে সুখ না পেলেও আখেরাতে তার বিনিময়ে পাবে চিরসুখের রাজ্য। যেহেতু তারা কষ্টে ধৈর্যধারণ ক'রে সওয়াবের আশা করে এবং তাওহীদ ও ঈমান নিয়ে নিষ্পাপ হয়ে প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে।
📄 (৬) কবরের আযাব
কবরের আযাব সত্য। কোন মু'মিন কোনও পাপ থেকে তওবা ক'রে মারা না গেলে তার কবরে আযাব হতে পারে। আর তার ফলে তার জাহান্নামের শাস্তি লাঘব হতে পারে অথবা মাফ হতে পারে।
কবরের শাস্তির মধ্যে মাটির চেপে ধরা অন্যতম। আর সেটা সকলের জন্য অনিবার্য। কেউ বাঁচলে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী সা'দ বিন মুআয বাঁচতেন। মহানবী বলেছেন,
((هَذَا الَّذِي تَحَرَّكَ لَهُ الْعَرْشِ وَفُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَشَهِدَهُ سَبْعُونَ أَلْفًا مِنَ الْمَلَائِكَةِ لَقَدْ ضُمَّ ضَمَّةً ثُمَّ فُرِّجَ عَنْهُ)).
“এই ব্যক্তি, যার (মৃত্যুর) জন্য আরশ কম্পিত হয়েছে, তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তার জানাযায় সত্তর হাজার ফিরিস্তা উপস্থিত হয়েছেন, তাকেও একবার চেপে ধরা হয়েছে। অতঃপর মুক্তি দেওয়া হয়েছে।” (নাসাঈ ২০৫৫নং)
এ ছাড়া পাপ অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি রয়েছে কবরে। আর সে শাস্তি কবরে পেয়ে গেলে জাহান্নামের শাস্তি হাল্কা অথবা মাফ হয়ে যাবে。